তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৫৮
নওরিন মুনতাহা হিয়া
আজ শনিবার ।ঘড়ির কাঁটায় রাত ৯:০০ বাজে। বাংলাদেশে তালুকদার বাড়ির ড্রয়িং রুমের খাবার টেবিলে বসে আছে সকল সদস্যরা। বাড়ির মহিলা সদস্যর মধ্যে শালির্ন বেগম আর নীলিমা বেগম রান্নাঘর থেকে খাবার নিয়ে এসে টেবিলে সাজিয়ে রাখছে। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বড় বড় পা ফেলে নিচে নেমে আসে সৃষ্টি‚তার পড়নে সাদা ফ্রক‚গলায় ঝুলন্ত নীল রঙের উড়না আর হাতে কালো ফিতার ঘড়ি। ড্রয়িং রুমে পেরিয়ে সৃষ্টি এসে পৌঁছায় খাবার টেবিলে! রুহুল আমিন আর জুনাইদ চেয়ারে বসে খাবার খাওয়ার প্রস্তুতি নেয়! সৃষ্টি গিয়ে পাশের চেয়ার টেনে বসে। কিন্তু জামান তালুকদারকে কোথাও না দেখতে পেয়ে‚ প্রশ্ন করে উঠে
“আব্বু‚ এখনও খাবার খেতে আসেনি?”
শার্লিন বেগম বাকি রান্না করা খাবার টেবিলে রেখে সৃষ্টি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বলে উঠে
“তোমার আব্বু ঘুম থেকে উঠেছে। ফ্রেশ হয়ে হয়ত এখুনি খাবার খেতে আসবে।”
সৃষ্টি সম্মতি দিয়ে বলে উঠে
“ওহ্ আচ্ছা।”
তাদের দুইজনের কথা বলার মাঝে শরীর ঝাঁকিয়ে গম্ভীর মুখশ্রী নিয়ে উপস্থিত হয় জামান সাহেব। শার্লিন বেগম প্লেটে খাবার বেড়ে দেয়! সকলে খাওয়া শুরু করে দেয়! হঠাৎ খাওয়ার মাঝে জামান সাহেবের ফোনে তার পিএর কল আসে। পকেট থেকে ফোন বের করে তিনি রিসিভ করে বলে
“হুম রবিন বলো?”
ফোন অপর পাশ থেকে জামান সাহেবের পারসোর্নাল পিএ রবিন বলে উঠে
“স্যার‚ আমেরিকার ভিসা রেডি হয়ে গেছে।”
শান্ত কণ্ঠে জামান সাহেব উত্তর দেয়
“ভিসা রেডি করে অফিসে নিয়ে আসো।”
“ওকে স্যার।”
কথা বলা শেষ করে পাশের টেবিলে ফোন রেখে। হাতের কবজি অবধি পাঞ্জাবি উঠিয়ে প্লেটে থাকা ভাত তরকারি দিয়ে মেখে মুখে তুলার আগে। মাথা উঁচু করে তাকায় জামান সাহেব। ডাইনিং টেবিলে বসা প্রতৈকে বিস্ময় সূচক মুখশ্রী নিয়ে তীর্যক চোখে তার দিক তাকিয়ে আছে। মুখ গম্ভীর করে চোখ দিয়ে সবার দিকে ইশারা করে প্রশ্ন করে উঠে
“কি হয়েছে তোমাদের? সবাই খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে এমন স্থির হয়ে! আমার দিকে কেন তাকিয়ে আছো?”
মুলত‚ ফোনে আমেরিকা যাওয়ার ভিসার কথা শুনে সবার মুখশ্রী এমন বিস্ময় সূচক রূপ ধারণ করেছে! ড্রাইনিং টেবিলে উপস্থিত সকলে একে অপরের মুখের দিকে তাকায়! জামান সাহেব হঠাৎ আমেরিকায় কেন যাবে? আদ্রিয়ানের সাথে দেখা করতে? না‚ অন্য কোন কারণে? সবার মনের মধ্যে এমন প্রশ্ন ঘুরাঘুরি করছে কিন্তু কেউ সাহস করে জামান সাহেবকে প্রশ্ন করছে না! তবে উপস্থিত সবার মধ্যে শার্লিন বেগমের মুখ শান্ত ‚ ওনি নিভার্ক ভঙ্গিতে তার স্বামীর পাশের চেয়ারে দাঁড়িয়ে আছে। মনের সমস্ত ভয় দূর করে কিছুটা সাহস নিয়ে রুহুম আমিন প্রশ্ন করে উঠে
“ভাইজান‚ আপনি ফোনে আমেরিকার ভিসা রেডি করার কথা কেন বললেন? হঠাৎ আপনি আমেরিকায় কেন যাবেন? ব্যবসার কোন প্রয়োজনে?”
প্লেটে থাকা ভাত মুখে দিয়ে বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে চিবিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে জামান সাহেব জবাব দিলেন
“হ্যাঁ। খুব শ্রঘীই আমি আমেরিকায় যাব।”
বেশ শান্ত আর কোমল কণ্ঠে দুই বাক্য উত্তর দিল জামান সাহেব। কিন্তু তবুও ডাইনিং টেবিলে থাকা কারও হৃদয় এই উত্তর শুনে তৃপ্ত হল না। হঠাৎ আমেরিকা যাওয়ার কারণ সবার কাছে ধোয়াঁশা থেকে গেল! ভাইয়ের মন _ মানসিকতা এখন একটু ভালো দেখে‚ রুহুল আমিন সাহস নিয়ে দ্বিতীয় প্রশ্ন করে উঠে
“কিন্তু ভাইজান? হঠাৎ আমেরিকায় কেন যাবেন? কি কারণে?”
ডাইনিং টেবিলে উপস্থিত সবার চোখের দিকে তাকায় জামান সাহেব। এরপর পুনরায় প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বলে উঠে
“মিরাজ আর তার পরিবার দীর্ঘদিন আমেরিকায় থাকে। জমি সংক্রান্ত কারণে তার সাথে আমার ঝগড়া _ কাথা কাটাকাটি হয়েছিল। এরপর বেশ কয়েক বছর দুই পরিবারের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ ছিল। তাছাড়া কারানের বিয়ের দাওয়াতে আমন্ত্রণ করেছিল আমাদের‚ কিন্তু তখন যাওয়া হয়নি। তাই এখন আমরা সপরিবারে আমেরিকায় যাব। রবিনকে বলে সবার ভিসার ব্যবস্থা করেছি।”
এই প্রশ্নের উত্তর যথেষ্ট সন্তুষ্ট জনক ছিল সবার কাছে। রুহুল আমিন আর কোন প্রশ্ন করল না। আপন মনে খাবার খাওয়া শুরু করে দেয়। কিন্তু হঠাৎ পাশে বসা জুনাইদ উচ্ছ্বাসিত কণ্ঠে বলে উঠে
“আমরা সবাই আমেরিকা যাব। আদ্র ভাইয়ার সাথে দেখা করব। জেষ্ঠু তুমি কি আদ্র ভাইকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে? আর সাথে মেঘ আপুকে ও?”
বাচ্চাসুলভ কণ্ঠে বলা জুনাইদের প্রশ্ন শুনে জামান সাহেব মৃদু হাসে। এরপর এক বিস্ফোরণ সত্য প্রকাশ করে উত্তর দেয়
“না জুনাইদ‚ আর্দ্র আর মেঘ কেউও বাংলাদেশে আসবে না। বরং তাদের ডিভোর্স করাতে আমরা সবাই আমেরিকায় যাব।”
হঠাৎ জামান সাহেবের এমন চরম সত্য শুনে ‚ ড্রাইনিং রুমের সবার চক্ষু চরগাছ। শার্লিন বেগম তার স্বামীর মনের অগ্রীম চিন্তা _ ধারা জানে তাই ওনি বেশ শান্ত থাকেন! কিন্তু সৃষ্টির মন জুড়ে ভয়ের শংকা বাড়তে থাকে। হঠাৎ বাবা‚ আদ্রিয়ান আর মেঘের ডিভোর্স কেন করাতে চাই? তবে কি বাবা সব সত্য জেনে গেছে? এখন কি হবে? রুহুল আমিন বলে
“ভাইজান‚ হঠাৎ আমেরিকায় গিয়ে মেঘ আর আদ্রিয়ানের ডিভোর্স করানর প্রয়োজন কি? বিয়ের পর থেকে ওরা দুইজন আলাদা থাকে! এখন আমেরিকায় নিজ কেরিয়ার নিজে ব্যস্ত তারা। শুধু ডিভোর্স নামক ঝামেলা না করলে কি হয় না? পরে না হয় —–
রুহুল আমিনের কথা শেষ হওয়ার আগেই জামান সাহেব এক অবিশ্বাস্য সত্য বললেন। ড্রাইনিং টেবিলে উপস্থিত সকলে যেন থমকে যায়! কারণ‚ ছোট বাক্য জামান সাহেব বলেন
“আদ্রিয়ান‚ আর মেঘ ওরা দুইজন আমেরিকায় একসাথে সংসার করছে। একই বাসায় স্বামী স্ত্রীর মতো থাকছে! তাই আমি আমেরিকায় গিয়ে ওদের ডিভোর্স করাতে চাই।”
আশ্চর্য বোধক চাহনি আর অবিশ্বাস্য নয়নে ড্রাইনিং টেবিলে উপস্থিত সকলে হতভম্ব হয়ে যায়। জামান সাহেবের কথার মানে তার ঠিক বুঝল না! এইটা কি আদৌও সম্ভব? আমেরিকায় মেঘ আর আদ্রিয়ান একসাথে সংসার করছে মানে? যে আদ্রিয়ান‚ মেঘকে নিজ স্ত্রী হিসাবে অস্বীকার করে নয় বছর পরিবার থেকে দূরে বিদেশে থেকেছে। সে আজ মেঘের সাথে সংসার করছে? তাছাড়া যদি ওরা দুইজন একসাথে সংসার করে ‚ তবে ওদের ডিভোর্স করানর কি প্রয়োজন। রুহুল আমিন জিজ্ঞেস করে
“কিন্তু ভাইজান! ”
বিরক্তি মাখা মুখ নিয়ে জামান সাহেব মাথা উঁচু করে আদের্শ দিয়ে বলে উঠে
“রুহল কথা বলা বন্ধ করে। খাবার খাওয়া শুরু কর। আমি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছি তা অবশ্যই সঠিক।”
ব্যাস‚ গম্ভীর কণ্ঠে বলা জামার সাহেবের এই কথা শুনে। আর কোন প্রশ্ন করার সাহস হয় না কার। রুহুল আমিন আর নীলিমা বেগম একবার পাশে থাকা শার্লিন বেগমের দিকে তাকায়। শার্লিন বেগম চোখ দিয়ে ইশারা করে‚ পরে সব ঘটনা খুলে বলবে! চুপচাপ সবাই খাওয়া দাওয়া শুরু করে দেয়। কিন্তু সৃষ্টির মনে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। বাবা যদি সত্যি আর্দ্র ভাই আর মেঘের ডিভোর্স করিয়ে দেয় তখন কি হবে? জামান সাহেব এক কথার মানুষ। ওনি ভীষণ জেদি আর ঘাড়ত্যাড়া টাইপের লোক। যদি একবার সিদ্ধান্ত নেয়‚ যে ডিভোর্স করাবে। তবে অবশ্যই করিয়ে ছাড়বে? না‚ না‚ সে নিজের ভাইয়ের সংসার নষ্ট হতে দিবে না । ফোন করে আদ্রিয়ানকে জানাতে হবে। অনতুবা সবর্নাশ হয়ে যাবে!
[ আগামীকালের ঘটনা ]
কাল বিকালে আদ্রিয়ান ঘুম থেকে উঠে বেশ দেরি করে। ড্রয়িং রুমে এসে জিয়া আর মেঘের সাথে কিছুক্ষণ আড্ডা দেয়। জিয়া রান্না বা ঘরের কাজে অকর্ম হলেও ডক্টর হিসাবে কিন্তু সে যথেষ্ট বিচক্ষণ আর ট্যালেন্টড। আদ্রিয়ান অবধি তা স্বীকার করে! আর মেঘ মেডিক্যালে ডক্টরি নিয়ে পড়াশোনা করছে তাই তাদের আড্ডা বেশ জমে যায়। তিনজনে মিলে বিখ্যাত ডক্টর ‚ সার্জারি‚ থ্রিসিস নিয়ে আলোচনা করে। এরপর সন্ধ্যা হয়ে গেলে‚ জিয়া বাসা থেকে বিদায় নেয়!
সদর দরজা বন্ধ করে মেঘ‚ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গটগট করে হেঁটে নিজের রুমে চলে যায়। পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা আদ্রিয়ানের পানে ফিরে অবধি তাকায় না। আদ্রিয়ান বুঝে ‚ তার বউয়ের বেশ অভিমান হয়েছে আজ তার উপর। তাই পিছু পিছু হেঁটে সে মেঘের রুমে যায়। ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে বসে আছে মেঘ! কারণ সে জানত আদ্রিয়ান আসবে। বেশ দীর্ঘক্ষণ ‚ জোরে জোরে শব্দ করে দরজা ধাক্কা দেয় আদ্রিয়ান। কিন্তু অপর পাশ থেকে কোন সাড়া শব্দ আসে না মেঘের! এক পযার্য়ে হতাশ হয়ে মেঘের রুমের দরজার কাছ থেকে হতাশ হয়ে ফিরে যায় সে! তার বউয়ের অভিমান বড্ড বেশি আজ।
রাত প্রায় তখন সাড়ে নয়টা। পড়ার টেবিলে বইয়ের উপর মুখ গুঁজে বসে আছে মেঘ। সারাদিনের কাজকর্মে শরীর ভীষণ ক্লান্ত তার চোখে ঘুম ভাব চলে এসেছে। কিন্তু ঘুমান যাবে না! কাল ক্লাস রয়েছে পড়াশোনা শেষ করতে হবে। তবে যতই মনোযোগ সহকারে পড়ার চেষ্টা করছে কিন্তু পাড়ছে না। মাথা টিপটপ করে ব্যাথা করছে‚ মন_ শরীর জুড়ে এক অদ্ভুত অস্বস্তি বয়ে যাচ্ছে। ভীষণ বিরক্ত লাগছে তার। এখন একটু শান্তির নিঃশ্বাস নিতে চাই সে। তাই ছাদে দিয়ে একা কিছুক্ষণ সময় কাটানর ইচ্ছা করল তার।
রুমে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল আদ্রিয়ান। কিন্তু হঠাৎ মেঘের কথা মনে পড়তেই ল্যাপটপ বন্ধ করে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। বড় বড় পা ফেলে রুম থেকে বের হয়ে যায়। তার বউটার অভিমান ভাঙ্গাতে হবে। প্রায় পাঁচ মিনিট পর মেঘের রুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তবে রুমের দরজা খুলা দেখে স্বস্তি পায়। বউয়ের রাগ কমেছে তবে একটু! এই ভেবে হাসি _ মুখে রুমের ভিতরে ঢুকে আদ্রিয়ান। কিন্তু রুমের আনচে কানাচে কোথাও মেঘকে না দেখতে পেয়ে ভ্রু কুঁচকায়! ওয়াশরুমের দরজা ভিড়ান মানে ওয়াশরুমেও যায়নি। তবে এতো রাতে কোথায় গেল মেঘ? “ছাদে?”
খোলা আকাশের নিচে একা চুপচাপ বিষন্ন মন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেঘ। তার খোলা চুল মৃদু দক্ষিণা বাতাসে ধোল খাচ্ছে। উদাসীন মনে অপলক দৃষ্টিতে আকাশ পানে চেয়ে থাকে বেশ কিছুক্ষণ! বাংলাদেশে থাকতে প্রায়ই মন খারাপ বা কষ্টের অনুভূতি সমূহ সে এই উন্মুক্ত আকাশের সাথে ভাগ করে নিত। কিন্তু আমেরিকায় আসার পর এখনও ছাদে এসে এমন করে খোলা আকাশ দেখা হয়নি। নিজ মনের সাথে নিজের কখনও একা সময় কাটান হয়নি! কিন্তু আজ অদ্ভুত ভাবে এমন শখ জাগল তার মনে।
সিঁড়ির খুপরি দরজা দিয়ে ছাদে প্রবেশ করে আদ্রিয়ান। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা চাদরে মোড়ান এলোকেশী চুলের মেঘকে দেখে থমকে যায় আদ্রিয়ান। তার পা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে! মনের মধ্যে এক সুখকর অনুভূতির আভাস হয়। আদ্রিয়ান বেশ দীর্ঘক্ষণ ধরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নারী রূপে তার স্ত্রীকে পর্যবেক্ষণ করছিল।ক্ষাণিক সময় অতিবাহিত হওয়ার পর পা বাড়িয়ে এগিয়ে যায়‚ পিছন থেকে হাতের গীব্রে আবেশে জড়িয়ে নেয়। বেশ শক্ত করে ধরে যেন শত চেষ্টা পর মেঘ তার থেকে দূরে সরে না যায়।
হঠাৎ জড়িয়ে ধরায় মেঘ অবাক হয় না। তার মন আকাশের মধ্যে বিলীন থাকলেও আদ্রিয়ানের আসার আগমন বার্তা সে শুনতে পেয়েছে। ভালোবাসার মানুষ নিকটে থাকলে মনের মধ্যে যে নিদারুণ সুখ অনুভূতি হয় তার আবাশ সে পেয়েছে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হয় রাগ‚ অভিমান‚ ঘৃণা দেখিয়ে মেঘ দূরে সরে যায় না। বরং স্বামীর উষ্ণ ছোঁয়া পেয়ে গা এলিয়ে দিয়ে বুকে মাথা রাখে। এরপর চোখ বন্ধ করে সুখের নীড়ে হারিয়ে যায়। বুকে লেপ্টে থাকা মেঘের শরীর মিশে যায় আদ্রিয়ানের সাথে। তার বুকের ডান পাশের হার্টবিট যেন প্রতিনিয়ত দিগুণ হারে বেড়ে চলছে। এই মেঘের মধ্যে এক অদ্ভুত জাদু রয়েছে। যখনই সে কাছে আসে নিজের আপন সত্তার খেয় হারিয়ে ফেলে আদ্রিয়ান। মন জুড়ে শুধু একটা ইচ্ছাই হয় যেন মেঘের মাঝে বিলীন হয়ে যেতে।
দীর্ঘদিন যাবত দুইটি দেহ এক উষ্ণ আলিঙ্গনে লিপ্ত হওয়ার হয়। কাঁধে মাথা রেখে এখনও একই ভাবে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রয়েছে মেঘ। আদ্রিয়ান হয়ত বুঝল মেঘের বিষন্ন মনের অবস্থা। তাই কাঁধ থেকে মাথা সরিয়ে উঁচু হয়ে দুই গাল আলতো করে ধরে‚ আবেগময় কণ্ঠে প্রশ্ন করে উঠে
“মেঘ‚ তোমার আমার প্রতি অনেক অভিযোগ তাই না? গত নয় বছর শত কষ্ট‚ অপমান‚ অভিযোগ সয্য করছে তুমি। যার মূল কারণ আমি। কিন্তু বিশ্বাস কর তোমায় কষ্ট দিতে চাইনি আমি। আর কখনও বেঁচে থাকতে দিবও না। তুমি শুধু একবার আমায় ক্ষমা করে দেখ‚ সত্যি তোমায় অনেক ভালোবাসব। একটা সুন্দর সাজান সংসার দিব‚ সুখ দিব তুমি যা চাও সব দিব। শুধু একবার শেষ সুযোগ দাও মেঘ?”
সব কথায় মনোযোগ সহকারে শুনে মেঘ। কিন্তু সে নিশ্চুপ থাকে শান্ত কিন্তু দৃঢ়! আদ্রিয়ানের দুই _চোখ বরাবর দৃষ্টি রেখে মৃদু কষ্টের সহিত বলে উঠে
“আদ্রিয়ান‚আপনি না বললেও আমি শেষ সুযোগ অনেক আগেই দিয়ে দিয়েছি। এর কারণ কি জানেন? কারণ‚ আমি নিঃস্ব। যার কোন ঠাঁই নাই তার অহংকার বা অভিমান মানায় না। মা_বাবা এতিম মেয়ে আমি‚ এই পৃথিবীতে আপন বলতে আমার কেউ নাই। তাই আপনি যদি শত ঘৃণা‚ অপমান ‚ আর মারপিট করেন। তবুও বেহায়ার মতো আপনার কাছেই পরে থাকব। কারণ আমার যাওয়ার কোন জায়গায় নেই। একা থাকা আমার জন্য কষ্টকর তবে অসম্ভব নয়! কিন্তু আমি এই একাকিত্বকে বড্ড ভয় পায় আদ্রিয়ান। দয়া করে আমায় একা ছেড়ে চলে যাবেন না? আপনার প্রতি আমার কোন অভিযোগ নাই তবে অভিমান রয়েছে। নয় বছরের দূরত্ব এতো সহজে মিটে না‚ সম্পর্কের মধ্যে থাকা ফাটল পূরণ হতে সময় লাগবে। তবে আমি চাই সব পুনরায় ঠিক হয়ে যাক। প্লিজ আদ্রিয়ান‚ আমায় সাহায্য করুন সব ঠিক করতে!
এক টান দিয়ে বুকে নিয়ে আসে আদ্রিয়ান মেঘকে। এরপর শক্ত করে নিজ শরীরের সাথে মিশিয়ে মাথার চুলের ভাঁজে হাত বুলিয়ে সম্মতি সূচক মাথা নাড়িয়ে বলে
“অবশ্যই চেষ্টা করব। আমরা দুইজন মিলে পুনরায় আবার আমাদের সম্পর্ক ঠিক করব! সারাজীবন তোমায় আগলে রাখব‚ ভালোবাসব। কথা দিলাম বউ।”
কাল রাত এমন করেই পার হয়ে যায় তাদের।
[ বর্তমান ]
রাস্তায় গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে নূহা বেশ দীর্ঘক্ষণ ধরে। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে আজ কোন গাড়ি নাই! নূহা চিন্তিত ভঙ্গিতে ঘড়ির দিকে তাকায়। ঘড়িতে তখন সময় সকাল ১০:২০। ১০:৪০ এর দিকে ক্লাস শুরু হয়। প্রথম ক্লাস আজ আদ্রিয়ান স্যারের খুব গুরুত্বপূর্ণ এক চ্যাপ্টার পড়াবে। নূহা যদি সময় মতো ক্লাসে উপস্থিত হতে না পারে তবে হয়ত এই অধ্যায়ের পড়া তার মিস যাবে। রাস্তায় উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখছে গাড়ি আসছে কি না? কিন্তু না কোন গাড়ি নেই!
প্রায় দশ মিনিট পর এক বাইক এসে দাঁড়ায় নূহার সামনে। হঠাৎ তার সম্মুখে বাইক দেখে দূরে সরে যায় নূহা! হয়ত কোন বখাটে ‚ বেয়াদব কোর ছেলে হবে। কিন্তু তার ধারণা সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়ে বাইকের হেলমেট খুলার পর। পরিচিত এক মুখশ্রী দেখে নূহা অবাক করা কণ্ঠে বলে উঠে
“তিহান? আপনি?”
মাঝ রাস্তায় নূহাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রথমকে তিহানও অবাক হয়। তাই ওর সামনে এসে বাইক থামায়। তিহান বলে
“হুম আমি কলেজে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তুমি মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছো কেন নূহা? কলেজে যাবে না?”
আজ তিহান তার সাথে ঝগড়া করছে না দেখে নূহাও আগ বাড়িয়ে ঝগড়া করে না। বিরক্তি মাখা মুখ নিয়ে উত্তর দেয়
“কলেজে যাব। গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু কোন গাড়ি নাই রাস্তায়।”
ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায় তিহান। সরু ফাঁকা রাস্তায় কোন গাড়ি নাই! ঘড়ির কাঁটায় তাকিয়ে দেখে কলেজে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে! তিহান কিছু ইতস্তত বোধ করে বলে উঠে
“নূহা‚ তুমি আর কতখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবে? ক্লাস প্রায় শুরু হয়ে যাবে? তুমি চাইলে আমার বাইকে উঠতে পার। আমিও কলেজে যাব।”
বাইকে উঠার প্রস্তাবে নূহা অবাক হয়ে যায়। তিহান তার সাহায্য করতে চাইছে? হঠাৎ এমন পরিবর্তন কি করে হয়ে গেছে? তাছাড়া আজ তার সাথে ঝগড়াও করছে না। দেরি হয়ে গেলে ক্লাস মিস হয়ে যাবে এই ভয়ে থাকার পরও নূহা তিহানের বাইকে উঠতে রাজি হয় না। নূহা বলে
“তিহান‚ আমি একাই চলে যেতে পারব। বাইকে উঠতে হবে না। আপনি চলে যান।”
নূহার না বোধক কথা শুনেও তিহান চলে যায় না বরং পুনরায় অযুহাত দেখিয়ে বলে উঠে
“নূহা‚ জেদ না করে বাইকে উঠে বস। মাঝ রাস্তায় কতোখন দাঁড়িয়ে থাকবে? ক্লাসের দেরি যাবে তো।”
নূহা আর অহেতুক জেদ করল না। ক্লাসের দেরি হয়ে যাবে ভেবে বাইকে উঠার সিদ্ধান্ত নেয়। নূহা এগিয়ে যায় বাইকের কাছে। বাইকের পাশে থাকা হেলমেট এগিয়ে দেয় নূহার দিকে! নূহা হেলমেট হাতে নিয়ে পড়ার চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। তিহার কিছুক্ষণ দেখে‚ হাত বাড়িয়ে নূহার কানের পাশে থাকা চুল পিছনের পিঠে সরিয়ে দেয়। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে! তার হাত _পা থমকে যায়। তিহান হেলমেট মাথায় পড়িয়ে দিয়ে থুঁতনি উঁচু করে লাগিয়ে দেয় নূহার মাথায়। তিহান বলে
“উঠে বস বাইকে নূহা।”
তিহানের এমন শান্ত কোমল রূপ নূহা আগে কখনও দেখিনি। প্রথম দিন থেকেই তারা দুইজন শুধু ঝগড়া করত তাই একে অপরের কাছাকাছি আসা হয়নি।
বাইকে উঠে বেশ দুরত্ব নিয়ে বসল নূহা। তিহান বাইক স্টার্ট দেয়। বাইক ছাড়ার সাথে সাথেই নূহার তাদের মধ্যকার সমস্ত দুরত্ব দূর হয়ে যায়। নূহার শরীর ধাক্কা লাগে তিহানের চওড়া পিঠের সাথে! নূহার শরীরের স্পর্শ পাওয়ার সাথে সাথেই তিহানের সারা দেহ অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যায়। তার গলা শুকিয়ে আসে! কিন্তু নিজ মনের অনুভূতি নূহার থেকে আড়াল করে শক্ত দৃঢ় ভাবে বাইক চালান শুরু করে দেয়। ফাকাঁ রাস্তায় প্রচণ্ড স্রিডে বাইট চলছে! ভয়ে গুটিগুটি হয়ে নূহা শক্ত করে পড়নে থাকা তিহানের জ্যাকেট খামচে ধরে!
প্রায় তিরিশ মিনিট পর কলেজ গেইট বাইক এসে থামে। তিহান বাইক থামিয়ে পিছনে বসা নূহাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে
___ নূহা, আমরা কলেজে পৌঁছে গেছি নেমে পড়।”
ভয়ে চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে চুপচাপ বসে নূহা তিহানের শীতল কণ্ঠ শুনে চোখ মেলে তাকায়। এরপর দ্রুত বাইক থেকে নেমে পড়ে! ক্লাস কখনও শুরু হয়নি সময়ের আগেই তারা পৌঁছে গেছে। নূহা সৌজন্য বোধ থেকে ছোট করে বলে উঠে
_ ধন্যবাদ তিহান। আমায় সময় মতো কলেজে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।”
তিহান নূহার মুখে “ধন্যবাদ ” শুনে অবাক হয়। এই মিস ঝগড়ুটে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ দেখাচ্ছে? অবিশ্বাস্য! তিহানও হাসি মুখে বলে উঠে
_ ওয়েলকাম নূহা।”
তিহানের থেকে বিদায় নিয়ে নূহা এগিয়ে গিয়ে কলেজ গেইটের পথে হাঁটা ধরে। তিহান বাইক নিয়ে এখনও একই জায়গায় অবস্থান করছিল। হঠাৎ তার দৃষ্টি যায়,দূরে এক গাড়ির থেকে! গাড়ির দরজা খুলে বের হয়ে আসে মেঘ। যা দেখে তিহান খুশি হয়। আজ ফাইনালি মেঘের সাথে কলেজে যেতে পারবে সে! একই সিটে দুইজন বসতে পারবে। কিন্তু হঠাৎ গাড়ির অপর পাশের দরজা খুলে আদ্রিয়ানকে বের হতে দেখে। তিহানের হাসি নিমিষে উদাও হয়ে যায়!
একই গাড়ি করে আদ্রিয়ান আর মেঘ কেন এসেছে? ওরা দুইজন একসাথে কেন? মেঘ কি আদ্রিয়ানের পরিচিত? কিন্তু মেঘ এখনও বলেনি তো? তিহানের মনে হাজারও প্রশ্ন ঘুরাঘুরি করছে! দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দুইজন বেশ হেঁসে হেঁসে কথা বলছিল। যা দেখে তিহানের মনে সন্দেহর সৃষ্টি হয়! তিহানের কি উচিত মেঘকে সরাসরি এই বিষয়ে প্রশ্ন করা। কিন্তু মেঘ যদি কষ্ট পায় তার কথায়! তখন? কিন্তু আদ্রিয়ানের সাথে মেঘের কি সম্পর্ক তা জানা উচিত তিহানের!
দূরে হেঁটে যাওয়া নূহার কথা মনে পড়ে তিহানের। বাইক রেখে তিহান দ্রুত নূহার পিছু পিছু ছুটে যায়! বেশ দূরে যায়নি নূহা। তিহান পিছন থেকে জোরে ডাক দেয় নাম ধরে
___”নূহা দাঁড়াও। ”
হঠাৎ তিহানের কণ্ঠ শুনে অবাক হয়ে পিছনে ঘুরে তাকায় নূহা। এক দৌড়ে নূহার কাছে ছুটে আসে তিহান এরপর দ্রুত প্রশ্ন করে উঠে
___” নূহা, আদ্রিয়ানের সাথে মেঘের কি সম্পর্ক? ওরা এক গাড়িতে কেন এসেছে?”
এমন অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে ভ্রু কুঁচকে তাকায় নূহা! হঠাৎ এমন প্রশ্ন? তাও আবার মেঘের বিষয়ে? তবে কি তিহান তাদের একসাথে দেখেছে? আদ্রিয়ান স্যার যে মেঘের আত্মীয় হয় তা কলেজের কোন ছাএ ছাএীকে জানাতে নিষেধ করেছে মেঘ? কিন্তু তিহান যে নাছরবান্দা সে অবশ্যই নূহার থেকে এই প্রশ্নের উত্তর শুনেয় ছাড়বে? অবশ্য তিহান, মেঘের বেশ ভালো বন্ধু আদ্রিয়ানের স্যারের বিষয়ে জানলে খুব বেশি অসুবিধা হবে না! নূহা বলে
তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৫৭
___”আদ্রিয়ান আর মেঘ একই বাসায় থাকে। শুনেছি তারা আত্মীয়। সম্পর্কে বেয়াই _বেয়াইন হয়। হয়ত তাই একই গাড়ি করে কলেজে এসেছে।”
নূহার কথা শুনে তিহান অবাক হয়ে বলে
“আত্মীয়!”

Apu next part
Apu next part
Next part plz taratari den