তবু গল্পটা ভালোবাসারই পর্ব ১১
নাজনীন নেছা নাবিলা
মোহনা নিজের ঘরে গিয়ে তৈরি হচ্ছে। কারণ এখন তারা সবাই মিলে রাইফের বাড়িতে যাবে। অবশ্য মোহনা যেতে চাইনি কিন্তু রাইফ এবং নিজের ভাইয়ের জোড়া জোড়িতে তাকে হার মানতে হলো। সাদা রঙের জামা পরে নিল।সাথে কালো রঙের উড়না সুন্দর করে দুই কাঁধে পিনআপ করল।সাথে কালো রঙের হিজাব। মুখ পরিমাণ মতো ক্রিম,ঠোঁটে লিপগ্লস। এতেই তার তৈরি হওয়া শেষ। আলমারি থেকে পার্স ব্যাগ নিয়ে রুম থেকে বের হলো।
রাইফ মাহিনের রুম থেকে শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে বের হচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে মোহনাও রুম থেকে বের হয়ে নিজের রুমের দরজা লাগাতে ব্যস্ত। মোহনা কে দেখা মাত্রই ডান হাত আপনা আপনি বুকের বা পাশে চলে গেলো।মোনহা কে এই মূহুর্তে তার কাছে স্নিগ্ধ পরী লাগছে।যেন আকাশ থেকে নেমে আসা সাদা মেঘ।
মোহনার মনে হলো কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে।তাই দরজা লাগিয়ে নিজের বাম পাশে তাকাতেই দেখলো রাইফ মাহিনের দরজার পাশে বুকের বা পাশে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। মোহনা চিন্তিত হয়ে পড়লো। ভাবলো হয়তো রাইফের বুকে ব্যাথা শুরু আছে।তাই চিন্তিত হয়ে রাইফের কাছে দৌড়ে গিয়ে ব্যস্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল____
কি হয়েছে আপনার আবার বুকে ব্যথা শুরু হয়েছে বঝি? দেখি রুমে গিয়ে বসুন তাড়াতাড়ি প্লিজ। দাঁড়িয়ে থাকলে বেশি খারাপ লাগবে।আমি আমি কিছু কর করছি।
আসলে রাইফের বুকে ব্যাথার সমস্যা আছে। প্রায় তার বুকে ব্যাথা হতো কিন্তু বিগত কত বছর ধরেই হয়না।রাইফ মোহনা কে ব্যস্ত হতে দেখে নিজেকে স্বাভাবিক করল এবং মোহনা কে শান্ত করার জন্য বলল___
শান্ত হোও মোহনা আমার কিছুই হয়নি। আমার বুকে ব্যথা করছে না।
মোহনা রাইফের কথা শুনে যেন জান ফেরত পেলো।রাইফের দিকে তাকিয়ে অবুঝের মতো তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল___
তাহলে বুকে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
রাইফ এখন মহা বিপদে পরে গেল।কি বলবে এইবার মোহনাকে? যে সে তাকে দেখে ফিদা হয়ে এমন পাগলামী করে ফেলেছে। কথাটি বলার পরকি তার ঘাড়ে তার মাথা থাকবে? মনে তো হয়না।
তাই শুকনো ঢোঁক গিলে বলল___
আসলে নতুন কাপড় প্রেস করে পেরছি তো।তাই বার বার ঠিক করছিলাম যেন প্রেস নষ্ট না হয়ে যায়।
মোহনার কপালে হাত।সে কত চিন্তিত হয়ে পরেছিল অথচ এই লোক নিজের প্রেস করা কাপড়ের চিন্তা করছে। মোহনার মেজাজ গরম হয়ে গেলো।সে তো ভেবেছিল কয়েক বছর আগের মতোন রাইফের অবস্থা হয়েছে।তাই তো এত ভয় পেয়েছিল। মোহনা রাগে দুঃখে অভিমানে কিছু না বলেই পিছন ঘুরে হাঁটা শুরু করল। মেজাজ তার বিগরে গেছে।রাইফ মোহনাকে চলে যেতে দেখে বুঝলো মোহনা রাগ করেছে। জ্বিভে কামর লাগিয়ে মোহনার পেছনে ছুটে গেল। মোহনা নিচ তলায় যাওয়ার জন্য প্রথম সিঁড়িতে পা দিতে না দিতেই নিজের ওড়নায় টান অনুভব করল।পেছন ফিরে দেখল রাইফ কুকুর ছানার মতোন ছোট ছোট চোখ করে তার ওড়না টান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
রাইফের এমন চেহারা দেখে মূহুর্তেই মোহনার সব রাগ গলে জল হয়ে গেল। এবং সঙ্গে ভীষণ হাসি পেল। কিন্তু নিজের আবেগ কন্ট্রোল করে মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল। কারণ বেশিক্ষণ রাইফের দিকে তাকিয়ে থাকলে সে হেসেই ফেলবে।
রাইফ মোহনার ওড়নায় নিজের আঙুলে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলল___
আইম সরি।আইম এক্সট্রিমলি সরি। আমি ভাবতে পারিনি তুমি ভয় পেয়ে যাবে। নেক্সট টাইম আর এই ধরনের মজা করবো না আর প্রমিস।
মোহনা ফিরল রাইফের দিকে।তার দৃষ্টি শীতল হলো।সে অনেক কথাই বলতে চাইলো কিন্তু গলা দিয়ে বের হলো না। অনেক কষ্টে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলল__
ইটস্ ওকে আসলে আমি ডাক্তারি নিয়ে পড়াশোনা করছি তো।তাই আমার সামনে কাউকে অসুস্থ লাগলে আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ি।যাই হোক দেরি হয়ে যাচ্ছে চলুন।
বলেই মোহনা একপা, একপা করে নিতে নামতে লাগলো।
কিন্তু আবার ওড়নায় টান লাগতেই দাঁড়িয়ে পরল। কর্ণপাত হলো রাইফের কথা।যা শুনে তার দেহ, মন থমকে গেল।রাইফ জিজ্ঞেস করল___
শুধু ডাক্তারি পড়াশোনা করছি বলেই কি আমার জন্য চিন্তা হলো তোমার? আমি কি অন্য সবার মতন?
কন্ঠে ছিল তার অসহায়ত্ব, আবেগ। মোহনা চোখ বন্ধ করে নিজেকে প্রশ্ন করল___
আসলেই কি শুধু ডাক্তারি পড়াশোনা করছি বলে উনার জন্য আমি চিন্তা করি?
বেশিক্ষণ সময় লাগলো না তাকে উত্তর পেতে। কারণ সে খুব ভালো করে জানে তার অনুভূতি। কিন্তু এই অনুভূতিকে লুকায়িত রেখে রাইফের দিকে না তাকিয়েই জবাব দিল___
ডাক্তার পড়ার আগেও আমি আপনার জন্য চিন্তা করতাম।
মোহনার উত্তর শুনে রাইফের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।সে জিজ্ঞেস করল ___
শুধু আগে করতে?
মোহনা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে জবাব দিল___
আগেও করতাম, এখনও করি এবং সবসময় করব।
জবাব দেওয়ার পর আর অপেক্ষা না করে নিচে চলে এলো।
মুনমুন প্রিয়া রান্না ঘরে রান্না করছে।আজ তার চাচাতো ভাই আসবে বাড়িতে।কত বছর পর আসছে।তাই তার পছন্দের সব খাবার রান্না করা হচ্ছে। প্রিয়া এইবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। গায়ের রঙ শ্যামলা। কোমর সমান চুল। শান্তশিষ্ট এবং চুপচাপ সে।সকল কাজেই পারদর্শী।
আজ শুধু তার চাচাতো ভাই আসছে না বরং তার সাথে তার বন্ধু, বন্ধুর ভাই এবং বোন আসছে। তাই মুনমুন সবার জন্য রান্না করছে। অবশ্য আজকে তার প্রিয় মানুষটিও আসছে। যাকে সে তার বয়ঃসন্ধি কাল থেকে ভালোবেসে যুবতী হয়ে বেড়ে উঠছে। নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে কত বছর পর দেখতে পাবে এই খুশি প্রিয়া কোথায় রাখবে ভেবে কুল পাচ্ছে না।
কলিং বেলের শব্দ শুনতেই প্রিয়া হাতের কাজ ফেলে দৌড় দিল দরজা খুলার জন্য।তার মন বলছে সবাই এসে পরেছে।বাড়ির অন্যান্য সদস্যরা যার যার রুমে।রাইফের চাচি লতা ইসলাম এবং প্রিয়া মিলে রান্না করছিল। কিন্তু উনার ছাদে ফেলে আসা কাজের কথা মনে পড়তেই ছাদে চলে যান।
প্রিয়া দরজা খুলতেই অতি পরিচিত কিছু মুখ দেখতে পেলো। দরজা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে রাইফ, মোহনা, মাহিন এবং মাহিম। এখানে এমন একজন আছে যাকে প্রিয়া ভালোবাসে ভীষণ।
রাইফের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল প্রিয়া কে দেখে। অনেক দিন পর নিজের বোন কে দেখছে।ছোট বেলা থেকেই সে প্রিয়া কে নিজের আপন বোন মনে করে এসেছে।
রাইফ প্রিয়ার মাথা হাত রেখে হাসি মুখে জিজ্ঞেস করল__
কিরে কি অবস্থা তোর? বড় হয়ে গেছিস দেখছি।তোকে তো এইবার তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে হবে।
রাইফের কথা শুনে প্রিয়া লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। কুশল ও বিনিময় করে রাইফকে ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করল।
অবশ্য এখন তার ভীষণ লজ্জা লাগছে।তার ভালোবাসার মানুষটির সামনে তাকে বিয়ের কথা বলছে তার তো লজ্জায় পাওয়াটাই স্বাভাবিক।
মাহিন তো কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দেখে গেল নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে। তারপর রাইফের কথা কানে আসতেই মাহিন তো রাইফ কে খোঁচা দিচ্ছে হাতের কুনি দিয়ে।রাইফ ঠোঁট টিপে হাসছে।
অন্যদিকে মোহনা আহত দৃষ্টিতে রাইফের দিকে তাকিয়ে আছে যাই রাইফ দেখেনি। ঠোঁটে তার তাচ্ছিল্যের হাসি। মনে মনে বলল__
কিছুদিন পর আপনার সাথে বিয়ে হবে আর আপনি বলছেন আপুকে বিয়ে দেওয়ার কথা। আচ্ছা তাহলে কি আমার আর হবে আপনাকে পাওয়া।
রাইফের চাচা রিফাত চৌধুরী দরজায় রাইফ কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খুশি হয়ে বলল___
আরে রাইফ বাবা ভেতর আয়।কত বছর পর দেশে ফিরলি অথচ নিজের বাড়িতে আগে না এসে বন্ধুর বাড়ি চলে গেলি বাহ্।
সবার ধ্যান ফিরল রিফাত চৌধুরীর কথা শুনে। প্রিয়া সবাইকে ভিতরে আসার জন্য জায়গা করে দিল। একে একে সবাই ভেতরে চলে এলো।
রাইফ এসে নিজের চাচাকে জড়িয়ে ধরল। ততক্ষণে ছাদ থেকে লতা ইসলাম এবং রাইফের মা বাবা তাদের রুম থেকে বের হয়ে ড্রয়িং রুমে চলে এলেন। রাইফ তার চাচার সাথে কুশল বিনিময় করে চাচির কাছে গেল এবং ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করলো।
মাহিন গেল রিফাত চৌধুরীর কাছে।সালাম দিয়ে টুকিটাকি কথা বলতে লাগলো। রিফাত চৌধুরী আবার মাহিন কে বেশ পছন্দ করেন। যদি প্রিয়ার বিয়ের কথা রাইফের সাথে না হতো তাহলে উনি নিশ্চিত মাহিনের সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন।
রাইফ,মোহনা, মাহিন এবং মাহিম সবাই মিলে সোফায় বসল।রাইফ মোহনার পাশেই বসেছে।সবাই টুকিটাকি কথা বলছে। কিন্তু মাহিনের চোখ কেবল তার নিজস্ব চাঁদের দিকে।
তার মুন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।ওড়না দিয়ে মাথা ঢেকে রেখেছে। কপালে ঘামের বিন্দু।ছোট ছোট চুল গুলো কপাল ঘামের সাথে লেপ্টে আছে।দেখতে মুগ্ধতার লাগছে।
প্রিয়ার মনে পরলো রান্না বাকি আছে। তাই সে রান্না ঘরে চলে গেলো। তার চলে যাওয়া সবার চোখ এড়োলেও মাহিনের চোখ এড়াইনি।সে দেখলো সবাই কথা বলতে ব্যস্ত।এই সুযোগ বুঝে চুপচাপ সোফা থেকে উঠে রান্না ঘরে চলে গেল।
প্রিয়া হাঁসের মাংস রান্না করছিল। মাহিন এবং মোহনার অনেক পছন্দের খাবার।মাহিন রান্না ঘরে যেতেই নাকে নিজের প্রিয় খাবারের ঘ্রাণ পেল।আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলল। ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।চোখ খুলে এক পা এক পা করে এগিয়ে গেলো প্রিয়ার দিকে। প্রিয়ার মনে হল তার পিছনে কেউ আছে সে ভাবলে হয়তো তার মা তাই পেছনে তাকালো না।
মাহিন প্রিয়ার একদম পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো। দুজনের মাঝে সম্মানজনক দূরত্ব আছে। তারপর ফিসফিস করে বলল
পাঁচ বছর পর নিজের প্রিয় খাবার খাচ্ছি তাও আবার মুনের হাতে করা রান্না।
প্রিয়ার হাত থেমে গেলো। কত বছর পর এই ডাকটি সুন্দর সে। সবাই তাকে প্রিয়া বলে ডাকে, আবার অনেকে মুনমুন বলে ডাকে কিন্তু এই একটি মাত্র ব্যক্তি তাকে মুন বলে ডাকে। এই ব্যক্তিটির কাছ থেকে যখন যে প্রথমবার মুন ডাকটি শুনে তারপর থেকে যদি কেউ কখনো তাকে মুন নামে ডাকতে চেয়েছে সে ডাকার অনুমতি দেয়নি। আসলে কিছু কিছু জিনিস শুধুমাত্র প্রিয় মানুষদের জন্য বরাদ্দ থাকে।
প্রিয়া নিজেকে স্বাভাবিক করে মাহিন কে জিজ্ঞেস করল____
কেমন আছেন?
মাহিন প্রিয়ার পেছন থেকে পাশে এসে দাঁড়ালো এবং প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে জবাব দিল___
আগে কেমন ছিলাম জানিনা কিন্তু এখন অনেক ভালো আছি।
প্রিয়া থমকে গেল। তার বুকের ভেতর উতাল পাতাল শুরু কর। মাহিনের দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না। সে এখনো ঠিকমতো জানে না মাহিন তাকে আদৌও ভালোবাসে নাকি এগুলো শুধু তার মনের ভুল। সবসময় ভাবে সে মাহিন কে ভালোবেসে এসেছে বলে তারও মনে হয় মাহিন তাকে ভালোবাসে। তাছাড়া ও মাহিনের ব্যবহার এবং আচার-আচরণেও প্রকাশ পায় অনেক সময়। কিন্তু তবু প্রিয়া, দোটানায় পড়ে থাকতে চায় না।
মাহিন হাঁস রান্না করতে থাকা ফ্রাইপেন এর কাছে মুখ নিয়ে ঘ্রাণ শুঁকল এবং বলল___
ইচ্ছে করছে গরম ফ্রাই পেন এর উপর বসেই খাওয়া শুরু করে দেই।
প্রিয়া শব্দ করে হেসে উঠলো। তার রান্না করা প্রায় শেষ। তরকারির ফ্রাইপেন এক চুলা থেকে সরিয়ে পাশে রাখল এবং চুলায় আরেকটি পানি ভর্তি ডেক বসিয়ে দিল। রেগ থেকে একে ছোট বাটি এবং চামচ ছিল। তারপর তরকারি থেকে কয়েক টুকরো হাঁসের মাংস উঠিয়ে মাহিনের দিকে এগিয়ে দিল এবং বলল___
এই নিন খেয়ে নিন কিন্তু সাবধানে গরম আছে ।
মাহিন প্রিয়ার কাছ থেকে বাটি নিলো। কিন্তু পছন্দের খাবার পছন্দের মানুষের হাত থেকে পাবার পর লোভ সামলাতে না পেরে, গরম মাসে টুকরা হাতে উঠিয়ে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে হাতে গরম লাগলো এবং মানুষের টুকরা বাটিতে পড়ে গেল।
ঘটনা এত তাড়াতাড়ি ঘটে গেল যে প্রিয়া কিছু বুঝতেই পারল না। তখন বুঝতে পারল তখন ব্যস্ত হয়ে মাহিনের হাত ধরে ফু দিতে লাগলো এবং রাগ দেখিয়ে বলতে লাগলো____
এমন ভাব করছেন যেন কখনোই খাননি। আরেকটু অপেক্ষা করলে কি হত? এখন কার হাত পুড়েছে? একটু অপেক্ষা করে খেলে তো ভালো করে খেতে পারতেন এবং তৃপ্তি পেতেন। সব সময় এত তাড়াহুড়ো করেন কেন? আপনি কি বাচ্চা?
মাহিনের হাত এতক্ষন জ্বললেও এখন সে কোন রূপ জ্বালানি অনুভব করছে না। শুধু নিজের মুন কে এক নজরে দেখে যাচ্ছে এবং মুনের বকা গুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছে। মেয়েটা এমনিতে চুপচাপ হলেও তার সামনে অনেক সময় নিজের অনেক রূপ দেখিয়ে ফেলে। ঠিক যেমন সবার ভাষ্যমতে মুনমুন প্রিয়ার রাগ বলতে কিছুই নেই। অথচ মাহিনের সাথে সে প্রায়ই রাগ দেখায় যখন মাহিন উল্টাপাল্টা কাজ করে। মাহিনের বেশ ভালই লাগে যখন তার মুন তার সাথে নিজের আসল রূপে থাকে।
প্রিযয়া মাহিনের হাতে ফুঁ দিতে দিতে অস্থির কন্ঠে জিজ্ঞেস করল____
খুব বেশি জ্বলছে কি?
মাহিন প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে নরম সুরে বলল__
তোমার এই যত্নময় ছোয়া পাবার পর একটু ও জ্বলছে না। কিন্তু হাঁসের মাংস খাওয়ার জন্য পেট ঠিকই চলছে।
প্রিয়া শব্দ করে হেসে উঠলো। এই লোকটি কখনোই সিরিয়াস হয় না। তাই মাইনের হাত ছেড়ে দিয়ে মাংসের বাটি হাতে নিল। এবং ধীরে ধীরে ফুঁ দিয়ে দিয়ে একটু একটু করে মাংস ছিঁড়ল। তারপর মাহিনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল___
এই নিন এখন খেতে সুবিধা হবে।
মাহিন চোখগুলো ছোট ছোট করে অসহায় কণ্ঠে বললো___
আসলে আমার হাত এখনো জ্বলছে। তার ওপর হাঁসের মাংস খেতেও খুব ইচ্ছে করছে। যদি কারো অসুবিধা না হয় তাহলে চাইলে সে আমাকে নিজ হাতে খাইয়ে দিতে পারে।
প্রিয়া থমকে গেল মাহিনের এমন আবদার শুনে। সে কত দিবা স্বপ্ন দেখেছিল মাহিনকে নিজ হাতে যত্ন সহকারে খাইয়ে দিবে। কিন্তু কখনো ভাবতে পারেনি তার এই স্বপ্ন পূরণ হবে। এখন যখন স্বপ্ন পূরণ হবার সময় এল তার বিশ্বাস হচ্ছে না। কিছুক্ষণ মাহিনের দিকে এভাবে তাকিয়ে থেকে মুচকি হেসে বিনা দ্বিধায় মাংসে ফুঁ দিয়ে দিয়ে মাহিনকে খুব যত্ন সহকারে খাইয়ে দিতে লাগলো।
মাহিন নিজের ব্যক্তিগত মুনের কাছ থেকে লক্ষ্মী ছেলের মত মাংস খেতে লাগলো।
দুপুরবেলা খাওয়া দাওয়া করে মোহনা এবং মাহিম চলে এলো বাড়িতে। অবশ্য তাদেরকে কেউই আসতে দিতে চাইনি কিন্তু মোহনা বাহানা করে চলে এসেছে। আসলে রাইফ এবং প্রিয়াকে একসাথে দেখে মোহনার আরো বেশি কষ্ট হচ্ছিল। সে নিজেকে সবার সামনে দুর্বল প্রমাণ করতে চায় না তার জন্যই সেখান থেকে চলে এলো। অবশ্য রাইফ তাকে অনেকবার অনুরোধ করেছিল কিন্তু সে এসাইনমেন্টের বাহানা করে চলে এলো। সে কখনোই রাইফের কোন কথা ফেলেনি আজ প্রথম তার কাছে অনুরোধ করার পরেও সে তা রাখতে পারেনি। এর জন্য ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তার। কিন্তু কি আর করার। এখন থেকেই তাকে নিজেকে শক্ত করে তুলতে হবে।
রফিক চৌধুরী এবং তার স্ত্রী রেশমা আক্তার।আর রিফা চৌধুরী এবং তার স্ত্রী লতা ইসলাম চারজন মিলে রফিক চৌধুরীর রুমে বসেছেন। তারা মূলত এইটা নিয়ে আলোচনা করছেন কিভাবে বিয়ের বিষয়ে ছেলে মেয়েদেরকে জানাবেন। আসলে অতীতের ঘটনা গুলোর জন্য এই বাড়িতে সবার সাথে সবার সম্পর্কে ফাটল ধরেছিল। এই ফাটল জোড়া লাগাতেই মূলত রাইফ আর প্রিয়ার বিয়ে সিদ্ধান্ত নছয় বড়রা কিন্তু একথা ছোটরা জানে না। আর সবচেয়ে বড় সত্য হলো প্রিয়া লতা ইসলামের আপন মেয়ে না। বরং রিফাত চৌধুরীর প্রথম স্ত্রীর সন্তান যেই স্ত্রীর কারণে এই সংসারে শত ঝামেলা হয়। রিফাত চৌধুরী যখন নিজের প্রথম স্ত্রী কে তালাক দেন সব তথ্য জানার পর তাই কিছুদিন পর জানতে পারেন তার স্ত্রী গর্ভবতী। এবং আইন অনুযায়ী সময় মতন নিজের সন্তানকে পেয়ে যান তিনি। সবার জোড়া জোড়িতে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। প্রথম ভেবেছিলেন হয়তো দ্বিতীয় স্ত্রী কখনোই উনার প্রথম ঘরের সন্তানকে মানবে না কিন্তু উনার ভাবনাকে ভুল প্রমাণিত করে লতা ইসলাম প্রিয়াকে নিজের আপন মেয়ের মতন বড় করে তুলেছেন। এবং এই কথা প্রিয়া বাদের সবাই জানে। এজন্যই উনারা চাচ্ছেন বাড়ির নিয়ে যাতে বাড়িতেই থাকে এবং কষ্ট না পায়। তাই সবাই মিলে এখন আলোচনা করছেন কি করে ছোটদেরকে এই সিদ্ধান্ত জানাবেন।
মাহিন আজ রাইফের সাথে তারই বাড়িতেই রয়ে গেল। তাকে আর যেতে দেওয়া হলো না। দুপুরবেলা খাওয়া দাওয়ার পরে রেস্ট নিয়ে দুই বন্ধু মিলে বের হয়েছিল। রাত ১১ টায় বাড়িতে ফিরলো। অনেকদিন পর দেশে ফিরেছে তার জন্য সব বন্ধু বান্ধব দের সাথে আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে দেরি হয়ে গিয়েছে।বাড়িতে ফিরে খাওয়া দাওয়া করে দুই বন্ধু ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। তারপর দুই বন্ধু মিলে প্ল্যান করতে লাগলো কে কি করে কার বোনকে পটাবে। এসব আলোচনা করতে করতেই রাত দুইটা বেজে গেল।
মাহিন কথা বলতে বলতে অনলাইনে গিয়ে দেখল মোহনাকে একটিভ দেখাচ্ছে। রাইফ এবং মাহিন পাশাপাশি শুয়ে থাকার কারণে রাইফের চোখেও এই জিনিস কি পড়লো। সে মাহিনকে খোঁচা দিয়ে বলল___
তোর বোনকে কল দিয়ে জিজ্ঞেস কর এত রাত্রে অনলাইনে কি করছে?
মাহিম আর দেরি না করে বন্ধুর কথা অনুযায়ী হোয়াটসঅ্যাপে বোনকে কল লাগালো। মোহনা রাত জেগে পড়ছিল। কিছুদিন দুঃখী হয়ে কান্নাকাটি করার কারণে তার অনেক পড়া গ্যাপ গিয়েছে এবং এখন সেগুলো কমপ্লিট করতে হচ্ছে তাকে। এই কারণেই এখনও ঘুমানো হয়নি। হঠাৎ ফোন বেজে উঠতে তার পড়ায় ব্যাঘাত ঘটলো। দেখলেও তার ভাই কল দিয়েছে। কিছুটা অবাক হলেও পরক্ষণে নিজেকে সামলিয়ে নিল এবং ফোন ধরল। ফোন ধরে সালাম দিল।
মাহিন ফোন লাউডস্পিকারে রেখে দিয়েছে। সে সালামের জবাব দিল। কিন্তু এখন বুঝতে পারছে না সে কি বলবে। কাছে নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই এত রাত্রে বোনকে কল দেওয়ার। তবুও আমতা আমতা করে বলদের মতো জিজ্ঞেস করল___
বোন তুই কি ঘুমাচ্ছিস এত রাতে?
রাইফ কপাল চাপড়ালো এবং মনে মনে বলল__
হায় আল্লাহ কোন বলদকে আমি নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড বানালাম। শুধুমাত্র কমন সেন্স নাই। ঘুমালে কি করে ফোন ধরতো? মানুষ রাতে ঘুম হবে নাকি এই বলদের মতো দিনে ঘুমাবে এবং রাতে চুরি করতে যাবে?
মোহনার নিজের ভাইয়ের কথা শুনে মেজাজ গরম হয়ে গেল। এমনিতেই বেচারীর পুরনো পড়া কমপ্লিট করতে করতে জান ক্ষয় করে ফেলছে আর তার ভাই তাকে মাঝরাতে কল দিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলছে। তবু নিজের রাগ কন্ট্রোল করে বলল___
তবু গল্পটা ভালোবাসারই পর্ব ১০
না ঘুমাবো কেন? রাত দুইটাই ছাদে গিয়ে তীব্র রোদে কাপড় শুকাতে দিয়েছি। তুমি বললে তোমার কাপড় গুলো রোদে শুকাতে দেই?
মাহিন হা হয়ে গেল।আর রাইফ কে মোহনার কথা শুনে অট্টহাসিতে ফেটে পরলো এবং হাসতে হাসতে খাট থেকে পড়ে গেল। সে মূলত একদম খাটের সাইডে ছিল। তাই হাসতে হাসতে পড়ে গেল এবং মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরেও তার হাসি থামতো না।
