Home ছায়াস্পর্শ ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪১

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪১

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪১
জান্নাত চৌধুরী

ভোর রাতের দিকেই শরীর খারাপ করেছে চেয়ারম্যানের। প্রেসার বেরেছে , নাক দিয়ে চিরচির করে রক্ত পড়া দেখেই ভয় দিশেহারা হয়ে পড়েছিলো অরুনিমা।
আরাধ্য ফিরলো ভোর রাতের খানিক আগে ঘরে এসে গোসল সেরে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই দরজায় কড়া পড়েছে। বিরক্ত হয়ে উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই মায়ের কান্না মুখ টা দেখলো। অরুনিমার গলায় কথা আটকে আছে। সে কথা বলছে না। তার ব্যাকুলতায় আরাধ্য অবুঝের ন্যায় প্রশ্ন করলো , “ কি হয়েছে আম্মা” ?

অরুনিমা হাত ইশারায় কিছুটা দেখাচ্ছে। তবে আরাধ্য ইশারা না বুঝেই বারবার অরুনিমার মুখে তাকিয়ে দেখছে। অরুনিমা কথা বললো আর , দ্রুত আরাধ্যের হাত ধরে টেনে নিয়ে এলো ঘরে।
চেয়ারম্যানের অবস্থা ততক্ষণে বেহাল দোষা। খাটের ওপর বসে কেমন জানি একটা করছে লোকটা। আরাধ্য এসে, দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে চেয়ারম্যান কে ধরে কয়েকবার ডাকলো , “ আব্বা ও আব্বা… কেমন লাগছে আপনার।”
চেয়ারম্যান শরীর ছাড়তে শুরু করেছে। আরাধ্য নাকের রক্ত দেখে বলল , “ আম্মা জলদি ঔষধের বাক্স খান আনেন দেখি।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

অরুনিমা ঘরে থাকা এক বক্স ঔষধ এনে আরাধ্য হাতে ধরিয়ে দিলো। আরাধ্য চেয়ারম্যান কে ছেড়ে খুঁজে খুঁজে প্রেসারের ঔষধ বের করলো।
-“আম্মা পানি আনেন”;
অরুনিমা পানি আনে দিলো। আরাধ্য ঔষধ বের করে চেয়ারম্যান খাইয়ে দিলো। বিছানার পাশ হতে এক গামছা টেনে পরিষ্কার করলো রক্ত তরল।

চেয়ারম্যান বোধ হয় খানিকটা আরাম পেলেন। আরাধ্য তাকে শুইয়ে দিয়ে বেড়িয়ে এলো।
ঘড়িতে সময় তখন , ৭ টার কাছাকাছি। ঘরে এসে ইফরাহ কে খুজলো, মেয়েটা নেই। আরাধ্য এদিকে উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখলো। পুরো ঘর ফাঁকা তবে গোসল খানা থেকে পানির শব্দ আসছিলো। আরাধ্য নিশ্চিত হলো ইফরাহ গোসল খানায় রয়েছে। বিছানায় চিত শুয়ে চোখ দু’টো উপর ডান হাত রেখে ঘুমানোর চেষ্টা করলো।
কিসময় বাদেই গোসল খানা থেকে ঘরে এলো ইফরাহ। আরাধ্য তখনো পুরোপুরি ঘুমে তলিয়ে যেতে পারে নি। ইফরাহ এসে পাশে বসল। আলতো হাত ছোঁয়ালো লোকটার চুলে। আরাধ্য চোখ থেকে হাত নামিয়ে ইফরাহকে দেখলো। এরপর কোলের উপর মাথা রেখে জিজ্ঞেস করলো‌-

-“জ্বর কমেছে”?
-হুম!
-পুরোপুরি কমেছে ?
ইফরাহ চুল টেনে দিতে দিতে বলল , “জ্বি”
-ব্যথা কমেছে ?
-কমেছে;
আরাধ্য চোখ বুঝে নিলো।‌ চেহারায় ঘোর বিষন্নতা তার , চোখে নিচে ঘুম জাগা কালো দাগ। ঘাড় গলায় , ছোপ ছোপ লালচে দাগ। এ সকল ক্ষত ইফরাহর করা ;
আরাধ্যের হাতে ক্ষত হয়েছে তবে কিসের ক্ষত ওসব জানাতে চাইলো না ইফরাহ। শুধু হাতের ক্ষতটায় একটু হাত বুলিয়ে বলল-

-”প্রসাধনী লাগিয়েছেন ?
-কোথায় ?
-হাতে ক্ষত হয়েছে আপনার! খুন করা বড় খাটুনির কাজ তাই নয় কি? সে খুনের একটু চিহ্ন না বহন করলে তবে আপনি কিসের বিচারক হলেন?
আরাধ্য তাকল , লাল রঙ্গা চোখ জোড়ায় অবুঝের ন্যায় চেয়ে থাকলো ইফরাহর মুখ পানে। ইফরাহ বলল –
-আপনি প্রকাশ্যে শুদ্ধ হলেও .. ভিন্ন রুপে ভয়ংকর বিধ্বংসী।
আরাধ্য উঠে বসল , শরীর টা হালকা মোচড় কেটে একখান সিগারেট জ্বালালো। ইফরাহ সামনের বেপোরোয়া পুরুষটির প্রতিটি আচরণ খুতিয়ে খুতিয়ে দেখছে। আবারো গাঢ় এক টান দিতেই ইফরাহ বলল –
-“একটু তাকান না আমার দিকে। দেখুন তো মায়া লাগে তাই না? সত্যি লাগে না ? কেনো লাগেনা বলুন তো? ভালোবাসতে পারিনি আপনাকে, তাই! ”

আরাধ্য হাসল , এ হাসির ব্যখ্যা নেই , “ কে বলেছো ভালোবাসো না। তোমার চোখ জোড়ায় পানি ইরা। তুমি মিথ্যা বললেও ওই সাদা মণির চোখ কখনো মিথ্যা বলে না। তুমি ভালোবেসেছো আমায়;
-“একি তবে পাপ করেছি ?”
-“তোমার ভাষ্যমতে একে কী বলে আমার জানা নেই ইরা। তবে, দুনিয়ায় হাত বাড়ালেই যেখানে সব পাওয়া যায়। সেখানে তোমায় পেতে আমি নির্লজ্জ, বেহায়া হয়ে তোমার সামনে দাড়িয়েছি। এ আমার প্রাপ্তি।”
-“তবে কি আপনি অস্বীকার করেছেন আপনি পাপ করেনি। মানুষ হত্যা পাপ নয়।”
-আমি পাপী , নিজের কৃতকর্ম যে কোনো পরিস্থিতিতে স্বীকার করার সাহস এ বুকে রয়েছে ইরা।
ইফরাহর কন্ঠ কেঁপে উঠলো। সে ধরা গলায় বলল ,

“ জানেন তো এসবে অভিশাপ লাগে। কোথাও না কোথাও গিয়ে ঠিক লাগবে। এসব অনর্থক কীভাবে সামলাবেন আপনি ?”
-“কাল পিছু নেওয়ার কারণ কী ছিলো ইরা ?”
ইফরাহ তাচ্ছিল্যের হাসলো । আরাধ্যের হাতটা জড়িয়ে নিয়ে মাথা ঠেকালো তাতে, “ কতকাল আর ভুলিয়ে রাখবেন আমায়। কতকাল এই আড়ালে আবডালে সব চলবে বলুন।”
আরাধ্য সিগারেটে পরপর দু’টো লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া গিললো। ইফরাহ বলল , “আপনি ঠিক না ভুল এসবের বিচারের আমি নামবো না। আমি সাহসী ন‌ই যে , আপনার বিপক্ষে দাড়াবো। আমি শুধু অনুরোধ করতে পারি এসব খুন-খারাপি সংঘর্ষ বন্ধ রাখুন। রাখবেন বলুন ? ”
আরাধ্য চোখে বুজে তৃপ্তি হাসলো। সিগারেটেরের শেষ অংশ টেনে মেঝে ছুড়ে মেরে বলল , “ বাঁচতে হলে লড়তেই হবে। নয়তো আমি আমারে সরে গেলে তোমায় সকলে পিষে মারবে‌!”

-আমায় অপরাধী তৈরি করবেন না দোয়া করে। আমি নিজের রক্ষার্থে এই নরকে আপনাকে থাকতে বলতে চাই না। এসব ছেড়ে ছুড়ে আসুন না ছোট নবার।
আরাধ্য চমৎকার হাসল , “ কেনো এসবে নিজেকে জড়াচ্ছো ইরা?” এসব থেকে দূরে থাকাই তোমার জন্য মঙ্গল। ভাবো না সব ঠিক আছে।
-তাহলে আবারো ভুলিয়ে দিন আমার সব কিছু , কাল রাতের আপনার সেই ভয়ংকর রূপ আমি ভুলে থাকতে চাই।
আরাধ্য ঘাড় কাত করে তাকিয়ে বলল , “ ভুলিয়ে রেখেছিলাম , কেনো পিছু নিয়েছিলে? এতো কিসের কৌতুহল। সব কৌতুহল মঙ্গলজনক নয় ইরা।”

-”আজ আপনার পাহাড়াদার আমায় আটকালো না কেনো?”
আরাধ্য চুপ করে র‌ইলো। আরো একটা সিগারেট জ্বালানো উচিত তার। টেনশনে সিগারেট বেশি ফুরায়। তবে জ্বালোলো না। ইফরাহ ধৈর্য্য নিয়ে অপেক্ষা করছে উত্তরের। লোকটার এক জিনিস ইফরাহ কে মোহিত করে। আরাধ্য বেশ সাজিয়ে কথা বলতে পারে। হোক মিথ্যা কিংবা সত্য;
আরাধ্য বলল , “ সাবানে ক্ষয় দেখেছো ইরা? সারাজীবন অন্যের জন্য নিজেকে ক্ষয় করে যায়। যার যখন প্রয়োজন নিজের ইচ্ছে মতো ঘঁষে ব্যবহার করে। নরম জিনিস তো এক পর্যায়ে গলে নিঃশেষ হয়ে যায়। এইটাই আমাদের শিক্ষা নরম হলেই শেষ তুমি মেয়ে।”
আরাধ্য কাঠবোর্ডে হেলান দিলো , ”আমি নিঃস্বার্থ হয়ে দেখেছি জীবনে আমাকে থাপিয়ে গেছে। আপতত এর হিসাব চুকোবার পালা চলছে।”
ইফরাহ ছলছল চোখে তাকিয়ে শুনলো প্রতিটি। আরাধ্যে বলল ,

“ আমি এতো মারা খেয়েও কখনো বলতে পরিনি। ভাগ্য আমার বেলায় নিষ্ঠুর। ভাবো তো জীবন কেমনে চলছে? ”
আরাধ্য উঠে গিয়ে বেলকনিতে দাড়ালো। আবারো ২য় নাম্বার সিগারেট ধরিয়ে শুন্যে ধোয়া ছুঁড়েলো। ঘর হতে ইফরাহ দাঁড়িয়ে দেখলো উদাসীন লোকটার ছন্নছাড়া হাবভাব‌। ভাবনায় ডুবলো ….
ইরফাদের হাতে দুটো ঔষধ পাঠিয়েছিলো আরাধ্য। কথা ছিলো রেণুর মায়ের হাতে দেবার। মহিলা যেন ইফরাহ কে ঔষধ খাইয়ে ঘুমানো ব্যবস্থা করে দেয়। ইরফাদ কাজটা তাই করতে এসেছিলো তবে রেণুর মা আজ অবেলায় ফিরে গিয়েছে, পুরো বাড়ি খুঁজেও দেখা পাইনি তার। উপায় না পেয়ে কাগজে মোড়ানো ওষুধগুলো ইফরাহ ঘরে এসেই দিয়ে যায়।

রাত বাড়লো , বাড়ির অন্য কাজের লোক দিয়ে খাবার ঘরে পাঠিয়েছেন অরুনিমা। ইফরাহর খাওয়া হতেই একবার এসে দেখে গিয়েছে। জ্বর বেড়েই চলছিলো , সাথে ব্যথাও – ইফরাহ খাবার পালা চুকিয়ে ঔষধ খুলতেই দেখলো জ্বর ব্যথার সাথে এক ঘুমের ঔষধ। ইফরাহ চেনে ঘুমের ঔষধ , নামটাও জানে না। তবে , তার ঘুম ভালো হয় ভেবেই ঘুমের ঔষধ আর খেলো না সে। –
জ্বরে ঔষধ খেয়েছে , কিছুসময় যেতেই জ্বর নেমে যায় তার। তবুও শুয়ে অপেক্ষা করছিলো লোকটার জন্য। ভেবেছে , এলে ডাকবে ; তবে আরাধ্য ডাকলো না। জাগনা পেলো তখন, যখন -ঘরের দরজা শব্দ করে লাগিয়ে বেড়িয়ে গেলো।

ইফরাহ ভীত হয়ে উঠেছিলো ঘুম ছেড়ে। আরাধ্য যেতেই , সে‌ও পিছু নেয় তার। তবে দেখা মিললো না , ঘরে এসে কালো রঙ্গের এক শাল গায়ে জড়িয়ে বেশ সাবধানে বের হলো মীর বাড়ি হতে। ইফরাহ জানে , রাতের আধারীতে আরাধ্যের অবস্থান হয় স্টিলের ঘরের সেই গোপন কুঠিরেতে। ঘরটা রহস্যময় না চাইলেইও হাজার খানেক সন্দেহ মনের মাঝে থেকেই যায় তার।

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪০

ইফরাহ বেশ সাবধানে চলে স্টিল ঘরের দিকে। ভেবেছিলো আজো হয়তো বাঁধা পাবে পাহাড়াদারের তবে তা হয় নি আজ। কারণ তারা হয়তো জানেই না আরাধ্য এ ঘরের অবস্থান করেছে। ইফরাহ আনন্দিত হয়েছিলো বোধহয় –
ঘরের এসে এক‌ই পথ ধরে। আবারো কুঠিরে ঘরে এলো সে, কী আশ্চর্য আজ আর সে দিনে অবস্থান নেই। ঘরে শীলতা থাকলেও কোনো লোক নেই। কিছু নেই , চারপাশে চারটে মর্শাল জ্বলছে। যার আলোতেই ঘর পরিষ্কার ;
প্রথমের দিকে সন্দেহভাজন কিছু নজরে এলো না। সব শুনশান নিশ্চুপ। ইফরাহ পুরো ঘর পাইচারি করছিলো। ঘরের দেয়ালের সেই লাল লাল দাগ গুলো আজ সে হাতে ছুয়ে দেখেছে। এক এক করে ঘরের প্রতিটি কারুকাজ সে ছুয়ে দেখছে।
হঠাৎ …….

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪১ (২)