Home ছায়াস্পর্শ ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৯

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৯

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৯
জান্নাত চৌধুরী

রাত প্রায় নয়টা ছাব্বিশ , রেজা ঘরে এলো। খাটের উপর ওড়নায় মুখ ঢেকে বসে রয়েছে রাইসা। রেণুর মা বসিয়ে গেছে। রেজা দরজা লাগিয়ে এসে খাটের উপর বসলো। রাইসার ঘোমটা দুহাতে সরিয়ে কিছু সময় তাকিয়ে তাকলো।
সারাদিনে এতো এতো ধকলে রাইসার মুখ টা ছোট মোটো হয়ে গিয়েছে। গায়ে মোটা একটা শাড়ি , রেজা সেদিক খেয়াল করে বলল-

-“শাড়িতে অসস্থি হচ্ছে তোমার?”
রাইসা মাথা নাড়ালো, তার সমস্যা হচ্ছে। যদিও রাইসা না বললেও রেজা ঠিক বুঝে যেতো। সারাদিন বাচ্চামি করে ছুটে বেড়ানো মেয়েটা খনিকেই কেমন বড় হয়েছে। বিয়ে হয়েছে। রেজা উঠলো , আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো। তেমন কোনো কাপড়ের ব্যবস্থা নেই । এদিক ওদিক তাকিয়ে গোসলখানায় গেলো। চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে এসে বলল,
-“বসো তোমার সুবিধার আয়োজন করে আসি।”
রেজা বেড়োবে , হঠাৎ দরজায় শব্দ হলো‌। কেউ ডাকছে,রেজা গিয়ে দরজা খুললো। রেণুর মা হাতে দুটো
শপিং ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে। রেজা জিজ্ঞেস করলো –
-”এইলা কি চাচি ?”
রেণুর মা ব্যাগ দুটো এগিয়ে দিলো। এক গাল হাসি দিয়ে বলল ,
-“ছোট নবাব পাঠাইছে , আপনার লাগি একখান লুঙ্গি আর গেঞ্জি। আর ব‌উয়ের লাগি একখান শাড়ি।”
রেজা ব্যাগ নিলো‌, রেণুর মা চলে যেতে দরজা লাগিয়ে বিছানায় এসে বসলো। শাড়িটা বের করে রাইসার হাতে দিয়ে বলল-

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

-“পাল্টে এসো আরাম লাগবে।”
রাইসা শাড়ি হাতে বিছানায় ছেড়ে মেঝেতে নামলো। তারপর গোসল খানায় না গিয়ে , রেজার সামনেই শাড়ির খুললো। রেজা বিরক্ত গলায় ধমকে উঠলো –
-“কি করছো মেয়ে?”
-“চোখ নেই ;
রেজা দাঁতে ঠোঁটে কামড়ে নিশ্চুপ থেকে বলল “ সরম করছে না তাইনা? পুরুষের সামনে বস্ত্র খুলে মাটিতে ফেলেছো!
-“উহু ; করেছেনা।”
রেজা কৌতুহলী হলো পূর্ণ দৃষ্টি রাইসার শাড়ি পড়ার দিকে রেখে বলল, – ”লাজুকতা মেয়েদের জন্য সৃষ্ট ; তবে তোমার মাঝে অনুপস্থিত কেনো ?”
রাইসা শাড়ি কুচি তুলছিলো। হাত থামিয়ে রেজা চোখে তাকিয়ে থাকে। কয়েক সেকেন্ড পর দৃষ্টি সরিয়ে বলল”

-“রাতে বস্ত্র ছাড়াই আমার দেহ প্রদর্শন করেছেন আপনি। সেই সুবাদে সমাজের লোক ওড়না বিহীন আমায় নষ্টা বলে চিনেছে। ব্যাশা বলেছে বহুবার , আমার যা যাবার সব গিয়েছে । আপতত এসব লজ্জা সরমে কি কাজ বলুন?”
রেজা হাসল , ” তোমার নিকট আমি অপরাধী রয়ে গেলাম রাই”
রাইসা মলিন হাসলো ,সে হাসিতেই মেয়েটা কতশত বেদনা লুকালো কে জানে। শাড়িটা কুচি গুজে নিয়ে রেজা পাশে এসে বসলো। রেজা বলল –
-” এ দিন হয়তো স্বরণীয় হয়ে ইতিহাসের পাতায় তুলে রাখা উচিত রাই” তবে যদি মনের খিদে টা মিটে।
রাইসা এসব কথা বেশি একটা পাত্তা দিলো না। খাটের উপর বাবু হয়ে বসে দু’খান রাখলো রেজা গালে। মুখটা নিজের দিকে ফিরিয়ে নিলো। চোখে, চোখ মিলিয়ে তাকিয়ে থাকলো কয়েক মিনিট। দুজনে চোখের পলক পড়ে না। নীরবতা ভেঙে একপর্যায়ে রাইসা বলে –

-“আপনি ঠকেছেন জনাব , ভীষণ রকমের ঠকেছেন;
রাইসা হাত নামিয়ে নিলো। চোখ সরিয়ে নিলো রেজা থেকে। রেজা প্রশ্ন করল –
-”কারণ?”
-”কারণ , ছেলেরা মূলত নারীর সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে। অথচ আপনি এক শ্যাম কন্যার স্বামী হয়েছেন।”
রেজা কিছুক্ষণ নীরব থাকলো , বিছানা ছেড়ে গিয়ে ঘরের জানালা খুললো‌। পশ্চিমা বাতাস হুঁ হুঁ করে ঘর ঢুকছে। রেজার চুল উড়িয়ে চলেছে , প্যান্টের পকেট হাতড়ে একটা সিগারেট আর লাইটার বের করলো। লাইটার কয়েকবার জ্বালানো পরে আগুন জ্বললো, তারপর সিগারেট ঠোঁটে চাপিয়ে আগুন দিলো। লম্বা, লম্বা কয়েকবার টান দিয়ে ধোঁয়া গিললো। রাইসা এতো সময় সব দেখছিলো। রেজার নিচের ঠোঁটের এক কোণে একটু কাঁটার দাগ। এমনি সময় চোখে পড়েনা। তবে সিগারেট টানলে স্পষ্ট হয়। রেজা আরো একটা টান দিয়ে ধোঁয়া গিলে বলল,

-”ছেলেরা মুলত নারীর সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে এটা চিরন্তন সত্য। তবে তার থেকেও বড় সত্য ভাগ্য , নসিব। যা থাকিবে নসিবে তাহাই মিলিবে! সুতরাং নারীর সৌন্দর্য্য জীবন নয়; ভাগ্যে যা রয় , তাহাই জীবন।
রাইসা মনোযোগ দিয়ে শুনলো। তারপর উঠে দাড়ালো , এগিয়ে এসে রেজার কাছে দাঁড়িয়ে সিগারেট হাতে নিয়ে ছুঁড়ে জানালার বাহিরে ফেলল। রেজা নির্বাক , রাইসা আবারো তার গালে হাত রাখলো;
-”আমায় পেয়ে জীবন খাতায় কয়েক ধাপ পিছিয়ে গেলেন তাই না;
রেজা তাচ্ছিল্যের হাসল, -জীবনটা সংক্ষিপ্ত রাই” এই জীবনে আক্ষেপের পথ খোলা রেখে , অকালে নিজেকে খুন করার যথেষ্ট কোনো কারণ নেই আমার কাছে।
রাইসা গাল থেকে হাত নামালো। হতাশার শ্বাস ফেলল। রেজা আবার বললো-
-তবুও বলছি “এক শ্যামাঙ্গিণীর টানা দুটো চোখের মায়া! আমায় তার ভালোবাসার স্নিগ্ধতায় আবদ্ধ করার জন্য‌ই কি, যথেষ্ঠ নয়;
রাইসা নিশ্চুপ থাকলো , রেজা তাকে নিজের দিকে ফেরালো, রাইসার চোখের কোণের বিন্দু পানি আঙ্গুলে চুলে। জিহ্ব দিয়ে চেটে নিলো,

-“জীবনটা আফসোসে সুতোয় বেঁধে কি হবে;
বড় জোর প্রাপ্তির খাতায় কয়েকটা দীর্ঘশ্বাস জমা র‌ইবে।
তারচেয়ে ভালো , হাত ধরো রাই, গোটা জীবন দুজনে একসাথে কাটাই।”
রাইসা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। রেজা এগিয়ে এসে কোলে তোলে নেয় তাকে। হেঁটে যায় বিছানার দিকে, একদম নিকটে এসে শুইয়ে দেয় রাইসাকে। তল পেটে প্রজাপতি উড়ছে মেয়েটার। রেজা ধীরে ধীরে বুক হতে শাড়ির আঁচল নামিয়ে দেয়। এর পর নিজের গায়ের পাঞ্জাবি খুলে , একবারে বস্ত্র বিহীন হয়। ধীরে ধীরে ঝুঁকে গিয়ে মুখ ডোবায় রাইসার , গলায়। রাইসার চোখের কোণে পানি এসেছে ,
রেজা বেশ যত্নে ভালোবাসার চিত্র অঙ্কন করতে ব্যস্ত। এক এক করে ব্লাউজের প্রতিটি বোতাম খুলে আবারো‌ ঝড় তোলা স্পর্শে পাগল করতে শুরু করে কিশোরী মন।
রাইসা চোখ খিচে নেয় , রেজা ঝুকে গিয়ে আলতো চুমু খায় রাইসার ওষ্ঠে। তারপর আস্তে আস্তে নিজে নামে , ঠোঁট ছোঁয়া রাইসার উন্মুক্ত পেটে , নাভীর কাছে কালো এক তিল।
রেজার চোখে পড়তেই কামুক চোখে তাকিয়ে থেকে কামড় বসায় তাতে। তীব্র ব্যথা অনুভব করে রাইসা , মুখে উফ জাতীয় এক শব্দ নির্গত হয়। সময়ের হুস নেই – আপতত দুই নর নারী কামুকতায় লিপ্ত।

-“বাকি অর্ধেকটা সেরে ফেলি রাই”
রাইসার নিঃশ্বাস ঘন পড়ছে , এ যেন মৃত্যুর আগের নিঃশ্বাস। উত্তাল সমুদ্র ডুবন্ত সাঁতারির অক্সিজেন ফুরিয়ে এসে ঠিক যতটা ঘন নিঃশ্বাস টানে তেমন। রেজার জিহ্বা চলাচল করছে রাইসার পেটে। রেজা কাজ থামায় , মুখে তুলে রাইসার দিকে তাকায়,
-“প্রস্তুতি নাও রাই; দ্বিতীয় দফায় যুদ্ধ ঘোষণা করছি।”
রাইসা দাঁতে ঠোঁটে কামড়াতেই , রেজা মোক্ষম আঘাত হানে! আবগে মুখ হতে নির্গত হয় ,
-”ও তেরি , এটা উত্তপ্ত লাভা।”
ব্যথায় কুঁকড়ে যায় রাইসা‌। অথচ নিজের একান্ত কাজে অটল রেজা। সময় পেরোতে থাকে।

অন্ধকার আচ্ছন্ন , ফাঁকা ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে ইফরাহ। সময়ের খেয়াল নেই তার। হাজার তারার মাঝে , উজ্জ্বল চাঁদের আলো এসে মুখে পড়েছে তার। পশ্চিমা বাতাসে গায়ের লোম গুলো শির শির করছে।
ইফরাহ শান্ত চোখে চাঁদের সৌন্দর্য্য দেখছে , দেখছে চাঁদ কে ঘিরে রাখা তারা গুলো কে। জীবন গুলো কীভাবে কীভাবে জেনো সময় স্রোতে বয়ে চলছে। প্রতিটি জিবনের একটা করে নিজস্বতা। তবুও কেমন করেই যেনো হারিয়ে যাচ্ছে সব। এসবের হিসাব কষলে দেখা যাবে , প্রতিটি জীবনে একটি করে অপ্রাপ্তির গল্প। প্রতিটি মানুষ‌ই খুনি একটা স্বচ্ছ হৃদয়ে খুনি । ইফরাহ‌ও খুনি; সে নিজের সাথে খুন করেছে আরেকটি মেয়ের জীবন। মানহার জীবন , এটা কি চাইলেই অস্বীকার করা সম্ভব? সম্ভব নয় ; সেও খুনি –
আরাধ্য এলো, চুপচাপ এসে দাড়ালো একপাশে। ইফরাহর নাকে এসেছে লোকটার শরীরের ঘ্রাণ। কিছু সময় নিশ্চুপ কাটলো দু’জনের। খোলা চুল গুলো বাতাসে উড়ছে , শাড়ির আঁচলটাও মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে। আরাধ্য ডাকল,

-ইরা; তারা গুনছো ?
-“উঁহু”
-“তবে”?
-“ভাবছি ;
আরাধ্য রেলিং থেকে সরে এলো পেছনে হতে ইফরাহ কে জড়িয়ে ধরে খোপা আলগা করে চুল খুলে মুখ ডাবলো। ইফরাহ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। আরাধ্য জিজ্ঞেস করল –
-”কি ভাবছো?”
ইফরাহ চুপ থেকে বলল , -ভাবছি ! “এই যে সকলে আমায় ভাঙ্গছে , আমার বিশ্বাস ভাঙ্গছে।দিনের পর দিন মিথ্যা ভালোবাসার অভিনয় করছে। কত সহজেই আমায় দুমড়ে- মুচড়ে শুকনো পাতার মতো‌ ঝুড়ঝুড়ে করে মাটিতে ফেলে, পা দিয়ে পিসে যাচ্ছে। কী আশ্চর্য !কারো কোনো আফসোস নেই ,কোনো অপরাধ বোধ নেই। কি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রাত পার করছে তারা। অথচ আমি অভাগী হতাশায় মুখ গুজে নিঃসঙ্গতার সাথে নিদারুণ যন্ত্রণায় বেঁচে থাকি।কারো কোনো মায়া নেই।”
ইফরাহ ঘুরে যায়, আরাধ্যের দৃষ্টিতে নিজের দৃষ্টি মেলায় ,

-”মানুষ শখ করে কত প্রাণী পোষে , পাখিও পুষে। তাদের জন্যে মায়াও করে। উড়ে গেলে কান্দে , মরে গেলেও কান্দে। অথচ কেউ আমায় মায়া করে না। কেন করে না ছোট নবাব ? তবে আমি পোষা প্রাণীর থেকেও নিকৃষ্ট।”
আরাধ্য সরে গেলো ছাদের রেলিংয়ে হাতে ভর দিয়ে দাড়ালো। এ প্রশ্নের উত্তর টা সে নিজেও খুঁজে চলেছে। জানা নেই তার;
ইফরাহ আস্তে করো পেছনে থেকে জড়িয়ে নিলো তাকে। মাথাটা ঠেকালো আরাধ্যের পিঠে। আরাধ্য চোখ বুজে ইফরাহ হাতের উপর নিজের হাত রাখলো। ইফরাহ শরীরের কাঁপুনি অনুভব করছে। কাঁদছে মেয়েটা , আরাধ্য হাত দুটো বুক থেকে সরিয়ে পরপর দুই হাতে চুমু খেলো।
ইফরাহ আরো চেপে মাথাটা রাখছে আরাধ্যের পিঠে। আরাধ্যের হাসফাস লাগছে , কোথাও একটা বিঁধছে এই নিশ্চুপ থাকা। কিছুক্ষণ এক‌ই ভাবে চুপ থেকে ইফরাহর হাত সরিয়ে ঘুরে যায়। ইফরাহ দ্রুত চোখ মুছতে গিয়েও গালে পানি থেকে যায় তার। আরাধ্য হাসে ,

-শোনো মেয়ে , বেদনা লুকিয়ে কাঁদতে নেই। ওসব শীতে সকালের শিশিরের মতো রোদ্রতাপে শুকিয়ে ফেলায় উত্তম।
ইফরাহ তাকিয়ে থাকে আরাধ্যের চোখে। চোখ দুটো লাল , কেনো লাল এই প্রশ্ন করলেই শ’ উল্টা পাল্টা কথা বলবে লোকটা। আরাধ্য ভ্রু জোড়া কুঁচকে নিলো। তার অস্বস্তি বাড়ছে , পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ইফরাহর নাক টেনে বলল-
-“দিন কাল ভালো নয় বুঝলে? আজকাল মেয়েরা এমন ভাবে ছেলেদের দিকে তাকায় , মাঝে মাঝে ভয় ধরিয়ে ছাড়ে। কি জামানা চলছে বলো তো;
ইফরাহ স্বাভাবিক হয়। আরাধ্যের জ্বালা ধরা কথায় বলে ,
-“রুপবতী নন আপনি , দেখলে ক্ষয় হবে না।”
আরাধ্য হাসে , তবে দেখলে কেনো ?
-”রসিকতা ভালো লাগছে না।”

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৮

ইফরাহ চলে যাবার জন্য পা বাড়িয়েছিলো। আরাধ্য দ্রুত তাকে আটকে কোমড় চেপে ধরে। ঝাঁকি মেরে ওঠে ইফরাহর শরীর। থমকে গিয়েছে বাতাস। আরাধ্য ঘন ঘন শ্বাস টানছে , চোখ দুটো গাঢ় লাল হয়ে উঠছে। এতো সবের মাঝে ইফরাহর চোখ আটকায় আরাধ্যের গলার উঁচু জায়গায়। Adam’s apple , ইফরাহ হাত ছোঁয়াতে চায় ওটাতে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে খানিক স্পর্শ করে। আরাধ্য ঢোক গিলতেই কেমন একটা শব্দ হলো।

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৯ (২)