Home তোমাতেই বসন্ত তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২৩

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২৩

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২৩
জেরিন আক্তার

প্রাণেশা সুবহাকে বলল ও শপিং মলে স্নিগ্ধর মতোই একজনকে দেখেছে। পারফিউমের স্মেলও যে মিলেছে এটাও বলল। সুবহাও কতক্ষন ভেবে জানালো অন্য কেউও তো হতে পারে। কিন্তু প্রাণেশা বলল,
“তোর ভাইকে চিনতে তাই আমার এতটা ভুল হবে? কিন্তু উনি তো বাড়িতে তাহলে ওটা কে ছিলো?”
সুবহা হেসে বলল,
“তু্ই দেখি এতো চিন্তা করতে করতে পাগল হবি। বাদ দে, চল একটু ছাদে যাবো।”
প্রাণেশা সুবহাকে নিয়ে ছাদে চলে গেলো।
সন্ধ্যার সময় প্রাণেশা ড্রইং রুমে বসে ছিলো। মুখটা ভার। একদিকে শপিং মলের সেই ঘটনা নিয়ে দোটানায় পড়ে আছে। আবার আরেকদিকে তার ভাই তার সাথে কথা বলেনি।
আরশাদ খান অফিস থেকে ফিরে এসে ফ্রেশ হয়ে নিচে এলেন। প্রাণেশার মুখোমুখি বসলেন। সৌরভও এলো। ও এসে আরশাদ খানের থেকে পাশাপাশি বসলো। আর সুবহা ডাইনিং টেবিলে বসে রোকেয়া বেগমের সাথে টুকটাক কথা বলছে।

আরশাদ খান মেয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে কিছু একটা ভাবছেন। মেয়ের মুখাকৃতি দেখে কিছু আচও করতে পারছেন।
প্রাণেশা থেকে থেকে সৌরভের দিকে তাকাচ্ছিলো। সৌরভও আড়চোখে দেখছিলো। তবে প্রাণেশার চোখমুখ থেকে বোঝাই যাচ্ছে এখনই সৌরভকে ধরে কেঁদে দিবে। সারাদিন কোনো কথা বলেনি।
সৌরভ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বসে আছে। প্রাণেশার মনটা আরও খারাপ হয়ে গেলো। ও কুশন দিয়ে মুখ ছাপিয়ে বসে রইলো।
আরশাদ খান নীরবতা ভেঙে সৌরভকে বলে উঠলেন,
“অফিসে যাবে কবে থেকে?”
সৌরভ সোজা গলায় বলল,
“যাবো না।”
আরশাদ খান উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন,

“তোমার জন্য অনেকগুলো কাজ আটকে আছে। তোমাকে যেতে হবে।”
সৌরভ মনে মনে বলল—ভালো লাগে না অফিস। টাকা পয়সা তো আছেই। এখন শুধু বসে বসে খাবো, তা না। কাজ আর কাজ।
মিনিট দুই পরে সৌরভ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“বেশ কালকে থেকে যাবো।”
প্রাণেশা তখনই রাগে-দুঃখে আরশাদ খানকে বলে উঠল,
“বাবা কালকে ওই বাড়িতে চলে যাবো। তোমার জামাইকে আসতে বলবো সকালে।”
আরশাদ খান কপাল কুঁচকে নিয়ে বললেন,
“মানে? কালকেই চলে যাবে কেনো? না আরও কয়েকদিন থাকো।”
সৌরভ প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে আরশাদ খানকে বলল,
“ও যেতে চাইছে, তুমি না করছো কেনো?”

প্রাণেশা কান্না আটকাতে চেয়েও পারছে না। তাই উঠে দাঁড়িয়ে কুশনটা সৌরভের দিকে ছুড়ে মেরে বলল,
“তোমার বাড়িতে তুমিই থাকো। আসবো না আর।”
প্রাণেশা সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে এসে আবারও নিচে নামলো। সৌরভের কাছে এসে ওকে মারতে শুরু করলো। সৌরভ হতোভম্ব। প্রাণেশা মারতে মারতে বলল,
“সারাদিন গেলো একটা কথা বললে না। আমি জেদ ধরে থাকবো বলে তুমিও থাকবে?”
সৌরভ প্রাণেশাকে ধরে পাশে বসালো। প্রাণেশা ভাইকে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“তুমি বড় খারাপ একজন মানুষ। খুব খারাপ।”
সৌরভ প্রাণেশার কানে ফিসফিস করে বলল,
“তোর বিছানার পাশে সাইড টেবিলে একটা জিনিস রেখেছি।”
প্রাণেশা মাথা তুলে তাকিয়ে কান্নামাথা মুখশ্রীতে হাসি ফুটিয়ে আবারও সৌরভকে মারতে শুরু করলো।

রাত ১০ টা,
সুবহা রুমে এসে সোফায় বসে আছে। সৌরভ রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিয়ে বিছানায় এসে বসলো। সুবহা ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। আবার যখন সৌরভের চোখে-চোখ পড়ছিলো তখনই সুবহা অন্যদিকে তাকাচ্ছিলো।
এভাবে কিছুক্ষন যাওয়ার পরে সৌরভ সুবহাকে আঙুল ইশারা করে কাছে আসতে বলল। সুবহা শুকনো ঢোক গিলে এগিয়ে এসে দাড়ালো। সৌরভ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“ওভাবে কি দেখো আমার দিকে তাকিয়ে? আবার আমি তাকালে অন্যদিকে কেনো তাকাও? কি বোঝাতে চাও আমি সুন্দর না?”
সুবহা মিনমিন করে বলল,
“আসলে কথা টা তা না। ওই আসলে আপনার দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে। আবার চোখ সরিয়ে নেই যদি কিছু বলেন তাই। তাছাড়া আপনি সুন্দর।”
সৌরভ শ্বাস ছেড়ে বলল,
“যাও ভিতরে গিয়ে শুয়ে পড়ো।”
“কেনো এখানে ঘুমাতে দিবেন না? বিশ্বাস করেন আপনাকে টাচও করবো না। ওই আপনার রুমের সাথে এটাচ করা বেড রুমটায় একা ঘুমাতে ভয় লাগে।”
“না তুমি ওখানেই যাও। দরকার হলে লাইট জ্বালিয়ে দরজা খোলা রেখে ঘুমাও।”
সুবহা চলে গেলো সৌরভের রুমের সাথে এটাচ করা রুমে। সেটাও আরেকটা ছোট্ট বেডরুম। সেখানে সৌরভ খুব একটা থাকে না।

রাত ১ টারও উর্ধে।
প্রাণেশার ঘুমটা ভেঙে গেলো। আবছা আবছা চোখ মেলে তাকিয়ে আবারও চোখ বন্ধ করলো। কিন্তু ঘুম আর ধরলো না। পরিবেশটা কেমন গুমোট বেধে আছে। ও ফোন হাতে নিয়ে দেখলো ১ টা ১৪ মিনিট বাজে। সাথে সাথে ফোনটা রেখে শ্বাস ছেড়ে কাত হয়ে শুতেই কারো শক্তপোক্ত বুকে গিয়ে ঠেকলো।
প্রাণেশা চিৎকার দিয়ে উঠল। স্নিগ্ধ সাথে সাথে ল্যাম্প লাইট জ্বালিয়ে উঠে বসে ধমক দিয়ে বলল,
“চুপ করো। চিল্লাচ্ছ কেনো? আমি আমি, স্নিগ্ধ। আমাকে চিনতে পারোনি?”
স্নিগ্ধ ওকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো। প্রাণেশা ঢকঢক করে সবটুকু পানি খেয়ে নিলো। এরপরে বলল,
“আপনি এতো রাতে এখানে কিভাবে এলেন?”
স্নিগ্ধ ওর পাশে শুয়ে বলল,
“ভাগ্য করে একটা শশুর পেয়েছি। সেই হেল্প করেছে।”
প্রাণেশা বলল,

“তাই এতো রাতে আসবেন! সন্ধ্যায় আসতেন। এতো রাতে যদি কোনো বিপদ হতো?”
“এটা এখন আমার বোনের শশুরবাড়ি। তার উপরে কালকেই ওদের বিয়ে হয়েছে। যতই আমার শশুরবাড়ি হোক না কেনো তবুও এখানে আসতে কেমন একটা ইতস্তত লাগে।”
প্রাণেশা স্নিগ্ধকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“সব ঠিক হবে ইনশাআল্লাহ। আর আপনি কি গাড়ি নিয়ে এসেছেন?”
“না বাইক নিয়ে এসেছি আমি আর সিয়াম।”
“তাহলে সিয়াম কোথায়?”
“আছে হয়তো আশেপাশে কোথাও।”
প্রাণেশা নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে স্নিগ্ধর বুকে কিলঘুষি মারতে মারতে বলল,
“এতো রাতে আসার কি দরকার ছিলো?”
স্নিগ্ধ প্রাণেশার হাত দুটো ধরে শুইয়ে নিজে তার উপরে শুয়ে বলল,
“অনেক দরকার। তোমার জন্য একটুও ভালো লাগছিলো না। তোমাকে দেখার জন্য মনটা ছটফট করছিলো। তাই চলে এসেছি।”

ভোরেই স্নিগ্ধ চলে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো বাঁধিয়ে দিয়েছে। যেহেতু লুকিয়ে এসেছে, লুকিয়েই যেতে হবে। চাইলে থাকতে পারতো কিন্তু ওর যা ইচ্ছা। প্রাণেশা ওকে ধরে বলল,
“এখনই চলে যাবেন? সকালটা হোক।”
স্নিগ্ধ তড়িৎ কণ্ঠে বলল,
“না জান, আবার দিনে আসবো। এখন আসি।”
প্রাণেশা মুখটা ভার করলো। স্নিগ্ধ প্রাণেশার কপালে চুমু দিয়ে বলল,
“আই লাভ ইউ জান। মন খারাপ করো না।”
স্নিগ্ধ চলে গেলো। গেটের বাহিরেই দাঁড়িয়ে ছিলো সিয়াম। স্নিগ্ধ উঠে বসতেই সিয়াম বাইক স্টার্ট দিয়ে চলে গেলো।

সকাল সকাল স্নিগ্ধকে বাড়িতে ঢুকতে দেখে সাঈদ রেজা চৌধুরী বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। স্নিগ্ধ তাড়াহুড়ো করে উপরে চলে গেলো। এরপরে সিয়াম এলো। সাঈদ রেজা চৌধুরী বললেন,
“তোমরা কোথায় গিয়েছিলে এতো সকালে?”
সিয়াম হেসে বলল,
“বাইক রাইডে গিয়েছিলাম।”
সাঈদ রেজা চৌধুরী কপাল কুঁচকে নিয়ে বসে রইলেন। স্নিগ্ধ শাওয়ার নিয়ে একবারে ভার্সিটি যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে নিচে এলো। সাঈদ রেজা চৌধুরী ব্রেকফাস্ট করতে বসেছেন। তার দুই পাশে স্নিগ্ধ আর সিয়াম বসলো।
স্নিগ্ধ নিজের মতো খাচ্ছে তাড়াহুড়ো করে। সাঈদ রেজা চৌধুরী কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বললেন,
“রাতে কোথায় ছিলে?”
স্নিগ্ধ কিছু বলার আগেই সিয়াম বলল,
“চাচ্চু বললাম না আমরা বাইক রাইডে গিয়েছিলাম।”
সাঈদ রেজা চৌধুরী স্নিগ্ধর দিকেই তাকিয়ে আছেন। এরপরে বললেন,
“তোমার ঘাড়ে কি হয়েছে? লাল হয়ে আছে কেনো? মারামারি করেছো বাইক রাইডে গিয়ে?”
স্নিগ্ধ সাঈদ রেজা চৌধুরীর কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বললেন,
“নাহ এসব কিছুই না। এগুলো তোমার বউমার ভালোবাসা। রাতে সেখানেই গিয়েছিলাম। বউ ছাড়া কি জীবন চলে, বলো।”
সাঈদ রেজা চৌধুরী বিষম খেয়ে উঠলেন। সিয়াম পানি এগিয়ে দিয়ে ফিচেল হাসলো।

প্রাণেশা আজও বিকেলে সেই শপিং মলে গেলো। স্নিগ্ধকে আজও বলেনি। কালকের সেই ছেলেটাকে খুঁজতেই সেখানে যাওয়া। তবে তাকে পাবে কিনা তা অজানা। তবুও মনকে তো শান্তনা দিতে পারবে।
প্রাণেশা আজকে গাড়ি নিয়ে আসেনি। সকাল থেকেই থেকে থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। শপিং মলের বাহিরে রাস্তার সাথে একটা খোলা মাঠ ছিলো। প্রাণেশা সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আর আশেপাশে তাকাচ্ছে। এমন সময় কালকের সেই ছেলেটি গাড়ি নিয়ে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। মুখে আজকেও মাস্ক। গাড়িটা মুহূর্তেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো।
প্রাণেশা তৎক্ষণাৎ কল দিলো স্নিগ্ধকে। প্রতিবারের মতো এবারও স্নিগ্ধর রিসিভ করতে দেরি হলো না। ওপাশ থেকে হেসে বলল,
“কি করছো জান?”
প্রাণেশা অস্থির কণ্ঠে বলল,
“কোথায় আপনি? কি করছেন?”
স্নিগ্ধ স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“কোথায় আবার থাকবো ভার্সিটিতে। কেনো? আজকেও কি আমার সাথে অন্য কাউকে দেখেছো?”
প্রাণেশা নিচু গলায় বলল,

“না। কাউকেই দেখিনি। কিন্তু ওই যে আপনার মতো ওই লোকটাকে দেখেছি। তাহলে আপনি? আবার, সে কে? আপনার কি যমজ ভাই আছে? না না ওইটা আপনিই। মিথ্যে বলছেন আমাকে। আপনি আমার সাথে মজা করছেন। বুঝেছি। আমি ঐদিন আপনার কাভার্ডে একটা কাগজ দেখেছি, আপনার পছন্দের পেশা লেকচারার হওয়া না। আর সুবহা বলেছে আপনি লেকচারার হয়ে জব করছেন শুধু আমার জন্য। প্লিজ সামনে আসুন।”
স্নিগ্ধ খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। প্রাণেশা গাল ফুলিয়ে বলল,

“হাসছেন কেনো কেনো? কি এমন বলেছি?”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“তোমার সাথে পরে কথা বলছি ক্লাস আছে।”
“না, আপনি আমায় এড়িয়ে যাচ্ছেন। আমি জানি ওইটা আপনি। আপনি যদি এখন না বলেন তাহলে আমি এখানেই বৃষ্টিতে ভিজবো। এক পাও নড়বো না।”

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২২

প্রাণেশা ঠাস করে কল কেটে দিলো। এরপরে স্নিগ্ধ কল দিলো কয়েকবার কিন্তু প্রাণেশা ধরলো না। ফোন সুইচ অফ করে এগিয়ে গিয়ে মাঠের কোণে একটা ব্রেঞ্চে বসলো। বৃষ্টিতেও ভিজে যাচ্ছে।
১০ মিনিট পার হওয়ার পরে কেউ একজন প্রাণেশার মাথার উপরে ছাতা ধরলো। প্রাণেশা মাথা তুলে স্নিগ্ধকে দেখে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো। এরপরে হাফ ছেড়ে তৎক্ষণাৎ কাদা ছুড়ে দিলো স্নিগ্ধর শরীরে।

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here