Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬০

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬০

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬০
আরোবা চৌধুরী আরু

আস্তে আস্তে একজন একজন করে মিট কর। সবাই একসাথে হামলে পড়লে যদি আমার বউ পড়ে যায়, তাহলে সবকটাকে ধরে ধরে তুলে আছাড় মারবো।
সায়মান কথাগুলো বলেই থেমে গেল। ঘরের ভেতর হঠাৎ করে নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
সবাই একযোগে চোখ ছোট ছোট করে সায়মানের দিকে তাকিয়ে রইল। এমন সায়মানকে তারা খুব কমই দেখেছে। এতটা স্পষ্ট অধিকারবোধ,সবাইকে একটু থমকে দিল।

“ওহো!”
রুহি কোমরে হাত রেখে আধা বিস্ময়ে বলে উঠল,
“আমার বউ! বড় ভাইয়া, তুমি এতটা বদলে গেলে কেমনে?”
রুহির গলায় খোঁচা ছিল, রিশা চোখ আরও সরু করে, ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“বাহ! সবার সামনে কী সুন্দর ডায়ালগ, ‘আমার বউয়ের কিছু হলে’!”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সায়ফান এগিয়ে এসে রিশার ঘাড়ে নিজের সব ভার দিয়ে বলল,
“দেখ দেখ, আমি অনেকদিন আগেই থেকে দেখছি আমার ভাইয়ের এই বদলে যাওয়ার রূপটা। বউ আসার পর ভাই-বোন সব ভুলে গেছে। আমাকে তো প্রত্যেক কথায় কাজে এখন তবলা বাজানোর মতো করে বাজায়, থাপ্পড় উপর থাপ্পড় দেয়!”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

কথা বলা শেষ করে নিজের ওজন আরো রিশার উপর দিলো,
রিশা এক ঝটকায় সায়ফানকে নিজের থেকে ঠেলে সরিয়ে দিল।
“তোমার প্যাঁচরমো তুমি অন্য জায়গায় গিয়ে করো। সর ও তো! নাটকবাজ কোথাকার একটা!”
তারপর চোখ ঘুরিয়ে জারিনের দিকে তাকাল।
“এই হারে বজ্জাতের প্রেমের ফাঁদে পড়লি কী করে বল তো তুই? ছেলের কি দুর্ভিক্ষ পড়েছিল? আমার বান্ধবী হয়ে এমন একটা কাজ করতে পারলি!”
জারিন অসহায়ভাবে রিশার দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক তখনই সায়ফান আবার এগিয়ে এসে রিশার চুলের মুঠি ধরে ফেলল।

“এই! তুই আদৌ আমার বোন তো?”
সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“শালি, নিজের ভাইয়ের নামে এভাবে বলতে লজ্জা করে না?”
হঠাৎ চুলে টান লাগায় রিশা চিৎকার করে উঠল।
“আহ! বড় ভাইয়া দেখো! আমার চুল ধরে টানছে! কিছু বলো!”
সবার দৃষ্টি আবার সায়মানের দিকে ঘুরে গেলো । সায়ফান এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে, আঙুল তুলে রিশার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই ভাই কী বলবে হ্যাঁ? তুই যে আমাকে এত কিছু বললি তার বেলা? আগে তোর বিচার করুক!”
রুহি বিরক্ত হয়ে দুই হাত তুলে বলল,

“থামবি তোরা দু’জন! আর বড় ভাইয়া, ওদের কিছু বলছ না কেন? সেই কখন থেকে দুইটা শুরু করেছে, থামার নাম নেই!”
এতক্ষণে নাফিসা রাহিলকে জড়িয়ে ধরে ওদের ঝগড়া দেখছিল । সায়মান তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে মুখ শক্ত করে । ওদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“যা ইচ্ছা কর,”তোদের কাছে আমার বউকে দুই ঘণ্টার জন্য ছেড়ে দিলাম। তারপর আবার আমার ঘরে পাঠিয়ে দিবি।”
একটু থেমে আবার বলল ,
“এই দুই ঘণ্টার ভেতরে টাইম টু টাইম খাবার দিবি।”
সবাই একটু হতভম্ব। তারপর সে সোজা নাফিসার দিকে তাকাল।
“মিসেস সায়মান তাহের রাশিদ,”
কণ্ঠটা নিচু,

“দুই ঘণ্টা পর আপনাকে রুমে দেখতে চাই। তার ভেতরে টাইম স্পেন্ড করে নেন।”
এইটুকু বলেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ঘুরে নিজের রুমের দিকে চলে গেল সায়মান। সায়মান যেতেই যেন বাঁধ ভেঙে গেল।
রুহি, জারিন, রিশা একসাথে নাফিসার দিকে এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
“নাফু—”
“নাফু রে…”
“তুই ঠিক আছিস তো?”
নাফিসা হেসে ওদের জড়িয়ে ধরল। চোখে একটু পানি চলে আসলো। কথাবার্তা বলতে বলতে সবাই মিলে রুমের দিকে চলে গেল। দরজার ভেতরে সবাই ঢুকে পড়তেই, সায়ফান হঠাৎ জারিনের হাত ধরে ফেলল।
“এই, এক সেকেন্ড।” কিছু বোঝার আগেই সে জারিনকে টেনে পাশের রুমে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। রুমটা নিস্তব্ধ। শুধু দু’জনের শ্বাসের শব্দ।
জারিন চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,

“এই! কী করছ তুমি?”
সায়ফান দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“সবাইয়ের সামনে আমাকে অপমান করতে ভালো লাগে?”
জারিন প্রথমে রাগ করলেও সায়ফানকে সিরিয়াস ভাবে কথা বলতে দেখে কাঁপা গলায় বলল,
“আমি কিছু বলিনি…”
“বলনি?”
সায়ফান এক পা এগিয়ে এল,
“ওরা যা বলল, তার একটাও থামালে না কেন?”
জারিন চুপ করে রইল। চোখ নামানো। সায়ফান একদম ওর কাছে এসে দাঁড়িয়েছে নিঃশ্বাসের সাথে নিশ্বাস বারি খাচ্ছে, সায়ফান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গলার স্বর একটু নরম হলো।

“এই চশমা… আই লাভ ইউ।”
কথাটা বলেই সায়ফান জারিনের কপালে একটা চুমু একে দিল।
জারিন সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে ফেলল। ঘনঘন নিশ্বাস নিচ্ছে।
সায়ফান আরও একটু কাছে এগিয়ে এসে জারিনের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“উত্তর দাও চশমা, ডু ইউ লাভ মি?”
জারিন চোখ আরও শক্ত করে বন্ধ করে নিল। জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বলল,
“ইয়েস… আই অলসো লাভ ইউ।”
জারিনকে এভাবে ঘনঘন নিশ্বাস নিতে দেখে সায়ফান চোখ মেরে বলে উঠল,

“এভাবে জোরে জোরে শ্বাস নিতে দেখলে আমার কেমন কেমন হয় চশমা। প্লিজ এভাবে শ্বাস নিও না, বেবি। তাহলে তোমার বাকি নিশ্বাসটুকুও এখন আটকে রাখার যোগান হয়ে যাবে।”
জারিন নিজেকে সামলে নিয়ে সায়ফানকে একটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
“অসভ্য একটা!”
বলেই ঘুরে চলে গেল।
আর সায়ফান হেসে হেসে জারিনের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“বেবি, এভাবে চলে যাচ্ছ কেন? আমি আর কতটা নির্লজ্জ হতে পারি, একটু দেখে যাও প্লিজ!”

অনেকদিন পর সবাই একসাথে হয়েছে। এই “অনেকদিন”-টাই যেন আজ কথার শেষ হতে দিচ্ছে না। সময় যে কখন গড়িয়ে গেছে, কেউ খেয়ালই করেনি। দুই ঘণ্টা কখন পার হয়ে গেছে, নাফিসার নিজেরই হুঁশ নেই। সবাইকে কাছে পেয়ে সে এমনভাবে গল্পে ডুবে গেছে।
সায়মান ল্যাপটপটা এতক্ষণ কোলের ওপর ছিল। স্ক্রিনে চোখ থাকলেও মন নেই । ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে গেল। দুই ঘণ্টা। সে ল্যাপটপটা পাশের টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়াল। মুখটা শক্ত, হাঁটার ভঙ্গিতে বিরক্তি স্পষ্ট। কোনো কথা না বলে পাশের রুমের দিকে এগোল।

দরজা খুলতেই দেখতে পেল বেহাল অবস্থা, একজন বিছানার ওপর আড়াআড়ি হয়ে পড়ে আছে, বালিশ জড়িয়ে। আরেকজন মেঝেতে আধশোয়া, এক পা ভাঁজ করা, এক হাত কপালের নিচে।
কেউ সোফার কোণায় গুটিশুটি, মাথা হেলানো। কারও পিঠ দেওয়ালে ঠেকানো, চোখ আধবোজা। কেউ আবার কারও গায়ে হেলান দিয়ে বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
আর ঠিক মাঝখানে নাফিসা। সে বসে আছে, হাঁটু ভাঁজ করে, এক হাতে গাল ঠেকানো। সায়মান এক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। কিছু বলল না।
পরের মুহূর্তেই সে এগিয়ে গিয়ে নাফিসার সামনে দাঁড়াল, এক হাতে ওর হাঁটুর নিচে, আরেক হাতে পিঠে ভর দিয়ে, হঠাৎ করেই কোলে তুলে নিল। সবকিছু ঘটল চোখের পলকে। নাফিসার “এই—” বলার সুযোগও হলো না। আর বাকিরা এত গল্পে মগ্ন ছিল যে, প্রথমে বুঝতেই পারেনি কী হয়েছে। দুই কদম এগোনোর পর যেন সবার চোখ একসাথে খুলে গেল।

“ওইইই!”
“আরে!”
“হু হু হু!”
হাততালি, শিস, চিৎকার সব একসাথে শুরু করলে সবাই মিলে। সায়ফান তো ফ্লোরে শুয়ে শুয়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে চিৎকার করে হু হু করছে শয়তানি করে।
নাফিসা লজ্জায় লাল। দুই হাত সায়মানের কাঁধ আঁকড়ে ধরেছে। চোখ নামানো, ঠোঁট কামড়ানো। সায়মান একবার পিছন ফিরে তাকাল। গলা একটু উঁচু, গম্ভীর।
“নো সাউন্ড।”
একটু থেমে আবার,
“একটা শব্দ যেন পাশের রুমে না আসে। নাইলে সবকটাকে আজই বের করে দিব।”
সবাই হেসে চুপ।
সে আবার বলল,

“আর দুপুরের লাঞ্চ রেডি করার দায়িত্ব তোদের। সো গো। লাঞ্চ রেডি হলে রুমে নক দিবি।”
এইটুকু বলেই আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। সোজা নিজের রুমের দিকে হাঁটা ধরল। রুমে ঢুকেই দরজা বন্ধ। নাফিসাকে সাবধানে বেডের ওপর শুইয়ে দিল। নিজে পাশে বসে এক টানে টি-শার্ট খুলে ফেলল। নাফিসার গলার ওড়নাটাও আলতো টানে সরিয়ে দিল।
তারপর ওর বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। নাফিসাকে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে বললো কিছুক্ষণ চুপচাপ।
তারপর বিরক্তি মেশানো নরম গলা,

“এই পিচ্চি বউ এতটা বেয়াড়া হইলে কবে স্বামীর কথা শোনে?”
নাফিসা মুখ ঘুরিয়ে তাকাল।
“আমি কখন বলেছি আসতে?”
সায়মান আবার বলল,
“ঘড়ি দেখিসনি?”
নাফিসা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“আমি তো সময় দেখিনি। সবাই এতদিন পর—”
“মানে?”
সায়মান মাথা তুলল,

“আমি ডাকছি, তুমি গল্পে ব্যস্ত?”
নাফিসা উঠে বসার চেষ্টা করল,
“ আপনি সবার সামনে এভাবে কোলে তুলে আনলে কেন? আমি কত লজ্জা পেয়েছি জানেন ?”
সায়মান হাত দিয়ে ওর কোমরে চাপ দিল,
“বস।”
নাফিসা বসে পড়ল। সে নাফিসার চিবুক ধরে মুখ তুলল,
“এভাবে আনাটা লজ্জার না। এটা আমার অধিকার।”
নাফিসা চোখ নামিয়ে ফেলল,
“সবাই তাকাচ্ছিল…”
“তাকাবে।”
সায়মানের গলা শান্ত,

“তুমি আমার বউ। এটা লুকানোর কিছু না।”
নাফিসা একটু চুপ থেকে বলল,
“আমার সত্যি মনে ছিল না আপনি রুমে আসতে বলেছিলেন …”
সায়মান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“জানি। কিন্তু দুই ঘণ্টা অনেক।”
নাফিসা ধীরে ধীরে মাথা নামিয়ে ওর বুকে রাখল।
“ভুল হয়ে গেছে।”
সায়মান চুলে হাত বুলিয়ে দিল।
“হয়।”
কিছুক্ষণ চুপ। নাফিসা হঠাৎ বলল,
“ আপনি কিন্তু খুব রাগী।”
সায়মান নাফিসার কথা শুয়ে হালকা হাসল,
“তোমার জন্যই।”
নাফিসা মাথা তুলে তাকাল,
“আর খুব দখলদার।”
“তাও তোমার জন্য।”

সারাদিন একসাথে কাটিয়ে রাত গড়িয়ে গেছে। রাতের দিকে একে একে সবাই বিদায় নিয়ে চলে গেছে। শেষে ঘরটা ফাঁকা হয়ে এলে সায়মান আর নাফিসা একা রয়ে গেছে। সাইফান তখনো ফেরেনি। সে জারিনকে ড্রপ দিতে গেছে।
রাত প্রায় এগারোটা।
সাইফান গাড়িটা থামাল জারিনদের বাড়ির গেটের সামনে। রাস্তা ফাঁকা, লাইটপোস্টের আলোয় গাছের ছায়া লম্বা হয়ে পড়ে আছে।
জারিনের ফোনে একের পর এক কল ওর আম্মুর ।
জারিন ব্যস্ত হয়ে বলল,
“আম্মু রেগে গেছে। আমি যাই।”

সে দ্রুত দরজা খুলে নামতে যেতেই হঠাৎ সাইফান ওর হাতটা টেনে ধরল হঠাৎ, অপ্রস্তুত ভাবে। নিজেকে সামলাতে না পেরে জারিন আচড়ে গিয়ে সাইফানের কোলের ওপর পড়ে গেল।
দুজনেই মুহূর্তের জন্য হতভম্ব।
সাইফানের হাত শক্ত হয়ে গেল স্টিয়ারিংয়ে। সে বুঝতেই পারেনি এত জোরে টান পড়বে। জারিন ওর কোলের ওপর পড়ে আছে দেখে সে মাথা একটু নিচু করে, কণ্ঠ নামিয়ে কানে ফিসফিস করে বলল,
“একটুতেই এমন। শুধু হাতটা ধরলাম, এই হাতের ভারই সামলাতে পারলি না। গোটা আমাকে কেমনে সামলাবি, চশমা?”
জারিনের চোখ রাগে জ্বলে উঠল। সে ঝাটকা দিয়ে সরে এসে দাঁড়াল।

“সবসময় ফাজলামো ভালো লাগে না। নিলজ্জ, বেহায়া লোক!”
সাইফান ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উঠল,
“আমি নিলজ্জ বেডা না হলে, তুই বেডি ধাড়ি বেডি হতে পারবি কোনদিন? মা হতে পারবি? আমি যদি নিলজ্জভাবে অকাম-কুকাম না করি। আমি তো উপকার করছি তোর, বেবি।”
“রাখ তোর উপকার, হালার ব্যাটা!”
রাগে গজগজ করতে করতে জারিন গেটের ভেতরে ঢুকতে গেল।ঠিক দরজার সামনে এসে হঠাৎ থমকে গেল।সামনে দাঁড়িয়ে আছে—জারিফ। রাগে চোখ লাল, হাত শক্ত করে বাঁধা। এক সেকেন্ডেই জারিন বুঝে গেল, সব দেখে ফেলেছে।

“ভাই—”
কথাটা শেষ করার সুযোগ পেল না।
ঠাস!
জারিফের হাত সজোরে গিয়ে পড়ল জারিনের গালে।।জারিন কেঁপে উঠল, চোখে পানি চলে এল।
“লজ্জা নাই তোর?” —— জারিফ গর্জে উঠল।
এই দৃশ্য দেখে সাইফানও থমকে গেল। এক পলকের মনে পড়ে গেল কলেজের সেই দিনটার কথা, ঝামেলা, মারামারি, জারিফের দোষ চাপানো, তার গার্লফ্রেন্ড ছেড়ে যাওয়া। সব একসাথে মাথায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। আর দ্বিতীয়বার জারিনের গায়ে হাত উঠতে দেখে রাগটা দ্বিগুণ হয়ে গেল। সাইফান গাড়ি থেকে নেমে এক পা এগিয়ে এসে বলল না কিছুই। সোজা গিয়ে,
ঠাস!
এক ঘুষি গিয়ে পড়ল জারিফের গালে।

“তোর সাহস কই থেকে আসে আমার গার্লফ্রেন্ডের গায়ে হাত দেওয়ার ?”
আরেকটা ঘুষি।
“তুই এখানে কী করিস?”
জারিফ পাল্টা সামলে উঠে সজোরে ঘুষি মারল।
“তুই বল, তুই আমার বোনের পিছনে কী করছিস?”
দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আমার বোনকে টার্গেট করেছিস? তোর চোখ তুলে ফেলবো আমার বোনের দিকে তাকালে!”
সাইফান থমকে গেল।
“তোর… বোন?”
ঠাস!
আরেকটা ঘুষি মারল জারিফ।

“ভাব করছিস যেন জানিস না! জেনে শুনেই তো পিছনে লেগেছিস। আমি তোকে বহুদিন আগে থেকেই চিনি!”
দুজনের মধ্যে মারামারি শুরু হয়ে গেল। ঘুষি, ধাক্কা, গালাগালি, সব একসাথে।
“থামো! প্লিজ থামো!”
জারিন কাঁদতে কাঁদতে মাঝখানে ঢুকতে চেষ্টা করল। কিন্তু কারো কানে কিছু ঢুকছে না। হঠাৎ সাইফান জারিনের কান্না শুনে থমকাল। ওর চোখ ভিজে গেছে, ঠোঁট কাঁপছে। সে হাত তুলে বলল,
“শোন, শোন প্লিজ!”
জারিফ তাকাল না।
সাইফান গলা ভারী করে বলল,

“কলেজে আমাদের ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। আমি তোর সাথে ইচ্ছা করে ঝামেলা করিনি।”
এক কদম এগিয়ে এসে বলল,
“আমি তোর বোনকে সত্যিই ভালোবাসি। আর তোর বোনও আমাকে ভালোবাসে।”
জারিন কাঁদতে কাঁদতে মাথা নেড়ে বলল,
“ভাই, প্লিজ…”
জারিফ হেসে উঠল।
“ভালোবাসা?”
সে জারিনের হাত শক্ত করে ধরে টান দিল।
“চল। ভিতরে চল।”
“ভাই, ছাড়! বোঝার চেষ্টা করো। আমি সব জানি তোমার সাথে ওর ভুলবোঝাবুঝি হয়েছে। ” — জারিন চিৎকার করল।

“খুব পাকনা হয়েছিস তুই।”
জারিফ টানতে টানতে বলল,
“তোর বিয়ের ব্যবস্থা করছি। আর এইসব ফালতু ভালোবাসা মাথা থেকে বের কর।”
জারিন কাঁদছে, ছুটে তাকাচ্ছে সাইফানের দিকে।
সাইফান এক পা এগোল। কিন্তু জারিফ চোখ রাঙিয়ে বলল,
“আর এক পা বাড়ালে খুন করে ফেলবো। এখন এখান থেকে যা না হলে আব্বু আম্মুকে বলে আমি এমন ব্যাবস্থা করবো তখন বুঝবি। ”
এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল সাইফান। তারপর দাঁত চেপে পিছিয়ে গেল।
জারিফ জারিনকে টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে গেল। গেট বন্ধ হয়ে গেল বিকট শব্দে। সাইফান দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। চোখ লাল, তারপর হঠাৎ ঘুরে গাড়িতে উঠল। স্টার্ট দিল। হুমকির মতো গতি নিয়ে গাড়িটা অন্ধকার রাস্তায় মিলিয়ে গেল।

সাইফান সায়মানের ফ্ল্যাটে এসেই সবার আগে সায়মানের রুমে নক করল।
ঘরের ভেতরে সায়মান তখন বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে। নাফিসাকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে এক হাতে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। দুজনের মাঝে চাপা গলায় টুকিটাকি কথা হচ্ছে।
হঠাৎ দরজায় শব্দ হতেই সায়মান বিরক্ত হয়ে বলে উঠল,
“যা বলবি কালকে বলবি। এখন শোনার জন্য দরজা খুলতে পারবো না।”
দরজার ওপাশ থেকে সায়ফানের গলা প্রায় চিৎকারের মতো শোনা গেল,
“ভাইয়া দরজা খোলো এখনই! আমি এদিকে শেষ হয়ে যাচ্ছি আর তুমি বউ নিয়ে আরামে শুয়ে থাকবে, এটা তো হবে না। আমার বউ নিয়ে আসার আগে ব্যবস্থা করো!”
নাফিসা সায়মানের বুক থেকে সরে উঠে দাঁড়াতে চাইলো।
“কিছু একটা হয়েছে,” সে ফিসফিস করে বলল, “প্লিজ দরজাটা খুলে দিই। ভাইয়া খুব টেনশনে আছে মনে হচ্ছে।”

সায়মান হাত বাড়িয়ে নাফিসার কবজি ধরে ফেলল।
“বউ, তোমার এখন আমার দিকে ফোকাস করা দরকার। আর আমার বাচ্চার দিকে। এই সময় অন্য সবার চিন্তা করার দরকার নেই।”
নাফিসা অসহায়ভাবে ওর মুখের দিকে তাকাল। চোখ দুটো ভিজে উঠল।
“প্লিজ… এক মিনিট। শুধু শুনি কী বলবে।”
এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সায়মান হাত ছাড়ল। “যা,” বলল ঠান্ডা গলায়। নাফিসা দরজা খুলে দিতেই সাইফান হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল। সোজা এসে বিছানার একপাশে লুটিয়ে পড়লম।
“ভাই আমার কী হয়ে গেল!”
গলায় কান্না,
“একটা মাত্র গার্লফ্রেন্ড জোগাড় করেছিলাম। ভাবলাম এবার বিয়ে করবো, হালালভাবে সুখে থাকবো। যখন খুশি অমৃত খাবো,বাসর করবো। আর ঠিক তখনই সব শেষ!”
সে বালিশে মুখ গুঁজে ফেলল।

“এই বাধা থেকে আমাকে উদ্ধার কর। যে করেই হোক আমার বউ নিয়ে এসে দাও। আব্বুকে বলো প্লিজ!”
সায়মান এমন ভাব নিল যেন কিছুই শোনেনি। চোখ নামিয়ে চুপ করে বসে রইল।
সাইফান হঠাৎ উঠে বসে বলল,
“এই ভাই! এমন অচেনার মতো ব্যবহার করছ কেন? এক মায়ের পেটের ভাই আমি। আমার বিপদে তুই এমন?”
তারপর নাফিসার দিকে তাকিয়ে প্রায় মিনতির স্বরে বলল,
“ছুট ভাবি, দেখো তো! তোমার স্বামী কেমনে অবহেলা করছে। আমার সব শেষ হয়ে গেছে।”
নাফিসা তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করল,
“ভাইয়া কী হয়েছে? পরিষ্কার করে বলো।”
সাইফান দাঁত কটমট করে বলল,
“তোমাগো চশমা আপার একটা বেয়াদব ভাই আছে। আমার প্রেমকাহিনীতে বাংলা সিনেমার ডিপজলের ভূমিকায় নামছে। আর তার থেকেও বড় বাধা—তোমার স্বামী।”
সায়মান বিরক্তিতে তাকাল।

“আরেকটা বাজে কথা বলবি না। বের হয়ে যা।”
“মানে কী!”
সাইফান গর্জে উঠল,
“আমার মতো ছোট বাচ্চা ছেলের সাথে এমন ব্যবহার করছ? তুমি না আমার অভিভাবক?”
সে একটু নরম হয়ে আবার বলল,
“সব নিজে নিজে করবো। শুধু বিয়েটা দিয়ে দাও। বাসরের সব দায়িত্ব আমি নেবো। খুব তাড়াতাড়ি তোমাকে চাচা বানিয়ে দেবো।”
সায়মান এবার কড়া গলায় বলল,

“আর একটা ফালতু কথা বলবি না। বের হ।”
এইবার সাইফান সত্যি সিরিয়াস হয়ে সায়মানের হাত চেপে ধরল।
“ভাই, আমি মজা করছি না। আমি ওকে সত্যিই ভালোবাসি। হালালভাবে পেতে চাই।”
সায়মান হাত ছাড়িয়ে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“নিজের ভালোবাসা নিজে আদায় করতে শেখ। জীবনের সব সময় বাবা বা আমি তোর পাশে থাকবো না। এখন থেকেই নিজেরটা গুছানো শেখ।”
“ভাইয়া—”
“আর একটা কথা না।”
সায়মান চোখে চোখ রেখে বলল,
“নিজে ভাব। নিজে সিদ্ধান্ত নে।”

সাইফান বুঝে গেল, আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। সায়মান যখন একটা সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সেটা বদলায় না। নিরব পায়ে সে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
সাইফান বেরিয়ে যেতেই নাফিসা ধীরে ধীরে বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল।
“আপনি এমন করলেন কেন?”
সায়মান কোনো উত্তর দিল না। একটুক্ষণ পর পাশ ফিরে শুয়ে পড়তে চাইলো। নাফিসা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না।
“ভাইয়া তো সত্যিই ভেঙে পড়েছে। আপনি বুঝতেও পারলেন না? ও তো মজা করছিল না। ওর চোখে পানি ছিল, আপনি দেখেননি?”
সায়মান গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর উঠে বসে নাফিসার দিকে তাকাল।

“দেখেছি,”
নাফিসা অবাক হয়ে গেল।
“তাহলে?”
সায়মান মাথা নিচু করে বলল,
“সব সময় সাহায্য মানেই পাশে দাঁড়িয়ে ঢাল হওয়া না। কোনো কোনো সময় শক্ত না হলে মানুষ দাঁড়াতেই শেখে না।”
নাফিসা কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইল।
“ বিয়ে করবে আপনি হেল্প করবেন এখানে আবার দাঁড়ানো না দাঁড়ানোর ব্যাপার কি।
ও আমার ছোট ভাই,” সায়মান আবার বলল,
“ছোট থেকেই ওকে আমি আগলে রেখেছি। এখন যদি আমি আবার ঢাল হই, তাহলে ও কোনোদিন নিজের সিদ্ধান্তের দায় নিতে শিখবে না।”
নাফিসা চুপ করে শুনছে।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫৭+৫৮+৫৯

“ আজ প্রেমে পড়েছে,” সায়মান গলা নামিয়ে বলল,
“ভালোবাসে—এটা আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু ভালোবাসা মানেই শুধু আবেগ না। ভালোবাসার সাথে দায়িত্ব থাকে, ঝুঁকি থাকে, সাহস লাগে।”
” হুমমম “নাফিসা ছোট্ট করে উত্তর দিল।
সায়মান এবার নাফিসার হাত ধরে টেনে পাশে সরিয়ে দিয়ে ওকে ঝাপটা ধরে জড়িয়ে ধরল।
” ঘুমাও বউ আর আমার কথা ভাবো। ”

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬১