Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৪২+৪৩

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৪২+৪৩

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৪২+৪৩
আরোবা চৌধুরী আরু

পড়ন্ত বিকেলের শেষ আলোটা তখন আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। চারদিক হালকা কমলা আভায় ভরে গেছে, বাতাসে মিশে আছে গোধূলির নরম গন্ধ। পাখিরা গাছের ডালে ফিরে যাচ্ছে, আর দূরের মসজিদ থেকে মাগরিবের আযান পড়ার অপেক্ষায় যেন স্থির হয়ে আছে চারপাশ। পার্কের একপাশে বিশাল একটা গাছ, তার নিচে দাঁড়িয়ে আছে রিশা আর আকাশ ———— দু’জন দু’জনার পাশে, অথচ মনে হচ্ছে দূরত্বটা অনেক বড়।

রিশা মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। আকাশও নিস্তব্ধ। যেন এই নীরবতার মধ্যেই তারা একে অপরের অগণিত কথা শুনে নিচ্ছে, তবুও মুখে কোন শব্দ নেই। অথচ এই সাক্ষাৎ তো ছিল কথা বলার জন্যই মনের কথা বলার জন্য। কিন্তু কোথাও যেন জমে থাকা অজস্র অনুভূতি মুখে আসতে পারছে না।
আধা ঘণ্টারও বেশি সময় কেটে গেল। সূর্যের আলো ধীরে ধীরে হারিয়ে গিয়ে চারদিক মৃদু অন্ধকারে ঢেকে গেছে। পার্কের বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠছে। ঠিক তখনই, আকাশ ধীরে হালকা গলায় নীরবতা ভেঙে বলল,
“রিশা, আমি কিছু কথা বলব… চুপ করে শুনবে কথাগুলো ।”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

আকাশের কণ্ঠে এমন এক গাম্ভীর্য আর কোমলতা মেশানো স্বর, যা শুনে রিশা হঠাৎ মাথা তুলে তাকালো তার দিকে। চোখের ভেতর চকচক করে উঠল অদ্ভুত এক আলো। “আমি কিছু কথা বলব…”———— এই কথাটুকু শুনেই বুকের ভেতর হালকা ঝড় বইতে লাগল। মনে হলো, আকাশ কি তবে অবশেষে বুঝেছে তাকে? হয়তো আজ সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে। বুকের ভেতর দোলা দিয়ে উঠল আশার এক নতুন তরঙ্গ।
কিন্তু সেই আশার বাতাস বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। আকাশের পরের কথাগুলো যেন কাঁটার মতো বিঁধল রিশার হৃদয়ে।
আকাশ ধীর গলায় বলল,

“আশা করি, আমার কথাগুলো বুঝবে। কোনো রকম পাগলামি করবে না। তুমি জানতে চাইছিলে না — ——— আমি তোমাকে ভালোবাসি কিনা?”
এই প্রশ্ন শুনে রিশার চোখের ভেতর আলো আরও বেড়ে গেল, বুকের ভেতর কেমন এক মিষ্টি কাঁপুনি। সে একদৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল, চোখের দৃষ্টিতেই উত্তর পেতে চায়লো।
আকাশ এবার আর থামল না। অনেকদিনের বাঁধা কথাগুলো একসাথে বেরিয়ে আসছে তার ভেতর থেকে,———
“তোমার সব ইচ্ছা আমি পূরণ করতে পারব না, রিশা। এটা সত্যি। কিন্তু একটা কথা মেনে নাও… আমি তোমাকে ভালোবাসি। কবে, কখন ——— — জানি না। অনেক চেষ্টা করেছি যেন মনটা তোমার দিকে না যায়, কিন্তু পারিনি। না চাইতেও, এই বেহায়া মন তোমার মায়ায় জড়িয়ে গেছে। আমি তোমাকে ভালোবাসি রিশা… নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি।”

‘ভালোবাসি’——— এই শব্দটা আকাশের ঠোঁট থেকে বের হতেই রিশার পুরো শরীরে যেন বিদ্যুতের শিহরণ বইল। চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল, ঠোঁটে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত হাসি। মনে হলো, তার সমস্ত পৃথিবী আজ আলোকিত হয়ে গেছে এই একটি শব্দে।
যাকে সে এতদিন নিজের প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছে, যার জন্য কেঁদেছে, যন্ত্রণায় পুড়েছে —— — — সেই মানুষ আজ নিজ মুখে বলছে “ভালোবাসি”। এই অনুভূতির রেশ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এ যেন সমস্ত দুঃখের বিনিময়ে পাওয়া এক মুহূর্তের আনন্দ, যার ওজন মাপা যায় না।
আকাশের কণ্ঠ থামছে না ———

“দেখো, আমি তোমাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি। কিন্তু নিজের ভালোবাসাকে অস্বীকার করছি বারবার। নিজের মুখে বলছি — —— তুমি অন্য কারো হয়ে যাও। আমার থেকে দূরে থাকো। জানি, এটা নিষ্ঠুর শোনাচ্ছে, কিন্তু আমি তোমার ভালো চাই রিশা। আমি জানি আমার জীবনের বাস্তবতা কেমন। আমি তোমাকে সব সুখ দিতে পারব না। তাই ভালোবেসেও তোমাকে নিজের কাছে টেনে নিচ্ছি না। তোমাকে হারাতে চাই না, তবু ভালোবাসা আড়াল করছি তোমার ভালো চাওয়ার জন্য।”
এই কথাগুলো বলার সময় আকাশের চোখ দিয়েও পানি গড়িয়ে পড়ল। সে মুখ ফিরিয়ে নিল, রিশার সামনে দুর্বল হয়ে পড়তে চায় না। কিন্তু রিশা ততক্ষণে স্থির হয়ে গেছে — ——— চোখের জল থামাছে না, বুকের কষ্টটাও না।
সে হঠাৎ বলে উঠল, কাঁপা কণ্ঠে,

“আপনি আমাকে ভালোবাসেন, এই কথাটা শোনার পর আমার ভিতরের অনুভূতিটা আমি কোনো ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না আমি কতটা আপনাকে অনুভব করি। কিন্তু আপনি বলছেন আপনি আমাকে ভালোবাসেন, অথচ নিজের করতে চান না! এটা কেমন ভালোবাসা? আপনি আমার ভালো চাইছেন, কিন্তু আমাকে চাইছেন না ——— এটা কি আশ্চর্য না?”
রিশার কথাগুলো শুনে আকাশ নিঃশব্দে মাথা নিচু করে ফেলল। তার ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। এই মেয়েটা বুঝবে না, সে ভাবল মনে মনে। ভালোবাসা কখনো কখনো যতটা সহজ মনে হয়, ততটা সহজ নয়।
আকাশ ধীরে বলল, খুব নরম কণ্ঠে,
“রিশা, তোমার চোখের জল আমার দুর্বলতা। আমি জানি তুমি বুঝতে পারছো না, কিন্তু বিশ্বাস করো—এই দূরত্ব, এই কষ্ট, এই ত্যাগ——— – সবই ভালোবাসা।”

তারা বাইক রাইডের পর রাজীব ভাইয়ের গাড়িটা দেখতে পায়। রাজীব ভাইয়ের কাছ থেকে গাড়িটা নিয়ে তারা দু’জন রওনা দেয় কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। পথে নাফিসা বাইরের আবহাওয়া উপভোগ করছিল ——— — কাচে মুখ ঠেকিয়ে দূরের পাহাড়, গাছপালা, রাস্তার ধারে ঝিরঝিরে বাতাসে উড়ে যাওয়া ধুলোয় ওর মন ভরে যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে বই পড়ছিল সে ———— সায়মান নিজেই হাতে বইটা ধরিয়ে দিয়েছিল, যেন ঘুরতে এসে নাফিসার পড়াশোনার কোনো ক্ষতি না হয়। খেয়ালখুশি আর যত্নের মিশেলে
তার হালাল পুরুষটা।
পড়তে পড়তে এক সময় কখন যে নাফিসা ঘুমিয়ে পড়েছিল, সে নিজেও টের পায়নি।
চোখ মেলে দেখে ——— চারপাশ পুরো অপরিচিত। একটা ছোট খোলা কটেজ, কাঠের তৈরি ছাউনি, চারপাশে নিরবতা, আর দূরে সমুদ্রের গর্জনময় শব্দ। বাতাসে নোনা গন্ধ, ঢেউয়ের আওয়াজে এক ধরনের সুর বাজছে যেন। বুঝতে দেরি হয় না — — —— ওরা কক্সবাজারে চলে এসেছে, আর সায়মানই তাকে এই রুমে রেখে গেছে। চোখ ঘুরিয়ে চারপাশে তাকিয়ে দেখে, কোথাও সায়মান নেই।
ঠিক তখনই দরজায় হালকা টোকা পড়ে।
একজন স্টাফ ভেতরে এসে বলে,

“স্যার বাইরে গেছেন, ম্যাডাম। আমাকে বলেছেন আপনার দেখাশোনা করতে।”
নাফিসা নরম গলায় বলে,
“ঠিক আছে,” তারপর মাথা নেড়ে ফ্রেশ হতে যায়।
শাওয়ারের ঠান্ডা পানি গায়ে পড়তেই যেন ক্লান্তি গলে যায়। বের হয়ে হালকা কিছু খেয়ে নেয়, তারপর ব্যাগ থেকে নিজের বইটা বের করে কাঠের বারান্দায় গিয়ে বসে।
সামনে পুরো সমুদ্র দেখা যায় ——— দিগন্ত পর্যন্ত নীল আর সাদা ফেনায় ভরা জলরাশি। বাতাসে নরম ঠান্ডা ভাব, চুল উড়ে এসে গাল ছুঁয়ে যায়। পেছনের নারকেল গাছগুলো আস্তে আস্তে দুলছে, ঢেউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে। সারাদিন নাফিসা একা একাই কাটিয়েছে। সায়মান তাকে দেখে কোথায় গেছে সে জানে না। একবার ফোনে বলার প্রয়োজন বোধ করিনি।
নাফিসা বই খুলে পড়তে থাকে, কিন্তু মাঝেমধ্যে চোখ উঠে যায় সামনের দিকে ———— ঢেউ ভাঙার শব্দে মনটা যেন ক্রমে হালকা হয়ে আসে, এক অজানা শান্তিতে ভরে যায়।
হাওয়া লাগতে লাগতে, পাতা উল্টাতে উল্টাতে কখন যে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে, সে টেরই পায় না।
বইটা কোলে খোলা পড়ে থাকে, আর নাফিসা ঘুমিয়ে পড়ে ———সমুদ্রের মায়াবী সুরে, হাওয়ার নরম ছোঁয়ায়, নিঃশব্দ বিকেলের নিস্তব্ধতার ভেতর।

দলের ছেলেদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে সাইফান।
আর কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন ভোট শুরু হবে ——— — সেই নিয়েই দলের ছেলেদের সঙ্গে আলোচনা করছে সে। আজকে মূলত এসেছিল ব্যানার-পোস্টার কোথায় কোথায় লাগানো হবে, তার খোঁজ নিতে।
সব কাজ শেষ হয়ে গেলে দলের ছেলেরা খাওয়ার জন্য আবদার করে বসে। তাই সাইফান সবাইকে নিয়ে পার্কের ভিতর এক পাশে বসে নাস্তা করতে লাগল। হাতে হাতে নাস্তা বিলিয়ে দিচ্ছে, হাসাহাসি চলছে, রাজনীতির আলাপ জমে উঠেছে।

এই সময় হঠাৎ সাইফানের ফোনে কল আসে। ফোনটা কানে ধরে সে একটু একপাশে গিয়ে কথা বলতে শুরু করল। কথা শেষ করে যখন ফিরে আসছিল, তখন চোখ পড়ল দূরে এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা পরিচিত মুখে।
চোখ কুঁচকে ভালো করে তাকাতেই চিনে ফেলল — —— ওটা জারিন।
ওর মুখে অদ্ভুত এক দুশ্চিন্তা, ভ্রু কুঁচকানো, মনে হচ্ছে যেন কোনো বড় চিন্তায় আছে।
সাইফান অবাক হয়ে নিজের মনে বলল,
“এই সময়ে এখানে চশমা কি করছে? সন্ধ্যা নামছে, একটু পরেই আজান হবে, পার্ক বন্ধ হয়ে যাবে, এরকম সময়ে একা একা এখানে দাঁড়িয়ে!”
ফোনটা পকেটে রেখে কপাল গুটিয়ে সাইফান জারিনের দিকে এগিয়ে গেল।
ওদিকে জারিন বারবার আশেপাশে তাকাচ্ছে। মনের মধ্যে টেনশন—— — — ওদের দুজনের ঝামেলা কি শেষ হলো? নাকি আবার কিছু কথা হবে? তার ওপর এই জায়গায় মশার বংশবিস্তার যেন পুরোদমে চলছে। পা থেকে হাত —— — কোথাও শান্তি নেই।
একটা মশা এসে হাতের ওপর বসতেই জারিন বিরক্ত হয়ে অন্য হাত দিয়ে মারতে গেল, ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা চেনা কণ্ঠ ভেসে এল,

“এই চশমা, ভর সন্ধ্যেবেলা এখানে একা একা কী করছো? নিজে তো সাধু-সন্ন্যাসীর মতো চলে বেড়াও, তাই না? এত কিছু জানো, অথচ এইটুকু জানো না ——— — সন্ধ্যেবেলা একা পার্কে দাঁড়ানো ঠিক না?”
জারিন চমকে ঘুরে তাকাতেই সামনে সাইফান।
মুখে আগের মতোই বিরক্তি আর আত্মবিশ্বাস মিশে আছে।
“এই বেয়াদব অভদ্র লোক, চুপ!”
রাগে ফুঁসে উঠল জারিন।
“আপনার জন্য ওই মশাটা আমার রক্ত খেয়ে পালিয়ে গেল, মারতেও পারলাম না!”
সাইফান কপাল জোড়া খুঁজতে,,
“দিনকে দিন তো মটু হচ্ছো! বেচারা মশাটা একটু রক্ত খেয়ে তোমার ডায়েটের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে। তুমি কি ভাবছো, চশমা, মশাটাকেও দুনিয়া থেকে বিদায় করবে?”
জারিন এবার রাগে গজগজ করতে লাগল।
“এই লোকটার সাহস দেখো! এত খারাপ ব্যবহার করেও নিলজ্জের মতো কথা বলতে এসেছে, আর এখন আমাকে মটু বলছে! সাহস কত!”
সে আঙুল তুলে বলল,

“এই নিলজ্জ, অসভ্য মানুষ! আপনার লজ্জা করে না আমার সঙ্গে কথা বলতে? এত কিছু হয়ে যাওয়ার পরও এত স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেন! আপনি আমাকে মোটা বলছেন? আমার হাইট আর ওজন একদম ঠিক আছে। আপনি বরং আপনার ওই সাদা চামড়া কিভাবে বাদামি করবেন, সেটা ভাবুন। আপনাকে মোটেও বাঙালি বাঙালি লাগে না।”
সাইফান ভুরু কুঁচকে রেগে গেল।
“এই চশমা! তুমি আমাকে নির্লজ্জ, বেয়াদব বলছো?”
তার ঠোঁটে হালকা হাসি, চোখে বিরক্তি।
“আমার ফর্সা গায়ের রঙে কত মেয়ে ক্রাশ খায় জানো? এই সাদা চামড়ার জন্যই সবাই পাগল হয়ে যায়। আর তুমি বলছো, বাদামি হয়ে যাই! এত সুন্দর পোলারে কেউ এভাবে কথা বলে নাকি?”
স্বর একটু নিচু করে বলল,
“এই মুখ সামলে কথা বলো চশমা। আমি যদি অন্যায় করে থাকি, আমি সরি বলেছি। যেখানে তোমারও সমান দোষ ছিল, তবুও আমি ক্ষমা চেয়েছি। কিন্তু তোমার দেমাগ কমে না। আমার মতো সুন্দর ছেলে তুমি আর কোথাও পাবে না। মেয়েরা আমার ওপর ক্রাশ খায় ——— — আর আমি তোমার কাছেই প্রথম চুমু পেয়েছি। অমৃত খাওয়ার সাথে যদিও তিতা তোমার মুখ তাই বলছি, আমার বিউটি নিয়ে কথা বললে এখানেই দফারফা করে দিতাম তোমার।”
জারিন চোখ উল্টে বিরক্তির হাসি দিয়ে বলল,

“আইছে, ফাটা বাঁশ বাজে বেশি। আর মেয়েরা যদি সত্যিই আপনার ওপর ক্রাশ খেত, তাহলে এতদিনে একটা গার্লফ্রেন্ড পেতেন আপনি! যতসব ফাউল কথা বকেন, যান ? ভাগেন এখান থেকে।”
সাইফান গম্ভীর গলায় বলল,
“এই চশমা, ঠিক করে কথা বলো! আমি বলছি, ভালো হবে না। মেয়েরা আমার ওপর ক্রাশ খায়, সেটা একদিন ভালো করেই বুঝবে। তখন জ্বলবে, আর আমার পিছন পিছন ঘুরবে। আমি অভিশাপ দিলাম ———— একদিন আমার জন্য তুমি কাঁদবে, আমার উপরে ক্রাশ খাবে! আমিন।”
জারিন মুখ কুঁচকে বমি করার ভান করে বলল,
“আহ, বমি চলে আসছে! আমি জারিন আপনার উপর ক্রাশ খাব? ইম্পসিবল! দরকার হলে রিকশাওয়ালার উপর ক্রাশ খাবো, কিন্তু আপনার ওপর না ——— ধলা বিলাই কোথাকার!”
সাইফান হেসে বলল,
“তাই নাকি? তোমার চোখে আমি পড়ব কেন? ওই কানা দেড় ব্যাটারি চোখ দিয়ে যেটুকু দেখতে পাও, তাতে রিকশাওয়ালা মামাকেই ভালো দেখাবে তোমার খাওয়ার ক্রাশের জন্য!”
বলতে বলতে সাইফানের চোখ হঠাৎ পড়ল দূরে — ——— বিশাল গাছটার নিচে।

রিশা গভীরভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে অনুরোধ, কণ্ঠে কাঁপুনি,,
“প্লিজ… সবকিছু বাদ দিয়ে শুধু আমাকে নিয়ে ভাবুন। এসব হিসেব, এসব বাস্তবতা নিয়ে ভেবেন না, আমি আপনাকে চাই… শুধু এটুকু নিয়ে ভাবুন।”
আকাশ চুপ। ওর চোখে না তাকিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। জানে, রিশার চোখের দিকে তাকালেই নিজেকে দুর্বল করে ফেলবে, আর তার সঙ্গে রিশাকেও দুর্বল করে ফেলবে। সেই চোখে আশার আলো জ্বলে উঠবে ——— — যে আলো কখনও পূর্ণ হবে না, তবু একবার জেগে উঠলে নিভানো অসম্ভব। তাই সে দৃঢ় স্বরে বলল,
“এটা সম্ভব নয়, রিশা। আমি তোমাকে বোঝানোর জন্য সবকিছু খুলে বলছি ——— তুমি যাতে বুঝতে পারো, যেন পাগলামি না করো। কিন্তু তুমি…”
বাকিটা শেষ করার আগেই রিশা আচমকা এগিয়ে এসে আকাশকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বুক কাঁপছে, গলা ভিজে গেছে কান্নায়।

“প্লিজ… প্লিজ আমাকে দূরে ঠেলে দেবেন না,” হেঁচকি তোলা কণ্ঠে বলে উঠল সে।
“আমি মরে যাব। আপনি ছাড়া অন্য কাউকে কল্পনাতেও আনতে পারি না আমি। আপনি কি আমার কষ্টটা বোঝার চেষ্টা করেন না? আপনি যদি সত্যি আমাকে ভালোবাসেন, তাহলে কেন আমার কষ্টটা অনুভব করেন না? আপনি যেটাকে আমার ভালো ভাবছেন, সেটা আমার কাছে কষ্ট ছাড়া আর কিছুই না। আমি আমার ভালো দেখি শুধু আপনার সঙ্গেই… প্লিজ আমাকে দূরে ঠেলে দেবেন না…”
রিশা এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলেই আবারও শক্ত করে আকাশকে জড়িয়ে ধরল। কান্না থামছে না তার, বুকের ভেতর যেন ঝড় বইছে।
আকাশের দুনিয়া মুহূর্তে থমকে গেল। হঠাৎ করে রিশা এভাবে তাকে জড়িয়ে ধরবে, তা সে কল্পনাও করেনি। মেয়েটার কান্নার শব্দে বুকের ভেতরটা কেমন যেন দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। এমন অসহায়, এমন ভাঙা লাগেনি তাকে কোনোদিন। জানে, এই মেয়েটাকে কষ্ট দিতে তার কোনো অধিকার নেই — ———তবু জীবনের বাস্তবতা যেন তার গলার কাঁটা।

ওর দুই হাত নিঃশব্দে উঠল, তারপর ধীরে ধীরে রিশার কাঁধে গিয়ে স্থির হলো। মুহূর্তের মধ্যে সে-ও রিশাকে শক্ত করে জড়িয়ে নিল। নিঃশব্দে, নিঃশ্বাসের ভেতর গলে গেল ভালোবাসা, কষ্ট, আর একরাশ অনিশ্চয়তা।
ঠিক সেই সময় দূর থেকে একজোড়া চোখ হঠাৎ থেমে গেল তাদের ওপর।
সায়ফান।
দূর থেকে দাঁড়িয়ে সে দেখল ———— রিশা আর আকাশ, দু’জন দু’জনকে শক্ত করে জড়িয়ে আছে। প্রথমে মুখের অভিব্যক্তি স্তব্ধ হয়ে গেল বিস্ময়ে, আর পরের মুহূর্তেই তার চোখ লাল হয়ে উঠল রাগে। বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলে উঠল।
জারিন তখনও পাশে দাঁড়িয়ে, কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সায়ফান একটাও কথা না বলে দ্রুত পদক্ষেপে সোজা সেই দিকেই এগিয়ে গেল। মুখ গম্ভীর, চোখে আগুন, কপালটা কুঁচকে আছে ——— — দূরত্ব কমছে, আর রাগে গর্জে উঠছে তার ভিতরটা।
জারিন সায়ফানকে হঠাৎ নিজের কথার মাঝেই থেমে না থেকে তেড়েফুঁড়ে এগিয়ে যেতে দেখল। কপাল গুটিয়ে তাকাল সায়ফানের দিকে, তারপর হঠাৎ চোখ পড়ল দূরে ——— বিশাল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা রিশা আর আকাশের দিকে।
চোখ এক পলকে বড় হয়ে গেল ওর, মুখ থেকে বেরিয়ে এলো হালকা ফিসফিসে শব্দ,

“আল্লারে আল্লাহ… রিশা আর আকাশ ভাই !”
ওর তো মনেই ছিল না এই দু’জনের কথা! মুহূর্তের মধ্যে যখন রিশা আর আকাশকে একে অপরের বুকে শক্ত করে জড়িয়ে থাকতে দেখল, জারিনের চোখে অদ্ভুত এক শান্তি নেমে এল। যেন বুকের ভিতর জমে থাকা ভার হঠাৎ হালকা হয়ে গেল। কিন্তু সেই শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না — ——— পরক্ষণেই সায়ফানের কথা মনে পড়তেই জারিন দাঁত দিয়ে নিজের জিভ কামড়ে বলল,
“ইশশ! এত সুন্দর একটা মুহূর্ত চোখে পড়ল ওই বেয়াদবটার। যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয় !”
ওর দৃষ্টি এবার সায়ফানের দিকে। ছেলেটার চোখ-মুখে আগুনের ছটা, ঠোঁট শক্ত করে চেপে রেখেছে,। জারিন নিচু স্বরে নিজের মনেই বলল,
“এই বেয়াদবটার মুখ দেখে বুঝছি আজ কোনো না কোনো প্যাঁচাল হবেই! রিশার বাঁচন নাই এবার…”
বলেই দৌড় দিল। সায়ফানের পেছন পেছন দৌড়াচ্ছে, কিন্তু ওর লম্বা কদমে তাল মেলানোই যেন অসম্ভব। তবু জারিন থামল না, হাপাতে হাপাতে হাসি মুখে বলল,

“এই সায়ফান ভাই… আপনি সত্যিই অনেক কিউট, মাশাআল্লাহ! আমি ভুল ভেবেছিলাম, আপনার ওপর মেয়েরা ক্রাশ খাবে না— আসলে খাবে, একদম খাবে!”
বলেই সোজা গিয়ে সায়ফানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।
সায়ফান থেমে গিয়ে ওর দিকে কটমট করে তাকাল। চোখে আগুন, গলায় রাগের আগুনে ভেজা ধমক,
“সামনে থেকে সরো, বেয়াদব মেয়ে! আগে ওদের দুইটাকে দেখছি, তারপর তোমাকে দেখব! ওই পাকনা টা ঠিক কত বড় হয়েছে আজ দেখব আমি। দুজনের পাকনা কেটে ফেলার ব্যবস্থা করতেই হবে আজ!”
কথা শেষ করে নিজের এক হাত দিয়ে জারিনকে সরিয়ে দিল। জারিন হোঁচট খেয়ে পেছনে পড়ে গেল, কিন্তু সায়ফান থামল না। কয়েক কদম এগিয়েই সে এক ঝটকায় রিশার হাত ধরে টেনে নিল, আর মুহূর্তেই জোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল ওর গালে।

“সাইফান ভাই…!”
রিশা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দ্বিতীয় থাপ্পড় এসে লাগল। মুখটা একপাশে বেঁকে গেল, চোখে ঝাপসা অন্ধকার। ও বুঝে ওঠার আগেই তৃতীয়বারের মতো হাত উঠল ———— কিন্তু এবার হাতটা মাঝ আকাশেই থেমে গেল। আকাশের শক্ত হাত ধরে ফেলেছে সায়ফানের হাত।
সায়ফান নিজের কাজে বাধা পেয়ে ঘুরে তাকাতেই চোখ পড়ল আকাশের মুখে। রাগে তার চোখ জ্বলে উঠল, ঠোঁট কেঁপে উঠল ক্রোধে।
এক মুহূর্তে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে আকাশের শার্টের কলার চেপে ধরল, আর অন্য হাতে এক ঘুষি মেরে দিল সরাসরি মুখে।

“তোকে আমি বন্ধু না, ভাই ভেবে কাছে রেখেছিলাম, তাই না?” সায়ফান গর্জে উঠল।
“কাজের শেষে তুই এমন জোচ্চুরি করলি? আমাদের বাড়ির মেয়ের দিকে নজর দিলি? আমার বোনের দিকে হাত বাড়ালি?”
কথা শেষ না হতেই আবার এক ঘুষি!
আকাশের ঠোঁট ফেটে গেল, কিন্তু মুখে কোনো প্রতিবাদ নেই ——— কেবল নিঃশব্দে একফোঁটা হাসি লেগে আছে ওর ঠোঁটের কোণে।
জারিন তখন ওদের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ। মুখে হাত, চোখ বিস্ফারিত। রিশার মুখে থাপ্পড়ের দাগ, কানের পাশটা লাল হয়ে গেছে। মেয়েটা নিঃশব্দে কাঁপছে। জারিন ছুটে গেল ওর দিকে, জড়িয়ে ধরল শক্ত করে।
“রিশু,সোনা … কিছু বলো না…”
রিশার মাথা ঝাঁঝিয়ে গেছে, কান বেজে চলেছে ——— — চারপাশ যেন ঘুরছে। ঠিক তখনই রিশার চোখ পড়ল আবার— আকাশকে এভাবে মারছে সায়ফান! ওর ভেতরটা কেঁপে উঠল।
মুহূর্তেই দৌড়ে গিয়ে ওদের মাঝে ঢুকে পড়ল। দু’হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ওদের মাঝে, মুখে চিৎকার,
“থামো দুজনেই! একদম থামো!”

শব্দটা কাঁপছে, কিন্তু গলায় ছিল একরাশ দৃঢ়তা — —— এই এক মুহূর্তে জারিনের চেহারা যেন অন্যরকম হয়ে গেল, ভয়ের মাঝেও চোখে আগুন, কান্না মিশে থাকা কণ্ঠে এক অদ্ভুত শক্তি।
আকাশ একবার রিশার দিকে ফিরে তাকালো, চোখে ছিল নীরবতার ক্লান্তি, আর মুখে এক ক্ষুদ্র, চোখে-না-ও-ধরা হাসি। সেই একটুকু ঢেউ রিশার কাছে কোনো আশার আলো হয়ে ওঠে; কিন্তু আকাশের কণ্ঠ যখন করল ——— ভারী, ঠাণ্ডা, প্রয়োজনীয় কঠোরতায় রিশার বুকটা কেমন খসে পড়ে। আকাশ বলল,
“আশা করি, এখন তুমি আমার উত্তর পেয়ে গেছো, রিশা। যে কারণেই আমি তোমাকে দূরে থাকতে বলেছি — ——— তার সব উত্তর তুমি পেয়ে গেছো। যদি না বুঝতে পারো, সেটা তোমার ব্যর্থতা। বাঁচ তো, ভালো থেকো। নিজের পরিবারের পছন্দের কোনো একজনকে বেছে নিয়ে, ওর সঙ্গে ভালোবেসে জীবন গড়ো।”
কথাগুলো যেন ধাতব কাঁটায় কেটে গিয়ে রিশার কণ্ঠে বশ বাঁধে। আকাশ পেছন ফিরল তার পা ধীর, নির্বিকার যেন সে ইতোমধ্যে পৃথিবী থেকে কিছুকাল দূরে সরে আসছে। সে চলে যেতে যেতে আর একবার পিছন ফিরে কেবল রিশাকে দেখল না, ফিরে তাকাল না; কেবল থামল, চোখ বন্ধ করল, নিঃশ্বাস ফেলে আবার অচেনা পলকে চলে গেল।

সেই মুহূর্তেই সায়ফান রেগে ভরে টেনে টেনে রিশাকে সামনে নিয়ে যাচ্ছে। রিশা চিৎকার করে কাঁদছে, পা থেমে নেই,বারবার হেঁচকি কেটে বলছে,
“আকাশ ভাই!তুমি যেও না! আমি তোমাকে ভালোবাসি! আপনি যদি আমাকে দেখতেন—প্লিজ একবারই দেখুন! আমি বাঁচব না, আপনাকে ছাড়া আমি মরে যাব!”
কিন্তু আকাশ তার দিকে ফিরে না দেখে নির্দিষ্ট দিকেই শেষ হাঁটা শুরু করল।
সায়ফান আরও শক্ত করে রিশার হাত নিলো। চোখে বিদ্রূপ, কণ্ঠে গর্জন।
“চুপ!”
আর একটা কথা বললে ——— তোর খবর আছে। চুপচাপ গাড়িতে গিয়ে বসবি; চল বলেই রিশাকে টানতে টানতে গাড়িতে নিয়ে গিয়ে দরজা খুলে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল।
রিশা চিল্লাচ্ছে আর আকাশকে বারবার ডাকছে পিছন থেকে।

জারিন রিশাকে এত অসহায় দেখে, চোখে পানি চলে এসেছে। চাইলেও কিছু করতে পারছে না; সাইফানের ওপর বেজায় রাগ হচ্ছে ——— — বেশি দাদাগিরি দেখাচ্ছে বেয়াদবটা। নিজে একটা মেয়েকে কিস করে বসে তার বেলায় কিছু না। এখন নিজের বোন অন্যজনকে ভালোবাসে, এটা সহ্য হচ্ছে না ———— শয়তান একটা। এখন বুঝবে না; নিজে যখন কাউকে ভালোবাসবে আর সেই ভালোবাসা এইরকম বাধা আসবে, সেদিন টের পাবে, তার আগে না। এগুলো ভাবতে ভাবতে জারিনও গাড়ি সামনে এসে দাঁড়ালো।
সাইফান এবার নিজে গাড়িতে উঠে বসতে গেলে একবার পিছন ঘুরে জারিনের দিকে তাকালো।
“এভাবে সং মতো দাঁড়িয়ে থাকবে না কি উঠে বসবে। অতিরিক্ত বাড় বেড়ে গেছো তোমরা। এখনই গাড়িতে উঠে বস —— —” জোরে চেঁচিয়ে একটা ধমক দিল।

জারিন সেই ধমকে কেঁপে উঠলো। তারপর সাইফানকে মনে মনে গালি দিতে দিতে গাড়িতে উঠে বসলো। উঠে বসার সাথে সঙ্গে রিশা জারিনের ওপর হামলে পরলো, চাপতে ধরে রেখে কান্না করে দিল।
সাইফান ফোন বের করে দলের ছেলেদের জানিয়ে দিল সে চলে যাচ্ছে; তারাও চলে যায়।
তারপর নিজের গাড়িতে উঠে বসলো। রিশাকে এভাবে কাঁদতে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“তোকে যদি আর একবার শব্দ করতে দেখি, আমি ————কান্না না থামলে সত্যি কথা, আকাশকে আমি মেরে রেখে আসবো। চুপচাপ বসে থাকবি আর আজকের পর থেকে এইসব মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলবি।”
রিশা সাইফানের কথা শুনে মুখে হাত দিয়ে কান্না বন্ধ করার চেষ্টা করল।
জারিন সাইফানের দিকে রাগে চোখে তাকিয়ে মনে মনে গালি দিচ্ছে।
“কারো ভালোবাসা বাড়ি ভিলেন সাজতে এসেছে ——— অভিশাপ দিলাম, নিজের ভালোবাসায়ও ভিলেন হিসাবে অন্য কাউকে পাবে, তখন এর মজা বুঝবে। শয়তান লোক।”

নাফিসা যখন চোখ মেলে তাকায়, তখন দেখতে পায় ————চারিদিকে বেশ অনেকক্ষণ আগেই সন্ধ্যা নেমে গেছে। এতক্ষণ সে ঘুমিয়ে ছিল, ভাবতেই অবাক লাগে। উঠে রুমের ভেতর আসে, এসে ফ্রেশ হয়ে ওযু করে কাজা নামাজ আদায় করে নেয়।
ঠিক তখনই স্টাফ এসে সন্ধ্যার নাস্তা দিয়ে যায়। সেটা খেয়ে নাফিসা আবার পড়তে বসে।
এর মধ্যে অনেকবার সায়মানকে কল করেছে, কিন্তু ওদিক থেকে কোনো সাড়া পায়নি। মানুষটা যে কখন কী করে, কিছুই বোঝা যায় না ——— ও এসব ভাবনা বাদ দিয়ে আবার বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে দেয়।
যখন গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ছিল, ঠিক সেই সময় দরজা দিয়ে ‘কারণ-হকার’ শব্দ হলো।
নাফিসা পিছন ঘুরে তাকিয়ে দেখে — ——— সায়মান।
সাথে সাথেই খুশিতে মুখ ভরে ওঠে, উঠে সামনে এগিয়ে যায়, কিন্তু…
সায়মানের চোখে অদ্ভুত এক ঘোর, দৃষ্টিটা ভারী আর গভীর।
সে টলতে টলতে নাফিসার দিকে এগিয়ে আসছে।
নাফিসা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সায়মানের দিকে। ভয় আর বিস্ময়ে গলা কাঁপতে থাকে,
“আপনি কোথায় ছিলেন সারাদিন? আপনাকে এমন লাগছে কেন?”

সে এক পা এক পা করে পিছাতে থাকে।
সায়মান মৃদু হাসে ——— চোখের কোণে ঘোর আর আকুলতা মেশানো।
“বউ… আমার ছোট্ট বউ… তুমি জানো না, তোমাকে কতটা দরকার আমার… এখন।”
সে ধীরে ধীরে আরও কাছে আসে, হাত বাড়ায় নাফিসার দিকে।
নাফিসা বিভ্রান্ত, বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। পিছাতে গিয়ে বিছানার সাথে ধাক্কা খেয়ে চুপচাপ বসে পড়ে।
সায়মান নাফিসার উপর ঝুঁকে পড়ে, বিছানার সাথে নাফিসার হাত চেপে ধরে বলে,
“আজকে আবার একটু ব্যথা দেবে… সয়্য করবে তো, আমার পিচ্চি বউ?”
নাফিসা কাঁপা কণ্ঠে, কিছুটা লাজুক, কিছুটা স্বীকারোক্তি দিয়ে শুধু মাথা নাড়ে।
সায়মান একটু কাছাকাছি ঝুঁকে আসে। চুলের কেশে হালকা স্পর্শ, নাকের কাছে নরম ঘ্রাণ আর ঠোঁটের এক অদ্ভুত কোমলতা।

“আমার পকেট সাইজ সুখ।সাড়া দেবে তো,, তোমার স্বামী জানতে আজকে একটু উতলা করো প্লিজ। একটু বেশি বেশি নিজের কাছে টেনে নেব ট্রাস্ট মি,, বউ তোমার আদরে এক চুলও কম করব না। আরো ঘুরিয়ে দিব তুমি শুধু সাড়া দেবে। আমার ভালোবাসা আর আদরে তোমাকে পাগল করে তুলবো আজকে।
নাফিসার চোখে অশ্রু জড়ো, কিন্তু সে চুপচাপ সাড় দেয়, হাত মৃদু শক্ত করে ধরে রাখে সায়মানের হাত।
সায়মান মাথা হালকা ঝোঁকিয়ে নাফিসার কাঁধে রাখে। নিঃশ্বাস মিলিয়ে আসে, নীরবতার মাঝে এক অন্যরকম সংযোগ।

“বউ তোমার গায়ের গন্ধ এত মিষ্টি কেন। এত নরম কেন তোমার গা, খেয়ে ফেলতে মনে চায়। তুমি কি আমাকে চাও বউ গভীরভাবে একবার বলো প্লিজ। ”
নাফিসা কাঁধে মাথা রাখে, নরম কণ্ঠে বলে, “আমি চাই শুধু আপনাকে … তুমি থাকলে অন্য কিছু চাই না। ব্যথা থাকলেও আপনাকে চাই আমার স্বামীজান। ”
সায়মান এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে নাফিসার চোখে তাকিয়ে বলল,
“তুমি রেডি তো আমার সুইটি ওয়াই ”
নাফিসা লাজুক, আর ভালোবাসা সঙ্গে মিশিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমি জানি… আমি সব বুঝতে চাই,… শুধু আপনার কাছেই থাকতে চাই।”

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৪০+৪১

সায়মান হাত মৃদু শক্ত করে ধরে রাখল। নিঃশ্বাস মিলিয়ে দুজনেই এক মুহূর্তের জন্য সময় থেমে যায়। বাতাসে ঢেউয়ের নরম শব্দ, বারান্দার কাচে সূর্যাস্তের শেষ আলো ——— সবই যেন তাদের ভালোবাসার সাক্ষী।
সায়মান আস্তে আস্তে নিজের সব তো ঠিক জোড়া এগিয়ে নিয়ে গেল নাফিসার নরম ঠোঁটে সাথে সাথে অধরে অধর মিলিয়ে দিল। নাফিসা ও কিছুক্ষণ তাল মিলাতে লাগলো সায়মানকে সারা দেওয়ার জন্য দুই হাত দিয়ে সালমানের গলা আঁকড়ে ধরল। কিন্তু বেশিক্ষণ তাল মিলাতে পারল না তাহলে হালাল পুরুষ তার ওপর পাগলের মত চুম্বনে লিপ্ত হতে লাগলো। নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না কোন।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৪৪