Home তুই আমার ৭ মিনিট তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ২৬

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ২৬

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ২৬
ঐশী আফরিন

নিশুতি রাত। চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর পেঁচার ডাকের শব্দে একটা গা ছমছমে মুহুর্ত। দূর থেকে কিছু নেওটা শিয়ালের হাক শোনা যাচ্ছে। জায়গাটা একটা পরিত্যক্ত শ্মশান ঘাট। এলাকাটি সম্পূর্ণ নির্জন,নিস্তব্ধ ও সাময়িকের জন্য নিষিদ্ধ। নিস্তব্ধ লিখে রাখা সাইনবোর্ডটার দিকে একবার তাকিয়ে মাধবী পরিত্যক্ত ঘাটের দিকে তাকায়। কুচকুচে কালো পানি চাঁদের আলোয় ছলছল করছে। মাধবী বুক ভরে শ্বাস নেয়। এরকম নির্জনতাই তো তার ভালো লাগে। চারদিকে ভ্যাপসা গন্ধ। পরিত্যক্ত শ্মশানটা বহুদিন আগেই মানুষজন ছেড়ে দিয়েছে। চারপাশে আছে বিশাল বিশাল বটগাছ।

পুরনো দাহস্থলের একটা ভাঙা চুল্লি আছে—তার ওপরে কালচে ধুলো জমে মোটা স্তর। পাশেই কাঠ রাখার পুরনো ঘর, দরজাটা বেঁকে গেছে এতটাই যে সামান্য বাতাসেই কড়কড় শব্দ ওঠে। এক কোণে মশালের রড দাঁড়িয়ে আছে—বহুদিন আগে আগুন জ্বালানো হতো সেখানে। এখন শুধু কালো দাগ আর ছাইয়ের গন্ধ, কিন্তু
আর সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে—সবচেয়ে গভীর কোণে একটা পুরনো সিঁড়ি, যেটা নদীর দিকে নেমে গেছে। কিন্ত এই নদীতে কেউ ভূল করেও পা বারায় না। কারণ এই শান বাঁধানো শ্যাওলা পরা ঘাট কাউকে বাঁধতে দেখা যায়নি। সিরির দিকে তাকালে যারা আরাধনা জানে তারা অবশ্যই বুঝবে এটা মন্ত্রোচ্চারণের স্থান। কিছু কিছু স্থানে খুব পুরোনো লন্ঠনের অবশিষ্ট অংশ পরে আছে। একটা কোণে ছোট মাটির ঘর। যেখানে রাখা হতো দেহ পোড়ানোর কাঠ।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

সম্পূর্ণ দৃশ্য টি অবলোকন করে মাধবী এগিয়ে যায় ঘাটের দিকে। চারদিকে প্রতিধ্বনিত হয় শুকনো পাতার মাঝে কিছু টেনে নেয়ার গভীর শব্দ। সে এক হাতে একটা ছালার বস্তা টেনে নিয়ে এগিয়ে যায়। ঘাটে পৌছে হাতের বস্তাটা সিরির সাথে ঘেঁষে দাড় করিয়ে রাখে। পানি ছুঁই ছুঁই সিরিটার উপর বসে পরোনের শুভ্র রঙা শাল টা খুলে রেখে দেয় এক পাশে। আজও পরনে সাদা শাড়ি। এই সাদা রঙটা তার পছন্দের তাই তো আরিয়ানের প্রেমে পরেছে। আরিয়ান কে বেশির ভাগ সময় সাদা কাবলী সেটেই দেখা যায়। বিষয়টা তার কাছে বেশ ভালো লাগে। ভেবেই একটা মুচকি হাসি ফোটে তার মুখে। নদীর পানিতে দৃষ্টি রেখেই হাত খোপা করা চুলগুলো খুলে দেয়। লম্বা চুলগুলো আছরে পরে শ্যাওলা পরা মেঝেতে। উঠে গিয়ে বস্তার মুখটা খুলে সেটাকে টেনে নিয়ে যায় বালুর স্থুপের দিকে।

কয়েকটা শুকনো কাঠ কুড়িয়ে এনে বালুর উপর জমা করে পাথরের সাহায্যে সেখানে আগুন ধরায়। প্রথমে সময় লাগলেও একটা সময় আগুনের তেজ তীব্র থেকে তীব্র হয়। মাধবী বস্তার মধ্যে থেকে চুলের মুঠি ধরে বের করে আনে সদ্য খুন করা লাশের মাথা। এক সেকেন্ডেও না ভেবে সেই মাথাটা ছুড়ে দেয় আগুনে। এভাবে একের পর এক মাথা বের করে আগুনে ছুরে দিতে থাকে। সবগুলো শেষ হয়ে গেলে বস্তাটা স্বযত্নে পাশে রেখে কিছুক্ষন একগুয়ে দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ধাউ ধাউ করে জ্বলতে থাকা অঙ্কারের দিকে। মুখে ফুটে উঠে ভয়ানক হাসি। ততক্ষনে চারদিকে মাংশ এবং হাড্ডি পোড়া গন্ধে জায়গাটা আরো বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। অপ্সরার মত চেহারায় বিষাক্ত একটা হাসি ঝুলিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে,

“তোরা বাবা হিসেবে কেমন তা আমি জানতে চাইবো না তবে মানুষ হিসেবে তোরা এক একটা নিকৃষ্ট কীট ছিলি শুয়োরের বাচ্চারা। আমি এতিম হয়েছি, পরিবার হীন হয়েছি। কার জন্য জানি না। তবে তোরা আমার নিশানায় ছিলি। তবুও এতটা মাথা ঘামাতাম না। যদি না তোরা কাল এরকম টা করতি। আমার সব শেষ করে দিয়েছিস তোরা। সব। আমার উদ্দেশ্য ফুরোনোর আগেই তোরা ইতি টেনে দিয়েছিস। তোরা কাল শুধু মাধবীলতা কেই শেষ করিসনি,শেষ করেছিস মাহফুজ চৌধুরীর কন্যাকে। তাই মাধবীলতা হয়ে না, মাহফুজ চৌধুরীর কন্যা হয়েই আজ তোদের বলি দিলাম। একে একে তোরা সকলে মরবি। আমি এক পাপীষ্ঠ হওয়া সত্তেও মনে এক পাপীষ্ঠকেই জায়গা দিয়েছি তবে উদ্দেশ্য ছাড়া নয়। দুনিয়া এই পাপীষ্ঠ কন্যার আরো রূপ দেখবে কারণ আমি পরিবার হীন হয়েছি এই দুনিয়ার জন্য। সবকটাকে নরক যন্ত্রনা দিয়ে মারবো”

বলে এই নিস্তব্ধ নিশিতে খিলখিলিয়ে হেসে উঠে। আবারও সে অনুভব করে সেই ঠান্ডা বাতাস। যেই বাতাসে তার চুলগুলো অবাধ্য হয়ে নৃত্য করছে। ফিচেল হাসে সে,খানিক বিরক্তও হয়। নানান ব্যাস্ততায় এই দিকটা তার দেখা হচ্ছে না। অথচ অবচেতন মন এই দিকেই ছোটে সব সময়। সে জানে এই সমস্যার সমাধান আরিয়ানই চাইলে করতে পারে, তবে এখনো কেন যে দেড়ি করছে সেটা বুঝতে পারছে না। এটাতো আরিয়ানের জীবনে সবচেয়ে বড় সমস্যা, তবুও যে কেন দেড়ি করছে কে জানে!?

এসব ভাবতে ভাবতে সে আবারও ঘাটে নামে। পানি বললে ভুল হবে। দিন দিন মানুষের রক্ত আর পোড়া ছাঁই নিতে নিতে পানিতে একটা বিশ্রী রঙ ধারণ করেছে। সেই পানিতেই নেমে পরে মাধবী। কিছুটা গভীরে গিয়ে একটা ডুব তিনটা ডুব দিয়ে আবার উঠে পরে। অথচ বইছে ঠান্ডা হওয়া। পৌষ মাসের কনকনে শীতে মানুষের হাড্ডি পর্যন্ত কেঁপে উঠে। ডুব দিয়ে উঠে খোলা চুলগুলোকে আবার হাত খোপা করে নেয়। এই গোসল টা তার প্রয়োজন। পবিত্রতার জন্য নয়,খুনের স্বাদ নেওয়ার জন্য। প্রতিটা খুন করার পরই তার এই ঘাটে এসে ডুব দিতে হয়। বিষয়টা যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। জায়গাটা সকলে ভয় পেলেও তার ভয় নেই। থাকবে কী করে! জায়গাটা তো নিজেরই গড়া। সব কাজ শেষে সাদা শালটা আবার পরে বেরিয়ে আসে সেই নিস্তব্ধ, নিষিদ্ধ মৃত্যুপুরী শ্মশান থেকে।

একদম শেষ রাতের দিকে বাড়ি ফেরে মাধবী। এখনও দরজার সামনে অপেক্ষা করে বসে আছে রুহি। অত্যাধিক ঘুমে এক একবার ঘোরে ঢলে পরছে আবার যখনই মাধবীর অবস্থানের কথা মনে পরে তখনই ঘুম উঁড়ে যায়। মাধবী আস্তে করে সদর দরজায় টোকা দেয়। সাথে সাথেই রুহির ঘুম ছুটে যায়। চটজলদি গিয়ে দরজাটা খুলে দেয়। মাধবীকে সুস্থ অবস্থায় দেখেই সমস্ত চিন্তারা পালিয়ে যায়। তবে মাধবীর অবস্থা দেখে কোন কিছু জিজ্ঞেস না করে আগে গামছাটা এনে দেয়। বাহিরে দাঁড়িয়ে চুল মুছতে মুছতে সে স্বাভাবিক স্বরে জিজ্ঞেস করে “তোর ভাই উঠেছে?”
রুহি বুঝলো না এত সাংঘাতিক একটা কাজ করে এসেও কীভাবে এতটা স্বাভাবিক থাকতে পারে! তবে সে স্বাভাবিক থাকতে পারলো না। কাঁপা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো “স সবাই ক কে মে…

“চুপপপপ। একদম চুপ”
রুহি কথা শেষ করার আগেই মাধবী তাকে থামিয়ে দেয় “কিচ্ছু হয়নি। মনে কর তুই কিছু জানিসই না। স্বাভাবিক থাক। বাড়ির আর কারও কাছে কিছু বলবি না। আরশির কাছেও না। ও কিন্ত এখন আর আমাকে ভালো চোখে দেখে না। এমনিতেও সবাই আমার মামা-মামি আর ভাই বোন হলেও এদের কাউকে আমি ঠিক ভালো চোখে দেখি না। তাই সবার মাঝ থেকে তোকে জানিয়ে গেলাম। আশা করি ঠকবো না?”
রুহি ঘন ঘন মাথা নাড়িয়ে বলে “জীবন দিয়ে দেব তবুও মুখ খুলবো না”
“ভালো। আর তোকে যেন স্কুলে কে বিরক্ত করে?”
“স্কুলে না। স্কুল থেকে আসার পথে কিছু গুন্ডা ছেলে পেল বাজে কথা বলে”
“শুধু তোকে একাই?”
“নাহ আমাদের ক্লাসের সব মেয়েদেরই”
“কাউকে বলেছিস?”

“ডাক্তা…” বলতে বলতে থেমে যায় রুহি। সে অভিকে বলতে চেয়েছিল। কিন্ত পেরে উঠছে না। কারণ তাদের সম্পর্কটা পুরোটাই ধোঁয়াসায় ঘেরা। না সম্পর্ক আছে না কখনো হয়ই নি। কোনটাই না। তো কিভাবে বলবে সে!
রুহিকে চুপ থাকতে দেখে মাধবী বলে “গত কাল রাতে যেটা করেছিস,আজ রাতেও করবি। পরদিন থেকে আর বিরক্ত করবে না”
গত কাল রাতে রুহির সাথে পরিকল্পনা করেই মাধবী আরিয়ান কে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিলো। আজ রাতেও একই কাজ করার কথা বলছে। সে জানে মাধবী এদেরও খুন করে ফেলবে। সে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করে “সব কিছুর সমাধান কি মানুষকে খুন করাই!”

মাধবী এক পেশে হেসে বলে “আমি তো মানুষ খুন করি না। আমি অমানুষ খুন করি। যেই পুরুষ নামক কাপুরুষ টা নারীকে সম্মান দিতে জানে না, সে কোন মানুষ হতে পারে না। তাদের পরিণতি দুনিয়াতে আমার মত মাধবীলতাদের হাতে নৃশংস খুন হওয়া আর আখেরাতে জাহান্নামের তীব্র অঙ্কার সহ্য করা”

কথাটা বলতে বলতে মাধবী সদর দরজা লাগিয়ে রুহির ঘরে চলে যায়। গোসল করে একেবারে তৈরি হয়ে মাথায় কাপড় দিয়ে বের হয়। রুহি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে লাবণ্যময়ীর দিকে। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় মাধবীর সৌন্দর্য যেন আরো বহুগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। মাধবী ওড়নাটা দোপাট্টা দিয়ে নামাযে দাঁড়ায়। রুহি অবাক হয় মাধবীর সাথে নামায পরাটা এখন বড্ড বেমানান লাগছে রুহির কাছে। এতদিনও তো মাধবী পাঁচ ওয়াক্ত নামায পরতো তবে আজই অবাক লাগছে। কারণ এতদিন সে এই ভয়ংকরী রুপের বিপরীতে লুকানো বিষাক্ত রূপটা দেখেনি। রাতে খুন করে ভোরে নামায পড়ছে। ব্যাপার টা সত্যি সত্যিই বেমানান। ভাবতে ভাবতে সেও ওযু করে ফজরের নামায টা আদায় করে নেয়। নামায শেষে রুহির কাছ থেকে চাবি নিয়ে মাধবী নিজের ঘরের সামনে যায়। তালা খুলে আস্তে করে আগে দরজার বাহির থেকে মাথা বের করে ভেতরে উঁকি দেয়। নাহ আরিয়ান এখনও বেঘোরে ঘুমাচ্ছে দেখে শস্থির নিশ্বাস ফেলে ভেতরে ঢুকে। এই দৃশ্য রুহি দেখলে হয়তো হাসতো। এই মাত্র জলজ্যান্ত কতগুলো মানুষ খুন করে এসে এখন স্বামীকে ভয় পাচ্ছে বলে।

পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকে আস্তে করে ভেতর থেকে দরজাটা বন্ধ করে দেয়। আরিয়ানের কাছে গিয়ে আগে চেক করে সজাগ নাকি ঘুমে। তারপর কিছুক্ষন ডাকাডাকি করে। সে জানে ঔষধের ডোজ এখনও শেষ হয়নি তবুও কিছুক্ষন ডাকাডাকি করে। তারপর কোন কথা বার্তা ছাড়াই পাশের টেবিল থেকে জগটা নিয়ে হুরহুর করে সবটা ঢেলে দেয় চোখের উপর। বেঘোরে ঘুমানো আরিয়ান কাঁচা ঘুম থেকে লাফ দিয়ে উঠে বসে। মস্তিষ্ক কিছুক্ষন কাজ করে না। যখন বুঝতে পারে তার বিছানা সহ গাঁ ভিজা, মেজাজ চরে যায়। পরক্ষণেই মনে পরে এটা এখন তাকে স্বজ্ঞানে বিয়ে করা পরীর বাচ্চা। ভাবতেই নিমিষেই মেজাজ পরে যায়। মুখে ফুটে উঠে মুচকি হাসি।
মাধবী নিজ থেকেই বলে “চা করে দেবো?”

আরিয়ান ঠোঁট কাঁমরে হাসে। বউ তার ভালো মন্দ বুঝতে পারে। ঘুমের ঔষধের তুলনায় ঘুম কম হয়েছে। যার ফলে এখন মাথাটা ঝিমঝিম করছে। এই সময় চা টা সত্যিই খুব দরকার ছিলো।
“দিলে মন্দ হয় না। সকাল সকাল বউয়ের হাতের চা খেয়ে দিন শুরু করলে দিনটা ফুরফুরে যাবে। যাহ কড়া করে এক কাপ চা নিয়ে আয়”
“আগে ওযু করে নামাযটা পড়ে নিন। আমি বানিয়ে আনছি। আর বিছানা কিন্ত আমি পরিষ্কার করতে পারবো না”
“নামাজের কথা তোকে বলতে হবে না। আর পানি তুই ফেলেছিস তাই তুই পরিষ্কার করবি না তো কে করবে!”
“আমি মরে গেলেও পারবো না” বলেই চা করতে চলে যায়।

আরিয়ান উঠে ওযু করে নামাজ পরে বিছানার চাদর উঠিয়ে ফেলে। ভেজা তোশকের উপর খবরের কাগজ দিয়ে দেয়। তারপর নিজ হাতে ঘরটাও ঝাঁড়ু দিয়ে ফেলে। বিছানায় নতুন চাদর বিছায়। চটপট করে সব কাজ করে সাদা পাঞ্জাবির সাথে সাদা শাল টা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে রান্না ঘরের দিকে ছোটে। গিয়ে দেখে মাধবী ট্রেতে করে দু কাপ চা নিয়ে আসছে। বাড়ির সকলে নামায পড়ে না। যারা পড়ে তারা নামায কালাম পড়ে চা খেয়ে কেউ কেউ কাজে বেরিয়ে গেছে আর বাড়ির কর্তিরা ঘুমিয়ে গেছে। শীতের মৌসুম তাই কুয়াশা এখনও কাটেনি। আরিয়ান বলে “একটা চাদর নিয়ে বাগানে চল”
মাধবী ভ্রুকুটি করে সুধায় “বাগানে কেন?”

“আবহাওয়া সুন্দর। এই সুন্দর আবহাওয়ায় জামাই বউ বাগানে বসে চা খাওয়া সুন্নত”
“হ্যা। দুনিয়ার সবই সুন্নত। আর এসব সুন্নত পালন করতে করতে আপনি নবীর শ্রেষ্ঠ উম্মত”
“তা ঠিক বলেছিস এখন আয়”
মাধবী কথা না বারিয়ে একটা চাদর নিয়ে হাঁটে। বাগানে পৌছলে আরিয়ান চাদরটা মসৃণ ঘাসের উপর বিছিয়ে মাধবীকে বসতে ইশারা করে। মাধবীর মনে পরে এই দিনগুলো তার বাবার সাথে কাটানো হয়েছে। প্রতিদিন সকাল সকাল পড়তে বসলে নিজ হাতে নাস্তা বানিয়ে নিয়ে আসতো। আর আজ সেরকমই একটা সকাল তবে আজ তার স্বামীর সাথে। মাধবী বসতে বসতে বলে “সাদা পাঞ্জাবির সাথে সাদা শাল কেন পরেন?”
আরিয়ান চায়ে চুমুক দিয়ে বলে “তো?”
“সাদা পাঞ্জাবির সাথে বাদামি বা কালো রঙের শাল বেশি মানায় আর কালো পাঞ্জাবির সাথে সাদা শাল। তবে আপনাকে সব কিছুতেই ভালো লাগে”

“যাহ একটু পর থেকে যেভাবে বলেছিস সেভাবেই মিলিয়ে পরবো”
“একটু পর থেকে কেন?”
“এখন উঠতে পারবো না”
“অলস লোক কোথাকার”
“কোথাকার না তোর জামাই লাগি”
“কচুঁ”
“ছ্যাহ মধু। তুই স্বামীকে সম্মান করিস না। তোর কাছ থেকে এসব আসা করি নাই”
“এহ। বলেন আসা করি নাই না আশার করা যায় না”
“এই বলতো তুই কবে ভালো মেয়ের মত সংসার করবি?”
“করতে তো চাই ই। তবে আপনি তো ভালো হবেন না”
“আমি আবার কি করলাম?”

“কিছু করেন নি। তবে আমি আপনাকে ভালো বলে মেনে নিতে পারি না। তাই যতদিন যাবত আপনি ভালো না হবেন মানে আমার চোখে ভালো না হবেন। ততদিন পর্যন্ত ভালো মেয়ের মত সংসার করার আশা আমার কাছ থেকে করা বন্ধ করুন”
“আগে জানলে জীন্দেগীতেও তোরে বিয়ে করতাম না”
“কে বলেছে আপনাকে বিয়ে করতে? নিজেই তো ধেই ধেই করে বিয়ে করতে গেছেন”
“বেশ করেছি”
“একদম মেয়েদের মত এভাবে তর্ক করবেন না”
“কেন? কোন হাদিসে লেখা আছে যে তর্ক শুধু মেয়েদের জন্য ছেলেরা করতে পারবে না”
“কথায় কথায় হাদীস আর সুন্নত। আসছে আমার মৌলভি পীর সাহেব”
“তুই এত ঝগড়া করিস কেন বলতো? অবশ্য মেয়েদের ঝগড়াতেই মানায়”
“আর ছেলেদের ক্ষমা চাওয়াতে”

“সেটা না হয় দু একবার বউয়ের কাছে চাওয়াই যায়। আর বউ যদি হয় অপ্সরা,তাহলে তো কথাই নেই”
বলে মাধবীকে কিছুক্ষন পর্যবেক্ষণ করে বলে “তোকে এই রঙে অপ্সরার মত লাগছে”
মাধবী নিজেও জানে না সে আজ কি রঙের জামা পরেছে। তাড়াহুড়োতে খেয়াল করেনি। এখন তাকিয়ে দেখে বাঙ্গী যেই রঙের হয় সেই রঙের একটা হালকা কালার গাউন। আরিয়ান আবারও বলে “এই রঙে সুন্দর লাগছে ঠিকই তবে শাড়ি পরলে আরো সুন্দর লাগতো। আর তুই জানিস না? বিয়ের পর মেয়েদের শাড়ি পরে স্বামীর সামনে ঘুরঘুর করতে হয়”

“করলে কী হবে?”
“পালুপাশা বাড়বে”
“এমনিতেই যে ভালোবাসা আছে তাতেই পাতিল উঁতলে পরে যায়। আর উঁতলে পরার সময়ই যদি পাতিল না উঠানো হয় তাহলে কিন্ত পুরে যায়। কথাটা একটু কষ্ট করে মাথায় গেঁথে রাখবেন। যত অল্প তত সুন্দর”
“বললাম ভালোবাসার কথা আর শুনিয়ে দিলো পাতিলের কথা। একেই বলে নারী জাতি”
মাধবী চুপ করে যায়। আরিয়ান হাসে। তারপর কিছুক্ষন নিস্তব্ধতার পর হঠাৎ আরিয়ান বলে “পোড়া পোড়া গন্ধ পাচ্ছি। খুব বাজে ভাবে হয়তো কিছু পুরে যাচ্ছে”
কথাটা শুনে মাধবীর একটুও সময় লাগে না বুঝতে। সেও বলে “এত পোড়া জিনিস রেখে তো কোন লাভ নেই। শুধু শুধু টাকা খরচ”

“ফেলে দেবো?”
“একটাকে পারবেন তবে আরেকটা অধিকার নিয়েই বসেছে। চাইলেও ফেলে দেয়া যাবে না”
“এরকম পোড়া জিনিস সাথে নিয়ে বউয়ের সাথে কথা বলে মজা পাচ্ছি না টুনির মা”
“যান এখন কিছু বলতাম কিন্ত বলবো না। আপনি আমাকে এসব টুনির মা ডাকেন কেন”
“আচ্ছা যাহ। একটু পর থেকে আবুলের নাতনি বলে ডাকবো। এবার খুশি?”
এমন ভাবে বলছে যেন সত্যিই খুশি হওয়ার মত কোন নাম দিয়েছে। মাধবী কিছু না বলে সোজা ছাদের উপর তাকায়। সাথে সাথে আরশি আর ইচ্ছে দুজন দু পাশে ছিটকে গিয়ে রেলিঙের নিচে লুকিয়ে পরে। কিছুক্ষন হয়েছে দুজন ছাদে এসেছিলো। পরে মাধবী আর আরিয়ান কে একসাথে বসে থাকতে দেখে সেখানেই ঠাঁই দাঁড়িয়ে পরে। আর সেটা মাধবীর আরিয়ানের তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কে তখনই ধরা পরে গিয়েছিল।
মাধবী জোরে জোরে বলে “আরিয়ান ভাই! আমাদের কি এক সাথে একটু বেশিই সুন্দর লাগে যে মানুষ এদিক সেদিক থেকে উঁকি মেরে দেখে!”

আরিয়ান হাসে। মেয়েটা বেশ ভালোই খোঁচা মেরে কথা বলতে পারে। একদম খাঁপে খাঁপ ভাবে। মাধবীর কথাটা আরশি আর ইচ্ছের কানে যেতেই দুজনে বসে থাকা অবস্থাতেই ছাঁদ থেকে নেমে পরে। ওরা চলে গেছে বুঝতে পেরে মাধবী বলে ” বাড়ির সবাই উঠে পরছে ভেতরে চলুন। আর আপনার না অনেক কাজ?”
“আজ একটু ব্যস্ততাতেই কাটবে। সংসদে যেতে হবে। চা*মা*রে*র ছাওয়ালরা বেশি নাচানাচি করছে। একটা দুটোর ডানা কেটে দিলেই হবে”

“বা*ল* ফালাবেন আপনি। কাজের কাজ কোন বা*ল*ও ছিড়তে পারেন না। শুধু বড় বড় চাপা”
“ছ্যাহ। এতবড় অপমান! আজই গিয়ে সবকটার বা*ল* ছিড়ে রেখে আসবো। কেমন?”
মাধবী কোন কথা না বলে নিচ থেকে চাঁদরটা উঠিয়ে ভাজ করে ভেতরে চলে আসে। আরিয়ানও পিছু পিছু আসে। ততক্ষনে সকলে উঠে যে যার কাজে লেগে পরেছে। আরিয়ান নিজের ঘরে যেতে যেতে চেঁচিয়ে বলে যায় “আম্মা? আজ বড় একটা দায়িত্ব দিয়েছে বউ। তাই তাড়াতাড়ি খেয়ে তাড়াতাড়ি যেতে হবে”
রুমে গিয়ে একেবারে তৈরী হয়ে নিচে নামে আরিয়ান। পড়নে সব সময়ের মতই সাদা পাঞ্জাবি। এখন মাধবীর কথামত সাদা পাঞ্জাবির সাথে কালো শাল পরেছে। চোখে কালো সানগ্লাস। হাতে কালো ঘড়ি। হালকা করে রাখা বাবরি চুলগুলো সিরি দিয়ে নামার সময় বাতাসে দোল খাচ্ছে। কালচে বাদামি রঙের ঠোঁটের ফাঁকে চেপে রাখা সিগারেট এক হাত দিয়ে মেঁচের কাঠি দ্বারা জালাচ্ছে আরেক হাত বাতাস রোধের জন্য সামনে ধরে রেখেছে। সেভাবেই একের পর এক সিরি বেয়ে নামছে।

তার শ্যাম গড়নে যেন এই হালকা জিনিস গুলোই যেন তার পুরুষত্বকে আরো সুদর্শন করে তোলে। আর সেই শ্যামবর্ণের লোকটাই এক সাথে তিনটি রমনীর চোখে মুগ্ধতা এনেছে। আরশি,ইচ্ছে,মাধবী তিনজনই অপলোক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। শ্যাম গড়নেও যে এত মাধুর্যতা,এতো মুগ্ধতা থাকতে পারে তার জলজ্যান্ত প্রমাণ আরিয়ান। তবে হঠাৎই মাধবীর চোখে মুগ্ধতা ছাপিয়ে ভর করে এক রাশ বিরক্তি। আরশি আর ইচ্ছেকে ড্যাবড্যাব করে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নাক মুখ কুচকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই আরিয়ান বলে “পা কাটা আর কুত্তার দৌড়ানিটা মনে হয় কম হয়ে গেছে তাই না মধু? এখন নতুন কিছু করতে হবে মনে হয়”
মাধবী তার উত্তর না দিয়ে বলে “আপনি সিগারেট খাচ্ছেন কেন?”

“নতুন দেখছিস?”
“কোন কারণ ছাড়া তো খান না”
মাধবী দু হাত বুকে বেঁধে বলে “তা কি কারণ শুনি?”
“এই যেমন ধর আমি খুব বিরক্ত হলে কিংবা রাগ উঠলে, শরীর খারাপ লাগলে, দমবন্ধ লাগলে ইত্যাদি আরো কিছু রোগের জন্য এই সিগারেট আমার খেতেই হয়”
“বাহ। সিগারেট খেলে যেই রোগ গুলো মানুষের হয় সেই রোগ গুলো দেখছি আপনার সিগারেট না খেলে হয়। তা এখন কী এমন রোগ হয়েছে?”
“সবগুলোই হয়েছে”
“কারণ?”

“সুন্দরী বউ আশেপাশে ঘুরে বেরাবে অথচ কাছে আসতে দেবে না তো এসব রোগ তো হবেই। রোগের আসল ঔষধ তুই আর নকল ঔষধ সিগারেট। তাই রোগের আসল ঔষধ তো আর পাবো না তাই সিগারেট দিয়েই কাজ চালাই”
মাধবী হতাশার শ্বাস ফেলে বলে “তা নবাব সেজে যে চলে যাচ্ছেন খাবেন না?”
“না। আজ দেখছি সত্যি সত্যি বা*ল ছিড়তেই হবে। পোলাপান টেলিফোন করেছে কী যেন হয়েছে। খব বড় সমস্যা নাকি। তাই এখনই যেতে হবে। এসে খেয়ে নেবো”
তারপর ইচ্ছের দিকে তাকিয়ে বলে “ভাবি আপনার সোয়ামিকে বলবেন যেন নয়টার মধ্যে সংসদে থাকে”
বলেই আরিয়ান বেরিয়ে যায়। মাধবী নাস্তা সেরে নিজের ঘরে চলে যায়। আজ অপুর প্রেমপত্র গুলো খুলে দেখবে। সময়ের ওভাবে এতদিন পারেনি। আজ সময় করে চিঠিগুলো হাতে নিয়ে বসেছে। তখনই দরজায় টোকা পরে। মাধবী অনুমতি দিতেই ইচ্ছে,

আরশি আর রুহি ঢুকে পরে। ওদেরকে দেখে মাধবী হাতের চিঠিগুলো বালিশের নিচে ঢুকিয়ে রাখে। তিনজন এসে খাটে গোল হয়ে বসে। অরশি আর ইচ্ছের সাথে সামনাসামনি না হলেও ভেতরে ভেতরে মনোমালিন্য চলছে এটা ওরা সবাই জানে। মাধবীই আগ বারিয়ে বলে “কী অবস্থা সবার?”
ইচ্ছে তাচ্ছিল্য হেসে বলে “কাটা ঘায়ে নুনের ছেটা দিচ্ছো?”
আরশি আর রুহি গাইগুই করে। তারা আগে থেকেই ইচ্ছেকে বুঝিয়ে এনেছে যেন মাধবীর সাথে উল্টো পাল্টা কথা না বলে। আর এই মেয়ে কি না এসেই এসব বলছে। মাধীকে এক বার তার ভালো রুপ থেকে ফেরালে যে এর পরিনাম খারাপ হয় তা খুব ভালোভাবেই জানে তারা।
মাধবী হেসে উত্তর দেয় “এখানে কোন ঘাঁ ও দেখছি না নুনও দেখছি না”
ইচ্ছে কিছু বলতে যাবে তার আগেই তাকে আরশি চিমটি দিয়ে বোঝায় চুপ থাকতে। পরে সে বলে “তুমিও কি আরিয়ান ভাইয়াকে ভালোবাসো?”

“ভালো না বসলে কি আর এক ঘরে থাকি?”
“তুমি কিভাবে ওমন একটা ছেলেকে ভালোবাসতে পারো?”
“কেন? কি সমস্যা?”
“তুমি আরিয়ান ভাই কে কেন ভালোবাসো?”
মাধবী সন্দিহান চোখে তাকিয়ে বলে “কী বলতে চাইছিস?”
“না মানে তুমি সুন্দরী আর আরিয়ান ভাই কালো”
“তো?”
ইচ্ছে বলে “তোমার সাথে তো ওকে একেবারেই বেমানান লাগে। তুমি হচ্ছো হুরের মত সুন্দরী আর আরিয়ান তো কালো। তবুও তুমি কেন ওকেই ভালোবাসলে!”
মাধবী কথায় উত্তর না দিয়ে সেই আরিয়ানের সাথে মিলে যাওয়া গানটা সুরের সাথে গেয়ে উঠে,

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ২৫

মাইনষে বলে তারে
কালা রে কালা
আমারই কাছে লাগে
কত যে ভালা…
মাইনষে বলে তারে
কালা রে কালা
আমারই কাছে লাগে
কত যে ভালা…
কলা গলার মালা
ঐ লাল কুর্তা ওয়ালা
দিলে বড় জ্বালা রে
পাঞ্জাবিওয়ালা
দিলে বড় জ্বালা রে
পাঞ্জাবিওয়ালা
তখনই দরজাটা জোরে ধাক্কায় খুলে যায়। আরিয়ান হাঁক ছাড়তে ছাড়তে ঘরে ঢোকে “মধু কাশেইম্মা সহ আরো অনেকে খুন হয়েছে ঐ গ্রামের। মিষ্টি খাবি?”

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ২৭