তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ২১
ঐশী আফরিন
বড় হলরুমটা জুড়ে বিরাজ করছে বাংলা মদের উটকো গন্ধ। চারদিকে বাইজিদের নাচ সাথে ঘুঙুরের শব্দে পরিবেশটা জমজমাট। নিচে রাজকীয় ভাবে বিছানো কেদারায় আয়েশি ভঙ্গিতে আধশোয়া হয়ে বসে অর্ধনগ্ন বাইজিদের নাচ দেখছেন আর একহাতে মদ আরেক হাতে বিড়ি খাচ্ছে গন্য মান্য জঘন্য জমিদার কাশেম চৌধুরী। চোখো জ্বলজ্বল করছে কামনার লালশা। সেই লাস্যময়ী মুহুর্তে সেনাপতি উপস্থিত হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে বলে,
“সাহেব ময়মনসিংহের রাণী মা আসছে”
কাশেম চৌধুরী নেশার তোপে বলে “হুমমম?”
“ময়মনসিংহের রাণী মা এসেছে?”
“কে এই ছোকরি?”
“সাহেব উনি জমিদার মাহফুজ চৌধুরীর কন্যা মাধবীলতা চৌধুরী ইরাবতী”
কথাটা যেন নেশার ঘোড়েও তীরের মত ঢোকে কাশেমের কানে। মুহুর্তেই যেন এতক্ষনের গেলা বোতলের পর বোতল মদের নেশা কুয়াশার মত কেটে গেছে। তিনি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ান। আশেপাশের অবস্থা দেখে যেন মাথা খারাপ হয়ে যায়। হাত থেকে মদ আর বিড়ি ছুরে ফেলে মাথা টা কিছুক্ষন দুদিকে ঝাকায়। তারপর চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করে,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“কোথায়?আর কখন এসেছে?”
“সাহেব এই মাত্রই এসেছে”
“আর তুমি এখনও দাঁড়িয়ে আছো?ঐ মেয়ের বাজ পাখির মত দৃষ্টি এসবের উপর পরলে কি হবে ধারণা আছে তোমার?তাড়াতাড়ি এদের সরাও এখান থেকে আর জায়গাটা পরিষ্কার কর। যেন বোঝা না যায় এখানে কি হয়েছে। তাড়াতাড়িই”
বলতে বলতে তিনি নিজেই এতক্ষনের বসে থাকা বিছানাটা উঠিয়ে ফেলেন। সেনাপতি রীতিমত অবাক। রাণী মা কেন আসলেন? কিভাবে আসলেন? কিচ্ছু না জিজ্ঞেস করে এত চিন্তিত কেনে হচ্ছেন বুঝলেন না। আর একটা মেয়েকে এত ভয় পাওয়ার কারণটাও বুঝলো না। তিনি কিছুক্ষন চুপ থেকে বললেন,
“এত ব্যস্ত কেন হচ্ছেন ঐ মেয়ের আসার কথা শুনে? একটা মেয়েকে এত ভয় পাচ্ছেন?”
“তুমি কাকে একটা মেয়ে বলছো? ও হতে পারে আমার বিরোধী দলের মেয়ে কিন্ত ওকে আমি সাধারণ মেয়ের চোখে দেখি না। ঐ মেয়ে সাধারণ না। তোমরা ভূল বুজছো। এই মেয়ের চোখে এসব পাপ ধরা পরলে ঐ মেয়ে যেকোন কিছু করতে পারে। ঝুঁকি না নেয়াই শ্রেয়”
বলতে বলতে হাতের কাজগুলো করছেন।সেনাপতি আর কথা না বারিয়ে সব পরিষ্কার করার আদেশ দিলো। ১০ মিনিটের মধ্যেই সমস্ত হলরুম পরিষ্কার করা হলো। উটকো গন্ধ দূর করার জন্য আশেপাশে আতর দেয়া হলো।বাগান থেকে তাজা বেলি ফুল এনে সাজানো হলো যেন কোনভাবেই গন্ধ বোঝা না যায়। কাশেম চৌধুরী নিজেও এই কনকনে ঠান্ডায় গোসল করে গায়ে আতর দিলেন। ওনার দুটো বউকে সাজিয়ে সামনে দাঁড় করালেন। তারপর স্বয়ং দুই বউ কে পাঠালেন তাদেরকে অতিথিশালা থেকে নিয়ে আসতে।
মাধবী হলরুমের দরজায় দাড়িয়ে একবার চারপাশ টা অবলোকন করে হাই তুলতে তুলতে ঢুকলো। তবে ঢোকার সাথে সাথেই তার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কে তীরের ফলার মত ঢুকে গেল বেলি আর আতরের সুঘ্রাণের সাথে মদের উটকো গন্ধ টা। সে ততক্ষনাৎ দাঁড়িয়ে গেল। আবার আশপাশটা তাকিয়ে দেখলো। তারপর কিছু একটা ভেবে বাঁকা হাসে। আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকায় মাধবীর দিকে। এই মেয়ের সব জায়গাতেই গোয়েন্দাগিরী। একটু ব্রেনটাকে বিশ্রামের সময় দেয় না। সারাক্ষণই গোয়েন্দাদের মত বাজ পাখির দৃষ্টিতে থাকে। এসব ভাবতে ভাবতে দুজনে গিয়ে সোফায় বসে।
বসেই মাধবীই প্রথমে মুখ খোলে “দেখতে আসলাম শত্রু কি আসলেই আমার শত্রু হওয়ার যোগ্য কি না। তো যা দেখলাম, এমনিতে ১০০তে ৬০ দেয়া যায়। তাও শুধু বাহ্যিক দেখে। কিন্ত বুদ্ধির দিক দিয়ে আপনি আমার শত্রু হওয়ার নখের যোগ্যও না”
কাশেম চৌধুরী রাগত চোখে চাইলেও কিছু বলতে পারলেন না সামনে আরিয়ানকে দেখে। আরিয়ান বলে “আগে মূল কথায় আসেন। আপনার গ্রামের লোকজন এত গাঁধা কেন বলুন তো?শুধু শুধু এই রাত করে আমাদের নিয়ে এসে আপনাদের ঝামেলা বারিয়েছে। এতই ঝামেলা যে কারো কারো ঘাম ছুটে যাচ্ছে। এসব গাঁধাদের খাইয়ে শুধু শুধু টাকা নষ্ট। ছ্যাহ”
কাশেম চৌধুরী বলার মত কিছু পেলেন না। এরা মনে হয় পরিকল্পনাই করে এসেছে। কিভাবে ওনাকে অপমান করা যায়। মাধবী অধৈর্য হয়ে বলে,
“কি? জমিদার কি কথা বলতে পারে না। না কি?”
এতক্ষনে মুখ খুললেন কাশেম চৌধুরী “তা এত রাতে নিশ্চয়ই এমনি এমনি আসোনি শত্রুর ডেরায়?কিছু তো হয়েছিল?”
“হয়েছিল তো বটেই। আপনার গাঁধাদের ডেকে জিজ্ঞেস করুন কি হয়েছে”
আরিয়ানের কথা মত ডাকা হলো গ্রামের লোকদের। সবার কাছ থেকে সব শুনে কাশেম চৌধুরী বললেন “সব শুনে তো কিছু ঠিক লাগছে না। রাতের অন্ধকারে একজন যুবক যুবতী জঙ্গলে একা একা কি করতে পারে তা তো নিশ্চয়ই তোমাদের বলে দিতে হবে না? তোমরা যে কারণেই আসো মানুষ যা দেখেছে তাই বলবে”
মাধবী চুপ থাকলো। ঠিক এই ভয়টাই কাজ করছে তার মধ্যে। আজ পর্যন্ত কিছুতে ভয় না পাওয়া মেয়েটা হঠাৎ এই কথাগুলোকে ভয় পাওয়ার কারণ কি?
আরিয়ান বললো “কি বলতে চাইছেন?”
“আরে বেটা কি বলতে চাইছি সেটা তো তুমি বুজেছোই। এখন ভূল যেহেতু করেছো শাস্তি তো পেতেই হবে”
মাধবী হাসলো। একটু জোরেই। কাশেম চৌধুরী সোজা হয়ে বসলেন। মাধবী তাচ্ছিল্য হেসে বললো “শাস্তি?আমাকে?কে দেবে আপনি?তা কি শাস্তি দেবেন শুনি?”
“এটাতো আমি ঠিক করতে পারবো না। গ্রামের মুরুব্বিদের ডেকে এর বিচার করা হবে”
“আপনি ঠিক করতে পারলে না ঠিক করবেন। শুধু শুধু আমার সময়টা নষ্ট করবেন না। ঘুম পেয়েছে। ঘুমানোর ব্যাবস্থা করুন”
“মেয়ে তুমি বললেই তো হবে না। এটা তোমার গ্রাম না যে এখানে তোমার কথাতে চলবে”
আরিয়ান ঠান্ডা কন্ঠে বলে “মুখের লাগাম টা কি ছেড়ে দিচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে না?”
এতেই যেন দমে গেলেন কাশেম চৌধুরী। গলা খাকারি দিয়ে বললেন “এখানে আমি কিছুই বলবো না। গ্রামের মুরুব্বি আর মাওলানাদের ডাকা হোক তারাই বলবে।সেনাপতি বড় বড় মাওলানাদের ডেকে আনবে এক্ষুনি”
সেনাপতি ইতস্তত হয়ে বললো “এত রাতে…”
আরিয়ান ধমক দিয়ে বলে “এত রাতে তো সমস্যা কি?মাওলানারা সারারাত জেগে নামায কালাম পরে। আপনাদের মত ভন্ডের মত ঘুরে বেরায় না। আসতে বললেই আসবে। আর না আসলে বাড়ি থেকে তুলে আনুন। যান”
“আরিয়ান ভাই আপনি পাগল হয়ে গেছেন?জানেন গ্রামের মুরুব্বিরা কি সিদ্ধান্ত দিবেন?ওরা বিয়ে করিয়ে দেবে। বুঝতে পারছেন আপনি?”
কথাগুলো ফিসফিস করে বলে মাধবী। আরিয়ান নির্বিকার ভাবে উত্তর দেয় “তো সমস্যা কি?তুই ই তো বলেছিস বিয়ে করবি। যাক এই অসিলায় বিয়েটা করে হয়ে গেল। তো সমস্যা কোথায়?”
সাথে সাথে মাধবী তীব্র প্রতিবাদ জানায় “নাহ। আমি বিয়ে করবো না”
আরিয়ান অবাক হয়ে বলে “আসার সময় না তুই বললি তোকে বিয়ে না করলে কি কি যেন করবি?”
“হ্যা বলেছি। কিন্ত আমি এখন বিয়ে করবো না। আমার অনেক কাজ আছে। আব্বাকে খুঁজে পাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি বিয়ে করবো না”
“মধু তুই কি পাগল হয়ে গেছিস?”
“হ্যা। হ্যা। আমি পাগল হয়ে গেছি। এগুলো থামান। আমি বিয়ে করবো না”
“মধু ওরা এখন আমাদের কথা মানবে না”
“মানতে হবে। আমি কিছুতেই এখন বিয়ে করবো না। আমার অনেক কাজ আছে। অনেক। এত সহজে সংসারের মায়ায় পরলে আমি কিচ্ছু করতে পারবো না”
“মধু…”
বাক্য শেষ করার আগেই হলরুমের বড় দরজা খুলে দেয়া হয়। দলে দলে গ্রামের মুরুব্বিরা,মহিলারা এবং যুবতী কিছু মেয়েরা মুখ ঢেকে প্রবেশ করতে থাকে। মাধবী শুকনো ঢোক গিলে গাট হয়ে বসে থাকে। চারদিক থেকে যুবতী মেয়েদের ফিসফিস ভেসে আসে,
“এটাই ময়মনসিংহের রাণী মা। ওনার কন্ঠ শুনলেই না কি মাইনষের কথা আপনাতেই বন্ধ হয়া যায়। আমার অনেক ইচ্ছা রাণী মায়ের চেহারাডা দেহার।একবার যদি দেখতে পারতাম”
আর মহিলারা বলাবলি করছে “রাণী মারে নাকি জমিদারে বাহির হওয়ার লেইগ্গা দিতো না। কেউরে চেহারাডা পর্যন্ত দেহনের দিতো না। তয় এই মাইয়া এমন আকাম করলো কেমনে!”
কথাগুলো মাধবীর কানে গরম শীশার মত প্রবেশ করছে। আরিয়ান একবার মাধবীর দিকে তাকালো। তার মনোভাব বুঝতে পেরে গলা খাকারি দিয়ে বললো,
“রাণী মা কে নিয়ে যে আর একটা বাজে কথা বলবে তার ভাগ্য কিন্ত খারাপ হবে”
চারদিকের ফিসফিসানো কলাহোল থেমে গেল মুহুর্তেই। সব ঘটনা শোনানো হলো মুরুব্বিদের। সব শুনে যিনি প্রধান তিনি বললেন “যেহেতু আমাগো গেরামে ধরা পরছে তো যেই গেরামেরই হোক। আমাগো কথাই মানোন লাগবো। এই কাম আমাগো গেরামের কোন মাইয়া করলে হেরে মাথা কাঁমায়া পুরা গেরাম ঘুরানো হইতো। আপনেরা রাণী আর সেনাপতি মানুষ। আপনেগো অপমান করোন যাইতো না। আমাগো পক্ষ্য থাইকা সহজ সিদ্ধান্ত হইলো দুইজনেরে আইজ রাইতেই বিয়া দেওয়া হোক”
মাধবীর কাঠ কাঠ জবাব “আমি বিয়ে করবো না”
“দেহেন রাণী মা। এডাই সবচাইতে ভালা সিদ্ধান্ত। আপনে না মানলেও মানতে হইবো। আমরা চাইতাসি না আপনের সাথে খারাপ আচরণ করতে”
“আর আমিও চাচ্ছি না আপনাদের সাথে বেয়াদবি করতে। আর আমার আসল রূপ দেখাতে”
আরিয়ান এবার বলে “আমি ওর সাথে একটু আলাদা কথা বলতে চাই”
“কও। দেহ কি কয়”
আরিয়ান উঠে দাঁড়ায়। মাধবী চোখ বন্ধ করে নিজের রাগ দমনের চেষ্টা চালায়। দাঁতে দাঁত খিঁচে আরিয়ানের পিছন পিছন একটা ঘরে পৌছায়। আরিয়ান চাঁদর টা গায়ে জরিয়ে দুহাত বুকে বেঁধে দাঁড়িয়ে বলে
“যদি বিয়েই না করবি তো আমার কেন হতে চেয়েছিস? আমার হয়ে যদি থাকতেই হয় বিয়েটা করে নে”
“আপনাকে হাড়ানোর ভয় দেখাচ্ছেন?”
“আমাকে হাড়ানোর ভয় তুই পাস?”
মাধবী হাসলো। মাধবী প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে “বিয়েটা কি পরে করলে আপনাকে পাওয়া যাবে?”
কথাটা কেমন যেন অসহায় শোনাল। আরিয়ান স্ববেগে ঘুরে তাকালো। কি বলবে বুঝে পেল না।
মাধবী ধরে যাওয়া গলায় বললো ” আসলে আব্বাটাকে ছাড়া কেমন যেন লাগে”
থেমে কি যেন ভাবলো তারপর আবার সেকেন্ডেই স্বাভাবিক হয়ে এক পেশে হেসে বললো “আচ্ছা। আপনারা যা চাচ্ছেন তাই হোক। তবে আমার কিছু শর্ত আছে”
আরিয়ান সন্দিহান চোখে তাকালো। মেয়েটাকে একদমই তার সুবিধার লাগছে না। এত সহজে সমাজ মেনে নেওয়ার মত মেয়ে তো মাধবী না। সে সন্দিহান কন্ঠে বললো “কি শর্ত?”
“একটা চুক্তি পত্রের ব্যাবস্থা করুন তো”
“তুই কি বিয়ে করবি না চুক্তি?”
“আপনার কাছে যেটা মনে হবে সেটাই”
আরিয়ান আর কথা না বারিয়ে একটা লোক কে দিয়ে কাজির কাছ থেকে একটা চুক্তি পত্র আনায়। মাধবীর হাতে দিলে সে গুটগুটে হাতে কি যেন লিখে সেটায়। তারপর আরিয়ানের হাতে দিলে আরিয়ান কিছুক্ষন চুপ থেকে পরা শুরু করে,
আমি আরিয়ান ইশান তৃহার জমিদার মাহফুজ চৌধুরীর কন্যা মাধবীলতা চৌধুরী ইরাবতীকে বিয়ের পর নিম্নোক্ত শর্তগুলো মেনে চলবো।শর্ত গুলো হলো:-
১/ বিয়ের পর তাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে।
২/ তার অনুমতি ব্যতীত তার সাথে জোড় জবরদস্তি করা যাবে না।
৩/ তার সব কথা মেনে চলতে হবে।
৪/ বিয়ের পর দ্বিতীয় কোন নারীর দিকে তাকানো যাবে না।
৫/ উপরোক্ত শর্তের কোন একটা ভঙ্গ হলে তার কাছ থেকে বিচ্ছেদ মেনে নিতে হবে।
________________ ______________
আদায়কারীর গ্রহিতার
সাক্ষর সাক্ষর
সবটা পরে আরিয়ান বলে ” বিচ্ছেদের শর্ত মানার আগে আমার মৃত্যু হোক। আর তুই চাইলেও আমার থেকে বিচ্ছেদ পাবি না। কারণ অনন্ত কালের প্রতিটি রাস্তায় আমি তোর সৃতির সঙ্গে সমাধি নেব। তুই না চাইলেও সমাধির ঠিকানায় আমি তোর শ্বাসের শব্দ হয়ে বাজবো ”
বলে মাধবীর হাত থেকে কলমটা নিয়ে বিনা দ্বিধায় সাক্ষর করে দেয়। মাধবী অবাক হয়ে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকে। সাক্ষর শেষে আরিয়ান কাগজটা মাধবীর হাতে দিয়ে বলে “নে। তবে সব শর্ত মানতে পারলেও শেষের শর্তটা মানতে পারবো না। এবার আর একটা কথাও না বারিয়ে চল। সবাই অপেক্ষা করছে”
মাধবী শেষ শর্ত নিয়ে আর কথা না বলে কাগজটা কোমরে গুঁজে মনে মনে একবার আলহামদুলিল্লাহ বলে। তারপর আরিয়ানের পেছন পেছন গিয়ে জায়গায় বসে। মুরুব্বি বলে “কি রাণী মায় কি রাজি হইসে নি?”
“রাজি না হয়ে যাবে কই। নেন এহন তাড়াতাড়ি শুরু করেন”
কাজিকে ডেকে সামনে বসানো হলো। ভদ্রলোক একটা মোটা খাতা খুললেন। কিছুক্ষন কি যেন লিখে বললেন,
“কাবিন কত দিবা বাপ?”
“১০ পয়সা”
আরিয়ানের নির্বিকার জবাব শুনে সকলেই অবাক হয়ে তাকায়। সেনাপতি হয়ে রাণী কে বিয়ে করবে তাও আবার কাবিন দিবে মাত্র দশ পয়সা!
মাধবীও নির্বিকার কন্ঠে বলে “আমিও কোন কিপ্টা লোককে বিয়ে করতে পারবো না”
“তো তুই কি চাস?”
“বিয়ে করছেন আপনি। তো আমি কেন বলবো!”
আরিয়ান গলা খাকারি দিয়ে বলে “কাবিন নামায় লিখুন মাধবীলতা চৌধুরী ইরাবতীর নামে গোটা আরিয়ান ইশান তৃহার টাকেই লিখে দেওয়া হলো। যখন ও বিচ্ছেদ নিয়ে চলে যেতে চাইবে তখন গোটা আমি টাকে সাথে নিয়ে যেতে হবে”
থেমে আবার বলে “গোটা আমিটাই যেহেতু ওর নামে লিখে দেওয়া হয়েছে তো আমার সবকিছুই তোর ওর নামেই। এসব তো আর লিখতে হবে না?”
সবাই অবাকের উপর অবাক হচ্ছে। এই মাত্র বললো ১০ পয়সা এখন আবার গোটা নিজেকেই বিলিয়ে দিচ্ছে! চারদিকে গুনগুন আওয়াজ শুরু হয়ে গেল। কাজী সবাই কে চুপ করতে বলে আরিয়ান কে বলে,
“বাবা এভাবে কাবিন লেখা যায় না”
“লেখা যাবে না কেন?কলম নেই না খাতায় জায়গা নেই? কোনটা? চাইলেই লেখা যায়। ঝটপট লিখুন”
কাজী কিছুক্ষন থম মেরে বসে থেকে আরিয়ানের কথা মত খাতায় লিখলো। তারপর কিছু দোয়া দুরুদ শেষে খুতবা শুরু করলো,
“আমি নেওয়াজ ইশানের একমাত্র পুত্র আরিয়ান ইশান তৃহারের সাথে মাহফুজ চৌধুরীর বড় কন্যা মাধবীলতা চৌধুরী ইরাবতীকে বিবাহ বন্ধণে আবদ্ধ করিলাম। বল বাবা কবুল”
আরিয়ান একদমে বলে দিলো “কবুল কবুল কবুল আলহামদুলিল্লাহ কবুল”
পাশ থেকে কাশেম চৌধুরী বললেন “আরে বাপ তিনবার বললেই হয়”
আরিয়ান কিছু না বলে মুচকি হাসলো। কাজী এবার মাধবীকে বললো ” বল মা কবুল”
“আচ্ছা কবুল অর্থ কি?”
মাধবীর এরকম পরিস্থিতিতে এরকম প্রশ্নে ভ্যাবাচেকা খায় সকলে। আরিয়ানের ইচ্ছে হলো একটা গাট্টা মারতে পাঁজী মেয়ের মাথায়। কিন্ত মানুষের জন্য চুপ রইল। কাজী ধীরে সুস্থে বললো “কবুল অর্থ গ্রহণ করা। এবার বলো কবুল”
“আচ্ছা গ্রহণ করা অর্থে তো আরো অনেক শব্দ আছে। তাহলে ওগুলো না নিয়ে কেন কবুলই বলতে হয়?”
আরিয়ান এবার না পারতে মুখ খোলে “তুই কি বিয়ে করতে এসেছিস না পরীক্ষা নিতে?”
“আজে বাজে কথা বলবেন না। মেয়েরা বিয়ে করে না। মেয়েরা বিয়ে বসে। তাই না কাজী চাচা?”
কাজী বিরক্ত হয়ে মাথা নারিয়ে হ্যা বোঝায়।তারপর আবার বলে “বল মা কবুল”
মাধবী কিছুক্ষন চুপ করে থাকে। তারপর দাঁতে দাঁত পিশে বলে দেয় “কবুল”
সকলে একসাথে বলে উঠে “আলহামদুলিল্লাহ”
কিন্ত মাধবী মাথাটা নিচু করে বিরবির করে বলে উঠে “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহির রজিউন”
সবার আলহামদুলিল্লাহ এর মাঝেই কারো কানে যায় না মাধবীর বলা সেই ভয়ংকর কন্ঠের একটা বাক্য। সেই প্রতিশোধী কন্ঠের বলা বাক্যটি যদি সবাই শুনতো তাহলে হয়তো আর এরকম আনন্দ করতে পারতো না। রাণী মায়ের বিয়ে হয়েছে তাও তাদের গ্রামে ব্যাপারটায় সকলেরই যেন আনন্দের শেষ নেই। তবে হঠাৎই সব আনন্দের মাঝে বয়ে যায় মাধবীর সেই চিরচেনা ঠান্ডা হিমেল বাতাস। কিন্ত এখন সেই বাতাস শুধু মাধবীর অঙ্গ জুড়েই না বয়ে গেছে পুরো হল রুম জুড়ে। এতটাই ঠান্ডা বাতাস যে সকলের দাঁতে দাঁত লাগার জোগাড়। পুরো হল রুমের মখমলের পর্দাগুলো দুলে উঠে। বিয়ের মোটা খাতাটা পাতার পর পাতা উড়ে যেতে থাকে। কাজী কাঁশতে কাঁশতে খাতাটা সামলে নেয়। আরিয়ান প্রলয়ের মাঝেও চেপে ধরে শ্রেয়সীর নরম হাত টা। সকলে নিজেদের বাচ্চাদের চেপে ধরে বুকের সাথে। হঠাৎই মাধবী আর আরিয়ান দুজনের সোফার মাঝ বরাবর হালকা ফাটল ধরে বন্ধ হয়ে যায় বাতাস। সবার কাঁশতে কাঁশতে চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। ১৩ সেকেন্ডের বাতাস টা মুহুর্তেই আনন্দ মুখোর পরিবেশটা শান্ত করে দেয়।
সেই হালকা ফাটল টা কারো চোখে না পরলেও আরিয়ানের চোখে পরে। সে অবাক হয়ে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকে। মুহুর্তেই চোখের কোনে ভেসে উঠে অগ্নি। ডান হাত মুঠো করে ধরে সে রাগ সংবরনের চেষ্টা চালায়। ব্যাপার টা মাধবীর চোখও এরায় না। সে পাশের টেবিল থেকে একটা প্রদীপ নেয়। মোমদানি থেকে তাতে আগুন ধরিয়ে সেই ফাটা অংশে ঢালে। অতঃপর মাধবী প্রদীপটা চোখের সামনে ধরে তাতে অপলক তাকিয়ে থেকে গেয়ে উঠে,
” সিল সিলা ইয়ে চাহাত কা
না মেনে বুঝনে দিয়া…..
হো….হুমমমমমমমমম
সিল সিলা ইয়ে চাহাত কা
না মেনে বুঝনে দিয়া……
ওওওও পিয়া…ইয়ে দিয়া…
না বুঝা হে , না বুঝেগা….
মেরি চাহাত কা দিয়া ”
আরিয়ান ইশারা দেয় কাশেম চৌধুরীকে সমস্ত পুরুষদের নিয়ে বেরিয়ে যেতে। সকল পর পুরুষরা একে বেরিয়ে গেলে গ্রামের যুবতী মেয়েরা মায়ের শাসন ভেঙে আজ অবাধ্য হয়। তারাও একতারা,দোতারা এবং সারিন্দা বাজাতে বাজাতে মাধবীর সাথে তালে তালে সুর মেলায়,
” মেরে পিয়া,,,আব আজারে,,,মেরে পিয়া
হো, মেরে পিয়া,,,আব আজারে,,,মেরে পিয়া ”
আরিয়ান মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে মাধবীর দুটো চোখে। ততক্ষনাৎ আবারও শুরু হয় সেই বাতাস। মাধবীর শাড়ির আচঁল ধরে না রাখায় মাথার উপর থেকে আচঁল সরে যায়। হাতখোপা খুলে গিয়ে চুলগুলো হয় অবাধ্য। বাতাসে চুল উঁড়ে চোখে মুখে ছরিয়ে পরায় এক অন্য রকম সৌন্দর্য যেন ঘিরে ধরে মাধবীকে। গ্রামের সমস্ত মহিলারাও গান বন্ধ করে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখতে থাকে তাদের স্বপ্নের রাণী মাকে। এত সুন্দর কন্ঠে এই ভয়ংকর গানটা যেন স্বর্গীয় সুরের মত মনে হচ্ছে।
আরিয়ান মুচকি হেসে প্রশংসা করে মাধবীর বুদ্ধির। কত সুন্দর করে নিজের প্রতিভা দিয়ে সামলে নিলো থমথমে পরিবেশটাকে। কেমন করে সবার মন ভোলা করে দিলো।তবে মনে মনে একটা ক্রোধ থেকেই গেল। এই বাতাসটা শুধু মাধবীর না তারও চেনা। খুব চেনা। আর কেন এই সময়েই এই বাতাসটা হয়েছে সেটাও তার ভালোভাবেই জানা। কিন্ত মাধবী জিজ্ঞেস করলে কি বলবে সেটাই তাকে ভাবাচ্ছে।
গান শেষে সকলে এক সাথে বলে উঠলো “মাশাআল্লাহ। মনে হচ্ছে যেন আপনিই এই গানের রুপকার”
মাধবী খিলখিলিয়ে হেসে উঠে। পুরো হলরুম জুড়ে বারি খায় সেই মুক্তো ঝরা হাসি। সবাই আবারও বলে উঠে
“মাশাআল্লাহ”
মাধবী মুচকি হেসে তাকায় আরিয়ানের দিকে। দেখে আরিয়ান অপলক তাকিয়ে আছে তার দিকে। পাশ থেকে একজন বলে “সেনাপতির তো চোখই সরছে না”
আরেকজন বলে “সরবে কিভাবে। এত সুন্দর বউ এর উপর থেকে কি চোখ সরানো যায়”
হাসির রোল পরে যায় পুরো রুমে। মাধবী মজার ছলে হালকা ধমকে উঠে আরিয়ান কে “চোখ সরান। বে শরম পুরুষ”
“বউ আমার। তাকিয়েও থাকবো আমি”
আবারও সবাই হেসে উঠে। মাঝ থেকে একজন বলে “ইতিহাসে এই প্রথম কাউকে সাদা শাড়ি পরে বিয়ে করতে দেখলাম”
একজন মহিলা বলে “হে রে ঠিকই তো। আগে বলিস নি কেন। তাহলে তো রাণী মাকে লাল টুকটুকে শাড়ি পরিয়ে দিতাম”
“ইশশশ। শাড়ি পড়াতেন আপনারা। আর দম বন্ধ হতো আমার”
আরিয়ানের কথায় মাধবী উত্তর দেয় “আপনার কি মনে হচ্ছে না একদিকে কবুল বলেছেন আরেক দিকে আপনার লজ্জা সরম হাওয়া হয়ে গেছে”
আরিয়ান ফিসফিস করে বলে “বিয়ের পর লজ্জা না রাখা সুন্নত। আর বউয়ের সামনে তো একদমই না। সবে তো শুরু আগে আগে দেখো হোতা হে কেয়া” বলেই একটা শয়তানি হাসি দেয়।
“শর্তের কথা ভূলে গেছেন?”
“বিয়ে শেষ মানে শর্ত হাওয়ায় উঁড়ে”
মাধবী বিরবির করে “বজ্জাত লোক।একবার আপনাকে একা পাই শুধু”
তখনই কাশেম চৌধুরীর ছোট বউ পূর্ণিমা এসে বলে “আপনাদের জন্য উপরের ঘরে জায়গা করা হয়েছে”
মাধবী ভ্রু কুচকে বলতে যাবে “এক ঘরে কেন” তার আগেই আরিয়ান তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে “আচ্ছা আমরা যাচ্ছি”
“রাণী মার কাপড়ও রাখা আছে সেখানে” বলে সে চলে যায়।
পূর্ণিমা চলে যেতেই আরিয়ান বলে “পাগল হয়েছিস?গ্রামে বিয়ের পর স্বামী স্ত্রী এক সাথে না থাকলে লোকে খারাপ বলে”
“খারাপ বলার বাকি কি আছে?”
“মধু। যা হওয়ার হয়েছে এখন সবার সামনে এসব বলার দরকার নেই”
তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ২০
বলে সে উঠে দাঁড়িয়ে হাত বারিয়ে দেয় মাধবীর দিকে। মাধবী এক পলক বারিয়ে দেয়া হাতের দিকে তাকায়। তারপর নিঃশ্বব্দে হাতটা ধরে উঠে দাঁড়ায়। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দুজন হাঁটা ধরে উপরের সিরি ধরে। সকলে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখে সাদা শাড়ি পাঞ্জাবি পড়া রাজা রাণী কে। আর ছুড়ে দেয় হাজারো প্রশংসার ফুল।
