Home তোমাতেই বসন্ত তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১১

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১১

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১১
জেরিন আক্তার

সৌরভ যখন বলল লন্ডনে যাওয়ার টিকিট কেটে এসেছে তখনই প্রাণেশা বাচ্চাদের মতো করে কেঁদে উঠল। সৌরভ প্রাণেশার কাছে এসে ওর মন বুঝতে বলল,
“কাঁদছিস কেনো? তোর তো কাঁদার কথা না। আমি চলে গেলে তু্ই তো খুশিই হবি। তোকে আর বিয়ে নিয়ে কিচ্ছু বলবো না। যাকে ভালো লাগে তাকেই বিয়ে করবি।”
প্রাণেশা রাগে, দুঃখে, কান্নায় একসাথে হয়ে সৌরভকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে রুমের বাহিরে নিয়ে যেতে যেতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে উঠল,

“এখনই লন্ডন চলে যাও। এসেছো কেনো? নিজেই তো বললে খান বাড়িতে কেউ তোমার আপন না, তাহলে আমিও বলবো তুমিও আমার আপন না।”
ওদের সাথে আরশাদ খান আর রোকেয়া বেগম বাহিরে এলেন। প্রাণেশা দরজার সামনে থেকে সবাইকে সরিয়ে দিয়ে, রুমটা ভিতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো। আরশাদ খান দরজা ধাক্কিয়ে বললেন,
“প্রাণেশা রাগ করে না মা। খোলো দরজা। তোমার ভাইয়া এমনেই বলেছিলো। বুঝতেই তো পারো তোমার ভাইয়ার সবচেয়ে কাছের মানুষ তুমি।”
প্রাণেশা দরজা একটু খুলে বলল,
“আমি কারো আপন না। আর তোমার ছেলেকে চলে যেতে বলো।”
এই বলে প্রাণেশা আবারও দরজা লাগিয়ে দিলো।
আরশাদ খান ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বোন না হয় তোমার জন্য অপেক্ষা করে খায়নি। তুমিও কি সারাদিনে খাওনি?”
সৌরভের ছোট উত্তর,

“ইচ্ছে করেনি।”
সৌরভ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আরশাদ খানকে বলল,
“বাবা তুমি রুমে যাও। আমি ওকে খাবার খাওয়াচ্ছি।”
আরশাদ খান লম্বা একটা শ্বাস ছেড়ে রুমে চলে গেলেন। সৌরভ রোকেয়া বেগমকেও চলে যেতে বলল। সে চলে যেতেই সৌরভ নিচে বসে দরজায় হেলান দিলো। আর প্রাণেশাকে ডাকলো,
“এই দরজা কি খুলবি?”
“পারবো না। চলে যাও।”
সৌরভ বলল,
“সারাদিন কিচ্ছুটি খাইনি, আয় একসাথে খাবার খাবো। খিদে পেয়েছে।”
“তুমি একা খাও। আমি খাবো না। খিদে নেই।”
সৌরভ মিনিট পাঁচেক চুপ হয়ে রইলো। এরপরে মলিন হেসে বলল,
“জানিস প্রাণেশা আজ না মায়ের কবরের পাশে অনেকক্ষণ বসে থেকে এসেছি।”

এই শুনে প্রাণেশা আস্তে করে দরজা খুলে দিয়ে নিঃশব্দে সৌরভের পাশে বসলো। সৌরভ শ্বাস ছেড়ে বলল,
“দেখ প্যান্টে কত ময়লা, সত্যিই মায়ের কাছেই গিয়েছিলাম। এখন এই ময়লা প্যান্ট মায়ের মতো যত্ন করে ধুয়ে দিবে কে? যদি মা থাকতো, খেলাধুলা করে প্যান্টে ময়লা নিয়ে আসলে, নিশ্চই কত যত্ন করে ধুয়ে দিতো। কিন্তু সেই বয়সে মাকে হারিয়ে খেলাধুলাই বাদ দিয়ে দিলাম…….. ধুর! আমিও না কিসব বলছি, এখন তো বড় হয়েছি।”
প্রাণেশা সৌরভকে পেছন থেকে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠল। আবার চোখ মুছে সৌরভকে ধরে উঠিয়ে রুমে এনে বিছানায় বসালো। সোফায় থেকে খাবারের প্লেটটা এনে ভাত খাইয়ে দিলো সৌরভকে। এর মাঝে দুজনের কোনো কথা হলো না। এরপরে সেই প্লেটে নিজেও খেয়ে নিলো। সৌরভ চলে গেলো রুমে। প্রাণেশা শুয়ে পড়লো। মাঝে মাঝে ভাবে, ও নিজের মাকে একদিন সামনে থেকে দেখেওনি। জন্মের সাথে সাথে মারা গিয়েছে। তার সাথে কোনো স্মৃতিও নেই। আর সৌরভ, সৌরভের তো মায়ের সাথে কত স্মৃতি। সে তো মাকে প্রতিটা সময় মিস করে। মা তো মা-ইই, মায়ের জায়গা কেউ নিতে পারেনা।

পরেরদিন ভার্সিটি শেষে প্রাণেশা স্নিগ্ধর সাথে বের হলো। স্নিগ্ধই মূলত ওকে সাথে নিয়ে গেট পর্যন্ত এসেছে। প্রাণেশা স্নিগ্ধকে বলল বাড়িতে নামিয়ে দিতে। স্নিগ্ধ তো খুশি। প্রাণেশা গাড়িতে উঠল, সাথে স্নিগ্ধও।
প্রাণেশা অনেক ভেবেচিন্তে একটা বুদ্ধি বের করলো। আজ কোনো একটা বাহানা দিয়ে স্নিগ্ধর ওয়ালেটটা নিয়ে সেখানে রাখা নিজের ছবিটাই দেখবে। একদিন দেখেছিলো স্নিগ্ধর থেকে লুকিয়ে। কিন্তু আজ প্রকাশ্যে দেখেই ছাড়বে। যেই ভাবা সেই কাজ, অত্যন্ত নরম ও কোমল স্বরে বলল,
“আপনার কাছে একটা আবদার করতে পারি?”
“হুমম।”
প্রাণেশা বাচ্চাদের মতো ফেস বানিয়ে বলল,
“কিছু টাকা দিবেন আইসক্রিম খাবো।”
স্নিগ্ধ অবাক হলো, এই মেয়ের কাছে টাকা নেই? নাও থাকতে পারে হয়তো ভুলে আনেনি। স্নিগ্ধ ওয়ালেট বের করে যেই টাকায় হাত দিবে ঠিক তখনই প্রাণেশা ওয়ালেটটা ছো মেরে নিয়ে নিজের ছবিটা দেখিয়ে হেসে বলল,

“এটা কার ছবি হুম?”
স্নিগ্ধ মুচকি হেসে বলল,
“আমার খুনির।”
প্রাণেশা হেসে হেসে বলল,
“তার মানে আমাকে অনেক আগে থেকে ভালোবাসেন?”
“হতে পারে।”
“তাও কতদিন?”
“৪ বছর ৩মাস।”
প্রাণেশা অবাক হয়ে স্নিগ্ধর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাও বলেননি কেনো?”
“ঠিক করেছিলাম আমাদের বাড়িতে এলে নিজেই বুঝতে পারবে।”
প্রাণেশা অনেক খুশি। তাকেও কেউ গোপনে এতদিন ভালোবেসে গিয়েছে অথচ বলেইনি। মনে মনে ভাবছে কতটা লাকি ও।
এর কিছুক্ষন পরে প্রাণেশার কিছু একটা মনে পড়তেই স্নিগ্ধর চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলল,
“প্রতিদিন এতো সেজেগুঁজে আসেন কেনো?”
স্নিগ্ধ অবাক চোখে তাকিয়ে বলল,

“মানে?”
“কি মানে মানে করছেন? কি মনে করেছেন আমি দেখি না কেনো এতো পরিপাটি হয়ে আসেন। অন্য মেয়েরা তাকিয়ে থাকে এর জন্যই তো এতো হ্যান্ডসাম লুক নিয়ে আসেন।”
স্নিগ্ধ হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইলো। প্রাণেশাও যে এতো জেলাস এখন বুঝলো। স্নিগ্ধ মুচকি মুচকি হাসছিলো। যা দেখে প্রাণেশা কপালে ভাজ ফেলে বলল,
“হাসার কি বলেছি?”
স্নিগ্ধ মাথা নাড়িয়ে বলল,
“নাহ কিচ্ছু বলোনি। বকছো তো আমায় তবুও হাসি পাচ্ছে গো।”
প্রাণেশা চোখ ছোট ছোট করে বলল,
“হাসি পাক আর কান্না পাক এরপরে যদি কোনো মেয়ের মুখ থেকে শুনি স্যারকে সুন্দর লাগছে তাহলে আপনার খবর আছে।”
স্নিগ্ধ বাচ্চাদের মতো মাথা দুদিক নাড়িয়ে বলল,
“ঠিক আছে শুনবে না এর আগেই তোমায় বিয়ে করে নিবো ইনশাআল্লাহ। এই কয়েকদিনে আর ভার্সিটি আসতে হবে না। তেমন প্রয়োজন নেই।”

“ঠিক আছে।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে নামিয়ে দিয়ে চলে এলো বাড়িতে। ড্রইং রুমে ঢুকেই দেখলো একটা গোল মিটিং বসেছে। সিয়াম দুষ্টুমি করে বলল,
“এসো ভাইয়া আজকে তোমার নামে বিচার আছে।”
স্নিগ্ধ এগিয়ে এসে বলল,
“আমি আবার কি করলাম?”
সিয়াম বলল,
“তাড়াতাড়ি বিয়ে করছো না কেনো?”
স্নিগ্ধ ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,
“আমাকে না বলে আমার গার্লফ্রেন্ডের ভাইকে বল যে, বোনকে বিয়ে দিচ্ছেন না কেনো?”
সবাই হো হো করে হেসে উঠল। স্নিগ্ধ উপরে এলো।
বিকেলের দিকে আরশাদ খান কল দিলেন সাঈদ রেজা চৌধুরীকে। ভালো মন্দ কথা হলো। এর আগেও দুজনের মাঝে কথা হয়েছে।
আরশাদ খান বললেন,

“ভাই আমি আবারও বলছি আপনারা সবাই আমার মেয়েকে চাইছেন, এটা কি শুধু ছেলের খুশির জন্য নাকি, আপনারাও মন থেকে চাইছেন?”
সাঈদ রেজা চৌধুরী বললেন,
“আমরা প্রাণেশাকে আমাদের বাড়ির মেয়ে করে আনতে চাই, বউ না। যেদিন আপনার মেয়ে এই বাড়িতে এসেছিলো সেদিন থেকেই আমরা ওকে পছন্দ করি। পরবর্তীতে স্নিগ্ধ বলল দুজন-দুজনাকে ভালোবাসে। এরপর আরও খুশি হয়েছি। বলতে গেলে আমার ওয়াইফ যখন শুনলো প্রাণেশার বিয়ে অন্য কোথাও ঠিক হয়ে যাচ্ছে তখনই সে সেন্সলেস হয়ে গিয়েছে। এরপরে আপনি ঐদিন স্নিগ্ধকে না ডাকলে আমিই আপনার সাথে কথা বলতে যেতাম। এখন বাবা-মা হয়ে তো আর দুজনের ভালোবাসা মারতে পারিনা। আর একটা কথা আমার ছেলে অনেক আগে থেকেই ভালোবাসে আপনার মেয়েকে। আমরাও জানতাম। এরপরে যখন আমাদের বাড়িতে এলো তখনই প্রাণেশার সাথে কথা হয়, তারপর থেকে এই পর্যন্ত ওরা এসেছে। এখন আপনি আমাদের সাথে যেদিন বসে কথা বলবেন আমরা তখনই বিয়ে ঠিক করে রাখবো।”
আরশাদ খান মাথা নাড়িয়ে বলল,

“তাহলে কালকেই আসুন আপনারা। এর মধ্যে আমার ছেলে আবার এমার্জেন্সি লন্ডনে যাবে।”
“কেনো? কোনো কাজে নাকি?”
“হুমম।”
আরশাদ খান নিজেও জানেন না সৌরভ কেনো লন্ডনে চলে যাবে।

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১০

এদিকে সৌরভের সাথে ঝামেলা হয়েছে হামিমের। হামিম তো ক্ষেপে গিয়েছে যে ওকে বিয়ের কথা বলে এখন অন্যকারো সাথে বিয়ের আলোচনা হচ্ছে বলে। সৌরভ বুঝিয়ে বলেছে তবুও হামিম এই বিষয় নিয়ে নিজে থেকেই ঝামেলা করতে চাচ্ছে। এরপরে সৌরভ অতিষ্ট হয়ে সেখানে থেকে রাগারাগি করে বাড়িতে ফিরেছে।
রাতে স্নিগ্ধ প্রাণেশার সাথে কথা বলার সময় জানতে পারলো সৌরভ নাকি লন্ডনে চলে যাবে। স্নিগ্ধ প্রাণেশার কাছে সৌরভের নাম্বার চাইলো। প্রাণেশা নাম্বার পাঠিয়ে দিলো। এরপরে স্নিগ্ধ নিজে থেকেই কল দিলো সৌরভকে।

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here