তবু গল্পটা ভালোবাসারই পর্ব ১২
নাজনীন নেছা নাবিলা
ক্লাসের গুমোট বাতাস আর ফরমালিনের তীব্র ঘ্রাণ পেছনে ফেলে মোহনা যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের বারান্দায় এসে দাঁড়াল, বাইরের পড়ন্ত বিকেলের আলোটা তার চোখে বিঁধল তপ্ত তীরের মতো। সারা দিনের হাড়ভাঙা খাটুনি আর অ্যানাটমি-ফিজিওলজির জটিল মারপ্যাঁচে তার মগজটা তখন একটা জট পাকানো সুতোর গোল্লা।
ক্লান্তিতে কাঁধের ওপর ঝুলে থাকা ভারী ব্যাগটা যেন সহস্র মণের বোঝা হয়ে চেপে বসছে। দীর্ঘক্ষণ ল্যাবে দাঁড়িয়ে থাকার পর অবশ হয়ে আসা পা দুটো যখন লাল ইটের চত্বরে পড়ল, একটা দীর্ঘশ্বাস আপনিই বেরিয়ে এল তার ভেতর থেকে। কপালে জমে থাকা সূক্ষ্ম ঘামবিন্দুগুলো মুছে নিতে নিতে সে একবার আকাশের দিকে তাকালো। শহুরে ধুলোমাখা সেই আকাশেও যেন আজ এক অদ্ভুত বিষণ্নতা।
চারপাশে সহপাঠীদের কোলাহল, কারো ব্যস্ত পায়ে হেঁটে যাওয়া কিংবা কারো উচ্চহাসি,সবকিছুই মোহনার কানে আসছিল এক দূরবর্তী প্রতিধ্বনির মতো। তার ভাবনার রাজ্যে তখন কেবল সাদা অ্যাপ্রনটার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা একরাশ ক্লান্তি আর ঘরে ফিরে এক কাপ তিতকুটে কড়া চায়ে নিজেকে ডুবিয়ে দেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। ভিড় ঠেলে গেটের দিকে এগোতে এগোতে সে মনে মনে ভাবল, এই রূপালি জগত আর হাড়-মাংসের কাটাছেঁড়া—সব মিলিয়েই তো তার জীবনের এই দীর্ঘ পথচলা।
মেডিকেলের গেট দিয়ে বের হতেই মোহনার হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। গেটের পাশে নিজের গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাইফ। বিকেলের ম্লান আলোয় রাইফকে এক অদ্ভুত মায়াবী দেখাচ্ছে। মোহনা আলতো করে নিজের অ্যাপ্রনটা গুছিয়ে নিল, যদিও মনের ভেতরে বয়ে যাওয়া ঝড়টা সামলানোর কোনো উপায় তার জানা নেই। সে রাইফকে ভালোবাসে,এক বুক হাহাকার আর না-বলা কথা নিয়ে গড়া একতরফা এক ভালোবাসা। রাইফ জানে না যে, তার জন্য মোহনার এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা। মোহনার কেবলই মনে পড়ল রাইফের সেই চাচাতো বোনের কথা, যার সাথে রাইফের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। মোহনা মনে মনে বলল_ আমার কাছে আপনি এক নিষিদ্ধ পাণ্ডুলিপি, যা আমি বারবার পড়তে চাই,কিন্তু নিজের করে পাওয়ার অধিকার আমার নাই।
অন্যদিকে, মোহনাকে দেখা মাত্রই রাইফের বুকের ভেতরটায় এক অদ্ভুত তোলপাড় শুরু হলো। সে চট করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। মোহনার ক্লান্ত চেহারা দেখে আবার নতুন করে মায়ায় পড়ে গেল।রাইফের চোখেমুখে যে দীপ্তি ফুটে উঠল, তা কেবল একজন প্রেমিকের চোখেই মানায়। সে মোহনাকে ভালোবাসে, হয়তো মোহনার চেয়েও অনেক বেশি গভীরতায়। কিন্তু তার মহীনি তো অন্য কাউকে পাগলের মতোন ভালোবাসে। একথাটি মনে পরতেই রাইফের মনের ভেতর ঝড় চালু হলো।এই ঝড় যেন তার ভেতরের সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে এবং তাকে মুখ বুজে সহ্য করতে হচ্ছে।সে চাইলেও কিছু করতে পারছে না।
দুজনের চোখাচোখি হলো। মোহনা মনে মনে ভাবল, “উনি তো অন্য কারো হতে চলেছেন।”
আর রাইফ ভাবল, “ও কি কখনো বুঝবে আমার এই মৌনতা?”
দুজনের মাঝখানে মাত্র কয়েক হাত দূরত্ব, অথচ সেই দূরত্ব যেন আলোকবর্ষের সমান। তারা একে অপরের দিকে তাকাল ঠিকই, কিন্তু লুকানো দীর্ঘশ্বাসগুলো বাতাসের ধুলোয় মিশে গেল।
মোহনা এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে রাইফের দিকে হাসি মুখে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল ___
আপনি হঠাৎ এখানে?
রাইফ অবহেলায় বলল___
এমন ভাব করছো যেন আগে কখনোই তোমাকে নিতে আসি নি আমি। স্কুলে থাকতে তো কম জ্বালাও নি আমায়।
মোহনার মনে পরলো সেই পুরনো দিনের কথা যখন রাইফ তাকে প্রায়সই নিতে আসতো। আসলেই সে রাইফ কে অনেক জ্বালাতো।কোই রাইফ তো আগে কখনোই বলেনি যে বিরক্ত হচ্ছে। মোহনা মনোক্ষুণ্ন হলো তবুও মুখে ক্লান্তির হাসি ফুটিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল___
আগে আপনাকে জ্বালাতন করলেও কিন্তু এখন বন্ধ করে দিয়েছি।
রাইফ ঠিক বুঝলো না যে মোহনা তার কথায় কষ্ট পেয়েছে। কারণ সে আগেও মোহনাকে মজার ছলে অনেক কথা বলতো।তখন মোহনা রাগ না করে উল্টো ঝগড়া করতো।আজ ঝগড়া না করলেও যে মোহনা অভিমান করেছে রাইফের তা বোধগম্য হলো না।সে প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে মোহনার উদ্দেশ্যে বলল___
কি আর করার এক সময় এত জ্বালিয়েছো যে এখন অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি।তাই তো এত গুলো বছর যাবৎ জ্বালাও নি বলে নিজ থেকেই আবার জ্বালাতন অনুভব করতে চলে এলাম। গাড়িতে উঠে পরো।
মোহনা স্মিত হাসলো।তার যে আর অধিকার নেই রাইফ কে জ্বালাতন করার।রাইফ কে জ্বালাতন করার জন্য নতুন কেউ চলে এসেছে।
রাইফ দরজা খুলে দিল গাড়ির মোহনার জন্য।মোহনা নিঃশব্দে গাড়িতে উঠে বসলো এবং কাঁধের ব্যাগ গাড়ির পেছনের সিটে লাগলো।রাইফ মোহনার সিটের দরজা লাগিয়ে নিজেও ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলো।গাড়ির ইঞ্জিন চালু করে ধীরে ধীরে গাড়ি চালাতে লাগলো। কারণ সে মোহনার সাথে বেশি সময় কাটাতে চায়। গাড়ি চালাতে চালাতে হঠাৎ ট্রাফিক সিগন্যাল পরায় গাড়ি থামাতে হলো রাইফকে।
রাইফ এবং মোহনা দুজনেই নিশ্চুপ। মোহনা ঘাড় ঘুরিয়ে ডান দিকে তাকিয়ে আছে।রাইফও তার দিকে তাকালো। হঠাৎ নজর এলো রাস্তায় কিছু দোকানের উপর বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন, জুয়েলারি অ্যাড বা কার্টুন দেখানোর জন্য যে ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ডগুলো টাঙানো থাকে, সেগুলোকে মূলত “ডিজিটাল সাইনেজ” বলে,সেখানে একটি দোকানের সাইনেজে ডোরেমন কার্টুনের ভিডিও প্লে করা আছে। সেখানে ডোরামি কে দেখেই রাইফের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।রাইফ সেখানে দৃষ্টি রেখেই মোহনার উদ্দেশ্যে বলল___
ডোরামি আমাদের প্রথম যেদিন দেখা হয়েছিল সেইদিনের কথা মনে আছে?
মোহনা খানিকের জন্য থমকে গেল। অনেক বছর পর আবার এই নামটি শুনতে পেলো সে। চমকে তাকালো রাইফের দিকে। কারণ হঠাৎ রাইফ এত পুরানো কথা তুলছে কেন তা তার কাছে অস্পষ্টবোধ।রাইফের দিকে তাকাতেই দেখল রাইফ জানালা দিয়ে বাইরে কিছু একটা দেখছে।রাইফের ঠোঁটে স্মিত হাসি।মোহনা রাইফের দৃষ্টি লক্ষ্য করতে সেই দিকে তাকাতেই তার ঠোঁটেও হাসি ফুটে উঠল।ডোরামি দেখে তারও পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে গেল।চলে গেল অতীতের ভাবনায়।
মাহিমের কাছ থেকে রাইফের পারিবারিক সমস্যার কথা শুনে ছোট্ট মোহনার বেশ মায়া হলো রাইফের প্রতি।মাহিন আবার বলতে শুরু করল___
জানিস রাইফের যখন বয়স নয় হয় তখন থেকেই সে নিজকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে। ক্লাসে সবসময় একা বসে থাকতো।তাকে একা দেখে তার সাথে বন্ধুত্ব করতে গিয়েছিলাম কিন্তু সে নাকোচ করায় চলে এসেছিলাম।আমি ভাবতাম হয়তো সে অনেক অহংকারী। কিন্তু কেন জানি মন বলতো তার সাথে বন্ধুত্ব করতে।তাই কত কাঠ পুড়িয়ে রাইফের সাথে বন্ধুত্ব করেই ফেললাম।তাও কম সময় লাগেনি।গুনে গুনে এক বছর আমাকে ঘুরিয়ে তারপর আমার সাথে বন্ধুত্ব করেছিল।বলতে গেলে রাইফের জীবনের একমাত্র এবং প্রথম বন্ধু আমি ছিলাম।তারপর তার সাথে বন্ধুত্ব করে বুঝতে পারলাম অল্প বয়েসেই অনেক কষ্টের দিন কাটাতে হয়েছে তাকে। এবং আস্তে আস্তে যখন রাইফের বাড়িতে যেতে শুরু করলাম তখন বুঝতে পারলাম রাইফ তার পরিবারের কারোর সাথেই কথা বলে না। সবার থেকেই কেমন দূরে সরে থাকে।আর পরেই আস্তে আস্তে রাইফের সাথে আমার বন্ধুত্ব গভীর হয়।
জানিস ছেলেটা সেভেনে উঠার পরেই বাহিরে কাজ খোঁজা চালু করে দেয়।আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম____
এই বয়সে কাজ করার কি প্রয়োজন তোর পরিবার তো বেশ সচ্ছল।
তখন সে জবাবে বলেছিল___
যেখানে আমার মা বাবা আমাকে বোঝা মনে করে ছেড়ে চলে গেছে, সেখানে আমি কি করে চাচা, দাদার টাকার উপর নির্ভর করে থাকি? নিজের খরচ আমি নিজেই বহন করতে চাই।তাই এখন কাজ খুঁজতে হচ্ছে। যেহেতু আমি সেভেনে পড়ি আমি টিউশন করাতে পারবো না। কিন্তু কাজ তো করতেই পারবো।
আমি সেদিন ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। ভাষাহীন হয়ে গিয়েছিলাম। এতটুকু বয়সেই ছেলেটা এত চাপ নিবে।তাকে দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারলাম না। তারপর জানিস বোন রাইফ সারাদিন স্কুলে থাকতো, বিকালে বাড়ি এসে স্কুলের সব পড়া কমপ্লিট করে মাগরিবের নামাজের পর কাজে লাগতো। ফার্মেসিতে বসতো।যখন দেখতো এই টাকায় হচ্ছে না,তখন ডেলিভারি বয় হয়ে সন্ধা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত।আবার রাতে এসে নামাজ পড়ে খাওয়া দাওয়া করে ১২টা পর্যন্ত এক্সট্রা পড়তো।
বলেই মাহিন থামলো। বন্ধুর কথা বলতে বলতে তার চোখ ভরে উঠেছে।মোহনারও চোখ ছল ছল করছে জলে। একটা মানুষ সব থাকতেও কতটা কষ্ট করেছে।এমন মানুষ আদৌও পাওয়া যায়? মোহনার মনে রাইফের পরিশ্রমের কাহিনী গভীর ভাবে গেঁথে গিয়েছে।
মাহিন গাল ফুলিয়ে শ্বাস নিয়ে আবার বলতে লাগলো___
জানিস রাইফ চাকরি করে মাসে পেতো মাত তিন হাজার টাকা। প্রথম প্রথম এই টাকা দিয়েই সে চলতো,দাদা,চাচাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। সেভেনে উঠার পর থেকে ছেলেটা ভালোমন্দ খাওয়া বন্ধ করে দেয়। কারণ তার টাকা দিয়ে তো সে খাবারই খেতে পারতো না ভালো করে।আমার বাড়ি এসে আমার ফোন থেকে ভিডিও দেখে দেখে রান্না শিখেছিল।জানিস ছেলেটা এক বেলা ভাত রান্না করতো বাকি তিন বেলা ভাতে পানি দিয়ে খেতো। বাড়ির সবাই শুধু রাইফের জেদ দেখে কান্না করেছে। কিন্তু কখনোই রাইফের জেদ কমাতে পারেনি।
ছেলেটা সকালে গরম ভাত দিয়ে আলু ভর্তা খেত, এবং বাকি বেলা ভাতের পানি দিয়ে কাঁচা মরিচ এবং পেঁয়াজ দিয়ে ভাত খেত। আমি কত বলতাম আমার বাড়ি চলে আয়, কিন্তু সে আসতো না। সবসময় বলতো ____
এমনিতেই এত বছর যাবত যে তার নিজের বাড়ির মানুষের দান করা কাপড় পরেছি, এসব মনে পড়লেই আমার কষ্ট লাগে, আত্মসম্মানে আঘাত লাগে। আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাবলম্বী হতে চাই।
সে যখন দেখলো তিন হাজার টাকা দিয়ে হচ্ছে না, তখন অনেক ঘুরাঘুরি করে প্রত্যেক শুক্রবারে কাজ করার জন্য একটি দারোয়ানের চাকরি খুঁজে পেলে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার রাত দশটা পর্যন্ত সে দারোয়ানের কাজ করতো। কোন কাজ কেই কখনো ছোট মনে করেনি।জানিস এত কষ্ট করে পড়াশোনা করার পরেও সে সবসময় ফার্স্ট হতো।আমি সারাদিন বাসায় শুয়ে বসে থেকেও তার সমান মার্ক কখনো পাইনি। সে সব সময় আমার থেকে এক দেড়শ মার্ক এগিয়ে থাকতো।
ক্লাস সেভেন থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত সে এভাবেই নিজের খরচ নিজেই চালিয়েছে। অবশ্য এর মাঝে কয়েকবার বৃত্তি পরীক্ষা দিয়ে সেখান থেকে টাকা পাওয়াতে তার বেশ সুবিধা হয়, এতে করে সেই এসএসসির ফরম ফিলাপ করতে পেরেছিল। বাসা থেকে টোটালি টাকা নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। এবং এসএসসির পর বাড়ি পর্যন্ত ছেড়ে চলে যায়। এখন বর্তমানে টিউশনি করা এবং পার্টটাইম জব করে দোকানে। এবং পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি কলেজেও সে টপ করে। আসলেই ছেলেটি জিনিয়াস।
বলেই চোখর কোণে জমে থাকা জল হাতে সাহায্যে মুছে ফেলল মাহিন।মোহনাও সম্পূর্ণ ঘটনা শুনে অনেকটা ইমোশনাল হয়ে পড়েছে। এক দিকে তাকিয়ে তার মা বাবা খাইয়ে দেয়, যখন যেটা চাই তখন সেটাই পাই, প্রয়োজনের থেকে বেশি তার চাহিদা থাকে তবুও সে ভালো করে পড়াশোনা করে না। অথচ একটা ছেলে কেবল তার আত্মমর্যতার কারণে সব থাকা সত্ত্বেও পরিশ্রম করে, নিজে খেটে আবার পড়াশোনাও করছে। ব্যাস রাইফের স্থান হয়ে গেল মোহনার মনে।মোহনা চোখে নয় পানি মুছে ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের রুমে চলে এলো এবং সেই ডায়েরটি বের হয়ে করে লিখতে বসলো।
মোহনার কিশোরী মনের অবাধ্য আবেগগুলো যখন সাদা পাতায় শব্দ হয়ে ঝরে পড়ল, তখন বাইরের আকাশজুড়ে কেবল সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার নেমেছে। টেবিল ল্যাম্পের মৃদু আলোয় সে তার ডায়েরিটা খুলে বসল। আজ তার কলম থামছে না, কারণ আজ পাতাজুড়ে কেবল একজনই বিচরণ করছে,যার অস্তিত্ব মোহনার জীবনে এক অলীক ধ্রুবতারার মতো।
ডায়েরির পাতায় মোহনা লিখল:
“প্রিয় ‘আপনি’,আজ আপনার নাম উল্লেখ করেই এই ডায়েরিটা লিখতে বসলাম। অবাক হচ্ছেন? আমি জানি, এই লেখা কোনোদিন আপনার চোখ অবধি পৌঁছাবে না, তবুও এই শূন্য পাতায় আপনার নামটা খোদাই করার মোহ আমি সামলাতে পারছি না।
আমি তো কেবল ক্লাস নাইনে পড়ি। আমার এই ছোট বয়সে কতটুকুই বা জীবন দেখেছি? কিন্তু আপনার সংগ্রামের গল্পগুলো যখন শুনি, তখন আমার ভেতরের কিশোরী মনটা এক অন্যরকম প্রেরণায় জেগে ওঠে। আপনার সেই হাড়ভাঙা খাটুনি, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের পথ চিনে নেওয়ার জেদ,এসবই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় মোটিভেশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন আমি পড়তে বসে ক্লান্ত হয়ে যাই, তখন আপনার কষ্টের কথা মনে পড়লে চোখের পাতা থেকে ঘুম উধাও হয়ে যাবে আজকের পর থেকে। ভাবব, আপনি যদি অতটা পথ একা পাড়ি দিতে পারেন, তবে আমি কেন পারব না?
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় কী জানেন? আমি আপনাকে এখনো দেখিনি। চোখে দেখিনি, কানে আপনার গলার স্বর শুনিনি,তবুও কেবল আপনার এই কষ্টের দিনগুলোর কথা শুনেই আপনার প্রতি এক গভীর মায়া জন্মে গেছে। কিশোরী মনে আপনার জন্য যে জায়গাটা তৈরি হয়েছে, সেটা কোনো দেখার সৌন্দর্যে নয়, বরং আপনার চরিত্রের অদম্য শক্তির প্রেমে। না দেখেই কাউকে এতখানি ভালোবাসা যায়, সেটা আপনাকে না জানলে আমার অজানাই থেকে যেত।
আপনি কি জানেন, আপনি এখন আমার অস্তিত্বের অংশ? আপনার কথা ভাবতে ভাবতেই হয়তো আমার জীবনের সেরা স্বপ্নগুলো ডানা মেলবে। ভালো থাকবেন আপনি, আপনার সেই অদেখা মুখটা দেখার নেশায় আমি নাহয় এই ডায়েরির পাতাতেই আপনাকে খুঁজে নেব।”
সে আরো লিখল—
“আজ ভীষণ ইচ্ছে করে, হঠাৎ কোনো এক বিকেলে আপনার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। খুব কাছ থেকে একবার দেখি সেই মানুষটাকে, যার কথা ভেবে আমার রাতের ঘুম উধাও হয়ে যাচ্ছে,এই যে আপনাকে না দেখে ভালোবাসার এক অদ্ভুত যাতনা, এর থেকে কি মুক্তি নেই? আমার এই ছোট চোখ দুটো কি কোনোদিন আপনার ওই শ্রান্ত কিন্তু দৃপ্ত চেহারার দেখা পাবে না?
আপনার জীবনের গল্পের পাতায় যখন আপনার হারিয়ে ফেলা জিনিসগুলোর কথা পড়ি, আমার বুকটা হু হু করে ওঠে। আপনার শৈশবের সরলতা, আপনার প্রিয় কোনো শখ কিংবা সেইসব অধিকার যা পরিস্থিতি আপনার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে,আমি চাই সেই সবটুকু আপনাকে ফিরিয়ে দিতে। আমি হয়তো এখনো অনেক ছোট, আমার সাধ্য খুব সামান্য; তবুও আমার খুব ইচ্ছে করে আপনার সবটুকু শূন্যতা আমার ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে দিতে।
আমি জানি না জীবন আপনাকে কতটা কাঁদিয়েছে, কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি,যদি কোনোদিন আপনার দেখা পাই, তবে আপনার হারিয়ে যাওয়া হাসিখুশি দিনগুলো আমি আমার সমস্ত মমতা দিয়ে আবার ফিরিয়ে আনব। আপনি যা হারিয়েছেন, তার চেয়েও অনেক বেশি প্রাপ্তি দিয়ে আপনাকে সাজিয়ে দেব। আপনার ওই পরিশ্রমী হাত দুটোকে আগলে রেখে বলব, ‘এখন থেকে আমি আছি তো আপনার পাশে’।”
ডায়েরিটা বুকের ওপর চেপে ধরে মোহনা জানলার বাইরে তাকাল। এক কিশোরীর এই নিঃস্বার্থ সংকল্প কি কোনোদিন সেই অদেখা ভালোবাসার মানুষটির কাছে পৌঁছাবে?
রাইফের জীবনযুদ্ধের সেই বিষণ্ণ গল্পগুলো শোনার পর মোহনার জগৎটাই বদলে গিয়েছিল। সেই যে নবম শ্রেণিতে পড়া এক কিশোরীর মনে জেদ চাপল,তাকে বড় হতে হবে, যোগ্য হতে হবে। ডায়েরির পাতায় জমানো সেই অদেখা মানুষটার প্রতি ভালোবাসা আর দোয়া ছিল তার নিত্যদিনের সঙ্গী। প্রতি মোনাজাতে সে কেবল একবার সেই মানুষটাকে দেখার আকুতি জানাত।
সময় তার আপন গতিতে বয়ে চলল। দেখতে দেখতে এলো এক অলস শুক্রবারের দুপুর। বাইরে তপ্ত রোদ, আর ঘরের ভেতর মোহনা তখন সম্পূর্ণ নিজের মেজাজে। পরনে তার ঢিলেঢালা একটা প্লাজো আর হাঁটু সমান লম্বা এক ঢিলেঢালা হলুদ টপস। টপসটির বুকে বড় করে ডোরেমন কার্টুনের ক্যারেক্টার ‘ডোরামি’র ছবি আঁকা। মোহনার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই; সে সোফায় বেশ আয়েশ করে আধশোয়া হয়ে হাত-পা ছড়িয়ে কার্টুন দেখায় মগ্ন। এক হাতে চিপসের প্যাকেট, অন্য হাত দিয়ে আপন মনে মুখ চালাচ্ছে সে। কিশোরীবেলার চপলতা আর কার্টুনের প্রতি অগাধ মুগ্ধতা তাকে যেন এক অন্য ভুবনে নিয়ে গেছে।
ঠিক তখনই দরজায় কলিং বেলের শব্দ হলো। বাড়ির কাজের মহিলা দরজা খুলে দিতেই ভেতরে পা রাখল রাইফ। ভেতরে আসতেই রাইফের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল লিভিং রুমের সোফার দিকে। সেখানে এক কিশোরী অদ্ভুত অবহেলায় হাত-পা ছড়িয়ে ডোরেমন দেখছে। মোহনা বুঝতেও পারেনি তার সেই আজন্ম লালিত প্রার্থনার মানুষটি আজ তারই ঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে।
রাইফ বিস্ময় নিয়ে তাকালো মেয়েটির দিকে। হলদেটে টপসে আঁকা কার্টুন চরিত্র আর মেয়েটির বসার ভঙ্গি দেখে রাইফের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। এমনিতেই ভীষণ ক্লান্ত ছিল কাজের চাপ এবং পড়াশোনার চাপের জন্য।এখান দিয়ে টিউশন পড়িয়ে যাচ্ছিল তাই ভাবলো যাওয়ার আগে একবার নিজের বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করে যাওয়া উচিত।তাই ঘামাক্ত শরীর নিয়ে চলে এলো এই বাড়িতে। মুখে এক চিলতে হাসি না থাকলে এখন এই মেয়েটিকে দেখে মুখে হাসি ফুটে উঠলো তার।মেয়েটির নাম সে জানে না, পরিচয়ও অজানা,কিন্তু তার ওই হলদে পোশাকের ওপর আঁকা ছবিটা দেখে রাইফের মনে হলো—এ যেন রক্ত-মাংসের কোনো মানবী নয়, বরং কার্টুনের জগত থেকে উঠে আসা কেউ। অবচেতন মনেই রাইফ বিড়বিড় করে বলে উঠল, “ডোরামি!”
রাইফ মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল মেয়েটির দিকে। তার মনে মনে এক অদ্ভুত দোলাচল—হলুদ টপসের ওপর আঁকা সেই কার্টুন চরিত্রটার সাথে মেয়েটির সারল্য যেন মিলেমিশে একাকার। সে নিজের মনেই এক গোপন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, আজ থেকে এই নামহীন মেয়েটি তার কাছে কেবলই ‘ডোরামি’। কিন্তু কথা হচ্ছে এই মেয়েটিকে সে চেনে না।ঠিক তখনই তার মনে পড়ল, তার প্রাণের বন্ধুর একটা ছোট বোন আছে যার কথা সে প্রায়ই বলে। তবে কি এই সেই মেয়ে? রাইফের ঠোঁটের কোণে প্রশান্তির এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
অন্যদিকে, কার্টুনের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা মোহনা হঠাৎ অনুভব করল চারপাশের বাতাসে এক অচেনা স্তব্ধতা। কেউ একজন গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকে দেখছে। মনের ভেতরে এক অজানা শিহরণ বয়ে গেল। মোহনা যখন সোফায় আয়েশ করা অবস্থা থেকে সামনে তাকালো, তার সময়টা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে এক দীর্ঘদেহী, অত্যন্ত সুদর্শন যুবক। যার তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত মায়া। চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।রাত জাগার কারণে চোখের নিচে কালি জমেছে।মোহনা আগে কখনো এই মানুষটিকে দেখেনি। পরক্ষণেই নিজের অগোছালো অবস্থার কথা মনে পড়তেই তার কান-মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। সে বিদ্যুৎবেগে সোজা হয়ে বসল। সোফায় আর মেঝেতে অবহেলায় গড়াগড়ি খেতে থাকা ওড়নাটা তড়িঘড়ি করে তুলে নিয়ে মাথায় আর গলায় জড়িয়ে নিল। নিজের চপলতা ঢাকা দেওয়ার এক আপ্রাণ চেষ্টা।
দুজনের চার জোড়া চোখ যখন এক বিন্দুতে মিলিত হলো, মোহনার বুকের ভেতরটা যেন কালবৈশাখী ঝড়ের মতো কাঁপতে লাগল। সে তার সমস্ত বুদ্ধি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল,কে এই আগন্তুক? এই কি তবে সেই মানুষ, যার কথা ভেবে সে ডায়েরির পাতাগুলো ভিজিয়েছিল?তার মন তো এই কথাই বলছে।
মোহনা যখন দ্বিধা আর বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে, রাইফ তখন এক বুক দোলানো হাসি মুখে নিয়ে ধীরে ধীরে মোহনার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। রাইফের ওই হাসি যেন মোহনার মনে মনে জমানো সব প্রশ্নকে এক নিমেষে উধাও করে দিচ্ছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে মোহনার বড় ভাই মাহিন ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করল। দরজায় রাইফকে দেখে তার মুখে এক চিলতে চওড়া হাসি ফুটে উঠল। “আরে বন্ধু! তুই শেষমেশ আসলি তাহলে!” বলতে বলতে সে রাইফকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। রাইফও পরম মমতায় তার বন্ধুকে পাল্টা আলিঙ্গন করল।
দুই বন্ধুর এই আন্তরিক মিলনের দৃশ্য দেখে মোহনার মনে জমে থাকা কুয়াশা এক নিমেষে পরিষ্কার হয়ে গেল। তার হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তারপর এক তীব্র গতিতে ছুটতে শুরু করল। মোহনা বুঝতে পারল, এই সেই মানুষ, যার অদেখা জীবনের গল্পগুলো তাকে রাত জেগে পড়তে শিখিয়েছে, যার পরিশ্রমের কাহিনি তার কিশোরী মনে বিদ্রোহ এনেছে। ডায়েরির পাতায় পাতায় যে মানুষটাকে সে গড়ে তুলেছিল, সে আজ রক্ত-মাংসের শরীরে তারই সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
মোহনা অপলক দৃষ্টিতে রাইফের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ভেতরে এক প্রলয়ংকরী তোলপাড় শুরু হয়েছে; একদিকে অদম্য আনন্দ, অন্যদিকে এক গোপন দীর্ঘশ্বাস। এই মানুষটিই তো তার সেই পরম আরাধ্য ‘আপনি’। খুশিতে আর আবেগে মোহনার চোখের কোণ ভিজে উঠল, লোনা জল যেন উপচে পড়ার অপেক্ষায়। ঝাপসা দৃষ্টিতে সে দেখতে পেল রাইফের সেই হাসিমুখ, যা এখন তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য।
বিস্ময়, মুগ্ধতা আর প্রাপ্তির এই এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে মোহনা সোফায় স্থির হয়ে বসে রইল। তার কিশোরী মনের সেই একতরফা ভালোবাসার মানুষটি আজ তার ঘরে, তার ভাইয়ের প্রিয় বন্ধু হয়ে উপস্থিত।
মাহিন রাইফকে আলিঙ্গনমুক্ত করে স্মিত হাসিতে বোনের দিকে তাকাল। মোহনার তখনো ঘোর কাটেনি, সে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাহিন রাইফের কাঁধে হাত রেখে মোহনার দিকে ইশারা করে বলল—
“আর বনু, এই যে দেখ—এই হলো আমার সেই জানের দোস্ত রাইফ। যার কথা তোকে অনেক বলেছি।”
তারপর রাইফের দিকে ফিরে নিজের আদরের বোনকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া জন্য বলতে লাগলো__”আর রাইফ, ও হলো আমার জান, আমার কলিজা। আমার একমাত্র ছোট বোন। ওর নাম হলো—”
মাহিন নামটা শেষ করার আগেই রাইফ ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমি মাখা হাসি ফুটিয়ে তুলল। মোহনার হলুদ পোশাক আর তার একটু আগের কার্টুন দেখার ভঙ্গিটার দিকে তাকিয়ে সে বেশ সাবলীল ভঙ্গিতে বলে উঠল, “সম্ভবত ‘ডোরামি’!”
মুহূর্তেই ড্রয়িং রুম জুড়ে মাহিনের অট্টহাসি ফেটে পড়ল। “হা হা হা! দোস্ত, তুই ঠিকই ধরেছিস, ওর কাণ্ডকারখানা একদম ওই কার্টুনের মতোই।”
মোহনার কান-মুখ নিমেষে লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠল। সে মাথা নিচু করে নিজের ওড়নার খুঁট আঙুলে পেঁচাতে লাগল। কিশোরী মনের সেই গোপন রাজপুত্র তাকে আজ এমন এক অদ্ভুত নামে ডাকবে, তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। তার ইচ্ছে করছিল ওই সোফার নিচে কোথাও লুকিয়ে যেতে, কিন্তু তার পা দুটো যেন মেঝেতে আটকে গেছে।
রাইফ কিন্তু তার দৃষ্টি সরাল না। সে মোহনার সেই লজ্জারাঙা মুখটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে এক অসীম প্রশান্তি অনুভব করল।
মাহিন হাসি থামিয়ে বলল, “বনু, যা তো—আমাদের জন্য কড়া করে চা আর কিছু নাস্তা নিয়ে আসতে বল মাকে। আজ রাইফকে সহজে ছাড়ছি না।”
মোহনা কোনো কথা না বলে দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দিকে হাঁটা দিল। যাওয়ার সময় সে অনুভব করল, রাইফের গভীর চোখ দুটো তখনো তাকে অনুসরণ করছে। রান্নাঘরে গিয়ে সে যখন দরজার আড়ালে দাঁড়াল, তার বুকটা ধকধক করে কাঁপছে। আয়নায় নিজের লাল হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে সে বিড়বিড় করে বলল, “ডোরমি! উনি আমাকে ডোরমি বলে ডাকলেন?”
ভয় আর আনন্দ,দুটো বিপরীতমুখী আবেগ মোহনার কিশোরী মনে এক বিচিত্র অনুভূতি জাগিয়ে তুলল। সে কি জানত, তার ওই হলুদ টপসটা আজ তার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় স্মৃতির অংশ হয়ে যাবে।
রাইফের কণ্ঠস্বরে মোহনার মনন ভাঙল। চোখের পলকে বদলে গেল দৃশ্যপট। নেই সেই কিশোরীবেলার হলুদ টপস, নেই সেই পুরনো ড্রয়িং রুম। মোহনা বাস্তবে ফিরে এসে দেখল সে রাইফের গাড়িতে বসে আছে, আর গাড়িটা রাইফের বাড়ির সামনে পার্ক করা। মোহনা বিমূঢ় হয়ে প্রশ্ন করল, “আমি আপনার বাড়িতে কেন?”
রাইফ সিট বেল্ট খুলতে খুলতে অবাক চোখে তাকাল। “এতক্ষণ ধরে গাড়িতে তাহলে কী বললাম তোমাকে? মা বলেছে শপিংয়ে যাবে তোমাকে সাথে নিয়ে, তাই তো এখানে নিয়ে এলাম। এখন কথা না বাড়িয়ে জলদি নামো তো! ফ্রেশ হয়ে আবার বের হতে হবে।”
মোহনা কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে গাড়ি থেকে নামল। বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই এক গুমোট পরিবেশ। ড্রয়িং রুমে রাইফের বাবা, চাচা আর সেই চাচাতো বোন প্রিয়া সবাই উপস্থিত। রাইফের মা হন্তদন্ত হয়ে এসে মোহনার হাত ধরে সোফায় বসালেন। মোহনার মাথায় তখনো অতীতের সেই ডায়েরির পাতাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। রাইফের মা আদর মাখা স্বরে বললেন, “বিয়ের শপিং কি তোকে ছাড়া হয় রে মা?”
মোহনা মলিন এক চিলতে হাসল। আর কত কি দেখতে হবে তাকে। নিজের ভালোবাসার মানুষটির বিয়ে হচ্ছে অন্য কারো সাথে এবং তাদের শপিং করতে হবে তাকে। কিন্তু রাইফ পুরোটা সময় অন্ধকারে ছিল। তার মনে হলো তার মা হয়তো তার আর মোহনার বিয়ের বলছেন।সে বিভ্রান্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “মা, কার বিয়ের কথা বলছ তুমি?”
রেশমা আক্তার কিছুটা ইতস্তত করে আমতা আমতা করে বললেন,
“আসলে… তোর বিয়ে ঠিক করেছি বাবা। আজ সেই বিয়েরই শপিং করতে যাব আমরা।”
মুহূর্তেই রাইফের মনের আকাশে যেন হাজারটা আতশবাজি ফুটে উঠল। তার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা দুষ্টু হাসিটা ফিরে এল। সে আড়চোখে একবার মোহনার দিকে তাকাল। তার মনে মনে তখন প্রবল বিশ্বাস—নিশ্চয়ই মা মোহনার কথাই বলছেন, নতুবা তাকে কেন শপিংয়ের জন্য এখানে আনা হবে? রাইফের ভেতরে তখন বসন্তের হাওয়া বইছে।
অন্যদিকে, প্রিয়াও বেশ অবাক হলো। কারণ সে নিজের চাচাতো ভাইয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে এই কথাটি জানেনা।
রাইফ তখন উত্তেজনার তুঙ্গে। সে হাসি মুখে মায়ের একদম কাছে গিয়ে প্রশ্ন করল, “বিয়ে ঠিক করে ফেলেছ? কার সাথে মা?”
তবু গল্পটা ভালোবাসারই পর্ব ১১
রাইফ কেবল একটি নাম শোনার অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল—’মোহনা’। কিন্তু রাইফের মা তার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, “তোর চাচাতো বোন প্রিয়ার সাথে।”
মুহূর্তেই রাইফের হাসিমুখটা পাথরের মতো জমে গেল। মোহনার বুকের ভেতরটা যেন এক নিমিষেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। যে মানুষটাকে নিয়ে সে এতক্ষণ সোনালী অতীতে বিচরণ করছিল, বর্তমান তাকে এক নিষ্ঠুর সত্যের মুখোমুখি এনে দাঁড় করালো। আগে থেকে জানলেও এখন যেন আবার পুরনো কষ্ট মনে পরল।
