নিবৃতা পর্ব ১২
নেহার ছায়ালিপি
চোখের সম্মুখে সবটা গহন আঁধার। মস্তিষ্ক জুড়ে কেমন ভোঁ ভোঁ শব্দ হচ্ছে। এক পাশে বেশ চাপা একটা ব্যথা হচ্ছে। কর্ণকুহরে কেমন চেনা জানা এক কন্ঠস্বর ভেসে আসছে। কপাল কুঁচকায় সে। মুখের উপর শীতল কিছু এক ঝাপটা লাগছে।
– আম্মু! আম্মু!
রুগ্ন, ভগ্ন ও ভীত সেই স্বর। স্পষ্ট উদ্বেগ বিদ্যমান। নিবৃতার চেতনা ধীরে ধীরে ফিরে আসে। অক্ষি পল্লব তিরতির করে কেঁপে উঠে সহসা। গালে কেউ পরম কোমলতায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। মস্তিষ্ক সজাগ হতেই ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে ও। দিশেহারার ন্যায় চারপাশে চোখ বুলাতেই প্রিয় সেই মুখটা নজরে পরে। তানহা ক্রন্দনরত মুখে তাকিয়ে ওর দিকে। ওর এক বাহু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে নিবৃতাকে। এখন ওকে ঠিক দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারলো না মেয়েটা। সোজা মা নামক আশ্রয়ে হামলে পরে। নিজেকে ভার মুক্ত করে ভাঙা ভাঙা শব্দে বললো,
– তোমার কি হয়েছিল আম্মু? আমি তো অনেক ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
অজান্তেই ওকে নিজের সাথে আগলে নেয় নিবৃতা। ওকে শান্ত করার লক্ষ্যে পীঠের উপর ভরসার হাত বুলিয়ে দিতে থাকে, অথচ নিবৃতা নিজেও এখনো ধাতস্থ হয়ে উঠতে পারে নি। বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করছে। মুখটা কিঞ্চিৎ হা করে বড় বড় করে শ্বাস ছাড়ছে। অস্থিরতাকে কাবু করে, আসেপাশে নজর বুলিয়ে বুঝে সে গাড়ির ভেতরেই আছে৷ বুকে তানহা আর পাশেই বোধহয় স্কুলেরই একজন শিক্ষিকা। নিবৃতা চেনে উনাকে। নিবৃতাকে তাকাতে দেখে উনি বিনয়ী হেসে বলেন,
– তুমি ঠিক আছো নিবৃতা? অসুস্থ বোধ করছিলে?
বার কয়েক পলক ঝাপটে নিজেকে সামলায় নিবৃতা। ঢোক গলাধঃকরণ করে গলা ভিজিয়ে বলে,
– জি ম্যা’ম।
– বাসায় যাবে না হাসপাতালে?
– বাসায়ই যাবো। ঠিক আছি।
– আচ্ছা। সাবধানে যেও তাহলে।
– জ্বি।
শিক্ষিকা বেরিয়ে যেতেই নিবৃতা এক লম্বা শ্বাস ছাড়ে। অতঃপর অসহায় চোখে তাকায় তানহার দিকে। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
– আমি ঠিক আছি ঝিলমিল।
নিবৃতাকে পাল্টা আরও জোরে আঁকড়ে ধরে তানহা৷ মিইয়ে যাওয়া স্বরে বলে,
– আমি অনেক ভয় পেয়েছিলাম।
– আমিও।
ঝট করে সরে আসে তানহা। জানতে চেয়ে বলে,
– কি?
গোল গোল চোখে কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ সরায় নিবৃতা। তানহা ছোট মানুষ। ওর কাছে বিষয়টা এড়িয়ে যেতে হবে। ও কথা ঘুরিয়ে বললো,
– তুমি কখন এসেছ?
– আমি তো দাঁড়িয়ে ছিলাম। যেই গাড়ি এসে থামলো ওমনি আমি দৌড়ে এসেই তোমাকে ডাকলাম। প্রথমে ভেবেছি ঘুমিয়ে গিয়েছ। কিন্তু এর পরেও যখন তুমি কোন জবাব দিলে না তখন ভয় পেয়েছি।
নিবৃতা কিছুক্ষণ আহাম্মকের মতো তাকিয়ে থাকলো। আজ তো নিজের সমাপ্তি আশা করেছিল ও। কিন্তু মাঝে পরিস্থিতি এমন পাল্টে গেলো কেন? ওর মাথা কাজ করছে না। ওকে এভাবে অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে তানহা বলে,
– ড্রাইভার আঙ্কেলকে ডাকবো? চলো বাসায় যাই। তুমি অসুস্থ।
ড্রাইভারের নাম শুনে ভেতরটা আবারও কেঁপে উঠলো নিবৃতার। মৃদু আঁতকে উঠে বললো,
– না না৷ তাকে ডাকবে না।
– তাহলে?
তানহার বোকার মতো তাকিয়ে আছে যা দেখে অপ্রস্তত হাসলো নিবৃতা। নিজেকে ঠিক করতে করতে বললো,
– রিক্সায় যাবো আজ। খোলা আকাশের নিচে ঘুরবো।তুমি ফুচকা খেতে চাও না? সেটাও খাওয়াবো!
নিবৃতা ওকে তেমন একটা বাহিরের খাবার খেতে দিতে চায় না। যদি অসুস্থ হয়ে যায়, সেই ভয়ে! তাই এরূপ প্রস্তাবে প্রথমে খুশি হলেও পর মুহুর্তে মুখ বেজার করে তানহা বলে,
– না। আজ না। তোমার শরীর খারাপ।
নিবৃতা গাড়ি থেকে নেমে যেতে যেতে বললো,
– আমি একদম ঠিক আছি। তুমি আসো।
গাড়ি থেকে নেমেও নিবৃতা চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকলো। অনতি দুরেই দাড়িয়ে অপেক্ষা করা ড্রাইভারকে নিজ থেকে কিছু বলতেও দ্বিধা করলো। এবং ওকে বাঁচাতে তানহাই নিজেী তরফ থেকে বলে দিলো, গাড়ি নিয়ে বাসায় চলে যেতে।
তানহার হাতটা শক্ত করে দাঁড়িয়ে নিবৃতা রাস্তার এক পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। রিক্সার জন্য ওপারে যেতে হবে৷ ওর জন্য আগে রিক্সা বরাদ্দ করা ছিল। তারজন্য সিকিউরিটি গার্ড তাকে এখানে দাড়িয়ে থাকার অনুমতি দিয়েছিলো। তাই কখনও রাস্তা পার হয় নি নিবৃতা। আজ চোখের সম্মুখে এতো এতো মানুষ, দুরন্ত গতিতে চলে যাওয়া একের পর এক যানবাহন দেখে ওর দৃষ্টি ছানাবড়া হয়ে গেলো। হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়েই রইলো কতক্ষণ। এই তুরন্ত বেগে চলন্ত গাড়িঘোড়া পেরিয়ে কিভাবে রাস্তার ওপারে যাবে ওরা? আঁকড়ে ধরা তানহার হাতটায় জোর আরও বাড়ালো নিবৃতা। এদিকে তানহাও বেচারি এসবে অনভিজ্ঞ। দুই মা মেয়ে অসহায়ের মতো দাড়িয়ে থাকলো। অথচ ওদের টপকে ইতিমধ্যে কতজন রাস্তা পার হয়ে গেলো, যেন সাধারণ কোন ঘটনা। এক সময়ে সাহস করে নিবৃতা এক পা বাড়লালেও হঠাৎ সম্মুখে এক বাইক এসে ব্রেক করে বসলো। ঘটনার আকস্মিকতায় আঁতকে উঠে উলটো তিন পা পিছিয়ে গেলো ও।
– দেখে শুনে হাঁটবেন তো!
বাইকওয়ালা বিরক্ত হয়ে হাক ছেড়ে চলে যায়। এতে নিবৃতা ছোট মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকে। সে এতো অকর্মণ্য! এতোটা অনভিজ্ঞ! ওকে দিয়ে কি হবে? ও অসহায় চোখে তানহার দিকে তাকায়। তানহাও তখন উদগ্রীব হয়ে তার আম্মুর দিকে তাকিয়ে। মা মেয়ে মিলে একসাথে বিপদে পরেছে। দু’জন দু’জনের দিকে নির্বোধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এক হতাশামূলক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তানহার ছোট মুখটা কাঁদো কাঁদো হয়ে গিয়েছে। ওর মাথায় রাখা উচিত ছিল যে, নিবৃতা পারবে না। দুজনে নীরব বনে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তখনই পাশ থেকে এক ভদ্রলোকের গলার স্বর ভেসে আসে।
– আপনারা আমার সাথে আসুন।
অচেনা এক লোককে দেখে নিবৃতা তানহাকে আরও চেপে ধরে নিজের সাথে। অথচ তানহা যখন সুযোগটা ঠিক বুঝে নেয়। মিষ্টি করে হেসে বলে,
– থ্যাংক ইউ আঙ্কেল।
নিবৃতা ওর দিকে শাসনের নজরে তাকালেও তানহা আমলে নিলো না৷ উল্টো ফিসফিসিয়ে বললো,
– চলো চলো। আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবো?
এখানে কি আর গোয়ার্তুমি করা সাজে? লোকটার পিছু পিছু, শক্ত করে একে অপরের হাত আঁকড়ে ধরে তারা মা মেয়ে রাস্তা পেরোতে উদ্যত হলো। নিবৃতাতো এক প্রকার চোখ দুটো জাপটে বন্ধ রেখে চপল পায়ে তানহার সাথে এগিয়ে গেলো। অতঃপর রাস্তার অপারে এতেই হাফ ছেড়ে বাচলো। তানহা তখন খিলখিল করে হাসছে৷ যেন দারুন এক রোমাঞ্চকর মুহুর্ত তারা পার করে এসেছে। অথচ নিবৃতা তখন মনে মনে নিদারুণ কুন্ঠায় জর্জরিত। তাবিব ওকে বিশ্বাস করে তানহার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছে, অথচ নিবৃতা তা পালনে ব্যর্থ। তানহাকে নিরাপত্তা প্রদানে অক্ষম। আজ যদি ঐ লোকটা ওদের সাহায্য না করতো তাহলে ওরা কি করতো? ওভাবেই ঘন্টার পর ঘন্টা, অসহায় বনে অপেক্ষা করেই যেত? কিংবা পা বাড়ালে যদি কোন দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে? ও কেমন চুপ হয়ে গেলো। অপরাধ বোধে মিইয়ে এলো ভেতরটা। কোন রকম সাড়াশব্দ না পেয়ে তানহা যখন ওর দিকে তাকালো তখন দেখলে নিবৃতার উন্মুক্ত হয়ে থাকা চোখ দুটো তখন পানিতে টলমল করছে। সময় না গড়াতেই সেগুলো ঝরঝর করে গড়িয়ে পরে ওর নিকাব ভিজিয়ে ফেললো। তানহা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থেকে তৎক্ষনাৎ ওকে পাশ থেকে ধরলো। ওর বুঝতে অসুবিধা হলো না কেন নিবৃতা কাঁদছে। ও মিষ্টি গলায় বললো,
– মন খারাপ করছো কেন? আমিও তো রাস্তা পার হতে পারি না। তাই বলে কি আমি কাঁদছি?
– তুমি তো অনেক ছোট।
– তখন দেখলে না আমার চেয়েও ছোট ছোট কতগুলো বাচ্চা কতো সহজে পেরিয়ে গেলো? ছোট বড় দিয়ে কি হবে? আমার বাবা যেভাবে আমাকে রাস্তা পার হওয়া শিখায় নি, সেভাবে তোমার বাবাও তোমাকে শেখান নি। এখানে তোমার কি দোষ?
কথায় সুন্দর একটা যুক্তি ছিলো। নিবৃতা কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থেকে নাক টানলো। পরপর মাথা নেড়ে বললো,
– আচ্ছা।
– চলো আমরা রিক্সা নেই!
এরপর আর কি? তানহাই রিক্সা ঠিক করলো। এরপর খোলা আকাশের নিচে ঘুরে ওরা ফুচকা খেতে নামলো। তানহা নিজে খেয়ে নিবৃতার নামে বাসার জন্যও নিয়ে নিলো আর। এভাবেই একটু একটু করে চারপাশ ঘুরতে ঘুরতে ওরা বাসায় চলে এলো। সমাপ্তি ঘটলো ভিন্ন একটি শিক্ষনীয় দিনের।
তখন নিজেকে সামলে নিলেও বাসায় আসার পর থেকে নিবৃতার মুখটা আজ ভার ভার। তানহার সাথে সহজ ভাবে কথা বলার চেষ্টা করলেও ওর অভিব্যক্তির মাঝে এক উদাসীন ভাব বিরাজমান। থেকে থেকে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। কি যেন একমনে ভেবে চলেছে। তানহাকে বলে রেখেছে, লিটন ভাই না এলে তারা কাল স্কুলে যাবে না। এখন এখানে সমস্যাটা ঠিক কি হলো ও বুঝতে পারছে না। আবার নিবৃতাকেও ঠিক লাগছে না। এমনিতে সবসময় ওর খাবারের পরিমান স্বল্পই থাকে। কিন্তু আজ যেন নাম মাত্র খেতে বসেছিলো শুধু। চঞ্চল তানহার এরূপ গোমড়ামুখ পছন্দ নয়৷ তাই যখন আজ সন্ধ্যায় তাবিবের কল এলো তখন নিছক অযুহাতে অন্য ঘরে চলে গিয়েছিলো ও। একে একে সবটা ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র বিস্তারিত অবদি বাবাকে জানিয়েছে। সবটা শুনে তাবিবের মুখটাও স্থীর হয়ে এলো। শুধু সায় জানিয়ে আশ্বাস দিয়েছে মেয়েকে যে, ও বিষয়টা দেখবে। এরপর আর কথা খুব বেশি এগোয় নি। গম্ভীর মুখে তাবিব কল কেটে দিয়েছে।
সময় তখন রাত দশটা পেরিয়েছে। নিয়ম মাফিক, তানহা ঘুমিয়ে পরেছে তখন। ওকে আগলে নিয়ে নিবৃতাও পাশে শুয়ে থাকলেও ওর চোখে ঘুম নেই। চোখের দৃষ্টি নিবদ্ধ সিলিং পানে। সেখানে কৃত্রিম তারাগুলো ঝকমক করছে। চোখে দেখতে বেশ লাগে। অথচ নিবৃতা কখনও অভিভূত হয় না। এগুলো ওকে স্পর্শ অবদি করে না। যার গোটা অস্তিত্বই আঁধারে গড়া, সে আলোর সংস্পর্শে অস্বস্তি অনুভব করে। অনুভূতি সব শীতল। আজ ওর সাথে ঘটা যাওয়া ঘটনাটাই ঘুরে ফিরে মস্তিষ্কে আলোড়ন তুলছে। শান্তি মিলছে না একটুও। কি থেকে কি হয়ে গেলো, সে হিসেবও ও মিলাতে ব্যর্থ। থেকে থেকে সেই দম বন্ধকর অনুভূতি সজাগ হয়ে গায়ে কাটা দিচ্ছে। কি করলে এই ভয় থেকে নিস্তার মিলবে বুঝতে পারছে না। চোখের পাতা বুজলেই, আয়নায় প্রতিফলিত সেই পুরুষালী জহুরি নজর ভেসে উঠে। মনে হচ্ছে এখনও সে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। নিবৃতার সহ্য হয় না। অন্তরটা হাসফাস করে উঠে। এরই মাঝে নীরবতা চিরে ওর মোবাইলটা বেজে উঠে। নিবৃতার ধ্যান ভাঙে সেই শব্দে। ওর শরীর ঘাম ছেড়ে দিয়েছে। ধাতস্থ হয়ে মাথা তুলতেই দেখে তাবিব কল করছে। ভিডিও কল। ও আস্তে ধীরে তানহাকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে আসে৷ মোবাইলটা হাতে করে নিয়ে চুপচাপ বেড়িয়ে আসে ঘর থেকে। তাবিবের কক্ষে বসে, ওড়না দিয়ে কপালের ঘাম মুছে, শেষমেশ কলটা ধরে। স্ক্রীনে উদ্ভাসিত হয় সুদর্শন সেই মুখ খানি। পূর্ণ দৃষ্টি মেলে সরাসরি ওর দিকেই চেয়ে আছে। নিবৃতা চোখ নামায়। মানুষের চোখে চোখ রেখে কথা বলা ওর জন্য ভীষন কষ্টের! বিশেষ করে তানজিব নামক এই পুরুষটার ক্ষেত্রে ওর মস্তিষ্ক কাজ করাই যেন বন্ধ করে দেয়।
– মনে হয় না ঘুমিয়েছিলে।
নিবৃতা মাথা নাড়িয়ে বলে,
– না।
তাবিব কিছুক্ষণ চুপ থেকে ওর মুখটা পরোখ করে। স্বাভাবিকের চেয়ে আজ ওকে একটু বেশিই ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। চোখমুখ কেমন শুকিয়ে আছে। মুখটা ঘর্মাক্ত। বোঝাই যাচ্ছে মাত্র মুছেছে কারণ কপালের উপরের চুলগুলো ভিজে চিকচিক করছে।
– জসীম ভাইকে ভয় কেন পেয়েছ?
জসীম’ নামক লোকটা কে? নিবৃতা চেনে না তাকে। ওকে দ্বিধান্বিত দেখালো। তাই তাবিবই আগ বাড়িয়ে বললো,
– আজকের ড্রাইভার ছিলেন উনি।
সেই লোকটার কথা পুনরায় উঠতেই নিবৃতার মুখটা তমসায় ছেয়ে গেলো। ঠোঁট দুটো চেপে ধরলো সহসা। নাকের পাটা কেমন ফুলে উঠলো। এসব পরিবর্তনই সূক্ষ্ণ নজরে দেখে গেলো তাবিব। নিবৃতা তখনও চুপ থাকতে দেখে তাবিব আবারও বললো,
– তাকে ভয় পেয়েছ কেন? কি এমন হয়েছিল যার কারণে তুমি জ্ঞান হারালে নিবেদিতা?
নিবৃতার হাতদুটো কাঁপছে অনবরত। মোবাইলও নড়ছে তার সাথে। তাবিব চিন্তিত হলো। এতোটা ভয় পাওয়ার কি আছে? গলার স্বর নরম করে বললো,
– তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো না? একবার বলে দেখো সমস্যাটা। কথা দিচ্ছি আমি সব ঠিক করে দিবো।
নিবৃতা এবারে চোখ তুলে চাইলো। ডাগর ডাগর আঁখি যুগল তখন জলে ভরা বিলের ন্যায় দেখাচ্ছে। স্বচ্ছ পানি জমেছে সেথায়। তাবিবের অন্তঃকরণ কেমন কেঁপে উঠলো। মেয়েটা কিসে এতো ভয় পেয়েছে? তাবিবের আফসোস হলো। সে যদি এই মুহুর্তে ওখানে থাকতো, তাহলে পরম স্নেহে নিবৃতাকে আপন আশ্রয়ে জরিয়ে নিতো। মাথা হাত বুলিয়ে সকল সংশয় কাটিয়ে দিতো। কিন্তু নিরুপায় সে এখন। মৌখিক বানীতেই ওকে স্বান্তনা দিতে হবে। পেলব ওষ্ট দ্বয় কেপে উঠতেই তাবিব আবারও বলে,
– বলবে না আমায়।
– আজ যখন, ঝিলমিলকে নিতে গিয়েছিলাম, তখন ঐ লোকটা আয়না দিয়ে আমার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। আমি খেয়াল করেছি জেনেও চোখ সরায় নি। কেমন করে যেন দেখছিলো। এরপর হঠাৎ রাস্তা ঘুরালো। আমি চারপাশে তাকিয়ে কিছু চিনতে পারি নি। তাই ভয় পেয়েছিলাম।
কেমন নিষ্পাপ, সরল শোনালো ওকে। তাবিব চুপ থেকে ওকে আবারও বলতে দিলো,
– ঐ লোকটাকে আর পাঠাবেন না। সে ভালো না।
নাক টানছে সে। মাথা নিচু করে কাঁপছে সে মৃদু মৃদু। তাবিব ফোঁস করে এক শ্বাস ছাড়লো। ও নিবৃতাকে কল করার পূর্বে লিটন এবং জসীমকে কল করেছিল। যা যা জানার ছিল সবটা প্রশ্ন করেই জেনে নিয়েছিলো। অস্বাভাবিক কিছু মনে নয় নি। উপরন্তু দুজনই ওর চেনাজানা, ভালো মানুষ। কি ঘটতে পারে ওর বোধে আসে নি৷ এখন নিবৃতার সাথে কথা বলে বুঝলো বিষয়টা বেশ ঘোলাটে হয়ে গিয়েছে। তাই ও শান্ত স্বরে বললো,
– আমি যা যা বলবো, এবার সবটা মনোযোগ দিয়ে শুনবে। ঠিক আছে?
নিঃশব্দে মাথা নাড়ে সে। এবার আর উদ্ভ্রান্ত মেয়েটাকে মুখে জবাব দেওয়ার জন্য তাগিদ দেয় না তাবিব। বরঞ্চ নিজে ধৈর্যশীল গলায় বলে,
– ভ্রান্তদৃষ্টি মানে বোঝ? স্কোয়িন্ট।
– না।
– এটা একটা শারীরিক সমস্যা। এই সমস্যাটা যার, সেই মানুষ যদি একদিকে তাকিয়ে থাকে, তাহলে অন্য কেউ তাকে দেখে মনে করবে সে আরেকদিকে তাকিয়ে আছে। বুঝতে পারছো?
নিবৃতা বোকা স্বরে বলে,
– কিছুটা।
– তোমরা যখন রাস্তায় ছিলে, তখন অনেক জ্যাম ছিলো। তাই ফ্রন্ট মিররে চোখ রেখে পরিস্থিতি খেয়ালে রাখছিল জসীম ভাই। কিন্তু যেহেতু তার সমস্যা, তাই মনে হচ্ছিল সে রাস্তায় নয়, তোমার দিকে তাকিয়ে আছে৷
– তাহলে অন্য রাস্তায় কেন গেলেন?
– ঐ যে রাস্তায় জ্যাম! তাই অন্য রাস্তায় চলে গিয়েছিলেন। যেন দ্রুত স্কুলে পৌছানো যায়।
নিবৃতা চুপ করে রইলো। কিন্তু মনে মনে সে সত্যিই স্বস্তি পেলো। রাতে সে একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারবে। নতুবা তার চিন্তা ফুরোচ্ছিলো না। তাবিব ফের বললো,
– উনারা অনেক ভালো মানুষ। আমার অনেক বিশ্বস্ত। তুমি চিন্তা করো না।
নিবৃতার ভেতরের সত্তা তা মানতে চাইলো না। ও তৎক্ষনাৎ প্রতিবাদ করে বললো,
– আমি কাওকে বিশ্বাস করি না।
স্বরটা কেমন জেদি শোনালো। কেমন এক রোখা। তাবিব চুপচাপ দেখলো ওকে। পাল্টা তর্কে গেলো না। শুধু জানতে চেয়ে বললো,
– তাহলে কি করতে চাও?
কি করবে নিবৃতা? কিই বা করার আছে ওর। ও তো কিছুই পারে না। ওকে চুপ থাকতে দেখে তাবিব এক চেপে হাসলো। পরপর গম্ভীর হয়ে বললো,
– ড্রাইভিং শিখবে?
তড়িৎ গোল গোল চোখে চাইলো নিবৃতা। যেন কথাটি বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে ওর! ওর এরূপ প্রতিক্রিয়া দেখে তাবিব ভাব নিয়ে বললো,
– এভাবে তাকাচ্ছো কেন? সমস্যাটা তো তোমার। তুমি তো কাওকে বিশ্বাস করতে চাও না। এমতাবস্থায় যদি এমন ছোট ছোট বিষয়ে, মাঝেমধ্যে ভয় পেয়ে যাও তাহলে তো তোমারই কষ্ট। তার চেয়ে ভালো হয় না, এমন ব্যবস্থা করার যে, কোন পুরুষের আর আসার প্রয়োজন না পরে। তুমিই সব সামলে নিতে পারো।
তাবিব ভুল কিছু বলে নি। এমন কিছু করতে পারলে সত্যিই মন্দ হয় না। কিন্তু নিবৃতা পারবে এতো কঠিন একটা কাজ শিখতে? ও ভাবুক বনে চুপ হয়ে গেলো। তাবিব চেষ্টা করলে হয়তো মহিলা কাওকে খুঁজে নিতো। কিন্তু ও চায়, নিবৃতা নিজ থেকে আত্ম বিশ্বাসী হয়ে উঠুক। পরিস্থিতি সাপেক্ষে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। শক্ত হোক। তাই ওর সিদ্ধান্ত নেওয়াকে তরান্বিত করতে তাবিব বললো,
– তুমি না পারলে, থাক। আমার তো সমস্যা নেই। কাল নাহয় আরেক নতুন ড্রাইভার পাঠিয়ে দিবো।
আবারও নতুন কেও? নিবৃতা আঁতকে উঠে বললো,
– না না। আমি পারবো।
তাবিব আড়ালে মুচকি হাসলো। কাধ উচিয়ে বললো,
– আচ্ছা তাহলে আমি তানহার ক্লাস টিচারের সাথে কথা বলে নিবো৷ লিটন ভাই ঠিক না হওয়া পর্যন্ত নাহয় স্কুলে যাবে না ও। এবং এর পাশাপাশি তুমিও ড্রাইভিং ক্লাস করলে। ঠিক আছে?
নিবৃতা চুপ করে রইলো। ওর মনটা এখনো সংশয়ে পূর্ণ৷ ওকে দ্বারা কি আদও হবে এটা?
– তুমি বললে, আমি তোমার জন্য ক্লাস ঠিক করবো। পরিচিত কাওকে খুঁজবো। আর না পারলে এখনই বলে দাও।
নিজের সাথে যুদ্ধ করে নিবৃতা ঠোঁট চেপে বললো,
– পারবো।
তাবিব সগর্বে হাসলো। এভাবেই একটু একটু করে নিবৃতাকে স্বাভাবিক জীবনের দিকে নিয়ে যাবে ও৷ বিফল হলেও ওকে সাহস জুগিয়ে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে৷ ও হঠাৎ করেই উষ্ণ গলায় বলে,
– আর বাকি রইলো, রাস্তা পার হওয়ার বিষয়টা। সেটা নাহয় আমি এসে সামলে নিবো? হাতে হাত রেখো তোমায় শেখাবো। চলবে না? হুম?
নিবৃতা পর্ব ১১
নিবৃতা চুপটি করে চোখ নামিয়ে বসে রইলো। মাঝেমধ্যে এই মানুষটার কিছু কিছু কথার উত্তর দিতে ওকে বেশ বেগ পেতে নয়। তাবিব আজ আর ওকে নাজেহাল করে তুললো না। বেচারির মানসিক অবস্থা এতক্ষণ বিপর্যস্ত ছিল। এবার একটু শান্তি দেওয়া যাক। ও আরেকটি ক্ষন সেই শুভ্র মুখটার দিকে তাকিয়ে থেকে কলটা কেটে দেয়। এদিকে, একটু আগেও আজ রাতে নির্ভয়ে ঘুমাতে পারবে ভাবা নিবৃতা আবারও নতুন চিন্তায় নিমগ্ন হলো। ড্রাইভিং! এই ভয়ংকর জিনিসটার সাথে এখন ওকে মোকাবেলা করতে হবে! কিভাবে সম্ভব!
