তাকদীর পর্ব ১০
নিরুর কল্পনারাজ্য
বউয়ের হাতে থাপ্পড় খাওয়ার অনুভূতি আসলে কেমন হয়? জুনায়েদ আজ বোধহয় তা অক্ষরে অক্ষরে ঠাহর করে উঠতে পারলো। নিজের মন-মস্তিষ্ক-হৃদয় সবকিছুর সাথে লড়াই করেও তার ভেতরের জেদ-বিরক্তি একইসাথে রাগ সে দমন করতে সক্ষম হলোনা। চোখ ঘুরিয়ে সে রুহানি সৈয়দের পানে চায়লো। চোখদুটো তখন সম্পূর্ণ লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। পরিবেশ বড্ড থমথমে। ক্রন্দনরত আমিরার চোখের অশ্রুজলও নিঃশেষিত হওয়ার পথে। অবাক দৃষ্টে সে চেয়ে রয়েছে জুনায়েদের পানে। যে আপাতত একবারের জন্যেও আয়রার পানে ফিরে চায়নি। জুনায়েদ রুহানি সৈয়দের পানে তাকিয়ে তাকে কী বোঝাতে চায়লো? নাকি নিজের রাগ দমাতে চায়ছে? জুনায়েদের শ্বাসগুলো ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। তার শরীর কাঁপছে। তাকে মারার স্পর্ধা পর্যন্ত আজ অব্দি কারও হয়নি। অথচ আয়রা…সে দৃষ্টি নামায় মেঝেতে। হাতে থাকা হেলমেটখানা ছুঁড়ে ফেলে দেয় বিনাবার্তায়। বিকট শব্দে শব্দদূষণ করে দূরে গড়িয়ে পড়ে তা। পরপরই সে প্রস্থান গ্রহণ করে বড় বড় পদক্ষেপে। তার মস্তিষ্কে রাগের পারদ এতোটাই যে তার নীল আকাশতুল্য মণিদুটোতে আবছা পানির ছটা দেখা দিয়েছে। সে আর একবারও পিছু ফিরে চায়না। বাইকটা নিয়েই বেরিয়ে পড়ে।
অপরপ্রান্তে আয়রা নিজেও রাগত্ব কারণে কাঁপছে। অস্বাভাবিক সে কম্পন। চোক্ষুদুটোতে ভর করেছে আগ্নেয়সম জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড। বড় শ্বাস ফেলে সে নিজেকে শান্ত করতে চায়লো। আমিরার পানে চেয়ে সে ব্যস্ত হলো। উদ্বীগ্ন এবং ছটফটে কন্ঠে শুধালো নিজের অংশকে,
— আম্মু, আপনি ঠিক আছেন তো? হু? কোথাও লাগেনি-তো?
আমিরা বিনাশব্দে ফুঁপানো মুখশ্রীতে চেয়ে থাকে মায়ের উদ্বীগ্ন আদলের পানে। সে বুঝে উঠতে পারছেনা তার আঙ্কেলকে তার আম্মুজান মারলো কেনো? আয়রা আমিরার চোখেমুখে হাত বুলিয়ে দেয়। চুমু খায় প্রগাঢ় শব্দে। রুহানি সৈয়দ অবাক চোখে পরখ করে সবটা। আয়রা কী আমিরাকে নিয়ে একটু বেশিই সেনসিটিভ নয়? আয়রার আমিরার প্রতি এমন অতিরিক্ত চিন্তা তার বিচক্ষণ মনে খটকা জাগালো। তিনি বাচ-বিচার ছাড়া আয়রাকে কিছু না বলার সিদ্ধান্ততে উপনীত হলেন। তাতে হয়তো ঝামেলা আরও বাড়তে পারে। তিনি ভরসার কাধ স্বরূপ আয়রার নৈকট্যে পৌঁছালেন। আয়রার ভরসার কাধ হয়ে তার কাধে নিজের বাম হস্তখানা রাখলেন। আলতো স্বরে ডাকলেন,
— আয়রা?
রুহানহ সৈয়দের মিষ্টিমধুর; কোমল কন্ঠস্বর আয়রার কর্ণকুহর পেরিয়ে মস্তিষ্কে প্রবেশ করতেই সে সামান্য কেঁপে উঠলো। টনক নড়লো তার। সে রুহানি সৈয়দের পানে ফিরে চায়লো। চোখদুটোতে পানির ছটাক স্পষ্ট। রুহানি সৈয়দ ধীরলয়ে শুধালেন,
— আয়রা? কী হয়েছে তোমার? কিছুক্ষণ আগে অমন ব্যবহারের কারণ কী?
আয়রা স্তব্ধ হয়ে রইলো। কিছুমুহূর্ত পূর্বের কথা স্মরণ হতেই সে লজ্জায় মাথানত করে ফেললো। তার মনে পড়লো—সে নিজের স্বামীর গায়ে হাত তুলেছে। আয়রা আমিরাকে বুকে জড়িয়ে নিলো। তার তরফ হতে কোনো উত্তর না আসায় রুহানি সৈয়দ এবারে খানিকটা স্বর উঁচালেন,
— আয়রা? কথা বলো বলছি।
আয়রা কেমন অদ্ভুত আচরণে মত্ত। এই মুহূর্তে তার চোখ হতে জল গড়িয়ে পড়ছে যা অবিশ্বাস্য। রুহানি সৈয়দ অবাক হলেন। তিনি এবার সম্পূর্ণ আয়রার সম্মুখে বসে পড়লেন। তার কাধ ঝাঁকিয়ে সে শুধালেন মোলায়েম কন্ঠে,
— আয়রা? এই মেয়ে, কাঁদছো কেনো? কিছুই হয়নি এখানে। ভুলে যাও কিছুক্ষণ আগের ব্যাপার। ওসবের জন্য তুমি নিজের চোখের পানি কেনো নষ্ট করছো? এখানে জুনায়েদের ও দোষ আছে। এভাবে কেঁদো না তুমি। তোমার বুকের ধন তো তোমার কাছে ফিরে এসেছে।
আয়রা অবাধ কান্নায় ভেঙে পড়লো। মা’কে কাঁদতে দেখে ছোট্ট আমিরা আপনাআপনি কেঁদে ফেললো। আয়রা নিজের মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আরও জোরে কেঁদে ফেললো। তার মনে পড়ে গেলো অতীতের সেই দূর্বিষহ এক ঘটনা যা এখনও আয়রার মাতৃমনকে সর্বদা তটস্থ রাখে। রুহানি সৈয়দ বহুকষ্টে আয়রাকে ধরে উঠে বসালেন সোফায়। রেগে না গিয়ে বরং পানির গ্লাস এগিয়ে দিলেন আয়রার পানে। আয়রা তখনও ডুকরে উঠছে ক্রমশ। আমিরা কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। সম্পূর্ণ বিশ মিনিট পর আয়রার কান্না থামলো। রুহানি সৈয়দ এ’সময়টাতে ভীষণ ভালোভাবেই আগলে রেখেছে তাকে। তিনি আয়রার বেরিয়ে আসা; অগোছালো কুন্তলবৃন্দ কানের পিঠে গুঁজপ দিতে দিতে নরম সুরে শুধালেন,
— আম্মু, কী হয়েছে? এমন আচরণের কারণ কী?
আয়রা মাথানত করে বসে থাকে। অস্ফুটে বলে,
— আমাকে মাফ করুন, আম্মু। আমি আর কখনো এমন কাজ করবোনা।
আয়রার প্রতিটি লাফজের কোথাও না কোথাও যন্ত্রণা লুকিয়ে ছিলো। সে বোধহয় নিজেকে তখন গোনাহের ভাবছিলো। সে ভীষণ অনুতপ্ততায় ভুগছিলো। সৈয়দ রুহানি ব্যাপারখানা বুঝতে পেরে তাকে বললেন,
— আয়রা, তুমি চাইলে আমার সাথে তোমার যন্ত্রণাগুলে ভাগ করতে পারো। আশা রাখছি, এ’কদিনে আমি তোমার বিশ্বাসযোগ্য হতে পেরেছি।
আয়রা ডাগর ডাগর চোখের পলক ঝাপ্টে চোক্ষু নিবেশ করে তার শ্বাশুড়ির পানে। তিনি ওপর-নিচ মাথা নাড়তেই সে আশ্বস্ত হলো। আমিরাকে বুকের সাথে আরেকটু আঁকড়ে ধরলো। অন্যমনষ্ক হয়ে মেলে ধরলে বিষাদে ভরপুর কিছু স্মৃতির পাতা।
—দিনটি ছিলো চাকচমক্কে ভরপুর। আমিরার তখন ১ বছর। আমিরার আব্বু তার সকল বিজন্যাস পার্টনারদের আমাদের বাড়িতে অর্থাৎ আমার প্রাক্তন শ্বশুর বাড়িতে দাওয়াত দিয়েছিলেন। আমিরাকে নিজের কক্ষে রেখে আমি রান্নাঘরে নিজের কাজ করছিলাম। সাথে ছিলেন আমার শ্বাশুড়ি। দুপুরের দিকে রান্নাবান্না শেষ করে আমি আমাদের কক্ষে প্রবেশ করলাম। ঘর্মাক্ত এবং তৈলাক্ত চেহারাতে যখন দেখলাম আমার মাত্র একবছরের বাচ্চাটা তার জন্য বরাদ্দকৃত দোলনায় নেই তখন আমার মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়েছিলো। আমি সারাকক্ষ তন্নতন্ন করে খুঁজে ফিরলাম। কোত্থাও আমার বাচ্চাটাকে আমি পেলাম না।আমার বাচ্চাটাতে হাঁটতে জানতোনা সেসময়। কেবল আদো আদো স্বরে কয়েকটি লাফজ তার দ্বারা উচ্চারণে সক্ষমতা পেতো। অপারগ হয়ে আমি আমিরার আব্বুর কাছে জরুরি তলব পাঠালাম।
তিনি তখন খোশগল্পে মশগুল ছিলেন। আমি ভয়ে ছটফট করছিলাম। আমার বাচ্চাটাকে আমি সারাবাড়ি খোঁজালাম। কোথাও পেলাম না। ড্রইংরুমে আমিরার আব্বুর বন্ধুরা উপস্থিত ছিলো বিধায় আমার যাওয়া সম্ভব হয়নি। সে আসতেই আমি সমস্তটা তাকে খুলে জানালাম। সে চমকে গিয়ে আরও একবার সকল জায়গায় খুঁজে বেরালো। মেয়েকে আমরা পেলাম না। দু’জনের অব্স্থা-ই তখন যাচ্ছে-তাই। আমি বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরের দরজা হয়ে বাহিরে বেরোলাম। আমিরার দাদীজান তখন সকলকিছু সামলাচ্ছিলেন। আমি বাগানের দিকটা যেতেই আমার চোখদুটো আতঙ্কে ভরে উঠেছিলো। বাগানের সেই মেঠো স্থানে আমার এক বছরের বাচ্চাটা পড়ে ছিলো। সম্পূর্ণ অনাবৃত অবস্থায়। তার বাচ্চা কন্ঠের ক্রন্দনের আওয়াজে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এবং আমার বাচ্চার সামনে যে লোকটি ছিলো সে ছিলো আমিরার আব্বুর সবচেয়ে বিশ্বস্ত কলিগ। জোয়ার্দার বংশের সর্বসেরা বন্ধন তাদের পরিবারের সাথেই ছিলো। সে আমার ওই এক বছরের মেয়েটার সাথে…….
আয়রা চোখ বুজে নিলো। তার বুক কেঁপে উঠলো। সে মা হয়ে যা সহ্য করেছে তা রুহানি সৈয়দ কল্পনাও করতে পারলেন না। তিনি নিজেও আর্তনাদ করে উঠলেন চাপা স্বরে,
— ইয়া আল্লাহ!
আয়রা আবারও বলতে আরম্ভ করে,
— আমার মেয়েটা কাঁদছিলো। আর সে লোক নিজের তৃপ্তি মেটানোর উদ্দেশ্যে আমিরার ছোট্ট দেহকে নিজের পুঁজি করতে যাচ্ছিলো। আমি দিগ্বিদিক শূণ্য হয়ে পাশে থাকা ইটের দ্বারা তাকে সজোড়ে আঘাত করলাম। সে সেখানেই পড়ে রইলো। সেসময় আমার জানার ইচ্ছে ছিলোনা ওই লোক বেঁচে ছিলো নাকি মৃত। আমি কেবল আমার মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে গিয়েছিলাম।
রুহানি সৈয়দ এতক্ষণে বুঝতে পারলেন। সকালে যখন আমিরা নিখোঁজ হলো তখন আয়রা কেনো এতোটা উন্মাদ হয়েছিলো। আয়রা এখনও সেই আকস্মিক ঘটনা হতে বের হতে পারেনি। অস্বাভাবিক নয়। এমন নতুন স্থানে তো আরও নয়। তিনি প্রশ্ন ছুড়লেন,
— আমিরার বাবা? সে কী করেছিলো?
শ্লেষাত্মক হাসে আয়রা। জবাবে বলে,
— তাকে আমি জানিয়েছিলাম। তার প্রত্যুত্তর ছিলো খানিকটা এমন—‘আমিরা, তুমি এ ব্যাপার নিয়ে জলঘোলা করোনা৷ আমি বুঝতে পারছি বিষয়টা, আমিরা তো আমারও মেয়ে। কিন্তু দেখো, এতে আমাদের অনেকটা সম্মানহানি সাথে বিজন্যাসে লস হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আব্বু রেগে যেতে পারেন। আমিরার তো কিছু হয়নি। সে লোককে আমরা পরে দেখে নেবো!’ এরপর থেকে আমি আর কাওকে বিশ্বাস করতে পারিনা আম্মাজান। কাওকে না!
রুহানি সৈয়দ কিছু বলার ভাষা পেলেন না। কেবল চুপটি করে আরেক মায়ের বিশ্বস্ত কাধ হলেন। এজন্যই বুঝি সৃষ্টিকর্তা সকলকে সকল পরিস্থিতি ধৈর্য্যের সহিত সামলাতে বলেছিলেন? এখন যদি ছেলের আঘাতের প্রতিফল স্বরূপ রুহানি সৈয়দ আয়রাকে ভালো-মন্দ বলপ ফেলতো তবে পরিস্থিতি নিশ্চয় এতো শান্ত হতোনা? একারণেই সকল পরিস্থিতিতে ধৈর্য্যধারণ করা অতিবার্চনীয়। রুহানি সৈয়দ এমুহূর্তে তা অক্ষরে অক্ষরে ঠাহর করতে পারলেন।
নাইট ক্লাবের এককোণে বসে আছে জুনায়েদ। একের পর এক মদের গ্লাস শেষ করে যাচ্ছে সে। অবশিষ্ট থাকছেনা বোতলগুলোও। বন্ধুমহল তার চেয়ে আছে তার পানে। রাফি-রুদ্র-অরিন-হৃদ-আয়ান নজর ঘুরিয়ে বারংবার জুনায়েদের পানে রাখছে। বাম গালের ভাঁজে ভাঁজে দেখা যাচ্ছে পাঁচ আঙুলের ছাপ যা ফর্সা ত্বকে রক্তের লাল আভার ন্যায় ছোপছাপ দাগ ফেলেছে। চোখ তাদের বিস্ফোরিত। এহেন দুঃসাহসের কর্ম কার করার কথা? আয়ান অবাক কন্ঠে শুধায়,
— ব্রো, কী হয়েছে তোর?
জুনায়েদ একপ্রকার রাগী দৃষ্টে তাকালো আয়ানের পানে। আয়ান হতচকিত হয়ে দমে গেলো। জুনায়েদ লাল দ্রবণের গ্লাসখানা নিজের মধ্যমা এবং বৃদ্ধা আঙুলের সহিত দুলিয়ে কিছুপল আগের মুহূর্তের কথা মনে করলো। অরিন মেকি সহানুভূতি দেখাতে জুনায়েদের কাছ ঘেষে বসতে চায়লো। জুনায়েদের সোফার হাত রাখার স্থানটাতে স্বতস্ফূর্ততায় বসে সে জুনায়েদকে ধরতে যায়, চড় মারা স্থানে হাত বুলাতে গিয়ে বলে ওঠে,
— বেইব, হোয়াট হ্যাপেন্ড হা? তোর মুখে এমন মারের দাগ?
জুনায়েদ মদ্যপ অবস্থায় তার ডান হাতের পাঁচ অঙ্গুলি উঁচিয়ে তার পানে না তাকিয়েই তাকে থামায়। তর্জনী এবং মধ্যমা একত্র করে বাকি আঙুলগুলো ভাঁজ করে ‘আউট’ ইশারা করতেই থমথমে হয়ে গেলো অরিনের মুখখানা। বেলুনের ন্যায় চুপসে গিয়ে এইটুকুনি হয়ে গেলো তার সুশ্রী আদলখানা। সে কপট রাগ দেখিয়ে শুধালো,
— তোর হয়েছে কী বল তো? আমাকে এভাবে ইগনোর করছিস কেনো? এইদিনও তো আমাকে নিয়ে বাইকে নিয়ে নিয়ে ঘুরেছিস তুই। ডোন্ট টেল মি দ্যাট ওই গ্রিডি মহিলাটাকে বিয়ে করে তুই ওর প্রতি ফিলিংস গ্রো করতে স্টার্ট করেছিস।
মুহূর্তেই হাসির রোল পড়ে গেলো সকলের মাঝে। রাফি তো হাসতে হাসতে জবাব দিয়েই ফেললো,
— ডুড, ও? আর ফিলিংস? শালা কতগুলো মেয়ের মন নিয়ে খেললো।একটাকেও পাত্তা দিলোনা আর ওই এক বাচ্চার মা আর কী? আর ইয়্যু ম্যাড অর হোয়াট?
হৃদ সম্মতি জানালো,
— রাফি ইজ রাইট। অরিন, তুই কী মেয়াদউত্তীর্ণ কিছু খেয়েছিলি?
রুদ্র বিরক্ত হলো,
— থাম তোরা। ও তো জাস্ট এমনিই প্রেডিক্ট করেছে। রোস্ট করার কী হলো?
রাফি মুচকি হাসলো। খোঁচা মেরে বললো,
— বন্ধু, পেয়ারে লাল আমার—পাত্তা না পেয়েও কোনো পুরুষ কীভাবে কারও পিছনে পড়ে থাকে তা তোর থেকে শেখা উচিত।
আয়ান আর হৃদ হেসে উঠলো। রুদ্র শক্ত চোয়ালে অরিনের পানে তাকালো্ যার আপাতত বিরক্তির স্বর,
— উফফ, থামবি তোরা? দেখছিস আমার হার্টবিটের মুড অফ এর মাঝেও এইসব?
রাফি-হৃদ-আয়ান তারা তিনজন থামলো তো না উল্টে খিল্লি ওড়াতে তিনজন মেতে উঠলো। তাদের আড্ডার মূল আকর্ষণ–‘চড় টা কে মেরেছে? জুনায়েদের মা? নাকি সেই এক বাচ্চার মা?’
জুনায়েদের কর্ণে সেসব ঢুকলো বলে মনে হলো না। সে তীক্ষ্ণ চোখে গ্লাসের পানে তাকিয়ে। সে সেই মুহূর্তটা মনে করলো যখন আয়রা তাকে চড় মেরেছিলো। সে সময়…সেসময় জুনায়েদ আয়রার চোখের দিকে তাকাতে পারেনি। কেনো পারেনি? তার নিদারুণ এক উত্তর হলো–❝যায়নাব জুনায়েদ শাহরিয়ার–যে সর্বদা সকলের সাথে বেয়াদবি করে এসেছে, কোনো রমণীর কথা অথবা অনুভূতির ধার ধারেনি সে চেয়েছে যাতে ওই মেয়েটি যার মাঝে জুনায়েদ কৃষ্ণগহ্বর বিনা কিছুই খুঁজে পায়না সেই মেয়েটির চোখ তার রাগান্বিত চোখদুটোর দর্শক হোক। জুনায়েদ চায়নি–ওই রমণীটি তার রাগের সাথে পরিচিত হোক, তার হিংস্র চোখ দু’খানা দেখুক। সেকারণেই তো সে সেসময় মেঝেতে দৃষ্টি ফেলেছিলো তাকে থাপ্পড় মারার পরও।❞
জুনায়েদের অন্যমনষ্ক খেয়ালের ফায়দা অরিন লুটে নিতে চায়লো। সে একটি মদের গ্লাস নিজের হাতে নিয়ে লুকিয়ে তার হাতের ভাঁজে থাকা গুঁড়ি করা ড্রাগস যা শারীরিক চাহিদার উৎস তৈরি করে তা মেশানোর চেষ্টায় নিমজ্জিত হলো। জুনায়েদ ওসব খেয়ালও করলোনা। বলাবাহুল্য কেও-ই খেয়াল করলোনা। কেবল একজোড়া চোখ বাদে। রুদ্র! রুদ্রর রক্তাভ বর্ণের চোখদুটো অরিনের কাজ ঠিক ধরে ফেললো কেননা তার দৃষ্টি অরিন হতে হটেইনি। সে চেয়ে রইলো একদৃষ্টে। বক্ষস্থলে পিঞ্জিরাবদ্ধ হৃদযন্ত্রটি তখন রক্তক্ষরণের স্বীকার হয়েছে। রুদ্র হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ করে ফেললো। চোখে জল নামলো। অরিন..অরিন..অরিন..এই মেয়েটাকে সে ভালোবাসে। পাগলের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। অথচ তার কিছুই করার নেই। সে আবদ্ধ কোনো এক রুদ্ধদ্বারের মাঝে। যার নাম ‘সম্পর্ক।’ রুদ্র তো আদৌতেই কেও হয়না অরিনের। সে কী করে আটকাতে পারে তাকে? আটকালেও সে কী থামবে? জুনায়েদকে পেয়ে গেলে অরিন তাও খারাপ হবে না। অন্তত সে নিজেকে বোঝাতে পারবে। রুদ্র চেয়ে দেখলো তাদের পানে। জুনায়েদ আপাতত সেই গ্লাসটিই হাতে ওঠালো যা অরিন এমুহূর্তে তাকে দিয়েছে। যার মধ্যিখানে ড্রাগস মেশানো। রুদ্র খুব করে চায়লো, যাতে সে তা পান না করে। সে সহ্য করতে পারবেনা। নিজের ভালোবাসাকে খুশি দেখতে চায় সে, তা বলে এই নয় নিজের ভালোবাসাকে চোখের সামনে অন্যের সাথে ঘনিষ্ঠ হতে দেখবে সে। অরিন জুনায়েদকে গ্লাসটা হাতে ঠেসে দিয়ে বলে,
— বেইব, ড্রিংক ইট। তোর যত ইচ্ছে খা তুইচ সামলানোর জন্য আমি তো আছিই।
জুনায়েদের ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপের হাসি ফুঁটে উঠলো। কেনো ভাববে সে ওই মেয়ের কথা? কেনো? প্রয়োজন টা কী? জুনায়েদ কী ক্ষতি করেছিলো মেয়েটার। মানছে সে নাহয় একটু আমিরাকে নিয়ে বেরিয়েছে। তা বলে থাপ্পড়? জুনায়েদ রাগের কারণে গ্লাসখানা মুখে পুরতে নেয়। তবে ভাগ্য বোধহয় এবারে রুদ্রর সাথেই ছিলো। জুনায়েদের কাশি ওঠে আচমকা-ই। সে উঠে গিয়ে ওয়াশরুমের পানে গেলো। অরিন তাকে পিছু ডাকলো,
— জুনায়েদ, বেইবি। এটা ওয়েস্ট করিস না। বেইব….
নাহ! জুনায়েদ থামবার পাত্র নয়। সে ওয়াশরুমে গিয়ে নিজের মুখখানা ভালো করে ধোঁয়। আয়নার পানে নজর রেখে সেই পাঁচ আঙুলের দাগ বসে যাওয়া স্থানখানাতে চোখ বুলিয়ে গাম্ভীর্যতায় বিড়বিড় করে,
— দেখতে লিলিপুট অথচ হিজাবীনির হাতে এতো জোর আসে কোথা থেকে? আমার মতো কাঠখোট্টা; উন্মাদ পুরুষের গালে দাগ ফেলে দিয়েছে!
অতঃপর সে রাফিদের কিছু না বলেই বেরিয়ে যায়। নিজেরমতো করে বাইকে উঠে বসে। এতটুকু ড্রিংকসেও তার নেশা চড়েনি। সে দিব্যি বাইক চালিয়ে শাহরিয়ার কুঞ্জে ফিরে এলো। তখন প্রায় মধ্যরাত। স্বভাবসুলভ সে তর্জনীর মাঝে চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে শিষ বাজিয়ে সে নিজের বিলাসবহুল কক্ষের দিকে রওনা হলো। অথচ কক্ষে পৌঁছাতেই সে চমকে গেলো। জুনায়েদ যে মেয়েটির নাম–হিজাবীনি রেখেছে সেই মেয়েটি। দু’হাত তুলে কাঁদছে। জুনায়েদ বুঝতে পারলোনা এ’কি সত্য কিনা। সে কেবল অবাক নজরে চেয়ে রইলো। তার হৃদপিন্ড চিতাবাঘের ন্যায় ছুটতে আরম্ভ হলো। সে বিচলিত হলো। বুঝে উঠতে পারলোনা কেনো এমন হচ্ছে। একটু আগে করে আসা পণ মুহূর্তেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো। সে নিজের বক্ষস্থলের গহীবে চিনচিনে ব্যাথা অনুভব করলো। সে এটার মানেও বুঝতে পারলোনা। মানে বোঝার অত ইচ্ছেও তার জাগলোনা। সে মদ্যপ অবস্থাতেই এলোমেলো পদক্ষেপে আয়রার পানে এগিয়ে গেলো। তার কর্ণকুহরে পৌঁছালো কয়েকটি ক্রন্দনরত শব্দ,
— হে আল্লাহ, আমাকে মাফ করে দিন। আমি আমার গুণাহ স্বীকার করছি। আমার তওবা আপনি কবুল করুন। যেমনি হোক, সেই পুরুষটিকে আপনি আমার তাকদীরে লিখেছেন। আমার আপনার ফয়সালার সাথে মানিয়ে নেওয়া উচিত ছিলো; ভরসা রাখা উচিত ছিলো। মাফ করুন আমাকে। এই তাহাজ্জুদে বসে আমি আপনার নিকট আমি তার হেদায়েতের জন্য দোয়া চাইছি। আমার দ্বারা এমন ভুল আর কখনো হবেনা। আপনি আমার ভুল মওকুফ করুন আল্লাহ। আপনি তো জানেন আমি চেষ্টা করছি সব মেনে নিতে; মানিয়ে নিতে। আমি চেষ্টা করছি আপনার ঈমানের পথে নিজে অটল রাখার। এ ভুলের জন্য আমাকে ক্ষমা করুন। দয়া করুন, আমার রব!
জুনায়েদ অবাক হলো। তার হেদায়েতের প্রার্থনা করছে এই মেয়ে? হেদায়েত অর্থ কী? সে বুঝলোনা অবশ্য। তবে স্বামী শব্দটা সে দিব্যি বুঝে গেলো। মেয়েটা কী অভিযোগ করছে। হয়তো-বা করছে। সে তো আর ভালো নয় যে করবেনা। তবু মেয়েটাকে কাঁদতে দেখে তার বুক ভেঙে এলো। জুনায়েদ মদ্যপ অবস্থাতেই স্পষ্ট স্বরে নিজের ওপর বিরক্ত হয়েই আয়রার উদ্দেশ্যে বুলি ছুড়লো,
তাকদীর পর্ব ৯
— এই মেয়ে, কী কালোজাদু করেছো তুমি আমাকে হু? কাঁদছো তুমি আর বুক পুড়ছে আমার মতো বখাটের।
প্রয়োজন পড়লে আরও দু-চারটে চড় মেরে দাও, তবু ফর গড সেইক, কান্না থামাও!
হঠাৎ পুরুষালি কন্ঠে আয়রা চমকিত হলো। আমিরা সেই যে ঘুমিয়ে ছিলো এখনও অব্দি ওঠেনি। সে পাশ ফিরতেই তার পাশে জুনায়েদকে দেখে সে চমকে উঠলো। তাও এমন মদ্যপ অবস্থায়, এইক্ষণে!
