তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২১
রিমঝিম বৃষ্টি
” সত্যি আসলেন আপনি..?”
ফারিশা চুলার নিচের দিকে মুছতে মুছতে বললো। তা শুনে ইরাদ বললো,
” অবশ্যই আসবো কিন্তু তোমার বাকি দল আর হায়না টা কোথায়..?”
ফারিশা কাজ করতে করতেই বললো,
” ওরা তুবার বাড়িতে গেছে পরশু বিয়ে ওর তাই আমাকে একা……
বাকি কথার বলার আগেই সামনে তাকাতেই কিছুটা থমকালো ইরাদকে দেখে। ইরাদের পরনে আজ সাদা পাঞ্জাবি যার বুকের ওপরের দু’টো বোতাম খোলা হওয়ায় তার ফর্সা বুক দৃশ্যমান যেনো, হাতা দুটো কনুই অব্দি গোটানো সাথে তার গলায় নীল রঙের ওড়না দেখে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য। পরক্ষণেই তার গলায় নিজের ড্রেসের ওড়নাটা দেখে বললো,
” আমার ওড়না নিয়েছেন কেন..?”
ইরাদ সূক্ষ্ম হেসে ফারিশার দিকে তাকিয়ে নিজের চুল ঠিক করতে করতে বললো,
” এটা বউয়ের সিল যেনো কারোর নজর না লাগে.! ”
ফারিশা নজর সরিয়ে পাশ ঘুরে কফি বানাতে বানাতে বললো,
” যার নজর খারাপ তার সিল লাগিয়েও লাভ হয় না বুঝলেন আর যার নজর ভালো তার সিলেরও প্রয়োজন হয় না.!”
পাশেই তাকের ওপর হাতে কনুই ভর দাঁড় হয়ে ইরাদ বললো,
” জি অবশ্যই কিন্তু তাদের মধ্যে এই ইরাদ চৌধুরী পড়ে না বুঝলেন..! ”
” হু..! ”
ফারিশার কথা শুনে ইরাদ ব্যঙ্গ করে হেসে উঠলো। হুট করেই লাফিয়ে উঠলো ইরাদ আর মুখ কুঁচকে আওয়াজ করলো,
” ইশশ..!”,
বলেই পিছন ফিরতেই দেখলো তার হাতের আঙ্গুল নিজের মুখে নিয়ে কামড়ে ধরেছে ইয়াশ। ইরাদের তাকানো দেখেই ইয়াশ হাত ছেড়ে দিয়ে কিছুটা রাগী গলায় বললো,
” আমাকে বসিয়ে দাও মিলাদ..! আমার গলম ( গরম) লাগছে..?”
পাশ ঘুরে ফারিশা ইয়াশের কান্ড দেখেই হেসে নিজে এগিয়ে এসে তাকে কোলে তুলে ডিভানের ওপর বসিয়ে দিয়ে বললো,
” আপনি এখানেই চুপটি করে বসবেন হে আমরা কাজ করি.!”
কোনো কাস্টমারের গলা পেতেই ফারিশা বাইরে চলে গেলে ইরাদ নিজের হাতের আঙ্গুল টা দেখলো দাঁত বসে গেছো যেনে একদম, পিছন ঘুরে ছেলের দিকে এগিয়ে ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে বললো,
” এই পুঁচকে কামড় দিলে কেন আমায়..?”
ইয়াশ দাঁতগুলো বের করে হেসে বললো,
” তো আমায় দালিয়ে ( দাঁড়িয়ে) লেখেচিলে কেনো.?”
” সরে যান ওখান থেকে কফি বানাতে হবে..!”,
বলেই ফারিশা এগিয়ে আসলে ইরাদ পাশ থেকে এগিয়ে এসে বললো,
” আমি বানিয়ে দেয়..?”
ফারিশা ঘাড় ঘুরিয়ে শক্ত গলায় বললো,
” না থাক লাগবে না আপনি বরং কাফগুলো বের করুন..!”
ইরাদ পাশের তাক থেকে কাফ বের করতে করতে বললো,
” কয়’টা বের করবো..?”
” একুশ টা.!”
ইরাদ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো আর বললো,
” এত কাস্টমার কয় থেকে আসলো..?”
ফারিশা উত্তর দিলো না। এত কাস্টমার তার ওপর আবার মেয়ে সবগুলো কেন যে এসেছে কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছে। কফি বানিয়ে তিন-চার টা ট্টে তে করে সাজিয়ে নিলো তারপর একটা ফারিশা নিয়ে বেরিয়ে যেতেই অন্য টা ইরাদ ধরলে ফারিশা পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে বললো,
” আপনার আসতে হবে না..?”
ফারিশার কথায় ইরাদের ভ্রু কিছুটা কুঁচকে বললো,
” কেনো এতগুলো আছে আমি একটা নি…
বাকি কথা বলার আগেই ফারিশা হনহনিয়ে চলে গেলো। ইরাদ তবুও একটা ট্রে হাতে নিলো বাইরে যেতে বসলেই ইয়াশ বললো,
” আমি যাই তোমাল সাথে..? ”
ইরাদ পাশে তাকিয়ে বললো,
” আচ্ছা এসো আমার সাথে! “,
বলেই বাইরে যেতেই কিছু স্তব্ধ হলো এগুলো মেয়েকে দেখে তারাও ইরাদকে এখানকার ওয়েটার রুপে দেখে যেনো অবাক হলো। এখানে সব কলেজ স্টুডেন্ট যারা ভার্সিটিতে ভর্তি হবে জন্য শেষ বারের মতো সবার সাথে ছোট-খাটো আড্ডা দেওয়ার জন্য অন্য ক্যাফেতে যেতে বসেছিলো কিন্তু ইরাদকে ঢুকতে দেখে তারা এই ক্যাফেতেই এসেছে। ইরাদ সামনের টেবিলে ট্রে রেখে সবাইকে কফি দিচ্ছে মেয়েগুলো তো তার দিকেই তাকিয়ে আছে ড্যাবড্যাব করে তা দূর হতে ফারিশা বিষয় টা খেয়াল করলো। পাশেই বসে থাকা মেয়েটা মিষ্টি গলায় বললো,
” ভাইয়া কী এখানেই জব করেন..?”
” জি কিছুদিনের জন্য..! ”
ইরাদ তাকালো না তার দিকে তা দেখে পাশ থেকে আরেক মেয়ে বলে উঠলো,
” তো আপনার নাম্বার হবে ভাইয়া না মানে এখানকার কফিটা বেশ টেস্ট মাঝেমধ্যে না হয় ডেলিভারি দিয়ে যেতেন..?”
ইরাদ পাশের টেবিলে থাকা ফারিশাকে দেখিয়ে শান্ত গলায় বললো,
” সরি আন্টি! আপাদের যদি অর্ডার করতে ইচ্ছে হয় তো আমার স্ত্রীর নাম্বার বা ক্যাফের নাম্বার নিয়ে যাবেন ধন্যবাদ..! “,
বলেই চলে গেলো ইয়াশ কে নিয়ে ভেতরে আরেকটা ট্রে আনতে আর এদিকে মেয়েটা চুপসে গেলো দু:খে, মনটা খারাপ করে বললো,
” এটা কোনো কথা হলো এত সুন্দর ছেলে ভাবলাম একটু পটায় কিন্তু হলোই না ম্যারিড তারওপর আন্টি বললো আমারে..! ”
তার পাশের বান্ধবী টা বললো,
” আচ্ছা মিথ্যে বললো না তো দাঁড়া মেয়েটাকে ডাকি, এই যে আপু এদিকে আসবেন একটু..?”,
শেষ কথাটা ফারিশাকে বললে ফারিশা এগিয়ে এসে আস্তে করে বললো,
” জি বলুন..?”
” বলছিলাম একটু আগে যিনি আমাদের কফি দিলেন ওটা কী আপনার হাসবেন্ড..? ”
ফারিশা সবার তাকানো দেখে নিচু গলায় বললো,
” জি আপু কেনো কিছু হয়েছে..? ”
” উনি কী এখানেই জব করেন..?”
” না আপু, উনি নৌবাহিনীর জব করে..! “,
ফারিশা চলে যেতেই মেয়েগুলো ফের কানাঘুষা করতে শুরু করলো,
” দেখ এত বড়লোকী পোলা সামান্য ক্যাফেতে জব করা মেয়েকে বিয়ে করেছে! ”
কিচেনে গিয়ে ইরাদ ফের একটা ট্রে নিতে গেলে পাশ থেকে ফারিশার থমথমে মেজাজ দেখেই কিছু টা ভ্রু কুঁচকে ফেললো, ট্রে টা রেখে পাশ ঘুরে ইয়াশকে বললো,
” তুমি কী এবারও যাবে ভেতরে..! ”
” হুম নিয়ে চলো..!”
ইরাদ ইয়াশকে দু’হাতে তুলে কাঁধে বসিয়ে বললো,
” আমার গলা ধরে রাখো তাহলে ভয় করবে না..! ”
ইয়াশ চুপটি করে তাই করলো পাশ থেকে ফারিশার তা দেখেও চুপ রইলো। ইরাদ ট্রে নিয়ে ভেতরে গিয়ে আরেক টেবিলে যেতেই তারা ইয়াশকে দেখে বললো,
” ভাইয়া এটা কে হয় আপনার..?”
” আমার আর আমার কিউট বউয়ের একমাত্র সম্পদ আমার ছেলে এটা..!”
ইরাদ কিছুটা জোরে বলায় সবাই শুনে ফেললো তা, মেয়েগুলো আর কথা বললো না শুধু ছোট্ট করে জবাব দিলো,
” ওহ আচ্ছা..! ”
ফারিশা ভেতরে এসে ইরাদের কান্ড দেখে আর কিছু বললো না। সন্ধ্যা অব্দি কাস্টমার সামলাতে সামলাতে তাদের সময় চলে গেলো।
দুপুর পেরিয়ে রাত হতেই আয়েশা গেছে হসপিটালে কাবিশাকে দেখতে। হাতের ক্ষত বেশ খানেক তবে হসপিটালে থাকার মতো নয় তবুও তার বাবা মেয়ের জন্য স্পেশাল কেবিন নিয়ে আলাদা ট্রিটমেন্ট করাচ্ছে। কাবিশার পাশে বসতেই আয়েশা কে কাবিশা হাতটা দেখিয়ে বললো,
” দেখো দীদা দেখো! তোমার ইরাদ আমার সুন্দর স্কিনটার কি দশা করেছে। এখন এই স্কিন ঠিক করতে কত টাকা ওয়েস্ট করতে হবে আমাদের..!”
” কী যে বলি, ওই পোলার মাথা নষ্ট হয়ে গেছে বউয়ের জন্য..! ”
পাশ থেকে কাশেম খান এগিয়ে এসে বললো,
” আজ ইমদাদুলের কথা ভেবে পুলিশকে বলেনি নয়তো পুলিশে ধরিয়ে দিতাম, আমার মেয়ের সাথে এই কাজ করার ফল বুঝিয়ে দিতাম..!”
আয়েশা তার কথার তালেই বললো,
” সেটাই তো আমি আমার বড় পোলারে বললাম আজ কাশেম ভালো জন্য তোরে কিছু কয় নাই..! ”
” দীদা ইরাদকে কিন্তু আমি ছেড়ে দিবো না আর ওর বউকে তো আমি দেখে নিবো। সামান্য দেখিয়েছি তো এজন্য আমার পাওয়ার বুঝলো না, দাঁড়াও এবার কি করি দেখো শুধু তুমি..?”
আয়েশা কিছু টা স্থির হয়ে বললো,
” আমার ভালো মা রাগের মাথায় আবার বেশি কিছু করো না..! ”
কাবিশা উত্তর দিলো না শুধু এর প্রতিত্তোরে ব্যঙ্গ হেসে উঠলো।
সকাল—————
কাল থেকে ফারিশা ইরাদকে যা দিচ্ছে সব যেনো আঁচড়ে আঁচড়ে দিচ্ছে। এইতো আজ সকালে শুধু জিজ্ঞেস করলো,
” ফারিশা কখন যাবে ক্যাফেতে..?”
তার প্রতিত্তোরে ফারিশা কোমরে দুই হাত রেখে কিছুটা রাগী গলায় বলেছিলো,
” কেনো আড্ডা দিতে যাবেন আপনি..?”
তারপর থেকে ইরাদ আর একটাও প্রশ্ন করেনি বউ যে ক্ষেপে আছে বোঝায় যাচ্ছে তার আচরণে । তাই ছেলেকে নিয়ে বাগানে ঘুরতে গেছে নিচে। বেঞ্চের ওপর বসে আছে আর সামনে ইয়াশ দিয়ার সাথে খেলছে। ইরাদ বসে বসে তা দেখছে আর সাথে ল্যাপটপে কাজ করছে একটু। দিয়ার বাবা এসে দিয়াকে ডাকতেই দিয়া চলে গেলে ইয়াশ এগিয়ে এসে বাবার পাশে বসে বললো,
” এটা কী..?”
ইরাদ ল্যাপটপ দেখিয়ে বললো,
” এটা ল্যাপটপ বাবা..?”
ইয়াশ ইরাদের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো,
” ল্যাম টম..!”
ইরাদ ইয়াশের থুতনিতে হাত রেখে কিছুটা হেসে উঠলো,
” ওটা ল্যাম টম না বাবা ল্যাপটপ হবে..?”
” না ওটা ল্যাম টমই..!”
ইরাদ হেসে উঠলো আর বললো,
” আচ্ছা এটা ল্যাম টমই..!”
দুপুরবেলায় খেতে বসেছে তিনজনই আজ ইয়াশের পছন্দের ডিম রান্না হয়েছে তা দেখে তো ইয়াশ বেজায় খুশি একসাথে তিনজনই বসে খেতে খেতে ফারিশা ইয়াশকে বললো,
” অনেক তো ফাঁকি দিলেন বিকেলে একটু পড়তে বসবেন আজ..?”
” না আমাল পলতে ( পড়তে) ভালো লাগে না..!”
ইয়াশের ঠোঁট উল্টানো দেখে পাশ থেকে ইরাদ বললো,
” আচ্ছা তোমায় আমি পড়াবো অনেক সুন্দর করে আমার ল্যাম টমে ঠিক আছে পড়বে তুমি..! ”
ইয়াশ দাঁত বের করে হেসে বললো,
” সত্যি, আচ্ছা পলবো তাহলে..!”
খাওয়া শেষ করতেই ফারিশা সবকিছু রান্নাঘরে রেখে ইরাদের রুমে এগিয়ে গিয়ে বললো,
” শুনন আপনার সাথে আমার কথা ছিলো একটু..?”
ইরাদ বেডের ওপর বসতে গিয়ে ফারিশার ডাকে দ্রুত সরে এসে দরজার কাছে এগিয়ে একদম ফারিশার সামনে দাঁড় হলো আর বললো,
” হুম বলো বলো শুনছি তো..?”
ফারিশা এক কদম পিছনে সরে গিয়ে বললো,
” আমার কিছু টা……….
বাকি কথা বলার আগেই দরজায় কেউ নক করলো। ফারিশার কথায় ব্যাঘাত ঘটাতে ফারিশা আর প্রসঙ্গ টা তুললো না পিছন ঘুরে দরজার কাছে যেতে যেতে বললো,
” পরে বললো..!”
ফারিশা দরজা খুলতেই তিনজনই হুড়মুড়িয়ে ভেতরে এসে চেঁচিয়ে উঠলো,
” সারপ্রাইজ…! ”
ফারিশা কিছুটা ভয়ে চমকে উঠলো। ভেতর থেকে ইয়াশ ছুটে বেরিয়ে এলো আওয়াজ পেয়ে আর ইরাদ বাঁকা চোখে তাকিয়ে রইলো শুধু। ইভান, সাবাহ্ আর তমা তিনজনই দুপুরের খাবার খেয়ে চলে এসেছে একদম আর বাড়িতে বলেছে মামার বাড়ি যাচ্ছে। ইভান ইরাদকে দেখে এগিয়ে এসে ভাইকে জড়িয়ে ধরে বললো,
” ভাই তোমাকে কত মিস করছি উফ কী দুঃখ যে পেয়েছি , কেমন আছো তাই বলো..?”
ইরাদ ইভানকে সরিয়ে বিরক্ত গলায় বললো,
” তোদের আসতে বললো কে, বাড়িতে কী বলে এসেছিস..?”
” ভাইয়া মামার বাড়ি যাচ্ছি তাই বলেছি.! ”
সাবাহ্’র কথা শুনে ইরাদ জোরপূর্বক হেসে বললো,
” খুব ভালো করেছিস..! ”
তমা ফারিশার কাছে এগিয়ে এসে বললো,
” কেমন আছো ভাবী..!”
” জী আলহামদুলিল্লাহ তোমরা কেমন আছো? বসো তোমরা..!”
ইভান ইয়াশকে নিয়ে সোফায় বসে বললো,
” হু বসবো তো অবশ্যই আজ থাকবো আমরা ইয়াশের সাথে রাখবে না আমাদের..?”
” হুম থাকো তোমলা অনেক মজা হবে..! ওরা কে..? ”
তমা আর সাবাহ্ কে দেখালো ইয়াশ তা দেখে ইভান হাত উঁচিয়ে তমাকে দেখিয়ে শয়তানি হাসি দিয়ে বললো,
” ওইটা বিছানার সাথে চিপকে থাকা তোমার ল্যাটকা ফুপি! আর ওইটা পটকা ফুপি সারাক্ষণ পটকার মতো বোম হয়ে থাকে বুঝলে..!”
ইভানের কথা শুনে সাবাহ্ কটমটিয়ে এগিয়ে এসে এক কিল মারলো তার পিঠে তারপর পাশে বসলো ইরাদও সাথে এসে বসলে ফারিশা ইরাদকে চোখের ঈশারায় ডেকে কিচেনের দিকে চলে গেলে ইরাদও উঠে সেদিকে যায়।
” কিছু বলবে..?”
” জি ওরা থাকবে বোধহয় রাতের জন্য একদম স্বল্প কিছু রয়েছে আর ঘরে তেমন কিছু নেই বাজারে গিয়ে ওদের জন্য কিছু কিনে নিয়ে আসুন..!”
ফারিশার কথা শুনে ইরাদ পিটপিট করে তাকিয়ে সামনে হাত বাড়িয়ে বললো,
” আমার টাকাগুলো দাও তাহলে..! ”
ফারিশা রুমে গিয়ে নিজের থেকে দুইশো টাকা এনে ভেতরে এসে ইরাদের সামনে টাকা টা ধরে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বললো,
” জীবনেও না যেহেতু আপনি তুবার জায়গায় আছেন, তো তুবার কেউ আসলে আমরা এভাবেই খরচ করি তাই আমার থেকে দুইশো টাকা দিলাম বাকি টাকা আপনার এখন কীভাবে ম্যানেজ করবেন সেটা আপনার বিষয়..!”,
বলেই ইরাদের হাতে টাকা গুজে বেরিয়ে গেলো ইরাদ সেখানেই স্থির হয়ে দাঁড়ালো সে এখন কী করবে? ও বাড়িতে থাকতে সে যতবার বাজারে গিয়েছে কখনো তিন-চার হাজারের ওপর বাজার ছাড়া সে কিছু কিনে নাই আর এই সামান্য টাকায় সে কি কিনবে। তারও ভাই-বোন সব কেমন যে আসার আর জায়গা পেলো না। রাগে মনে মনে বকা দিতে দিতে বেরিয়ে গেলো। ইভান ভাইকে তার রুমের দিকে যেতে দেখলে বললো,
” ভাইয়া আসো গল্প করি..!”
ইরাদ পেছন ঘুরে কটমটিয়ে বললো,
” তুই কর বেয়াদব..! “,
বলেই নিজের রুমে চলে গেলো। রেডি হয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলে ইয়াশ দৌড়ে এসে ইরাদের শার্ট টেনে ধরে বললো,
” মিলাদ কোতায় যাও আমায় নিয়ে যাও..?”
ইরাদ ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
” বাবা আমি এখুনি চলে আসবো তুমি ওদের সাথে খেলো..! ”
” তোমার মিলাদের পটি পেয়েছে উফ ইয়াং ইয়াশ যেও না এসো এসো..?”
ইভানের কথা শুনে ইরাদ কটমটিয়ে তাকালেই ইভান মুখে আঙ্গুল দিয়ে চুপ হয়ে গেলো। ইয়াশ হাসতে হাসতে ওদিকে চলে গেলো চুপচাপ তা দেখে ইরাদ দরজা খুলে বাইরে যেতেই ফারিশা দরজা আটকাতে আটকাতে বললো,
” শুনুন ভুলেও চিটিং করবেন না আর সাথে মুড়ি আর চানাচুরও নিয়ে আসবেন..! “,
বলেই দরজা আটকে দিলো ইরাদ দরজার দিকে তাকিয়ে লম্বা হাসি টেনে দ্রুত চলে গেলো।
তমা, সাবাহ্ আর ইভান ইরাদের রুমে বসে সেই আড্ডা দিচ্ছে আর ফারিশা এদিকে তাদের সাথে হালকা কথা বলেই কিচেনের ফ্লোরে বসে রসুন, পেঁয়াজ কাটছে। প্রায় এক ঘন্টা বাদেই ইরাদ আসলো কিচেনে এসে বাজার ফারিশার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,
” ধরো রান্না করো আর জলদি ওই পেটুক দের বিদায় করো..?”
ফারিশা মাথা উঁচু করে ইরাদকে দেখলো একদম ঘেমে যেনো একাকার হয়ে গেছে, তাকে দেখে মনে হবে যেনো যুদ্ধ করে এসেছে । ফারিশা ইরাদের হাত থেকে ব্যাগ নিতেই ইরাদ বেরিয়ে গেলো। ব্যাগ টা নিচে রেখে খুলতেই দেখতে পেলো একটা সোনালি মুরগি, সাথে ছয় টা ডিম, মুড়ির প্যাকেট আর চানাচুর। ফারিশা কয়েক সেকেন্ড স্থির থেকে মুখ চেপে হেসে উঠলো।
এক নজর ইরাদের রুমে দিকে তাকিয়ে তারপর স্থির হয়ে ফারিশা হিসাব করতেই আন্দাজ করে বুঝলো সে হাতে গুণে মোট তিনশো নব্বই বা চারশো টাকার মতো খরচ করেছে । বিকেলের দিকে তাদের মুড়ি আর চানাচুর মাখিয়ে দিয়েছিলো তারপর রাতে মুরগি রান্না করে সবাই মিলে একসাথে খেয়েছে। ইভান, তমা আর সাবাহ্ বেশ মিশুক প্রকৃতির মানুষ তা ফারিশা এতটুকু সময়ে ঠিক বুঝলো। ইয়াশ তো তাদের কে পেয়ে যেনো ভীষণ খুশি সাথে তার পড়াশোনাও গায়েব। সে এখন খেলায় ব্যস্ত এই কখনো বল খেলছে তো আবার এই ইভানের চুল টেনে যা নয় তাই করছে সাথে ইভানও কম নয় সেও ইয়াশকে জ্বালাছে গাল টিপে টিপে। রাতে খাওয়া শেষ হতেই ফারিশা তমা আর সাবাহ্ কে নিজের রুমে ঘুমাতে বলেছে ইয়াশ তাদের সাথেই শুইয়ে শুইয়ে ফোন দেখছে । বেড ছোট হওয়ায় বাকি দু’জন থাকা মুশকিল আর একজন হবে শুধু সেই ভেবে ফারিশা কিছুটা এগিয়ে এসে ইরাদের রুমের সামনে দাঁড় হলো। ইভান আর ইরাদ গল্প করতে করতে ইভান ফারিশাকে দেখেই বললো,
” আরে ভাবী ভেতরে আসেন..! ”
ফারিশা সেখান থেকেই কিছুটা বিনয়ী গলায় বললো,
” না সমস্যা নেই আপনারা গল্প করুন। আমি শুধু বলতে এসেছিলাম আজ একটু ইয়াশকে আপনাদের সাথে নিবেন..! ”
” অবশ্যই ভাবী দিয়ে যান এখুনি.?”
ইভানের কথা শুনে ফারিশা ইরাদের দিকে তাকিয়ে বললো,
” ও আমার কাছে ছাড়া ঘুমোই না তাই আমি ওকে ঘুম পাড়িয়ে তারপর দিয়ে যাচ্ছি..? ”
ইরাদ মৃদু হেসে বললো,
” আচ্ছা..! ”
ফারিশা ইয়াশকে ঘুম পাড়িয়ে তাদের কাছে দিয়ে তারপর সে তমাদের সাথে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। ইরাদ ছেলেকে মাঝে শুইয়ে কপালে আলতো করে চুমু এঁকে দিলো তা দেখে ইভান হালকা হেসে বললো,
” বাড়ি নিয়ে যাচ্ছো কবে ভাইয়া..?”
” দীদা না আসলে আর যাওয়া হচ্ছে না..?”
ইভান পাশেই সটান হয়ে শুইয়ে বললো,
” বাড়িতে রোজ রোজ অশান্তি আর ভালো লাগছে না,
দীদার মন এমন কেন কে জানে তা.!”
” তোরা আমায় না বলে এসেছিস কেন..?”
ইরাদের কথায় ইভান বাঁকা হয়ে শুইয়ে চোখ দুটো ছোট ছোট করে বললো,
” কেনো..? ”
ইরাদ ছেলের পাশেই শুইয়ে ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললো,
” তোরা আমার টাকার দফারফা করে দিয়েছিস আমি বাকি ষোলো দিন কীভাবে চলবো..!”
” মানে! ষোলো দিন মানে বুঝলাম না..?”
ইভান ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকলে ইরাদ চোখ বন্ধ করে বললো,
” আর বুঝে লাভ নেই সব তোর পেটে চলে গেছে রাক্ষস..! ”
ইভান বাঁকা চোখে তাকিয়ে বললো,
” উফ ভাইয়া রাক্ষস বললে কেনো অগ্রিম প্রফেসর বলে ডাকো..!”
ইভানের কথায় ইরাদ হেসে উঠলো।
মাঝ রাত ঘড়িতে তখন বাজ ৩টা,
” আমার জুতা নিয়ে গেলো আম্মু আ আ আ…!”
কারোর কান্নার আওয়াজে ইরাদ আর ইভানের ঘুম ভেঙে গেলো। ইরাদ আর ইভান পাশে তাকাতেই দেখলো ইয়াশ বসে বসে কাঁদছে তা দেখে তারাও উঠে বসলো। মাঝরাতে এভাবে কাঁদতে দেখে ইরাদ ভাবলো হয়তো খারাপ স্বপ্ন দেখেছে তাই ইরাদ ইয়াশকে নিজের কোলের কাছে টেনে পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বললো,
” কী হয়েছে খারাপ স্বপ্ন দেখেছো। এইতে বাবা এখানেই আছে ভয় পেও না..!”
পাশ থেকে ইভান ঝুঁকে এসে বললো,
” এই তো ইয়াশ কী হয়েছে? কে ভয় দেখালো তোমাকে আমায় বলো তাকে পেরে দিবো আমি.?”
ইয়াশ থামার বদলে উল্টো আরও জোরে কেঁদে উঠে বললো,
” দিয়া আমাল জুতা নিয়ে গেচে এনে দাও আমাকে আ আ আ..?”
ইভান পাশ থেকে ঘুমো ঘুমো চোখে ফোন অন করে দেখে রাত ৩ টা বাজে তা দেখে ইরাদকে বললো,
” ভাই তুমি যাও ওর জুতো টা খুঁজে দাও নয়তো কান্না থামবে বলে তো মনে হয় না আমি ঘুমায়..!”,
বলেই শুইয়ে পড়লে ইরাদ পাশ থেকে ইভানের শার্ট টেনে তাকে একটানে তুলে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
” উঠ বেয়াদব তুইও খুঁজবি, আচ্ছিস কেন আমার বাড়িতে..! “,
ইভান ঠোঁট উল্টে বেড থেকে নামতে নামতে বললো,
” আচ্ছা চলো তাহলে তাড়াতাড়ি জুতো টা খুঁজি ভাইয়া তাহলে ঘুমাতে পারবো..! ”
ইরাদ ইয়াশকে কোলে নিয়ে বসার রুমে গিয়ে তাকে সোফায় বসাতেই সে দু’হাত দিয়ে চোখ ডলতে ডলতে বললো,
” আমার জুতা এনে দাও দিয়া নিয়ে গেচে..?”
” দেখো ভাই এখানেই কোথাও জুতো আছে হয়তো স্বপ্ন
দেখেছে ও..! “,
তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২০
ইভানের কথা শুনে দু’জনেই আশেপাশে তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগলো কিন্তু তার নরমাল একজোড়া স্যান্ডেল বাদে আর কোনো জুতা খুঁজে পেলো না। তুবও দু’জনে খুঁজেই চলেছে এদিকে ইয়াশের কান্না থামার নাম-গন্ধ নেই। ইভান ইয়াশের পাশে ধপ করে বসে কিছুটা হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
” বাপ তোর বউ তোর জুতো চুরি করেছে দিয়ে যাবে কান্দিস না তোর বাবা এনে দিবে..?”
