চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫২
আয়াত বিনতে নূর
রিভানের জীবনটা জানো, একদম অন্য রকম হয়ে গেছে। এই রিভান আর আগের রিভানের মধ্যে এখন আকাশ-পাতাল ব্যবধান। সে আর আগের মতো নেই। চিরচেনা সেই মুখের মিষ্টি হাসিটা জানো কোথাও উধাও হয়ে গেছে। এখন তার ভুল করেও হাসতে ইচ্ছে করে না।
আর ছেলেকে এমন দেখে মাহতাব তালুকদার ও মমতা তালুকদারও বেশ চিন্তিত। হঠাৎ করে রিভানের হলোটা কী, কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। রিভানকে অনেকবার এই বিষয়ে জিজ্ঞেসও করা হয়েছে, কিন্তু কোনো উত্তর মেলেনি। সবসময় প্রশ্নটাকে এড়িয়ে চলেছে সে।
নিজের মনে কী চলছে, সে আর কিভাবে বোঝাবে অন্য কাউকে? সেই দুঃখ বোঝার সাধ্য হয়তো কারও নেই, আর না হবে।
নিশিতাকে প্রথমবার দেখায় যা অনুভব করেছিল রিভান—সেই মায়া, সেই ভালোবাসা, মায়াবী দুটো চোখ—সেই প্রথম দেখার অনুভূতিগুলো ছিল অন্যরকম মুগ্ধতায় মেশানো। কিন্তু যখনই ফারিসের মুখ থেকে ‘নিশিতাকে ফারিস ভালোবাসে’ কথাটা শুনেছিল, তখন অনুভূতিগুলো ছিল খারাপ কোনো স্বপ্নের মতো, যা কিছুতেই মেনে নেওয়ার মতো না।
কিন্তু তাও কি রিভান পেরেছে এক শতাংশও নিশিতার ওপর থেকে মায়া কমাতে?
নাহ্… অসম্ভব…
ফারিসের বলা কথাগুলোও পারেনি নিশিতাকে রিভানের মন থেকে ভোলাতে।
কিন্তু রিভানও বুঝতে পারছে যে, ফারিস থাকতে সে কখনো নিশিতাকে নিজের করে পাবে না। নিশিতার কাছেও যেতে পারবে না। কারণ ফারিস সবসময় শকুনের মতো দৃষ্টি দিয়ে নিশিতাকে ঘিরে রেখেছে। যেন ফারিসের দুনিয়া থেকে নিশিতা বের হতে না পারে।
কিন্তু রিভানই বা কী করবে?
বেহায়া মনটা তো সবসময় চায় তার ভালোবাসার মানুষটাকে দেখতে, কাছে যেতে, নিজের করে নিতে।
এসব ভাবতে ভাবতেই রিভান টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা হাতে নিল। সেই দিনের নিশিতার কালো শাড়ি পরা ছবিটা গ্যালারি থেকে বের করল। জুম করে দেখতে থাকল তার এই জীবনের প্রথম ভালোবাসার নারীকে, যাকে দেখে গত সাতাশ বছরেও কোনো মেয়েকে দেখে এমন অনুভূতি হয়নি তার।
এত মায়া তো কখনো আগে অন্য কোনো মেয়েকে দেখে রিভানের হয়নি। এমনকি মমতা তালুকদার বিয়ের জন্য কত মেয়ে দেখিয়েছেন, তবুও কখনো এমন ফিল হয়নি।
এসব ভাবনার মাঝেই নিশিতার ছবির দিকে তাকিয়ে বলল—
“নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি সর্বদা আকর্ষণ আর ভালোবাসা—দুটোই বেশি থাকে, তাই না মায়াবিনী?”
কথাটুকু বলে বাঁকা হাসল রিভান।
সে তো জানে, ছবি থেকে বেরিয়ে এসে নিশিতা কখনো তার এই প্রশ্নের উত্তর দেবে না। তারও কী জানি কী হলো!
এর মাঝেই হঠাৎ করে রিভানের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট নক করল।
রিভান ফোনটা টেবিলে রেখে বলল—
“কামিং…”
লোকটা ভিতরে প্রবেশ করে বলল,
— “স্যার, কালকে আপনার লন্ডনের ফ্লাইট রয়েছে দুপুর ২টায়। টেন্ডারের কাজের জন্য সেখানে মিটিং রাখা হয়েছে। আপনাকে সেখানে মিনিমাম ২০ দিনেরও বেশি থাকতে হতে পারে। তাই আমি প্যাকিংয়ের জন্য বলে দিয়েছি।”
কথাগুলো বলে লোকটা চলে গেল।
রিভান আর কিছু বলল না।
কী-ই বা করবে সে? এখানে থেকে লাভ কী! তার চেয়ে কিছুদিন বাইরে থেকে ঘুরে আসলে মনটাও হালকা হবে। আর জরুরি কাজের মাঝে থাকলে এসব এতটা মনে বসবে না। এসব ভেবেই রিভান সিদ্ধান্ত নিল, সে যাবে।
এদিকে জামান বাড়িতে আজ ১৫ দিন ধরে আরিশা বাইরের দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ অবগত। বাইরের দুনিয়ার কোনো খবরই জানে না সে। জানবেই বা কী করে? বাড়ি থেকে তো দূরের কথা, নিজের রুম থেকেও এক সেকেন্ডের জন্য বের হয়নি আরিশা।
কাঁদতে কাঁদতে এখন হয়তো তার চোখের জলও শুকিয়ে গেছে। আরিশা যেন এক নীরব কাঠের পুতুলে পরিণত হয়েছে। না আছে কোনো অনুভূতি, না আছে কোনো অনুভূতির প্রকাশ। ইচ্ছে হলে খায়, না হলে খায় না।
আরিশ জামানও মেয়েকে নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত।
কী করবে, না করবে—কিছুই তিনি ভেবে পাচ্ছেন না। এই ২৫ বছরে প্রথমবারের মতো আরিশাকে এতটা ভেঙে পড়তে দেখেছেন তিনি। নিজের মেয়েকে নিয়ে দিনরাত তার চিন্তার শেষ নেই। কী করবে, না করবে—কিছুই বুঝতে পারছেন না।
মেয়ের কষ্টটা কিছুতেই সহ্য হচ্ছে না তার।
এদিকে কালকে উর্মি জামান দেশে ফিরবে। আরিশ এই নিয়েও বেশ চিন্তিত। কী জবাব দেবেন তিনি তাকে?
যে এক মাসের জন্য মেয়েটার খেয়াল রাখতে পারেননি? একটুও যত্ন নিতে পারেননি?
এসব ভাবতেই কেমন যেন মাথা গুলিয়ে গেল।
সবকিছু সামলানো আরিশ জামানের পক্ষে দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারও কিছু করার নেই। সবই যে পরিস্থিতির শিকার।
এদিকে ফারিস নিশিতাকে নিয়ে চৌধুরী ভিলার সামনে গাড়িটা থামালো। পুরো রাস্তা নিশিতা নীরব ছিল। ফারিস তাকে ঠিক সময়ে বাঁচিয়ে নিলেও আজ যদি সে না আসত, তাহলে হয়তো নিশিতার আর রক্ষা হতো না।
এসব ভাবলেই নিশিতার সারা শরীর ভয়ে কেঁপে উঠছে। ফারিস তা দেখেও কিছু বলল না। তাকে নিজের মতো করে সামলে নেওয়ার সময় দিল।
ফারিসের ডাকে নিশিতার ধ্যান ভাঙল।
ফারিস স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
— “যাও, বাড়ির ভিতরে যাও। আমার কাজ আছে, ফিরতে রাত হবে।”
ফারিসের কথায় নিশিতার সবার আগে ওই মেয়েগুলোর কথা মনে পড়ল। তখন যেভাবে মেয়েগুলো ফারিসকে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছিল, সেই দৃশ্য মনে হতেই নিশিতা চটে গেল।
একরাশ বিরক্তি আর রাগ নিয়ে বলল,
— “হ্যাঁ… তাই তো! আমি বাড়িতে চলে যাই আর আপনি ওই মেয়েগুলোর সাথে গিয়ে আবারও ফ্লার্টিং করুন, তাই না?”
নিশিতার কথায় ফারিস বোকা বনে গেল।
সে কী বলছে আর এই মেয়ে কী বলছে!
রাতারাতি তাকে লুচ্চা টাইপের মানুষ বানিয়ে ফেলছে।
ফারিস শুধু অবাক হয়ে ভাবল, এই মেয়ে নিজের স্বামীকে বিশ্বাসই করে না। অথচ নিজের আটাশ বছরের জীবনে নিশিতা ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে পর্যন্ত তাকায়নি সে।
ফারিস বিরক্ত হয়ে বলল,
— “ম্যাডাম, আপনার এসব কথা বাদ দিয়ে ভিতরে যান।”
নিশিতা গাল ফুলিয়ে বলল,
— “নাহ্… আপনি আগে চলুন আমার সাথে বাড়ির ভিতরে, তারপর।”
ফারিস বুঝল, তার বউ এভাবে যাবে না। তাই আর কিছু না বলে ফোন বের করে সোজা রিয়াকে ডাকল নিশিতাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
রিয়া ফিরেছে বেশ অনেকক্ষণ আগে। বাড়ির কারও সাথে আর কথা হয়নি তার। এসে সোজা নিজের রুমে চলে গিয়েছিল। আর রাজীব অহনাকে নিয়ে আবারও বেরিয়ে গেছে।
রিয়া মাত্র শাওয়ার নিয়ে চুলে তোয়ালে পেঁচাতে পেঁচাতে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দেখল ফোনের স্ক্রিনে ফারিসের মেসেজ ভেসে আছে। ফারিস শুধু তাকে নিচে, বাড়ির সামনে আসতে বলেছে।
রিয়া ঠিক বুঝল না হঠাৎ কী হলো আবার। বেশি কিছু না ভেবে যেভাবে ছিল, ঠিক সেভাবেই রুম থেকে বের হয়ে নিচে চলে গেল।
বাড়ির বাইরে গিয়ে চারদিকে তাকিয়ে দেখল কেউ নেই। তাহলে হঠাৎ করে এভাবে ফারিস ডাকল কেন, তার কিছুই বুঝতে পারল না।
হঠাৎ করে চোখ পড়ল ফারিসের গাড়ির দিকে।
গাড়ির গ্লাস নামানো ছিল বলে বাইরে থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, কোনো একটা কারণে নিশিতা ফারিসের উপর খুব রেগে আছে।
ধীরে ধীরে গাড়ির কাছে যেতেই ফারিস রিয়াকে দেখে দরজা খুলে গাড়ি থেকে নামল। তারপর অপর পাশের দরজাটা খুলে নিশিতাকে বের হতে বলল।
নিশিতা রাগি রাগি ভাব নিয়ে গাড়ি থেকে বের হলো।
ফারিস নিশিতাকে গুরুত্ব না দিয়ে রিয়াকে বলল,
— “তোর ভাবিকে ভিতরে নিয়ে যা, নাহলে আমাকে আরও অনেক কিছু বানিয়ে দেবে।”
ফারিসের কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারল না রিয়া। প্রশ্নভরা দৃষ্টিতে তাকাল তার দিকে।
ফারিস বিরক্ত হয়ে বলল,
— “কী রে? নিয়ে যাবি নাকি বল তো?”
ফারিসের ধমক শুনে রিয়া নিশিতার হাত ধরে টেনে এনে বলল,
— “এই চল আমার সাথে। তাড়াতাড়ি আয়। তোর হয়েছে কী? এমন করছিস কেন?”
কিন্তু নিশিতা তো ফারিসকে না নিয়ে নড়বেই না।
রিয়ার কাছ থেকে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল,
— “রিয়ু, ডাইনি, ছাড় আমাকে। তোর ভাই সবার সাথে গিয়ে কথা বলবে, এটা আমার সহ্য হবে না। রিয়া ছাড়… ছাড়…!”
রিয়া অবাক হয়ে নিশিতার কথাগুলো শুনল।
নিশিতা কী বলছে, তা এই মুহূর্তে রিয়ার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
ফারিসের বিরক্তি এবার চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেল।
রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তুই যা, আমি ওকে পাঠাচ্ছি।”
রিয়া কিছু বলল না। চুপচাপ চলে গেল। তবে বেশ বিরক্ত হলো। ফারিস নিজে ডেকে এনে আবার নিজেই যেতে বলছে। যদি বউকে এতই ভয় পায়, তাহলে আবার ডাকল কেন!
রিয়া যেতেই ফারিস নিশিতাকে গাড়ির সাথে চেপে ধরল।
নিশিতা এতক্ষণ চেঁচামেচি করলেও ফারিসের হঠাৎ এমন গম্ভীর হয়ে যাওয়ায় বেশ অবাক হলো। সাথে ভয়ও পেল।
রাগের মাথায় কত কিছু বলে ফেলেছে, সেটা ভাবতেই নিজের কাছেই মনে হলো সে যেন একটু বেশিই বলে ফেলেছে।
ফারিস তো নিশিতা ছাড়া কখনো অন্য কোনো মেয়ের দিকে তাকায় পর্যন্ত না। আর সেখানে সে রাগের মাথায় কত কী বলে ফেলল!
এখন যদি ফারিস তাকে বকা দেয় বা মারে, তাহলে কী হবে? কে বাঁচাতে আসবে তাকে?
নিশিতা চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলল,
— “হে আল্লাহ, এবারের মতো বাঁচিয়ে দাও। আর কখনো এই রাক্ষসটার সামনে এগুলো বলব না। আমাকে এক চড় দিলে খুঁজে পাওয়া যাবে না। হে মাতুব, আমাকে বাঁচাও।”
ফারিস নিশিতাকে এমন অবস্থায় দেখে নিজের বিরক্তি ভুলে গিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হাসল।
তারপর নিশিতাকে ছেড়ে দিয়ে বলল,
— “যাও ডার্লিং, ভিতরে যাও। আজকের মতো ছেড়ে দিলাম।”
ফারিস এটা বলে গাড়িতে উঠে বসল।
তারপর বলল,
— “ফিরতে রাত হবে। ঘুমিয়ে পড়িস।”
বলে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চৌধুরী ভিলার সামনে থেকে চলে গেল।
নিশিতা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ফারিসের গাড়ি চলে যাওয়ার দিকে।
ব্যাপারটা ঠিক বুঝল না সে। ফারিসকে দেখে তো মনে হচ্ছিল, সে যেন কিছু একটা করবে। কিন্তু হলো তার ঠিক উল্টোটা।
নিশিতা বিড়বিড় করে বলল,
— “যাই হোক, আমার কী! আমি তো বেঁচে গেছি।”
কথাটা বলে আর সময় নষ্ট করল না। দ্রুত পায়ে বাড়ির ভিতরে চলে গেল।
ঘড়ির কাঁটায় ঠিক ৮টা ৪৫ মিনিট।
ফারিসের অফিসে বেশ কিছু কাজ ছিল। আর দুটো মিটিং অ্যাটেন্ড করতে করতেই সময় যেন কিভাবে পার হয়ে গেল, টেরই পেল না। নিজের সব কাজ শেষ করে সে কেবিনে নিহানকে ডেকে আনল।
নিহান দ্রুত এসে কেবিনের দরজায় নক করল।
— “আসবো স্যার?”
ফারিস ছোট করে বলল,
— “হুম, এসো।”
নিহান দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করল। ফারিসকে তার সুবিধার লাগছিল না। কে জানে আবার কী বলে বসে।
নিহান কিছু বলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছিল, তার আগেই ফারিস উঠে দাঁড়াল। নিহানের দিকে তাকিয়ে বলল—
— “আমার কালকে অফিসে আসতে লেট হবে। সব কিছু সামলে নিও। আর যে মিটিংগুলো আছে সেগুলো রাজীবকে বলবে সামলে নিতে।”
নিহান ছোট করে বলল—
— “জি স্যার।”
ফারিস কোনো উত্তর না দিয়ে গটগট পায়ে কেবিন থেকে বের হয়ে গেল।
পিছনে পড়ে রইল ফাঁকা, সুনসান অফিসটা।
অফিস থেকে বের হয়েই কালো বিলাসবহুল মার্সিডিজে উঠে রওনা দিল এক অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।
চোখে আবারও সকালের সেই জমে থাকা ক্ষোভ ধীরে ধীরে ফিরে আসছিল। জানা নেই, এবার আবার কে হবে তার সেই ক্ষোভের শিকার, তার এই পাগলামির।
ঢাকা শহরের এক পরিত্যক্ত বাড়ি।
দেখলেই বোঝা যায়, এখানে বহু আগেই মানুষের বসবাস শেষ হয়েছে। চারপাশে ঝোপঝাড়, মাকড়সার জাল আর ভাঙাচোরা দেয়ালে ভরে আছে জায়গাটা। এক কথায় পুরো এলাকা যেন পরিত্যক্ততার প্রতিচ্ছবি।
চারপাশে কোনো বাড়িঘর তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষের চলাফেরাও নেই। এমন ভুতুড়ে পরিবেশে আসতে গেলেই শরীর কেঁপে ওঠার কথা।
ঠিক সেই বাড়িটার সামনেই থামল ফারিসের কালো মার্সিডিজ।
গাড়ির টায়ারের ঘর্ষণের শব্দে চারপাশের নিস্তব্ধতা মুহূর্তেই ভেঙে গেল। রাস্তার ধুলোকণা বাতাসে উড়তে শুরু করল, আর গাড়ির হেডলাইটে তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
ফারিস গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল।
তার মুখশ্রী আগের মতোই গম্ভীর, রগচটা। বরং আজ তাকে আরও বেশি কঠিন লাগছিল।
গটগট পায়ে সে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।
বাড়ির ভেতরে প্রায় কিছুই নেই বললেই চলে।
এক পাশে ভাঙাচোরা কাঠের আসবাবপত্র এলোমেলোভাবে পড়ে আছে। মাথার ওপরে টিমটিমে আলো দেওয়া বাল্বের আলোয় পুরো ঘরটা আরও ভয়ংকর লাগছে। চারদিকে মাকড়সার জাল আর ধুলোর স্তূপ।
আর তার মাঝখানে পড়ে আছে একটা ছেলে।
হাত-পা ও পিঠ শক্ত করে বাঁধা। চোখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। বড় বড় চোখে সে তাকিয়ে আছে, যেন এই মুহূর্তেই প্রাণ বের হয়ে যাবে।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে সে আরও সিঁটিয়ে গেল। চোখে বাঁচার আকুল মিনতি।
লোকটার মুখে ফুটে উঠল এক বাঁকা হাসি। সেই হাসিতে মিশে আছে বিদ্রুপ, ঘৃণা আর এক অদ্ভুত নিষ্ঠুরতা।
— “কি রে, শুয়োরের বাচ্চা?”
কথাটা কানে যেতেই ছেলেটার শরীর যেন আরও কেঁপে উঠল। চোখে-মুখে স্পষ্ট মৃত্যুভয়। সে মরিয়া হয়ে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু ভয়ে গলা দিয়ে কোনো শব্দই বের হলো না।
ফারিস ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে গেল। টিমটিমে আলোয় তার ছায়াটা আরও ভয়ংকর লাগছে। চোখ দুটো রক্তিম আভায় জ্বলছে যেন। মুখে কোনো দয়া নেই, কোনো সহানুভূতি নেই—শুধু জমাট বাঁধা ক্ষোভ।
ছেলেটা কাঁপা কাঁপা চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টিতে ছিল বাঁচার আকুতি, ক্ষমা চাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা।
ফারিস তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর নিচু হয়ে ছেলেটার থুতনি শক্ত করে চেপে ধরল।
— “সাহস তো কম না তোর। কার দিকে হাত বাড়াতে গিয়েছিলি, মনে আছে?”
ছেলেটার ঠোঁট কাঁপছে। শরীর ঘামে ভিজে গেছে। সে কিছু একটা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু কথাগুলো এলোমেলো হয়ে বের হলো।
— “ভা… ভাই… ভুল হয়ে গেছে… আমাকে ছেড়ে দিন…”
ফারিস ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উঠল।
— “ভুল?”
তার কণ্ঠস্বর শুনেই ছেলেটার বুকের ভেতরটা যেন হিম হয়ে গেল।
— “মানুষ ভুল করে। কিন্তু তুই যা করেছিস, সেটা ভুল না… সেটা অপরাধ।”
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫১
কথাগুলো বলে ফারিস ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর পকেটে হাত ঢুকিয়ে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল।
চারদিকে আবারও নেমে এলো ভয়ঙ্কর নীরবতা।
সেই নীরবতার মাঝেই শোনা যাচ্ছিল শুধু ছেলেটার আতঙ্কিত নিঃশ্বাসের শব্দ আর মাথার ওপর ঝুলে থাকা বাল্বটার টিকটিক আওয়য়াজ।
ফারিসের চোখে তখন একটাই জিনিস স্পষ্ট—আজ সে কোনো জবাব শুনতে আসেনি, এসেছে হিসাব মেলাতে।
