তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২১
জেরিন আক্তার
প্রাণেশা সৌরভের চলে যাওয়ার কথা শুনতে পেয়েই ওকে কল দিলো। সৌরভ তৎক্ষণাৎ ফোন সুইচ অফ করে নিলো। প্রাণেশা কাঁদতে কাঁদতে রোকেয়া বেগমকে বলল,
“ভাইয়া তাই চলে গেলো এভাবে? আমাকে বলল না কেনো?”
রোকেয়া বেগম বললেন,
“স্নিগ্ধ আর তোমার বাবা গিয়েছে তো দেখো ওরা ওকে যেতে দিবে না।”
এদিকে সৌরভ সাব্বিরকে বলল,
“তু্ই এখন এয়ারপোর্ট যাবি না। এয়ারপোর্টের আশেপাশে কোনো রেস্টুরেন্ট বা কোনো একটা জায়গায় চল। ওরা এখন এয়ারপোর্টের সামনেই দাঁড়াবে। এখন ওদের সামনে যাওয়া যাবে না। আমার হাতে এক ঘন্টা আছে। সমস্যা হবে না।”
সাব্বির বলল,
“ঠিক আছে তাই যাচ্ছি। তু্ই রিলাক্সে থাক।”
আরশাদ খান যেতে যেতে কল দিলেন সাঈদ রেজা চৌধুরীকে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন,
“ভাই আপনারা তো সৌরভের সাথে সুবহার বিয়ে দিবেন এটা তো সজ্ঞানে স্বীকার করেছেন?”
“হুমম। আমি আমার মেয়ের কষ্ট দেখতে পারবো না। দরকার হলে ওরা বিয়ে করে সময় নিক আমার সমস্যা নেই।”
আরশাদ খান বললেন,
“তাহলে আজই বিয়ে পড়াই?”
সাঈদ রেজা চৌধুরী নিরেট কণ্ঠে বললেন,
“আজই?”
আরশাদ খান শ্বাস ছেড়ে বললেন,
“নাহলে যে আমার ছেলে চলে যাচ্ছে লন্ডন?”
স্নিগ্ধ আরশাদ খানের থেকে ফোনটা নিয়ে ওর বাবাকে বলল,
“বাবা তুমি শুধু কাজী ডেকে সুবহাকে রেডি করো। আমরা আসছি।”
সাঈদ রেজা চৌধুরী ছেলের কথায় ভরসা রেখে বললেন,
“ঠিক আছে। তোমরা এসো।”
প্রাণেশা স্নিগ্ধকে কল দিলো। স্নিগ্ধ কল ধরলো। এখন অতটাও চিন্তিত নয় বললেই চলে। স্নিগ্ধ নরম কণ্ঠে বলল,
“চিন্তা করো না প্রাণ। তোমার ভাইকে যেতে দেইনি।”
প্রাণেশা নাক টেনে বলল,
“ভাইয়া কোথায়? ভাইয়াকে নিয়ে বাড়ি চলে আসুন। ভালো লাগছে না।”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“তোমার ভাইয়াকে পাঠিয়ে দিবো একটু পরে। চিন্তা করো না।”
প্রাণেশা কপাল কুঁচকে নিয়ে বলল,
“ভাইয়াকে পাঠিয়ে দিবেন মানে? আপনি আসবেন না?”
“না।”
“কেনো?”
স্নিগ্ধ হেসে হেসে বলল,
“কখনও কি দেখেছো ভাই তার বোনের বিয়ের দিন তার সাথে শশুরবাড়ি যায়? তোমার ভাইকে সোজা আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসে বিয়ে পড়িয়ে দিয়েছি। এখন দেখি ও কেমন করে কোথায় যায়।”
প্রাণেশা খুশি হয়ে বলল,
“স্বপ্ন দেখছি না তো!”
“না। সত্যি। এখন সবাই খাওয়া-দাওয়া করছে। খাওয়া হলেই সুবহাকে নিয়ে চলে যাবে।”
সৌরভ গাড়িতে চুপচাপ বসে আছে বললে ভুল হবে। রাগে শুধু ফুসছে। সুবহা ওই এক কোণে বসে আছে। আরশাদ খান সামনের সিটে।
তার মধ্যে সৌরভের মাথা প্রচন্ড ব্যাথা করছে। সিটে গা এলিয়ে দিয়ে বসলো।
আরশাদ খান পেছনে ফিরে বললেন,
“খারাপ লাগছে?”
সৌরভ উত্তর দেয়না। সুবহা সৌরভের দিকে তাকিয়ে আছে। ভেবেছিলো সৌরভের সাথে হয়তো ওর এই জীবনে মিল হবে না। কিন্তু আল্লাহ ওদের একসাথে করে দিয়েছে।
গাড়িটা বাড়ির সামনে এসে থামতেই সৌরভ আগেই নেমে বাড়িতে ঢুকলো। সদর দরজার সামনেই ছিলো প্রাণেশা আর রোকেয়া বেগম। ও সোজা ভিতরে ঢুকে গেলো কোনো কথাও বলল না। এরপরে সিঁড়ির কাছে গিয়ে প্রাণেশাকে বলল,
“ওই ডাক্তার আংকেলকে কল দিয়ে আসতে বলতো।”
প্রাণেশা প্রশ্ন করলো,
“শরীরে খারাপ লাগছে নাকি?”
সৌরভ উত্তর না দিয়ে হন হন করে চলে গেলো। আর যাই হোক এতো চিন্তা করে নিজের শরীরের ক্ষতি ও করতে চায়না। ছোটবেলা থেকে একটু কিছু হলেই আপসেট হয়ে পড়ে গিয়েছে। বড় হয়েও এই অভ্যাস যায়নি। ওর কাছে কোনো কাজের আগে নিজের শরীরের যত্নই আগে।
সদর দরজার সামনে এলো আরশাদ খান আর সুবহা। আরশাদ খান প্রাণেশা আর রোকেয়া বেগমকে বললেন,
“তোমরা বাড়ির বউকে বরণ করে ঘরে তুলো।”
প্রাণেশা খুশি হয়ে সুবহাকে ধরলো। আর আরশাদ খানকে বলল,
“বাবা তুমি একটু ডাক্তার আংকেলকে কল দাও ভাইয়া দিতে বলেছে।”
ডক্টর এসেছে। সৌরভ নিজের রুমে বসেছিলো। ডক্টর সৌরভকে চেকাপ করে বললেন,
“সৌরভ তোমার রেস্টের প্রয়োজন। এতো চিন্তা করার কারণে তোমার মাথা ব্যাথা বেড়ে গিয়েছে। আগেও একটা আঘাত পেয়েছিলে। রেস্ট নাও, ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।”
সৌরভ হালকা মাথা নাড়িয়ে বলল,
“হুমম।”
আরশাদ খান ডক্টরের সাথে কথা বলতে বের হলেন রুম থেকে। রোকেয়া বেগম সৌরভকে বললেন,
“কিছু বানিয়ে আনি খাবে?”
সৌরভ নিরেট কণ্ঠে বলল,
“না ভালো লাগছে না। খাবো না।”
আরশাদ খান রুমে ঢুকে বললেন,
“ওই বাড়িতেও তো খাওনি কিছু। এখন কিছু খাও ভালো লাগবে।”
সৌরভ তপ্ত শ্বাস ছাড়লো। ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বলল,
“ভাবতে হবে না আমাকে নিয়ে। যদি এতই ভাবতে তাহলে এমন করতে না আমার সাথে।”
সৌরভ ঠাস করে দরজা লাগালো। আরশাদ খান প্রাণেশা আর রোকেয়া বেগমকে বললেন,
“তোমরা এখন শুয়ে পড়ো। অনেক রাত হয়েছে। আর সুবহা কোথায়?”
প্রাণেশা বলল,
“আমার রুমে।”
আরশাদ খান বললেন,
“ওকে নিয়ে এসো। এখানেই থাকবে এখন থেকে।”
“ঠিক আছে বাবা।”
প্রাণেশা শুয়ে পড়লো। কিন্তু স্নিগ্ধকে পাশে না পেয়ে ঘুম আসছে না। অভ্যাস হয়ে গিয়েছে কি না।
এদিকে স্নিগ্ধ রুমে এসে শুয়ে প্রাণেশাকে মেসেজ দিলো,
—ঘুমিয়ে পড়েছো নাকি?
প্রাণেশা ওর মেসেজ পেয়ে সাথে সাথে কল দিলো। স্নিগ্ধ কল রিসিভ করে অবাক কণ্ঠে বলল,
“ঘুমাওনি এখনও?”
“আপনাকে ছাড়া ঘুম আসছে না।”
“তাহলে এসে পড়ো।”
“নিয়ে যান।”
“কয়েকদিন থাকো ওইখানে আমি নিয়ে আসবো।”
“এর আগে আসবেন না?”
“না।”
প্রাণেশা মনটা খারাপ করে রইলো। কথা বলল না। স্নিগ্ধ শুধানো গলায় বলল,
“আরে মন খারাপ করো না। তুমি ঐখানে ৩-৪ দিন থাকো। এখন এই বিয়ে নিয়ে তোমার ভাইয়ের মেজাজ ভালো থাকবে না। ও তোমার কথা ছাড়া কারো কথা তেমন শোনে না। তাই বলছি ঐখানেই থাকো।”
“ঠিক আছে।”
স্নিগ্ধ শয়তানি করে বলল,
“জান এই কয়েকদিনই তো। এরপরে হানিমুনে যাবো।”
প্রাণেশা লাজুক হেসে চুপ করে রইলো।
সকাল সকাল প্রাণেশা ড্রইং রুমে এলো। পরনে গোলাপি রঙের টু-পিস। আর গলায় চেরি কাপড়ের গোলাপি ওড়না। রোকেয়া বেগম তো আজকাল এই মেয়েকে এতো সকালে উঠতে দেখে অবাকই হন।
প্রাণেশা কিচেনে গিয়ে কফি বানালো।
এর পরপরই সৌরভ ড্রইং রুমে এসে বসলো। সুবহা এসে কিচেনে ঢুকলো। প্রাণেশা কফির মগটা সুবহার হাতে দিয়ে বলল সৌরভকে দেওয়ার জন্য। সুবহা অনীহা জানিয়ে বলল,
“প্রাণেশা উনার রাগ কেমন, আমি নিয়ে যেতে পারবো না। তু্ই নিয়ে যা।”
প্রাণেশা ওকে জোর করে কিচেন থেকে বের করে ফিসফিস করে বলল,
“তোকেই নিয়ে যেতে হবে যা।”
সুবহা কফি নিয়ে সৌরভের সামনে এসে দাড়ালো। হাতে থাকা কফির মগটা কাপা হাতে এগিয়ে দিলো। সৌরভ তা হাতে নিলো। যা দেখে সুবহা হাফ ছেড়ে চলে এলো কিচেনে।
স্নিগ্ধর ঘুম ভাঙতেই কল দিলো প্রাণেশাকে। প্রাণেশা কল রিসিভ করে কথা বলতে বলতে বাড়ির বাহিরের দিকে হাঁটা দিলো। বাগানে এসে ঘাসের উপরে বসে কথা বলতে শুরু করলো।
স্নিগ্ধ ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল,
“কি করছো?”
“বাগানে এসে বসে আছি।”
“আপনি আজকে ভার্সিটিতে যাবেন না?”
“না। কেনো তুমি ভার্সিটিতে আসবে নাকি?”
“না।”
এরপরেই প্রাণেশা কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
“আচ্ছা আপনি আদৌ ভার্সিটি টিচার তো? নাকি অন্য কাজও করেন?”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“হুমম। এছাড়া আমি তো রিক্সা চালাই।”
প্রাণেশা রেগে গিয়ে বলল,
“আপনার সোজাভাবে কথা বলতে কি হয়? শুধু আপনার সাথে দেখা হোক, ধুমধাম মার খাবেন।”
স্নিগ্ধ হেসে বলল
“রাগ করেছো জান?”
“না। রাগ নেই আমার।”
স্নিগ্ধ ওর মুখে হাসি ফোটাতে হেসে হেসে বলল,
“জান… আই লাভ ইউ। আই মিস ইউ। এতো রাগ করলে হবে? হবে না তো। তুমি রাগ করলে তোমার বাচ্চা-কাচ্চা কি শিখবে? তখন তো বাচ্চা-কাচ্চা আমাকে ঠিকই বলবে মাম্মা পচা।”
প্রাণেশা লাজুক হেসে বলল,
“তা না হয় বলবেন। এখন উঠে ফ্রেশ হন।”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“বউ ছাড়া কিচ্ছু ভালো লাগে না।”
প্রাণেশা আদেশ করে বলল,
“ফ্রেশ হয়ে কল দিবেন নাহলে আমি বাড়ি যাবো না।”
এই বলে কল কেটে দিয়ে স্নিগ্ধর কথাগুলো ভাবছিলো। মুহূর্তে লজ্জায় ঘাসের মধ্যেই বাচ্চাদের উঁবু হয়ে শুয়ে পড়লো। ওইদিক দিয়ে যাচ্ছিলো সৌরভ। ওকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে তড়িৎ পায়ে এগিয়ে এসে ওকে ধরে বলল,
“এই এই কি হয়েছে রে? প্রাণেশা?”
প্রাণেশা মাথা তুলে হেসে বলল,
“কিচ্ছু হয়নি এমনি।”
সৌরভ কয়েসেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে থেকে ওর মাথায় গাট্টা মেরে বলল,
“বিয়ে হয়েছে এখনও বাচ্চামো যায়নি।”
প্রাণেশা মাথায় হাত রেখে বলল,
“তুমিও তো আমাকে মারা বন্ধ করোনি।”
এই কথা শুনে সৌরভ উঠে দাড়ালো। প্রাণেশা উঠে দাঁড়িয়ে ভাইয়ের কাছে এসে শয়তানি করে আস্তে আস্তে বলল,
তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২০
“তো তোমাদের মাঝে কি মিল হয়েছে?”
সৌরভ দাঁত চেপে আশেপাশে তাকালো। পাশ থেকে একটা চিকন লাঠি হাতে নিতেই প্রাণেশা ঢোক গিলে দৌড় দিলো বাড়ির দিকে।
