নিবৃতা পর্ব ১৬
নেহার ছায়ালিপি
কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ। সাদাটে ধোয়ার মাঝে সূর্য রশ্মি হারিয়ে গিয়েছে কেমন। মিঠা রোদের তাপের বদলে রয়েছে শিহরন জাগানিয়া শীতল, ঠান্ডা বাতাস। পাতা ঝরা শুকনো গাছের ডাল রাতে জমা শিশিরে ভিজে জবজব করছে। কুজ্ঝটিকা মিশে গিয়ে যখন দিবাকরের তীক্ষ্ণ, ঝলমলে কিরণ এসে পরবে, তখন তারা জ্বলজ্বলে মুক্তোর ন্যায় চিকচিক করে উঠবে। প্রাকৃতিক সকল অকৃত্রিম সৌন্দর্যের কাছে জাগতিক রূপ ম্লান হয়ে আসে।
এই শীতের ভোরে ঘুম থেকে উঠে পরেছে সারোয়ার ঘর কর্ত্রী। তার সবকিছুই সময় মোতাবেক চলে। কখনও এর হেরফের হয় না। ক্লান্তি, অবসাদ কিংবা অলসতা যতকিছুই মানবজীবনের অজুহাত রয়েছে, সেগুলো তার ক্ষেত্রে মোটেও খাটে না। সদা তটস্থতা এর মাঝে বিদ্যমান। যান্ত্রিক তার সকল কর্মকান্ড। বাড়ির সকলে এই সময়টাতে এখনও ঘুমিয়ে। আলসেমি কাটিয়ে, মোটা কম্বলের স্তর থেকে বেরিয়ে আসতে ইচ্ছে করে না। উল্টো নিজেকে আরও খানিকটা আবৃত করে গভীর ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার আবেশ জাগে। কিন্তু নিবৃতা! তার এসবের জন্য কখনও মন উতলা হয় না। এই তো সাত সকালে, সে রান্নাঘরে এসে হাজির হয়েছে। শুভ্র মুখে স্নিগ্ধতার ছড়াছড়ি। মুখায়ব জুড়ে প্রশান্তিকর ভাব। রুটির জন্য আটার খামির মাখায় হাত দিতেই দরজা অভিমুখ থেকে সরল একটি স্বর ভেসে আসে,
– গুড মর্নিং!
এ সময়ে, মানুষটাকে এখানে আশা করে নি নিবৃতা। ও বিস্ময় নিয়ে ঘাড় বাকিয়ে চাইলো। ওকে এভাবে নিরুত্তর, বাকহীন হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে বরাবরই সরল মুখে সাবলীলভাব নিয়ে রইলো তাবিব। ভেতরে আসতে আসতে পুনরায় আবার বললো,
– গুড মর্নিং নিবেদিতা।
বোধদয় হতেই কিঞ্চিৎ সরে দাঁড়ালো নিবৃতা৷ নত কন্ঠে প্রত্যুত্তর করলো।
– গুড মর্নিং।
জবাব পেয়ে চমৎকার হাসলো তাবিব। মনহোর হাসির রেখাটা তড়িৎ চোখে পরলো নিবৃতার। কোন এক ভয়ংকর অনুভুতির আগাম বার্তা বনে তীরন্দাজের সেই চিত্তাকর্ষক তীরটা নিবৃতার মনের অন্দরমহলে গিয়ে গেঁথে গেলো। এতসব জটিল সমীকরণ নিবৃতার বুঝে আসে না, তবে নিজের অবস্থার ভীত নড়ে উঠা স্পষ্টতই টের পেলো। তাই তো কাল বিলম্বে মেতে না উঠে, তৎক্ষনাৎ মাথা নামিয়ে কাজে মনোনিবেশের চেষ্টা করলো। তাবিবও দৃষ্টি ফিরিয়ে চুলোর উপর রান্না হতে থাকা পদগুলো দেখে নিলো। আহ! কতদিন পর দেশীয় খাবার নাশতায় পাবে সে। শান্তি! শখ করে দু’একদিন ভিনদেশী খাবারের স্বাদ নিতে মন চাইলেও, তৃপ্তি সেই আপন সংস্কৃতি ও অভ্যাসেই নিহিত।
– আপনার কিছু লাগবে?
কন্ঠটি অত্যন্ত নিচু। মেয়েটার আসেপাশে থাকলে তাবিবকে সর্বদা তার শ্রবণ ইন্দ্রীয় সজাগ রাখার চেষ্টায় থাকতে হয়, যেন সামান্য তারতম্যও মুহুর্তে ধরে ফেলতে পারে। ও ঘুরে দাঁড়ালো। কিচেন কাউন্টারের পীঠ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বুকে দু’হাত গুজে নিলো। বাঁ ভ্রু নাচিয়ে হালকা গলায় শুধালো,
– কেন? প্রয়োজন ছাড়া আসা যায় না?
নুইয়ে রাখা অক্ষি পল্লবগুলোকে অস্থির ভঙ্গিতে বেশ কয়েকবার নড়তে দেখা গেলো। ওষ্ঠ যুগল চেপে কোন এক দুর্বোধ্য ভাবনায় মশগুল হয়ে ফিরে আসতেও বোঝা গেলো। এই যে, এতো গভীর নিবেদন নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে তাবিব, নিবৃতা নামক মানুষটিকে নিজের মনেই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করে, এগুলো তাবিবের ভালো লাগে। পছন্দের মানুষটিকে চিনে নিতে ও শান্তি পায়। ও সবসময় এমনটাই ছিল। বুঝদার, সরল, শান্ত, যত্নশীল। শুধু কালের নিষ্ঠুরতায় চাপা পরেছিল এই রূপগুলো। এখন যদি কারও নির্ভেজাল অস্তিত্বের সাহায্যে সেই পুরনো সত্তা ফিরে আসতে চায় তবে তাকে মুক্তহস্তে সেই স্বাধীনতাটুকুন দেওয়া উচিত। কারণ তার প্রাপ্যটা পাবেই, তা সে যে মাধ্যমেই হোউক না কেন। ভাঙাচোরা মনের তাবিব, আবারও কাওকে ভালোবাসবে, সেটা হওয়ার ছিল। তাই হচ্ছে!
– সেভাবে বলি নি৷
– আচ্ছা।
কাধ উচিয়ে সায় জানালো তাবিব। সুপ্ত অনুভুতির স্পষ্ট প্রতিফলন, দু’চোখের নরম প্রতিফলনে ব্যাক্ত করে তাবিব চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকলো রুটি বেলতে থাকা নিবৃতাকে। ও জানে, মনে মনে মেয়েটা দারুন অস্বস্তিতে গাঁট হয়ে আছে৷ হয়তো ওর রাগও হচ্ছে। কিন্তু তাবিব নিরুপায়!
– দাও আমি রুটি সেঁকে দেই।
বিভ্রম ও অনিচ্ছা নিয়ে নিবৃতা বললো,
– আমি পারি তো!
– জানি তো! অথচ দেখো, তুমি আসার আগে এসব কিছু তো আমিই সামলাতাম। এখন তুমিই একা করছো।
– আগে আপনি করতেন, এখন আমি। একই হলো না?
খুবই সূক্ষ্ম এক হাসির ঝলক ফুটিয়ে সুমিষ্ট স্বরে সে প্রত্যুত্তর জানালো। ঘন, দীর্ঘ পাপড়ি দিয়ে সাজানো আঁখি যুগলের সরল দৃষ্টি। তাবিব দেখলো, বুঝলোও। প্রশান্তি ছেয়ে গিয়ে তুলতুলে হয়ে আসা ওর মনটা হাতের পাতায় তুলে নিলো। চুলোর সামনে দাঁড়িয়ে রুটি বেলতে গিয়ে এই শীতেও নিবৃতার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হয়েছে। আলতো হাতে ললাটের কোনে লেপ্টে থাকা ক্ষুদ্রাকার চুলগুলো সরিয়ে সরিয়ে দিতে বললো,
– আমি যে সময়টাতে পারবো, তোমাকে একটু হলেও সাহায্য করবো। ইট শুড বি অলওয়েজ গিভ এন্ড টেইক। এতে সম্পর্কের সমীকরণ সমান সমান থাকে। অসঙ্গতিপূর্ণ হয় না। বুঝতে পেরেছ?
লম্বাটে, শক্ত আঙুলগুলোর নম্র স্পর্শে যত্নের আভাস মিলে। ছোট্ট এক কাজেও খুবই পারদর্শিতার সাথে নিজের পরিষ্কার মনোভাব গুলো প্রকাশ করতে জানে। নিবৃতা স্বস্তি পায়। ঠিক তাবিবের পছন্দ মতো শাব্দিক অর্থে সায় জানায়।
– জ্বি বুঝতে পেরেছি।
– গুড।
ফুল হাতা টি-শার্টের আস্তিন টেনে মুঠোয় নিয়ে আসে তাবিব। সেটি দিয়েই নিবৃতার ছোট্ট সিক্ত কপালটা নরম করে মুছিয়ে দেয়। এরপর আর কথা হয় না। দু’জন মিলে সম্পূর্ণ করে নেয় বাদবাকি কাজগুলো।
– দু’জন শেফ হাজির হয়েছে দেখছি! তা বিশেষ কি মিলছে আজ?
তানহা ঘুম থেকে উঠে এসেছে। সকালে উঠেই ওর অভ্যাস, আগে মা’কে খুঁজতে বের হওয়া। মা কি করছে, কোথায় আছে, তা নিশ্চিত করতে হবে আগে। অতঃপর কিছুক্ষণ আহ্লাদ করে দিন শুরু করবে৷ টলোমলো পায়েই সে এসে নিবৃতাকে জাপ্টে ধরলো এক পাশ থেকে। কাঁধে গলিয়ে দিলো ঘুমো ঘুমো মুখখানি। তাবিব ঠোট প্রসারিত করে হাসলো। নীরবে দেখলো নিবৃতা ওকে আগলে নিয়েছে ততক্ষণে। সাথে মাথায় কোমল হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
– নাশতায় কি?
– এই তো আলু ভাজি আর…
আঁড়চোখে তাবিবকে একবার দেখে মিয়ে আরেকটু ক্ষীণ গলায় বললো,
– বুটের ডাল দিয়ে খাসির মাথা।
– ভালোই ভালোই! বাবার খাতিরদারি দেখি কমছেই না। তা বলি, আমার মতো অবলা মানুষটা সারাক্ষণ চোখের সামনে থাকে বলে কি গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য নয়?
নিবৃতা সইলো না এই অপবাদ! তৎক্ষনাৎ প্রতিবাদ করে বসলো।
– তাহলে আলু ভাজি আমি ফ্রিজে তুলে রাখি। কি বলো?
চোরা চোখে পিটপিট করে চাইলো তানহা। দন্তপাটি মেলে হাসলো।
– খাবার নষ্ট করা ভালো না। সমস্যা নেই খেয়ে নিবো আমি… আহ্!
তাবিব পাশ থেকে তানহার কান মুচড়ে ধরেছে!
– ছটফটে পাখিটা একটু বেশিই দুষ্ট হয়ে যাচ্ছে দেখছি!
তবে নিবৃতা তখনই তাবিবের হাত আঁকড়ে ধরেছে। চোখ মুখের সহজ ভাবটা এখন আর নেই। সেখানে আছে তানহাকে ছেড়ে দিতে বলার স্পষ্ট ইঙ্গিত! অথচ তাবিব হালকা করেই ধরেছে ওকে। ও মাথা নেড়ে ছেড়ে দিলো। দু-হাত উচিয়ে বললো,
– ভালোই। এই সংসারের রাজ এখন আপনার আম্মুরই শুধু! আমার কোন মূল্যই নেই।
তানহা শব্দ করে হেসে ফেললো। বাবার এক বাহু জড়িয়ে ধরে বললো,
– আমারও নেই। চিন্তা করো না, তুমি একা নও।
তানহার এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে তাবিবও হাসলো। অথচ এদিকে নিবৃতার মুখাবয়ব রক্তিম হয়ে এসেছে। মেয়ে যা বলে, যেভাবে বলে, যা চায়, নিবৃতা পইপই করে সেভাবেই করে। কোন দিক থেকে খামতি রয়ে গেলো কি না, সেটা নিয়ে বারংবার দ্বিধায় ভুগে, অগণিতবার চেষ্টা করে। আর তানজিব নামক মানুষটা? তার একান্ত বাধ্যগত এক স্ত্রী সে। তবুও দিনশেষে এই অভিযোগ? ও চুপটি করে রইলো। এমনিতেই কথা কম বলে, তবুও যদি বাবা মেয়ের এতো সমস্যা হয়, তাহলে ও কথাই বলবে না আর। মুখটা আমসে করে, ম্লান বদনে রুটি বানানোতে মনোযোগ দিলো। হাতের গতি আগের চাইতে ক্ষিপ্র। মায়ের অভিব্যক্তি বুঝতে পেরে তানহা মুচকি হাসলো। এগিয়ে গিয়ে জাপ্টে ধরে বা গালে চুমু খেয়ে বললো,
– রাগ করে না আম্মু।
এই আহ্লাদে বরাবরই বরফের ন্যায় গলে যায় নিবৃতা। ওর কোন প্রতিরোধই টেকসই নয়। শুধু ভার কন্ঠে বললো,
– ফ্রেশ হয়ে এসো। নাশতা হয়ে গিয়েছে প্রায়।
তানহা জানে ওর রাগ পরে গিয়েছে। তাই চপল পায়ে চলে গেলো। তাবিব এতক্ষণ নীরব দর্শক বনে সবটা দেখছিলো। ছোট্ট এই জায়গাটা পুনরায় নীরবতায় ডুবতেই ও রসিক স্বরে বললো,
– মেয়ে তো চুমু খেয়ে রাগ ভাঙালো। আমি কিভাবে ভাঙাবো? আরেক গালে দিবো আরেকটা? চলবে তো?
সুপ্ত অভিমানে আরক্তিম কপোলদ্বয় এবার লাজে রাঙা হলো। পলকা দেহ দেওয়ালে দিকে খানিকটা সেটে গেলো। হেট হলো মস্তক! দৃশ্যখানিক দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে তাবিব। এগিয়ে গিয়ে মসৃণ কপালে দু’আঙুলে টোকা দিয়ে বলে,
– নির্বোধ!
তড়িৎ চোখের পাতা বুজে যেতেই স্থান ত্যাগ করে তাবিব। এই মেয়ে তার সংশয় নিয়েই থাকুক আপাতত।
আবারও সকালে খাওয়ার টেবিলে ছোটখাটো গুঞ্জন ভেসে উঠছে। শোনা নায়, নতুন দিনের নব্য আলাপ। সারাদিনটা ঠিক কিভাবে কাটবে, কে কি করবে, সেই আলোচনায় ফুরিয়ে আসে সময়। আপাতত অল্প কয়েকটা দিনের ছুটি কাটাবে তাবিব, বেশি না। এতো লম্বা কাজ থেকে ফিরে এসে এতোটুকু বিশ্রাম তার প্রাপ্য!
– চলো তাহলে আমরা একটা ট্যুর দিয়ে আসি বাবা!
তানহার উৎসুক কন্ঠে তাবিব নরম চোখের তাকায়৷ হাতে গোনা অল্প একটু ছুটিই। এরমধ্যে ঘুরে কি তৃষ্ণা মিটবে? মেয়েটা অবশ্য গত কয়েকটা বছরে ঘরের চারকোনেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। অথচ এই সময়টা ওর প্রজাপতির ন্যায় ডানা মেলে উড়ার কথা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে জ্ঞানার্জন করার সময়। নতুন নতুন অভিজ্ঞতা কুড়ানোর মোক্ষম সুযোগ। তাছাড়া ঘরকুনো নিবৃতাকেও একটু বাহিরি দুনিয়া সম্পর্কে অবগত করা উচিত। ভাবুক হলো তাবিব। তবে সাবলীলভাবেই বললো,
– আচ্ছা দেখি কি যায় আমার মা!
তানহা এতেই খুশি। বাবা যেহেতু বলেছে তাহলে একটা না একটা ব্যবস্থা তো করেই ছাড়বে। ও উৎফুল্ল বদনে ঘরে চলে গেলো। নাশতা করে অলস শরীরে আবারও ঘুমেরা জেঁকে আসছে। নিবৃতাকে টেবিল গোছাতে সাহায্য করে তাবিব যখন ঘরে এলো, তখন ওর মোবাইল শব্দ তুলে বেজে উঠলো। কলটা এসেছে তাকরিমার থেকে। শেষ দেশে আসার আগে কথা হয়েছিল বড় আপুর সাথে। তবিব খোশমেজাজে বারান্দায় গিয়ে বসলো। ভিডিও কল রিসিভ করে প্রসন্ন গলায় সালাম জানালো তাবিব। তাকরিমাও প্রশস্ত হেসে প্রত্যুত্তর করে বলেন,
– কি রে! বাসায় ফিরে দেখি চেহারা খুশিতে ঝলমল করছে একদম!
তাবিব বোনের কথায় লজ্জালু হাসে। কানের পিছ চুলকে বলে,
– পরিবারই শান্তি আপা। তারা কাছে থাকলে মন মস্তিষ্কও সব ঠান্ডা থাকে।
ভাইয়ের মুখটা চুপ করে পর্যবেক্ষণ করলেন তাকরিমা। আগের তুলনায় যথেষ্ট প্রাঞ্জল দেখায়। সত্যি বলতে আগেরই তো! সেই পুরোনো তাবিব, যে শত দুঃখ, কষ্টের মাঝেও ঠোঁটে অকৃত্রিম হাসি ও মুখে সরলতা নিয়ে ঘুরতো। সেই হারিয়ে যাওয়া সত্তাটা একটু একটু করে ফিরে আসছে।
– যেই মানুষটা এসে তোর পরিবার সম্পূর্ণ করেছে সেই মানুষটা বোধহয় তোর অনেক পছন্দের হয়ে উঠেছে। তাই না?
তাকরিমার নরম কন্ঠে তাবিব হাসলো। ভাইয়ের চোখে স্পষ্ট হওয়া অব্যক্ত শব্দগুলো বুঝে ফেলেন উনি। জানতে চেয়ে বলেন,
– ও কি অনেক ভালো?
তাবিবের সরু ওষ্ঠ যুগল হতে আজ হাসি সরছেই না, অথচ মাঝের দিকে ছেলেটা হাসিখুশি থাকা ভুলে গিয়েছিল। বাবার দায়িত্ব ও আপন কর্মের প্রতি থাকা কর্তব্য পালনেই ছিল সকল মনোযোগ। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখার ইচ্ছেও বোধহয় মরে গিয়েছিল। আর আজ? পরিবর্তনটা তাকরিমার মন ঠান্ডা করলো। এমন না যে সে নিবৃতার সাথে কথা বলে না। বলে, কিন্তু মেয়েটা এতো ঠান্ডা প্রকৃতির। তাকরিমা যতটুকু প্রশ্ন করে, ঠিক ততটুকুরই উত্তর দিবে, তাও অনেকটা সময় নিয়ে করে। নিজ থেকে কখনোও কিছু বলবে না। তাই কথা তাদের খুব বেশি একটা জমে না।
– একটু বেশিই ভালো। সরল ও নির্বোধ।
বলেই শব্দ করে হাসলো তাবিব। তাকরিমাও ভাইয়ের সাথে মাথা নাড়িয়ে তাল মেলালেন। পরপর নিজেকে সামলে কাজের কথা চলে আসলেন,
– একটা প্রয়োজনে কল করেছিলাম।
– হ্যা বলো না।
– তোর তিন ভাগনে ভাগনি আর আমি মিলে ট্যুর দিবো ঠিক করেছিলাম। কয়েকটা দেশ একবারে ঘুরবো। এখন শেষ সময়ে এসে, তোর ভাগনের কাজ পরে,গিয়েছে। ও ভার্সিটি থেকে আসতে পারবে না। আর তোর দুলাভাই তো জানিস। সময়ই হয় না উনার। এখন মেয়েরা চাচ্ছে, তানহা চলে আসুক। আসলে আমিও তাই ভাবছিলাম। আমরা এতো জায়গায় ঘুরবো, তানহাকে ছাড়া। প্রথম থেকেই ভালো লাগছিল না। তুইও দেশি ছিলি না, তাই সাহস হয় নি বলার। এখন যখন সুযোগ মিললো, ছাড়তে চাইছি না৷ চাইলে তুই আর নিবৃতাও যোগ দিতে পারিস, যদিও সময় লাগবে অনেক। আর যাই হোক তানহাকে কিন্তু দিতেই হবে।
বড় বোনের আবদারে তাবিবের মুখ গম্ভীর হলো।
– মাত্র দেশে ফিরলাম৷ কতো কাজ পরে আছে। এখন ট্যুর দেওয়ার সময়টাই তো নেই।
– তাহলে তুই রাজি হয়ে যা, তানহার সব ব্যবস্থা আমিই করবো।
– নিবেদিতা তানহাকে একা ছাড়তে রাজি হবে না।
– আশ্চর্য আমরা কি পর কেউ? ছোটবেলায় তো তানহা আমাদের সাথেই থাকতো।
– আমি নিশ্চয়তা দিতে পারছি না। তাছাড়া তানহাও ওর মা’কে ছাড়া থাকতে পারে না।
– দেশে দেশান্তরে ঘুরে বেড়ানোর লোভ, তানহাও সামলাতে পারবে না। আমি এখন রাখি। তুই ওকে রাজি করে দ্রুতই আমাকে জানাবি৷
বোনের সাথে কথা বলে চিন্তিত মননে বসে থাকে তাবিব। মেয়েকে একা এতো দুরে ছাড়তে ওর নিজেরও মন সায় দিচ্ছে না, কিন্তু বিস্তৃত দৃষ্টিতে চিন্তা করলে এটা অনেক ভালো একটা সুযোগ। ও দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সোজা চলে এলো মেয়ের ঘরে৷
তানহা তখন ঘুমাবে বলে এলেও এখন চুপচাপ সুয়ে ছিল। দরজায় করাঘাত হতেই ও উঠে বসতেই, তাবিব এসে মেয়ের সম্মুখে জায়গা করে নিলো। নিবৃতাও তখন বিছানার এক পাশে বসা ছিল।
– কি হয়েছে বাবা?
আড়চোখে নিবৃতাকে একবার দেখে দিয়ে তানহাকে মাত্র ঘটা বিষয়ের সবটা জানায় তাবিব। ওর কথা শেষ হতেই দেখে তানহার দু’চোখ জ্বলজ্বল করছে। নিশ্চয়ই মনের মাঝে বিপুল পরিমানে উৎসাহ জমা হয়েছে ইতিমধ্যে।
– সত্যি বলছো?
তাবিব নীরবে মাথা নাড়ায়। তানহা উৎফুল্ল হয়ে কিছু বলবে তার পূর্বেই চোখ যায় নিবৃতার দিকে, যে তখন পুরো নিস্তব্ধ বনে বসে আছে। মনে বিদেশে ঘোরার স্পৃহা জাগলেও মা’কে ছেড়ে যেতে হবে ভেবে তানহার মুখে আধার ঘনিয়ে আসলো। ও মুখটা ছোট করে বললো,
– কিন্তু আমি এতোদিন তোমাদের ছাড়া কিভাবে থাকবো একা একা?
– আমাদের ছাড়া না-কি আম্মুকে ছাড়া?
তাবিবের কথার জবাব আসে না। তানহা চুপটি করে বসে থাকে। তাবিব মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
– মাত্র দেড় দুই মাসের ব্যাপার। তাছাড়া এতো বড় সুযোগ তুমি মিস করতে চাও?
তানহা কিছু না বলে চুপ রইলো। আড়চোখে নিবৃতার দিকে তাকিয়ে থাকলো। অথচ নিবৃতা তখন নির্বিকার হয়ে বসে।
– কি চাও সেটা আমাকে দ্রুতই জানাবে।
তাবিব উঠে চলে এলো। ঘরে প্রবেশ করতেই অনুভব করলো ওর পিছন পিছন আরও একজন এসেছে। আজ সে আর বাহিরে দাড়িয়ে প্রবেশের অনুমতি চায় নি৷ নাই-বা জড়তা প্রকাশ করেছে। তাবিব ঘুরে তাকাতেই দৃষ্টি গোচর হলো থমথমে মুখখানি। চিন্তা নয় বরঞ্চ চাপা ক্রোধ জমে ওঠা আঁখি যুগল। নরম চোয়াল তিরতির করে কাঁপছে।
– আপনি ওকে একা পাঠানোর সিদ্ধান্ত কিভাবে নিলেন?
আক্রোশে কন্ঠ অবদি কাঁপছে তার। যদি ক্ষমতায় কুলতো তাহলে চিৎকার করে উঠতো বোধহয়। তাবিব অবাক হতেও ভুলে বসলো।
– ও এতো ছোট একটা বাচ্চা! একা একা এতো দুরে পাঠাতে চাইছেন কিভাবে?
ছোট বাচ্চা সম্বোধনে তাবিবের হাসি পেলো। তবে এরুপ উত্তপ্ত পরিবেশে ও নিজেকে সামলে নিলো। এলোমেলো দৃষ্টি চারপাশে ফেলতে ফেলতে নিবৃতা অস্থির হয়ে উঠেছে ততক্ষণে।
– এটা ঠিক হচ্ছে না।
ওকে শান্ত করার প্রয়োজন। তাবিব গিয়ে সোজা ওর দু’কাধ আকড়ে ধরে বললো,
– শান্ত হও।
– আপনি বুঝতে পারছেন না!
তানহার বিষয়ে সে সর্বদাই এমন অস্থির, দুর্দমনীয়। তার নরম সত্তা হারিয়ে গিয়ে মা নামক রৌদ্রময়ী এক রূপ বেরিয়ে আসে, যে তার সন্তানের নিরাপত্তা ও ভালোর জন্য সব করতে রাজি। তাবিব ওকে টেনে নিয়ে এসে বিছানায় বসালো৷ কম্পনশীল হাত দুটো নিজের হাতে বেঁধে নিয়ে বললো,
– আমার কথাটুকু আগে শুনো। তারপর তোমার সব প্রশ্নের জবাব আমি দিবো।
তাবিবের নিরুত্তাপ, শান্ত মুখশ্রী দেখে চুপ হয়ে যায় নিবৃতা। অতঃপর মাথা নিচু করে বড় বড় শ্বাস ছাড়ে৷ এরূপ চঞ্চল ভাব ওকে নাজেহাল করে তুলে। মনটা বড্ড ব্যাকুল হয়ে আছে৷ মেয়ের চিন্তায় সে দিশেহারা। মুখে না বললেও তানহা অনেক আশায় আছে যে ও সত্যিই যাবে৷ কিন্তু নিবৃতার মন মানে না। ওকে চোখের আড়াল হতে কিভাবে দেবে ও?
– তানহা দুরে যাবে, এ নিয়ে চিন্তিত তুমি না ও তোমার নজরের বাহিরে থাকবে, সেটা নিয়ে?
লোকটা সবসময়ই ওর মনোভাব বুঝে ফেলে। নিবৃতা অবাক হয় না। শুধু মাথা নেড়ে বলে,
– আমার নজরের বাহিরে থাকবে।
– কেন?
নিবৃতা এক শুষ্ক ঢোক গলাধঃকরণ করলো। অন্তরে কাঁটার মতোন গেঁথে থাকা সংশয় প্রকাশ করে বললো,
– আমার ভয় হয়!
– কিসের ভয়?
উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে তাবিব, কিছু জবাবের আশায়।
– ও যতক্ষণ আমার সামনে না থাকে, ততক্ষণ আমার অস্থির, অসহ্য লাগে। মনে হয়, ও ঠিক আছে তো? কোন সমস্যা হচ্ছে না? সমস্যায় পরলে ওর সাহায্য করবে কে? এসব নানান চিন্তারা আমাকে শান্তি দেয় না।
নিবৃতার কন্ঠরোধ হয়ে যাচ্ছে। মস্তিষ্ক সর্বদা ভীত থাকে তানহাকে নিয়ে। তাবিব নরম চোখে তাকিয়ে থেকে বলে,
– তানহা তো এখন বড় হচ্ছে। ওকে সবকিছু নিজের মতো করে সামলাতে শিখতে হবে।
নিবৃতা নাছোড়বান্দার ন্যায় শক্ত গলায় বলে,
– যতদিন আমি আছি, আমিই ওকে সামলাবো। ওর জন্যই তো এতোকিছু শিখেছি আমি। দরকার পরলে আরও শিখবো, কিন্তু ওর কোন সমস্যা হতে দিবো না।
এতোটা গভীর মমত্ববোধ ও ভালোবাসা! তাবিব যতটুকু অনুমান করেছিলো তার চেয়েও বেশি স্নেহ তানহাকে করে নিবৃতা। তাবিব হাতের বাঁধনটা আরও জোড়ালো করে বলে,
– এতে তো তানহারই সমস্যা হবে, সেটা কি তুমি জানো?
এরূপ কিছু কি আদৌও সম্ভব? নিবৃতা অবিশ্বাস নিয়ে তাকাতেই তাবিব গোপনে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। বলতে কষ্ট হলেও ওকে যে বাস্তবতা তুলে ধরতেই হবে।
– তুমি তো জানো নিবৃতা, অনেক কিছুই তুমি বুঝো না, আগে পারতেও না। তোমাকে প্রতিনিয়ত শিখতে হচ্ছে, নিজের সাথে সংগ্রাম করে কষ্ট করতে হচ্ছে। এগুলো নিয়ে তোমার আফসোস এবং মন খারাপও হয় তাই না?
নীরবে মাথা নাড়ায় সে। তাবিব আরও বলে,
– কেন হয় বলো তো?
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে দুঃখী চোখে তাকায় ও। তাবিবের মায়া হয়৷ নিবৃতার মাথার এক হাত তুলে নিয়ে সেটা আস্তে আস্তে বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,
– কারণ তোমার বাবা, মা তোমাকে শেখায় নি কিংবা চেয়েও শিখাতে পারেন নি হয়তো। এই যে তোমার এতো অজ্ঞতা, সেটা তোমার আপনজনেরা বোঝে, তোমাকে আগলে রাখে। অথচ অপরিচিত কেউ কিন্তু এটা ভালো চোখে দেখে না। আবার প্রয়োজনের সময় দেখায় যায়, তুমি নিজেও বিপদে পরে যাও। মনে নেই?
ভুলে নি সে৷ কিছুই ভোলার মতোন তো নয়। ও মাথা নিচু করে নেয়।
– তুমি কি চাও তোমার মেয়ের মাঝে এসব অপারগতা থাকুক?
উত্তর আসে না। কিন্তু তাবিব আজ বদ্ধ পরিকর। তাবিব পুনরায় বলে,
– তোমাকে কষ্ট দেওয়া কিংবা ছোট করার কোন প্রশ্নই এখানে আসছে না। এখানে বিষয় হচ্ছে তানহা। আমাদের ইচ্ছে ও স্বপ্ন যে, ওকে আমরা একজন পারদর্শী ও দক্ষ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবো। এখন বলো, তাহলে, তানহাকে এভাবে গেটকিপিং করা কি আদৌও ঠিক হবে?
ডাগর ডাগর নয়ন যুগল হতে দুঃখ ঝড়া বান বইছে৷ ও নীরবে নেতিবাচক মাথা নাড়াতেই, তাবিব আলগোছে ওর গাল মুছে দেয়। নম্র স্বরে বলে,
– ভালোবাসা আগলে রাখতে জানে। কিন্তু এই আগলে রাখা মানে খাঁচায় বন্দী করে রাখা নয়, ওকে উৎসাহ দিয়ে আকাশে উড়া শিখানো। যে আপন নীড়ে শান্তি অনুভব করে, সে দিনশেষে কিন্তু ওখানেই ফিরে আসে। আমাদের কাজ শুধু ওকে নিরাপদ জায়গাগুলো শিখিয়ে দেওয়া, অথবা বিপদে কিভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখতে হবে তা বুঝিয়ে দেওয়া। সবসময় কি আমাদের কারও জন্য থাকা সম্ভব হয়? যদি হতো, তাহলে আমরা কেউই আলাদা আলাদা সৃষ্ট হতাম না।
নিবৃতা বুঝেছে সবটা। বেশ ভালোমতোই বুঝেছে। আসলে শিক্ষক যেখানে নিবৃতার একান্ত ব্যক্তিগত মানুষটা সেখানে বিভ্রান্তি জাগার প্রশ্নই আসে না। নিজেকে সামলালো নিবৃতা। ওড়না টেনে মুখ মুছলো।
– সম্ভব হলে আমি যেতাম, কিন্তু আমার সময় হবে না। তবে তুমি চাইলে, তোমার যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারি।
– লাগবে না। ঝিলমিল একাই যাবে।
নিবৃতা নাকোচ করলো। তাবিব আর জোর করলো না। ও তো এটাই চেয়েছিলো। বরঞ্চ ওর ইচ্ছে, পরের ট্যুরটা ওর ছোট্র পরিবারটা মিলেই দিবে৷ কাওকে ছাড়া হবে না।
– কে কে যাচ্ছে ট্যুরে?
– এই তো, আপা, আমার দুই ভাগনি আর তানহা।
উসখুস ভঙ্গিতে চেয়ে নিবৃতা বলে,
– আপনার দুলাভাই?
– ভাইয়ার কাজ আছে।
– আর উনার ছেলে?
আপন মানুষদের মাঝেও এতো ভয়! অবশ্য যথার্থই। কেউ-ই বিশ্বাসের নয় আজকাল। তাবিব কিছু মনে করলো না।
– ওর কাজ পরে গিয়েছে। একচুয়ালি ওর জায়গায়ই তো তানহা যাবে।
নিবৃতা হাপ ছাড়লো একটা। তাবিব সেটা লক্ষ্য করে বললো,
– ভয়ের কিছু নেই। আপাই তো ছোটবেলায় তানহাকে দেখে রাখতেন। আপা আমার থেকেও অনেক বেশি স্ট্রিক্ট!
তার মুখের উপর না করাটা আমার জন্য সত্যিই অনেক কষ্টের ছিল!
– আচ্ছা।
অবশেষে বোকারানী নিবৃতা মানলো তাবিবের কথা। তবে মনের খচখচানিটা মিটবে না। কিন্তু তাবিব যেহেতু বলছে, ভালো কিছুই হবে, তাহলে আর নিবৃতা বিরোধিতা নাই করলো!
এরপর আর কি? তানহাকে যখন অনুমতি দেওয়া হলো, জানানো হলো যে, সে যাচ্ছে! তখন ওর খুশি ঠিক রংধনুর সাতটে উজ্জ্বল রঙের মতোই জ্বলজ্বল করে উঠলো। কি ভীষন উৎসাহ তার। বোনদের সাথে ভিডিও কলে দীর্ঘ আলাপ জমিয়েছে। কোথায় যাবে, কি করবে, কি পরবে সব এখনই ঠিক করে নিচ্ছে। এক ঝাক শপিং করেও এসেছে ইতিমধ্যে। মনে ওর মা’কে ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট উদয় হলেও নিবৃতার শক্ত মনোভাব ওকে নরম হতে দেয় নি। বরঞ্চ ওর উদ্যম ও আগ্রহ বাড়াতে নিজেই ওর সাথে নানান বিষয় নিয়ে আলোচনায় মেতেছে। এদিকে তাবিব তো ঘোষনাই করেছে যে, কয়েক মাস বাদে ও কাজ থেকে একটু ছুটি নিবে। তখন ওরা পুরো বাংলাদেশ ঘুরে বেড়াবে। এরপর নাহয় বিদেশ যাবে। এতে তো তানহার খুশি যেন উপচে পরে। নিবৃতা উষ্ণ মনে মেয়ের খুশি দেখে। তাবিব ঠিকই বলে। উড়তে দেওয়া উচিত। আমাদের কাজ শুধু নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দেওয়া। ননাসের সাথে স্বল্প কথায় অভ্যস্ত নিবৃতা সেদিন কত কথা বললো, সবগুলোই তানহাকে দেখে রাখার বিষয়ে। তাকরিমা হ্যা তে হ্যা মিলালেও পরে ভাইকে নালিশ জানাতে ভুলে নি।
– হ্যা রে তাবিব! আমি কি তোর মেয়েকে নিয়ে গুম করে দিবো? তোর বৌতো আমাকে বিশ্বাসই করে না।
তাবিব কিছু বলে নি। শুধুমাত্র হেসেছিল। আপাত দৃষ্টিতে বিষয়টি একটু অতিরিক্ত দেখালেও তাবিব বেশ সন্তুষ্ট। ওর মেয়েকে নিয়ে কেউ এতোটা ভাবে, নিজের জীবনের কেন্দ্র বিন্দু বানিয়ে রেখেছে, এটা জানার পর কি আর কোন আফসোস থাকে? এই বোকা বোকা মেয়েটার এই সরল, শুদ্ধ কাজেই তো তাবিবের ভালোবাসার গাঢ়ত্ব বাড়ে৷ অকারণে ভালোবাসলেও এই কারণগুলো ভালোবাসার যথার্থতা বুঝিয়ে দেয়। চোখে আঙুল দিয়ে নিজের সার্থকতা দেখিয়ে দেয়।
সময় দ্রুত ফুরিয়ে যায়। তানহার লম্বা সফরের ব্যবস্থা করতে করতেই অল্প কয়েকটা দিন চোখের পলকে পেরিয়ে গিয়েছে। বর্তমানে তাবিব ও নিবৃতা এসেছে তানহাকে বিদায় জানাতে৷ অবস্থান বিমানবন্দরে। তানহাকে বাকিটুকু পথ একাই যেতে হবে। অতঃপর ও যখন পৌছাবে তখন ফুফু থাকবে ওর অপেক্ষায়। যদিও তানহা ভিতরে ভিতরে ভীষন রোমাঞ্চকর অনুভুত করছে, চটপটে সে দারুণ অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য উদগ্রীব। কিন্তু ও যতটাই সাহসী, ওর মা ঠিক ততটাই ভীতু স্বভাবের। বাসা থেকে এই পর্যন্ত আসার পুরোটা সময় নিবৃতা শুধু চুপচাপ দোয়াই করে গিয়েছে। নানান দরূদ পাঠ করে বারংবার ওর শরীরে বুলিয়ে দিচ্ছে। অথচ ওর হাতটা পর্যন্ত কাপছে। কথা বলতে হিমশিম খাচ্ছে। তাইতো কিছু বলতে গিয়েও নিজেকে আটকে রাখছে তানহা। যে চায় না নিবৃতাকে কষ্ট দিতে। বিমানবন্দরে আগামী ফ্লাইটের ঘোষনা হতেই তাবিব তাড়া দিয়ে উঠলো। তানহার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
– শক্ত রাখবে নিজেকে। প্রয়োজনে নার্ভাস হবে না মোটেও। সাহায্যের জন্য ডেকে নিবে তৎক্ষনাৎ। ঠিক আছে?
তাবিবকেও ভীষন চিন্তিত দেখাচ্ছে। মেয়ে খুশি হবে ভেবে প্রথমে এই সিদ্ধান্ত নিলেও এখন এতো দুরে, একা পাঠাতে ওর ভীষন ভয় হচ্ছে। মেয়ের চিন্তায় কন্ঠ তালু অবদি শুকিয়ে আসছে। বাবার শুকনো মুখ দেখে তানহা ফিক করে হেসে দেয়। সাহসী গলায় বললো,
– তোমার কি মনে হয়, আমি ভয় পাওয়ার মতো মানুষ?
মেয়েটা তার হয়েছে একদম ভিন্ন! অতুলনীয়। তাবিব আদরে ওর ললাটে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দেয়। বাবার সাথে কথা বলে তানহা ওর মা’য়ের কাছে যায়। যে তখন, মাথা নিচু করে বসে ছিল। শত চেষ্টা করেও দুর্বল, ভগ্ন দশা সে লুকাতে ব্যর্থ। তানহার মন খারাপ হলো। নিবৃতাকে এক পাশে জড়িয়ে ধরে বললো,
– তুমি না চাইলে আমি যাবো না।
আঁখি যুগল ভিজে এসেছে। নিবৃতার অন্তঃস্থল ভীষন কাতরে উঠছে। তবুও নিজেকে শক্ত দেখালো। মুখ তুলে মেয়েকে নিজের আশ্রয়ে নিয়ে নিলো। কিছুই বললো না। মাঝেমাঝেই স্পর্শই অত্যন্ত ক্ষমতাধর হয়ে উঠে।
দু’জন থেকে বিদায় নিয়ে তানহা চললো টার্মিনালের ওপারে। তাবিবও গিয়ে চুপচাপ বসে পরলো নিবৃতার পাশে। দু’জোড়া চোখ এক চিত্তে তাকিয়ে রইলো যতক্ষণ না তানহা দৃষ্টির আড়াল হয়। ও মিলিয়ে যাওয়ার পরও ওরা চুপটি করে অপেক্ষায় রইলো। একসময় যখন বিমান উড়ে যাওয়ার ভারি শব্দ হলো তখন এই দুটি মানুষের অন্তঃকরণ ভেদ করে এক শ্বাস বেরিয়ে এলো।
– চলো যাওয়া যাক।
নিবৃতা সায় জানিয়ে উঠে দাড়ালো। দু’জনে বের হয়ে গেলো বিমানবন্দর থেকে। এই স্থানটি সবসময়ই এরূপ জনবহুল হয়। এখানকার মানুষগুলোর অবস্থাও হয় দু ধরনের। একদল স্বজন বিদায়ের দুঃখে কাঁদে, আরেক দল আপনজনের আগমনে সুখে কাঁদে। এখনও বেশ উত্তপ্ত পরিবেশ। ওরা পার্কিং লটের দিকে এগোতেই তাবিব আচমকা থামলো। রাস্তার ওপরারে নজর পরতেই বললো,
– মাসিক বাজার শেষের পথে না?
– জ্বি।
– চলো একেবারে নিয়েই যাই।
– আচ্ছা।
রাস্তা পার হতে হবে। চোখের সম্মুখে দুরন্ত গতিতে যানবাহন ছুটছে। কি তীব্র বেগ তাদের! একে অপরকে টেক্কা দেওয়ায় তারা মশগুল। সময় সংকুলানে মরিয়া! নিবৃতা নিভু নিভু দৃষ্টিতে দেখে চললো সবটা। এরূপ ব্যস্ত পরিবেশ ওর মাঝে অস্বস্তি জাগায়। ওকে জড়োসড়ো হয়ে আসতে দেখেই তাবিব আগ বাড়িয়ে অকস্মাৎই ওর একটা হাত শক্ত করে ধরে ওর পুরো অস্তিত্বটাকেই নিজের কাছে টেনে নিলো। জমজমাট সড়কের দিকে তাকিয়ে বললো,
– চলো তোমাকে রাস্তা পার হওয়া শিখাই আজ!
লোকটা বলেছিল, রাস্তা পার হওয়াটা নাহয় সে নিবৃতার হাতটা নিজের হাতে ধরে শিখিয়ে দিবে৷ কোন কথাই সে ভুলে না। একটুও হেরফের হতে দেয় না। নিজের দায়িত্ব, কর্তব্য, ওয়াদাগুলো নিপুনভাবে পালন করে। মাঝে কোন ফাঁকফোকর থাকে না। নিখুঁত! নিবৃতা শুধু অনুভব করে লোকটা ওকে নিয়ে এগোচ্ছে। এই স্পর্শের মাঝে যত্ন, খেয়াল, ভরসা সব রয়েছে। রয়েছে নিবৃতা একান্ত অভিভাবক হওয়ার দায়িত্ব। ওর কর্নধার ছুঁয়ে যাচ্ছে তাবিবের দেওয়া একের পর এক দিকনির্দেশনা। ঠিক কিভাবে কি করতে হয়, কখন এগিয়ে যেতে হবে, সেটাও বুঝিয়ে দিচ্ছে। আর নিবৃতা তাকে নিষ্ঠার সাথে অনুসরণ করছে।
নিবৃতা পর্ব ১৫
তানহা নামক যেই সুতোয় দুজন মানুষ বাঁধা পরেছিলো, নিবৃতা পেয়েছিলো নতুন আরম্ভের কারণ, আজ সেই-ই ওদের থেকে বহু দুরে। দৃষ্টির বাহিরে। ঝিলমিলে অভ্যস্ত এই নতুন জীবনটা, ঝিলমিলকে ছাড়া, নিবৃতার ঠিক কেমন কাটবে, ওর পরিবর্তনগুলো কিরূপ হবে, কিংবা তাবিব নামক পুরুষটার একাগ্র উপস্থিতিতে ওদের সম্পর্কটা ঠিক কোন দিকে ঘুরবে সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা!
