নিবৃতা পর্ব ১১
নেহার ছায়ালিপি
ভীষন ব্যস্ততায় ঘেরা জায়গা। লোকসমাগমে পূর্ণ। চারপাশে মানুষের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। বাতাসে কফির গাঢ় ঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছে। আমোদপূর্ণ পরিবেশ। জানালার দিকের একটি টেবিল দখল করে নিয়েছে তাবিব। সহকর্মীদের সাথে আসলেও এখন তার কফির সঙ্গী সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন। যাকে তাবিব কখনো এখানে আশা করে নি। এজন্যই হয়তো জীবনকে এতোটা অননুমেয় বলা হয়। তাবিব চুপচাপ ওর ক্যাপাচিনো ভর্তি কাপে চামচ ঘোরাচ্ছে। দৃষ্টি সেখানেই একমনে নিবদ্ধ অথচ ওর সম্মুখে বসা মানুষটির নিরবিচ্ছিন্ন নজর ওর উপরেই নিপতিত। মুলত সেই ব্যক্তির ইচ্ছেতেই এখানে বসা হয়েছে। নতুবা তাবিব এসব এড়িয়ে যাওয়ার মানুষ। চোখের আড়াল হওয়া মানুষটি আজ তার মনেরও আড়াল হয়ে গিয়েছে। অনুভূতি কেমন নিস্পৃহ। তবুও যখন সেই মানুষটি অনুরোধ করে বললো,
– চলো একটু বসে কথা বলি।
তখন মানা করতে পারে নি তাবিব৷ হয়তো আত্মিক কিংবা মানসিক কোন টান না থাকলেও ওর জীবনের সবটা জুড়ে যার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে, তার সাথে থাকা সম্পর্কটি অস্বীকার করা ওর সাজে না। তাবিব অবুঝ নয়। তাই সব ধরনের পরিস্থিতি সামলে নিতেই তৈরি সে।
তাবিবকে এখানে, প্রথমে দেখে বেশ অবাক হয়েছিল আঁখি! এই দেশে মোটেও ওকে আশা করে নি সে! ভাগ্যক্রমে আজ এক দশকেরও বেশি সময় পরে তাদের দেখা। কেন যেন নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে নি। অনধিকার চর্চা করে আটকে দিয়েছে তাবিবকে। এই যে, এই মুহুর্তে ওর সামনে বসে থাকা পুরুষটিকেই দেখে চলেছে ও। সাথে চোখকে বিশ্বাস করতেও বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। মস্তিষ্ক এক অজানা ঘোরে ডুবে যায়, যার স্রোতে ও ভেসে চলে যায় সেই অতীতে, যখন তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল!
ইন্টার পরীক্ষা সবে শেষ হয়েছে ওদের। এবং এর এক সপ্তাহের মাঝেই ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোচিং শুরু হয়ে গিয়েছে। পড়ালেখা নিয়ে কখনও তেমন একটা তৎপর ছিল না আখি। করতে হবে বিধায় করতো। কারণ বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে হিসেবে সে ছিল ভীষন আদরের। যদ্দরুন কিছুটা জেদি ও আত্ম কেন্দ্রীক মনোভাবের ছিল ও। যা চাইতো, চাওয়ার আগেই পেয়ে যাওয়া ছিল ওর জন্য অতি স্বাভাবিক বিষয়। আভিজাত্যে বড় হওয়া ও ছিল কিছুটা অহংকারীও।
প্রথম যেদিন কোচিং ক্লাসের জন্য এলো, সেদিন ছিল ঘোর বর্ষা! রাস্তা ঘাটে কাদা পানি জমে একাকার অবস্থা। এরূপ বৈরি পরিস্থিতিতে যখন আঁখিদের প্রাইভেট কার এসে কোচিং গেইটের সামনে এসে থামলো তখনই এক কান্ড ঘটে গেলো। দ্রুত গতিতে ব্রেক করার কারণে কাঁদা পানি ছিটে গিয়ে পরলো পাশে দাঁড়ানো এক ছেলের গায়ে। আঁখিদের বিনয়ী ড্রাইভার তার দোষ স্বীকারে তৎক্ষনাৎ নেমে গেলেন গাড়ি থেকে। আঁখি বিষয়টি তেমন আমলে নেয় নি। নিজের মতোন করে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে যখন বেরিয়ে এলো তখন ওর চোখ না চাইতেও আঁটকে গেলো সম্মুখে।
সুদীর্ঘ উচ্চতার একটি ছেলে দাঁড়িয়ে। শ্যাম বর্ণের লম্বাটে একটি মুখ। সরু উঁচু নাক। যার উপর মোটা ফ্রেমের একটি চশমা সদর্পে বসে আছে। গায়ে টি-শার্ট ও জিন্স। চুলগুলো ভদ্র ছেলেদের মতো একদম পরিপাটি করে রাখা। কাঁধে ব্যাগ ঝুলানো। পুরো অভিব্যক্তিতে নেই কোন জটিলতা বা জৌলুশ। একদম সাদামাটা, সাধারণ গোছের। চাহুনি বেশ বাচ্চা সুলভ। পরনে থাকা গোলাপী টি-শার্টটার একদম মাঝ বরাবর বড় করে এক ছোপ কাঁদার দাগ স্পষ্ট! ওর কাছেই ড্রাইভার বারংবার তার কাজের জন্য দুঃখ প্রকাশ করছেন। বিব্রতকর এক পরিস্থিতির শিকার হয়েও ছেলেটার মুখে তখন কোন প্রকার অস্বস্তি কিংবা বিরক্তির ছায়া পর্যন্ত ছিল না। বরঞ্চ ঠোঁটে ছিল সরল এক হাসি। হাত নেড়ে নেড়ে আশ্বস্ত করার অভিপ্রায়ে বলছে,
– সমস্যা নেই তো আঙ্কেল। এরকম একটু আধটু ভুল হয়ই। আপনি শান্ত হন। আমি কিছু মনে করি নি।
– তোমাকে বিপদে ফেলে দিলাম বাবা।
– কিসের বিপদ? ওয়াশরুমে গিয়ে পরিষ্কার করে নিবো।
কোন ক্ষোভ নেই সেই কন্ঠে! একটু নির্বোধ যেন! আঁখি ঐ পরিস্থিতিতে, ছেলেটির জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে বুঝলো, এতক্ষণে সে থাকলে বড়সড় এক দাঙ্গা বেঁধে যেতো এখানে। বাবাকে কল করে, নাকের পানি চোখের পানি এক করে নালিশ জানাতো। এরপর আরও কত কি যে ঘটতো! পুরো দমে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে তবেই ছাড়তো। ছেলেটির সারল্যতায় ও মোটামুটি মুক বনেই গিয়েছিল। এরপর যখন সে ভেতরে চলে গেলো, তখন আঁখিরও ধ্যান ভাঙে। চুপচাপ ক্লাসে গিয়ে বসে থাকলেও, পর মুহুর্তে আবারও চমকে উঠে৷ ছেলেটা ওদের ক্লাসেই এসেছে। ঠিক গিয়ে আঁখির সম্মুখ বেঞ্চে বসেছে৷ এরপর আর জানা নেই আঁখির কি হলো, বাকি ক্লাসে ওর আর পড়ায় মন বসলো না৷ না কানে কিছু শুনলো। শুধুমাত্র আড়চোখে ঐ সরল, বোকা বোকা মুখটাই দেখে চললো সারাটা সময় ধরে।
বারো বছর আগে দেখা সেই অপরিপক্ক, শিশু সুলভ গরনের মুখটি আজ আর নেই। তার পরিবর্তে সেখানে রয়েছে, সুদর্শন নিরেট একটি চেহারা। দুরদর্শীতা পূর্ণ দুটি চোখ ও পরিপক্ব অভিব্যক্তি। আচরণে বেশ গাম্ভীর্যতা। ছেলেদের শারীরিক পরিবর্তন একটু দেরি করেই ঘটে, সেটারই আজ চাক্ষুষ প্রমাণ পেলো আঁখি। বিশের তরুণ তাবিব ও বত্রিশের সুপুরুষ তাবিবের মাঝে বিস্তর ফারাক রয়েছে। ও আজও সেই প্রথম দিনের মতো মুগ্ধ হলো। কিছু মানুষদের জন্মই বোধহয় আমাদের বারংবার মুগ্ধ করার জন্যই হয়! এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো আঁখি। হাতের সাহায্যে কোল্ড কফির স্ট্র নাড়াতে নাড়াতে বললো,
– তা মেলবোর্নে কি কাজে এলে?
সেই একই কন্ঠস্বর! পরিবর্তন তেমন আসে নি। তাবিব এ যাত্রায় চোখ তুলে তাকায়। সম্মুখে বসে থাকা বত্রিশের নারীর উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে একবার। উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের মুখটায় সামান্য বয়সের প্রতিফলন বোঝা যাচ্ছে। বাদবাকি বেশভূষায় আধুনিকতার ছোঁয়া। পাশ্চাত্য ছাপ। সবসময়ের মতো এবারও ওর বাহ্যিক ছায়ায় অভিভূত হলো না তাবিব। একটুও না। পরপর চোখ সরিয়েও নিলো। পর নারীর দিকে তাকালেও, তাকে দেখতে চায় না ও। কফির কাপে এক চুমুক বসিয়ে ভারি গলায় বলে,
– ফেলোশিপের জন্য এসেছি।
আঁখি বেশ অবাক হলো। কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বললো,
– ওয়াও! এফসিপিএস কিসের উপর করেছিলে?
– ওনকোলজি।
– তাই? তোমার ইচ্ছে না মেডিসিন ছিল?
সে কি তার অসাধারণ স্মৃতির ধারণ ক্ষমতা ব্যক্ত করার প্রচেষ্টায়? তাবিব স্মিত হাসলো শুধু।
– গোটা মানুষ পরিবর্তন হওয়া যেমন খুবই সাধারণ একটি বিষয় সেখানে ইচ্ছে আর তেমন কি?
এরূপ কথায় আঁখির মাঝে থাকা প্রাঞ্জলতা কিছুটা মিইয়ে এলো। ক্ষীণ হাসার চেষ্টা করে বললো,
– না বলতে চাচ্ছিলাম যে, আন্টির ট্রিটমেন্ট প্রসেস দেখে তো তুমি খুব ভয় পেয়েছিলে। তাই ভেবেছিলাম ক্যান্সার বিষয়ক কোন বিষয়ের কাছে যাবে না তুমি।
– ভয়কে জয় করা শিখতে হয়। নতুবা জীবন যুদ্ধে আমাদের পিছিয়ে যেতে হয়। আর আমি সেটা চাই নি।
তাবিবের গোটা ব্যক্তিত্বে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে। কথার মাঝে কি দৃঢ়তা! নিরেট তার ভাবভঙ্গি! এখন আর ওকে যা তা বলে থামিয়ে দেওয়া যাবে না। আঁখি কিছু পলের জন্য চুপ হয়ে গেলো। তাই তাবিবই কথা বাড়ালো।
– তোমার কথা বলো। এখানে স্থায়ী?
– হ্যা। আমার হাজবেন্ড অস্ট্রেলীয়।
– গট কিডস?
আঁখি কিছুটা নিভু কন্ঠে বলে উঠলো,
– এক ছেলে এক মেয়ে।
ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো তাবিব। স্বাভাবিক গলায় বললো,
– কমপ্লিট ফ্যামিলি। গুড ফর ইউ।
অস্বস্তি হলো আঁখির। নিজের দ্বিমুখীতা এভাবে সামনে চলে আসায় কুণ্ঠিত বোধ করলো। পরপর কোল্ড কফিতে গলায় ভিজিয়ে রয়েসয়ে বললো,
– তানহা কেমন আছে?
আজ এতো বছর পর, তানহার খবর নেওয়াতে তাবিবের মাঝে ভীষন জেদ চাপলো। ইচ্ছে করলো কিছু কটু কথা শুনিয়ে দিতে। কিন্তু ও তেমন কিছুই করলো না। পর মানুষের সাথে রাগ নামক অনুভূতিটি সংগতিপূর্ণ নয়। বরঞ্চ নিজেকে আরও নিচু করা হয় এতে৷
– অনেক ভালো আছে।
আঁখির চোখদ্বয় কেমন চকচক করে উঠলো। আগ্রহ নিয়ে বললো,
– এখানের কোন স্কুলে দিয়েছ ওকে?
– উহুম! ওকে এখানে আনি নি। দেশেই আছে।
অবাকত্বের চূড়ায় পৌছালো যেন। হতভম্ব গলায় বলে,
– তুমি আমার ওতোটুকু মেয়েকে বাংলাদেশে একা রেখে এসেছ? তোমার তো কেউ নেইও সেখানে। কিভাবে পারলে?
– নিজেকে কি সবার মতো ভেবেছ?
নিস্পন্দ চোখে তাকিয়ে শীতল স্বরে প্রশ্ন করে তাবিব। আঁখি দমে না গিয়ে বলে,
– পুরোনো কথা টেনে এনে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে না। কিভাবে রেখে এলে ওকে?
তাবিবের কালো মনি দ্বয় বোধহয় ক্ষনিকের জন্য জ্বলে উঠলো। দাম্ভিক সুরে বললো,
– আমার মেয়ে তার অত্যাধিক পছন্দের একজন মানুষের সাথে আছে। অত্যন্ত বিশ্বস্ত দুটো হাত ওর দায়িত্ব গ্রহন করেছে। ওর সবচাইতে আপন কেউই ওকে আগলে রেখেছে।
– কে সে?
– ওর আম্মু।
তাবিবের মুখে সেই সুন্দর স্নিগ্ধ এক হাসি৷ যেই হাসি আগে ওর নিত্য দিনের সঙ্গী ছিলো। এই মানুষটির কথা বলতে গিয়েই তাবিব এতো খুশি হয়েছে? আঁখি নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে থাকলো কিয়ৎক্ষণ। মনে হচ্ছে বুকের ভেতরে কিছু একটা আচমকাই ফাঁকা হয়ে গেলো। ভারি হয়ে আসা কন্ঠে বললো,
– বিয়ে করেছ?
– আলহামদুলিল্লাহ।
হাসিটা যেন আরও প্রশস্ত হলো। যা কাঁটার মতো বিধলো আঁখিকে। তবুও নিজেকে সামলে কিঞ্চিৎ কঠোর গলায় বললো,
– নিজের জন্য স্ত্রী এনেছ, মেয়ের জন্য মা নয়।
তাবিব তাচ্ছিল্য হাসলো।
– আমার মেয়ে নিজের মা’কে নিজে পছন্দ করে এনেছে৷ আর জানো কি? ও আমাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে।
আঁখি ভ্রু কুচকে বলে,
– কি?
– ওর পছন্দ বেশ ভালো। যাকে বলে একদম এ ওয়ান! নিজের জন্য মা তো এনেছেই, সাথে আমার জন্য আদর্শ সঙ্গীনিও নিয়ে এলো। আসলে ও বুঝে গিয়েছিল যে, ওর বাবা এসব কাজে ভীষন কাঁচা। আমাকে দায়িত্ব দিলে দেখা যেত, আবার কাকে না কাকে পছন্দ করে নিয়ে এসেছি। একদম বাজে চয়েস যে আমার!
ঘুরিয়ে প্যাচিয়ে করা অপমানে আঁখির মুখটা আধারে ছেয়ে গেলো। থমথমে হয়ে উঠলো পুরো অবয়ব। ও হাত দুটো মুষ্টিযুদ্ধ করে বললো,
– আমি আমার মেয়ের চিন্তায় এসব বলেছি।
– দু’মাস বয়সী তানহার জন্য যখন চিন্তা হয় নি, তাহলে এখন সেই চিন্তা বেমানান। আর বারবার ওকে নিজের মেয়ে বলে দাবি করবে না।
– আমি ওকে জন্ম দিয়েছি।
– কিন্তু আফসোস! তুমি যদি আজ ওর সম্মুখে গিয়ে দাঁড়াও ও তোমাকে চিনবেই না! আর মা বলে শুধুমাত্র আমার স্ত্রীকেই সম্বোধন করবে। তাই শুধু শুধু এই মতভেদে তর্ক কার কোন প্রয়োজনই আমি দেখছি না।
আঁখির চোখদুটো কেমন ভিজে এলো। ভাঙা গলায় বললো,
– আমি ওর সাথে নেই এর মানে এই নয় যে আমি ওর পরোয়া করি না। আর সত্যি বলতে আমি তোমাকেও কিন্তু অপছন্দ করি না। আফটার ওল, ইউ ওয়্যার মাই ফার্স্ট লাভ!
– ডোন্ট ইউজ দ্যাট ওয়ার্ড ফর মি। মোহ এবং ভালোবাসার মাঝে থাকা পর্দাটা খুবই ভারি। সেটাকে গুলিয়ে ফেলো না। আই ওয়াজ জাস্ট ইউর ফ্যান্টাসি। নাথিং এলস্! এবং এই ফ্যান্টাসি পুরণের জেদে তুমি আমার এবং আমার মেয়ের জীবনকে জটিল করে দিয়েছিলে। তাই এটাকে পরোয়া কিংবা ভালোবাসা বলবে না। তুমি শুধু নিজেকেই ভালোবাসো। এবং আজও সেটা পরিবর্তন হয় নি।
তাবিবের কঠোর গলায় বলা শব্দগুলো আঁখিকে নাজেহাল করে তুললো। কাতর গলায় বললো,
– তাবিব শুনো….
– পরপুরুষকে নাম ধরে ডাকবে না। তুমি আমার জীবনের বিষাক্ত এক অধ্যায়। আমার মেয়ের কারণে তোমাকে কখনও ভুলতে পারবো না, কিন্তু তোমার উপস্থিতি আমার জন্য অসহনীয়। এরজন্য নয় যে, পুরোনো কথাগুলো মনে পরে যায়, বরঞ্চ এজন্য যে, এরূপ স্বার্থপর ও নিচ মানসিকতার একটি মানুষের সাথে কথা বলতেও আমার রুচিতে বাঁধে। সো প্লিজ, গেট আউট অফ মাই আইসাইট!
কঠিন অপমান ও লাঞ্ছনায় আঁখির সমস্ত বদন জ্বলে উঠলো। গাল গড়িয়ে টপটপ করে অশ্রু কণা ঝরতে শুরু করলো। আর পারলো না বসে থাকতে। এক ছুটে টেবিল থেকে উঠে চলে গেলো। তাবিব তখনও নির্বিকার মুখে বসে। যেন কিছুই হয় নি৷ ও চুপচাপ কতক্ষণ সেভাবেই বসে রইলো। এরওর হঠাৎ পাশ থেকে মোবাইলটি তুলে নিয়ে গ্যালারিতে চলে গেলো। খুঁজে বের করলো বিশেষ সেই ছবিটি। আড়াল থেকে, তার অনুমতি ব্যতীত তোলা সেই অপরূপ দৃশ্যখানি। তাবিব সেখানে তাকিয়েই রইলো। চোখের পলক অবদি পরলো না। মুহুর্ত গড়ায়। একসময় ঠোঁটের প্রান্ত ছেয়ে যায় চওড়া এক হাসিতে। আরামে চোখ মুদে বসে রয় চুপচাপ। কিন্তু অন্তঃকরণে বয়ে চলা অনুভূতির জোয়ার আটকে রাখতে ব্যর্থ হয় ও। কোনকিছু চিন্তা না করেই মিসেস তানজিব’ নামে সংরক্ষণ করা নম্বরটিতে কল করে কানে ঠেকায় মোবাইলটি।
তানহা এসময় স্কুলে থাকে। আর নিবৃতা কাজে সাহায্যকারী খালার সহায়তায় টুকটাক রান্নাবান্না করে। সাথে ঘরের কাজগুলোও গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এসবে ও পটু না হলেও, একদম উপেক্ষা করার মতোও নয়। ও শিখছে। বেশ আগ্রহের সাথেই শিখছে এবং নিষ্ঠার সাথে করার চেষ্টায় আছে৷ খুব বেশি দেরি নেই, যখন চুলো জ্বালাতে হয় না একা একাই জ্বলে, সেটা না জানা অজ্ঞ মেয়েটাও পাকা এক গিন্নি হয়ে যাবে!
তাবিবের উপহার দেওয়া মোবাইলটি যখন সশব্দে বেজে উঠলো তখন তাবিবের ঘর পরিষ্কারেই ব্যস্ত ছিল নিবৃতা। শেল্ফে থাকা ভারি ও মোটা মোটা বইগুলো এক একটা করে মুছে দিচ্ছিলো ও। এগুলো বেশ যত্নে রাখে ও। কেউ বলে নি ওকে এসব করতে। এমনকি তানহাও মনে করিয়ে দেয় নি আর। তবুও ঠিক কি কারনে বা কিসের টানে ও নিজ থেকেই এই কাজটি স্বাচ্ছন্দ্যে করে, সেটা অজানা। মোবাইলের শব্দ পেয়ে হাতের বইটি রেখে আসে ও। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে মিস্টার তানজিব’ নামক লোকটা কল করছে। নিবৃতা কিছুটা অবাক হয়৷ এই সময়ে মানুষটা কখনও কল করেন না। কাজে ব্যস্ত থাকেন যে। ও শুষ্ক একটা ঢোক গলাধঃকরণ করে কলটি রিসিভ করে।
– কি করো?
প্রথম প্রশ্নই এটা। অন্যান্য সময়ে প্রথমে সালাম আদান প্রদান হয়। ভালো মন্দ খবর জানা হয়৷ তারপর অন্য দিকে কথা পৌছায়। নিবৃতা সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে শেল্ফের দিকে একবার তাকিয়ে বলে,
– আপনার বইগুলো পরিষ্কার করছিলাম।
এরকম কোন উত্তর কি তাবিব আশা করেছিল? না হয়তো। ও মৃদু হেসে বলে,
– তানহার পাগলামিতে সায় দিতে হবে না। ওভাবেই রেখে দাও সমস্যা নেই।
– না না। ঝিলমিল কিছুই বলে নি। আমি তো…
নিবৃতা থেমে গেলো আচমকা। অথচ এবার উত্তর শোনার জন্য তাবিবের কান দুটো মরিয়া হয়ে উঠলো। ও আগ বাড়িয়ে বললো,
– তুমি কি?
নিবৃতা লম্বা এক শ্বাস নিয়ে নত গলায় বললো,
– নিজের ইচ্ছেতেই।
সামান্য একটি বিষয়। তবুও তাবিবের মনটা ভালো লাগায় ছেয়ে গেলো। হয়তো নিবৃতার মতো চাপা স্বভাবের মেয়ের কাছ থেকে এতোটুকু পাওয়াও অনেক।
– দায়িত্ব যেহেতু নিয়েছই তাহলে বলবো, ওরা আমার খুব যত্নের।
– আচ্ছা।
হ্যা তে হ্যা মিলানোর স্বভাব। এরকমটাই হয়। তাই তাবিব এবার অদ্ভুত গলায় বলে,
– একটা কথা জানানোর জন্য কল করেছিলাম।
– জ্বি।
– জানতে চাইবে না কি?
নিবৃতা দু’ঠোট চেপে ধরলো সহসা। অস্ফুটে বললো,
– বলুন।
তাবিব চেয়ারে পীঠ এলিয়ে দেয়। দু’চোখ বন্ধ করে শান্ত কন্ঠে বলে,
– আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি নিবেদিতা।
এতটুকুই। তৎক্ষনাৎ কলটা কেটে গিয়েছে। নিবৃতা আহাম্মক বনে দাঁড়িয়ে রইলো কতক্ষণ। এরপর যখন বুঝে আসলো তখন মোবালটি কান থেকে সরিয়ে নিলো। ভালোবাসা? বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলো শব্দটি। এক বার দুই বার। বেশ কয়েকবার। এই শব্দটির অর্থ ঠিক কি? অনুভূতিটি ঠিক কেমন? অনুভব করতে কেমন লাগে? ও জানে না। বুঝেও না। তবে আজ এতোটুকু জেনে রাখলো যে, তাবিব ওকে একটু বেশিই পছন্দ করে ফেলেছে? কিন্তু কেন? নিবৃতার মাঝে কি পেলো সে? সময় গড়াতেই, একটু একটু করে নিবৃতার শুভ্র মুখটা কালসিটে হয়ে এলো। ঠোঁট জোড়া কাঁপতে কাঁপতে একসময় অক্ষিকোল ঝাঁপিয়ে নোনতা জলের ধারা বইতে শুরু করলো গাল বেয়ে।
বেলা এগারোটা পেরিয়ে গিয়েছে। নিজেকে সামলে নিবৃতা তৈরি হয়ে নিয়েছে। তানহাকে স্কুল থেকে নিয়ে আসতে যেতে হবে ওকে। দরজা আঁটকে যখন নিচে নেমে এলো তখন সবসময়ের মতো গাড়ির সম্মুখে চেনা মানুষটিকে পেলো না। চোখ নিচের দিকে রেখেই বুঝলো আজ অন্য কেও এসেছে। কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেলো ও। তবে আগ বাড়িয়ে কিছু বলার আগেই আগত লোকটি বললেন,
– আসসালামু আলাইকুম ম্যাডাম। লিটন ভাই আজ একটু অসুস্থ। তাই তার জায়গায় আমি এসেছি আজ।
নতুন কেউ! নিবৃতার মনে একটু খটকা লাগলো। কিছু না বলে শুধু নীরবে মাথা নাড়লো। কেমন যেন লাগছে। অচেনা এক অনুভূতি। তবুও নিজেকের দমিয়ে রেখে ও উঠে বসলো গাড়িতে। নতুন লোকটিও নিজের মতো গাড়ি চালানোতে মনোযোগ দিলেন। তবে এর মাঝেই হঠাৎ করেই অস্বস্তি অনুভব হলো নিবৃতার। মনে হচ্ছে কেউ ওর দিকে তাকিয়ে আছে! অজানা কারণেই গায়ের লোম দাড়িয়ে গেলো। তাকাবে না তাকাবেনা করেও যখন সরাসরি তাকালো তখন দৃষ্টি গিয়ে পরলো ফ্রন্ট মিররে। সেখানে নিপতিত এক জোড়া চোখ ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। কেমন ভাসা ভাসা সেই নজর। ও তৎক্ষনাৎ চোখ সরিয়ে নিলেও বুকটা সহসা খামচে উঠলো। লোকটা এভাবে ওর দিকে তাকিয়ে আছে কেন? কেমন অস্থির অস্থির লাগছে। ভয়ে হাতের তালুও ভিজে উঠলো তখন।
নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করেও পারলো না। আড়চোখে আবারও তাকিয়ে বুঝলো, লোকটা এখনও ওর দিকেই চেয়ে আছে। সাথে সাথে গলা শুকিয়ে এলো ওর। কি হচ্ছে এসব? বার কয়েক শুষ্ক গলা ভেজানোর চেষ্টা করে বাহিরে তাকালো। এভাবে যদি নিজের মনোযোগ সরানো যায়। কিন্তু আজ বোধহয় ভাগ্য ওর সাথে নেই। কিছুদূর যেতেই গাড়ি এক অচেনা রাস্তায় প্রবেশ করলো। প্রতিদিন স্কুলে যেতে যেতে পথের দিক দিশা মুখস্থ হয়ে গিয়েছে ওর৷ তাই যখন চারপাশে তাকিয়ে কিছুই চিনতে পারলো না তখন নিজেকে চূড়ান্ত অসহায় রূপে আবিষ্কার করলো ও। ডান হাতটা ইতিমধ্যে কাঁপতে শুরু করে দিয়েছে।
নিবৃতা পর্ব ১০
অত্যন্ত বাজে ভাবে। ওর মাথায় শুধু ঘুরছে, কেন আবারও? কেন? অস্থির হয়ে গাড়ির চারপাশে চোখ বুলায়। নাহ! কিছুই মাথায় আসছে না। উল্টো মস্তিষ্কে কেমন ভোঁতা যন্ত্রণা হচ্ছে। সব কেমন ঝাপসা লাগছে। গলা শুকিয়ে চৌচির। মনে হচ্ছে এখনই চেতনা হারিয়ে ফেলবে। এরপর ও হয়ে উঠবে একদম নিরুপায়! কোন পথ খোলা থাকবে না আর। শরীরের সমস্ত শক্তি যখন নিঃশেষ হয়ে এলো তখন শরীরটা পেছনের দিকে হেলে পরলো। নিজের এহেন দুর্বলতায় ভর্ৎসনা জাগলো। এরপর দু’চোখ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পূর্বে শুধু বিড়বিড়িয়ে বললো,
– ঝিলমিল!
