চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২০
আরোবা চৌধুরী আরু
রুহি ওয়াশরুমে ফ্রেশ হতে গিয়েছে । এদিকে নাফিসা রাহিলকে হাত-মুখ ধুয়ে দিয়েছে, নিজেও জামা-কাপড় বদলে ফ্রেশ হয়ে নিয়েছে। দু’জন খাটের উপর গোল হয়ে বসে আছে। এই রুমটা বরাদ্দ হয়েছে তার, রাহিল আর রহির জন্য । এ বাড়িতে প্রত্যেককে আলাদা আলাদা রুম দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে ভাগ ভাগ করে দেয়া হয়েছে সবার থাকার জায়গা।
রাহিল নাফিসার হাত ধরে খেলছে—আঙ্গুলগুলো টিপে টিপে চাপ দিচ্ছে। নাফিসা ওকে দেখছে, রাহিল হঠাৎ বলেই ফেলল,
—“আমার না তোমাকে অনেক ভালো লাগে। তুমি অনেক কিউট।”
কথাটা বলতে গিয়েও সে লাজুকভাবে চোখ নামিয়ে নিল।
নাফিসা মুচকি হেসে ওর গাল ধরে টান দিয়ে বলল,
—“পাকা বুড়ো! তুমি একটা বুড়ো! তোমাকেও আমার অনেক ভালো লাগে।”
রাহিল গম্ভীর মুখে কপাল কুঁচকে বলল,
—“আমি বুড়ো না, আমি তো ছোট্ট বাচ্চা! তুমি আমাকে বুড়ো বলছো কেন?”
নাফিসা আবার ওর গাল টেনে দিয়ে হেসে উঠল,
—“তুমি যে এত পাকা পাকা কথা বলো, সেজন্যই তো তোমাকে বুড়ো বলি বুঝলে, পাকা বুড়ো!”
রাহিল গোল গোল চোখে তাকাল, তারপর কি যেন বুঝে মাথা নেড়ে সায় দিল।
ঠিক তখনই খট করে বাথরুমের দরজা খুলে গেল। রহি চুল মুছতে মুছতে এসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়াল। ওদের দু’জনের দিকে তাকিয়ে বলল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
—“কিরে, তোরা এখনো খেতে যাসনি নিচে?”
—“আপু তোমার সাথে যাবো বলে বসে আছি।” নাফিসা উত্তর দিল।
—“আমার জন্য বসে থাকার দরকার আছে? দুইজন আগে খেয়ে নিলেই পারিস।”
কথাটা বলেই রহি মাথা মুছতে মুছতে টাওয়েলটা একপাশে রাখল। তারপর বলল,
—“চল!”
তিনজন একসাথে নিচে নামল।
নিচে এসে দেখা গেল, সবাই প্রায় খেতে বসে গেছে। কেউ খাচ্ছে, কেউ এখনো গল্প করছে।
শারমিন আক্তার মিষ্টিকে খাইয়ে দিচ্ছে, রুশনা পাশে টেবিলে বসে একটা একাটা ঢাকনা তুলে রান্না দেখছে আর মাঝে মাঝে এটা ওটা খাবার তুলে নিজের মুখে পুরছে,
—মিষ্টির দিকে একবারও তাকাচ্ছে না। যেন বাবার বাড়িতে ফিরে সে আবার ছোট হয়ে গেছে।
রাইমা মুখ কালো করে খাচ্ছে, রিশা আর জারিন এখনো খাওয়া শুরু করেনি—গল্পে ব্যস্ত। রিদওয়ান আর আরিব আড্ডায় মশগুল। করিম খান আর হাসান খান—দুই ভাই—এখনো খাওয়া শুরু করেনি, প্রিয়ভাগ্নে সায়মান না আসা পর্যন্ত নাকি খাওয়া শুরু করবে না। রাইহান বসে থেকে সবার সাথে গল্প করছে, মাহফুজা বেগম সায়ফানকে খাইয়ে দিচ্ছে আর ও এমন ভঙ্গিতে যেন শুয়ে শুয়েই খেতে পারলে সবচেয়ে স্বস্তি পেত।
রুহি এসে নাফিসা আর রাহিলকে এক জায়গায় বসিয়ে দিল। শারমিন আক্তার ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“তোমাদের খাবার বেড়ে দিই, খাওয়া শুরু করে দাও। আর রাহিলকে আমি খাইয়ে দিচ্ছি।”
রাহিল সাথে সাথেই বলে উঠল,
—“আমি নাফিসা আপুর কাছেই খাব!”
আরিব এবার কৌতূহলী চোখে তাকাল। এতক্ষণে সে নাফিসার ব্যাপারে নিজের মতো করে ইনভেস্টিগেশন করে সব জেনে নিয়েছে।
রুহি বলল,
—“আমি খাইয়ে দিচ্ছি, ওকে আর বিরক্ত করিস না।”
কিন্তু নাফিসা মিনমিন করে বলল,
—“আমি দেবো আপু, সমস্যা নেই।”
ওর ভেতরে হালকা অস্বস্তি—অচেনা এত মানুষ, যদিও সবাই ভালো ব্যবহার করেছে, তবুও ওর মনে হচ্ছে, যেন কোথাও ঠিকভাবে মিশতে পারছে না।
শেষ পর্যন্ত শারমিন আক্তারের জোরাজুরির পরও রাহিলের জেদের কারণে নাফিসাই খাওয়ানো শুরু করল।
ঠিক তখনই সায়মান ঢুকল, টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে। এসে চেয়ার টেনে নাফিসার পাশে বসে পড়ল।
হঠাৎ তার বসার কারণে নাফিসা চমকে পাশ ফিরল। এক মুহূর্তের জন্য চোখাচোখি হতেই ওর বুকের ভেতর ধড়ফড় শুরু হলো। পাশে বসা মানুষটার শরীর থেকে আসা পরিচিত তীব্র গন্ধ নাকে আসতেই তার মনে অদ্ভুত ভালোলাগা জেগে উঠল। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত রাহিলকে খাওয়ানোতে মন দিল।
সায়মান বসতেই করিম খান নিজের হাতে ওর প্লেটে খাবার বেড়ে দিলেন।
—“মামু, আমি নিজেই নেবো। তুমি বসো।”
করিম খান হেসে বসলেন।
সায়মান, করিম খান আর হাসান খানের প্লেটেও খাবার বেড়ে দিল তারপর নিজের টা নিয়ে বসে খাওয়া শুরু করল। ধীরে ধীরে সবাই খাওয়া শুরু করল।
খাওয়া প্রায় শেষ, সবাই উঠে গেছে।
শুধু শারমিন আক্তার আর মাহফুজা বেগম সবার শেষে বসলেন। নাফিসা রাহিলকে খাওয়াতে গিয়ে নিজের খাওয়া দেরি করে ফেলেছে।
শারমিন আক্তার, নাফিসার প্লেটের দিকে তাকিয়ে দেখে তরকারি নেই কোন রকম ঝোল দিয়ে হাত নেড়ে নেড়ে খাচ্ছে, হেসে ওর প্লেটে একটা চিংড়ি মাছ তুলে দিয়ে বললেন,
—“তুমি তো কিছু না, নিজের বাড়ি মনে করে থেকো বুঝেছো।”
নাফিসা প্রথমে একটু চমকে গেলেও মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
মাহফুজা বেগম কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন। রুশনার কাছ থেকে আগেই শুনেছেন নাফিসার গল্প। তার ভেতরটা হালকা খারাপ লাগায় ভরে গিয়েছিল ।
—“তুমি কোন ক্লাসে পড়ো?” ভদ্রমহিলা নাফিসা দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
—“ক্লাস এইটে।” আস্তে উত্তর দিল নাফিসা।
—“তুমি তো অনেক ছোট! তোমার কিছু লাগলে আমাকে বলবে। আমাকে ‘মামী’ বলে ডাকবে। আমি বড় মামী, আর ও”—শারমিন আক্তারের দিকে ইশারা করলেন—“ও হচ্ছে ছোট মামী। আচ্ছা?”
নাফিসা ছোট্ট সাঁই জানালো।
খাওয়া শেষে নাফিসা উঠে আশেপাশে তাকাল। রান্না ঘরে, শারমিন আক্তার আর মাহফুজা বেগম,ও একজন গৃহকর্মী কাজ করছে। কাউকে দেখতে পেল না।
সবাই উপরের রুমে গেছে। হঠাৎ কণ্ঠ শুনে পাশে তাকাতেই সেই ছেলেটাকে দেখল।
—“আমি আরিব, সায়মান ভাইয়ার ছোট মামার ছেলে। তুমি নাফিসা, তাই না? পরে আরো ভালো করে পরিচয় হবে। এখন চলো, তোমাকে সবার কাছে নিয়ে যাই।”
এক নিঃশ্বাসে এতগুলো কথা বলে ফেলল আরিব। নাফিসা হাঁ হয়ে গেল। মনে মনে ভাবল, “এদের ভাই-বোনেদের কি কোনো রোগ আছে নাকি? কথা শুরু করলে আর থামে না! একদম ওর মামার বাইকের মত, ওর মামার বাইক স্টার্ট নেয় না নেয় না, কিন্তু একবার স্টার্ট দিলে আর থামেনা। সায়মান বাদে প্রায় সবাই একই রকম।”
মনের ভেতর কথাগুলো বলতে বলতেই আরিবের পেছনে পেছনে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল নাফিসা। ওপরে উঠে দেখল, সায়মান মামাদের সাথে বসে গল্প করছে। একপলক তাকাতেই হঠাৎ চোখাচোখি হলো। দুজনেই থমকে গেল।
ঠিক তখনই আরিব ঘুরে দেখল নাফিসা দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগল—
—“এমন করে দাঁড়িয়ে গেলে কেন? এইদিকে সবাই বসে আছে।”
চমকে গিয়ে নাফিসা নিজের হাতে তাকাল। অচেনা ছেলের এভাবে হাত ধরা তার ভিতরে অস্বস্তি তৈরি করল।
সায়মানের দৃষ্টি এবার গিয়ে পড়ল আরিবের হাতে ধরা নাফিসার হাতের দিকে। মুহূর্তে তার চেহারার রং পাল্টে গেল। দাঁত চেপে ডাকল,
—“আরিব!”
আরিব চমকে হাত ছেড়ে দিয়ে বলল,
—“জি ভাইয়া? কিছু বলবা?”
পাশ থেকে করিম খান আর হাসান খানও তাকালেন,
—“সায়মান, কিছু লাগবে?”
সায়মান নিজেকে সংযত করল। ভেতরে তীব্র রাগ জমে উঠলেও কঠিনভাবে বলল,
—“আমার জন্য এক গ্লাস পানি নিয়ে আয়।”
আরিব হতাশ মুখে বলল,
—“আচ্ছা ভাইয়া, দিচ্ছি । আগে নাফিসাকে দিয়ে আসি।”
—“না! আগে পানি নিয়ে আয়!” দাঁত চেপে বলল সায়মান।
হাসান খান তাড়াতাড়ি বললেন,
—“যা আরিব, বড় ভাইয়া পানি খেতে চাইছে। পরে নাফিসাকে দিয়ে আসিস।”
কিছুটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে আরিব নিচে চলে গেল। যাওয়ার আগে ইশারায় নাফিসাকে রুমের দিকটা দেখিয়ে দিল।
সবকিছু সায়মানের চোখ এড়াল না। তুচ্ছ ব্যাপার হলেও তার রাগ হচ্ছে। কেন জানি নাফিসার বিষয়ে তার ভেতর কোনো কিছুই সহ্য হচ্ছে না।
নাফিসা স্তম্ভিত— এইটুকুর ভেতরে কি হলো, সে কিছুই বুঝতে পারল না। তারপর চুপচাপ মাথা নিচু করে রুমের দিকে হাঁটা দিল।
সায়মান ওর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়াল,
—“মামু, আমি রুমে যাচ্ছি। অনেক টায়ার্ড লাগছে। একটু রেস্ট নেই।”
করিম খান স্নেহভরে বললেন,
—“আচ্ছা, যা আব্বু । পরে আবার গল্প হবে।”
সায়মান চুপচাপ নিজের রুমে চলে গেল।
আর করিম খান আর হাসান খান আবার আড্ডায় মেতে উঠলেন।
নাফিসা আরিবের দেখিয়ে দেওয়া রুমে ঢুকতেই ভেতরে এক প্রাণোচ্ছল পরিবেশ চোখে পড়লো। সবাই একসাথে বসে আড্ডা দিচ্ছে, সায়ফান শুয়ে শুয়ে চিপস খাচ্ছে, আর রিদওয়ান ওর পা টিপে দিচ্ছে।
বাকি সবাই নিজেদের মতো গল্প করতে ব্যস্ত।
ছোট্ট মিষ্টি খিলখিল করে হেসে ছুটে এলো নাফিসার দিকে।
“থালামণি! থালামণি!”— বলতে বলতে তার ছোট্ট হাত দিয়ে নাফিসার পা জড়িয়ে ধরলো।
নাফিসা হেসে উঠলো। স্নেহভরে বুকে টেনে নিলো মিষ্টিকে। ছোট্ট মিষ্টির গাল লাল হয়ে উঠেছে খুশিতে।
“সরি রে নাফু,” পাশে বসা রুশনা মুখটা কুঁচকে বললো।
“তোকে একা রেখে আমরা চলে আসলাম। খাচ্ছিলিস বলে একেবারেই মাথায় ছিল না তোকে নিয়ে আসব। আরিবকে পাঠালাম তোকে আনতে, হাঁদারামটা আবার কোথায় গেল কে জানে!”
নাফিসা হালকা হেসে উত্তর দিলো,
“আরিব ভাইয়াই আমাকে এখানে দিয়ে গেল।”
“ও, তাই নাকি।” — রুশনা শান্ত হলো।
কিন্তু সবার মধ্যে একটা অস্বস্তি টের পেল নাফিসা।
রুমের এক কোণে বসা রাইমা ওর দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে ছিল। নাফিসার ঢোকা মাত্রই রাইমা বিরক্ত মুখে উঠে দাঁড়ালো।
“কোথায় যাচ্ছিস?” — রুহি প্রশ্ন করলো।
“মাথা ধরেছে, রুমে যাচ্ছি।” — বিরক্ত কণ্ঠে উত্তর দিলো রাইমা।
যাওয়ার পথে নাফিসার সাথে ধাক্কা লাগালো সে। হঠাৎ ধাকা লাগাই প্রায় পড়ে যাচ্ছিল নাফিসা, তবুও মিষ্টিকে দু’হাতে আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামলে নিলো নিলো কনো রকমে।
“সরি, আমি দেখিনি… ভুল হয়ে গেছে।” — কৃত্রিম হাসি দিয়ে বলে চলে গেল রাইমা।
ঘরটা কিছুক্ষণের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই একসাথে নাফিসার দিকে তাকালো।
“ঠিক আছিস তো, নাফু?” — রুশনা জিজ্ঞেস করলো।
নাফিসা মিষ্টিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মাথা নেড়ে জানালো, সে ঠিক আছে। তারপর তাদের কাছে গিয়ে বসলো।
এদিকে আরিবও এসে পড়েছে। একটু আগেই সায়মানকে পানি দিতে গিয়েছিল সে কিন্তু,গিয়ে দেখে বড় বাবা আর ওর বাবা বসে গল্প করছে সায়মান নাই।
করিম সাহেব ওকে বলল, সায়মানের রুমে গিয়ে পানি দিয়ে আসতে সায়মান রুমে চলে গেছে। ও আবার না পেরে সায়মানের ঘরের সামনে আসে, দরজা বন্ধ থাকায় অনেক ডাকাডাকির পরও সায়মান সাড়া দেয়নি। “আজব, ভেতরে আছে কিন্তু দরজা খুললো না কেন?” বলে মাথ চুলকিয়ে, বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে।
পরিবেশটা ধীরে ধীরে হালকা হয়ে উঠলো। এবার সবার মাথায় নতুন প্ল্যান—কালকে কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায়?
রিশা খাতা-কলম হাতে নিলো।
“চলো, লিস্ট করি। খুলনায় ঘোরার কত জায়গা আছে, দেখি কালকে কয়টা কাভার করতে পারি।”
রিদওয়ান উত্তেজিত হয়ে বললো,
“প্রথমেই শাট গঙ্গা! নদীর ধারে গেলে মনটাই ফ্রেশ হয়ে যাবে।”
“হ্যাঁ, তারপর রূপসা ব্রিজ ঘুরতে হবে। ওখান থেকে সন্ধ্যার সময় সূর্যাস্ত দেখা একদম অন্যরকম।” — রাইহান যোগ করলো।
রুশনা হেসে বললো,
“আমার কিন্তু খুব ইচ্ছা সুন্দরবনে যাওয়া এবার ।”
“আরে, সুন্দরবন তো একদিনে সম্ভব না! ওটা রাখতে হবে আলাদা ট্যুরের জন্য।” — সায়ফান বলতেই সবাই হেসে উঠলো।
চল তাহলে “শিববাড়ি মন্দির আর হাদিস পার্কও লিস্টে রাখো। হাদিস পার্কে সন্ধ্যায় গেলে দারুণ লাগে।”
“আর কুয়েট ক্যাম্পাসের ভেতর গেলে?” — রুহি চোখ বড় বড় করে বললো।
রাইহান তালিকায় টিক চিহ্ন দিয়ে লিখে নিচ্ছিল।
“ঠিক আছে, কালকের জন্য ফাইনাল লিস্ট রেডি। ”
যদি সময় থাকে, অতিরিক্ত কিছু অ্যাড করব।
সবাই মিলে মিলে জায়গা ডিসাইড করে, যে যার রুমে চলে গেল, সরাদিন আজ জার্নি, সে জন্য সবাই রেস্ট নিতে চলে গেল।
সারাদিনের ভ্যাপসা গরমে যেন বাতাস পর্যন্ত ভার হয়ে গিয়েছিল। চারপাশে অদ্ভুত ক্লান্তি, গাছপালাও যেন হাঁপিয়ে উঠেছিল। কিন্তু রাত নামতেই আবহাওয়াটা বদলে গেল। নিরিবিলি বাড়িটার চারপাশে নিস্তব্ধতা, শুধু দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, আর মাঝে মাঝে পুকুরের পানি থেকে আসা শীতল বাতাস শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে। গাছের ফাঁক গলে অর্ধচন্দ্র আকাশে ঝুলে আছে, চারপাশে হালকা কুয়াশার মতো নরম নীরবতা।
সায়মান দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির বেলকনিতে। নির্জন রাত, দূরে কোথাও কোনো শব্দ নেই, শুধু পাতার ঝরঝর শব্দ। হাতে একটা সিগারেট। মাঝে মাঝে খায়, অভ্যাস না হলেও চাপ এলে সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে বুকের ভার মিলিয়ে দিতে চায়।
সিগারেটটা ঠোঁটে নিয়ে এক দীর্ঘ টান দিলো সে। লালচে আগুনটা মুহূর্তের জন্য অন্ধকার আলোকিত করলো। ধোঁয়া ছাড়তেই সে চোখ বন্ধ করলো। আর সঙ্গে সঙ্গেই তার সামনে ভেসে উঠলো নাফিসার মুখ। শান্ত, সরল, মিষ্টি সেই মুখ। হঠাৎ করেই ঠোঁটের কোণে হালকা একটুখানি হাসি খেলে গেল।
কিন্তু আনন্দটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ ভেসে উঠলো আরিবের সেই দৃশ্য—নাফিসার হাত ধরে আছে ও। মুহূর্তেই বুকের ভেতর রাগের ঢেউ আছড়ে পড়লো। হাত মুঠো করে শক্ত করে ধরলো, পরের সেকেন্ডেই বেলকনির লোহার রেলিংয়ে এক ঘুষি বসিয়ে দিলো। ধাতব শব্দটা নীরব রাতকে কেঁপে তুললো।
শ্বাস ভারী হয়ে আসছে। নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলো সায়মান—
“রিলাক্স…. রিলাক্স.. সায়মান। এটা জাস্ট সিম্পল মেটার। এত অস্থির হচ্ছিস কেন? ও তো ছোট একটা মেয়ে… ওই পিচ্চিটাকে নিয়ে এমন ভাবছিস কেন? ওর নিয়ে তোর ভিতরে কোন ফিলিংস আসতে পারে না? এটা অসম্ভব।”
কথা বলতে বলতে বুকের ভেতরের কাঁপুনি লুকাতে পারলো না সে। ঠোঁট শক্ত করে চেপে আবার বললো,
“ওর পুরো জীবন পড়ে আছে সামনে… ও তোকে সাথে তোর মানায় না। ও অনেক ভালো কিছু ডিজার্ভ করে। তাই… ওর জন্য কোনরকম ভাবনা নিয়ে আসা যাবে না। একদমই না।”
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১৯
শেষ কথাগুলো যেন চিৎকার হয়ে বের হয়ে এলো ঠোঁট থেকে। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো বেলকনির ঠান্ডা বাতাসে। ধোঁয়া মিলিয়ে যাচ্ছে চারপাশে, রাতের নীরবতায় শুধু তার ভেতরের টানাপোড়েনই গুঞ্জন তুলছে বারবার—
“পারিস না… পারিস না… পিচ্চির জন্য কিছু ভাবতে পারিস না।”
চারপাশের পরিবেশ শান্ত, নির্জন। দূরের গাছপালার ফাঁকে চাঁদ হালকা আলো ঢেলে দিচ্ছে, কিন্তু সায়মানের বুকের ভেতরের অশান্তি ক্রমেই গভীর হয়ে উঠছে।
