ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ৭
অনামিকা আহমেদ
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আদনান বারবার ইশতিহার এর হাত চেপে ধরে তাকে বসানোর চেষ্টা চালায়। কিন্তু ইশতিহার তার হাত ঝাড়া দিয়ে ফেলে নিজের বক্তব্য কে আরও দীর্ঘায়িত করে।
” রূপ আমার স্ত্রী, ওর প্রতি বিন্দুমাত্র অবমাননা কিংবা অসম্মান আমি সহ্য করব না। ও এখন আর বাড়ির মেয়ে না বরং মীর্জা বংশের বড় বউ। আর খুব তাড়াতাড়ি উত্তরসূরির মা ও হতে চলেছে।”
আমরিন ভেতরে ভেতরে রাগে পুড়ে যাচ্ছে। তার অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল অরুণার সাথে ইশতিহার এর বিয়ে দেওয়ার। এতে মির্জা বাড়ির অনেকাংশ সম্পত্তি হাতানোর সুযোগ পেত সে। কিন্তু তা আর হলো কই? জ্বলন্ত চোখে একবার নিজের মেয়ের দিকে তাকায়, তার চোখের অভিব্যাক্তি এমন ছিল যে,
” পারলি না তো ইশতিহার কে হাতের মুঠোয় রাখতে? দেখ, রূপ ঠিকই সুযোগ বুঝে ঠিক জায়গায় চাল দিয়েছে। এখন তুই বসে বসে আঙুল চুস আর ও আমাদের ওপর কর্তৃত্ব ফলাক। ”
পরক্ষণেই আমরিন সুলেখার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলে,
” দেখেছ ভাবি, বলেছিলাম ও মেয়ের থেকে ছেলেকে আলাদা করে রেখো। তাবিজ করেছে তোমার চেছেলে, শুনেছ তাবিজ। নয়ত আমাদের অত ভালো ছেলেটা যে কিনা মা ছাড়া কিচ্ছু বুঝেনা সে কীভাবে সকলের সামনে গলা তুলে কথা বলছে? কার না কার বাচ্চা, এখন আর পেটের পাপ তে ইশতিহার বাবার ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে। একেবারে মায়ের মতোই হয়েছে, বে*শ্যা কোথাকার ।”
” তাহলে তো আপনিও কম বে*শ্যা নন শ্রদ্ধেয় ছোট চাচী। সামান্য কয়টা টাকার জন্য আপনি যে নিয়মিত আমার মেঝ চাচার বিছানায় যেতেন, মেঝ চাচির সংসার ভাঙার পেছনে যে আপনার কত বড় ভূমিকা সেটা আর কেও না জানুক আমি জন্য। তাই অন্যের নামে মিথ্যা অপ*বাদ দেওয়ার আগে নিজের দিকে তাকান। খোকন চাচা, ডিএনএ টেস্ট করে দেখে নিয়েন তিনটা বাচ্চাই আপনার কিনা।”
কথাটা শেষ করার আগেই আমির সাহেবের এক জোরালো থা*প্পড় এসে পড়ে ইশতিহার এর ফলে। কিন্তু তাতে ইশতিহার কে খুব একটা দমানো যায় না। সে মুখে পৈশা*চিক হাসি টেনে বলে,
” আপনার এত দরদ লাগছে কেনো ওই ভন্ড মহিলার জন্য? উনি আমার স্ত্রী আর অনাগত সন্তান কে অপমান করবেন আর আমি মুখ বুজে সব মেনে নিবো? আমি আর যাই হোক মেঝ চাচির মতো মেরুদণ্ড হীন নই।”
” ইশতিহার চুপ কর, বাড়ির ছোটরা এখানে আছে।”
” তো? কার সামনে কি বলা যায় সেটা কি শুধু আমার খেয়াল করার কথা আপনাদের নয়? দেখুন আব্বা, আমি আপনাকে যথেষ্ট সম্মান করি তাই বলছি আপনারা যদি চান আমি এই বাড়িতে থাকি তবে আমার স্ত্রী কে ওর যথাযথ সম্মান দিতে হবে আপনাদের।”
আমির সাহেবের আর কিছু বলতে পারেন না। ইশতিহার যেনো আজ আগ্নেয়*গিরির মতো ফেটে পড়েছে। তাকে থামানো মুস্কিল। আমির অসহায় চোখে সুলেখার দিকে তাকায়, যার অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছে যে তার মধ্যে দুটি আবেগের গৃহযুদ্ধ চলছে। না পারছে নিজের ছেলেকে আটকাতে, না পারছে রূপ কে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নিতে। এমন নয় যে সে রূপ তে পছন্দ করেন কিংবা ছেলে বিয়ে করতে চাইলে তিনি বাঁধা দিতেন। কিন্তু পরিস্থিতি এমন ঘোলাটে হওয়ার তিনি চরম বি*রোধী। এই নিয়ে যে পরিবারে বেশ কয়েকদিনের জন্য একটা সংঘা*ত বাঁধবে তিনি সেটা বুঝতে পারছেন।
এদিকে আদনান এবার ইশতিহার কে টেনে তার এক পাশ নিচু করে নিম্নস্বরে বলে,
” থাম এবার অনেক বলেছিস, আমার সামনে এসব ফেমিলি মেটার না আনলে হতো না?”
” না হতো না। আরে বিয়ে করেছি কি নিজের বউ কে জেনে শুনে অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য? তোর বউ নেই তাই বুঝবি না, বিয়ে করলে ঠিকই আমাকে বুঝতি।”
আদনান ও এবার চুপসে যায়। বাড়ির সকলের মধ্যে উৎকণ্ঠা কাজ করছে। শুধু আখতার এককোণে বসে মাথা নিচু করে খাবার প্লেটের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার যেনো কিছুই বলার নেয় এসবে। তবে মনের মধ্যে একটু খারাপ লাগাকাজ করছে, যতই হোক রূপ তার সন্তান। তিনি জানেন তার মেয়ে কেমন, তবুও যখন রূপের বিরুদ্ধে মি*থ্যা অভিযোগ উঠছে তখন আসলেই তার মধ্যে খানিক রাগ দানা বাঁধে। তবুও তার উদাসীনতা আর দীর্ঘদিনের গা ছাড়া ভাব তাকে কিছু বলতে বাঁধা দেয়।
এদিকে পেটের সবকিছু উগলে দেওয়ার পর রূপ বাথরুমের ভেজা মেঝের ওপর বসে পড়ে। শরীরটা বেশ ক্লান্ত লাগছে তার, মনে হচ্ছে পেটের খাবার নয় বরং তার সকল শক্তি বমি রূপে বের হয়ে এসেছে। এখন একটু আচার বা লেবু পেলে ভালো হতো।
হঠাৎ রূপ নিজের আশেপাশে কারো অস্তিত্ব অনুভব করে। চোখ মেলে তাকালে নিজের সামনে ভাবনা কে অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে। এতে রূপ কিছুটা চমকে যায়। বুকের বা দিকটায় হাত চেপে ধরে বলে,
” ভয় পাইয়ে দিয়েছো আপু। এভাবে কেও তাকিয়ে থাকে?”
” তুই প্রেগন্যা*ন্ট তাই না?”
রূপের চোখ বড় হয়ে আসে। মাত্র দুমাসে তো পেট এতটা ফুলে ওঠার কথা না যে এক দেখায় কেও বুঝতে পারবে যে সে প্রেগ*ন্যান্ট। রূপ ভাবনার কথা উড়িয়ে দিয়ে একটু মিছেমিছি হাসার চেষ্টা করে বলে,
” কি যে বলো আপু? আমি কেনো প্রেগন্যা*ন্ট হতে যাবো? আসলে একটু এসিডিটি হয়েছিল তো তাই -”
” মিথ্যা বলবি না রূপ? আমি জানি তুই ইশতিহার ভাই এর বাচ্চা মা হতে চলেছিস।”
রূপ ভয়ে জমে যায়। কাপা গলায় বলে উঠে,
” তুমি কীভাবে জানলে?”
” জেনেছি, তবে এতক্ষণে নিচেও সবাই জেনে গেছে আশা করি। তোর বরটা যে ঘাড়তেড়া, ছোট চাচী কে একেবারে দুইয়ে দিয়েছে আমি আড়াল থেকে শুনেছি।”
রূপ সংকোচিত চোখে তাকায় ভাবনার দিকে। মেয়েটা ইশতিহার এর আপন ছোট বোন। তবে ছোট থেকে মাথায় একটু সমস্যা থাকার জন্য তাকে সবাই কোণঠাসা করে রাখে। মাথায় সমস্যা আছে বলতে সে পা*গল নয়, একটু মাথাগরম, হুটহাট কাজ করে বসে, সচেতন নয়, মাঝে মাঝে মেয়েটার কি হয়ে যায় সেই জানে। হয়তো ঠিকমতো চিকিৎসা করলে মেয়েটা সুস্থ হয়ে উঠত কিন্তু সে আর হলো কই। তাকে সময় দেওয়ার বিপরীতে সবাই তাকে হেলা করলো। ভাবনা মেয়েটা নিজের মতন থাকে সবসময়, এক ঘরে বন্দী, ছবি আঁকে, গান শুনে এতটুকুই তার জীবন।
রূপ আর কিছু ভাবার সময় পায় না। উঠে চলে যায়। নিচে তার জন্য ঠিক কী অপেক্ষা করছে সেটা ভাবতেই তার গা শিউরে উঠে। তবে যাওয়ার আগে একবার ভাবনার দিকে চায়। সে হাসিমুখে বলে উঠে,
” কংগ্রেচুলেশন রূপ, আমাকে তাড়াতাড়ি ফুপি বানানোর জন্য। তোদের বাচ্চা কে কিন্তু সবার আগে আমি কোলে নিব। শুধু এই অধিকারটুকু দিস আমায়।”
রূপ ভয়ে ভয়ে নিচে যায়। আজকে বাড়ির আবহাওয়া একটু বেশিই ঠান্ডা। শুকনো একটা ঢোক গিলে সে দেওয়ালের আড়াল থেকে উঁকি দেয়। কেও নেই দেখে একটু নিশ্চিন্তে বের হতেই কোথা থেকে যেন সুলেখা এসে তার সামনে দাঁড়ায়। সুলেখার র*ক্তিম চোখ দুটো দেখে রূপের চোখ দুটো আপনাআপনি নিচে নেমে যায়।
” আমার দিকে তাকা রূপ।”
রূপ তবুও তাকায় না দেখে সুলেখা নিজেই তার চোয়াল ধরে মুখ উচু করে।
” এত বড় কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছিস অথচ আমাকে একবারের জন্য জানালি না? আমি কি তোকে ভালোবাসতাম না? তোর মা চলে যাওয়ার পর কি আমি তোকে নিজের হাতে মানুষ করিনি? বুঝেছি তুই আসলে আমাকে কখনো মা ভাবতেও পারিস নি।”
রূপের চোখ ঘোলা হয়ে আসে। সে সুলেখা কে জড়িয়ে ধরে বাচ্চাদের মত কাদতে থাকে।
” সরি সরি চাচী। আমি তোমাকে জানাতেই চেয়েছিলাম কিন্তু তোমার ছেলেই তো আমাকে কিছু বলতে দেয়নি।”
” হয়েছে আর নাটক করতে হবে না।আমাকে ছাড়।”
সুলেখার কথায় রূপ তাকে ছেড়ে দাঁড়ায়। কান্না থাকলেও সে বারবার নাক টানতে থাকে। সুলেখা এবার একটু মুচকি হেসে বলে,
” কয়মাস?”
” দুই মাস হলো।”
” আজকাল রাতে কার রুমে থাকা হচ্ছে?”
” তোমার ছেলের রুমে।”
” হুম বুঝলাম, আজকে থেকে আর থাকবি না। এই সময় টা স্বামীর থেকে একটু দূরে থাকতে হয় বুঝেছিস? তানাহলে বাচ্চার ক্ষতি হবে।”
” কিন্তু তোমার ছেলে তো -”
” সে আমি দেখে নিবক্ষণ।”
” দুঃখিত মা জননী, আমি আপনার কথা রাখতে পারলাম না। আমি আমার বিয়ে করা স্ত্রী কে আমার থেকে দূরে যেতে দিবো না।”
নিজের পেছনে ইশতিহার এর কন্ঠ ভেসে এলে তারা দুজনেই পেছন ফিরে তাকায়। ইশতিহার রূপের কাছে এসে তাকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে বলে,
” মা আমি ডাক্টার। এতটুকু ভরসা আপনি আমার করতেই পারেন। আমি আবার এসব বিষয়ে খুবই জেন্টেল। বিশ্বাস না হলে রূপ তে জিজ্ঞাসা করে নিন। কি বেবী, মা কে বলো আমি কত গেন্টেল, সবসময় তোমার কথা শুনে করি। তুমি না চাইলে জোর জবরদস্তি করি না।”
সুলেখা নিজের ছেলের মুখে এমন বেহারা কথাবার্তা শুনে তৎক্ষণাৎ রুম থেকে বের হয়ে আসে। সুলেখা চলে যেতেই ইশতিহার এর মুখের ভাবের পরিবর্তন দেখা যায়। রূপ কে নিজের মুখোমুখি করে তাকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরে বলে,
ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ৬
” শাস্তির জন্য প্রস্তুত হয়ে যা রূপ। আমি ছাড়া অন্য কেউ তোকে ছুঁতে পারবে না সেটা জানিস তাও রুপমকে তোকে ছুঁতে দিয়েছিস। তুই নিজেই আমার ভেতরের জানো*য়ারটা কে জাগিয়ে তুলেছিস। এখন সারারাত এত ফল ভোগ কর।”
