জাহানারা পর্ব ৩৭
জান্নাত মুন
ফ্ল্যাশব্যাক
জায়ান ভাইয়ের গার্ডসরা আমাকে সেইফলি বাড়িতে দিয়ে গেছে। এদিকে আমি মুখ ভার করে বসে আছি।সকাল সকাল মুডটা বিগড়ে গেছে।ভেবেছিলাম মানুষটার সাথে একান্তে কিছুটা সময় কাটাব।এমন কি সেই জন্যই কবিতা আপু,জুই আর জিয়াদকে সাথে নিয়ে যাই নি।
অন্যদিকে জায়ান ভাই আমি চলে আসার কিছুক্ষণ পর বাড়িতে আসে।আর বাড়ির সবাই কে সাবধান করেছে গার্ডস ছাড়া একা কোথাও না যেতে।কারণ জিতু ভাই একজন সি আই ডি অফিসার।তার শত্রুর অভাব নেই।শত্রুরা সব সময় ওত পেতে থাকে কিভাবে আমাদের ক্ষতি করা যায়।
কিছুক্ষণ পর তিনি আবার বাসা থেকে বেড়িয়ে যান।তারপর সোজা অফিসে গিয়ে নিজের কম্পিউটার ল্যাবে চলে যান।সেখানে আগে থেকেই উনার বিশ্বস্ত কয়েকজন সঙ্গী কম্পিউটারে মনযোগ দিয়ে কাজ করছিলো।জায়ান ভাই কে দেখেই সকলে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ জানালো।তিনি নিজের কম্পিউটারের সামনে বসতে বসতে বললো,
–কোনো ইনফরমেশন পেয়েছ?
একজন বললো,না স্যার ঐ সার্ভারটা এখনো হ্যাক করতে পারি নি।তবে ক্রাইম ইনভেস্টিগেটর অফিসার কবিরের সাথে আমার কথা হয়েছে। উনারাও হ্যাক করার চেষ্টা করছে।কিন্তু স্যার,,,,,
জায়ান ভাই কম্পিউটারে হাত চালাতে চাালতে বললো,কিন্তু কি?
লোকটা বললো,আমরা যে বর্তমান একটা কেইসে সি আই ডি কে হেল্প করছি সেটা কিন্তু কোনো সাধারণ কেইস না।নিশ্চয়ই এই চক্রের পেছনে কারো লম্বা হাত আছে।আর আমরা অলরেডি জানি আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে পাওয়ারফুল টেরো*রিস্ট গ্যাং ব্ল্যাক ভে-নম বাংলাদেশও কিছুকিছু ক্ষেত্র যেমন নারী পা*চারের এক বড় অংশে উনাদের হাত আছে ।তার সাথে নিষিদ্ধ সব মাদক দ্রব্যও ফ্রান্সে যায়।আর এই গ্যাংও যদি এই কেইসে যুক্ত থাকে তাহলে তো আমাদের জন্য বিপদজনক। তার চেয়েও বড় কথা ঐ মাফিয়া যদি জানতে পারে সি আই ডি কে পেছন থেকে আপনি সাহায্য করছেন, তাহলে আপনাকে কিন্তু ছাড়বে না।
শামিন লোকটার কথায় ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো জায়ান ভাই। তিনি নিজের কাজে মনযোগ রেখেই বললো,,
–মি. ভেনম কে আমি খুব ভালো করেই চিনি।ওর মতো মাফিয়া কখনো এত ছোটলোকি কাজে হাত লাগাবে না।আর আমার কিছু করার ক্ষমতাও ওর নেই।
গত এক বছর ধরে বাংলাদেশে নারী-পুরুষ সহ অনেক বাচ্চাও নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। এদিকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে জানা গেছে অনলাইনে গ্রামের সহজ সরল মেয়েদেরকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ছেলে পক্ষ এসে সামাজিক ভাবে বিয়ে করে লাপাত্তা হয়ে যাচ্ছে।আবার অনলাইনে বন্ধুত্ব করে মানুষের ব্যক্তিগত ইনফরমেশন আদায় করে উক্ত ব্যক্তির সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে।সেখানে যদি নারী হয় তাহলে উক্ত ভিক্টিমের অসামাজিক ছবি ভিডিও ধারণ করে যৌ*ন হ*য়রানি সহ শতশত কেইস ফাইল জমা হয়েছে।এতদিন সেগুলো পুলিশ অব্দি থাকলেও এখন সি আই ডি র হাতে চলে এসেছে। আর যেহেতু এই চক্র টি অনলাইন ভিত্তিক সেক্ষেত্রে জিতু ভাইয়া জায়ান ভাইকে রিকুয়েষ্ট করেছে এই কেইসে হেল্প করতে।
জায়ান ভাই একজন বিশ্বের নামকরা কম্পিউটার সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।এপল, গুগল, মাইক্রোসফট এর মতো বিশ্বের নামকরা বিলাসবহুল কোম্পানিগুলো থেকেও উনার জন্য জবের অফার এসেছে বহুবার।কিন্তু তিনি বারবার রিজেক্ট করে দিয়েছে।তিনি যখন ফ্রান্সে ছিল তখন সেই দেশের অন্যতম বিলাসবহুল সফটওয়্যার কোম্পানিতে CEO পদে বসেন।কিন্তু হঠাৎ করে কেনই বা রিজাইন নিয়ে দেশে ফিরলেন তা আমাদের কাউকে বলে নি।
জায়ান ভাই কম্পিউটারে নিজের কাজ শেষ করে নিজের কেবিনে গিয়ে বসলো।অতঃপর ল্যাপটপে বিজনেসের কাজে মন দিলো।তক্ষুনি উনার কেবিনে বিনা অনুমতিতে কেউ ঢুকে পড়লো। উনি সামনে তাকাতেই দেখতে পেল ইফান চৌধুরী আর তার পিএ ইনান খন্দকার এবং তাদের পেছনে স্ব অস্ত্র হাতে কালো পোশাকধারী কয়েকজন বডি গার্ড।ইফানের সারা দেহ কালোতে মুড়ানো। শার্টের উপরে লং ওভারকোট,চোখে সানগ্লাস।ইফান মুখের কালো মাস্কটা খুলে জায়ান ভাইয়ের মুখে ছুড়ে মারলো।ইনান চেয়ার টেনে ইফানকে বসতে দিলো।ইফান পায়ের উপর পা তুলে আরাম করে বসলো।জায়ান ভাই ইফানের এমন ব্যাবহারে চোখমুখ কুচকে নিলো।ইফান চোখের সানগ্লাস টা খুলে গার্ডদের দিকে ছুড়ে মারলো।কিন্তু গার্ডটি কেচ ধরতে পারলো না।ইফান চোখ কড়া করে গার্ডগুলোর দিকে তাকালো।আজ যদি ওর আস্তানা হতো তাহলে সবকটাকেই উপরে পাঠিয়ে দিতো।এটা দেখে জায়ান ভাই জোরে হেসে দিলো।ইফানের শক্ত চোয়াল আরও শক্ত হয়ে আসলো।
–তোর হিরো গিরি দেখানো শেষ হলে এবার আসতে পারিস।
জায়ান ভাইয়ের কথায় আরও তেতে উঠলো ইফান।অতঃপর দাঁড়িয়ে ডেস্কে থাপ্পড় মারলো।জায়ান ভাই ওকে পাত্তা দিলো না।বরং ল্যাপটপে চোখ রেখে কাজে মনযোগ দিলো।ইফানের চোখ লাল বর্ণ ধারণ করেছে।সে দাঁতে দাঁত পিষে ইনানের উদ্দেশ্যে বললো,
–ইন্দুইরার বাচ্চা আমার রিভলবার দে।
–জি ভাই,
বলেই ইফানের দিকে লোড করা একটা রিভলবার এগিয়ে দিলো।ইফান সেটা টান মেরে নিয়ে জায়ান ভাইয়ের মাথায় তাক করলো।অতঃপর রাগে রিরি করতে করতে বললো,
–শালা হারা*মির বাচ্চা, বেইমান, মা*দারচু*দ।আমাকে ঠকাতে তর কলিজা একবার কাঁপলো না?তোর কারণে আমাকে কুত্তার মতো ফ্রান্স থেকে বিডিতে আসতে হলো।
জায়ান ভাই এবার উঠে দাঁড়িয়ে ইফানের চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বললো,
–আমি তোর সাথে বেইমানি করি নি।আর যদি তর অন্যায় কাজকে সাপোর্ট না করা বেইমানি হয় তাহলে আমি বেইমানিই না হয় করলাম।
জায়ান ভাইয়ের কথায় ঝারি মারলো ইফান।তারপর বলল,
–তর সা*উয়া*র নীতি সা*উয়া*তেই রাখ শালা।
–ভদ্র ভাবে কথা বল ইফান।সবসময় অসভ্যের মতো গা*লিগা*লাজ করা বন্ধ কর।আর কথায় কথায় শালা শালা করবি না।
জায়ান ভাইয়ের কথা শুনে গা দুলিয়ে হাসতে হাসতে ইনানকে বললো,
–কিরে ইন্দুর আমি কবে ভদ্র সভ্য ছিলাম রে?
ইফানের কথা শুনে ইনান দাঁত কেলিয়ে হাসলো।তারপর মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললো,
–জি ভাই আমারও মনে পড়ছে না।
ইফান হেসে জিহ্বার ডগা দিয়ে গাল ঠেলতে ঠেলতে আচমকা জায়ান ভাইয়ের কলার চেপে ধরলো,
–হা*রামির বাচ্চা, তোর কারণে আমার কত কোটি টাকা লোকসান হয়েছে জানিস?এখন তোর খুলিটা গুলি মেরে উড়িয়ে দেই,দেই উড়িয়ে?
জায়ান ভাই ইফানের হাত থেকে শার্টের কলার ছাড়াতে ছাড়াতে বললো,
–দেখ ইফান আমি তোর কোনো কাজে কখনো বাগড়া দেই নি।আর না তো দেওয়ার ইচ্ছে আছে।কিন্তু আমার সামনে অসহায় মেয়েদের জীবন নষ্ট করবি আর আমি তো সেটা মেনে নিতে পারবো না।
ইফান আবারও গর্জে উঠলো,
–তর ভালো মানুষী তোর কাছে রাখ।তোর কারণে প্রশাসনের হাতে আমার ড্রা*গস, অ্যাল*কোহল ভর্তি দু’টো লরি সহ আমার কেনা ১২০টি মেয়ে আটকা পড়েছে।
জায়ান ভাই পড়াশোনার জন্য ফ্রান্সে যাওয়ার পর পরিচয় হয় ইফানের সাথে।দু’জন একই সাথে পড়াশোনা করে।তবে ইফানের আসল পরিচয় জায়ান ভাই কয়েক বছর পর জানতে পারে।তখন তারা একে অপরের বেস্ট ফ্রেন্ড তৈরি হয়েছে।তাই ইফানের নোংরা পরিচয় জানার পরও বন্ধুত্বের খাতিরে তিনি কিছু করতে পারেন নি। যদিও দু’জন দুই প্রান্তের মানুষ। ইফান পাপে কলুষিত আর জায়ান ভাই এক অতি সাধারণ মানুষ।যার এক মাত্র নেশা ছিলো পড়াশোনা করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।তিনি তাই করেছেন। পড়াশোনা করে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন।
এদিকে তিনি ইন্জিনিয়ার হয়ে বের হওয়ার পর থেকেই উনার জন্য ভালো ভালো জবের অফার আসতে থাকে।কিন্তু ইফানের কথায় অন্য কোথাও জয়েন না করে ইফানের কোম্পানিতে জয়েন হয়।তবে সেখানে অনেক অনৈতিক কাজকর্ম হয় যা বরাবরই জায়ান ভাইয়ের চোখে খারাপ লাগতো।কিন্তু বন্ধুর দিকে চেয়ে উনি নিজের দিক থেকে অনেস্টলি কাজ করেছেন।তবে হঠাৎ দেশে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সেখান থেকে একেবারে রিজাইন নিয়ে নিয়েছে। হয় তো উনি এখন থেকে বিডি তেই থাকবেন।
এদিকে ইফান ইউএসে ছিলো।যখন জানতে পেরেছে জায়ান ভাইয়ের কারণে ইফানের অবৈধ মালামাল প্রশাসনের হাতে চলে গেছে, তখনই ফ্রান্সে ব্যাক করে।তবে ফ্রান্সে এসে জানতে পারে জায়ান ভাই কোম্পানি থেকে রিজাইন নিয়ে বিডি চলে এসেছে। তখন থেকে ইফান জায়ান ভাইকে মারার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।আর এই জন্যই ইফানের বিডিতে আসা।
জায়ান ভাই ইফানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে আবার চেয়ারে বসলো।ইফান রাগে রিরি করছে।তাকে পৃথিবীর সবাই ভয় পেলেও জায়ান ভাই কখনো পায় না।এমনকি তাকে তেমন পাত্তায় দিচ্ছে না।ইফান ক্ষিপ্ত চোখে জায়ান ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।জায়ান ভাই চোখে ইশারা করলো বসতে।ইফান দাঁতে দাঁত পিষে বসলো। অতঃপর চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
–ইচ্ছে তো করছে তোকে আর তোর চিপ সি আই ডি ভাইটাকে গুলি করে উপরে সেটেল করে দিই।শালা সব হা*রামির দল।
ইফানের কথায় চোখ সরু করে তাকালো জায়ান ভাই।অতঃপর ইফানের কথার পরে বললো,
–এখানে জিতু কোথা থেকে আসছে?
ইফান কয়েক মূহুর্তের জন্য চুপ করে যায়।তারপর ভাবতে থাকে বিডিতে আসার প্রথম দিনের কথা,”সেদিন ঢাকা থেকে সরাসরি কেরানীগঞ্জ আসে।তার সাথে ছিল তিন জন বডি গার্ড।তখনও ইনান মিশনের কাজে ইউএস ছিলো বলে ইফানের সাথে আসতে পারে নি।আর এদিকে গার্ড বেশি নিয়ে না আসায় ইফানের নিরাপত্তাও কম ছিলো।তিনজন গার্ডই জায়ান ভাইয়ের খোঁজে চলে যায়।এদিকে গোপ্ত খবরে জিতু ভাইয়া জানতে পারে তার বিডি আসার কথা।তিনি সি আই ডি টিম নিয়ে কেরানীগঞ্জ আসে।সেদিন ইফান তাদের থেকে পালায়।যদিও ও চাইলেই প্রত্যেক কে একাই সামলে নিতে পারতো।কিন্তু বন্ধুর ভাই হওয়ায় ছেড়ে দেয় আর নতুন ঝামেলায় জড়ায় নি।এদিকে পেছন থেকে জিতু ভাই শুট করে।আর সেই গুলিটা ইফানের পা ছুঁইয়ে যায়।আর সেদিনই অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে আমাদের প্রথম দেখা।যদিও আমি দেখতে পারি নি মুখ ঢাকা থাকার কারণে।
–কি হলো বলছিস না যে?
জায়ান ভাইয়ের কন্ঠ শুনে ঘোর থেকে বেরিয়ে আসলো ইফান। হঠাৎই ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির উদয় হলো।সে জিহ্বা দিয়ে গাল ঠেলতে ঠেলতে বললো,
–তুই আর তর লুজার সি আই ডি ভাই যাদের খোঁজ করছিস তাদের নারী নক্ষত্র আমার নখদর্পনে।
মূহুর্তে জায়ান ভাইয়ের চোখ দুটো কপালে উঠে যাওয়ার উপক্রম হয়।জায়ান ভাই অবাক স্বরে বললো,
–তার মানে এসবে তুইও ইনভলভ আছিস?
ইফান নাক ছিটকে বললো,
–ছ্যা, এসব ছোটলোকি কথা তর মাথায় আসলো কিভাবে?আ’ম গ্যাংস্টার, যা চাই সেটা সকলের সমনেই ছিনিয়ে নিয়ে আসতে পারি।আমাকে চোরের মতো লুকিয়ে কিছু করতে হয় না।
জায়ান ভাই শান্ত কন্ঠে বললো__”তার মানে এই সবে তোর কোনো হাত নেই। তাহলে বল কারা আছে? ”
জায়ান ভাইয়ের কথা শুনে আবার বাঁকা হাসলো। অতঃপর ডেস্কে কিউব নিয়ে খেলতে খেলতে হেয়ালির স্বরে বললো,
–তোদের হেল্প করলে আমার কি লাভ?
ইফানের কথা শুনে জায়ান ভাইয়ের কপালে কয়েকটি সুক্ষ্ম ভাজের সৃষ্টি হলো।কারণ ইফান এমন এক ক্যারেক্টারের মানুষ যে সকলের সাথে মেলামেশা করে না।আর জায়ান ভাই ছাড়া তার আর একটাও ফ্রেন্ড আছে কি না সন্দেহ।আজ কিনা তার একমাত্র ফ্রেন্ডের সাথে লাভ লোকসান হিসাব করছে।জায়ান ভাই এক ব্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
–কি চাই তোর?
–তোর একটা সুন্দরী বোন আছে না, কি যেন নাম?
ইফান ভাবুক চেহারা করতেই পাশ থেকে ইনান বললো,
–ভাই জাহানারা শেখ জারা।
ওদের মুখ থেকে আমার নাম শুনতেই জায়ান ভাইয়ের চোখমুখ শক্ত হয়ে আসলো।এদিকে জায়ান ভাইয়ের এমন চেহারা দেখে আবার বাঁকা হাসলো।অতঃপর ঘারে হাত বুলাতে বুলাতে বললো,
–তর সুন্দরী বোনটিকে আমার চাই।
ইফানের কথায় জায়ান ভাই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিলো,
–ও আমার বোন না,,,,,
–ও হ্যা, এখন থেকে ও তর ভাবি।
জায়ান ভাই হয় তো আরও কিছু বলতো। তবে তাকে সুযোগ না দিয়ে ইফানই বলে ফেললো।ইফানের এমন কথা শুনে জায়ান ভাইয়ের চোখমুখের রং আরও বদলে গেলো।কারণ সে খুব ভালো করেই জানে ইফান কত বড় মেয়ে বাজ ছেলে।এমন এক রাত নেই যে তার বেডে মেয়ে পাওয়া যায়নি।আর ইফান তার অপবিত্র মুখে আমাকে নিয়ে এসব বলছে।জায়ান ভাই ঠাস করে দাঁড়িয়ে পড়লো।অতঃপর চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
–জারা’র দিকে নজর দেওয়ার চেষ্টাও করবি না।
ইফানও উঠে দাড়াল। অতঃপর বাঁকা হেসে ওর মেইন পয়েন্টের দিকে আঙ্গুল তাক করে বললো,,
–এটা আছে যতদিন নজর দিব ততদিন।
এবার আর নিজের রাগ আটকে রাখতে পারলো না জায়ান ভাই।তৎক্ষনাৎ এসে ইফানের নাকেমুখে পাঞ্চ মারলো।আচমকা আক্রমণে তাল সামলাতে না পরে কিছুটা ছিটকে গেলো ইফান।ব্যাপারটা কি হলো বুঝতে কিছুটা সময় লেগেছে ইফানের।এদিকে ইনান সহ গার্ডরা জায়ান ভাইয়ের দিকে বন্ধুক তাক করলো।ইফান হাতের উল্টো পিট দিয়ে নাক থেকে বের হওয়া লাল তরল টুকু মুছে সেদিকে তাকালো।অতঃপর কড়া চোখে সকলকে ইশারা করলো বন্দুক নামাতে।সকলে তাই করলো।ইফান চোয়াল শক্ত করে জায়ান ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে তৎক্ষনাৎ ঠোঁট বাকিয়ে কুৎসিত হাসলো।এতে জায়ান ভাই আরও ফুঁসে উঠলো।ইফান জায়ান ভাইয়ের কাঁধ ঝেরে দিতে দিতে বললো,
–বিডিতে এসে দেখছি বেডা হয়ে গেছিস।
জায়ান ভাই ওর কথা শুনলো না।বরং ইফানের হাতটা ঝারা মেরে সরিয়ে দিলো।অতঃপর দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
–সাবধান ইফান।আমার বাড়ির মেয়েদের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস দেখাবি না।বিষয়টা কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে।
ইফান আফসোস করার মতো চুক চুক শব্দ বের করে বললো,
–খারাপ হওয়ার আর কি বাকি আছে?তোর সুন্দরী বোনকে দেখার পর রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে রে পাগলা।এই দুই রাতে কতবার যে ড্রিম এক্সিডেন্ট করে শাওয়ার নিয়েছি হিসাবের বাইরে ভাই।
–ইফান!!!
চেচিয়ে উঠলো জায়ান ভাই। ইফান হেসে জিহ্বা দিয়ে গাল ঠেলতে ঠেলতে বললো,
–জাহান সুন্দরী কে তো আমি চাইই চাই। যে মেয়ে এক দেখা দিয়েই আমার ঘুম হারাম করে দিয়ে বারবার প্যান্ট ভেজানোর কারণ হচ্ছে, না জানি সে আমার বেডে আস,,,,,,,,
বাকিটা আর শেষ করতে পারলো না ইফান। তার আগেই জায়ান ভাইয়ের হাতের শক্ত থাবার শিকার হয়েছে। জায়ান ভাইয়ের শক্ত হাতের থাপ্পড় ইফানের গালে পড়তেই ইফান তাল হারিয়ে এক পা পিছিয়ে গেলো।জায়ান ভাই আবারও ইফানের কলার শক্ত করে ধরে অ*শ্রাব্য ভাষায় গা*লি দিলো,
–শাট ইউর ফা*কিং মাউথ বা*স্টার্ড। আরেকটা বাজে কথা বললে তোর জিহ্ব টেনে ছিড়ে ফেলবো।
এতক্ষণে ইফানের চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো।শরীররে রাগে তার মস্তিষ্ক ফেটে পড়ছে। আজ এখানে জায়ান ভাইয়ের বদলে অন্য কেউ হলে সে তার কি হাল করতো সে নিজেই ভাবতে পারছে না।ইফানের চোখ দু’টোও অত্যাধিক লাল বর্ণ ধারণ করেছে।ইফান জায়ান ভাইয়ের হাত থেকে নিজের শার্টের কলারটা ছাড়িয়ে শক্ত কন্ঠে বললো,
–তোর ঐ বোনকে আমার চাই বুঝতে পেরেছিস।চাই মানে চাই। ওকে তুলে এনে আমার ফা*কিং রানী বানাবো।ভুলে যাস না,ইফান চৌধুরী একবার যে জিনিসে নজর দেয় সেটা নিজের করেই ছাড়ে।আর বুলবুলিকে তো আমার করেই ছাড়বো।আটকে দেখাস।
ইফান আর এক মূহুর্ত দাঁড়ালো না।যাওয়ার আগে নিজের মাথায় দুই আঙ্গুল তাক করে জায়ান ভাই কে আবার সতর্ক করে গেলো।ইফানের সাথে সাথে ইনান সহ বাকি গার্ডরাও পিছন পিছন চলে গেলো।এদিকে ইফানের যাওয়ার পানে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো জায়ান ভাই। অতঃপর তাচ্ছিল্য করে ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বিরবির করলো,
–তুই কিচ্ছু করতে পারবি না ইফান।জারা শুধু আমার।আর ওর দিকে যে চোখ তুলে তাকাবে তাকে আমি ছেড়ে দিবো না।সে তুই হলেও।আর বাকি রইলো ক্রিমিনাল গ্যাংএর কথা।ওদের সূত্র পেয়ে গেছি।এবার খালি মাস্টার মাইন্ডদের আইডেন্টিটি খোঁজে বের করার পালা।
বিকাল পাঁচ টা বাজে।আমাদের বাড়িতে কিছুক্ষণ আগে তন্নি,সুমাইয়া,নাফিয়া আর আরিফ এসেছে।এদিকে জিয়াদ,জুই,কবিতা আপু সহ আমরা সবাই মিলে লিভিং রুমের ফ্লোরে বসে মিউজিক ছেড়ে বালিশ খেলা খেলছি।তক্ষুনি কলিং বেল বেজে উঠে। জিয়াদ সদর দরজা খুলে দিতেই দেখতে পায় প্রতিবেশী রাকিব ভাই এসেছে।উনি ভেতরে আসতেই আমাদের চোখ পড়ে উনার হাতের মিষ্টির প্যাকেটে।আমি আর জুই উঠার আগেই কবিতা আপু দৌড়ে উনার হাতের মিষ্টির প্যাকেটটা নিয়ে নিলো।
–আরে রাকিব ভাই মিষ্টি নিয়ে আসলে,বিয়ে সাদি করলে নাকি।
রাকিব ভাই আড় চোখে কবিতা আপুকে দেখে মাথা নিচু করে উত্তর দিলো,” আরে নাহ্।”তক্ষুনি রান্নাঘর থেকে আম্মু আর বড় আম্মু বেড়িয়ে আসলো।এদিকে আমরা একটার পর একটা মিষ্টি মুখে পুরে নিচ্ছি। আম্মু আমাকে চোখ পাকালো।বড় আম্মু রাকিব ভাই কে সোফায় বসিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
–কি বাবা কি উপলক্ষে মিষ্টি এনেছ?
রাকিব ভাই মিষ্টি হেসে বললো,”চাচি আপনাদের সকলের দোয়ায় এবার পুলিশের এসআই পদে প্রোমোশন হয়েছে।”
রাকিব ভাইয়ের কথা শনে আমরা সবাই খুশিতে চেচিয়ে উঠলাম।এতে তিনি একটু লজ্জা পেলো।আবার আড় চোখে কবিতা আপুকে দেখে নিলো।
রাকিব ভাইয়ের বাবা উনি দশ বছরের যখন, তখনই মারা যায়।আর আমার পরিবার অসহায় মা ছেলের পাশে দাঁড়ায়। এদিকে রাকিব ভাই মেট্রিক্স পাশ করতেই জিতু ভাইয়া উনাকে পুলিশের চাকরি পাইয়ে দেয়।উনাদের বিপদের সময় সবসময় আমাদের কাছে পাওয়ায় সবসময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।তবে এই বাড়িতে উনার আরেকটা দুর্বলতা আছে।সে হচ্ছে কবিতা আপু।রাকিব ভাই কবিতা আপুর কয়েক বছরের সিনিয়র। তিনি ছোট থেকেই কবিতা আপুকে পছন্দ করে যদিও কখনো মুখ খুলে শিকার করে নি।
ঘড়ির কাটা রাত বারোটার ঘরে।শেখ বাড়ির সকলেই ডিনার সেরে লাইট নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। এদিকে আমি এখনো কিছু খাইনি।খাবই বা কিভাবে?সেই সাদ সকালে মানুষ টা বেড়িয়েছিলো কিন্তু এখনো আসে নি।আমি নিজের রুমের বেলকনিতে গিয়ে একবার নিচে উঁকি দিচ্ছি তো উনার রুমের সামনে ঘুরে আসছি।আবার সদর দরজার সামনেও কিছুক্ষণ বসে অপেক্ষা করছি।রাত আটটার দিকে বড় আম্মু কে কল করে বলেছে উনার আসতে দেরি হবে।এমনও হতে পারে রাতে আসবে না।তাই সবাই যেন ডিনার সেরে নেয়।কিন্তু আমার সপ্তাদশী হৃদয় জায়ান ভাই ছাড়া কিছু বুঝতে চাইছে না।
আমি নিজের রুমের বেলকনিতে দাড়িয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছি।ছোট্ট হৃদয় টা বারবার বলছে,জায়ান ভাই কি সবসময় আমাকে এভাবে অবহেলা করবে।আমাকে কি কখনো উনার হৃদয়ে স্থান দিবে না।আচ্ছা উনি যদি আমাকে ভালো না বাসে তাহলে আমি কিভাবে বাঁচব। না আমি বাঁচতে পারবো না।
শেষ কথাটা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করেই হু হু করে কেঁদে দিলাম।কাঁদতে কাঁদতে চোখের জল নাকের জল মিশে একাকার।কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ির হর্ণের শব্দ কানে আসলো।আমি তাড়াতাড়ি বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নিচে উঁকি দিলাম।জায়ান ভাইয়ার গাড়ি দেখে মূহুর্তেই যেন সকল দুঃখ কষ্ট ভেনিস হয়ে গেলো।আমি আর এক মূহুর্ত দাঁড়ালাম না। উড়নচণ্ডীর মতো এক ছুটে সদর দরজা খুলে দিলাম।জায়ান ভাই সবে কলিং বেল চাপতে যাচ্ছিল তবে দরজা আগেই খুলে যাওয়ায় উনার হাত থেমে গেলো।এদিকে আমি লাইট না জ্বালিয়েই দাঁড়িয়ে আছি।তবে জায়ান ভাইয়ের বুঝতে দেরি হলো না সামনের মানুষ টা কে হতে পারে।
–জারা,,,,,
উনার মাদকীয় কন্ঠ স্বর কানে আসতেই সারা শরীরে কেমন যেন কম্পন বয়ে গেলো।তল পেটের প্রজাতিগুলো ডানা ঝাপটাতে আরম্ভ করলো।তক্ষুনি আবার উনার কন্ঠ কানে আসলো,
–জারাপাখি,,,
–আমি এখানে।
উনার কথার পিছে ঝটপট উত্তর করলাম।আমার শরীর কেমন যেন আসার হয়ে পড়েছে যখন থেকে উনার সেডাকটিভ কন্ঠ স্বর কানে এসেছে।জায়ান ভাই দু পা ভেতরে আসলো।অতপর পকেট থেকে মুঠো ফোনটা বের কর ফ্ল্যাশ ওয়ান করে আমার মুখে ধরলো।হঠাৎ চোখেমুখে আলো পড়ায় তৎক্ষনাৎ চোখমুখ খিচকে নিলাম।জায়ান ভাই আমার এমন বিধস্ত চেহারার দিকে তাকাতেই থমকে গেলো।আমার সারামুখে বাবরি চুল লেপ্টে আছে। চোখের জল নাকের জলে মিশে একাকার। উনি এক হাতে ফোন ধরে আরেক হাতে আমার মুখের উপর পরে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে উদ্বীগ্ন হয়ে বললো,
–জারা কি হয়েছে পাখি?এভাবে কেঁদেছিস কেন?তোকে কে কি বলেছে আমাকে একবার বল জান?
আমি হেঁচকি তুলতে তুলতে বললাম,
–আ আপনি এত দেরি করে কেন এসেছেন জায়ান ভাই। আপনি কি আমার উপর কোনো কারণে রাগ করে আছেন?থাকলে বলেন না প্লিজ। আমি আর ঐরকম কিছু করবো না।
হেঁচকির তোরে আমার ছোট্ট বুক সমান তালে উঠানামা করছে।আমার কান্না মিশ্রিত কন্ঠ স্বর শুনে উনি আমার দিকে অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।উনাকে কাছে পেয়ে আমার কান্নাগুলো যেন আর থামছে না।এদিকে আমার গালে রাখা উনার হাতটা তখনই থেমে গেছে। জায়ান ভাই আমার দিকে পলকহীন তাকিয়ে থেকে ভাবনায় ডুব দিলেন,,,,,,,
তখন জায়ান ভাই সবে HSC বোর্ড পরীক্ষা দিয়েছে।এখনো রেজাল্ট আসেনি।তবে সকলের ধারণা ছিলো এবারও পুরো বাংলাদেশে ফাস্ট হবেন।কেননা এর আগের বোর্ড পরীক্ষা গুলোতেও তিনিই প্রথম স্থান দখল করে নিয়েছিলো।আমার আব্বুর সবচেয়ে পছন্দের ছাত্র ছিল জায়ান ভাই। বড় আব্বু আমার আব্বু সবসময় উনাকে নিয়ে গর্ববোধ করেন।দিনটি ছিলো ঈদের দিন।তখন জায়ান ভাইয়ের বয়স আঠারো আর আমার সাত।আর এই সাত বছরের বাচ্চাটাকে যে একবার দেখেছে সেই হুরপরীর সাথে তুলনা করেছে।
সেদিন আমাদের বাড়ির সব পুরুষ সহ ছোট্ট জিয়াদও ঈদগাহ মাঠ পড়তে গিয়েছিলো।আমি নতুন জামা পড়ে কবিতা আপুর উড়নার এক কোণা ধরে ধরে ঘুরছি।তখন আপুর কোলে এক বছরের জুই।আম্মু বড় আম্মু রান্না ঘরে। ভোর থেকে রান্নাবান্না শুরু করেছে।
কিছুক্ষণ পর সকলেই নামাজ পড়ে পিরে আসে।সকলের পড়নেই পাঞ্জাবি।আমি দৌড়ে জায়ান ভাইয়ের কোলে উঠে পরি।তারপর এটা ওটা বাইনা ধরতে শুরু করি।আমার কথা শুনে আব্বু, বড় আব্বু জিতু ভাই, জায়ান ভাই এমনকি ছয় বছরের জিয়াদও খিলখিল করে হাসিতে ফেটে পড়ছে।এদিকে কবিতা আপু ছোট্ট জুইকে আম্মুর কোলে দিয়ে দৌড়ে আবার ডাইনিং রুমে আসে।অতঃপর সোফায় বসে থাকা বড় আব্বু থেকে শুরু করে জায়ান ভাইকেও সালাম করছে।এটা দেখে ছোট্ট আমিও বড় আব্বু থেকে শুরু করে সালাম করি।আমার সালাম করা মানে সকলের পা ছুঁইয়ে খিলখিল করে হাসা।উনারা আমাদের সালামিও দিচ্ছে।এদিকে আমি যখন জিতু ভাইয়ের পা ছুঁইয়ে সালাম করছি তখন কবিতা আপুর জায়ান ভাই কে সালাম করা শেষ। তিনি কবিতা আপুকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে উঠে চলে গেলেন।এদিকে আমি যখন উনাকে সালাম করতে যাই তখন দেখি উনি সোজা সিঁড়ি দিয়ে উঠে উপরে চলে যেতে থাকেন।পিছন থেকে আমি চেচিয়ে ডাকছি,,
— জান ভাই আমাকে টাকা দিয়ে যাও,ওওও জান ভাই,,,,
কিন্তু তিনি আমার ডাক শুনলেন না।আমিও কম যাই না।উনার পিছুপিছু উনার রুমে চলে যায়।গিয়ে দেখি উনি পাঞ্জাবি খুলছেন।আমি দৌঁড়ে এসে উনার দুপা জড়িয়ে ধরলাম।তখন আমার উচ্চতা উনার হাঁটুর কিছুটা নিচ অব্দি। আমি আদুরে কন্ঠে বললাম,
–জান ভাই তুমি আমাকে টাকা না দিয়ে চলে আসলে কেন?
তিনি আমাকে কোলে তুলে নিলেন।তারপর মিষ্টি হেসে বললেন,
–টাকা দিয়ে আমার পাখি কি করবে?
–একটা গিটার কিনবে।
আমার কথা শুনে তিনি হাসলেন। তারপর বললেন,,
–গিটার দিয়ে কি করবে হুম?
আমি খিলখিল করে হেসে দিলাম।তারপর উনার গলা জড়িয়ে ধরে বললাম,
–তোমাকে গান সোনাবো,,
–ও তাই নাকি?তো পাখি আমায় কি গান শুনাবে?
আমি আবারো খিলখিল করে হেসে দিলাম।তারপর উনার গলা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, উনার ঘারে মুখ লুকিয়ে নিলাম।তারপর গানের দুটো কলি শুনালাম,
❝তোমার আমার প্রেম এক জনমের নয়
হাজার বছর আগেও বুঝি ছিলো পরিচয়
আমার এমন মনে হয়___❞
এইটুকু গেয়েই লজ্জায় উনার ঘারে আরও শক্ত করে মুখ ডুবালাম।উনি ঠোঁটে ঠোঁট চেপে মুচকি হেসে আামর পিটে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,
–এত সুন্দর গান আমার জারাপাখিকে কে শিখালো?
আমি আহ্লাদি কন্ঠে বললাম,”শিখায় নি তো কেউ। আমি কবিতা আপুর থেকে শুনে শিখেছি। ”
উনি আমাকে বিছানার উপর বসালো।অতঃপর আমার কপালে চুমু খেয়ে বললো,
–ঠিক আছে আমার জারাপাখিকে একটা গিটার কিনে দিবো।
–একটা না দুইটা দিবে।
আমি আমার হাতের দুই আঙ্গুল দেখিয়ে বললাম।উনি আমার কপালে আরেকটা শব্দ করে চুমু খেলো।অতঃপর বললো,
–শুধু দুটো কেন, আমি আমার পাখিকে হাজারটা কিনে দিতে পারি।তবে,,,
–তবে।তবে কিতা?
–আমার বউ হবি?
জায়ান ভাইয়ের স্পষ্ট উত্তর। আমি আবার খিলখিল করে হাসতে আরম্ভ করলাম।উনিও হাসলেন।তারপর কাভার্ড থেকে একটা শপিং ব্যাগ নিয়ে আসলো।সেখান থেকে একটা টকটকে লাল বেনারসি বের করে আমার মাথায় জড়িয়ে দিলো।সাথে দুটো সোনার ছোট্ট ছোট্ট বালাও আমার হাতে পড়িয়ে দিলো।অতঃপর আমার দুটো চোখের পাতায় শব্দ করে চুমু খেয়ে বললো,
–জারা আমি তোকে সারাজীবন আমার বউ রুপে দেখতে চাই।তুই জানিস, আমি দিনেদিনে কন্ট্রোললেস হয়ে পড়ছি?তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যা জান।আর আমি তোকে আমার করে নিবো।তুই শুধু একবার আমার হয়ে যা,ট্রাস্ট মি পৃথিবীর সব সুখ তোর হবে।হবি আমার?
সাত বছরের ছোট্ট আমি কিছু বুঝলাম কি বুঝলাম না,তবে খিলখিল করে হাসিতে ফেটে পড়লাম।জায়ান ভাই আমার দিকে অপলকে তাকিয়ে থেকে বারবার ঢুক গিললো।তিনি আমার মন ভুলানো হাসিতে ডুব দিয়ে নিজের অজান্তেই বলতে লাগলেন উনার নিষিদ্ধ সব অনুভূতির কথা ,
–এইটুকু তুই কিভাবে আমাকে সামলাবি পাখি।আমার জন্য একটু কষ্ট করে তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যা না।তোকে দেখলে নিজেকে সামলানো বড্ড কঠিন হয়ে যায় পাখি।
জায়ান ভাই আবেগের বসে আরও অনেক নিষিদ্ধ অনুভূতিগুলো ছোট্ট আমাকে শোনায়।যদিও আমি কিছুই বুঝিনি।তবে দরজার সামনে দাড়িয়ে থাকা বড় আব্বু সব শুনেছে।কিন্তু জায়ান ভাইয়ের শেষ কথাগুলো না শুনেই স্থান ত্যাগ করেন।আর সেদিনি হয় আমাদের শেষ দেখা।সেদিন জায়ান ভাই বড় আব্বুর পায়ে ধরে উম্মাদের মতো কেঁদেছিলো যাতে তার পাখির থেকে তাকে আলাদা না করে।কিন্তু বড় আব্বু শুনেনি।উনার মনে আতংক ধরে যায় যদি ভাইয়ে ভাইয়ে সব সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়।
এটা তিনি কিছুতেই সইতে পারবেন না।বড় আব্বু সেদিন জায়ান ভাই কে কথা দেয় উনি প্রতিষ্ঠিত হয়ে আমার আব্বুকে প্রমাণ করে দিতে যে তিনি আমাকে সুখি রাখতে পারবেন।জায়ান ভাই মেনে নেয় বড় আব্বুর কথা। তিনিও বড় আব্বু কে বলেন,” আমি প্রতিষ্ঠিত হয়ে ফিরে আসা অব্দি আমার পাখির খেয়াল রাখবে।” আর এই সম্পূর্ণ বিষয়টা বড় আব্বু আর জিতু ভাইয়া ছাড়া আর কেউ জানতো না।
সেই ঈদের দিনই শেখ বাড়িতে কান্নার রুল পড়ে।ছোট্ট আমিও অনেক কেঁদে কুটে ভাসিয়েছি।জায়ান ভাইয়ের দু পা আঁকড়ে ধরে বলেছিলাম যেতে দিব না বলে। তিনি বলেন জাবেন না।ছোট আমি কান্না করায় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি নিশ্চিন্তে।এদিকে রাত তিনটার ফ্ল্যাইটে জায়ান ভাই দেশ ত্যাগ করেন বুকে এক পাহাড় সমান যন্ত্রণা নিয়ে।আর সেই বুকের সবটা জোরে ছিল জারাপাখির থেকে দূরে সরে যাওয়ার যন্ত্রণা।
–আপনি আমার সাথে আর এমন করবেন না জায়ান ভাই। আমি আপনার দূরত্ব সহ্য করতে পারি না।আপনি আমার থেকে দূরে থাকলে মনে হয় আমি সত্যিই মরে যা,,,,,
আমার শেষ বাক্য উনার কর্ণধার হতেই ঘোর থেকে বেরিয়ে এসে,আমার মুখে হাত রেখে চুপ করিয়ে দিলো।আমার টলমল চোখের সাথে উনার ব্যথাতুর চোখের মিলন ঘটলো ক্ষীণকাল।
–এমন কথা কখনো বলবি না পাখি।তোর কিছু হলে আমি কিভাবে বাঁচব। গত দশটা বছর তোকে একবার কাছ থেকে দেখার তৃষ্ণায় আমার হৃদয় খা খা করেছে প্রতিনিয়ত।তোকে একটা বার ছুঁয়ার জন্য হৃদয় তোলপাড় হয়েছে ক্ষনে ক্ষনে।এই দশ বছরের তোকে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এই দুদিনে কিভাবে মিঠবে জান?তাই তো একটু দূরত্ব রেখে তোকে অনুভব করছি,এতেই যেন হৃদয়ে জলোচ্ছ্বাস বইছে পাখি।তাহলে তোকে ছুঁইয়ে দিলে আমার কি অবস্থা হবে ভাবতে পারছিস?
উনার কথাগুলো শুনে আমার চোখদুটো আরও জলে টইটম্বুর হলো।উনি প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করে আমার চোখদুটো মুছে দিলে সাথে নাকও।তারপর বললো,
–এভাবে আর কোনোদিন কাঁদবি না।তোর কান্না আমি সহ্য করতে পারি না।
আমি কান্না থামানোর চেষ্টা করে হেঁচকি তুলতে তুলতে বললাম,
–আপনি কথা দিন আর আমার থেকে দূরে দূরে থাকবেন না।
আমার কথা শুনে উনি মৃদু হাসলেন।অতঃপর আমার গালে হাত রেখে বললো,
–কথা দিলাম।
বাস আমি সব ভয়, দ্বিধা -জড়তা ভুলে উনাকে জড়িয়ে ধরলাম। আজ উনিও আমাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলেন।আমার মাথায় থুতনি ঠেকিয়ে শান্তিতে চোখ বুজলেন।উনার হৃদয়ের কোথাও বেজে উঠছে গানের দুটো লাইন,
❝ঠিক এমন এভাবে, তুই থেকে যা স্বভাবে
আমি বুঝেছি ক্ষতি নেই, আর তুই ছাড়া গতি নেই
ছুঁয়ে দে আঙুল ফুঁটে যাবে ফুল, ভিজে যাবে গা
কথা দেয়া থাক গেলে যাবি চোখের বাইরে না,,,,,,,❞
__বর্তমান _____
ফুপিয়ে কান্নার তোরে আমার ন*গ্ন পিট কম্পিত হচ্ছে। ইফান পেছন থেকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে।তার মুখ আমার ঘারে ডুবানো।আমার মৃদু কম্পিত দেহ আর ফুপিয়ে কান্নার আওয়াজে আচমকা চোখ মেলে তাকায়।তারপর আমার মুখের দিকে ঝুঁকতেই চোখে পড়লো আমার গাল বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে বালিসের সাথে মিশে যাচ্ছে।মূহুর্তেই ইফানের মধ্যে একটা অস্থিরতা উদয় হলো।সে আমার এলোমেলো চুলগুলো কানে গুঁজে সারা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মৃদু কন্ঠে ডাকতে লাগলো,
–বুলবুলি কি হয়েছে জান?
বেশ কয়েকবার ডাকার পর আমার কানে পৌঁছায়।আমি তৎক্ষনাৎ চোখ খোলে ওকে আমার থেকে সরিয়ে দিই।আমি হাতের সাহায্যে চোখমুখ মুছে উঠতে নিলেই সে তার হাতের বাঁধনে আটকে দিলো।আমি ওর দিকে না তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বললাম,
–ছাড়ুন।
–কাঁদছ কেন?
ইফানের পাল্টা প্রশ্নে ওর দিকে তাকালাম।অতঃপর তাচ্ছিল্য করে বললাম,
–মনের সুখে।
–সেই সুখের কারণটা কি আমি, নাকি অন্য কেউ?
আমি উত্তর দিতে প্রস্তত হলাম। তবে আমাকে বলতে না দিয়ে ইফান নিজেই বলতে লাগলো,
–তোর সুখের কারণ টা যদি আমি থাকি তাহলে কান্না এলাউড।আর যদি অন্য কেউ হয় তাহলে ভালো হবে না জান।
আমি স্বামী নামক জা*নোয়ার লোকটাকে অনুভূতিহীন নয়নে ক্ষীণকাল দেখলাম।অতঃপর কোনো বাক্য বিনিময় না করে ন*গ্ন বুকে চাদরটা টেনে ধরে ফ্লোর থেকে পড়ে থাকা পেটিকোট টা তুলে নিলাম।তারপর সেটা পড়ে বুক পর্যন্ত তুলে নিলাম।মাথার এলোমেলো থাকা চুল কানে গুজে দিতে দিতে ওয়াশরুমের দিকে এগোতে নিলে পিছন থেকে ইফান ডেকে উঠলো,
–আসার সময় নিজের ড্রেস নিয়ে আসি নি।সারারাত ফোনের ফ্ল্যাশ ওয়ান থাকায় ফোনটাও অফ হয়ে গেছে।পড়ার জন্য কিছু ব্যবস্তা কর।পরে ইন্দুর কে দিয়ে আনিয়ে নিবো।
আমি পিছন ফিরে ইফানের দিকে না তাকিয়ে বেড সাইট থেকে ফোনটা তুলে নিলাম।অতঃপর জুইকে একটা টেক্সট করে ওয়াশরুমে চলে গেলাম।আমার যাওয়ার পানে বেশ কিছুক্ষণ নিস্প্রভ তাকিয়ে অতঃপর বালিশে মুখ করে উপুড় হয়ে শুয়ে রইলো।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই ইফানের চোখ আবার লেগে গেলো।তক্ষুনি দরজায় কেউ নক করলো।প্রথম বারেরটা ইফানের কান অব্ধি পৌঁছালো না।অতঃপর পরপর আরও দুবার দরজায় নক হওয়ায় বিরক্তি নিয়ে ইফান সেদিকে তাকালো।আবার ঘুরে ওয়াশরুমের দরজায় তাকিয়ে দেখলো আমি বের হচ্ছি কি না।তক্ষুনি আবার নক হলো।ইফান দুনিয়ার সকল বিরক্তি নিয়ে উঠলো অতঃপর নগ্ন দেহে নিচে একটা টাউয়াল জড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো।ইফান চোখ কচলাতে কচলাতে দরজা খুলে দু কদম ভেতরের দিকে এসে দাঁড়ালো। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জুই ইফান কে এই অবস্থায় দেখে বেশ অনেকটা বিব্রত হলো।অতঃপর চোখ জমিনে রেখে মিনমিন করে ডাকলো,
–ভাইয়া আপনার পোষাক।
রিনরিন মেয়েলি কন্ঠ স্বর শুনে ইফানের চোখ কচলানো থেমে গেলো।ইফান প্রথমেই জুইয়ের পা থেকে আস্তে আস্তে জুইয়ের মুখের দিকে তাকালো।মেয়েটা একটা কালোর মধ্যে শেওলা রঙের থ্রি পিস পড়ে আছে।তবে মাথায় সুন্দর করে উড়না জড়িয়ে শরীর ভালো করে ঢেকে এসেছে।জুইকে আর আমাকে এক সাথে দেখলে যে কেউ বলবে জমজ বোন। যদিও চেহারা আর গায়ের রঙে কিছুটা তারতম্য রয়েছে। আমি টকটকে ফর্সা গায়ের রং পেয়েছি আমার ফুপির মতো। যদিও আমি ফুপিকে দেখিনি। তবে আব্বু, বড় আব্বু সহ সবাই বলে। জুই আম্মুর মতো ফর্সা গায়ের রং পেয়েছে। এক্কেবারে সাদা সুন্দর না হলেও বেশ অসাধারণ লাগে।
–ভাইয়া আপনার পোষাক,,
জুইয়ের কন্ঠ শুনে কিছু একটা ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসলো ইফান। জুইয়ের বাড়িয়ে দেওয়া হাত আছে একটা গামছা, সেন্ডো গেঞ্জি আর একটা লুঙ্গি। তবে ইফান সেসব লক্ষ করলো না।সে বাড়িয়ে দেওয়া হাত থেকে কাপড়গুলো নিয়ে নিলো।তক্ষুনি জুইয়ের কেনি আঙ্গুলের সাথে ইফানের এক আঙ্গুল হালকা টাচ লেগে যায়। তৎক্ষনাৎ জুইয়ের শরীর মৃদু কেঁপে উঠল। সে ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে যায়।অতঃপর আর সময় ব্যায় না করে স্থান ত্যাগ করে।জুইয়ের প্রস্থানের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইফান। কপাল কুঞ্চিত করে কিছু একটা আনমনে ভাবতে লাগল। জুই চোখের আড়াল হওয়ার সাথে সাথে বিরবির করলে,
জাহানারা পর্ব ৩৬
–এত তাড়াতাড়ি বেড়ে গেলো!!!
অতঃপর ইফান দরজা লাগিয়ে পিছনে ফিরতেই চোখ আটকালো ওয়াশরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আমার উপর।আমার ভেজা চুল বেয়ে পানি পড়ছে টপটপ করে।পড়নে পেটিকোট আর ব্লাউজ।তার উপর বুকে গামছা টেনে রাখা।আমি ইফানের দিকে অনুভূতিহীন ভাবে তাকিয়ে আছি।আমার চোখে নেই কোনো দুঃখ-কষ্ট, রাগে-অভিমান আর না কোনো কিছু।
