দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ১৫+১৬
আনায়া আফরিন
আফরিনের ভার্সিটিতে আজ দুটো ক্লাস হয়নি!তাই আজ তাদের আগেই ছুটি হয়েছে।বের হয়ে আফরিন ভাবলো একটু ঘোরা যাক।রুদ্ভিকা-ফিহার ক্লাস আছে তাই তাদের আর বললো না বের হতে।সে একাই হাটতে লাগলো।আজকেই আবহাওয়া টা বেশ সুন্দর।আকাশটা মেঘলা।ঠাণ্ডা বাতাস শরীরকে স্পর্শ করছে।এই সময় এক কাপ কফি হলে মন্দ হয়না।নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিলে এক কাপ কফি খাবে।গেলো একটু রেস্টুরেন্টে।কলেজ রোড অজস্র রেসুরেন্ট রয়েছে।সে একটা ক্যাফেতে ডুকতে যাবে তার আগেই একটা ক*ড়া পারফিউমের ঘ্রাণ তার নাকে আটকালো।পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো প্রণয়পুরুষ আরশ।আরশ তাকে দেখে মুচকি হেসে ক্যাফের দরজাটা খুলে এক হাত দিয়ে একটু গুজো হয়ে ইশারা করলো আফরিনকে ভিতরে ডুকতে।আফরিন মুচকি হেসে ভিতরে ডুকলো।একপাশে বসলো সে।আরশ এসে তার সামনে বসলো।বিনয়ের সুরে বললো-
“রাগ করেছো এভাবে বে*হায়াদের মতো পিছু নিয়ে আবার নিজেই এসে কফি খেতে বসে গেলাম?”
আফরিন এবার ভ্রু উচিয়ে বললো-
“ইচ্ছে করছে রাগ করতে তবে পারছি না।আচ্ছা জানলেন কীভাবে?”
আরশ এবার মেনু কার্ডের দিকে তাকিয়ে বললো-
“একটু আগেই উত্তর দিয়ে দিয়েছি ম্যাডাম।”
আফরিন-“এভাবে মেয়েদের পিছু নেওয়া কি কোনো ভালো কাজ?”
আরশ-“অকারণেই মেয়েদের পিছু করা আমার অপছন্দের কাজ।তবে আরশ আফরিনের পিছু নিতেই পারে।ব্যাপারটা স্বাভাবিক।আফরিন ব্যতীত আরশ অন্য নারীর পিছু তো দূরে থাক,চোখ দিয়েও তাকায়ও না অন্য নারীর দিকে।”
আফরিজ বোধহয় লজ্জা পেলো খানিকটা।সে আর কিছু বললো না।আরশ তা বুঝলো।নিরবতা ভাঙতে বলে উঠলো-
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“কোন কফি খাবেন?আইস নাকি হট?”
আফরিন চোখ কাচের বাহিরের দৃশ্যতে রেখেই জবাব দিলো-
“হট”
আরশ কফি অর্ডার করলো।আফরিন বললো-
“আমার পিছু নিয়ে কি মজা পান?”
আরশ-“মজা পাই নাকি জানি না তবে তোমার পিছু নিলে তোমাকে বহুক্ষণ দেখার সুযোগ হয়।তৃষ্ণার্ত হৃদয় একটু পানি পায় এমন মনে হয়!”
আফরিন এবার লাজুক হেসে বললো-
“কার থেকে শিখেছেন এমন নাটকীয় কথা?”
আরশ-“প্রেমে পড়লে মানুষ সব কথাই শিখে যায় প্রেয়সী।”
আফরিন এবার অবুঝের মতো একটা প্রশ্ন করলো-
“তো কার প্রেমে পড়েছে সিনিয়র মশাই?”
আরশ-“এক জুনিয়রের প্রেমে পড়েছি।”
আফরিন আর কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারলো না।লজ্জায় গালে লাল আভা দেখা দিয়েছে।আরশ তার এই অবস্থা দেখে মিটিমিটি হাসছে।আফরিন কফি খেতে শুরু করলো।দু’জনে কথা বললো বেশ অনেকক্ষণ।তারপর আরশ গেলো পে করতে।আফরিন অনেক বার না করেছে কিন্তু আরশ শুনেনি।তার মতে পুরুষ সঙ্গে থাকলে নারী কেন পে করবে?পুরুষ টা কি অক*র্মার ঢে*কি নাকি?আফরিন এটা শুনে আর কিছু বলেনি।খাওয়া শেষ দু’জন বেরোলো হাটতে।আর বিশ মিনিট আছে এরিদের আসতে।ভার্সিটির গেইটের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে সে যাতে ভাই বুঝতে না পারে কিছু।হাটা ধরলো সে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে!আরশ পিছুপিছু হাটছে।আফরিনের বেলী ফুল বড্ড পছন্দ।আরশ দেখলো একটা মেয়ে বেলীর গাজরা বিক্রি করছে।সে আফরিনের জন্য ৬ টা কিনলো।আফরিন দ্রুত হচ্ছে।পথ ফুরোচ্ছে না অথচ সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে।পরক্ষণেই আরশ তার সামনে এসে দাড়ালো।
তার হাতের গাজরা দেখে আফরিন যেনো খুশি হয়ে গেলো।সময়ের কথা যেনো ভুলে বসলো।আফরিনের অনুমতি নিয়ে আরশ অতি সন্তর্পণে তার দুই হাতে গাজরা দুটি পড়িয়ে দিলো।খোপার জন্য চারটি গাজরা কিনেছে যাতে মাথায় পুরো ফুলের সমাহার থাকে।আফরিনের চুল ছাড়াই ছিলো তার চুল অতো লম্বা নয়।তবে চারটি গাজরা না হলেও তিনটি দেওয়াই যায়।আরশ রাস্তার এক লাফে আফরিনকে দাড় করিয়ে পড়িয়ে দিলো গাজরা গুলো।আফরিনের তখনই মনে পড়লো ভাইয়ের কথা।সময় হয়ে তিন মিনিট পেরিয়ে গিয়েছে।তার ভাই এমনিও দশ মিনিট আগেই এসে পড়ে।আজ তো সে শেষ।দ্রুত পা চালিয়ে এসে দেখলো তার ভাই গেইট বরাবর তাকিয়ে আছে।তার শরীর বোধহয় জমে গেলো।আরশকে দূরে থাকতে বলেছে।আফরিন নিজেকে স্বাভাবিক করে সামনে এগোলো।এরিদের সামনে আসতেই এরিদ ভ্রু কুচকে জিজ্ঞাসা করলো-
“গেইটের ভিতর থেকে না বের হয়ে গেইটের বাহিরে তুই আমার সামনে কীভাবে আসলি?”
আফরিন এবার আমতা আমতা করে বললো-
“সামনে বেলী ফুল দেখেছিলাম তুমি তো জানোই কতো পছন্দ আমার বেলীফুল।তাই কিনতে গিয়েছিলাম আরকি!”
এরিদ কোন প্রশ্ন করার আগেই সামনে থেকে রুদ্ভিকা আসলো।এরিদকে দেখে চোখ নামিয়ে ফেললো।তাদের এখন প্রায়ই দেখা হয়।যেমন সকালেও হলো।তাই আর কিছু জিজ্ঞাসা করলো না।সে এমনিও একটু লাজুক স্বভাবের।সে এসেই আফরিনকে জিজ্ঞাসা করলো-
“আপুউউউ কোথায় ছিলে তুমি?শুনলাম তোমাদের নাকি আজ দুই ক্লাস হয়নি।আমি তো ভেবেছি তুমি বাসায় চলে গিয়েছো।”
আফরিনের যেনো শরীর জমে গেলো।এরিদ এবার সন্ধিহান দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো।অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বললো-
“এতোক্ষণ ধরে কি গাজরাই কিনলি নাকি?”
আফরিন-“এতো সময় কোথায়?এতোক্ষণ তো ভিতরেই ছিলাম তোমার অপেক্ষায়।”
এরিদ বিশ্বাস করলো নাকি বোঝা গেলো না।রুদ্ভিকাকে বিদায় দিয়ে এরিদ আর আফরিন গাড়িতে বসলো।আফরিন ভাইয়ের থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বললো না।রাস্তার ফেরার পথে এরিদের ফোনে একটা মেসেজ আসলো।এরিদ মেসেজটা ওপেন করতেই জোরে গাড়ির ব্রেক কষলো।আফরিন সামনেএ দিকে পড়ে যেতে নিলেও সামলে নিলে নিজেকে।ভাগ্যিস সিট বেল্ট বাধা ছিলো।এরিদ এবার র*ক্তচক্ষু নিয়ে আফরিনের দিকে তাকালো।আফরিন যেনো স্তব্ধ হয়ে গেলো।তার ভাইয়ের হলো টা কি আসলে।এরিদের হাত দুটো মু*ষ্টি বদ্ধ হয়ে এলো।সে কোনরকম নিজেকে শান্ত করে গাড়ি চালালো।বাড়িতে পৌছেই দ্রুত ভিতরে ঢুকে গেলো।ভাইয়ের এহেন আচরণে আফরিন কিছুটা দুঃখ পেলো কারণ এরিদ বা এরিক কেউই কখনো তাকে পিছনে ফেলে যায়না।এরিক তো তার ব্যাগটা পর্যন্ত নিজের হাতে নিয়ে আসে।মেহের লিভিং রুমেই বসে ছিলো।সে মুলত তাদেরই অপেক্ষা করছিলো।এরিদকে আগে আসতে দেখে সেও কিছুটা অবাক হলো।এরিদের চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে বড্ড রেগে আছে।মেহের এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলো-
“এরিদ কি হয়েছে?আফরিন কোথায়?”
এরিদ রাগান্বিত সুরেই জবাব দিলো-
“আসছে আর ভাবি আমি আজকে খাবো না।ইচ্ছে নেই তাই ডাক দিয়ো না!”
এটা বলে সে চলে গেলো নিজের রুমে।পিছনেই আফরিনকে দেখতে পেলো মেহের।এগিয়ে গিয়ে ব্যাগটা নিয়ে আফরিনের থমথমে চেহারার দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় জিজ্ঞাসা করলো-
“কি হয়েছে আফরিন?তোমার ভাই রেগে আছে আর তোমার মুখ এমন কেন?”
আফরিন যেনো কেদেই দিবে এমন অবস্থা।সে আস্তে করে বললো-
“কিছু হয়নি ভাবি”
এটা বলে সেও নিজের রুমে চলে গেলো।মেহের অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো যে এই দুইজনের হয়েছেটা কি আসলে!
কিছুক্ষণ পর সে খাবার নিয়ে এরিদের রুমের সামনে গেলো।দরজা আটকানো।ডাকার পরেও কোন শব্দ আসছে না তাই সে আফরিনের রুমের দিকে এগোলো।আফরিনের রুমের দরজা চাপানো ছিলো।মেহের গিয়ে দেখলো আফরিন সবেমাত্র ফ্রেশ হয়ে বেরিয়েছে।সে খাবার গুলো নিয়ে আফরিনের সামনে রাখলো।আফরিন তখন নরম গলায় বললো-
“তুমি কষ্ট করে কেন আনতে গেলে ভাবি?আমার এমনিও খাওয়ার ইচ্ছে নেই!”
মেহের এবার মুচকি হেসে বললো-
“ইচ্ছে নেই বললেই হলো।বাজে কয়টা দেখেছো?এখন খেয়ে নাও!শরীর খারাপ লাগছে?আমি খাইয়ে দেই?”
আফরিনের উদাস মনটা যেনো এবার ভেঙে গেলো।মনে পড়লো শেষবার তাকে এমন আদুরে গলায় কে বলেছিলো খাইয়ে দেই!দাদু হ্যাঁ?দাদু বলেছিলো।বাবার পর তো দাদুর হাতেই খাওয়া হয়েছিলো তার।বহু বছর পর কেউ এভাবে আবার বললো।আফরিনের চোখ থেকে দু’ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো।তার জীবনে এতো কম মানুষের মধ্যে সবাই কি করে অতি দ্রুত হারিয়ে গেলো।বাবা-মা,দাদু,দাদি কেউ নেই।তবে ভাইরা তাকে এই না থাকার দুঃখ কখনো বুঝতেই দেইনি।তাও মাঝে মাঝে আধার রাতে আফরিনের বড্ড মনে পড়ে তাদের কথা।আফরিনের চোখের এই জল দেখে মেহের দ্রুত গতিতে নিজের ওড়না দিয়ে জল মুছে দিতে দিতে বললো-
“কাদছো কেন আফরিন?কিছু হয়েছে?কেউ কিছু বলেছে?”
আফরিন-“না ভাবি কেউ কিছু বলেনি।মা-মা একটা ঘ্রাণ নাকে আসছে বহুদিন পর তাই আরকি একটু মনে হলো আম্মুকে।”
মেহের বুঝতে পারলো এবার।আফরিনকে আলতো করে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো-
“তাহলে ঘ্রাণ নাও।যেই স্থান থেকে ঘ্রাণ পাচ্ছো সেই স্থানে মনে করো তোমার মা-ই আছে ঠিক আছে?এখন খেয়ে নাও তো জলদি জলদি!”
আফরিন মুচকি হাসলো।মেহের সযত্নে মেয়েটাকে খাইয়ে দিলো।আফরিন মনে মনে সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো তাদের তিন ভাই-বোনের জীবনে এতো অমায়িক একটা নারীর আগমন ঘটানোর জন্য!
রাত ১০:৩০।এরিক সবেমাত্র হসপিটাল থেকে ফিরেছে।এসেই দেখলো মেহের বসে আছে লিভিং রুমে।মেহের তার আসা অবদি অপেক্ষা করে।এরিকের কাছে আজ বাড়িটাকে বেশ স্তব্ধ মনে হলো।আরেকটা জিনিস দেখে অবাক লাগলো যে আজ আফরিনের কোন শব্দ নেই।অন্যদিন সে বাড়িতে পা রাখতেই আফরিন এসে এরিদের নাম ১০০টা নালিশ করতো তবে আজ কোথায় সে।সে মেহেরের দিকে এগিয়ে গেলো।জিজ্ঞাসা করলো-
“খেয়েছেন আপনি?”
উত্তর “না” আসবে এরিকের জানা।এরিক মানা করেছে তার জন্য অপেক্ষা করতে।তবুও মেহের করে।এরিকের কাছে ব্যাপারটা বড্ড ভালো লাগে।মেহেরের ভালোবাসা না হোক,যত্ন টুকুই তো তার কাছে বিশাল ব্যাপার।মেহের “না” বললো।রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললো-
“আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন।আমি খাবার গরম করে আনছি।”
এরিক ফ্রেশ হয়ে এলো।আফরিন অথবা এরিদ কারোই সাড়াশব্দ না পাওয়ায় এরিক জিজ্ঞাসা করলো-
“ওরা কোথায়?”
মেহের খাবার বেড়ে দিতে দিতেই বললো-
“আজ আফরিন ভার্সিটি থেকে আসার পরই তার মুখ ভার।আর এরিদ যে সেই ঘরে দরজা লাগিয়ে ঢুকেছে এখনও মেলেনি।ডাক দিয়েছি কয়েকবার খোলেনি।”
এরিকের এবার ঘটকা লাগলো।সে এরিদকে কল করলো তবে উত্তর এলো না।আফরিনকে কল করলো কোন উত্তর নেই।এদের দুইজনের হয়েছেটা কি।এতো দ্রুত ঘুমানোর মানুষ তো এরা না।তবে!সে খেয়ে এবার আফরিনের রুমের দিকে গেলো।দরপজায় দুটো টোকা দিতেই দরজা খুলে গেলো।আফরিনের চোখ মুখ ফোলা।মেহের এরিকের পাশেই ছিলো।আফরিনের এই অবস্থা দেখে মেহের তার গালে হাত রেখে বললো-
“চোখের একি অবস্থা মেয়ে?কান্না করেছো কেনো?”
আফরিন হাসার চেষ্টা করে বললো-
“কী বলো কাদিনি তো আমি।ঘুমিয়েছিলাম অনেক ক্ষণ ধরে তাই হয়তো ফুলে গিয়েছে!”
মেহের বিশ্বাস করেও যেনো করলো না তবে এরিক নুন্যতম বিশ্বাস পর্যন্ত করেনি।আফরিনকে সাথে সাথে জিজ্ঞাসা করলো-
“কেদেছিস কেন আফরু?রিদ উ*ল্টা*পা*ল্টা কিছু বলেছে?”
এরিক জানে এরিদ আফরিনকে কাদানোর মতো কিছুই বলবে না কখনো তবে আফরিনের কান্নার কারণ টা কি!আফরিন এবার মলিন মুখে বললো-
“ভাইয়া আমার সাথে কথাই বলছে না,সে আর কি বলবে?”
এরিকের যেনো এবার সব পরিষ্কার হলো।মেহের বলে উঠলো-
“তার মানে ভাই কথা বলছে না দেখে তুমি কেদেছো?আসো আজ তার বিচার হবে কেন সে আমার ননদিনীর সাথে এমন মেয়ে মানুষের মতো মুখ ফুলিয়ে বসে আছে।”
এরিক আলতো করে আফরিনের হাত ধরে বললো- “চল”
বড় ভাইয়ের গলার আওয়াজ শুনতেই এরিদ দরজা খুললো।বড় ভাইকে দুই ভাইবোন যথেষ্ট সম্মান করে,তাই ভাইয়ের ডাক কেউ উপেক্ষা করতে পারেনি।দরজা খুলতেই এরিদ মাথা নিচু রেখেই জিজ্ঞাসা করলো-
“কিছু হয়েছে ভাইয়া?”
এরিক ভাইকে পরখ করলো।চোখদুটো চুল দিয়ে ডাকা।কেমন যেনো বি*ধ্বস্ত লাগছে এরিদকে।এরিকের বুকটা কেমন করে উঠলো যেনো।তার ভাই কি কিছু নিয়ে চিন্তিত।বোনের মুখ দেখেও কেমন যেনো লাগলো তার।এরিদকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করলো-
“আফরিনের সাথে কি হয়েছে?কথা বলছিস না কেনো ওর সাথে?”
এরিদ এবার গম্ভীর স্বরে বললো-
“ও ভালো জানে ও কোন পথে পা বাড়িয়েছে।জিজ্ঞাসা ওকেই করো।”
এরিক তাকালো আফরিনের দিকে।আফরিন মেহেরের পিছনে গু*টিসু*টি মেরে দাঁড়িয়ে আছে।এরিক এরিদকে বললো-
“তুই বল!”
এরিদ বললো-“ওর ব্যাপারে কথা বলতে ইচ্ছুক নই!”
আফরিন এবার ফুপিয়ে কেদে উঠলো।এরিকের এবার রাগ হলো।কি এমন করেছে মেয়েটা যাতে এরিদ মেয়েটাকে কাদাচ্ছে।মেহের আফরিনকে জড়িয়ে ধরে এরিদকে বললো-
“এরিদ ও বোন তোমার।ওর সব ব্যাপারে তোমাদেরই কথা বলতে হবে ভাই!”
এরিক বললো-
“মেহের ওকে নিয়ে রুমে যান।আমি আসছি!”
মেহের আফরিনের হাত ধরে তাকে রুমে নিয়ে গেলো।এরিক এবার এরিদের রুমের ভিতিরে ডুকলো।পুরো রুম উলোটপালোট হয়ে আছে।জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।পাশে ফুলদানি ভাঙাটা পড়ে আছে।এরিক এবার বিছানার উপর বসে ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞাসা করলো-
“হয়েছেটা কি রিদ?আফরিন কি করেছে?”
এরিদ এবার ভাঙা গলায় বললো-
“আমার বোন ভুল পথে পা বাড়িয়েছে ভাই।বোকাটা জানেই না কার প্রেমে সে পড়েছে।বাবা-মাকে যাদের কারণে হারিয়েছি তাদের জন্যই আবার এই বোনকে হারাতে পারবো না!”
এরিকের বুক ছলাৎ করে উঠলো।সে জিজ্ঞাসা করলো-
“মানে বলছিস কি?বাবা-মাকে যাদের কারণে হারিয়েছি তাদের থেকে আফরিনকে অনেক দূরে রাখবো আমরা।কিছু হবে না ওর।ওদের ছায়াও পড়তে দিবো না আমাদের বোনের উপর!”
এরিদ ধপ করে বিছানায় বসে বললো-
“এতো বছর যাদের থেকে নিজেদের দূরে রাখতে চেয়েছি তারা সেই আমাদের আদরের জিনিসটার উপরই নজর দিলো।”
মোবাইল থেকে আফরিন আর আরশের আজকের একটা ছবি বের করে দেখালো।এরিকের ভ্রু কুচকে গেলো।বোনকে চিনতে অসুবিধা হলো না তবে ছেলেটার অর্ধেক দেখা যাচ্ছে।ছেলেটা কে জিজ্ঞাসা করতেই এরিদ উত্তর দিলো-
“আসিফ আহমেদ এর একমাত্র ছেলে আর রাইয়ান আহমেদ আরশ!”
এরিক যেনো এবার স্তব্ধ হয়ে গেলো।কথা বলতে ভুলে গেলো।এতো বছর পরও আর কী কেড়ে নিতে এসেছে তারা?অর্থ-সম্পদ?তা তো তাদের পাপা*চার দুনিয়ায় ইউহানদের থেকেও বেশি আছে তবে কীসের দায়ে এসেছে তারা?আর তাদের বোন?বোকা মেয়েটা যদি রাস্তার একজন সৎ ব্যক্তিকেও ভালোবাসতো মেনে নেওয়া যেতো কিন্তু এই ছেলে?কি করে মানবে তারা এই ছেলেকে?আর এই ছেলে যে তাদের বোনকে ভালোবাসে না তা তাদের রীতিমতো জানা আছে কারণ আহমেদ পরিবারের পুরুষরা নারীদের ভালোবাসতে পারে না।তারা নারীদের ধ্ব*স করতে মজা পায়!দুই ভাই অতীতের স্মৃতিচারণ করতে করতে মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলো!
বাহিরে ঠান্ডা বাতাস বইছে।শীত এসেছে প্রকৃতিতে।প্রকৃতি নিস্তব্ধ।ঘড়ির কাটায় রাত ১১:২০টা বাজে।আনায়া বারান্দায় বসে আছে।চুল থেকে চুইয়ে চুইয়ে পানি পড়ছে।তার বরাবরই রাতে গোসল করার অভ্যাস আছে।শীতের দিনে গরম পানি দিয়ে হলেও করে।চুল গুলো বেশ লম্বা তবে আগের মতো আর ঘন নেই।একবারেই পাতলা হয়ে গিয়েছে।গায়ের রংটা চাপা পড়েছে।ফর্সা রঙটা এখন আর নেই।চোখের নিচে কালির প্রলেপ পড়েছে।আগের আনায়া আর নেই এটা।বারান্দার রেলিংয়ে হাত দুটো ঝুলিয়ে একটি টুলের উপর বসে আছে।গায়ে একটা চাঁদর জড়ানো।ঠান্ডার সমস্যা থাকায় মা সবিতা সন্ধ্যাবেলায়ই চাঁদর-মোজা পড়িয়ে মেয়েকে বাচ্চাদের মতো তৈরি করে রাখে।
আনায়া মুজো গুলো খুলে কেবল চাঁদর টাই শরীরে রেখেছে এখন।বারান্দায় থাকা ফুলগুলোর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আর ভাবছে কিছু একটা।তার এমন অতি গভীর ভাবনার কারণ যে একজনই-এরিক।বহুদিন ধরে পুরুষটার আইডি ঘাটা হয় না।আজ না হয় একটু দেখুক।বুকে ব্যাথা করলেও কিছু করার নেই।মোবাইলটা খাটের এক কোণায় পড়ে ছিলো।তুলে নিয়ে আবার বারান্দায় এলো।টুলটায় বসে সরাসরি ফেসবুকে ডুকলো।নোটিফিকেশন বারে ক্লিক করলো দেখতে।এরিকের বিয়ের পর তার অনলাইনে আসা হয়না আর।বলতে গেলে মোবাইল-ই ধরা হয়না।বহুদিন পর ফেসবুকে ডুকতেই নোটিফিকেশনের ঝড় বইলো।চেক করতে করতেই দেখলো একটা বুকশপ থেকে তাকে মেনশন দেওয়া হয়েছে।সে অবাক হলো।ক্লিক করতেই বেশ অবাক হলো।কেউ তাকে ৫০ টারও অধিক বই গিফট করেছে।শুভাকাঙ্ক্ষী?আনায়ার?আনায়া যেনো অবাক হলো।
বইগুলোর নাম তার ভাইকে বহুদিন আগে পাঠিয়েছিলো।তবে কি আদিল নাকি?কিন্তু আদিল কখনো এভাবে অর্ডার দেয় না।সর্বদা সে নিজেই বইগুলো নিয়ে এসেই আনায়ার হাতে দেয়।আনায়া বুকশপের ইনবক্সে যোগাযোগ করলো।জানানো হলো বইয়ের সাথে একটা চিরকুট আছে হয়তো সেটা পড়লে বুঝবে মানুষটা কে।আনায়া ভাবলো আদিলই হয়তো।এবার দেরি করে কিনে দিচ্ছে বলে হয়তো এতো আয়োজন।সে বেশি ঘাটলো না আবার একবারেই নিশ্চিতও হলো না।তবে তার মনে কেমন যেনো একটু ভালো লাগা কাজ করলো বইগুলোর কথা ভেবে।পরক্ষণেই যেই কাজে অনলাইন আসা সেটা মনে করলো।এরিকের আইডিতে ডুকলো।হৃদয় যে আবারও ভাঙবে তা সে নিশ্চিত।হলোও তাই।এরিক বেশি একটা পোস্ট করেনা।
দেখা গেলো ১ মাস আগে একটা পিক পোস্ট করেছে।কাশফুল হাতে মেহেরের হাস্যোজ্জ্বল একটা মুখ।সে তাকিয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে।পিক টা তুলেছে আফরিন।কমেন্ট বক্স চেক করে বুঝলো।কি সুন্দর লাগছে দু’জনকে।মেহের সাদা রঙের একটি থ্রি-পিস পড়া আর এরিক সাদা শার্টের সাথে কালো প্যান্ট!কি সুন্দর লাগছে।শরতের স্নিগ্ধতা যেনো তাদের সাথেই বিচরণ করছে।তার চোখ থেকে দু’ফোটা জল গড়য়ে পড়লো।মোবাইল টা বুকের সাথে যথাসম্ভব চেপে ধরলো।ফুপিয়ে কাদতে শুরু করলো।অভিযোগের স্বরে বললো-
“ডাক্তার সাহেব শরতের নীল রঙা আকাশ উপভোগ করছেন অথচ দেখুন আমি এখনো বর্ষার কালো আকাশের মাঝে তলিয়ে আছি।আমি হারিয়ে যাচ্ছি ডাক্তার সাহেব।আপনার অভাবে আমি বর্ষার কালো আকাশ ভেদ করে শরতের স্নিগ্ধতা অনুভব করতে পারিনি।”
হঠাৎ করেই বারান্দায় মৃদু আলোতে একটি অবয়ব ভেসে উঠলো।আনায়ার সামনে বসলো।আনায়া এবার নিজের মাথা উচু করে সামনে তাকালো।অবাক হয়ে কম্পিত গলায় উচ্চারণ করলো-
“ডা-ডাক্তার সাহেব।”
এরিক আলতো করে আনায়ার চুলগুলো সড়ালো গাল থেকে।চোখের পানিতে ছড়ানো চুলগুলোও ভিজে গালের সাথে কিছুটা লেগে আছে।আনায়া স্তব্ধ।সে মুহুর্তটা আবেশে উপভোগ করলো।এরিক ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো-
“তোমার এই চোখের জলে আমায় অভি*শাপ দিচ্ছো?”
আনায়া টলটলে চোখে বললো-
“আপনি বললে আমার সকল সুখ আপনার নাম বিলিয়ে দিবো আমি নির্দ্বিধায়।সেখানে অভিশাপের তো প্রশ্নই আসে না ডাক্তার সাহেব।”
এরিক-“তবে এই চোখের জল বিসর্জন কবে বন্ধ হবে?”
আনায়া এবার এরিকের চোখের দিকে তাকিয়ে বললো-
“যদি অন্য নারীর হওয়ার আগে আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন তবে বলতাম যে আপনি আমার হলেই তবে এই সময় বলবো এই জল আর বন্ধ হওয়ার নয়।আজীবন গড়াতেই থাকবে।এই বুকের ব্যাথা আর কমার নয়।আমার না বড্ড যন্ত্রণা হয় ডাক্তার সাহেব।চোখ জলে কাদতে কাদতে,মাথা ধরে যায়,বুকে কী অসহনীয় চাপ লাগে,কাদতে গেলে দম আটকে আসে,শরীর অবশ হয়ে যায়,আপনার ধ্যানে দিন-দুনিয়া ভুলে যাই।”
এরিক এবার নরম সুরে বলে উঠলো-
“ঔষধ খাও মেয়ে।সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।”
আনায়ার কান্নার বেগ বাড়লো।সে ধপ করে ফ্লোরে বসে পড়লো।কাদতে কাদতে বলে উঠলো-
“ডাক্তার সাহেব এই রোগের সমাধান যে শুধু আপনি।আপনি আমার রোগ বুঝেন না কেন ডাক্তার সাহেব!”
এবার আনায়ার কান্নার তোপ বাড়লো।চোখের সামনে সব ঝাপসা হতে শুরু করলো।ফ্লোরে মাথাটা ঠেকিয়ে শুয়ে পড়লো।তার ডাক্তার সাহেব শীতের বাতাসের সাথে তলিয়ে যাচ্ছে।আনায়ার ভ্রমে আসলো ডাক্তার সাহেব তাহলে।আনায়া জানে এমনই হবে।গত কয়েকদিন ধরেই তার এই ধরনের মতিভ্রম হয়।কল্পনায় এরিক আসে তার।তার বুকের যন্ত্রণা বাড়িয়ে দিয়ে চলে যায় ডাক্তার সাহেব।ডাক্তার সাহেব তার রোগ বুঝেনা।ফ্লোরে শুয়ে অশ্রু বিসর্জন দিতে থাকলো।ঠান্ডা হাওয়ায় তার শরীরও ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।শরীরের চাদর সেই কখনই পড়ে গিয়েছে।আনায়া চেয়ে রইলো আকাশের পানে।ঠান্ডায় শরীর অবশ হয়ে গিয়েছে অনুভব করলো।জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে বোধহয়।চোখ দুটো লেগে এসেছে।ঠান্ডা বাতাসরা সাক্ষী রইলো আনায়ার এই বিরহের।
ইউহান ভিলাতে আপাতত সবাই নিজেদের রাতের খাবার শেষ করে রুমে গিয়েছে।মেহের এসে বিছানা ঠিক করছে।এরিক রুমের কোণায় থাকা সোফাটি বসে ল্যাপটপে কিছু করছে-এটা মেহের জানে।তবে এরিক ল্যাপটপে কিছুই করছে না।কেবল খুলে বসে আছে।সে আড়চোখে মেহেরকে দেখতে ব্যস্ত।বারান্দা দিয়ে আসা চাদের আলো আদের বিছানায় পড়ছে।এরিকের মনে হলো প্রকৃতির চাঁদের আলো তার চাঁদের মুখে পড়ছে।মেহের বিছানা গুছিয়ে বসলো বিছানার উপর।এরিক মেহেরের দিকে এবার একজনর তাকিয়ে রইলো।মেহের তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হলো।মেয়েটা সামান্য চাহনিতেই কী লজ্জা পেলো।এরিক অনেকক্ষণ এভাবেই তাকিয়ে রইলো।ঘরের নিস্তব্ধতা আর এমন অসস্তি ভাঙতে মেহের বলে উঠলো-
“কিছু বলবেন?”
এরিক এবার নিজের ল্যাপটপটা রেখে দিলো।বিছানার কাছে এগিয়ে আসলো।মেহেরের চোখে চোখ রেখে বললো-
“আপনি আশেপাশে না থাকলে আমি আপনার জন্য শত কথা জমিয়ে রাখি,অথচ আপনি সামনে আসলেই সব ভুলে যাই।কেবল আপনার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলেই মনে হয় আমার জীবনটা সার্থক।”
মেহের হকচকিয়ে গেলো এরিকের এহেন আচরণে।তার বড্ড অবাক লাগলো পাশাপাশি লজ্জাও পেলো।সে চোখ সরিয়ে বলে উঠলো-
“আপনার কি কিছু হয়েছে এরিক সাহেব?”
এরিক এবার কিছুটা মেহেরের দিকে ঝুকে বললো-
“আপনাকে দেখলে আমার হৃদয় থমকে যায় মেহের।আপনার দেখার তৃষ্ণায় আমার বুকটা খা খা করে রাজনন্দিনী।”
মেহের অবাক হয় পাশাপাশি তার হৃদয় ধুকপুক করতে থাকে।নিস্তব্ধ পরিবেশে তা স্তব্ধ বোঝা যাচ্ছে।এরিক মুচকি হেসে দূরে সরে গেলো।মেহের আহাম্মকের মতো তাকিয়ে রইলো।এরিকের এই সহজ সিকোরোক্তি গুলো তার বুকে তোলপাড় চালিয়ে যাচ্ছে।এরিক মেহেরের এই অবস্থা দেখে মুচকি হাসলো।মনে মনে ভাবলো ২৫ বছরের নারীটার বুকের হৃদস্পন্দন তার জন্য অতিমাত্রায় বেড়ে গেছে।কি মারা*ত্মক সে।উঠে গিয়ে মেহেরের জুতোজুড়া বারান্দার থেকে এনে বিছানার সামনে রাখলো।মেহেরকে বললো-
“রাতে উঠলে জুতোজুড়া পড়ে নিবেন।ফ্লোর প্রচুর ঠান্ডা।”
এটা বলে সে শুয়ে পড়লো।মেহেরও শুয়ে পড়লো।তার হৃদয়ে কেমন যেনো সুখের ব্যাথারা নাড়া দিচ্ছে।ব্যাথাটা আবার অতীতকেও মনে করিয়ে দিচ্ছে।তার অতীত কী?আদিল?হ্যাঁ আদিলই তো।চোখ দিয়ে হঠাৎ করেই নোনা জল গড়য়ে পড়লো।তার এরিকের জন্য খারাপ লাগছে।এতোদিনে সে এইটুকো তো বুঝেছে যে এরিক কী পরিমাণ ভালোবাসে তাকে।তবে সে কেন এগুলো মেনে নিয়ে এরিককে ভালোবাসতে পারছে না?আদিলের জন্য কি?তার উচিত এবার আদিলকে হৃদয় থেকে মুছে ফেলা।তার মতো এমন ম্যাচিউর নারীদের এহেন কাজ মানায় না।সব ভালোবাসা কী দুনিয়াতে পুর্নতা পায় নাকি?অপুর্নতা রইলেই কী জীবনে ভালোবাসা নামক সুখটা শেষ হয়ে যাবে নাকি?দ্বিতীয়বার চেষ্টা করাই যায়।
আদিল তো তার জন্য ভুল মানুষ যে অকারণেই তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে।তার অসীম ভালোবাসা বোঝেনি তবে সে কেন সেদিকেই পড়ে আছে এখনো।মুভ অন করা উচিত।তার তো এখন একটা সংসার আছে সেটাই সামলাক সে।কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই ঘুমের রাজ্যে পাড়ী দিলো সে।সে চোখ বুঝতেই একজোড়া চোখ নিজের অভিনয় ছেড়ে চোখ মেললো।অপর পাশে ফিরতেই দেখলো তার রাজনন্দিনী ঘুম।বিভোর ঘুমে আছে সে।সে একনজরে চেয়ে রইলো।কিছুক্ষণ আগে চোখ থেকে গড়া নোনা জলের দাগটা এখনো গালে লেগে আছে।মেহেরের আবার হালকা আলো রাখতে হয় ঘুমানোর সময় ঘরে।সেই আলোতেই দেখা যাচ্ছে দাগগুলো।এরিক হাসলো।মনে মনে আদিলের ভাগ্যকে শতবার ধি*ক্কা*র জানালো ছেলেটার প্রতি নির্দয় হওয়ার জন্য।পাশাপাশি নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ জানাতে ভুললো না।এই নারীটা তার ভাবতেই তার হৃদয়ে কী শান্তি লাগে।নারীটা তাকে স্বামী হিসেবে সম্মান করে,যত্ন নেয় এইতো অনেক।ভালো না হয় পরেই বাসলো।কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই এরিকের চোখে ঘুমেরা হা-না দিলো।
কেটে গিয়েছে বহুদিন।চারদিকে পুরো শীতের আমেজ।ঠান্ডা বাতাস বইছে প্রকৃতিতে।সকালের রোদটা মিষ্টি।বেলা ৯:২০।মেহের নাস্তা টেবিলে সাজাচ্ছে।এরিদ মোবাইল ঘাটছে বসে বসে।মিতু চেয়ারে পা ঝুলিয়ে বসে বসে মেহেরের রান্নার প্রশংসা করছে।এ সময় আফরিন কাধে ব্যাগ নিয়ে নিচে নামলো।তার আজ পরীক্ষা আছে।সে আসার কিছুক্ষণ পরই এরিক আসলো।আড়চোখে আফরিন আর এরিদকে দেখলো।তারা এখন স্বাভাবিকই তবে কেউ কারো সাথে আর আগের মতো হাসি মজা করেনা।মেহের আড়চোখে শান্ত দু’জনকে দেখে খাবার বেড়ে দিতে থাকলো।পুরো টেবিলে মিতু ছাড়া কেউ কথা বলছে না।রহিমা বেগম বহুবার ধ*ম*ক দিয়েছে কিন্তু সে পাত্তাই দেয়নি। এরিক,এরিদ,আফরিন,মেহের খুব মনোযোগ দিয়েই তার কথা শুনছে,মাঝে মাঝে হু-হা উত্তরও দিচ্ছে।মেহের সবাইকে সার্ভ করে খেতে বসেছে।এ সময় মিতু বলে উঠলো-
“রিন আপ্পি।”
আফরিন তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো-
“বলো মুতু আপ্পি”
মিতু মুখটা কালো করে বললো-
“মিতু আমার নাম।এই নামে ডাকলে কিন্তু কথা বলবো না তোমার সাথে”
আফরিনও এবার একই সুরে বললো-
“আচ্ছা তাহলে আমাকেও এই রিন মিন বলে ডাকবে না।আমার একটা সুন্দর নাম আছে আ-ফ-রি-ন।বুঝেছো?”
মিতু-“পারলে বলবো নে এখন শুনো তোমরা সবাই যখন চলে যাও বাসার থেকে সকালে আম্মু আমাকে বের হতে দেয়না।খুউব ব*কে।আসার সময় একটা বাবু কিনে এনো আমার জন্য”
আফরিন-“বাবু আবার কীভাবে কিনে বোন?”
মিতু বি*র*ক্তির সুরে বললো-
“তাহলে কীভাবে পাবো?”
আফরিন এবার মুচকি হেসে বললো-
“তোমার মেহু আপুকে বললো তোমাকে আর আমাকে একটা বাবু এনে ধন্য করে দিতে আমার জীবন”
মেহের মাত্রই পানি খেতে নিচ্ছিলো।নাকে মুখে উঠে যাওয়ায় সে কাশতে লাগলো।এরিকও যেনো হতভম্ব হয়ে গেলো।এরিক এবার মৃদু ধ*ম*ক দিয়ে বললো-
“খাওয়ার সময় এতো কথা বলতে নেই তোরা জানিস না।মুখ বন্ধ করে খাবার খা।না হয় মুতু আপির সাথেই রিন পাউডারকে বাসায় ফেলে চলে যাবো আমি!”
আফরিন মুখ ভে*ঙচি মেরে খাওয়া শুরু করলো।মেহেরের আর খাওয়া হলো না।সে লজ্জায় উঠে রান্নাঘরে দৌড় দিলো।এরিক বুঝলো না মেয়েটা এতো লাজুক কেনো?সামান্য বাচ্চার কথা বলতেই মেয়েটার কি অবস্থা।যদিও সেও কিছুটা লজ্জা পেয়েছে।পরক্ষণেই ভাবলো যার হৃদয়ে তার ঠাই নেই তার দেহেই বা তার অংশ আসবে কোথায়?বোকা হয়ে গেলো নাকি।ভাবতে ভাবতেই সে নাস্তা শেষ করে হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।এরিদ নিয়ে গেলো আফরিনকে ভার্সিটি।মেহের আর রহিমা রান্নাঘরে চলে গেলেন।মিতুকে টিভি দিয়ে বসিয়ে রাখলেন!
ইরফান সাহেব পত্রিকা পড়ছেন।ভদ্রলোকের আপাতত কাজের চাপ ছেড়ে দিয়েছেন।ছেলে বলেছে এবার অবসর নাও তুমি বহুদিন তো করলে।তাই ছেড়ে দিয়েছে ছেলের উপর।ছেলেও বড্ড বুদ্ধিমত্তার সাথেই দায়িত্ব পালন করছে।ভদ্রলোক পত্রিকা পড়ছেন এমন আনায়া এসে বসলো পাশে।হাতে চায়ের কাপ।মা পাঠিয়েছে বাবাকে দিতে।আনায়া নিজের জন্যও এনেছে।বসে বাবার সাথে আলাপ জুড়লো।ইরফান সাহেব চোখের চশমাটা খুলে মেয়ের দিকে চাইলেন।তার হৃদয়টা মোচড় দিয়ে উঠলো।আনায়া কথা বলছে আর চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে।ইরফান সাহেব এবার আদুরে গলায় বললেন-
“মা রে?”
আনায়া থামলো।বাবার চোখে চোখ রাখলো না।চোখ রাখলেই বাবা আবার পড়ে ফেলবে তাকে।মাথা নিচু করেই জবাব দিলো-
“বলো বাবা।”
ইরফান সাহেব আদুরে ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করলেন-
“ঠিক আছো তুমি মা?এটা আমার সেই আনায়া না।এই আনায়াটাকে দেখলে আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠে কেন রে মা?”
আনায়া যথাসম্ভব নিজেকে শান্ত রেখে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করলো-
“আমার আবার কি হবে বাবা?রাতে ঘুম হয়না জানোই তো তাই এমন হয়ে যাচ্ছে শরীর!”
দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ১৩+১৪
ইরফান-“সত্যিই ঠিক আছিস মা?”
আনায়া-“মিথ্যে বলা উচিত বুঝি?”
ইরফান সাহেব আর কথা বললেন না এই নিয়ে।মেয়ে চোখের জল লুকাতে চাইছে।ইরফান সাহেব লুকিয়ে রাখতে দিলেন।অনেক সময় সন্তানদের দুঃখগুলো তারা আড়াল রাখতে চাইলে রাখতে দেওয়া উচিত।তাই আর ঘাটলেন না।মেয়ের সাথে তাল মিলিয়ে অন্য প্রসঙ্গে আড্ডা দিতে থাকলেন।
