তুই শুধু আমার উন্মাদনা পর্ব ৬৩
তাবাস্সুম খাতুন
রাতের আঁধার ঘেরাও করে রেখেছে ইতালির রোম শহরকে। সময়টা গিয়ে ঠেকেছে রাত দশটা বেজে চার মিনিটে। তবুও রোম শহরে যেন মানুষের আনাগোনা আড্ডা দেওয়া একসাথে ঘুরে বেড়ানোর কমার বদলে বেড়ে যাচ্ছে। নিশান সিমিকে ঘুম পড়িয়ে দিলো দুই মিনিট হচ্ছে। সিমির কপালে একটা চুমু দিয়ে সে উঠে পড়ল। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসলো। বাইরে এসে আলমারি থেকে নিজের পোশাক বাহির করলো। কালো প্যান্ট , সাদা শার্ট আর তার উপরে লেডার জ্যাকেট পড়ে নিলো।
চুলগুলো সেট আপ করে বালিশের পাশে থাকা তার ফোন তুলে নিলো সিমির দিকে এক পলক তাকিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে আবারো দরজা লক করে দিলো।সে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেলো। বাড়ির বাইরে পনেরো টা মতো বডিগার্ড পাহারা দিচ্ছে কালো পোশাক আর হাতে বড়ো বন্ধুক নিয়ে। নিশান বাড়ি থেকে বেড়িয়ে সদর দরজা লক করে দিলো। সে একটু এগিয়ে এসে সবগুলো বডিগার্ড এর উদ্দেশ্য গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“একটা পিঁপড়াও যেন এই বাড়ির ভিতরে ঢুকতে না পারে। সেই ভাবেই পাহারা দে আমি যতক্ষন না আসছি।”
সবাই মাথা নেড়ে নিজেদের জায়গায় চলে গেলো। নিশান নিজের গাড়িতে উঠে বসলো। স্টেয়ারিং ঘুরিয়ে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গন্তব্যর দিকে যেতে লাগলো। এর মধ্যে তার ফোনে কল আসলো নিশানের কানে ব্লুএটুথ আছে সে কানে হাত দিয়ে রিসিভ করলো। ওইপাশ থেকে ভেসে আসলো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“বস মেয়েটার সবকিছু বায়োডাটা আমি যোগাড় করতে পেরেছি। আপনি কোথায়? কখন আসবেন?”
“অপেক্ষা কর আমি আসছি।”
বলেই কল কেটে গেলো। নিশান মুখ গম্ভীর করে ফুল স্প্রিডে গাড়ি চালাতে লাগলো। বিশ মিনিট পরে তার গাড়ি এসে থামলো একটা বিল্ডিং এর সামনে নিশান গাড়ি থেকে বেড়িয়ে গাড়ি লক করে চাবি পকেটে ঢুকিয়ে বিল্ডিং এর দিকে হেঁটে যেতে লাগলো। সে বিল্ডিং এর ভিতরে ঢুকলো। বিল্ডিংটা আবারো তৈরী করা হচ্ছে নতুন করে কাজ চলছে, নিশান বিল্ডিং এর গেট ধরে দশ পা হেঁটে যেতেই আরেক জায়গা থেকে একটা সরু রাস্তা ধরে হাঁটা ধরলো। কিছু দূর যেতেই একটা দেওয়াল এ গোপন সুইচ এ চাপ দিলো। সাথে সাথে নিচে থাকা গোপন সুড়ঙ্গের পথ খুলে গেলো। নিশান ভিতরে ঢুকলো দুই এক পা হেঁটে একটু নিচে যেতেই আবারো সুইচ এ হাত দিতেই গোপন দরজা বন্ধ হয়ে গেলো।
নিশান সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো। সেখানে ছিলো হাজারো কালো পোশাক ধারী বডিগার্ড নিশানকে দেখেই সবাই মাথা নিচু করে নিলো। নিশানকে যাওয়ার রাস্তা করে দিলো। নিশান সেই রাস্তা ধরে যেতে লাগলো। এই গোপন সুড়ঙ্গে আছে দশটা বড়ো বড়ো রুম। বড়ো একটা অডটেরিয়াম। এই গোপন সুড়ঙ্গের নিচে আরো একটা জায়গা আছে খুবই ভয়ঙ্কর জায়গা যেইখানে অন্ধকার কারাগার বিরাজমান করছে। নিশান হাঁটতে হাঁটতে একটা রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো। বডিগার্ড গুলো দরজা খুলে দিতেই নিশান ভিতরে প্রবেশ করলো। রুমের ভিতরে দুইটা ছেলে আর দুইটা বডিগার্ড ছিলো।একটা ছেলে নিশানের কাছে এসে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“বস আপনি বসুন আর দেখেন মেয়েটা আসলে কে। আপনিও চিনবেন!”
নিশান ঘাড় এইপাশে ঐপাশে কাত করে ফুটিয়ে নিলো। সোজা গিয়ে বসলো সোফার উপরে। ছেলেটা নিজের ল্যাপটপ এগিয়ে দিলো নিশানের কাছে নিশান দেখতে লাগলো ছেলেটা বললো,
“বস মেয়েটার নাম অরুয়ানা শেখ অরা। কানাডার আন্ডার ওয়ার্ল্ড মাফিয়া ডন ইমতিয়াজ শেখের এক মাত্র মেয়ে। আমি অনেক হ্যাকিং করে এইটুকু তথ্য পেলাম। তবে আরো কিছু ডিটেলস আমি বলতে পারবো যেইগুলো আমার ল্যাপটপ থেকে না আমার মস্তিস্ক থেকে।”
ছেলেটা থামলো নিশান তার দিকে তাকাতেই ছেলেটা বলে উঠলো,
“এই মেয়ে নিজের বাপের পাওয়ার দিয়ে অনেক কিছু করে। তার একটা জেদ আছে যেইটা বলে সেইটা করে দেখায়। ওর সেইটা লাগবে না কোন কাজে তবুও অন্যের থেকে ছিনিয়ে এনে রাখবে। আপনি যখন TN টিমে ছিলেন বস সেইসময় মেয়েটা তার বাপের কাছে আপনাকে চাই কিন্তু পেরে ওঠে না জেদ চেপে বসে। এখনো সেই জেদ মেটাতেই মনে হয় ভাবির দিকে নজর দিচ্ছে তাকে কষ্ট দিয়ে আপনাকে শেষ করার পরিকল্পনা করছে বস।”
নিশান রাগানিত্ব চোখে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললো,
“এইসব কথা তখন বলিস নি কেন? স্টুপিড আমার ইশুর যদি কিছু হয় আমি এই TN টিম মাটির সাথে মিশিয়ে দেবো। বুঝেছিস?”
ছেলেটা মাথা নিচু করে বললো,
“বস সেই সময় বলি নি কারন আপনিও তার পর পর সবকিছু ছেড়ে চলে যান। যোগাযোগ বন্ধ করে দেন আমিও আর ঐসব বলার চেষ্টা করলাম না। তবে ভাবির কিছু হবে না আমাদের সব গার্ড সবসময় সেভ রাখবে ভাবীকে।”
নিশান উঠে দাঁড়ালো বলে উঠলো,
“ওর পার্সোনাল একাউন্ট হ্যাক করার চেষ্টা কর। খোঁজ লাগা ও এখন কোথায় অবস্থান করছে? আমাকে সকালের মধ্যে সবকিছুর খবর জানিয়ে দিস আদিল।”
আদিল মাথা নাড়লো বসে পড়লো ল্যাপটপ নিয়ে। সে একজন বড়ো হ্যাকার। ল্যাপটপ ঘেঁটে সে সবকিছু হ্যাক করে নিতে পারে কে কোথায় আছে কি অবস্থাতে সেগুলো ও সে খোঁজ নিয়ে নেই এই হ্যাক এর মাধ্যমে। নিশান আরেকটা ছেলের উদ্দেশ্য বললো,
“সাদিক তুই আমাদের পুরো TN টিমের মধ্যে খবর ছড়িয়ে দে। সবাইকে কাজে লেগে যেতে বল। কোন সন্ধিহান কিছু পেলে আমাকে বলে দিস। আমি এখন চলে যাচ্ছি আল্লাহ হাফেজ।”
বলে বেড়িয়ে গেলো সেই জায়গা ছেড়ে। এইদিকে সাদিক ও কোন রূপ বাক্য ব্যায় না করে নিজের মতো কাজ করতে লাগলো নিশানের বলে যাওয়া অনুযায়ী। নিশান বিল্ডিং থেকে বেড়িয়ে সোজা নিজের গাড়িতে উঠে বসলো। গাড়ি চলতে শুরু করলো তার বাড়ির উদ্দেশ্যর দিকে।
রাত একটা বেজে চার মিনিট। আচমকা সিমির ঘুম ভেঙে যাই। ঘুম থেকে উঠে বুকে হাত দিয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে থাকে। গলা শুকিয়ে গেছে। কপালে ঘাম জমে আছে।শ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছে।সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো ধীরে ধীরে হেঁটে লাইট অন করলো। রুম আলোকিত হলো সে টি টেবিল থেকে পানি নিয়ে খেলো। পানি শেষ করে বেডে বসলো নিজেকে স্বাভাবিক করতে লাগলো একটু স্বাভাবিক হতেই দেখলো বেড এ সে শুধু একা। নিশান কোথায়? সিমি আশেপাশে তাকালো বেড থেকে নেমে ওয়াশরুমে দেখলো না নেই বেলকুনির পর্দা সরালো তাও নেই। গেলো কোথায়? তার এইবার আরো ভয় লাগছে বুকের ভিতরে ধুকধুকানি টা যেন বাড়তেই আছে।সে বেডে বসলো গায়ে ব্লাঙ্কেট জড়িয়ে গটশট হয়ে কাঁপতে লাগলো ভয় লাগছে প্রচুর। এর মধ্যে সে শুনতে পাচ্ছে কেউ ভারী বুটের শব্দ তুলে রুমের দিকে হেঁটে আসছে সিমির নিশ্বাস নেওয়াটাও যেন বন্ধ হয়ে আসছে ভয় লাগছে প্রচুর। সিমি নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে আছে দরজার দিকে। হঠাৎ বুটের শব্দ থেমে গেলো কিন্তু পরক্ষনেই দরজা খোলার আওয়াজ হলো। সিমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে চিৎকার দিয়ে উঠলো উচ্চসরে। নিশান দ্রুত ভিতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে সিমির কাছে এসে বিচলিত কন্ঠে বলতে লাগলো,
“ইশু এই ইশু কি হয়েছে? কষ্ট হচ্ছে? কোন সমস্যা হচ্ছে? ভয় পেয়েছিস নাকি? এই ইশু!”
পরিচিত কণ্ঠ সিমির কানে যেতেই সিমি চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলো নিশান। সে দিক বেদিক ভুলে নিশানের বুকে হামলিয়ে পরে হুঁ হুঁ করে কান্না করে উঠলো। নিশান বুঝতে পারলোনা সিমির হঠাৎ কান্নার কারন সে সিমির মাথায় হাত বুলাতে লাগলো আর বললো,
“রিলাক্স জান রিলাক্স কি হয়েছে আমাকে বল? আমি আছি এইখানে। কান্না করছিস কেন জান? তোর কি ভয় লাগছিলো? কান্না থামা আমি আছি জান তোর সাথে সবসময় আছি।”
সিমি ফুঁফাতে ফুঁফাতে বললো,
“আমাকে রেখে কোথায় গিয়েছিলেন? জানেন আমার কত ভয় লাগছিলো? মাত্র একটা খারাপ স্বপ্ন আসছিলো আমার। পরে আপনাকে না দেখে আমি ভয় পেয়ে গেছি। আমার শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে দেখেন না। আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ভয় লাগছে। আমাকে ছেড়ে যাবেন না ভয় লাগছে খুব।”
কথা গুলো সে দম নিয়ে নিয়ে বলছে। নিশান সিমিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বেডে শুয়ে পড়লো ব্লাঙ্কেট টেনে দিয়ে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে বললো,
“দেখ তোর কাছেই আছি। তোকে ছেড়ে দূরে কোথাও যাচ্ছি না। আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি বুঝতে পারি নি আর এমন হবে না জান আমার,চুপ কর এইবার।”
সিমির কান্নার রেশ কমে এলো। তবে নাক টানতে লাগলো। নিশান সিমির চুলে গভীর চুম্বন দিয়ে বললো,
“ঘুমা আমি আছি আর কোথাও যাব না। ঘুমিয়ে পর।”
তুই শুধু আমার উন্মাদনা পর্ব ৬২
সিমি নিশানকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। নিশানের প্রতি যে রাগ ছিলো তার সেগুলো সে বেমালুম ভুলে গিয়েছে। তার কাছে এখন একমাত্র আশ্রয় আর নিরাপদ স্থান নিশানের বুক। তাই সে আরো আষ্টে পিষ্টে জরিয়ে নিশানের বুকে গুটি সুটি মেরে শুয়ে রইলো।এইদিকে নিশান চোখ দুটো বন্ধ করে বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা সাজাতে লাগলো।
