দাহশয্যা পর্ব ৯১ (৩)
Raiha Zubair Ripti
গভীর রাত,চারিদিকে ঝিঁঝি পোকার ডাক। কুকুর গুলোর ডাক বন্ধ হয়ে গেছে সেই অনেক আগেই। চারিদিকে এখন কেবল নিস্তব্ধতা। অলংকারপুর গ্রামের ভুঁইয়া বাড়ির সকলে ঘুমে বিভোর হলেও জেগে আছে কেবল বাতাসি আর মেহরিন। দুজনে বসে আছে বেলকনিতে। বিছানায় ঘুমিয়ে আছে আফিয়া সুলতান। জ্যোৎস্নার আলোয় মেহরিন আবিষ্কার করলো এক বিশাল শূন্যতা। কি যেন নেই তার। কিন্তু কি নেই? তার সোলেমান সুলতান নেই। মেহরিন চাঁদের দিকে তাকায়। বাতাসির ঘুমঘুম ভাব জড়িয়ে আসছে। কিন্তু চিন্তার ভার আঁটকে দিচ্ছে। কিসের চিন্তা জানে না। মন খারাপ,ভীষণ মন খারাপ। ভাইয়ের কথা মনে পড়ছে,ভীষণ মনে পড়ছে। তার কবর টা দেখা হয় না কতদিন ধরে!
মেহরিন ঘাড় বেঁকিয়ে তাকালো। বাতাসি কে বলল-
“ ঘুমিয়ে পড়ো গিয়ে যাও। ”
“ আর আপনি?”
“ আসছি আমি। ”
বাতাসি চলে গেলো। মেহরিন দীর্ঘ এক চাপা শ্বাস ফেললো। লোকে বুঝি এজন্যই বলে অল্প বয়সে বিয়ে করতে নেই। এরা দূরত্ব সইতে পারে না। স্বামীর ব্যস্ততা বুঝে না। নিজের মন মতো স্বামী কে নিজের পাশে না পেলে রাগ হয়,অভিমান হয়। মেহরিনের ও বুঝি সেই দশাই হলো। জীবনে প্রথম পুরুষের শূন্যতা বুঝি এভাবেই পোড়ায় রমণীর বুকের ভেতর টায়? মেহরিনের বুক পুড়ছে,গলা শুকিয়ে আসছে। কি অদ্ভুত যন্ত্রণা এটা! মেহরিন নিজের ফোনের গ্যালারি তে গেলো। গ্যালারি টা ভরা শুধু সোলেমানের ছবি। খুব কম ছবিই আছে তার সাথে সোলেমানের। যেগুলো তোলা হয়েছিল সেগুলো সোলেমানের ফোনে। মেহরিন সোলেমানের ছবিটার উপর হাত বুলিয়ে কিঞ্চিৎ সুর তুলে গেয়ে উঠলো-
“ জীবনে প্রথম তুমি শেষ ভালোবাসা,
তোমাকে নিয়ে আমার কত শত আশা …
তোমার কাছে এলে সুখ খুঁজে পাই…
চোখের আড়াল হলে যেনো মরে যাই… ”
পরক্ষণেই নিজেকে দুটো গালি দিলো মেহরিন। শুধু নিজের টাই ভাবছে।
“ স্বার্থপর তুমি? না তো! তাহলে কেনো শুধু নিজের কথা ভাবছো? উনি তো বললো এই দূরত্ব তোমাদের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে। তাহলে? ”
মেহরিন কথাগুলো ঠোঁটের কোণে বিরবির করে রুমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালে হাতে থাকা ফোনটা বেজে উঠে। মেহরিন তাকিয়ে দেখে তার স্বামী ফোন করেছে। বাজে এখন রাত দেড় টা। মুখের কোনে হাসি ফুটলো। ফোনটা রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর গলায় ভেসে আসলো সালামের সহিত –
“ এই অবস্থায় এত রাত অব্দি জেগে থাকাটা কি ঠিক? ”
মেহরিন কেবল সালামের জবাব দিয়ে বলল-
“ জানলেন কি করে আমি জেগে আছি এখন?”
“ স্বামী হই আমি তোমার। তোমার আগাগোড়া সব জানি। খেয়েছ রাতে?”
“ হু,আপনি?”
“ খাওয়া হয় নি। ”
মেহরিন সাথে সাথে বলে উঠলো-
“ কেনো হয় নি খাওয়া? কিসের এত ব্যস্ততা আপনার?”
“ কত কাজ আমার। পিচ্চি মানুষ তুমি ওসব বুঝবে না। তা বলো কেমন আছো?”
“ আপনি যেমন রেখেছেন তেমনই আছি। ”
“ তাহলে তো ভীষণ খারাপ আছো। ”
“ তাহলে তাই। ”
“ চ্যাম্প কেমন আছে?”
“ ভালো আছে। ”
“ তাহলে কেবল ভালো নেই আমি তুমি তাইতো?”
“ হয়তো। ”
“ মিস করছো আমাকে? ”
“ মিস কেনো করবো আপনাকে?”
“ আমি করছি। ”
“ কেনো করছেন? আমি কে? ক..কে হই আমি আপনার যে মিস করবেন? ”
সোলেমান মুচকি হাসলো বউয়ের এই কথা শুনে। ফিসফিস করে বলল-
“ তুমি আমার গণিতের ভাষায় সমাধান। English এর ভাষায় Everything। রসায়নের ভাষায় অক্সিজেন। জীববিজ্ঞানের ভাষায় হৃৎপিণ্ড। ভূগোলের ভাষায় পৃথিবী। আইসিটির ভাষায় মেমোরি কার্ড। হিসাববিজ্ঞানের ভাষায় চূড়ান্ত হিসাব…মিস না করে উপায় আছে? এখন বলো কে হই আমি তোমার? ”
“ নাথিং। ”
সোলেমানের মুখ গম্ভীর হলো।
“ রাগ নাকি অভিমান? ”
“ বুঝেন এসবের ভাষা?”
“ বুঝি না বলছো?”
“ বুঝলে ভালো। ”
“ আমাকে একটা মাস সময় দিবে? জাস্ট একটা মাস আমার ব্যস্ততা থাকবে। তারপর আমি ফ্রী হবো। মাঝেমধ্যে আসবো ও বাড়ি তোমাদের দেখতে। হবে না তাতে?”
“ খুউব হবে। ”
“ এখন রাখি তবে? ঘুমিয়ে পড়ো। কাল কথা হবে।”
“ একটা কথা বলি? ”
“ অনুমতি নিতে হবে কেনো?”
“ আমার মুড সুয়িং হয়েছে। ”
“ আদেশ করুন শুধু ম্যাডাম। জানটাও হাজির আপনার জন্য। ”
“ ভালোবাসেন আমায়?”
“ আমায়? আমাদের হবে। ”
“ আমি স্বার্থপর তাই শুধু আমার কথা বলছি। ”
“ বাসি তো। ”
“ কতটুকু ?”
“ দুঃখিত কেজি দরে পরিমাপ করতে পারছি না। ”
“ মেপে বলুন। ”
“ মাপতে পারি না তো। তবে ঠিক যতটুকু ভালোবাসলে একটা মানুষ নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে দিতেও দু বার ভাবে না। ঠিক ততটুকুই ভালোবাসি। এবার তুমি দাঁড়িপাল্লায় মেপে দেখো এক কেজি হয় নাকি দুই কেজি। ”
“ মেপে দেখলাম ৫০০ গ্রাম। ”
“ মাশা-আল্লাহ। অনেক ভালেবাসে তোমার স্বামী তোমাকে তাহলে। তো এবার ঘুমিয়ে পড়ুন ম্যাডাম?”
“ আপনিও ঘুমান। ”
মেহরিন ফোনটা কেটে দিয়ে রুমে চলে আসলো। সোলেমান সূদুর আকাশের জ্বলজ্বল করতে থাকা চাঁদের দিকে তাকালো। এই পৃথিবীতে কেবল মেহরিন ছাড়া নিজের বলতে সোলেমানের আর কেউ নেই। এই মেয়েটাকে হারালে সোলেমানের বাঁচার আর কোনো আশাই অবশিষ্ট থাকবে না। ছোট থেকে হারাতে হারাতে তার এই অব্দি আসা। নিজের জীবন নিয়ে কখনো তার দুশ্চিন্তা ভয় কোনোটাই হয় না। কিন্তু তার কাছের মানুষদের বাঁচানোর জন্য সোলেমান কত কিই না করলো। কেউ বাঁচলো,আর কেউ বাঁচলো না।
সোলেমান অন্ধকার এক জনশূন্য রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলছে। পড়নে কালো রঙের হুডি। কিঞ্চিত চাঁদের দিকে তাকিয়েই কালো হুডি টা মাথায় উঠিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে ছুরি টা বের করে নিজ গন্তব্যের দিকে হেঁটে যেতে যেতে সোলেমান গেয়ে উঠলো-
“ দূর আকাশে চাঁন্দের পাশে ঝলমল করে তাঁরা
আমার কেউ আর নাই রে বন্ধু, কেবল তুমি ছাড়া…!! ”
তীব্র এক দাবানলের ভেতর যেন ধীরে ধীরে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে মেহরিন। চারদিকে শুধুই আগুন আর আগুন। লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়েছে বিশাল খোলা মাঠজুড়ে, গাছপালা একে একে দাউদাউ করে জ্বলছে। সেই আগুনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মেহরিন।
তার সামনে মোতালেব ভুঁইয়া পাগলের মতো ছোটাছুটি করছেন। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, আগুন যেন তাকে ছুঁতেও পারছে না। চারদিকে তাকিয়ে তিনি হাহাকার করে চিৎকার করছেন—
“কেউ কি আছো? আমার মেয়েটাকে বাঁচাও! কেউ ওকে বাঁচাও! ও পুড়ে যাচ্ছে… ওর কষ্ট হচ্ছে… আমার কলিজাটার কষ্ট হচ্ছে!”
ওদিকে আগুনে ঝলসে যাচ্ছে মেহরিনের শরীর। যন্ত্রণায় কাতর হয়ে, বুক ফেটে কান্না করতে করতে সে বলছে-
“ আব্বা,আপনি এটা কি করলেন আমার সাথে? আমাকে জেনেশুনে আগুনে ফেললেন! এই আপনি আমারে ভালেবাসছিলেন! আমার জীবনটা তো আপনি বাবা হয়ে শেষ করে দিলেন নিজ হাতে। কি অপরাধ করেছিলাম আমি? চোখ বন্ধ করে আপনার প্রতিটা সিদ্ধান্ত কে মেনে নিয়েছিলাম,ভরসা করেছিলাম, বিশ্বাস করে নিয়েছিলাম আপনার কোনো সিদ্ধান্ত ভুল হতেই পারে না। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। আমার আজকের এই অবস্থার জন্য কেবল আপনি দায়ী। আমি আপনাকে কোনোদিন ক্ষমা করবো না। কোনোদিন ও না। আমার সুন্দর জীবন টা নষ্ট করে দিছেন বাবা। আপনার মতো বাবা আর কোনো মেয়ের না হোক। আপনি জঘন্য, জঘন্য এক বাবা আপনি। আমি ঘৃণা করি আপনাকে। ”
মেহরিনের কণ্ঠ ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে, আর সেই সঙ্গে আগুন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। মুহূর্তের মধ্যেই মেহরিনের শরীরের চামড়া খসে খসে পড়তে লাগলো, মাংস ঝলসে গিয়ে আগুনের গভীরে তলিয়ে যেতে লাগলো সে।
“মেহরিন! মা!”
চিৎকার করতে করতে মোতালেব ভুঁইয়া হঠাৎ বুক চেপে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
আর তখনই এক তীব্র বজ্রপাতের আলোয় চমকে উঠে চোখ মেলে তাকালেন তিনি।
চারদিক অন্ধকার। ঘরের ভেতর কেবল বিজলির ঝলকানিতে মাঝে মাঝে আলো ছড়িয়ে পড়ছে। শরীর ঘামে ভিজে একাকার। হাঁপাতে হাঁপাতে বিছানা থেকে উঠে বসে পড়লেন। পাশে রাখা পানির গ্লাস তুলে নিয়ে এক নিঃশ্বাসে ঢকঢক করে পানি খেলেন।
স্বপ্ন… সবটাই স্বপ্ন ছিল! কিন্তু এত ভয়ংকর স্বপ্ন? নিজের আদরের মেয়েকে এমন অবস্থায় দেখলেন তিনি! বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। সত্যিই কি তার কারণে মেয়ের জীবন নষ্ট হয়ে গেছে? না… এটা হতে পারে না। মোতালেব ভুঁইয়া কখনো জেনে শুনে নিজের সন্তানদের সর্বনাশ করতে পারেন না।
তবুও… এই দুঃস্বপ্ন এত বাস্তব মনে হলো কেন?
দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালেন,রাত সাড়ে চারটা। ভোর হয়ে আসছে। অদ্ভুত এক শঙ্কা তাকে গ্রাস করলো। ভোরের স্বপ্ন কি সত্যিই সত্যি হয়ে যায়?
বাইরে তীব্র বাতাস আর ঝড়ো বৃষ্টি। আকাশ চিরে বিজলি ঝলসে উঠছে, প্রতিবারই শরীর কেঁপে উঠছে তার। ধীরে ধীরে উঠে জানালাটা বন্ধ করে দিলেন। ঠিক তখনই দূরের মসজিদ থেকে ভেসে এলো ফজরের আজান।
একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোতালেব ভুঁইয়া পাঞ্জাবি গায়ে জড়িয়ে নিলেন। হাতে ছাতা তুলে নিলেন। তারপর ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন মসজিদের পথে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে মেহরিন বাড়ির সকলের জন্য চা বানালো। বৃষ্টি কমেছে। তবে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। বাতাসের তীব্রতাও কিঞ্চিৎ কমেছে। তবে ঠান্ডা পড়েছে ভালোই। আফিয়া সুলতানের চা টা তার ঘরে দিয়ে বসার ঘরে আসতেই মোতালেব ভুঁইয়া কে ছাতা মাথায় করে আসতে দেখে মেহরিন সেদিক পানে তাকায়। বৃষ্টির ভেতর কোথায় গিয়েছিল তার বাবা? মেহরিন জিজ্ঞেস করার আগেই মোতালেব এসে দাঁড়ালেন তার সামনে। কতক্ষণ নির্বিকার হয়ে তাকিয়ে রইলেন। বুকের ভেতরটা তার কি যে অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে বলার বাহিরে। নামাজ শেষে মসজিদে বসে এতক্ষণ জিকির করছিলেন। মেহরিন চায়ের কাপ এগিয়ে দিলো। মোতালেব ভুঁইয়া মাথা নেড়ে না জানালেন। তিনি খাবেন না। ছাতাটা বন্ধ করে সোফায় বসলেন। সাথে মেয়েকেও ডেকে বসালেন। মেহরিন বসলো বাবার পাশে। মোতালেব ভুঁইয়া দূর্বল নতজানু শরীর নিয়ে মেয়ের হাত মুঠোয় নিয়ে বললেন-
“ মেহরিন,মা আমার। আমি জেনেশুনে কখনো আমার মেয়েদের সাথে কোনো অন্যায়, কোনো অবিচার, জুলুম করি নি,কাউকে করতেও দেই নি। কিন্তু আজ হঠাৎ করে মনে হচ্ছে আমি তোমার।সাথে কোনো অন্যায়, অবিচার করেছি,যা তোমার প্রাপ্য ছিলো না। যদি কখনো বুঝতে পারো তোমার এই বাবা সত্যি তার অজান্তে তোমার প্রতি কোনো অবিচার করেছে,তার কোনো ভুল সিদ্ধান্তের কারনে তোমাকে চুল পরিমান কষ্ট পেতে হয়েছে। তাহলে বাবা কে মাফ করে দিও? মেয়ের চোখে দোষী হয়ে মরাটা আমার জন্য খুবই বেদনাদায়ক, মা। ”
মেহরিন চমকালো বাবার মুখে এমন কথা শুনে। কি হয়েছে তার? এমন কথা তো তিনি বলেন না। আর তার গলার স্বর টায় এত কষ্ট এত অপারগতার ছাপ কেনো? মেহরিন বাবার হাতের উপর চুমু খেয়ে তাকে শান্ত করে বলল-
“ আপনি কোনো ফেরেস্তা না বাবা। আপনি মানুষ,আপনার দ্বারা ভুল হবে এটাই স্বাভাবিক। যদি সত্যি কখনো বুঝতে পারি আপনার কোনো সিদ্ধান্ত আমার জন্য কষ্টের ছিলো,আর আমার পক্ষে যদি সেই কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা না থাকে,তাহলে আমি আপনার সেই ভুল সিদ্ধান্ত কে পেছনে ফেলে আপনার নিকট ফিরে আসলে আপনি আমার শেষ ভরসাস্থল হবেন। শুধু এই টুকু আশ্বস্ত করুন আমায়। একটা মেয়ের আর কাউকে প্রয়োজন হয় না,যদি তার বাবা তার পাশে থাকে সবসময় । পৃথিবী কে আমি জানতেই দিব না,
আমার বাবা তার এই মেয়ের জন্য কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ”
মোতালেব ভুঁইয়ার কথাগুলো শুনে যতটা না শান্ত হওয়ার কথা ছিলো ততটাই যেন উদ্বেগ হয়ে গেলেন। তার মেয়ে তো তাকে আপনি বলে সম্বোধন করে না কখনো। স্বপ্নে আপনি বলে সম্বোধন করেছি। এখন আবার করছে। নাকি ও বাড়ি সবাই কে আপনি আপনি করে সম্বোধন করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে বলে ফেলছে? তাই হবে হয়তো। মোতালেব ভুঁইয়া কিছুটা শান্ত হলো। মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে বলল-
“ আমি সর্বদা তোমার পাশে আছি মা। পৃথিবীর সবাই তোমার বিপক্ষে চলে গেলেও জেনে রেখো তোমার এই বাপ কখনো তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে না। তোমার সামনে সর্বদা ঢাল হয়ে থাকবে। তোমাকে সব আপদ-বিপদ থেকে বাঁচিয়ে রাখবে।”
মেহরিন হেঁসে বলল-
“ তাহলে আর আমার কিসের চিন্তা? এখন আসি? চুলায় ডাল বসিয়ে এসেছি। ”
“ তোমার আম্মা কোথায়?”
“ আম্মার দেখলাম জ্বর আসছে। তাই আম্মাকে রুমেই থাকতে বলছি। আমি সামলাতে পারবো একটা। ”
মেহরিন উঠে রান্না ঘরে আসতেই দেখলো বাতাসি এরিমধ্যে ডাল বাগার দিয়ে আলু ভর্তা বানিয়ে মাংস কসাচ্ছে।
“ তুমি করতে গেলে কেনো বাতাসি? ”
“ তো কে করবে? আপনি? আমি করতে দিতাম আপনাকে এই অবস্থায়? ”
“ বেশি কাজ না। রান্না বান্নাই তো। ”
“ আপনি চাচির কাছে যান। আমি পারবো। আমার হাতের রান্না এতটাও খারাপ না। ভালোই লাগবে।”
“ আচ্ছা বেশ। আমি খাবার গুলো তাহলে টেবিলে নিয়ে যাই? নাকি এতেও আপত্তি আছে?”
“ অবশ্যই আছে। এই যে তরকারি তে ঝোল দিয়ে দিলাম। এবার তো আমি ফ্রী। আমিই নিয়ে যাচ্ছি। আপনি রুমে যান। ”
মেহরিন রুমে আসলো। আফিয়া সুলতান বেলকনিতে দাঁড়িয়ে বাহির টা দেখছিলো। মেহরিন পাশে দাঁড়াতেই আফিয়া সুলতান বলল-
“ আমার মেয়েটা আমাদের ছেড়ে কেমন আছে ঐ অন্ধকার কবরে মেহরিন? কতদিন ধরে তাট গলার স্বর শুনি না। একটু যদি যোগাযোগ করা যেত! ইশ সেদিন যদি আমার মেয়েটা বাড়ির বাহিরে বের না হত! তাহলে ও আজ আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকতো তাই না বলো? ”
মেহরিন আফিয়া সুলতান কে জড়িয়ে ধরে কাঁধে থুতনি রাখলো।
“ আমরা কেবল আল্লাহর কাছে বেশি বেশি আপুর জন্য দোয়া করতে পারি আম্মা। এ ছাড়া আর কিছুই করতে পারি না। ”
ফ্রান্সের সেই নিরিবিলি এতিমখানার ঘরে বসে মাহি একে একে এমন সব সত্যের মুখোমুখি হচ্ছিল, যেগুলো তাকে পুরো অবাক,হতবিহ্বল আর আশ্চর্য করে তুলছিলো।
মেরিলিনের বাবা একসময় রিচাদের বাড়ির বিশ্বস্ত ড্রাইভার ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই মেয়েটা বড় হয়েছে সেই বাড়ির আশেপাশে, রিচাদের পরিবারের ছায়াতেই। কিন্তু ভাগ্য বড় নির্মম এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় মেরিলিনের বাবা-মা দুজনেই মারা যান। এক নিমিষেই সবকিছু হারিয়ে ফেলে ছোট্ট মেরিলিন।
তারপর আশ্রয় হয় এই এতিমখানায়। তবে একেবারে একা হয়ে যায়নি সে। রিচা প্রায়ই এসে থাকত তার সঙ্গে। সময়ের সাথে সাথে তাদের সম্পর্কটা বন্ধুত্বের সীমা ছাড়িয়ে বোনের মতো হয়ে যায়। একই স্কুল, একই কলেজ, একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন তারা।
এই সময়েই ফ্রান্সে আসেন তরিকুল চৌধুরী বাংলাদেশি এক তরুণ ব্যবসায়ী। নিজের ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য নতুন করে ফ্রান্সে পা রাখা তার। সেখানেই তার পরিচয় হয় মেরিলিন দেমির সঙ্গে।
প্রথমে সাধারণ পরিচয়, তারপর ধীরে ধীরে কথা, বোঝাপড়া…তারপর ভালোবাসা।
তবে এই সম্পর্ক এত সহজ ছিল না।রিচাদের পরিবার, বিশেষ করে রিচার বাবা রিচার্ডসন একজন প্রভাবশালী, কঠোর মানসিকতার মানুষ মেরিলিনকে কখনোই নিজের পরিবারের সমান মনে করেননি। তার চোখে মেরিলিন ছিল কেবল এক ড্রাইভারের মেয়ে, এতিমখানায় বড় হওয়া একটি মেয়ে।
তরিকুলের মাধ্যমে রিচার পরিচয় হয় তার বিজনেস বন্ধু বাশার সুলতানের সঙ্গে। বাশার সুলতান ফ্রান্সের অন্য প্রান্তে কেবল পড়াশোনা শেষ করেছে। বড় ভাইয়ের বিজনেসের একটি সাইড দেখাশোনা করছিলো। সেখান থেকেই পরিচয় হয়েছিল তরিকুল চৌধুরী আর রিচার সাথে। বাশার সুলতান শুরু থেকেই একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, আত্মবিশ্বাসী এবং গভীর চিন্তার মানুষ ছিলেন। তার কথাবার্তা, দৃষ্টিভঙ্গি সবকিছুতেই ছিল আলাদা এক আকর্ষণ। প্রথম দেখা ক্যাফে তে হয়। দ্বিতীয় দেখা মেরিলিন দেমির আর তরিকুলের সম্পর্ক বিয়ের দিকে আগাবে এমন এমন সময়। সে থেকে রিচার আর বাশার সুলতানের মধ্যে কথাবার্তা যোগাযোগ হয়। তারপর ধীরে ধীরে… অজান্তেই ভালো লাগা।
রিচা নিজেও বুঝতে পারেনি, ঠিক কখন বাশার সুলতান তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বাশারের মধ্যেও জন্ম নেয় একই অনুভূতি। কিন্তু এই ভালোবাসার পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ধর্ম। রিচা ছিল খ্রিস্টান পরিবারে বড় হওয়া মেয়ে, আর বাশার সুলতান একজন মুসলিম। যখন রিচার্ডসন এই সম্পর্কের কথা জানতে পারেন, তার প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়ংকর কঠোর।
তিনি সরাসরি বাশার সুলতানকে ডেকে পাঠান।
ঠান্ডা, কিন্তু ভয়ানক কণ্ঠে তিনি বলেন—
“আমার মেয়ের কাছ থেকে দূরে থাকবে। এই সম্পর্ক এখানেই শেষ।”
বাশার সুলতান শান্তভাবে সব শুনে বেরিয়ে এসেছিল। এরমধ্যেই কোর্ট ম্যারেজ করে মেরিলিন আর তরিকুল বিয়ে করে ফেলেছে। তাদের সংসার হচ্ছে।
বাশার সুলতান যোগাযোগ বন্ধ করে দেন রিচার সাথে। কিন্তু ভালোবাসা কি এত সহজে থেমে যায়?
রিচা বাবার এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি। আবার বাশারের থেকে এমন দূরত্ব টাও মেনে নিতে পারে নি।
তার ভেতরে তখন দ্বন্দ্ব একদিকে বাবার কঠোর আদেশ অন্যদিকে নিজের হৃদয়। শেষ পর্যন্ত সে বেছে নেয় নিজের ভালোবাসাকে।
সব বাধা উপেক্ষা করে, নিজের বাবার বিরুদ্ধে গিয়ে রিচা ইসলাম গ্রহণ করে। আর তারপর বাশার সুলতানের হাত ধরে শুরু করে এক নতুন জীবন। বাশার সুলতান মানা করে নি। যে মেয়ে নিজের ধর্ম ছেড়ে পরিবার ছেড়ে তার কাছে আসতে পারে তাকে কি আর ফিরিয়ে দেওয়া যায়?
মেয়ে মুসলিম হয়েছে বলে সমাজে রিচার্ডসন কে নানা কথা লাঞ্ছনা শুনতে হলো। তারমধ্যে খবর এলো বাশার নাকি রিচা কে নিয়ে বাংলাদেশ চলে যাবে। রিচার্ডসন মেয়৯ ছাড়া থাকতে পারেন না। সেই মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশ চলে গেলে না দেখে থাকবে কিভাবে? তিনি হৃদয়ে পাথর চেপে সম্পর্ক টা মেনে নেয়। আর বাশার সুলতান কে ঘর জামাই করে রাখেন।
এরমধ্যে মেরিলিন এক কন্যা সন্তান জন্ম দেন। তরিকুল তখন বাংলাদেশে যায় ব্যবসার কাজে। মেরিলিন মাঝেমধ্যে আসতো মেয়েকে নিয়ে রিচার বাসায়। তার এক দেড় বছর পর রিচাও এক পুত্র সন্তান জন্ম দেয়। রিচা মেরিলিনের মেয়েকে জড়িয়ে ধরে মেরিলিন কে বলতো- এরপর বাচ্চা নিলে একটা যেন মেয়ে হয় মেরিলিনের। সেই মেয়ের সাথে সে তার একমাত্র ছেলের বিয়ে দিবে। বান্ধবী থেকে তারা বেয়াইন হবে। আত্মীয়তা আরে দীর্ঘ করবে। মেরিলিন ও সম্মত হয়। তার কিছুদিন পর তরিকুলের সাথে তার যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে আসে। স্বামীর খোঁজে বাশার সুলতানের থেকে ঠিকানা নিয়ে তাকে বাংলাদেশ চলে যেতে হয়। তারপর আর কোনো যোগাযোগ রাখেনি মেরিলিন। এজওয়ানের বয়স ২ যখন তখন মনোমালিন্য হতে শুরু করলো বাশার সুলতান আর রিচার মাঝে। রিচার্ডসন তখনও মেয়েকে মেনে নিলেও বাশার সুলতান কে কখনোই মেনে নেন নি। বাশার সুলতান আর রিচার মধ্যে কি নিয়ে ঝগড়া হতো বলতো না কেউ। হুট করে একদিন খবর আসে রিচা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে তার পুরোনো প্রেমিকের সাথে। যাকে সে একটা সময় কলেজ লাইফে ভালোবাসতো। বাশার সাথে সে আর সংসার করবে না। তার ধর্মে সে ফিরে যাবে তার প্রেমিক কে বিয়ে করে। ডিভোর্স পেপার খুব তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দিবে। এমন কিছু চিঠিতে লিখে পালিয়ে যায়। বাশার সুলতান তখন পাগল হয়ে গেলো। একদিকে বাচ্চা ছেলেটা মাকে কাছে না পেয়ে কেঁদে কে’টে ফিট হয়ে যাচ্ছে অন্য দিকে স্ত্রী নিখোঁজ। রিচার্ডসন তখনও বাশার সুলতান কে দোষারোপ করে তাকে নিচু করছিলেন। বাশার সুলতানের রাগ হলো। মুখ ফস্কে বলেই বসলেন- আপনি কিছু করেন নি তে আমার বউয়ের? ”
বাড়ি থেকে বের করে দিলেন সে কথা শুনে রিচার্ডসন তাকে। সেই রাতে ছোট ছেলেকে নিয়ে তিনি এতিমখানায় আসেন। ছেলেকে ফ্রান্সির কাছে রেখে পুলিশ স্টেশনে দৌড়াদৌড়ি করে। এক সপ্তাহ পর খবর আসে রিচা যার সাথে পালিয়ে গিয়েছিল সে রিচাকে মে’রে তার মুখ শরীর থেঁতলে দিয়েছে। সেই মৃ’ত দেহ দেখে বাশার সুলতান পাগলের মতো হয়ে গেলো। যার জন্য ছেড়ে গেলো সেই তাকে মে’রে ফেললো! রিচার্ডসন মেয়েকে ইসলামের নীতি অনুসারে কবর দিতে দেয় নি। তার কবর হয় খ্রিস্টান দের মতো করে। বাশার সুলতান বাঁধা দিতে চাইলেন কিন্তু রিচার্ডসন শুনে নি। এতিমখানা থেকেও বের করে দেয় তাকে আর এজওয়ান কে।
এদিকে রিচার খুনির খোঁজ ও পাওয়া যাচ্ছে না। বাশার সুলতান তার বড় ভাইকে ফোন করে সাহায্য চাইলেন। বড় ভাইয়ের তরফ থেকে সাহায্য আসলো। রিচার সেই প্রেমিককে খুঁজে পাওয়া গেলো না আর। হয়তো বেঁচে নেই,হয়তো বেঁচে আছে। হতে পারে কিছু একটা। বাশার সুলতান এজওয়ান কে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া চলে যায়। এ দেশে থেকেই বা আর কি হবে?
বাশার সুলতান চলে যাওয়ার ১ বছর পর অস্বাভাবিক ভাবে রিচার্ডসনও মারা যান। শ্বশুরের মৃত্যুর খবর শুনেও বাশার আসে নি। রিচার্ডসন মা-রা যাওয়ার পর তার সকল সম্পত্তির মালিক হয় এজওয়ান। তবে সেসব কিছু বাশার সুলতান দেখেন। এই যে এতিমখানায় যখন যা দরকার হয় ফোন করার সাথে সাথে বাশার সুলতান পাঠিয়ে দেন। তবে ফ্রান্সে তারা কেউই আসে না।
মাহি নির্নিমেষ চোখে চেয়ে রইলো ছবিটার দিকে। তার মনে আছে মোহনা বলেছিল মায়ের একটা বান্ধবী ছিলো। নাম রিচা। সেজন্যই কি তখন নামটা অতো চেনা চেনা লাগছিলো! এজওয়ান তার মায়ের বেস্ট ফ্রেন্ডের সন্তান! যার মা মাহির মা’কে সর্বদা আগলে রেখেছিলেন বোনের মতো করে! সেই তারই সন্তান কে মাহি এতো তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলো এতদিন ধরে! কিন্তু এতো সুন্দর ভালো মনের একজন মানুষ কি করে স্বামী সন্তান কে ছেড়ে প্রেমিকের হাত ধরে চলে যেতে পারে! মাহির বিশ্বাস হচ্ছে না। মনে হচ্ছে এটা সত্য না। এর পেছন অন্য কিছু আছে।
মাহি ফ্রান্সির ফোন নম্বর টা নিলে নিজের ফোনে। আর এমিলা সুলতানের ছবিটা খুলে প্রিন্ট করে নিলো নিজের জন্য একটা।
সেদিন রাত টা সে এতিমখানাতেই থাকলো। মেরিলিন দেমির মৃত্যু হয়েছে সেটাও জানালো। তারা বিশ্বাস করতে পারলেন না যে তরিকুল চৌধুরী এমন টা করেছেন মেরিলিনের সাথে!
পরের দিন মাহি সবার থেকে বিদায় নিয়ে এয়ারপোর্টে আসে। প্লেনে ওঠার আগে তার ব্যবহৃত ফোনটায় এজওয়ানের নম্বর টা টাইপ করে। দু’বার কল বেজে কে’টে যায়। তৃতীয় রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর গলায় ভেসে আসে-
“ হ্যালো..!! ”
মাহির গলা শুকিয়ে যায়। এদিক ওদিক তাকিয়ে জোরে জোরপ শ্বাস ফেলতেই হুট করপ ওপাশ থেকে আবারও ভেসে আসে এজওয়ানের গলার স্বর –
“ তরিকুলের বেটি.. কোথায় ছিলে তুমি? ফোন কেনে বন্ধ ছিলে তোমার? এক মিনিট…এটা তে ফ্রান্সের নম্বর। তুমি কি ফ্রান্সে তরিকুলের বেটি? ফ্রান্সে কি তোমার? তুমি না আমেরিকা যাবে বলেছিল? তুমি মিথ্যা বলেছিলে তাহলে আমায়! আর আমি তোমার সাথে পাগলের মতো বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। ”
“ থামুন এজওয়ান, থামুন। শ্বাস নিন। এর আগে বলুন আমার গলার আওয়াজ না শুনেও চিনলেন কিভাবে?”
“ নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ শুনেই। এখন বলো মিথ্যা বললে কেনো আমায়? জানো কত কি ঘটে গেছে এদিকে?”
“ আমি মিথ্যা বলি নি। আসলেই আমি আমেরিকা গিয়েছিলাম। গতকাল এসেছি ফ্রান্সে। আমি অস্ট্রেলিয়া ফিরছি আজ। আর শুনুন আপনার জন্য সারপ্রাইজ আছে। আমি আপনাকে কিছু দেখাতে চাই,জানাতেও চাই। ”
“ আমারও তোমাকে অনেক কিছু বলার আছে। তুমি জানো না র….”
“ শুনুন প্লেনে উঠবো এখন। রাখছি। ফিরে এসে কথা হবে সব। আপনি অপেক্ষা করবেন তো আমার? ”
“ হু করবো। ”
মাহি কেটে দিলো ফোন। তার এত ভালো লাগছে কেনো এখন?
মাহি ফুরফুরে মন নিয়ে প্লেনে উঠে বসলো। সে কখন এই ছবিটা এজওয়ান কে দেখাবে! লোকটা এই প্রথমবার তার মা’কে নিজ চোখে দেখবে। তারপর দুজন মিলে এমিলা সুলতানের মৃত্যু রহস্যের সমাধান করবে।
ফ্রান্সের এক প্রান্ত থেকে অন্য এক দেশের অন্য প্রান্তে থাকা একজনের কাছে ফোন গেলো। ওপাশ থেকে রিসিভ হলো ফোন। এপাশ থেকে বলা হলো-
“ রিচার বিষয়ে খোঁজ নিতে এসেছিল একজন। ”
“ কে?”
“ মাহি নামের কোনো মেয়ে। সম্ভবত সে রিচার ছেলের বউ। এবার তো আপনাকে সবার সামনে নিয়েই আসবে তারা। আপনার রহস্য বেরিয়ে আসবে। আফটারঅল সব কিছুর কলকাঠি তো আপনিই নাড়ছেন আড়ালে থেকে।
ওপাশ থেকে হাসির আওয়াজ ভেসে আসলো।
“ এতো সহজ! ব্যাকআপ প্ল্যান সবসময় আমার কাছে তৈরি করাই থাকে। যার অব্দি এত বছরেও কেউ আসতে পারে নি সেখানে এই ছোট ছোট বাচ্চারা চলে আসবে! পারবে না। ঐ মেয়ে এখন কোথায়?”
“ অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছে। ”
“ অস্ট্রেলিয়া পৌঁছানোর সাথে সাথে মে’রে ফেলে দাও। বেঁচে যেন না থাকে। বেঁচে থাকলে তোমাদের মেরে ফেলবো আমি। আমার এত বছর ধরে গড়া সাম্রাজ্য কে এসব চুনোপুঁটিরা ধ্বংস করতে পারে না। আমিই তাদের ধ্বংস করে দিব। ”
“ ঠিক আছে। অস্ট্রেলিয়া নামার সাথে সাথে মাহিকে তুলে নিব। ”
ফোন টা কেটে গেলো।
রাজধানী ঢাকাতে আজকাল হ’ত্যার ঘটনা যেন নিয়মিত দুধ ভাতের মতো হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন একটা করে লাশ পাওয়া যাচ্ছে নর্দমার ড্রেনে, বুড়িগঙ্গা নদীতে,তো ময়লার স্তূপের মধ্যে। খোঁজ নিয়ে জানা যায় ঐ সব মৃত ব্যক্তিরা বেশির ভাগই ধর্ষক। আর তাদের বিচার হয় নি। ক্ষমতার দাপটে বেরিয়ে এসেছে। বা ভুক্তভোগী পক্ষ মামলাই করে নি। বাংলাদেশের টপ নিউজ হয়ে গেলো এটা। সোলেমান রুমে বসে চ্যানেল বদলে বদলে সেসব নিউজ শুধু দেখে যাচ্ছে। বাশার সুলতান হন্তদন্ত হয়ে আসলেন। পাশে বসে অস্থির গলায় বললেন-
“ শুনছস দেশের খবর? কি হইতাছে চারিপাশে? ”
“ হু। দোষী রা সাজা পাচ্ছে। ”
“ দেশের মধ্যে আতঙ্ক ঢুকে গেছে। রাত আটটার পর বাহিরে বের হতে লোকজন ভয় পাচ্ছে। ”
“ ভালো খবর তো। ”
“ ভালো খবর?”
“ আমার জন্য ভালো খবর এটা। ”
“ কিভাবে?”
সোলেমান বাঁকা হাসলো। টিভিটা বন্ধ করে বলল-
“ আমাকে আর লুকিয়ে লুকিয়ে থাকতে হবে না নিবাসে। রাতে ঠিকমতো বাহিরে বেরিয়ে হাওয়া খেতে পারবো। ”
বাশার সুলতানের কপাল কুঁচকে আসলো সে কথা শুনে। কিছু বলতে নিবে এমন সময় ফোন আসে সোলেমানের। সোলেমান তাকিয়ে দেখে তেহরান ফোন করেছে। সোলেমান রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে তেহরানের মা বলে উঠে-
“ সোলেমান সৈকত কে কি তেহরান খু’ন করেছে? ও পাগলের মতো হাসছে আর বলছে আমি খু’ন করেছি সৈকত কে। পিস পিস করে মে’রেছি। এসব কথা এখন পুলিশ জেনে গেলে কি হবে আমার ছেলেটার! ওকে তো ধরে নিয়ে যাবে পুলিশ। তারপর জেল হবে সাজা হবে। আমি মা হয়ে কিভাবে মেনে নিব এটা? ”
সোলেমান জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে বলল-
“ আপনার ছেলেকে দেশের বাহিরে পাঠিয়ে দিন। তার মানসিক অবস্থা ভালো না। সেজন্য উল্টাপাল্টা কথা বলছে। সৈকত কে ও পাবে কোথায়? সৈকত তো গা ঢাকা দিয়েছে। আমিই পাই নি খুঁজে। তেহরানের এখন ভালো চিকিৎসার প্রয়োজন। এ দেশে তার থাকাটা ঠিক হবে না। সুস্থ হবার বদলে অসুস্থ হবে প্রতিদিন। মা হিসেবে আপনি আপনার ছেলের ভালোটাকেই প্রাধান্য দিবেন। সেজন্য যত তাড়াতাড়ি পারেন দেশের বাহিরে পাঠান। ”
তানজিলা বেগম তাই করার চেষ্টা করলেন। সোলেমান ফোন কেটে দেওয়ার সাথে সাথে তার ই-মেইলে কিছু ডকুমেন্টস আসলো। সোলেমান খুলে দেখলো ওরোবোরোস ট্যাটু যাদের যাদের পায়ে আছে তাদের সকল তথ্য দেওয়া আছে এখানে।
সোলেমান সব চেক করলো এক এক করে। সেই ডকুমেন্টস গুলের মধ্যে কিছু আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়াদেরও নাম আছে। সোলেমান তাদের বয়স দেখলো। আর একটা নামে গিয়ে চোখ আঁটকে গেলো। আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন এক মাফিয়ার প্রবেশ ঘটেছে। যার বয়স ৫৭, যার পায়ে ওরোবোরোস ট্যাটু আছে। কিন্তু তার মুখ কেউ দেখে নি এখনও।
সোলেমান সাথে সাথে কাউকে ফোন করে ছবি চাইলো। ওপাশ থেকে জানানো হলো ছবি পাওয়া যায় নি। তার সাথে আমাদের গ্যাং এর একজন কাজ করেছিল। সেই দেখেছে তার পায়ে ওমন ট্যাটু। আপনি ডেনমার্কে আসুন।
সোলেমান সে রাতেই ডেনমার্কের উদ্দেশ্য পাড়ি জমালো তার প্রাইভেট জেটে করে।
কেউ তার আগমনের কথা শুনে পৈশাচিক ভাবে হেঁসে বলছে-
দাহশয্যা পর্ব ৯১ (২)
“ যাও সোলেমান যাও। তোমার মৃ’ত্যুর ফাঁদ যে পেতে রাখা হয়েছে এখানে। মৃ’ত্যু তোমাকে ডাকছে। তোমরা একে একে সবাই মরবে। মাকড়সার জাল ছড়িয়েছি যে। কারোরই নিস্তার নেই। ”
