দ্বিতীয় সূচনা পর্ব ৪১
আফসানা শোভা
–ও মাই গড মাহি৷ হোয়্যাট আ সারপ্রাইজ!
আয়নায় সামনে শরীরে বডি লোশন মাখতে থাকা মাহিরা ভ্রুকুটি করে শুধায়,
— হোয়্যাট হ্যাপেন্ডস রাজ?
রাজ সরগরম গলায় বললো,
— তোমার এক্স হাসবেন্ড দেখি বিয়ে সেরেছে কাল।
মাহিরার চলন্ত হাত যুগল থেমে যায় সহসা। শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়৷ হতবাক গলায় একপ্রকার চেঁচিয়ে বললো ,
— হোয়্যাট? কি বলছ তুমি? ঐক্য বিয়ে করে নিয়েছে মানে? কখন?
— এইতো কাল৷ দেখ সোশ্যাল মিডিয়া সয়লব দ্য গ্রেট বিজনেসম্যান ঐক্য চৌধুরীর দ্বিতীয় বিয়ের নিউজ দিয়ে।
বলে শব্দ করে হাসল রাজ। ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে ফের বললো,
— যাই বলো ঐক্য চৌধুরীর বৌ ভাগ্য ভাল। তুমিও সুন্দরী ছিলে, আর বর্তমান বৌটাও আগুন সুন্দরী!
মাহিরা রাজের হাত থেকে ফোনটা চিলের মতো ছোঁ মেরে নিয়ে নিল। ফোনটায় তাকাতেই থমকে দাঁড়িয়ে রইল দুপল। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে নতুন বর-কনের যুগল ছবি। ঐক্যের পাশে বধূ বেশে থাকা আবৃতিকে চিনতে ওর দু’সেকেন্ড সময় লাগল। মনে পড়ল ওয়াফার স্কুলে সাক্ষাৎ হওয়া স্বল্প পরিচিতা আবৃতির কথা। বিস্ময়ে বিমূঢ় বনে গিয়ে মাহিরা বিরবিরিয়ে আওড়ায়,
— এই মেয়েটার বাচ্চা ওয়াফার ক্লাসমেইট না? এই মেয়েটা ঐক্যর বৌ কিভাবে? আমার মাথায় তো কিছুই ঢুকছেনা।
মাহিরার শরীরটা মৃদু কাঁপছে। কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেনা ঐক্য সত্যি বিয়ে করে নিয়েছে।
রাজ তীর্যক হেসে বেড থেকে নামল কোমরে তোয়ালে পেঁচিয়ে। প্রেমিকার চোখে তার প্রাক্তনকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মৃদু আস্ফালন ওর অভিজ্ঞ দৃষ্টি এড়ালনা। আজ থেকে চার বছর আগে মাহিরাকে কিভাবে ম্যানিপুলেট করে ঐক্যের সাথে ডিভোর্স করিয়েছিল সেসব মনে করে ঠোঁটে কুটিল হাসি ফুটে উঠে৷ মাহিরার মনে এখনো এক্সের প্রতি একটা সফট কর্ণার রয়েছে সেটা সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত রাজ। শত হোক মাহিরার পাগলা প্রেমিক ছিল কিনা ঐক্য। কিন্তু ক্যারিয়ার, নেইম, ফেইমের নেশা মাহিরাকে ওর স্বামী-সন্তান ছাড়তে বাধ্য করেছে৷ অবলীলায় রাজের শয্যাসঙ্গিনী পর্যন্ত রয়ে গিয়েছে। রাজ জানে মাহিরা এখন ওকে আবার প্রেসার দেওয়া শুরু করবে বিয়ের জন্য। বিয়ে করো, বিয়ে করো বলে সেই একই মন্ত্র ঝপতে থাকবে। কিন্তু রাজ করবে এই ছলনাময়ীকে বিয়ে? অসম্ভব? রাজের ভাবনাই সঠিক হলো। হঠাৎ মাহিরা অস্বাভাবিক আচরণ করা শুরু করে। কেমন অপ্রকৃতস্থের মতো রুমের এ মাথা থেকে ও মাথা পায়চারি করে অস্থির গলায় বিরবির করে বলে,
— ঐক্য বিয়ে করে নিয়েছে। ও আমাকে জেলাস ফিল করাতে বিয়ে করেছে আই নো ভেরী ওয়েল। কি ভেবেছে ও? একটা বাইরের মেয়েকে ও আমার মেয়ের মা বানিয়ে দেবে? এত ইজি? আমি কোন একশন নিইনি দেখে ঐক্য খুব বাড় বেড়েছে রাজ৷ আমি ওকে দেখে নেব। ও কি করে ওই মেয়েটার সাথে সুখে থাকে আমিও দেখে নেব।
মাহিরা ফণা তোলা সাপের মতো ফোঁসফোঁস করছে। যেন এক্ষুণি কাউকে ছোবল মেরে বসবে নিজের বিষ দন্ত দিয়ে। রাজ চিবুকে হাত বুলিয়ে বিদ্রুপ চোখে
দেখছে মাহিরাকে। আপনমনে বিড়বিড় করে মাহিরা হঠাৎ রাজের সামনে দাঁড়িয়ে অস্থির চিত্তে বললো,
— ঐক্য আমাকে জ্বালাতে বিয়ে করেছে না? এবার আমিও ওকে দেখিয়ে দেব এই মাহিরার জন্য ওর থেকেও বেটার অপশনস আছে। রাজ চলো বিয়ে করে ফেলি।
রাজ কপাল কুঁচকে বিরক্তিকর গলায় বললো,
— মাহিরা কাম ডাউন৷ সবসময় বিয়ে বিয়ে কর কানের কানে ঘ্যানঘ্যান করবেনা।
মাহিরা উন্মাদিনীর মতো সেন্টার টেবিলে থাকা এলকোহলের বোতলটা হাতে তুলে নিয়ে মেঝেতে ছুঁড়ে মারল। গর্জে উঠে বললো,
— কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি রাজ। আমি পারবোনা আর এভাবে ঝুলে থাকতে। আমাকে তোমার বিয়ে করতেই হবে রাজ।
রাজ ফিক করে হেসে দিল। মাহিরা অবাক চোখে তাকিয়ে বলে,
— হোয়াই আর ইউ লাফিং? এখানে হাসার কি বলেছি আমি?
রাজ কোনমতে হাসি থামিয়ে কটাক্ষের সুরে বলে,
— তোমার কেন মনে হলো আমি তোমাকে বিয়ে করব?
মাহিরা হতভম্ব হয়ে আওড়ায়,
— মা..নে? তু..মি আমাকে ভালবাসো না রাজ?
রাজ অকপটে বললো,
— তোমার মতো মেয়েদের বড়জোর বেড পার্টনার করা যায়, বৌ নয়।
— রাজ!
মাহিরা বজ্রাহতের ন্যায় অস্ফুটে আওড়ায়।
— যে মেয়ে নিজের পাঁচ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করে স্বামী, দুধের শিশুকে ছেড়ে আসতে পারে। সেই মেয়ে যে আমাকে ভালবাসে এটার থেকে সেরা জোকস এই পৃথিবীতে দুটো নেই মাহিরা বেবস।
মাহিরার যেন আজ অবাক হওয়ার দিন। যেই পুরুষটার প্ররোচনায় মাহিরা নিজের ভালবাসাকে ছাড়ল, সন্তানকে ফেলে আসল, সেই কিনা আজ ওর দিকেই আঙুল তুলছে? ওকে হেয় করে কথা বলছে? মাহিরা ঢোক গিলে কোনরকম ভেঙ্গে ভেঙ্গে বলে,
— আমাকে ভিলেন বানিয়ে নিজে এখন সাধু সাজছ? তখন কে আমাকে কনভেন্স করেছিল আমার সব স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব সে নেবে?
— তো তোমার স্বপ্ন কি পূরণ করিনি আমি? দেখ, আজ তুমি একজন সফল মডেল হয়েছ কার বদৌলতে?
— তুমি আমাকে তখন কেবল ক্যারিয়ারের লোভ দেখিয়ে আমার সংসারটা ভাঙ্গনি রাজ। ভুলে গেলে? তুমি বলেছিলে ঐক্যর থেকেও আমাকে সুখে রাখবে, ওর মতো কথায় কথায় ডমিনেট করবেনা। তাহলে এখন উল্টো সুরে গান গাইছ কেন?
রাজ ভনিতা করলোনা,
— সত্যি বলতে তখন আমি তোমার রূপ থেকে পিছলে পড়েছিলাম। আর যেটা একবার রাজের দৃষ্টিতে ভাল লেগে যায় সেটা রাজ যেকোন মূল্যে নিজের করেই ছাড়ে। তোমাকে আমি সত্যি সুখে রাখব সোনা। যা চাইবে তাই পাবে। যদি আগের মতো আমার সুইট বেড পার্টনার হিসেবেই থেকে যাও।
মাহিরার চোখদুটো ছলছল করে উঠে। যার জন্য মাহিরা আজ সব হারিয়েছে সে কত সহজে না মাহিরাকে রক্ষিতা তকমা দিয়ে দিল। একটা ঢোক গিলে মাহিরা ভেজা গলায় বলে উঠে,
— রাজ আমি সত্যি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। তোমার শয্যাসঙ্গিনী অব্দি হয়েছি। তুমি..
রাজ কথা কেড়ে নিল,
— ও মাহিরা প্লিজ। এসব মেলোড্রামা বন্ধ করো। তুমি আমার বিছানা গরম করেছ তার বিনিময়ে আমি তোমার ক্যারিয়ার বিল্ড আপ করে দিয়েছি৷ এই যে বিলাসবহুল লাইফস্টাইল লিড করছ, ডোন্ট ফরগেট এটা আমার সুবাদেই করতে পারছ।
মাহিরা হঠাৎ ঘর কাঁপিয়ে হেসে দিল। ওর হাসির শব্দে
রাজের শিরদাঁড়া শীতল হয়ে যায়। কেমন গা ছমছমে ভুতুড়ে শুনতে হাসির শব্দটা। মনে মনে একটু ভীত হলেও রাজ বুঝতে দিলনা। নিজের অভিব্যক্তি আড়াল করে ভ্রু কুঁচকে থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করে,
— হাসছ কেন?
মাহিরা কোনমতে নিজের হাসি থামিয়ে বলে,
— হাতি কাঁদায় পড়লে, চামচিকাও লাঠি মারে।
— মানে?
মাহিরা হঠাৎ একটা অদ্ভুত কাজ করে। শরীর থেকে বাথ টাওয়ালটা খুলে ছুঁড়ে মারে। রাজের সামনে উন্মুক্ত হয় মাহিরার লাস্যময়ী নারী শরীরটা। রাজ বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রয়। মাহিরাকে দেখতে ওর মোটেও স্বাভাবিক মনে হচ্ছেনা। মাহিরার ঠোঁটে একটা বঙ্কিম হাসির রেখা ভেসে উঠে। চোখেমুখে অশনী চিলিক। যেন সাক্ষাৎ ডায়নি দাঁড়িয়ে আছে রাজের সামনে। মাহিরা নগ্ন শরীরে একদম রাজের সন্নিকটে এসে দাঁড়ায়। রাজের কাঁধে নিজের দুহাত উঁচিয়ে ঝুলে পড়ে। ঠোঁটে ক্রুর হাসি ফুটিয়ে বলে,
— তুমি কি ভেবেছ রাজ? তুমি ছাড়া এই মাহিরার কোন গতি নেই?
রাজ কিছু না বলে বিহ্বল হয়ে চেয়ে রয় মাহিরার ফর্সা কুটিল মুখটায়। মাহিরা বক্র হেসে নিজের শরীরটা দেখিয়ে বলে,
— এই আকর্ষণীয় শরীরটা দেখেছ। যে কোন পুরুষমাত্র আকাঙ্ক্ষার এই শরীর। যেমন ভাবে তুমি এই শরীরটায় পিছলের,তেমন ভাবে তোমার থেকেও বেটার কাউকে এই শরীরের মোহে জড়াতে এই মাহিরাকে বেশি একটা কসরত করতে হবেনা।
একটু থেমে ফের বলে উঠে,
— আর আমাকে টাকাপয়সার খোঁটা দিচ্ছ, তুমি জানো যেই ঐক্যকে আমি ছেড়ে এসেছি সে ঠিক কত কোটি টাকার সম্পদের মালিক। সে সম্পর্কে তোমার মিনিমাম ধারণা আছে? হ্যাঁ আমি মানছি আমি ক্যারিয়ারের লোভে ওকে ছেড়ে চলে এসেছি। ও যদি আমার স্বপ্ন, আমার ক্যারিয়ারের পথে বাঁধা হয়ে না দাঁড়াত তবে আমি কখনো তোমার মতো বস্তি থেকে উঠে হঠাৎ বড়লোক বনে যাওয়া লোকের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিতাম না।
— মাহিরা মাইন্ড ইওর ল্যাংগুয়েজ!
রাজ ধমকে বলে। ওর স্তব্ধ, হতবাক চোখে তাকিয়ে থাকে মাহিরার সুন্দর মুখটায়। কিন্ত আজ আর এই সুশ্রী চেহারাটা ভাল লাগলনা রাজের নিকট। বরং মনে হলো যেন ওর সামনে একটা পিশাচীমূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। মাহিরা রাজের ফর্সা গালে একটা চুমু খেয়ে ন্যাকামীর স্বরে বলে,
— বেবি, ল্যাংগুয়েজ খারাপ তো আগে তুমি করেছ আমাকে স্লাট বলে। কিন্তু আমার না তোমাকে ছাড়া চলবেনা। তুমি আমার জীবনে এসে ঐক্যকে ভুলিয়ে দিয়েছ। তোমাদের দুজনের মতো সুখ আমি আর কোন পুরুষের কাছে পাইনি বিশ্বাস করো।
রাগে গা জ্বলতে লাগল রাজের। দাঁত কিড়মিড় করে বললো,
— কিন্তু আমি এখন আর তোমাকে চাইনা। তুমি শুধুমাত্র আমার বিছানা গরম করার স্লাট মাত্র৷ আমার স্ত্রী সন্তান আছে।
অপমানে মুখ লাল হয়ে যায় মাহিরার। এই শয়তানটার জন্য কিনা ও ঐক্যের পাগলকরা ভালোবাসাকে পায়ে মাড়িয়ে এসেছিল,আর আজ ওকে শুনতেে হচ্ছে কিনা স্লাট? মাহিরার ক্ষিপ্রতা এবার চরমে উঠল। তর্জনী তুলে শাসিয়ে বললো,
— আমাকে তোমার বিয়ে করতেই হবে রাজ।
— না করলে কি করবে?
মাহিরা অপ্রকৃতস্থের মতো হেসে উঠে। হিসহিসিয়ে বলে,
— তোমার আর আমার সুখময় রতিক্রিয়ায় যতগুলো ভিডিও ক্লিপস আড ফটোস আছে সেগুলোতে আমার মুখটা ব্লার করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেব।
রাজ স্তব্ধ, নিশ্চল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মাহিরার কুটিল মুখটায়। মাহিরা রাজের বদলে যাওয়া ভীতু মুখটা দেখে বড় আনন্দ পেল মনে৷
— কি ভেবেছিলে? মাহিরাকে পুতুলের মতো খেলে আবার ছুঁড়ে ফেলে দেবে? না রাজ, তুমি এবার আর আমাকে ডাবল ক্রস পারবেনা। এবার আমি এমন কিছু করব যে তোমাকে যেকোন মূল্যে আমায় গ্রহণ করতেই হবে।
রাজ দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
— তোমাকে আমি দেখে নেব মাহিরা।
বলে রাজ হনহন করে ওয়াশরুমে চলে গেল। রাজ যেতেই মাহিরার মুখের ভাবভঙ্গি বদলে গেল। বিষন্ন
মাহিরা অস্থির চিত্তে জামাকাপড় পড়ে বেডে বসে নিজের মাথার চুল খামচে ধরল। অদ্ভুতভাবে ওর বুকে কেমন যন্ত্রণা হচ্ছে। ঐক্যকে স্বেচ্ছায় ছেড়ে আসলেও অন্য আরেকটা মেয়ের সাথে কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা। অসহ্য যন্ত্রণা মাহিরা হঠাৎ নিজের চুল খামচে ধরে। বুকে আফসোসের চিনচিনে ব্যাথা৷ হেলায় কি হারিয়েছে তা মাহিরা আজ হারে হারে টের পাচ্ছে। শত হোক দিনশেষে প্রতিটা মেয়েই চায় একটা সংসার হোক। ঐক্যের নিখাঁদ ভালবাসা পায়ে ঠেলে ওকে রাজের প্ররোচনায় পা দেওয়া উচিত হয়নি। যা ভুল হওয়ার হয়ে গিয়েছে। এখন রাজকে ছাড়া মাহিরার কোন গতি নেই। একটা পশ লাইফ লিড করতে হলে ওকে যোভাবেই হোক রাজকে হাত করতেই হবে। এই মডেলিংয়ের ভাত নেই, যদিনা রাজ মাহিরার হাতের মুঠোয় না থাকে।
চৌধুরী বাড়িতে আসল বাজটা পড়ল রাতে। তখন রিসেপশন শেষে চৌধুরী ভিলা খানিক শান্ত হয়েছিল। বড়িতে তখন কেবল নিকটাত্মীয়রা উপস্থিত ছিলেন। ঐক্যের ফুফু সন্ধ্যে নামার পরপরই সবাইকে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত থাকতে বললেন। বাচ্চাদের প্লে রুমে খেলতে বসিয়ে দিয়ে ঐক্য, আবৃতি নিচে নামল। মাথায় ঘোমটা টেনে আবৃতি কিচেনে গিয়ে সবার জন্য নিজের হাতে তৈরী করা ফুলকপির পাকোড়া আর চা নিয়ে আসে।
ঐশী একটা আপেলে কামড় বসাতে বসাতে সবে সবার সাথে বসতে যাচ্ছিল। এমন সময় একটা রামধমক আছড়ে পড়ল ওর উপর।
— তুমি এখানে কি করছ?
ঐশী বোকার মতো তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
— ফুফু আপনি না সবাইকে ডাকলেন?
— আমি ছোটদের এখানে ডাকিনি, যাও নিজের রুমে যাও।
ঐশী হতভম্ব হয়ে উঠে চলে গেল। আশ্চর্য ছোট মানে? ও কি ওয়াফা, আরশান নাকি?
ও যেতেই ওয়াহিদা মুখ খুললেন। এক পলক আনত মুখে ঐক্যের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আবৃতিকে পরখ করে বললেন রাশভারি গলায়,
— ভাবি ঐশীর বিয়ে দিচ্ছ না কেন?
জোবায়দা চৌধুরী চশমাটা ঠেলে অবাক দৃষ্টিতে তাকান ননদের দিকে। অবুঝ গলায় প্রশ্ন ছোঁড়েন,
— মানে? ওর তো বাগদান হয়েই গিয়েছে ওয়াহিদা। তুমি কিসের বিয়ের কথা বলছো।
ঐশী কানখাড়া করে নিল। আসলে ও তখন রুমে যায়নি। দোতলার মোটা পিলারের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এখানে কি কথা হচ্ছে শুনতে। কিন্তু ফুফুর মুখে নিজের বিয়ের কথা শুনে ও বিভ্রান্ত হয়ে গেল৷ বুঝলোনা তিনি আসলে কি বলতে চাইছেন।
— শোন ভাবি৷ যা বলার সরাসরি বলছি। প্রাপ্তবয়স্ক দু’জন ছেলেমেয়ের বিয়ে না দিয়ে বাগদান নামক ফালতু সম্পর্ক ঝুলে রাখা সমীচীন না।
ঐক্য তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ফুফুর ভাবভঙ্গি বোঝার চেষ্টা চালিয়ে গেল। জোবায়দা চৌধুরী বুঝলেন না ওয়াহিদা হঠাৎ ঐশীর বিয়ে নিয়ে পড়ল কেন।
— বিয়ে তো দেবই ওয়াহিদা৷ কিন্তু মেয়েটার ফাইনাল প্রফ সামনে, বোঝই তো এই সময়টায় বিয়ের ঝামেলাটা কতটা প্রভাব ফেলবে?
— ভাবি বিয়ে দেবেনা বুঝলাম। কিন্তু ছেলেমেয়ে যে অবাধ মেলামেশা করছে সেই খবর রেখেছ?
ঐশী আঁতকে উঠে। শীরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। ফুফু এসব কি বলছে? ঐক্য, আবৃতি এক পলক নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। ঐক্য খানিকটা বিব্রত ভঙ্গিতে বললো,
— ফুফু, এখন কি করতে পারি?
— কি করবে মানে? যথা শীঘ্রই ওদের সম্পর্কটা হালাল করার ব্যবস্থা করো। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ের বিয়ে না দিয়ে তোমরা কান্ডজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছ।
ঐক্য বলতে চাইল,
— বাট ফু..
আবৃতি ত্রস্ত ঐক্যের হাত খামচে ধরল। ঐক্য তাকালে আবৃতি চোখ দিয়ে ইশারা করে মানা করে ফুফুর মুখে তর্ক না করতে।
— আমার মনে হয় ফুফুর কথাটা আপনার একবার ভেবে দেখা উচিত ঐক্য।
— তোমরা সবাই এটা কিভাবে বলছ? সামনে ঐশীর লাইফের এত বড় একটা টার্নিং পয়েন্ট। আর এই সময়টায় বিয়ের ঝামেলায় ও ঢুকে পড়লে টোটালি নিজের গোল থেকে ডিসট্রাক্টেড হয়ে পড়বে আবৃতি।
আবৃতি স্বামীর পাশে বসল। ওর কাঁধে হাত রেখে বোঝানোর সুরে বললো,
— ঐক্য আপনি ভুলে যাচ্ছেন ঐশীর বাগদত্তা কিন্তু নিজেও ডক্টর। তাই আহানের কাছে ও পড়াশোনা থেকে মন সরে যাবে এই ভয়টা সম্পূর্ণ অমূলক।
ঐক্যকে খানিক ভাবুক দেখা গেল। আবৃতি আবার বললো অস্ফুটে,
— আর তাছাড়া ফুফুর কথাটা কিন্তু একদম সঠিক। বিয়ে বিহীন এরকম একটা ঝুলে রাখা সম্পর্কে দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েকে রাখা উচিত না।
ঐক্য থমথমে গলায় বললো,
— ওকে। আমি কালকে আম্মুর সাথে কথা বলে দেখি।
আবৃতি মুচকি হাসল। ঐক্য ওর হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ডাকল,
–আবৃতি?
আবৃতি সচকিতে বলে,
— জি।
ঐক্য ইতস্ততভাবে বললো,
— আমি আরশানকে লিগ্যালি আমার করে নিতে চাই।
আবৃতি চটক কাটার ন্যায় থমকে তাকাল। ওর বিহ্বল দৃষ্টি দেখে ঐক্য একটা শুষ্ক ঢোক গিলে বললো,
— আমি যদি আরশানকে আমার নামটা দিতে চাই, তোমার তাতে আপত্তি আছে কোন?
আবৃতি কি বলবে ভেবে পেলনা। ঐক্যের আচানক প্রস্তাবটা বড় অপ্রত্যাশিত ছিল। তবুও বললো ক্ষীণ কন্ঠে,
— ঐক্য আরশান তো আপনারই।
— আমি জানি আবৃতি। কিন্তু আমি চাই ইন ফিউচার কেউ আমার সন্তানের অস্তিত্ব নিয়ে কোন প্রকার প্রশ্ন তুলুক। আমি চাই ওকে মানুষ ঐক্য চৌধুরীর নামেই চিনুক।
আবৃতির চোখজোড়া ছলছল করে উঠে। এই জীবনে ওর আর কিছু কি পাওয়ার আছে? আবৃতির অশ্রুসিক্ত চোখ দেখে ঐক্যে পাগল হলো। ওকে আগলে আদুরে হাতে চোখের পানি মুছে বলে,
— কাঁদছ কেন তুমি? আচ্ছা আচ্ছা ওকে তোমার যেটা ইচ্ছে সেটাই হবে। হুম?
আবৃতি হঠাৎ ফুঁপিয়ে উঠলো,
— আপনি কেন আমার জীবনে প্রথম পুরুষ হলেন না ঐক্য?
ঐক্য সম্পূর্ণ স্তব্ধ, মূক হয়ে চেয়ে রইল। মুখ ফুটে উচ্চারণ করতে পারলনা কিছুই। আবৃতি ফের হাহাকার করে বলে উঠল,
— আমার আরশান তো আপনার সন্তান হয়েও জন্মাতে পারত? আমাদের জীবনে ওই কালো অধ্যায়টা না আসলেও পারত ঐক্য। আ..মি আমি শুধুমাত্র আপনার স্ত্রী হয়ে…
— হুঁশ!
আবৃতির ঠোঁটে আঙুল চেপে বললো ঐক্য। মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে মাথায় চুমু খেয়ে অস্ফুটে বললো,
— কেঁদনা আবৃতি। হয়তে তোমার জীবনে হয়তো প্রথম পুরুষ হয়ে আসার সুযোগ আমাকে উপরওয়ালা আমাকে দেননি, কিন্তু তিনি আমাকে একজন চমৎকার নারীর স্বামী আর একটা ফুটফুটে বাচ্চার পিতা হওয়ার তৌফিক করে দিয়েছেন। আমি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি জীবনের অন্তিম নিঃশ্বাস অব্দি এই বুকে তোমাদের আগলে রাখব। প্রমিজ!
— মে আই কাম ইন?
ওয়াফা, আরশান খেলা ছেড়ে পেছনে ফিরে তাকাল।
দেখে দরজায় তাদের পাপা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। আরশান উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলে উঠে,
— পাপা দেখ ওয়াফা মনির টয় হাউজটা কত সুন্দর?
ঐক্য হাসিমুখে এগিয়ে এসে ওদের সামনে ম্যাটে বসে পড়ল। আরশানকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে নরম সুরে বললো,
— তোমার পছন্দ হয়েছে বাবা?
আরশান চকচকে চোখে উপরনিচ মাথা নাড়ায়। ঐক্য ওর কপালে চুমু খেয়ে পকেট থেকে ফোনটা হাতে নেয়।
— দেখেতো বাবা, কোনটা নেবে?
ঐক্য নিজের ফোনটা আরশানের দিকে বাড়িয়ে শুধায়। আরশান যেন চাঁদ হাতে পেয়েছে অমন খুশি মনেই ওয়েবসাইটে টয়েস চুজ করতে লাগল। সাথে যোগ দিল ঐক্যের খেলনা লোভি সুযোগ্য কন্যাটি। পুরো রুম ভরতি খেলনা, যেই রুমটার নামই ওয়াফা’স টয় হাউজ। খেলনা দিয়ে ভরতি থাকার পরেও নিজেও আরশানের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে খেলনা চুজ করতে।
— কি করছেন আপনারা?
আবৃতি খাবারের প্লেট হাতে রুমে ঢুকতে ঢুকতে বললো।
ওর দিকে সবাই এমনভাবে তাকাল যেন আবৃতি তাদের কোন গুরুত্বপূর্ণ কর্মে এসে ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছে। আবৃতি প্লেটটা সামনে প্লে টেবিলটায় রেখে উৎসুক নেত্রে ঝুঁকে তাকায় ফোনে, দেখতে বাপ, বাচ্চারা মিলে এত মনোযোগ সহকারে আসলে কি করছে? কিন্তু ফোনে তাকাতেই আবৃতির চক্ষু চড়কগাছ! বিচ্চু দুটো প্রায় লাখখানেক টাকার মতো খেলনা অর্ডার করে ফেলেছে ইতোমধ্যে। কিছুক্ষণ থম মেরে থেকে আবৃতির শান্ত মাথাটা দপ করে জ্বলে। ফোনটা ছিনিয়ে নিয়ে আর্তনাদ করে বলে উঠে,
— হায় আল্লাহ! আপনি পাগল হয়েছেন ঐক্য? কি শুরু করেছেন ওদের সাথে? ওরা এমনভাবে টয়েস অর্ডার করছে যেন লটারি লেগেছে ওদের।
ওয়াফা মাম্মামের বকা থেকে বাঁচতে হুড়মুড় করে বললো,
— মাম্মাম আমি শুধু তিনটা ডল অর্ডার করেছি।
আবৃতি আরশানকে একটা ঝাঁড়ি মারে,
— আরশান? তুমি এতগুলে খেলনা দিয়ে কি করবে? পাপা বলেছে তাই বলে তুমিও সেটার সুযোগ নেবে?
— আহ, এভাবে বলছ কেন আবৃতি?সমস্যা কি সামান্য টয়েসই তো।
— সামান্য টয় কে লাখটাকার কেনে?
আরশান মাথা নিচু করে টলমলে চোখে নাক টানল। ঐক্যের শান্ত মেজাজটা এবার চটে যায়। দারাজ গলায় বলে,
— আবৃতি বাচ্চাদের আবেগকে কখনো টাকা দিয়ে মূল্যায়ন করবেনা। আমার বাচ্চারা ইচ্ছে করল কোটি টাকার টয়েস কিনবে।
ঐক্যের রাশভারী গলায় আবৃতি দমে গেল। হঠকারিতায় ঐক্যকে হার্ট করে ফেলেছে কি? অস্ফুটে বলে,
— না মানে এগুলো তো অপচয় ঐক্য। প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা খরচ করা তো ভাল কথা নয়।
— হোক অপচয়৷ আর কোনদিন ওদের এমন কথা বলবে না আবৃতি। এখন আমার ছেলেকে স্যরি বলো।
আবৃতির চোখ যেন কোটর ছেড়ে বেরিয়ে যাবে। হতবাক গলায় বললো,
— আমি এই পুঁচকে টাকে স্যরি বলব?
— হ্যাঁ বলবে। দেখ তোমার বকা খেয়ে ওর চোখে পানি জমেছে।
পাপার আহ্লাদে আরশান এবার ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে দিল। আবৃতি হতাশ চোখে দেখল ছেলের ঢং। ছেলে তার এমন ভাবে কাঁদছে যেন আবৃতি এই প্রথম তাকে বকে দিয়েছে। তবুও স্বামীর আদেশ চিরধার্য। তাই চুপচাপ আরশানকে কোলে টেনে বললো,
— স্যরি আব্বাজান। মাম্মামকে মাফ করে দিন। মাম্মাম আর কোনদিন আপনাকে বকবে না। আপনি চাইলে দশ লাখার টয়েসও কিনতে পারেন। আপনার পাপার অনেক টাকা।
শেষের কথাটায় ঐক্য সরু চোখে তাকাল। আবৃতি পাত্তা না দিয়ে খাবারের প্লেটটা হাতে নিয়ে বলল,
— আসো রাত নয়টা বেজে গিয়েছে।
দ্বিতীয় সূচনা পর্ব ৪০
আবৃতি দু’জনকে সামনে নিয়ে খাওয়াতে বসল। সকালে, আর দুপুরে ওরা নিজের হাতে খায়। রাতে আবৃতি নিজের হাতে একসাথে খাইয়ে দেয়। ঐক্য ওদের পাশে বসে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে দেখল। যে মেয়ে প্রতিদিন খেতে হাজার তাল বাহানা করত সে আজ দু’দিন কত তৃপ্তি সহকারে খাচ্ছে মায়ের হাতে। ঐক্যের মনে হঠাৎ ভীষণ আফসোস জাগল আবৃতির ন্যায়। ইশ যদি আবৃতি আরো চার বছর আগেই তার লাইফে আসত। তাহলে হয়তো তার মেয়েটাকে একমাস আইসিইউতে থাকতে হতোনা, অবহেলায় এর হাতে, ওর হাতে বড় হতে হতোনা
