Home দুইজনাতেই দুইজনাতেই পর্ব ৫১

দুইজনাতেই পর্ব ৫১

দুইজনাতেই পর্ব ৫১
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

মায়ের দেওয়া শেষ উপহারটা কথা একটু বেশিই আগলে আগলে রাখত। একটু বেশিই ভালোবাসত এই উপহারটাকে। কাঁচের তৈরি মা মেয়ের একটা অবয়ব । ছোট্টর একটা ক্রিস্টাল সোপিশ। যেখানে একটা ছোট্ট মেয়ে তার মাকে খুব সুন্দর করে জড়িয়ে আছে। এই ছোট্ট অবয়বটা যে কথার কি ভীষণ দুর্বলতার জায়গা তা বোধহয় সাম্য আরও একবার টের পেয়েছিল। নিজের বারো বছর বয়সে কি একটা বিষয় নিয়ে ঝগড়া বেঁধে ছোট্ট সাম্য কথার সে উপহারটা সেবারও ভাঙতে চেয়েছিল সাম্য৷ ঠিক ঐ সময়টায় সাম্য টের পেয়েছিল কথার ঐ জিনিসটা কতোটা প্রিয়, কতোটা! সাম্যর এখনো মনে পড়ে। কথা কিভাবে কান্না করে আকুতি করেছিল সেবার। ইশশ!সাম্যর বুঝি মায়া হলো একটু হলেও সে ছোট্ট কথার প্রতি। কিন্তু এখন? এখন যে এটা ও ভাঙে নি তা কি করে বিশ্বাস করাবে? কি করে বুঝাবে যে এটা কথার ঐ বেয়াদব বিড়ালটাই করেছে? সাম্য বুঝে উঠে না। রাগে বিড়ালটাকেই আচমকা ছুড়ে ফেলল সে। কিয়ৎক্ষণ কিছু ভেবেই আচমকা কি একটা ভেবে সে কাঁচের টুকরো গুলো তুলতে লাগল হুড়মুড় করে। যেন কোন কাঁচের টুকরো বা চিহ্ন না থাকে তারই আপ্রাণ চেষ্টা চালাল। অবশেষে কাঁচের টুকরো গুলো তুলে নিয়ে সে ভাবল সে সফল। হুবুহু একই রকমের একটা ক্রিস্টাল সোপিশ এনে রেখে দিলেই তো হলো। কথা তাহলে নিশ্চয় আর ভাববে না?

এটুকু ভেবেই সাম্য নিজের কাজে নিজে অবাক হলো। কথা ভাবলেও বা কি? সে ভেঙেছে জানলেও বা কি? কথা কি তাকে এর জন্য শাস্তি দিবে? কিই বা শাস্তি দিবে? সাম্য তো এমন কত কিই নষ্ট করে প্রতিনিয়ত। তো? সাম্য কেন তুলল কাঁচের টুকরো গুলো?কেনই বা হুবুহু একই রকমের একটা ক্রিস্টার শোপিশ কেনার ভাবনাই ভাবল কেন?সাম্য বুঝল না। নিজের জন্য? নিজে দোষী হবে তার জন্য? নাকি কথা আঘাত পাবে ভেবে? সাম্য দ্বিধান্বিত হয়েই পা বাড়ায়। দ্রুত ঐ কাঁচের টুকরো গুলো নিয়ে রাখল নিজেরই ঘরের এককোণে। যাতে কথা দেখতে না পায়। জানতে না পারে। কিন্তু আদৌ লুকোতে পারল কি? ওখানে এককোণে অবহেলায় পড়ে থাকা দুয়েক কাঁচের টুকরো চোখে পড়লে বোধহয় সাম্য বুঝতে পারত, আসলে সে লুকাতে সক্ষম হয়নি।

দ্বিতীর শরীরজুড়ে মেঝমেঝে ব্যথা। শরীর-মন কোনটাই ভালো মনে হলো না। দ্বিতী তবুও স্বাভাবিকই দেখাতে চাইল যেন নিজেকে। বুঝাতে চাইল, তার অতোটাও যন্ত্রণা হচ্ছে না। সাক্ষ্য তখন তার পাশেই বসা। দ্বিতীর দিকে চেয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“ ভালো লাগছে না? যন্ত্রণা হচ্ছে কি? ”
দ্বিতী তাকায়। অতঃপর মুখে মৃদু হাসি টেনে উত্তর করল,
”একটুআধটু। আপনার জ্বর সেরেছে?”
সাক্ষ্য হাসে মেয়েটার উত্তর শুনে। এইযে মুখভঙ্গি তা দেখে সাক্ষ্য বুঝতে পারছে না বুঝি দ্বিতীর যে কষ্ট হচ্ছে? অথচ উত্তর এসেছে, “একটুআধটু।” সাক্ষ্য ওভাবেই বলল,
“ যন্ত্রণা বেশি হচ্ছে বললেও কি আমি যন্ত্রণা চুরি করব? নজর লেগে যাবে দ্বিতী? ”
দ্বিতী চোখ ছোটছোট করে চাইল। সাক্ষ্য আবারও বলল,

“ তুমি, দ্বিতীকা তাসনিম, অদিতি আন্টির মেয়েটা যতই বড়বড় ভাব ধরো না কেন তুমি আসলে আমার হাঁটুর বয়সী একটা মেয়ে বুঝেছো দ্বিতী? নেহাৎ তোমাকে মিসেস এহসান হিসেবেই আপনি সম্বোধন করি। কিন্তু সে বাচ্চাটাই আছো। তুমি কি ভাবো নিজেকে? আমি বোকা? মাথায় এত ক্ষতি হয়েও তোমার একটু আধটু যন্ত্রণা হচ্ছে? ”
” সব ঠিকাছে। কিন্তু হাঁটুর বয়সী?”
দ্বিতী অন্য সময় হলে প্রশ্নটা এমন ভঙ্গিতে বলত যে কোমড় বেঁধে যেন ঝগড়ায় নেমেছে। অথচ আজ এমন শান্ত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করছে? যেন কি নাদুসনুদুস মাছুম বাচ্চা! সাক্ষ্য তাকিয়েই বলল,
“ হাঁটুর বয়সী নও? ”
“ না, কোমড় বয়সী বললে তবু মানা যায়। ”
সাক্ষ্য এই পর্যায়ে চাপা হাসল। নিজের চুলগুলো পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে বলে উঠল,
“ তবুও তো ঐ কোমড় অব্দিই৷ আর তো উঠতে পারেননি মিসেস এহসান৷”
“ আপনার কি আরেকটু উপরের বয়সের মেয়ে পছন্দ ছিল? ”
সাক্ষ্য এই পর্যায়ে কেমন করে চাইল। দ্বিতীর হাতটক নিজের দুইহাতে নিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল,

“ নো। আমার ওয়াইফের বয়স একদম পার্ফেক্ট। ”
দ্বিতী তাকায়।সাক্ষ্য যখন তার হাতটা তার দুই হাতের মধ্যে নিয়ে জড়িয়ে ধরল ঠিক তখনই দ্বিতী অনুভব করল সাক্ষ্যর শরীরটা আগের চেয়েও উত্তপ্ত, উষ্ণ! দ্বিতী ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে বলল,
“ জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। এখনো পড়ে আছেন কেন এখানে?”
“ তো? বউ যেখানে ওখানে থাকব না?”
“ অসুস্থতা নিয়ে থাকার প্রয়োজন কি?”
“ প্রয়োজন আছে। এই যে এখন চোখের সামনে তাকে দেখতে পাচ্ছি? দুটো শব্দের কথা বলতে পারছি। চেয়ে থাকতে পারছি? দুদিন আগে ঠিক এই বিষয়গুলোর জন্যই আমি ছটফট করেছিলাম।আর আপনি বলবেন প্রয়োজন নেই? ”
দ্বিতী এবার চাপাশ্বাস ফেলে। আওড়াল,

“ প্রয়োজন আছে ধরে নিয়েই নিজের জ্বরের সুস্থতা কামনা করা উচিত নয়? ”
“ আমার ওয়াইফ সুস্থ হলে আমার সুস্থ হতে খুব বেশি সময় লাগবে না মিসেস এহসান। ”
“ তাই নাকি? আপনার ওয়াইফ অসুখ সারাতে পারে? ”
সাক্ষ্য চোখে হেসে জানাল,
“ইয়েজ! শি ইজ মাই পার্সোনাল মেডিসিন মিসেস এহসান। ”
দ্বিতী ভ্রু জোড়ায় ভাজ ফেলে চেয়ে থাকে। কিছু বললও না। সাক্ষ্য সে নজর দেখেই দ্বিতীর হাতটা ওভাবে ধরে থেকে ফের ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করল,

“এনি ডাউট মিসেস সাক্ষ্য এহসান? ”
সাক্ষ্য ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্নটা করলেও দ্বিতী উত্তর করল না। কিছুটা সময় পর ধীর গলাতেই নম্রভাবে বলল,
“আর কয়দিন হসপিটালে থাকতে হবে সাক্ষ্য? সুস্থ হবো কখন? বাসায় ফিরতেই বা কয়দিন লাগবে? ”
সাক্ষ্য হেসে ফেলল। দ্বিতীর সুঁই ফুটানো হাতটায় গভীর একটা চুমু দিয়ে বলল,
“ কেন? স্বামীর নীড়ে ফেরার খুব তাড়া ম্যাম? আই’ম অলসো ওয়েটিং টু ওয়েলকাম মিসেস এহসান ব্যাক ইনটু মাই লাইফ এন্ড হোম। ”
সাক্ষ্যর মুখে চাপা হাসি। চোখের দৃষ্টিএ হাসামাখা। অথচ এই ছেলেটাই কিনা দ্বিতীর শূণ্যতায় কেঁদেছে। দ্বিতীকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য কেঁদেছে। দ্বিতীকে একনজর দেখার জন্য কত আহাজারি। আর সে সাক্ষ্যই জিজ্ঞেস করছে, “স্বামীর নীড়ে ফেরার খুব তাড়া ম্যাম? ”
না, তাড়া না। কোন তাড়া নেই৷ দ্বিতী না ফিরুক। সাক্ষ্য আরামে থাকুক।

কথার ফিরল প্রায় সন্ধ্যা সাতটায়। এতোটা সময় দেরি হওয়ার কারণ আসার পথে দ্বিতীকে দেখতে হিয়েছিল। সাক্ষ্যর বাবা মা ও অবশ্য ওখানেই। সাক্ষ্যও। শুধু সাম্যটাই বাসায় আছে। অতঃপর কথাকে প্রথমেই বাসায় ফিরতে দেখেই ভ্রু বাঁকিয়ে চাইল সে। অন্যদিন যেমন কথাকে নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা থাকে না আজ তার দ্বিগুণ হলো। এতোটা সময়ও সে অপেক্ষাতেই ছিল কথা কখন ফিরবে, কখন ফিরবে এমন করে। দরজার দিকেই চোখ বুলাচ্ছিল কেবল। অতঃপর যখন কথা ফিরল বাসায় এবং নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল ঠিক তখনই সাম্য বাধ সাধল। কারণ রুমে গেলেই তো ও দেখবে ওর মায়ের দেওয়া উপহারটা নেই। কোথাও নেই। সাম্য ও এতগুলো দোকান খুঁজে ঐ একই রকমের ক্রিস্টাল সোপিশটা খুঁজে পেল না। সে সকাল থেকে সারাটাদিন সে এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ছুটেছে অথজ ঐ একই রকমের ক্রিস্টাল সোপিশ পেলই না। আবার ওটার ছবিও তোলা নেই যে দোকানদারদের বলে রাখবে এমন কোন শোপিস থাকলে তার জন্য যাতে আনায়। সাম্য ভেতরে ভেতরে চোরের মতো নিজেকে সেইভ রাখতে চাইলেও উপর দিয়ে কথাকে বলল,

“ কথা, আম্মুরা? আম্মুরা ফিরল না? ”
“ রাত করে ফিরবে বলল। কেন? তোমার কি কিছু দরকার আছে? ”
“ খিদে পেয়েছে আমার। আম্মু নেই। এতক্ষণ খিদেতে মরে যাচ্ছি অথচ কিচ্ছু নেই খাওয়ার। ”
মিথ্যা! সাম্যর খিদে পায়নি। তবুও কথাকে আটকানোর চেষ্টা কেবল। অন্যদিকে কথা ফ্যালফ্যাল করে চাইল। তার নিজেরও খিদে পেয়েছে। কিন্তু করবে কি? নিজেও তো রান্নার র ও পারে না। কথা ছোটশ্বাস ফেলে বলল,
“ খাবার অর্ডার করে নাও। অপেক্ষায় থেকে কি লাভ? ”
“ বাইরের জিনিস খেয়ে একশো একটা রোগ হয় জানিস না? শোন, তোরও নিশ্চয় খিদে পেয়েছে তাইনা? চল, ঘরে কিছু ট্রাই করি দুইজনে মিলে।রান্নার পর দুইজনই খাব। ”
এইটুকু বলেই একপ্রকার চেপে ধরল কথার হাতটা। কাঁধের ব্যাগটা অব্দি রাখা হলো না তার আগেই সাম্য কথার হাত ধরে এগোতে লাগল। উদ্দেশ্য কেবল এক!কথাকে রুমে যাওয়া থেকে আটকানো। অপরদিকে কথা কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয় সুধাল,

“ আমার অতোটাও খিদে নেই। হাত ছাড়ো, ফ্রেশ হয়ে আসি আমি। ”
” কিন্তু আমার খিদে পেয়েছে। আর রান্নার আমি কিছুই পারি না। পরে রান্না খারাপ হলে তো কাউকে দোষ দিতে পারব না। তুই সহ রান্না করলে অন্তত তোকে দোষারোপ করে হলেও মনের শান্তি মিলবে। ”
কথা চোখ ছোট ছোট করে চাইল। না পারতেই ব্যাগটা সোফায় রেখে রান্না ঘরে হাজির হলো। অতঃপর দুই প্যাকেট নুডুলস নিয়ে হাজির হলো দুইজনে। পানিতে নুডুলসটা সিদ্ধ দিতে দিতে সাম্য অভিজ্ঞের ন্যায় বলল,
“ এই দেখ কাঁথার বাচ্চা কাঁথা! এভাবে পানিতে নুডুলস ডালবি ওকে? দেন মসলা দিয়ে রান্না করে খেয়ে নিবি৷ ”
“ শুধু মসলা? ”
“ না মানে, লবণ, হলুদ, মরিচ সব। ”
কথা মিনমিনে চোখে তাকায়। মামনিকে কাঁটাকুটায় সাহায্য করলেও সে কখনো রান্না করেনি। তাই জানেও না কিভাবে রান্না করে। বোকার মতো জিজ্ঞেস করল,

“ তেল দিবে না? ”
“ তেলও দিতে হয় নাকি? জল দিলাম না? ”
কথা তো নিজেও জানে না। সাম্য পেয়াজ নিল। একটা পেয়াজ কথার দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল,
“কাট বেয়াদব। তখন থেকে তো দাঁড়িয়েই আছিস। করেছিস কি যে একটু পর নুডুলসটা গপাগপ খাবি?”
কথা উত্তর দিল না। পেয়াজটা কাটতে নিল। সাম্যও আরেকটা পেয়াজ কাটতে লাগল। কিন্তু ওর কাঁচা হাতে পেয়াজের চেহারা খুব সুন্দর রইল ন।ফটাফট দুইবার চুরি চালিয়ে সাম্য ফোঁস করে বলে,
“ পেয়াজ এমন সরু হয় না কেন? আশ্চর্য! ”
“ আমি পারব পেয়াজ কাটতে। দাও, কেটে দিই ”
কথার চোখ তখন টলমলে। সাম্যর নিজের চোখও টলমলে। পেয়াজের ঝাঁজ এ চোখে পানি আসার উপক্রম। সাম্য চোখমুখ খিচে বলল

”পেয়াজের কাজ কি। পেয়াজ দিব না।”
”দাও, স্বাদ হবে হয়তো। ”
” তুই নিজেই তো পারিস না গর্দভ৷ আবার বলে স্বাদ হবেে।যে জিনিস আমায় এভাবে কাঁদাতে পারে ঐ জিনিস খাবারে দিয়ে কোন লাভ নাই৷ ”
” তুমি বেশি জানো। মামনি দেয় আমি দেখি। ”
অতঃপর দুইজনের একদফা তর্কাতর্কি চললই। অবশেষে যখন একটা সিদ্ধান্তে আসবে ঠিক তখনই নাকে এল পোড়া গন্ধ। সিদ্ধ হতে দেওয়া নুডুলস এর পানি শুকিয়ে অলরেডি পুড়ে এসেছে।সাম্য মুহূর্তেই কড়াইটা নামাল। দোষারোপ করে বলল,
“ কাঁথার বাচ্চা কাঁথা! তোর জন্য। তোর জন্য পুড়ল। বেশি বকবক না করলে হতো না? ”
“ বকবক তো তুমিও করেছো। করোনি? ”
“ চুপ একদম চুপ! এতবড় একটা মেয়ে হয়েছে অথচ রান্না পারে না। রান্না পারা তো দূর রান্নার র ও পারে না। শুধু খেতেই পারে। ”

কথা এবার আর উত্তর করল না। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে দেখল তার পোষা বিড়ালটা এসে দরজার দ্বারে দাঁড়িয়েছে। গলার স্বর দিয়ে নিজের উপস্থিতির কথা জানান দিতেই সাম্য চেতে উঠল। চাইতেই দেখল পিকুটা তার দিকেই চেয়ে। তবে চাহনি কেমন ক্ষীপ্ত যেন। যেন পারলে সাম্যকে এখনো আক্রমণ করবে। সাম্য সেসব পরোয়া করল না। চামচ তাক করে বলে উঠল,
“ এসে গেছেন আরেক বেয়াদব। এই তোর সাথে আমার শত্রুতা আছে? ওভাবে তাকাস কেন ছাগলদের মতো?”
“ ও বিড়াল। ছাগল না সাম্য। ”
“ ও বিড়ালও না, ছাগল ও না৷ আস্ত এক বেয়াদব। তোর মতোই বেয়াদব। ”
কথা উত্তর করে না। শুধু বিড়ালকে খাবার দেওয়ার নাম করে পা বাড়াতে নিল। সাম্য আটকাতে চাইল এইসেই বলে। কিন্তু পারল না। কথা যখন পা বাড়াল তখনই বোধহয় সাম্য একদম চোরের মতোই হয়ে রইল৷ কান খাড়া করল শুনতে। এই বুঝি কথা কোন রিয়েকশন দিবে? এই বুঝি খুঁজবে? অথচ সাম্য সত্যিই পুরোটক দিন হন্যে হয়ে খুঁজেছে। পুরোটা দিন কত জায়গায় খুঁজেছে কিন্তু ভাগ্য সহায় হলো না।
সাম্য ওভাবেই রান্না করতে নিল। অতঃপর অদক্ষ হাতে রান্না করলও নুডুলস। নুন, ঝাল, হলুদ সবই দিয়ে রান্না করল। কিন্তু আন্দাজ ছাড়া। শেষমেষ খুঁজে দেখল কথা আর ওর বিড়াল ছাদেতেই। ভাগ্যিস! রুমে যায়নি। সাম্য খাবারটা নিয়েই ছাগে পা বাড়াল। কথাকে দু চোখে সহ্য করতে না পারা সাম্য আজ নিজেই খাবার অফার করল কথাকে। মুখ বাঁকিয়ে বলল,

“ ওখান থেকে যে চলে এসেছিস খাবারের ভাগ তো ঠিকই নিবি। তোদের একটারও আসলে ভদ্রতাজ্ঞান নেই। তোর ঐ নামমাত্র পোলাটাও একদম তোর মতই অভদ্র হবে। হবে কি.. হয়ে গেছেই। ”
কথা কথায় পেরে না উঠেেতাকিয়ে রইল। সাম্য আবারও বলল,
“ নে কষ্ট করে রান্না করেছি। খেয়ে উদ্ধার কর। অবশ্যই কম খাবি। কারণ আমার খিদে পেয়েছে বুঝলি? ”
কথা ফোঁস করে শ্বাস ফেলে। অতঃপর নিজের বিড়াল নিয় খেতে বসতেই সাম্য তৎক্ষনাৎ বলল,
“ ওকে ফেল, ফেল ওকে। ওকে আমি আমার রান্নার এক ফোঁটাও দিব না। ”
“ একটা পোষাপ্রাণীর সাথে এত হিংসা কিসের? ”
“ হিংসা না। বেয়াদবির শাস্তি৷ ও একটা বড় মাফের বেযাদব। আমার শখের মগটা ভেঙে দিয়েছে। আমার সাথে বেয়াদবি করে। ”
‘ এইজন্য তো তুমি আমার শখের কিছুও ভাঙবে বলেছো৷ কাটকাট হয়ে গেল না?তবুও ওর সাথে এত বিরোধ কেন? ”

“ কারণ তোর শখের জিনিস নষ্ট করা আমার সে ছোটকালের অভ্যাস।আমার ভাল্লাগে ওটা করতে। ওটা আমি তোর উপর রাগ মেটাতে করি। কিন্তু তোর বিড়ালের উপর রাগ মেটাতে কি করতে পারি? ওকেই কান ধরে পাঁচশো একবার উঠবস করাতে পারলে ভাল্লাগত। ”
কথা মিনমিনে চোখে তাকায়।বলে,
“আমার শখের জিনিস নষ্ট করতে ভালো লাগে? কেন? কেন ভালো লাগে? ”
“কারণ তুই কষ্ট পাস। আমার পৈশাচিক আনন্দ হয় তাতে৷ কলিজা ঠান্ডা হয়। বুঝলি? তোকে কাঁদতে দেখলে আরো ভালো লাগে। ”
কথা হঠাৎ অন্যমনস্ক হলো। জিজ্ঞেস করল,

“ যদি এমন হয় যে, তুমি মানুষটাও আমার খুব শখের,খুব পছন্দের। তখন কি করবে সাম্য? ”
সাম্য ভ্রু বাঁকায়। মুহূর্তেই প্রশ্ন ছুড়ে,
,“ আমি? আমি তোর শখের হবো কোন দুঃখে? আমি আর তুই হলাম শত্রু। বিপরীত পক্ষের লোক। বুঝেছিস? ”
“শত্রুতা বাদ দিয়ে ভাবো। একমুহূর্তের জন্য ভেবে নাও তুমি আমার শখের পুরুষ। ভাবো। ”
সাম্য পাত্তাই দিল না। বরং দায়সারা ভাবে বলল,
“ আমি মেয়েমানুষের শখের পুরুষ হওয়ার ভাবনা টাবনা ভাবতে পারি না। এসব ন্যাকামো ট্যাকামো আমার আসে না। প্রেম করলে করব দুয়েকটা। তারপর ধুম করে একটা বিয়ে করব। তারপর দশ বারোটা বাচ্চার বাপ হবো। এরপর আরামচে সংসার করব। ”

কথা কথা বাড়াল না। খেতে নিল। কিন্তু যখন খাবার মুখে তুলল ঠিক তখনই মুখচোখ কুঁচকে এল তার। ঝালে চোখ লাল হয়ে এল মেয়েটার। এতটাই ঝাল যে কান গরম হয়ে উঠল। কথার মনে পড়ল অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় একটা ঘটনা। ঠিক একইভাবে সাম্য সেদিন তাকে খাওয়ানোর নাটক করেছিল। অথচ প্ল্যান ছিল অন্যকিছু৷ সাম্য সেদিন কথাকে কাঁদানোর জন্যই খাওয়ানোর নাটক করেছিল। খাবারে দিয়েছিল মুঠোভর্তি মরিচ। আজ… আবারও সে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখে কথা টলমলে চোখে চেয়েই হাসে। ঝালে অবস্থা বেহাল তার। খুব বেহাল। তবু খেতে খেতে সে আওড়াল,
“ বাহ! তুমি এত ভালো রান্না কবে থেকে শিখেছো? ”

সাম্য তখনও খাবার মুখে তুলেনি।আবার প্রশংসাও হজম হলো না। কথার চোখমুখই বা এমন লাল হয়ে উঠছে কেন? সাম্য যখন কিছু বুঝে উঠল না তখন একটা সময় পর গিয়ে কথা সত্যিই কেঁদে ফেলল। চোখ দিয়ে গড়াল পানি৷ মেয়েটা আর শান্ত থাকতে পারল না। হাঁফাতে হাঁপাতেই লাল টকটকে চোখে চেয়ে বলল,
“ খুশি সাম্য? তুমি খুশি? চোখের পানিটা দেখতে চেয়েছিলে তাই না?”
সাম্য বুঝে না। ো তো ইচ্ছে করে কিছু করে নি। তবে ঝালে যে মেয়েটা হাপাচ্ছে তা বুঝে উঠেই দ্রুত নিচে গেল সে পানির বোতল আনতে। অপরদিকে কথা তখন নিজের দুঃখের সাথে উচ্চারণ করল,
“ এই একটা জীবনে তুমি আমায় যতোটা আঘাত করেছো , এই ঝালে আর কি আঘাত করবে সাম্য? তোমাকে ভালোবেসে এত দুঃখ পোহাতে পারলে এইটুকু পারব না? তুমি আসলেই বোকা সাম্য। ”

সাম্য ছুটেই এল পানির বোতল নিয়ে৷ অথচ কথা পানি খেল না। বরং জেদ নিয়েই নিজের নুডুলসটা শেষ করল। সাম্য না করা স্বত্ত্বেও। অতঃপর মুখচোখ লাল করে টকটকে লাল চোখে সাম্যর দিকে চেয়ে হেসে উত্তর করল,
“ সরাসরিই বলতে। ঝালটা খেয়ে নিতাম। ওভাবে নিজের খিদের অযুহাত দেওয়াটা জরুরী ছিল?”
সাম্য বলতে পারল না বোধহয়। তবে তখনও কথার চোখ দিয়ে পানি ঝরছে অতিরিক্ত ঝালে। ঠোঁটজোড়া লালচে হয় উঠেছে। মুখটাও লাল ঠেকছে।কথা পরপরই ডগডগ করে পুরোটা বোতলের পানি শেষ করল৷ নিশ্চুপ কতোটা সময় যে ও ছাদে বসে থাকল জানা নেই। সাম্য তখনই ছাদ থেকে সরেছে। খাবারের প্লেটেগুলো দিয়ে নিচে গিয়েছে। অতঃপর আবার ফের ফেরত এসে ছাদের দরজায় দাঁড়াল তখনই কানে কথার গুণগুণিয়ে সুর,
অলিরও কথা শুনে বকুল হাসে,
কই তাহার মতো
তুমি আমার কথা শুনে হাসো না তো…

দুইজনাতেই পর্ব ৫০

কথা অনেকটা সময় পর নিজের ঘরে এল। অনেকটা! নিজেকে কেমন ক্লান্ত লাগছের।আহত মনে হচ্ছের।সে আহত মন নিয়েই যখন নিজের ঘরে এসে আলো জ্বালাল তখন সর্বপ্রথমই পায়ে কিছু একটা বিধল যেন। কথা অস্ফুট স্বরে আর্তনাদ করল। ধারালো কাঁচের আঘাতে পা থেকে রক্ত বের হতেই দাঁতে দাঁত চেপে বসে পড়ল। ব্যথায় চোখ খিচে নিল। বুঝতেই পারল না কাঁচটা কিসের। কোথায় থেকে এল । অথচ এই কাঁচের টুকরোটা তারই অতি প্রিয় ক্রিস্টাল শোপিসটার। যাতে তার মায়ের ছোঁয়া ছিল। যাতে সে মায়ের অস্তিত্ব অনুভব করত। মন খারাপ হলে গল্প করত, দুঃখ শোনাত। তার সুখ -দুঃখ সবকিছুর সঙ্গী ছিল যেটা, এই কাঁচের টুকরোটা তারই অংশ। আচ্ছা, বোকা কথা যখন জানতে পারবে তার মায়ের দেওয়া তার সবচেয়ে প্রিয় উপহারটি আর নেই তখন কি করবে? দুঃখ পাবে? কান্না করবে?

দুইজনাতেই পর্ব ৫২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here