Home তুই আমার ৭ মিনিট তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ২৯

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ২৯

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ২৯
ঐশী আফরিন

কাল রাতের পুরো ঘটনা সংক্ষেপে শোনায় মাধবী আরিয়ান কে। সব শুনে আরিয়ান ভেংচি কেটে বলে “এভাবে কেউ খুন করে মনচুন্নি। ধুর কোন কষ্টই তো দিতে পারিসনি। আমার কাছে সকাল সন্ধ্যা ক্লাস করিস। কষ্ট দিয়ে খুন করা শিখিয়ে দিবো”
“বয়েই গেছে আমার আপনার কাছ থেকে শিখতে। আমিও পারি। তবে সময়ের অভাবে কাল পারিনি। কিন্ত আপনি আমাকে কি বললেন?”
“কি বললাম?”
“মনচুন্নি আবার কি?”

আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বলে “বউ হয়ে স্বামীর মন , মস্তিষ্ক , ধ্যান জ্ঞান , খেয়াল , ফুসফুস , কিডনি , হার্ট , পিত্তথলি সব চুরি করে নিয়ে গেলি? একটুও হাত কাঁপলো না? তাই তোর নাম দিলাম মনচুন্নি”
মাধবী হেসে বলে “নাহ। শুধু হাত না মন মস্তিষ্ক , ধ্যান জ্ঞান , খেয়াল , ফুসফুস , কিডনি , হার্ট , পিত্তথলি কিছুই কাঁপেনি। দুঃখিত”
“তোর দুঃখিতদের গুষ্টি কিলাই”
“শুধু গুষ্টি না চৌদ্দ গুষ্টি কিলালেও আমার কিচ্ছু যায় আসে না”
“তোর মত বউ কারো কপালে না হোক”
মাধবী ঠোঁট কাঁমরে দুষ্টুমি করে বলে “আমার মত না হোক আমিই হলাম। সমস্যা…”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

” বান্দির বাচ্চা এমন চটকানা মারবো যে তিনদিন কানে কম শুনবি”
“আপনার গায়ে এত কম শক্তি? যে মাত্র তিনদিন কানে কম শুনবো। এই তিনদিন একেবারে কানে না শুনলেও তো বুঝতাম একটু শক্তি আছে। শুধু কানে কম শুনবো। ছ্যাহ ”
“মুখটা খোলাস না পরীর বাচ্চা। আমি মুখ খুললে তোর রাণী গিরিতেও কোন কাজ হবে না। শক্তি এমনভাবে দেখাবো একেবারে…”
“চুপপপ অভদ্র পুরুষ”

মাধবী বুঝে যায় এই লোক এখন ভালো কথা বলবে না তাই আগেই চিৎকার করে উঠে। আরিয়ান ঠোঁট কাঁমরে হেসে বলে “আচ্ছা যা এখন বললাম না। সময় হলে শক্তি দেখিয়ে দেবো”
এভাবে আরো নানান কথা বলতে বলতেই তারা মুক্তাগছা পৌছে যায়। বাড়ির সামনে আসলে দুজনে ঘোড়া থেকে নেমে পরে। আরিয়ান দরজার সামনে থেকেই হাঁক ছাড়ে “পরাজয়ের বাচ্চা…? এই পরাজয়”
মাধবী চোখ সরু করে তাকিয়ে বলে “আপনি কি কোন নামই ভালোভাবে ডাকতে পারেন না? নামগুলো তো ভেংচাবেনই সাথে বাচ্চাও লাগিয়ে দেন। আমাকে এসব ডাকবেন না। নাম ভেংচানো কবিরা গুনাহ”
“ওহ আমি জানতামই না নাম ভেংচানো কবিরা গুনাহ আর খুন করা সুন্নত”
“কথায় কথায় শুধু খুন খুন করেন কেন? আর এসব কি?”

“কোন সব?”
“আপনি একটু ভেবে দেখবেন আপনার কতগুলো বাজে স্বভাব আছে”
“ভাবার সময় নেই। তুই বল”
“আপনার কথার মাঝেই একটু খেয়াল রাখেন তাহলেই বুঝতে পারবেন”
ততক্ষণে অজয় এসে হাজির। যেই দুজনকে মাথা নামিয়ে সালাম করতে যাবে আরিয়ান ধমক মেরে বলে “হাঁট শালা। তোকে না আমার বউ একদিন নিষেধ করেছে এভাবে মাথা নিচু না করার জন্য”
আমার বউ কথাটা শুনতেই অজয়ের মনে পরে সেদিন সেও আরিয়ানের বলদ মার্কা পরিকল্পনায় সাহায্য করেছিলো। মনে পরতেই সে ভয়ে ভয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে আরিয়ান কে বলে “ভাই আপনি বেঁচে আছেন?”
আরিয়ান বুঝতে এই ছেলের ভয়ের কথা। সে উল্টো প্রশ্ন করে বলে “তুই বাঁচতে চাইছিস?”
“হ্যা ভাই। আমি বিয়ের আগে মরতে চাই না”

আরিয়ান অজয়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে দাঁত চেপে বলে “মরতে না চাইলে মুখটা বন্ধ রাখ”
তারপর সোজা হয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে “তোর ভাবিকে ভেতরে নিয়ে যা। বেচারি শুক্রবার বিয়ে করবে গ্রামকে নিয়ে। পুরো ময়মনসিংহে প্রচার করে দে- শুক্রবার রাণী মাধবীলতার সাথে সেনাপতি আরিয়ানের বিয়ে, সকলেই যেন আন্ডা বাচ্চা যার যা আছে সাথে করে নিয়ে আসে”

মাধবী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়ির ভেতরে ঢোকে। বিয়ের আগে যদি সে আরিয়ানের এই ভন্ড রূপ জানতো তাহলে সেদিনই সবগুলোকে খুন করতো তবুও বিয়ে করতো না। দরকার পরলে সারাজীবন নিজেও চিরকুমার থাকতো বেটাকেও রাখতো। কি আর করার যেহেতু মন দেয়া নেয়া হয়েই গেছে। এসবের মায়ায় পরবে না বলা মেয়েটাও ধীরে ধীরে আরিয়ানের পাঁচমিশালি চরিত্র আর কথার মায়ায় পরে যাচ্ছে। সে ভালোই বেসেছিলো আরিয়ান তার মত ভয়ংকর খুনি ভেবে। কিন্ত কে জানতো বিয়ের পর সাহেবের ভয়ংকর খুনির রূপ না দেখে ভন্ডামির রুপ দেখবে !
মাধবী বাড়িতে ঢোকার কিছুক্ষন পরেই আরিয়ান ঢোকে। পুরো ময়মনসিংহ জেলায় মাইকিং করে দাওয়াত দেয়া হচ্ছে। আশেপাশের কিছু গ্রামের চেনা পরিচিত লোকজন কেও বলা হচ্ছে। তালিকা করলে দেখা যায় ৭০হাজারের অধিক মানুষ হয়। এত মানুষ কে তো দাওয়াত করে এনে খাওয়ানো যাবে না। আর মানুষ এত দূর দুরান্ত থেকে আসবেও না। তাই কথা হয়েছে শুক্রবারের মধ্যে সকলের বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোক দিয়ে খাবার পাঠানো হবে। প্রতিটা গ্রামে বাবুর্চি পাঠানো হলে তারা রান্না করে প্যাকেটিং এর মাধ্যমে দিয়ে আসবে। আর যাদের ইচ্ছে আছে বিয়ে দেখার তারা আসতে পারে সমস্যা নেই। এবং মুক্তাগাছায় বিয়ে অনুষ্ঠিত হবে। এই গ্রামের সকলেই বিয়েতে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ করবে। যেহেতু মাধবীর পরিবার নেই সে এই গ্রামের মানুষ কেই নিজের পরিবারের মত মনে করে। তবে সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার টা হচ্ছে আরিয়ান একটা চিরকুট লিখে বলেছে সেটা ছাপা করে খাবারের প্যাকেটের সাথে সবার বাড়িতে দিতে বলেছে। চিরকুটে লিখেছে,

~ বিয়ের কার্ড ছেপে নিমন্ত্রণ করতে পারলাম না। সে অনেক টাকা খরচ হবে। তাই একটা বিরল পদ্ধতি ব্যবহার করলাম। সবাই তো কার্ডে পরিচয় দেয়। আমাদের পরিচয় তো সবাই জানেনই। তাই পরিচয় না দিয়ে বলি- আমি যেই মেয়েকে বিয়ে করছি সে কিন্ত আপনাদের রাণী মা হলেও আমার মনচুন্নি। ওর স্বভাব সম্পর্কে তো সকলে জানেনই তাই ঝুঁকিতে আছি কখন আবার আমাকে কি করে বসে। তাই সবাই একটু খাছ দিলে দোয়া করবেন যেন আমি বেঁচে থাকতে পারি। আর এই মেয়েকে যেন আল্লাহ হেদায়েত দান করে। সবাই বলুন আমিন।
মনে রাখবেন কারো জন্য দোয়া করা সুন্নত ~
এসব ভাবতে ভাবতে আরিয়ান ঘরে ঢোকে। সে খুব ভালোভাবেই জানে এই কুকর্মের কথা মাধবী জানতে পারলে কি যে করবে নিজেও জানবে না। তবে মাধবীর প্রতিক্রিয়ার কথা মনে পরতেই হাসি পায় তার। অযথা তাকে এভাবে হাসতে দেখে মাধবীর সন্দেহ হয়। সে খাট থেকে নেমে সামনে দাঁড়িয়ে বলে “আবার কি করে এসেছেন?”

“এই মেয়ে দূরে হাঁট। আমি কি করবো? সারাক্ষণই শুধু আমার পেছনেই পরে থাকে। বান্দির বাচ্চা”
“আমি বান্দির বাচ্চা?”
“নাহ তুই মেজাজ খারাপের সময় বান্দির বাচ্চা আর মেজাজ ভালোর সময় পরীর বাচ্চা। বিয়ের আগে মধুর মা বিয়ের পর টুনির মা। কিছু সময় মনচুন্নি কিছু সময় রুহি। বাকি সময় মধুমতী”
মাধবী ভ্রু কুচকে বলে “রুহি…?”
“রুহি অর্থ জানিস না?”
“নাহ। কি?”

“রুহি অর্থ আমার আত্মা। সবাই তো জান প্রাণ কলিজা কিডনি পশু পাখি সবই ডাকে কিন্ত এসব বদলে ফেললেও কিন্ত মানুষ বাঁচতে পারে। এখন এসব নষ্ট হলে টাকা থাকলেই অন্য কারো কাছ থেকে কিনে বদলে ফেলা যায়। কিন্ত আত্মা বদলানো যায় না। যতদিন আছে একদম নিজের হয়েই আছে আর যেদিন দেহ ছাড়ে সেদিন কিছু সময়ের জন্য ছাড়ে। কবরে দেয়ার পর কিন্ত আবার যার আত্মা তাকেই দিয়ে দেয়া হয়। আর এতক্ষন আত্মাটা কিন্ত স্বয়ং আল্লাহর কাছে থাকে। তাই তুই আমার রুহি”
মাধবী মুগ্ধ হয়ে শোনে কথাগুলো। কিন্ত তার মনকে বোঝায় কঠোর হতে হবে আরিয়ান যতই নরম হোক। এসব কথায় গলে গেলে চলবে না। তবুও মনকে বোঝাতে পারে না। তাই জিজ্ঞেসই করে ফেলে “আরিয়ান ভাই…? আপনি আমাকে কতদিন ধরে ভালোবাসেন?”

“যার জন্য অনুভূতি তার কাছে অনুভূতি প্রকাশ করাটা আমার বিশেষ পছন্দ নয়”
“আচ্ছা কতদিন ধরে আমাকে নিজের বউ করার ইচ্ছা?”
“তোর বয়স কত?”
“১৮ কি ১৯ হবে”
“নিজের বয়সটা পর্যন্ত জানিস না গাঁধি। আজ তোর বয়স ১৮ বছর ২ মাস ৮দিন। তাহলে তোর জন্মের খবর কত দিন আগে আমার কানে পৌছাতে পারে?”
“১৯ বছর ১মাস ৮দিন”
“এই ১৯টা বছর তুই আমাকে জ্বালিয়েছিস”
“এই আপনি কি পাগল? বয়সই আমার ১৮ তাহলে আপনাকে ১৯ বছর ধরে কীভাবে জ্বালালাম?”
“ইশশশ গাঁধী। বললাম না যখন তোর জন্মের সংবাদ কানে এসেছিলো তখন থেকে নিয়ে”
“তখন থেকে কীভাবে?”

“তুই জন্মেছিস কার পেট থেকে?”
“উফফ। এতো ঘুরিয়ে পেচিয়ে না বলে সরাসরি বলুন”
আরিয়ান বলা শুরু করে “তোর মা কিন্ত তোর মায়ের আগে আমার মা। আমার দুঃসময়ে কিন্ত সেই পাশে ছিলো। যখন অনেক বছর পরে তোর জন্মের কথা শুনি। তখনই ভেতরে কেমন যেন একটা অনুভূতি হয়েছিলো। ভেবে রেখেছিলাম যেহেতু ফুফি আমাকে এতটা আগলে রেখেছে তো ফুফুর যদি একটা মেয়ে হয় আমি তাকে বিয়ে করে আগলে রাখবো আর ছেলে হলে ভাই হিসেবে আগলে রাখবো। কারণ তোর বড় ভাই তৃশাইন্নার সাথে আমার মিল পরতো না। তখন গ্রামের মানুষ বলাবলি করতো মাহফুজ চৌধুরীর এবার একটা মেয়েই হবে আর মাহফুজ চৌধুরীর রঙই পাবে। গ্রামের মহিলারা তো এমনেই বুঝে যেতো ছেলে হবে না মেয়ে হবে। তখন আমি ধরেই নিয়েছিলাম একটা শ্যাম কন্যা হবে ফুফির ঘরে। তারপর দুই শ্যামের একটা ছোট্ট সংসার হবে। তোর রূপ যৌবন না দেখেই ভালোবাসা শুরু করলাম তখন থেকেই। কিন্ত সবার ভাবনাকে ভূল প্রমানিত করে তুই জন্ম নিলি আগুন ঝড়া রূপ নিয়ে। সেই শ্যামার সংসারের বদল আজ হয়েছে এক কালা আর রূপসীর সংসার। আজ এতটুকুই থাক। সত্য কখনো চাপা থাকে না। আমি জানি একদিন সামনে আসবে তবে তার আগের দিনগুলো সুন্দর কাটাই। এখন বল এই রূপ কোথায় পেয়েছিস?”

সবগুলো কথা মন দিয়ে শোনার পর শেষ কথাটা শুনে মাধবী বলে “রূপ রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পেয়েছি”
“কোন রাস্তা থেকে পেয়েছিস বলিস তো। আসলে রূপ ছাড়া এ জগতে দাম নেই। এখন তো টাকা আছে বলে দাম আছে নয়তো এতদিন মানুষের কাছে আমি ফেলনা ছিলাম”
“কোন মানুষের কাছে?”
“থাক এসব বলে লাভ নেই । দিন ঘুরেছে মানে উপভোগ করি। আমরা আসলে অতীতের ভূল সিদ্ধান্ত আর ভবিষ্যতের সঠিক সিদ্ধান্তের কথা চিন্তা করতে করতে বর্তমান সিদ্ধান্ত টাকে অসুন্দর করে তুলি। এসব বাদ। এখন কি আজ বাড়িতে যাবি না থাকবি?”

“আপনি দেখা যায় পাঁচমিশালি ছাড়া ভালো কথাও বলতে পারেন”
“বলতে হবে না কার জামাই”
“বকুলি পাগলির জামাই। এবার আসেন চলে যাই”
“ধন্যবাদ নিজেকে বকুলি পাগলি বলার জন্য। এখন চলেন”
মাধবী মনকে শান্তনা দেয় পাগলের সাথে কথা বললেই কথা বারবে। তারপর আবার দুজনে বাড়ি থেকে বের হয়। ঘোড়ার সামনে এসে আরিয়ান বলে “আজ আমার সাথে এসে পর”
“আমার পেছনে বসতে ভালো লাগে না। আপনি আমার ঘোড়ায় এসে পরেন”

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ২৮

“জীন্দেগীতেও না”
“তাহলে ভালোবাসা বাদ দেন। নিজের ঘোড়ায় নিজে উঠেন”
“তোর মত বউ থাকলে এসবই করতে হবে”
বলে আরিয়ান ঘোড়ায় চড়ে বসে। টগবগিয়ে নিমিষেই দুজন হাওয়া হয়ে যায়।

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩০