Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ৬৫

জাহানারা পর্ব ৬৫

জাহানারা পর্ব ৬৫
জান্নাত মুন

সারাদিনের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ধরিত্রীর বুকে ঝুপ করে নেমে এলো সন্ধ্যা। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ল হিমেল হাওয়ার দাপট। এক চিলতে উষ্ণ পশমি আবরণে দেহ না জড়ালে এই হাড়কাঁপানো শীতে টিকে থাকাই দায়। অথচ এই নিদারুণ বৈরিতার মাঝেই একদল সহায়-সম্বলহীন মানুষ লড়ছে কেবল বেঁচে থাকার তাগিদে। চোখের সামনে জরাজীর্ণ পোশাকে এক বৃদ্ধ রিকশাচালককে দেখে বুক ছিঁড়ে দীর্ঘ শ্বাস বেরিয়ে এলো।
আমাদের সিআইডি গাড়িটি বর্তমানে দিয়াবাড়ি লেক সংলগ্ন একটি জনাকীর্ণ এলাকায় অবস্থান করছে। এলাকাটিতে সাধারণ মানুষের ব্যাপক আনাগোনা রয়েছে এবং বিশেষ করে সন্ধ্যায় পর্যটকদের সমাগম কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
–“ম্যাম আপনি কি শিউর, এত জনসমাগম পূর্ণ স্থানে ওরা কিছু করার সাহস দেখাবে?”
অফিসার অরনার কথায় মনযোগ ক্ষুন্ন হয়। এতক্ষণ গাড়ির ভেতর থেকে উইন্ডো দিয়ে বাইরের দিকটা লক্ষ করছিলাম। এবার সোজা হয়ে বসে হালকা ঠোঁট বাকিয়ে বললাম,

–“সেটা তো কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখতে পাবে।”
–“আরে এটা কি?”
হঠাৎ হিমনের কথায় ল্যাপটপ স্কিনে নজর রাখলাম।সেখানে আসেপাশের সন্দেহ প্রবল স্থানগুলোর সিসি টিভি শো করছে। একটা অল্পবয়সী মেয়ে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছে লেকের দিকে। তবে যেদিকে মানুষের সমাগম সেদিকে নয়; বরং উল্টো দিকে। মেয়েটা ভীষণ পরিপাটি হয়ে সেজেগুজে আছে। ভুল না হলে এখানের কোনো এক পর্যটক। তবে মেয়েটাকে বেশ অস্বাভাবিক ঠেকছে। মনে হচ্ছে তার দিনদুনিয়ার প্রতি কোনো হেলদোল নেই। মেয়েটার নিষ্প্রভ চাহনি বলে দিচ্ছে ঘাপলা আছে।

–“এক সেকেন্ড।”
আমি আচমকা বলে উঠলাম। মূহুর্তেই সকলের দৃষ্টি আমার দিকে ঘুরলো। আমি সেসবের তোয়াক্কা না করে একটু ঝুঁকে পড়লাম ল্যাপটপের দিকে,
–“এই জায়গাটা জুম কর, কুইক।”
আমার নির্দেশনা অনুযায়ী অফিসার কবির ঝটপট মেয়েটার সামনের এত এত মানুষের মধ্যে ঐ অংশটাকে জুম করল। তৎক্ষনাৎ অবিশ্বাস্য স্বরে জিতু ভাইয়া বলে উঠলো,
–“ও মাই গড, ইট’স আ ট্রেপ।”
সকলের দৃষ্টির কেন্দ্র বিন্দু ভীরের মধ্যে একটা কালো হুডি পড়া লোক। অফিসার আবির হতাশার শ্বাস ছেড়ে বলল,”হিপনোটিস থেরাপিউটিক।”

–“ইয়েস হিপনোটিস থেরাপিউটিক।”
আমি বাঁকা হেসে বললাম। হুডি পড়া লোকের এক হাতে কিছুটা ঝুলে আছে পেন্ডুলাম। পেন্ডুলাম মূলত এমন একটি বস্তু যা কোনো একটি নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে ঝুলে থাকে এবং মুক্তভাবে ডানে-বামে বা সামনে-পেছনে দুলতে পারে।হিপনোটিসের ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত পরিচিত সরঞ্জাম। আর কেউ যদি একনাগাড়ে দুলতে থাকা এই বস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে চোখের পেশি ক্লান্ত হয়ে যায় এবং মস্তিষ্ক কিছুটা শিথিল বা রিলাক্সড হতে শুরু করে। এই অবস্থাটিতেই উক্ত ব্যক্তি হিপনোটিস হয়। ফলে হিপনোটিস্ট সেই ব্যক্তিকে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
–“আরে স্যার এদিকটায় দেখেন।”
–“ও মাই গড!!”

অফিসার কণার কথার পরেই অবিশ্বাস্য স্বরে আওড়াল অফিসার কবির। আরেকটা ফুটেজেও দেখা যাচ্ছে একজন মেয়ে এবং একজন ছেলে মেট্রোরেল থেকে নেমে লেকের দিকে হাঁটা ধরেছে। আশ্চর্য জনক বিষয় হলো সেই ছেলেটাও হুডি পড়া এবং হুড দিয়ে মাথা ঢাকা, মুখেও কালো মাস্ক। কবির জুম করতেই লক্ষ করা যাচ্ছে ছেলেটা কিছু বলছে মেয়েটাকে।ফলে ছেলেটার চোখে হাসির একটা রেশ দেখা যাচ্ছে। অদ্ভুত বিষয় মেয়েটা নির্লিপ্ত; ছেলেটা যেদিকে যাচ্ছে মেয়েটাও তাকে অনুসরণ করছে।
–“স্যার মেয়েটাকে নিয়ে তো অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। এই মেয়েটাকেও হয় তো হিপনোটিস করেছে।”
–“হতে পারে। বাট আমার মনে হচ্ছে ম্যানিপুলেট হয়েছে। কারণ মেয়েটা চুপ থাকলেও ওর চেহারায় একটা ভালো লাগা বিষয় কাজ করছে। ভুল না হলে লোকটা কথার জালে কারসাজি করেছে। ইট’স কল ম্যানিপুলেশন।”
অফিসার অরনার কথার পিছে বললাম। সকলে ভালো করে ফুটেজগুলো চেক করতেই দেখতে পেল আরও কয়েকটি জায়গায় সেইম কাজ হচ্ছে।

–“জাহান কুইকলি ওদের ধরতে হবে। নাহলে আমাদের ধরা ছুঁয়ার বাইরে বেরিয়ে যাবে। এমনিতেই ওরা স্থান পরিবর্তন করছে বারবার।”
জিতু ভাইয়ার কথায় সকলে গাড়ি থেকে নেমে সবদিকে ছড়িয়ে পড়লাম। আমি একজনকে ফলো করতে লাগলাম। এটা সেই ছেলেটা যে হিপনোটিস থেরাপিউটিক ব্যবহার করে মেয়েটাকে চালনা করছে। আমি পিছনে অতি সতর্কতার সাথে আসতে আসতে আমার কোমরে গুঁজে রাখা রিভলবার তাড়াতাড়ি বের করে লোড করে নিলাম। অতঃপর ছেলেটার দিকে রিভলবার নিশানা করে এগিয়ে আসতে লাগালাম। ছেলেটা মেয়েটাকে নিয়ে অনেকটা দূরে চলে এসেছে। আপাতত আসেপাশে কাকপক্ষীও নেই। লোকালয়ের বাইরে চলে আসায় আসেপাশটা অন্ধকারে ডুবে আছে। এই তো সেই জঙ্গলটা দেখা যাচ্ছে, যেখানে সাধারণ জনগণ ভয়ে আসে না। জঙ্গলের ভেতরে হয় তো কেউ আছে, ঐ তো একটু লাইটের হদিশ মিলছে। আমার ভাবনার মাঝেই হঠাৎই সব নিস্তব্ধতা ভেদ করে লোকটার ফোনের কর্কশ আওয়াজে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। আর তীব্র শব্দে মেয়েটার হুঁশ ফিরে। অন্ধকার আর পাশে অপরিচিত কারো উপস্থিতি বুঝতে পেরেই মেয়েটা আতর্কিত হয়ে উঠে,

–“আআমি কোথায়? কে আপনি? কে আপনি? আমি কোথায়?”
কাজের মধ্যে ফোন চলে আসায় লোকটা বিরক্তিতে ফুঁসে ওঠে। ফোনটা সবে রিসিভ করতেই মেয়েটার চেচামেচি লোকটার রাগের পাল্লা আরও বাড়িয়ে দিল। মেয়েটির মুখ চেপে ধরতে যাবে তার আগেই ফোনের ওপাশের কথায় লোকটার ক্রুদ্ধ চেহারায় আতংক ফুটে উঠল। সেভাবেই আগপাছ না ভেবে উচ্চারণ করে উঠলো,
–“কি বলছিস!! সিআইডি পিছু নিয়েছে?”

লোকটার কথা আমার কানে আসতেই বুঝে গেলাম ওরা সতর্ক হয়ে গেছে। হয় তো বাকি অফিসাররা ওদের ধরে ফেলেছে। এদিকে মেয়েটা চিৎকার চেচামেচি শুরু করে দিয়েছে। আমি সময় নষ্ট না করে লোকটার দিকে রিভলবার তাক করে ছুটে আসতে লাগলাম। পিছনে কাউকে আসতে দেখেই ছেলেটা পালাতে লাগল। আমি ছেলেটার পায়ে শুট করলাম। কিন্তু অন্ধকার হওয়ায় নিশানা ফেল হয়।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেখানে জিতু ভাইয়া আর অফিসার অরনা হাজির হয়। মেয়েটা ভয়ে চিৎকার চেচামেচি করছে। অরনা মেয়েটাকে আশ্বাস দিতেই মেয়েটা শান্ত হয়। জিতু ভাইয়া তৎক্ষনাৎ শুধায়,
–“তোমাকে বাঁচাতে আমাদের আরেকজন অফিসার এসেছিল। সে এখন কোথায়?”
–“ঐ লোকটার পিছু নিয়ে এদিকে গেছে।”
জিতু ভাইয়া আর এক মূহুর্ত দেরী করল না। অরনা মেয়েটাকে সামলে তার সাথে নিয়ে আসছে। জিতু ভাইয়া দৌড়ে এদিকে আসতেই দেখল লোকটার সাথে আমি ফাইট করছি। অতঃপর জিতু ভাইয়া আসার আগেই লোকটার চোয়ালে সজোরে এক থাপ্পড় বসাতেই লোকটা মাটিতে আঁচড়ে পড়ল।

সিআইডি অফিস।।
কিছুক্ষণ আগে লোকটাকে অফিসে ধরে আনা হয়েছে। বাকিরা সিআইডির উপস্থিতি টের পেয়ে আগেই পালিয়েছে। আমার আর জিতু ভাইয়ার হাতে মার খেয়ে লোকটার অবস্থা বেগতিক। চোখমুখ কালচে লাল হয়ে ফুলে উঠেছে। এত মার খাওয়ার পরেও স্বীকার করছে না তাদের পিছনে কার হাত। এখন পর্যন্ত লোকটার মুখ থেকে একটা কথায় বের হচ্ছে, “আমি কিছু জানি না।”
আমরা সকলে ইন্টারোগেশন সেলে অবস্থান করছি। লোকটা চেয়ারে বাঁধা। জিতু ভাইয়া লোকটাকে আরেকটা থাপ্পড় মেরে ধমকে উঠলো,

–“ঐ হা’রা’মির বাচ্চা মুখ খোল। কাদের হয়ে কাজ করছিস? কবে থেকে এভাবে মেয়ে তুলে নেওয়ার ধান্দা চালাচ্ছিস বলছিস না কেন? কে আছে তোদের উপরে?”
–“জানি না।”
লোকটা না করতে না করতেই আরেকটা চাপাঘাত পড়ল। জিতু ভাইয়া লোকটার চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরে আবারও হুংকার ছুড়ল,
–“এবার যদি মুখ না খুলিশ তাহলে তর কপালে দুঃখ আছে রে। দেশের এত বড় নারী পাচার চক্রের সাথে যুক্ত, তাও বলিস কিছু জানিস না। উহু হজম হচ্ছে না। তোদের মাথার উপর যে আছে সে নিশ্চয়ই সাধারণ কেউ না। বল সত্যি কথা বল।”
লোকটা কিছুতেই বলতে চাইছে না। সিআইডি অফিসার আবির আরও দু ঘা দিতেই লোকটা বলে উঠলো,

–“আর মারবেন না, আর মারবেন না।”
–“তাহলে বল, কে তোদের বস?”
জিতু ভাইয়ার প্রশ্নে লোকটা কাঁপছে। এত মার খাওয়ার পর লোকটার দেহ নেতিয়ে পড়েছে। অফিসার হিমন নাক ছিটকে বলল,
–“আরে শা’লা মার খেতে না চাইলে এখনই বলে দে।”
–“ওরা খুব ভয়ংকর। যদি জানতে পারে আমি আপনাদের বলে দিয়েছি তাহলে আমার পরিবারের ক্ষতি করবে।”
–“অন্যায় করার আগে মনে ছিল না এই কথা? এখন ভালোই ভালোই সব বল।”
অফিসার কবিরের কথায় লোকটা ঢোক গিলল। জিতু ভাইয়া চেয়ারে হাত ধরে লোকটার উপর কিছুটা ঝুঁকে দাঁতে দাঁত পিষে বললো,

–“বল কে তোদের বস? কার কথায় তোরা এত বড় অন্যায় করিস?”
লোকটার থেকে কোনো উত্তর আসলো না। এতক্ষণ আমি চুপ থাকলেও এখন আর পারছি না। তাই ঠাস করে লোকটার গালে একটা থাপ্পড় বসালাম। তক্ষুনি লোকটরা মুখ থেকে রক্ত বেরিয়ে আসল। আরেকটা দেওয়ার জন্য হাত উঁচাতেই লোকটা কেঁদে বলে উঠলো,
–“বলছি বলছি।”
–“কে তোদের বস?”
অফিসার আবির প্রশ্ন করল। লোকটা ভয়ে ভয়ে বলল,”ম ম..”
জিতু ভাইয়া দাঁত কটমট করে হাত উঁচিয়ে বলে উঠলো,
–“কি ম ম করছিস? দিব একটা?”
–“না না বলছি বলছি, মমন্ত্রী….”
–“মন্ত্রী ইকবাল চৌধুরী তাই তো?”
লোকটার মুখের কথা কেঁড়ে নিয়ে বলে উঠলাম। আমার বাক্যটা শুনা মাত্রই সকলে আমার দিকে অবাক চোখে তাকালো। সকলের এমন দৃষ্টি দেখে আমার ওষ্ঠপুটে বাঁকা হাসির রেশ উদয় হল।
এই সত্যিটা আমি আরও আগেই জেনে গেছি। তবে প্রমাণের জন্য এতদিন চুপ ছিলাম। মন্ত্রী ইকবাল চৌধুরী ভালো মানুষের আড়ালে কত বড় ক্রিমিনাল তা সকলের ধারণার বাহিরে। রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে বছরের পর বছর অবৈধ কালো টাকার পাহাড় গড়েছে।

–“আমাদের দেশের বাইরে বড় বড় মাফিয়াদের সাথে এই ব্যবসবা। আমরা মেয়ে জোগাড় করে ডিলারদের হাতে তুলে দেই। এর জন্য আমাদের মোটা অংকের টাকা দেয়। আর ইকবাল চৌধুরী বানিজ্য মন্ত্রী হওয়ায় খুব সহজেই ঝামেলা ছাড়া দেশের বাইরে চালান করা যায়। আর আমাদের ব্যবসার মোটা একটা টাকার অংশ জমা পড়ে মন্ত্রী সাহেবের কাছে।”
–“তাহলে তোরা দিয়াবাড়ি টার্গেট করিস কেন?”
লোকটার কথার পিছে আমি জিজ্ঞেস করলাম।লোকটা আবারও বলতে শুরু করলো,
–“এর সঠিক কারণটা আমি জানি না।তবে বেশ কিছু কারণ হলো এটা মন্ত্রী সাহেবের নিজের শহর। তাই কোনো ঝামেলা হলে সহজেই ধামাচাপা দিতে পারেন। তবে আমাদের লোকজন সারাদেশে ছড়িয়ে আছে। আরেকটা বিষয় হলো আমরা নদী সংযুক্ত অঞ্চলগুলোকে টার্গেট করি। দিয়াবাড়ির কাছে তুরাগ নদী আমাদের কাজের জন্য অন্যতম সহজ উপায়। এখান দিয়ে মালবাহী জাহাজের সাথে মেয়েদের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সাপ্লাই দিতে পারি খুব সহজেই।
ঢাকা বড় শহর হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মেয়েদের লোভ দেখিয়ে ঢাকায় নিয়ে আসি। তারপর চালান করে দেই। আমার কোনো দোষ নেই স্যার। আমাকে ছেড়ে দিন।”

–“হা’রামজাদা এত বড় অন্যায় করেও বলছিস তর কোনো দোষ নেই।”
ছেলেটার গালে জিতু ভাইয়ার হাতের আরেকটা থাপ্পড় পড়ল। অতঃপর অফিসার আবির লোকটাকে ধরে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে যেতে লাগল। আমি আর সময় নষ্ট করলাম না। এতক্ষণে রাত আটটা বেজে গেছে। এখন এখান থেকে চৌধুরী বাড়ি ফিরতে আরও অনেকটা সময় চলে যাবে। আপাতত এই বিষয়টা সিআইডিদের মধ্যে থাকবে। আমাদের আরও প্রমাণ জোগাড় করতে হবে। কারণ মন্ত্রী ইকবাল চৌধুরীর দল অনেক বড়। সাধারণ জনগণ তাকে দেবতুল্য মনে করে। তাই হঠাৎ করে শক্তপোক্ত প্রমাণ ছাড়া মাঠে নামা সবচেয়ে বোকামি।

নিজের অফিসিয়াল পোশাক চেইঞ্জ করে চৌধুরী বাড়ির উদ্দেশ্য অটো করে বেড়িয়ে পড়েছি। কদিন ধরে আলাল দুলাল সহ ইফানের লোকদের চোখে ফাঁকি দিয়ে নিজের ডিউটি করে বেড়াচ্ছি। চৌধুরী বাড়ির খুব কাছেই চলে এসেছি। আর দশ থেকে বারো মিনিট হয়তো লাগবে। আমি ক্লান্ত চেহারাটা শাড়ির আচল দিয়ে মুছে দিচ্ছি তখনই অটো থেমে পড়ে। আমি ক্লান্ত শ্বাস ছেড়ে শুধালাম,
–“এই যে ভাই গাড়ি থামালেন কেন?”
–“ওই মা/গীরে টেনে বের করে আন। শা/লি যাতে আজ বেঁচে ফিরতে না পারে।”
বাইরে থেকে কয়েকজন লোকের অশ্রাব্য কথোপকথন কানে আসতেই আমার কপাল কুঞ্চিত হলো। ড্রাইভার গাড়ি থেকে নামতেই লোকগুলো ড্রাইভারকে মারধর করতে নিলেই ড্রাইভার নিজের জনা বাঁচিয়ে দৌড়ে পালায়। অতঃপর আরেকটা লোকের গলা কানে আসল,
–“শা/লিকে টেনে বের কর।”

আদেশ মাফিক একটা লোক আমাকে অটো থেকে নামানোর জন্য দরজার কাছে আসতেই আমি শাড়ি হালকা উঁচিয়ে লোকটরা বুকে সপাটে লাথি বসালাম। লোকটা তৎক্ষনাৎ উল্টি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। অতঃপর আমি অটো থেকে নামতেই লোকগুলো আমার দিকে তেড়ে আসলো। আমি আমার দক্ষতা দিয়ে সবাই কে লাথি, ঘুষি দিচ্ছি। শাড়ি পড়ে থাকায় অবশ্য বেশ ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। আরেকটা ছেলে আমার দিকে ছু’রি নিয়ে তেড়ে আসতেই ছেলেটার হাতে লাথি মেরে ছু’রি ফেলে দিলাম। অতঃপর ছেলেটার চোয়ালে একসাথে কয়েকটা থাপ্পড় দিতেই, ছেলেটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। চারজন বলিষ্ঠ পুরুষের সাথে আমি একজন নারী লড়ছি এটা মুখের কথা না।
বেশ কয়েক মিনিটেই দুজনকে মাটিতে শুইয়ে দিলাম। এবার আরও দুজন আমার দিকে তেড়ে আসছে। আমি বুকে লাথি মেরে আরেকটা ছেলেকেও মাটিতে শুইয়ে দিলাম। অতঃপর অবশিষ্ট হা’রামির দিকে ঘুরবো তখনই দেখি ছেলেটা প্রবল বেগে আমার পেটে লাথি দেওয়ার জন্য উদ্ধত হয়েছে। ঘটনাটা এতটা ফাস্ট যে আমি কিছু করব তার কোনো শক্তি আমার দেহে পাচ্ছি না। আমি গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলাম,

–“নাহ্।”
কিন্তু কয়েক মূহুর্তেও নিজের দেহে কারও স্পর্শ কিংবা আঘাত অনুভব করতে না পেরে আলতো করে চোখ তুলে তাকাতেই আমি চমকে উঠলাম। কারণ লোকটা আমার পেটে লাথি মারার আগেই মীরা কোথা থেকে ঝড়ের বেগে এসে লোকটাকে লাথি মেরে ফেলে দেয় এবং মীরা পায়ের হাই হিল দিয়ে লোকটার মুখ পিষে যাচ্ছে। হাই হিল হওয়ায় লোকটার মুখে গর্ত হয়ে তরল গড়িয়ে পড়ছে।
এদিকে হঠাৎ পিছন থেকে আবার আমাকে কেউ আঘাত করবে বুঝতে পেরেই ঝড়ের বেগে পিছনে ফিরে হাত চালালাম। লোকটা মুখ ভর্তি রক্ত বমি করে উঠল। তবুও থামল না। আবার আমার দিকে তেড়ে আসতে নিলে মীরা আর আমি লোকটার বুকে একসাথে লাথি মারলাম। লোকটা নিচে পড়তেই আমি গলা টিপে ধরলাম। মীরাও লোকটার বুকে পা রেখে ঝুঁকে পড়ল।আমি ক্রুদ্ধ হয়ে দাঁতে দাঁত পিষে জিজ্ঞেস করলাম,

–“কে পাঠিয়েছে তোকে?”
–“বলবো না।”
লোকটার কথায় মীরা বুকে সজোরে লাথি মারতেই লোকটা গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলো। অতঃপর আমি লোকটার চোয়ালে থাপ্পড় মারতেই বাঁচার জন্য মুখ খুলল,
–“আপনাকে মারার জন্য আমাদেরকে নুলক চৌধুরী পাঠিয়েছে।”
বাক্যটা শেষ হতে না হাতেই মীরা লোকটার মাথায় শুট করে দিল। শুধু লোকটাকেই না, আমি কিছু বুঝার আগেই মাটিতে কাতরাতে থাকা বাকি ছেলেদের মাথায়ও শুট করে দিল। সাথে সাথে কয়েকজন কালো পোশাকধারী লোক সব লা’শ সহ সকল চিহ্ন মুছে দিল।

–“আশা করি আমাকে খুব ভালো করে চেন।”
আমার কথায় মীরা ঠোঁট বাঁকাল। সেদিন সিআইডি অফিসে সব ফাইল ঘাঁটতে গিয়ে আমার সম্পর্কেও জেনে যায় মীরা। এখন আমি মীরার গাড়িতে আছি। মীরা ড্রাইভিং করতে করতে হেয়ালি স্বরে বলল,
–“ইউ নো বেইব, প্রথম যখন বিগ ব্রো কে তোমার জন্য পাগলামি করতে দেখতাম, তখন মনে হতো কি আছে মেয়েটার মধ্যে? বাট এখন বুঝতে পারছি ইউ আর দ্যা জিনিয়াস।”
মীরা হো হো করে হেসে উঠলো। আমি দাঁতে দাঁত পিষে বললাম,”তুমি একজন সিআইডি অফিসারের সামনে চারজন কে নিজ হাতে শুট করেছ। এর শাস্তি কি…..”
আমার কথা শেষ হতে না হতেই মীরা চু চু শব্দ করে হেসে বলে উঠলো, “তুমি খুব ভালো করে জান আমরা মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল। যেখানে আমরা আমেরিকার ধরাছোঁয়ার বাইরে সেখানে দ্য ফা’কিং বিডি কি করবে।”
আমি চোখ বন্ধ করে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে শুধালাম,”আমার পিছনে কেন পড়ে আছ?”

–“তোমাকে সেইভ করতে।”
আমি ঠোঁট বাকিয়ে হাসলাম মীরার কথায়। অতঃপর চোয়াল শক্ত করে বললাম,”কে বলেছে আমাকে সেইভ করতে? আমি বলেছি?”
–“আমার বস বলেছে। আই হোপ ইউ নো হু মাই বস ইজ।”
আমি ফোঁস করে শ্বাস ফেলে সিটে মাথা হেলিয়ে দিলাম। বড্ড ক্লান্ত লাগছে। আমি চোখ বন্ধ করে নিলাম। অতঃপর মৃদু স্বরে মীরাকে শুধালাম,
–“তোমার বস কোথায়?”
মীরা ফ্রন্ট মিররে আমাকে দেখে ঠোঁট কামড়ে নিঃশব্দে হেসে বলল,”সে সর্বদা তোমার কাছেই থাকে, শুধু তুমিই ফিল করতে পার না।”

বাড়িতে আসার পর থেকেই পলি একদম চুপচাপ হয়ে গেছে। কাকিয়া রান্না করছে, পাশে পলি ও লতা তাকে সাহায্য করছে। কাকিয়া বেশ কয়েকবার পলিকে লক্ষ করে এবার বলেই ফেলল,
–“কি হয়েছে সোনা?”
পলি কিছু একটা ভাবনায় মত্ত ছিল। হঠাৎ কাকিয়ার কন্ঠ শুনে চমকে উঠে বলল,”কিছু বলছ?”
–“মন কোথায় তোমার?”
–“না মানে?”
–“শরীর খারাপ?”
–“ঐ একটু, তবে টেনশনের কিছু নেই। আসলে সারাদিন বাইরে ছিলাম তাই একটু…. ”
কাকিয়া এবার দুশ্চিন্তা মুক্ত হয়ে হেসে বলল,”ও এই কথা। আমি আরও ভাবলাম কি না কি হল। তো সারাদিন কি করলে তোমরা?”
–“আমি বলছি, আমি বলছি।”
লিভিং রুম থেকে ইতি বলে এদিকে দৌড়ে আসছে। নিজের ফোন বের করে সবগুলো ছবি দেখাতে দেখাতে বলল,”এই দেখ কাকিয়া আজ আমরা সবাই মিলে কত ঘুরেছিলাম।”
কাকিয়া পিকগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ বলে উঠলো,”কিরে মা, এই মেয়েটা কে?”

–“আমার ছোট বোন হুমাইরা শেখ জুই।”
আমার কন্ঠ শুনে সবাই আমার দিকে তাকালো। আমি খাবার প্লেট রাখতে এসেছি।কিছুক্ষণ আগে বাড়িতে আসলাম।ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতেই কাকিয়া খাবার বেড়ে দিয়েছে। আজ সারাদিন আমার অনেক পরিশ্রম হয়েছে। তারপরও কেন যেন খেতে ইচ্ছে হচ্ছিল না।মীরা সামনে বসে জোর করে খাইয়েছে।
আমাকে দেখে ফারিয়া দৌড়ে এসে আমার হাত থেকে প্লেট নিয়ে নিল। কাকিয়া হেসে বলল,
–“তাই নাকি মাশাআল্লাহ, তোমার বোন তো দেখছি তোমার মতোই সুন্দর।”
আমি মৃদু হাসলাম। ফারিয়া প্লেট রেখে এসে জিজ্ঞেস করল,”মেডাম আর কিছু লাগবে?”
আমি হালকা মাথা নেড়ে না করলাম।তারপর কাকিয়ার দিকে তাকালাম। কাকিয়া আসেপাশে একবার চোখ বুলিয়ে আমাকে ইশারা করল পরে। আমি আর দাঁড়ালাম না, রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম।
যাওয়ার সময় শুনতে পারছি কাকিয়াদের কথা। কাকিয়া ইতিকে বলছে ছবিগুলো তার ফোনে দিতে। জুইকে তার বেশ পছন্দ হয়েছে। পিক দিয়ে কি করবে পলি জিজ্ঞেস করলে, কাকিয়া হেসে দিল। তারপর বাকিরাও কি সব কথাবার্তা বলছে আর হাসছে।

লিভিং রুমে আপাতত কেউ নেই। বাসায় এসে শুনলাম আমি আসার কিছুক্ষণ আগে অফিস থেকে দুই বোন বাসায় ফেরেছে। তারপর আমি নিচে নেমেও তাদের দেখি নি। আজ নুলক চৌধুরী আমার সাথে যা করল তার তো জবাবদিহি করতে হবে ঐ মহিলাকে। কিন্তু এখন কিছু বলতেও পারব না। কারণ মীরা আপাতত চুপ থাকতে বলল। মীরার যুক্তিগুলো শুনে মনে হলো এখন চুপ থাকায় ভালো।
আমি শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই পিছন থেকে মেয়েলি কন্ঠ ভেসে আসে,
–“বাড়ির বড় বউ হয়ে একা একা সারাদিন বাড়ির বাইরে থাক ভালো কথা,কিন্তু রাতেও একা গার্ড ছাড়া কোথায় ঘুরে বেড়াও তুমি? ভলো পরিবারের মেয়ে এত রাত অব্ধি বাইরে থাকে না। তাও আবার দেশে স্বামীর অনুপস্থিতিতে।”
আমি পিছনে ফিরতেই দেখি নাবিলা চৌধুরী জহরি চোখে আমার দিকে তাকিয়ে। আমি নাবিলা চৌধুরীর কাছে গিয়ে না বুঝার মতো করে শুধালাম,

–“আপনি কি কিছু মিন করতে চাইছেন?”
–“তাহলে আমার কথার মানে বুঝতে পেরেছ।”
আমি রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিলাম। নাবিলা চৌধুরী আমার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তাচ্ছিল্য করে বলল,”তোমার থেকে আর কি-ই বা আশা করা যায়। তোমার ফ্যামেলি ব্যাকগ্রাউন্ড তো এমনই।”
ক্রোধে আমার শরীর থরথর করে কেঁপে উঠেছে। আমি ঠিক কি উত্তর দিব বুঝে উঠতে পারছি না।এরই মাঝে নাবিলা চৌধুরী বলে উঠলো,
–“রুপ আছে ভালো কথা। আমার ছেলেকে তো এটা দিয়েই বস করেছ। তো আমার ছেলের অবর্তমানে তুমি যা খুশি তাই করবে এটা তো আমি মা হয়ে মেনে নিব না। আজ লাস্ট বার বলছি, নেক্সট টাইম যেন সন্ধ্যার আগে তোমায় আমি বাড়িতে দেখি।”
নিজের কথা বলেই নাবিলা চৌধুরী চলে যাওয়ার জন্য পিছনে ফিরল। তখনই আমি হেয়ালি কন্ঠে বলে উঠলাম,

–“তার মানে আপনি স্বীকার করছেন সুন্দরীদের পাওয়ার বেশি।”
আমার কথায় নাবিলা চৌধুরী আমার দিকে ফিরল। আমি উনাকে গা জ্বালানো হাসি ফিরিয়ে দিয়ে বললাম,”একটা গল্প শুনবেন?”
নাবিলা চৌধুরী ব্রু কুঁচকালো। আমি আবার হাসলাম। অতঃপর বলতে লাগলাম,
–“এক ছিল ধনী ঘরের সুন্দরী মেয়ে। বিশাল অট্টালিকায় তার বেড়ে উঠা। নিজের সৌন্দর্যের ছিল প্রবল দাপট। বাইরের মানুষের সাথে সহজে মিশা তার ধাঁচে ছিল না। তবে তার একজন বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল, যাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসত। যদিও সে ছিল দরিদ্র মধ্যেবিত্ত ঘরের সাধারণ মেয়ে।
যাইহোক। সে যে কলেজে পড়ত, সেই কলেজের সবচেয়ে বেশি সুন্দরী ছিল সে। হঠাৎ সেই কলেজে আরেকটি মেয়ের আগমন হয়। সেই মেয়ের সৌন্দর্যে প্রথম দিনই কলেজের সকল ছেলে মেয়ে উভয়ই হোঁচট খায়। ধনী ঘরের মেয়েটা নতুন মেয়েটাকে সহ্য করতে পারত না। ধীরে ধীরে অপছন্দের মেয়েটা তার খুব পছন্দের হয়ে উঠে। তারপর বেস্ট ফ্রেন্ড হয়। পুরো কলেজ জনাতো তাদের তিনজনের স্ট্রং ফ্রেন্ডশিপের কথা। তারপর হঠাৎ ধনী মেয়েটা সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটাকে ঘৃণা করতে লাগল। হঠাৎই সে বাকি দু’জনের থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিল।অবশেষে তিনজনে বন্ধুত্বে ছিঁড় ধরে। কিন্তু কেন?”

–“জাহানারা।”
আমি বাক্যটা শেষ করতে পারলাম কি পারলাম না তার আগেই নাবিলা চৌধুরী চিৎকার করে উঠে আমাকে থাপ্পড় মারার জন্য হাত তুলে। আমি চোখ খিচকে বন্ধ করে নিলাম। গায়ে আঘাত অনুভব না হাতেই চোখ তুলে নাবিলা চৌধুরীর দিকে তাকালাম। দাদি নাবিলা চৌধুরীর হাত ধরে আছে। নাবিলা চৌধুরী লাল টকটকে ক্রুদ্ধ নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে। দাদি আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
–“বড় নাত বউ, নিজের রুমে যা।”
আমি এক নজর আবার নাবিলা চৌধুরীর দিকে তাকালাম, তিনি রাগে ফুঁসছে। দাদি ইশারা করলো চলে যেতে। আমি আর কিছু না বলে চলে গেলাম।
আমি চলে যেতেই দাদি নাবিলা চৌধুরীর হাত ছেড়ে কড়া নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বললো,
–“আমার বাড়ির বউদের গায়ে হাত তুলার সাহস দেখিও না বউমা। এটাই শেষ বার বললাম। এখন নিজের রুমে যাও।”
দাদি চলে গেল। নাবিলা চৌধুরী এখনও দোতলার দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে। কয়েক মূহুর্ত পেরিয়ে যেতেই উনার চোখ দিয়ে টুপ করে এক ফোটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।

শীতকালে রাত নয়টা বাজতেই অনেকরাত মনে হয়। আমি বিছানা রেডি করছি শুয়ে পড়ার জন্য। শরীর ভীষণ ক্লান্ত। হঠাৎই রুমে নক হলো। আমি দরজা খুলতেই দেখি মীরা হাতে দু’কাপ কফি নিয়ে দাঁড়িয়ে। মীরাকে ভেতরে আসতে বলে আমি আবারও বিছানা গোছাতে লাগলাম।
–“আই থিংক এটা তোমার প্রয়োজন।”
মীরা এক কাপ কফি আমার দিকে এগিয়ে ধরে। আমি না চাইতেও হালকা হেসে বললাম, “তোমায় কে বলল?”
–“আমি সব বুঝি।”
–“তাই নাকি?”
–“অফকোর্স, এই যে তুমি এখন বিগ ব্রো কে মিস করছ। অ্যাম আই রাইট?”
হঠাৎ মীরার এমন কথায় আমার হাতের কাজ আপনা-আপনি থেমে গেল। আমার এমন অবস্থা দেখে মীরা উচ্চ স্বরে হেসে দিল। আমি নিজেকে ধাতস্থ করে বললাম,

–“যতসব আজগুবি কথা তোমার।”
–“আচ্ছা ঠিক আছে মানলাম। নাও কফিটা খেয়ে নাও, বেটার ফিল করবে।”
আমি কফিটা হাতে নিয়ে মনযোগ দিয়ে দেখতে লাগলাম। মীরা ফিক করে হেসে দিয়ে বলল,”নর্মাল কফি এটা, কিছু মেশাই নি। খেয়ে নাও।”
আমি হালকা হেসে একটা চুমুক দিলাম। মীরা নিজে কফি খেতে খেতে আড় চোখে আমাকে দেখল। আমি কফি খেয়েছি শিউর হতেই হেসে বলল,”ওকে বেইব, তুমি রেস্ট নাও আমি আসি।”
আমি হালকা মাথা নাড়ালাম। মীরা চলে যেতে গিয়েও আবার পিছন ফিরল। অতঃপর আমার চেহারা পড়ুক করে বলল,”যদি খুব ইচ্ছে করে তাহলে নিজে থেকেই না হয় একবার তাকে নক দিও। দেখই না সে তোমার এক কথায় ঠিক কি কি করতে পারে।”
মীরা নিজের কথা শেষ করেই মৃদু হেসে রুম থেকে বেড়িয়ে গেল। আমি বেশ কিছুক্ষণ মীরার যাওয়ার পানে একনাগাড়ে তাকিয়ে রইলাম। অতঃপর দরজা বন্ধ করে বেডে এসে বসলাম।

ঘড়ির কাটা নয়টা বেজে পয়তাল্লিশের ঘরে। আমি পায়ের উপর দুহাত রেখে সেখানে মাথা রাখলাম। আমার দৃষ্টি আমার পাশে রাখা ফোনটার দিকে। আজ এক সপ্তাহ হয়ে গেল, তবুও একটাবার আমাকে ফোন করল না। আর না দিল একটা মেসেজ।
আচ্ছা আমার কথা কি তার আর মনে পড়ে না। নাকি এখন আমি তার কাছে তিক্ত হয়ে গেছি। এসব আমি কি ভাবছি? আমি কেন তার থেকে এত আশা করছি? নিজের ভাবনাগুলোকেই মনে মনে তিরস্কার করে উঠলাম।

আমি ব্যথাতুর নয়নে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালাম, এই তো আর ক ঘন্টা পর একটা বছর পূরণ হয়ে যাবে আমার অভিশপ্ত জীবনের। খুব করে মনে পড়ছে সে রাতটার কথা।আমার জীবনের খুব জঘন্যতম রাত। একটা অচেনা পুরুষ আমার অনুমতি ব্যতিত হারামভাবে স্পর্শ করেছিল। আমার সর্বস্ব লুফে আমার পবিত্রতাকে হরণ করেছিল।
আচমকা আমি ফুপিয়ে কেঁদে উঠলাম। কেন এত কান্না পাচ্ছে আমি জানি না। কেন লোকটার প্রতি আমার অভিমান জন্ম নিচ্ছে তার প্রশ্নের উত্তরও আমার কাছে নেই। খালি মন বলছে ও কেন আমার কাছে নেই? ও কেন নিজ থেকে আমার কাছে আসছে না? কেন এত দূরত্ব?
ফুপিয়ে কান্নার তোড়ে আমার শরীরও কেঁপে উঠছে। তবে বেশিক্ষণ মন খুলে কাঁদতে পারলাম না। মাথা প্রচুর ঝিমঝিম করছে। ঘুমে চোখ দুটো বুজে আসছে।হঠাৎ এত ঘুম পাওয়ার তো কথা না। তাহলে কি মীরা কফির সাথে….

আর ভাবতে পারলাম না, কানে দূর থেকে ভেসে আসছে সেই ভায়োলিন বাজানোর সুর। আহ্ কি করুণ সেই সুর। আমার আরও কান্না আসছে। তবে কাঁদতে পারছি না, চোখ দুটো খুব করে বুজে আসছে। আমি হেলে পড়ে আধ বোজা চোখে মাথার পাশের ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তার কি উচিত ছিল না আজকে আমার পাশে থাকা। কিংবা একটা বার কল করা। আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আমি চোখ পুরোপুরি বন্ধ করার আগ অব্ধি ফোনের দিকে চেয়ে অস্পষ্ট ভাবে আওড়ালাম,
❝আমাদের কখনো মনের মিল হবে না জেনেও, তারপর একটা বছর হয়েই গেল; আপনিও আমায় ভালোবাসলেন না, আমিও আপনাকে ভালোবাসলাম না। আমাদের এই অবিচ্ছেদ্য গল্পের কি শিরোনাম দিবেন মিস্টার মাফিয়া?❞

আমার অন্ধকার রুমে ঝলঝল করা ফেইরি লাইটগুলো চমৎকার দেখাচ্ছে। সারা রুম জুড়ে নিস্তব্ধতা বিরাজমান। আমি একই ভাবে হাতের উপর মাথা ঠেকিয়ে মাঝ বিছানায় বেঘোরে ঘুমচ্ছি। হঠাৎ বাইরে থেকে আমার রুমের দরজা খুলে যায়। ধীরে ধীরে অন্ধকারে আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে বিশাল আকার একটি ছায়া।
আগুন্তক বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখল গায়ে কম্ফোর্টার না থাকায় আমি শীতে জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছি। আগুন্তক ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এল। ফেইরি লাইটের মৃদু আলোয় দৃশ্যমান আমার কোমল চেহারা। চোখের ঘন কালো পাপড়িগুলো এখনো ভেজা। গালে স্পষ্ট ভেসে আছে অশ্রুরেখা। আগুন্তক ঢোক গিলে আমার দু চোখের পাতায় ঠোঁট ছোঁয়াল। আমি ঘুমের ঘোরেই কেঁপে উঠলাম।

জাহানারা পর্ব ৬৪

আগুন্তক বেশিক্ষণ সময় ব্যয় করল না। আমাকে অতি সন্তর্পণে পাঁজা কোলে তুলে নিল। গভীর ঘুমে থেকে কিছুটা অনুভব করতে পারলাম। পরক্ষণেই এতক্ষণ পর একটু উষ্ণতা পেয়ে আগন্তুকের বুকে মিশে গেলাম। আমার বিষয়টা বুঝতে পেরে আগুন্তক আমাকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে আরও মিশিয়ে নেয়। এদিকে ঘড়ির কাটা টিকটিক করে দশটার ঘরে এসে থামে। লোকটা আর সময় ব্যয় করল না। অতঃপর বড় বড় পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

জাহানারা পর্ব ৬৬