Home নিবৃতা নিবৃতা পর্ব ৩২

নিবৃতা পর্ব ৩২

নিবৃতা পর্ব ৩২
নেহার ছায়ালিপি

ফারুকী নিবাসের সেই চিরচেনা নীরবতা আজ ভেঙে গিয়েছে। স্থবিরতার বদলে জায়গা করে নিয়েছে নিদারুণ চঞ্চলতা। নিষ্প্রাণ বাতাবরণে আজ উচ্ছ্বাস ঘুরে বেড়াচ্ছে। সরব পরিবেশ। খাবার টেবিল মুখরিত হয়ে আছে বিশেষ একজনের উপস্থিতিতে এবং সাথে আছে তার জন্য করা মহা আয়োজন। সবকিছু দেখে, নিভানের মাঝে উঁকি দিচ্ছে, সোনালি সেই অতীতের দৃশ্যপটগুলো। পিছে ফেলে আসা সুন্দর দিনগুলি। এভাবেই সকলে মিলে আনন্দ মুহুর্ত কাটানো হতো, অথচ এখন সেগুলো সব মস্তিষ্ক নামক সিন্দুকের ভেতর ধুলো জমা স্মৃতির খাতা। যাদের যত্ন করতে ভুলে গিয়েছিল নিভান। কিছু কিছু সময়ের মাহাত্ম্য ঠিক এতোখানি যে, সেগুলো পরবতীতে চাইলেও কোনভাবে পুনরায় সাজানো যায় না। মানুষের উপস্থিতি, হৃদয়ের অনুভূতি ও পরিবর্তিত মানসিকতা, আপাতদৃষ্টিতে ধরা না দিলেও, তাদের তারতম্য খুবই বড় কিছু। বুক চিরে আসা দীর্ঘশ্বাস আড়ালে গোপন করে নিভান।

– আম্মু ফজরের পর একটুও ঘুমায় নি। সারাদিন ছুটোছুটি করে, একা হাতে এতোকিছু সব আপনার জন্য রান্না করেছে মামা!
তানহা প্রফুল্ল কন্ঠে বলতেই ঘাড় বাকিয়ে বোনের দিকে তাকায় নিভান, যে আপাতত সবার পাতে খাবার তুলে দিতে ব্যস্ত। তার কাধের আঁচল পেঁচিয়ে রাখা। কাজের তালে দুলে ওঠা দু হাতে মোটা দুই সোনার বালা! পুরোদস্তুর গৃহিণী। যতটা মন্দ লাগতে পারে ভেবেছিল, বোনের নতুন জীবনের এই নব্য রূপটা ততটাও খারাপ লাগছে না নিভানের কাছে। পরিনত এক নিবৃতাকে দেখছে ও। হয়তো সময়ের ফারাক একেই বলে!

– নিবুটা তো আগে, চুলোর আগুন দেখলেই ভয় পেয়ে দৌড়ে পালাতো! আর সে কি না সে এখন বড় ভাইয়ার জন্য রান্নাও করে। আ’ম ট্রুলি টাচড্ নিবু। থ্যাংক ইউ।
নিভান হাসোজ্জল সুরে বলতেই, মাথা নুইয়ে, গাল ভরে হাসলো নিবৃতা। ভাইয়া খুশি হয়েছে এতেই তো খুশি সে! আরও উদ্বুদ্ধ হয়ে একেকটা খাবারের পদ এগিয়ে দিতে লাগলো ও৷
– রত্না তো কলই রিসিভ করছে না আমার। তোর সাথে বাসায় এলো না কেন? কোন সমস্যা হয়েছে?
শিউলি চিন্তিত কন্ঠে বলে উঠতেই নিভানের মুখের আদল কিছুটা শক্ত হয়ে এলো। তবে এরকম মনোরম পরিবেশ মোটেও নষ্ট করতে চাইলো না ও। দৃষ্টি অবনত রেখে, নরম গলায় বললো,
– কিছু কিছু জিনিসের নিজস্ব সময়ের প্রয়োজন হয়। আমরা এ বিষয়ে পরে কথা বলবো।
এরূপ উত্তরে শিউলি একদমই সন্তুষ্ট হলেন না। তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন,
– কিসের সময়? এতো বছরের বিয়ের সম্পর্কে এই প্রথম তোদের দেখা হলো। সেখানে এখন আলাদা থাকা কতটুকু যৌক্তিক?

পরিবেশে গাম্ভীর্যতা নেমে এলো হঠাৎ। সকলের মুখ থমথমে। তাবিবের মনে হলো, এই কথোপকথনে ওর উপস্থিতি বড়ই বেমানানান। এদিকে নিবৃতাও প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। এতগুলো বছর রত্না, চাতক পাখির ন্যায় নিভানের অপেক্ষায় ছিল। আর আজ যখন অবশেষে ওর অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটেছে, সেখানে ও নিজেই অনুপস্থিত কেন?
– কোনকিছুই অযৌক্তিক নয় এখানে। আমাকে একটু ধীরস্থির হতে দাও। সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
ক্লান্ত ছেলেকে আর ঘাঁটাতে ইচ্ছে হলো না শিউলির। ছেলে তার যথেষ্ট বুঝদার। যেহেতু বলেছে সমস্যার সুরাহা হয়ে যাবে, তাহলে নিশ্চয়ই কিছু একটা ভেবে রেখেছে সে। অথচ তিনি বুঝলেনও না যে, কোনপ্রকার গোলযোগ মিটানোর সাধ তার ছেলের নেই, বরঞ্চ গোটা সমস্যার মূলকেই গোড়া থেকে টেনে উপড়ে ফেলার ব্যবস্থা করছে সে!
– নিবু তুমিও বসে পরো। উই ক্যান হেল্প আওয়াসেল্ভস্।
ভাইয়ের কথায় নিবৃতাও সকলের সাথে যোগ দিলো। একদম তাবিবের ঠিক পাশের জায়গাতেই নিজ অবস্থান ঠিক করে নিয়েছে নিঃসংকোচে। অথচ অপর দিকে, তানহার পাশের চেয়ারটাও স্পষ্ট উন্মুক্ত ছিল। তাবিব একবার আড়চোখে ওকে লক্ষ করে, নিজ থেকেই ওর প্লেটে ভাত তুলে দিলো। নিবৃতা বুঝলো না ওর এতে একটু খুশি হওয়া উচিত না ওর রাগের স্তর আরও পুরু হয়ে গেলো। স্বেচ্ছায় নিবৃতার পরোয়া করছে না লোকসমাগমে আপন মান বজায় রাখার সামান্য চেষ্টা! বোকা মস্তিষ্ক বুঝতে পারছে না।

– আশ্চর্য! এটা সত্যিই নিবুর হাতের রান্না?
নিভান বিস্ময়ে বলে উঠতেই নিবৃতা জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে চাইলো।
– তোর বোন এখন পাক্কা রাধুনি হয়ে গিয়েছে।
শিউলি হেসে বলতেই নিভানের মুখশ্রী চকচক করে উঠলো। বেশ আমোদে খেতে খেতে বললো,
– যতগুলো গিফট এনেছি, সেগুলো সব কম পরে যাবে। নিবুর হাতের রান্নার সামনে ওগুলো একটাও পোষাবে না।
– তোমার ভালো লেগেছে, এতেই আমি খুশি। আর কিছু লাগবে না।
নিবৃতা মিষ্টি প্রত্যুত্তর করতেই নিভান রসিক গলায় বললো,
– বড় হয়ে তাতে কি? আমার সামনে এসব ভাব ধরলে হবে না। সেই ছোটবেলায় তো ঠিকই, বড় ভাইয়া চক্কেট দাও, আইত্তিম আনো নি? মজা খাবো, বলে বলে কান পচিয়ে দিতে।
সকলের মুখে হাসির স্ফুরন জাগলেও নিবৃতার খুশি ম্লান হয়ে এলো। শৈশবের সেই রঙিন স্মৃতি, তার মস্তিষ্কে জমায়িত দৃশ্যাবলী থেকে মুছে গিয়েছে। জীবনের সবচাইতে সুখী সময়গুলোর কিছুই যে এখন আর মনে নেই। কেউ না খেয়াল করলেও, নিবৃতার সেই বুঝদার মানুষটা ওর স্তিমিত হাসির পেছনে থাকা বিষাদের ছায়া স্পষ্ট পড়ে নিলো। সেই সরল মুখের মাঝে লুকায়িত ব্যথায় পীড়িত হলো তার মন।

– তাবিব! খাচ্ছেন না কেন? না-কি নিবুর হাতের রান্না আপনার পছন্দ নয়?
অন্য চিন্তায় ধ্যানমগ্ন তাবিব বেখেয়ালে, আনমনে প্লেটে হাত চালিয়ে যাচ্ছিল। মাঝে নিভানের কন্ঠে চোখ তুলে চায়। নিরেট সেই মুখে এক শ্লেষাত্মক হাসি। তাবিবের মেজাজ খারাপ হলো এ পর্যায়ে। ভ্রু গুটিয়ে এসে কপালের মধ্যভাগে জায়গা করে নিলেও তাবিব নিয়ন্ত্রণ হারালো না। বরঞ্চ মুহুর্তে ঠোঁটে বিস্তর হাসি ফুটিয়ে নিবৃতার পানে তাকালো। যে কেন যেন, কোন এক বিশেষ কারন বশত এদিকেই দৃষ্টি রেখেছিলো। মুখের আদলে জিঘাংসা স্পষ্ট।
– আমার মা’য়ের পর, একমাত্র নিবেদিতাই তার রান্নার মাধ্যমে আমাকে আপন নীড়ের স্বাদ দিতে পেরেছে। তাই, পছন্দ শব্দটা এর সম্মুখে নিতান্তই অতি সামান্য।
ওষ্ঠ জুড়ে প্রস্ফুটিত লাজুক সেই হাসির ছটা প্রেমিক মনে গভীর আলোড়ন তুললো। ইচ্ছে করলো একটু ছুঁয়ে দিয়ে, নিজেকে স্বার্থক করতে! কিন্তু কিছু কিছু ইচ্ছেকে প্রশ্রয় না দিলেই ভালো। তাবিব তার নড়বড়ে দৃষ্টি সরাতেই কারো এক তীক্ষ্ণ নজর ঠিকই নিবৃতাকে পরোখ করলো। স্পষ্ট করে দেখলো, সেই মুখে ছড়িয়ে পরা সুখময় ঝিলিক!

বসার ঘরে আবারও আড্ডার আসর বসেছে। অনর্গল কথা বলা, খিলখিলিয়ে হেসে ওঠা, সবই চলছে পাল্লা দিয়ে। সবচেয়ে বেশি খুশি, সকলের মধ্যনমনি তানহা। নিজেকে প্রফুল্ল রাখার সাথে সাথে সকলের মাঝেও উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে দিতে মশহুর সে। সকলের মধ্যে তানজিব এবং তার মিসেসই শান্ত প্রকৃতির। নীরব দর্শকদের কাতারে নিজেদের নাম লেখিয়েছে তারা।
– এতো সুন্দর!!!
নিভান ওর নায়াগ্রা ফলসে ভ্রমনের সারসংক্ষেপ শোনাচ্ছিলো তানহাকে। সাথে ভিডিওতে ধারন করা প্রকৃতির সেই মনোরম দৃশ্যও দেখাচ্ছিল।
– নেক্সট টুরে গেলে এখানে আমি যাবোই যাবো!
নিভান হেসে বলে,
– আচ্ছা তাহলে আমি তোমার গাইড হবো।
– অবশ্যই!
মেয়ে তার অল্পতেই খুশি হয়ে যায়। তাবিব দেখলো তবে ওর এখানে আর থাকতে ইচ্ছে হলো না। তাছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কাজও রয়েছে কিছু। ও মিলনায়তন ভঙ্গ করতে শিউলিকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,

– আজ আমাকে উঠতে হবে মা।
শিউলি অবাক হয়ে বললেন,
– এখনই? আমি তো আরও ভেবেছি আজ তোমরা থাকবে বাবা। সেই অনুযায়ীই তো সব আয়োজন করেছি।
তাবিব আন্তরিক হেসে বললো,
– কিছু মনে করবেন না মা। আসলে, আগামীকাল গুরুত্বপূর্ণ একটা সার্জারি আছে আমার। সেটারই কিছু কাজ রয়েছে। এখান থেকে বের হয়েই আগে হসপিটালে যাবো।
কর্মক্ষেত্র যখন মাঝে চলে আসে তখন আসলেই কিছু বলার থাকে না। শিউলি পরাজিত হয়ে বললেন,
– আচ্ছা বাবা, তাহলে কি আর বলবো। তোমার যেভাবে সুবিধা হয়।
– ধন্যবাদ মা।
তাবিব উঠে দাড়িয়ে তানহাকে তাড়া দিয়ে বললো,
– তোমরা তৈরী হয়ে এসো, যাও।
তানহা বিরোধ করে কিছু বলবে, তার আগেই নিভান উঠে এলো।

– আপনি কর্মব্যস্ত মানুষ। কাজ নিয়েই ডুবে থাকবেন। কিন্তু নিবু আর তানহার তো কোন কাজ নেই। ওদের নাহয় আজ রেখেই যান। সময় বের করে সহজে তো আর ঘুরতে আসা হয় না এখানে।
তাবিব আর কি বলবে? মেয়ের দিকে তাকাতেই দেখে সে এক পায়ে দাঁড়িয়ে। আজ এখানেই থাকবে। মেয়ের ইচ্ছে। তাবিবের কি আর সাধ্য মানা করার। ও মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,
– থাকো তাহলে তোমরা।
– থ্যাঙ্কিউ বাবা!
তানহার হাসোজ্জল জবাব পেয়ে তাবিব নিবৃতার পানে চায়, যে সকল পরিস্থিতিতেই নিরপেক্ষ মানুষ। এখনও নির্বিকার বনে তাকিয়ে।
– আসুন।
নিভান পথ এগিয়ে দিচ্ছে। তাবিব চুপচাপ তার সাথে বের হয়ে গেলো বসার ঘর থেকে।

– অযথা কোন এক বিষয়কে টেনে বড় করার অভ্যাস নেই আমার। আমি আজ রাতেই নিবুর সাথে কথা বলবো।
নিভানের আপোষহীন স্বরের প্রত্যুত্তরে তাবিব মৌন রইলো। কিছু বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। মনে আজ একটুও বল নেই।
– হতে পারে, আগামীতে নিবু আর কখনোই ফিরে যাবে না। আজই শেষ। ও শুধু একবার বললেই হবে। আমি ওর কোন চাওয়াই অপূর্ণ রাখবো না।
নিজেকে এক ঘোরের মাঝে আবিষ্কার করলো তাবিব। দুঃখবোধ করার হলেও, সবকিছু কেমন অনুভূতির বাহিরে ঠেকছে। শুধু বুঝতে পারলো, ওর কন্ঠতালু আজন্ম তৃষ্ণার্থের ন্যায় শুঁকিয়ে চৌচির। কোন প্রকার শব্দ উচ্চারণে বেশ কষ্ট হলেও, ও শুধু বললো,
– তার খুশিতেই আমার সন্তুষ্টি।
নিভানের কাছে কথাটি বেশ হাস্যকর শোনালো। এরকম আদোও হয় না-কি? ভালোবাসা নামক শব্দটি সর্বদাই ওর নিকট বাহুল্য ঠেকে। এসব অতিরঞ্জিত এবং অতিমাত্রায় নাটকীয়! ও ব্যঙ্গ করে কিছু বলবে তার আগেই নিবৃতার উপস্থিতি দেখা গেলো। সুন্দর মতন মাথায় ঘোমটা টেনে, নত দৃষ্টি রেখে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো স্বামীকে বিদায় জানাতে এসেছে। নিভান আর কথা এগোলো না। তাবিবের বাহু চাপড়ে দিয়ে বললো,

– আবার দেখা হবে।
– জ্বি অবশ্যই।
নিভান চলে যেতেই, তাবিব নিবৃতার দিকে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালো এবং তাকিয়েই থাকলো। এক মুহুর্তের জন্য না ওর নজর হটলো, নাই-বা চোখের পলক অবদি পরলো। কেমন নিষ্পলক, অবরিত চাহনি। নিজের উপর জহুরি এই নজর উপলব্ধি করতে পেরে অপ্রস্তুত হলো নিবৃতা। শাড়ির আঁচলের শেষ প্রান্ত গুটিয়ে আঙুলের ভাজে পুুরতেই, নাসারন্ধ্রে আতরের সুবাস পৌছলো। মানুষটা কাছে এসে দাঁড়িয়েছে তাহলে। দৃশ্যপটে লম্বাটে অবয়ব দেখা দিলো। মাত্র কয়েক ইঞ্চির দুরত্ব। অধিকারের বলে, সহজেই সেটুকু
অতিক্রম করা যেত। তবে মামুষটা আর এগিয়ে এলো না। শুধু বাতাসে ফিসফিসানির মতোন শোনা গেল তার ম্লান কন্ঠ,
– ভালো থেকো নিবেদিতা। তোমাকে সামান্য খুশি করতে পারলে, এই আমিটা একটু হলেও স্বার্থক হবো।
নিবৃতা বুঝলো না সেই কথার মর্মার্থ। উত্তরের আশায় উন্মুখ হয়ে উঠতেই দেখলো সে নেই। চলে গিয়েছে। সবটা কেমন যেন ফাঁকা, শূন্য।

হাইওয়ের বুকে, স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি গতিতে ছুটছে তাবিবের সাদা রঙা গাড়িটি। হুইলের উপর শক্ত হাতের চাপ পরছে ক্ষনে ক্ষনে। সর্বদা শান্ত থাকা মনটা আজ বড্ড অস্থির। বেপরোয়া হয়ে উঠতে চাইছে প্রতি পল। পরিস্থিতি ভিন্ন, সময়ের বিস্তর ফারাক। তবুও সেই বিষাদগ্রস্ত অনুভূতিগুলো কিভাবে যেন ঘুরেফিরে একই ভাবে তাবিবের কাছে ধরা দেয়। একাকিত্ব, পরিবার থেকেও নিঃসঙ্গতা। সর্বস্ব দিয়েও হেরে যাওয়ার কষ্ট। সবই পরিবর্তনশীল, তবে তাবিবের জীবন যেন একই চক্রে ঘুর্নায়মান। দুঃখের নীল বি/ষে ডুবন্ত। পাড়ে এসে শ্বাস নেওয়ার উপায় নেই। তাবিবের অন্তঃস্থল ভীষন করে কাতরায়। চোখের তারায় ভেসে উঠে জীবনের নানান মোড়ে পাওয়া সকল না ভোলা আঘাতগুলো। যাদের চিহ্ন মিটে গেলেও, বারেবারে পাওয়া ক্ষতগুলো এখনও সেই ব্যথাকে জীবিত করে রেখেছে।

অন্তরীক্ষের বুকে প্রতীয়মান উত্তপ্ত দিবাকর। গ্রীষ্মের প্রবল দাবদাহ। তবুও অসুস্থতায় শিরশিরে ঠান্ডার প্রকোপে গুটিয়ে গিয়েছেন তিনি। জ্বরের তাপে থরথর করে শরীরটা কাঁপছে। প্রতিটি অঙ্গে সে কি অসহনীয় পীড়া! সোজা হয়ে বসে থাকা দ্বায়! মৃদু ব্যথাতুর শব্দে গুঙিয়ে উঠে, দেহটা হেলে পরতেই দুটো নড়বড়ে হাত তাকে সামলানোর আপ্রান চেষ্টা করলো। সর্বোচ্চ বল খাটিয়ে আঁকড়ে ধরে, নিদারুণ অসহায় সুরে বলে উঠলো,
– মা!
অসুস্থ রমনী নিজেকে নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস চালান। হাসপাতাল বেডের গদিতে হাত ঠেকিয়ে নিজেকে সামলে উঠেন সামান্য। চোয়াল ভাঙা, পাণ্ডুর মুখ উচিয়ে, দুর্বল চোখে তাকিয়ে দেখেন, তাঁকে পাকড়াও করে বসে থাকা কাতর মুখটির পানে। যেখানে ভয়, সংশয় এবং মায়ের জন্য চিন্তা সবটাই স্পষ্ট। ছোট মুখটা কি করুন দেখাচ্ছে! চোখের দৃষ্টি হতবিহ্বল, উদ্ভ্রান্ত! তার মাতৃ হৃদয়ে হাহাকার জন্মে। নিদারুণ মায়ায় শীর্ণ, রুগ্ন হাতটি বুলিয়ে দেন ছেলের মাথায়।
– মা, ঠিক আছি। ভয় পায় না।
ঠিক আছি বললেও, মা যে ঠিক নেই সেটা তাবিব জানে। মরণ ব্যাধি রোগ যার শরীরে বাসা বেঁধেছে, সে আর কিভাবেই বা ঠিক থাকতে পারে। তবুও সৃষ্টিকর্তার কোন এক দয়ায় এতগুলো বছর লড়াই করে তিনি এখনও বেঁচে আছেন। তবে এখন বোধহয় প্রাণবায়ু নিভে যাওয়ার অন্তিম প্রহরে তিনি। স্বাভাবিক জীবন যাপন ব্যহত হচ্ছে। প্রতিটি শ্বাস টেনে নেওয়াও যেন কষ্টসাধ্য! সেই একজনের করুনায়, দীর্ঘ মেয়াদি চিকিৎসার মাধ্যমে আয়ু বর্ধিত হলেও এই হায়াতে কোন স্বস্তি নেই।
তাবিবের কান্না পায়। বড় আপুই সবসময় মায়ের সাথে হাসপাতালে আসে। মা’কে সাহায্য করে। সে এসবে পটু এখন। তবে আজ তার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। মাঝখানে মায়ের শরীরটা হঠাৎ করেই ভীষন খারাপ করে। তাই উপায় না পেয়ে তাবিব তাকে নিয়ে ছুটে এসেছে এখানে। তবে তরীর চিকিৎসার দায়িত্ব যে ডাক্তারের উপর ন্যস্ত, তিনি এখানে উপস্থিত নন। তাকে জরুরি ভিত্তিতে তলব করা হচ্ছে, কারণ ঢাকার খ্যাত শিল্পপতির স্ত্রী তিনি। সকলেই বেশ সমীহ করে চলে তাকে। এক ডাকেই সব প্রয়োজনীয় সামগ্রী হাজির করা হয়।

– তুমি একটু শুয়ে থাকো মা।
তরীর শীর্ণকায় শরীরটা ভেঙে আসছে। মনে হচ্ছে যেকোন সময় চেতনা হারাবেন। বল খুইয়ে বিছানায় পরতেই ক্ষীন আর্তনাদ করে উঠেন।
– বাবা একটু পানি দাও তো মা’কে।
আসেপাশে তাকায় তবিব। পানির কোন অস্তিত্ব নেই। আপু সাথে আসলে পানি থেকে শুরু করে মা’য়ের সকল ঔষধপত্র সুন্দর মতন গুছিয়ে নিয়ে আসে। তাবিব এগুলো কিছুই পারে না। ওকে আসলে কখনো এগুলো করতেই দেওয়া হয় নি! ও নেমে আসে বিছানা থেকে।
– একটু অপেক্ষা করো। আমি নিয়ে আসছি।
কেবিন থেকে ছুটে বেরিয়ে যায় তাবিব। অনতি দূরেই পানির ফিল্টার দেখা যাচ্ছে। সে পথে এগোতেই পাশের কেবিন থেকে পরিচিত এক মুখকে হেঁটে আসতে দেখে ও। ভীষন আপন সে। তবে তাকে এ সময়ে কখনও কাছে পাওয়া যায় না। মা বলে, তিনি খুব ব্যস্ত। তাবিবরা যেন ভালো থাকতে পারে, মায়ের দামি চিকিৎসা যেন নির্বিগ্নে চলে, সে জন্য মানুষটা সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। এতোটাই ব্যস্ত যে, বেশিরভাগ সময় রাতে বাসায়ও আসতে পারেন না তিনি। আগে আর আগমনের অপেক্ষায় বসে থাকলেও, এখন আর তাবিব তার পথ চেয়ে রাত জাগে না। ঘুমিয়ে পরে মায়ের কোলে। কিন্তু আজ প্রয়োজনের সময় তাকে উপস্থিত পেয়ে, তাবিবের মুখে হাসি ফুটে। মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে আসে একটি শব্দ!

– বাবাহ!
অপর পাশের ভদ্রলোক কিছু কাজ মনে পরায় আবারও কেবিনের ভেতরে চলে যান। এতেই তাবিব ছুট লাগায়। বাবাকে যে খুব দরকার এখন। এ প্রান্তে দৌড়ে আসতেই কেবিন থেকে আরও দু’জন মানুষ বেরিয়ে আসে তৎক্ষনাৎ। একজন রমনী। যার হাতে আঁকড়ে ধরা আরেকটি ছোট হাত। তাবিব তাদের উপেক্ষা করতেই নারী কন্ঠটি ভেসে এলো,
– কোথায় যাচ্ছো তুমি? ভেতরে ডাক্তার আছেন।
মিষ্টি কন্ঠ, ঠোঁটে হাসি। তবুও ভীষন অপরিচিত। তাবিব মিইয়ে গেলো জৈষ্ঠ্য কাওকে দেখে। মিনমিন করে বললো,
– বাবার কাছে যাচ্ছি।
ভদ্রমহিলার মুখের আদলটা তৎক্ষনাৎ বদলে গেলো। আপন স্ফীত উদরে হাতটা রেখে, ভ্রু কুঁচকে বললেন,
– তুমি কি তানজিব?
অচেনা কারও মুখে নিজের নাম শুনতে পেয়ে তাবিব হকচকালো।
– আপনি আমার নাম জানলেন কিভাবে আন্টি?
– আন্টি না। আমি তোমার আরেক মা হই।
নারী মুখটিতে দূর্ভেদ্য এক হাসির রেখা। আরেক মা? মা কয়টা হয়? একটাই তো! তাবিবের কেমন যেন লাগলো! ও কিছু বলার আগেই রমনী তার সাথে থাকা বাচ্চাটিকে সামনে এনে বললেন,
– ও হচ্ছে তোমার ছোট বোন। তাহজীবা সরোয়ার তাওশি।
এগারো বছর বয়সী তাবিবের থেকে বছর পাঁচেকের ছোট হবে বাচ্চাটি। কেন যেন তাবিবের ভালো লাগলো না বিষয়টা।

– কিন্ত আমার আপু তো আমার থেকে বড়।
– তাকরিমা তোমার বড় বোন আর তাওশি তোমার ছোট।
বাচ্চাটা নিজেও ভীত হয়ে পরেছে মায়ের হঠাৎ কর্মকান্ডে। নতুন এই মানুষদের সম্মুখে তাবিব যখন বিভ্রান্ত হয়ে পরলো, ঠিক তখনই কেবিনের দরজা ঠেলে উপস্থিত হলেন জাকির সরোয়ার। বাঙালী মধ্যম গড়নের চল্লিশার্ধ এক পুরুষ। পরিপাটি, দামি পোশাক পরনে। ভাব ভঙ্গিমায় স্পষ্ট গাম্ভীর্যতা। বাবাকে দেখেই তাবিবের স্বস্তি মিললো। আগ বাড়িয়ে তাকে ধরার আগেই ওর জায়গা অন্য কেউ কেঁড়ে নেওয়ার মতোই ছিনিয়ে নিলো। নরম সুরে বলে উঠলো,
– বাবা!

জাকির তার মেয়েকে তুলে নিলেন কোলে, পরম আদর ও মমতায়। তাবিবের এগিয়ে দেওয়া, ভরসা কাতর হাত দুটো তখন রিক্ত! ওর বাবাকে অন্য কেউ বাবা বলছে। এর পিছনে থাকা নির্মম বাস্তবতা টুকুন তখন সেই এগারো বছরের তাবিব এক লহমায় বুঝে গেলো। সাথে মায়ের বলা সকল মিষ্টি মিথ্যের পিছে লুকায়িত তিক্ত সত্য উপলব্ধি করতে পেলো। কেন মায়ের প্রয়োজনে বাবাকে পাশে পাওয়া যায় না তার কারন এই নারী। কেন তাকরিমা আর ও, বাবার আহ্লাদ পায় না, তার কারন এই ছোট মেয়ে বাচ্চাটি এবং আগত আরও একজন। মনের মাঝে লালন করা বাবার জন্য সেই শ্রদ্ধেয় স্থানটিতে ফাটল ধরলো। নিমিষে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেলো ভূমিধ্বসের ন্যায়। হতবাক তাবিবকে তখন মাত্র খেয়ালে এলো জাকিরের। তার ছেলে এখানে কি করছে? অন্তরে এক অজানা ভয় হানা দেয়। কিছু বলবেন, তার পূর্বেই দৌড়ে সেখান থেকে চলে যায় তাবিব। ওর প্রতিক্রিয়ায় জাকিরের বুঝতে বাকি থাকে না যে, যে দ্বিতীয় জীবন উনি এতোদিন তার প্রথম পরিবারের আড়ালে রেখেছিলেন, আজ সেটি উন্মুক্ত। লুকিয়ে রাখার আর কোন উপায় নেই।

তরীর তখন জ্ঞান লোপ পাওয়ার জোগার। তন্মধ্যে অস্থির ভঙ্গিতে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এলো তাবিব। আচমকা ছেলের কি হলো, সেটা ভেবে তরী চিন্তিত হলেন। কোনমতে বল খাটিয়ে উঠতেই তাবিব হামলে পরলো তার উপর। ছেলেটা রীতিমতো হিচকি তুলে কাঁদছে। তরী নিজের অসুস্থতা ভুলে গেলেন। ছেলেকে সামলাতে কত কথা বললেন, কিন্তু তাবিব থামলো না। মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে সে দুঃখ উজার করতে মরিয়া। এর মাঝেই তখন দরজায় করাঘাতের শব্দ হলো। দৃষ্টি তুলে তাকাতেই পরপর তিনি খেয়াল করলেন, একজন ভদ্রলোক প্রবেশ করেছেন কেবিনে। কোলে এক ফুটফুটে কন্যা, পেছনে প্রাপ্তবয়স্ক নারী। তরীর নিশ্বাস থমকে এলো। তড়িৎ তাকালেন তার ছেলের দিকে। আজ তাহলে সব শেষ? যেই শ্রম ও নিষ্ঠা দিয়ে, আপন সন্তানদের স্বাভাবিক জীবন দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, সে সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ প্রমানিত হলো। নিজের ভঙ্গুর সত্তা উপেক্ষা করেও তিনি তার বাচ্চাদের জন্য বলীয়ান থেকেছেন। এই নিষ্ঠুর সত্য প্রকাশে না আনার জন্য যত ধরনের মিথ্যা ছিল, সব কিছুর প্রয়োগ করেছেন। ভয়ংকর রোগে আক্রান্ত থেকেও, একই সাথে দু সন্তানদের জন্য বাবা এবং মায়ের দায়িত্ব পালন করে গিয়েছেন। কেন? এই ছোট বাচ্চা দুটোকে যেন অকালে ভয়াবহ মানসিক আঘাতের শিকার না হতে হয়। কিন্তু দিনশেষে সেটা সফল হলো না। আপন ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভালোমতোই অবগত ছিলেন তিনি। তবুও সন্তানদের জন্য বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে গিয়েছেন। মূলত নিজেকেই এসবের জন্য দায়ী মনে হয়েছে সবসময়। কারন কতগুলো বছর আগে, জাকির খুবই নিষ্ঠুর ভঙ্গিমায় কিছু কথা বলেছিনেন তরীকে।

– দেখো তরী, আমারও তো একটা জীবন আছে। আমারও বাকি সবার মতো হাসি খুশী থাকার ইচ্ছে হয়। সুন্দর, স্বাভাবিক জীবন কাটানোর লোভ জাগে। কিন্তু তোমার এই অসুস্থতা, দিন দিন সব কিছু নষ্ট করে দিচ্ছে। বাসায় এলেও শান্তি মিলে না। তোমার অসুস্থ, ভাঙা মুখটা দেখলে সারাদিনের ক্লান্তি আরও বেড়ে যায়। আমি আর এতো ভার টানতে পারছি না।
অসুস্থতা ধরা পরার মাত্র ছ’মাসের মাথায়ই জাকির ক্লান্ত হয়ে পরেছিলেন, অথচ এই ভয়াল রোগ নিজের মাঝে বহন জরে তরী দিব্যি তার সকল কর্তব্য পূরণ করছিলেন। তবুও স্বামীর এই অভিযোগ মাথা পেতে নেন তিনি। কারন সবারই জীবনে সুখী হওয়ার অধিকার রয়েছে। তরী শুধু বলেছিলেন,
– আপনি তাহলে যা চান, তাই করুন। আমার কোন বাঁধা থাকবে না। শুধু বাচ্চাদের জীবনে যেন কোন সমস্যা না হয়।
জাকির মুখে প্রত্যুত্তর করেন নি। কারন, ঠিক তার পরের দিনই, তিনি আসলে কি চাইতেন এতোদিন, সেটা স্পষ্ট কর্মে বুঝিয়ে দেন৷ সালমাকে বিয়ে করে, ভিন্ন নীড়ে দ্বিতীয় সংসার সাজান। নিজের অসুস্থতায় অপারগ ও সন্তানদের প্রতি থাকা নিখাঁদ মমতার টানে তরী ছিলেন নিশ্চুপ। ছেড়ে দিয়েছিলেন স্ত্রী হওয়ার অধিকার। অন্য নারীকে দান করেছিলেন আপন স্বামীর ভাগ।

জড় পদার্থের ন্যায় নিজের স্বামী এবং তার আরেক পরিবারের দিকে, নিষ্পলক তাকিয়ে থাকলেন তরী। জাকিরের পৌরুষ মুখে আবেগের কোন চিহ্ন নেই। নেই কোন ক্লেশের ছায়া। বরঞ্চ ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে পেরে তিনি হয়তো মুক্তভাবে শ্বাস নিচ্ছিলেন তখন। অবয়বে কোন জড়তা কিংবা ভ্রান্তি নেই। তরীর মাঝে চলা অনুভূতিদের প্রলয় তখন ব্যক্ত করা ভীষন কষ্টের! নিজের হতভাগা ভাগ্যকে নাহয় মেনে নিলেন কিন্ত তার নিষ্পাপ ছেলেমেয়েদের কি এগুলো প্রাপ্য ছিল? কোন বাচ্চাই তার জীবদ্দশায় এরূপ কিছুর সম্মুখীন হওয়ার যোগ্য নয়৷ ওদের গোটা জীবন এক লহমায় ভেঙে গুড়িয়ে যায়। আস্থাভাজন পরিবারের উপর থেকো বিশ্বাস উঠে যায়। দুশ্চিন্তা গ্রাস করে নিলো তাকে। এই রোগাক্রান্ত, নিশ্চল দেহে, এই ঝড়ের মুখোমুখি কিভাবে হবেন তিনি? বাচ্চাদের কিভাবে সামলাবেন?
তরীর এই চিন্তা অবশ্য খুব বেশি দীর্ঘায়িত হওয়ায় সুযোগ পায় নি। নতুন পাওয়া আরেক মানসিক আঘাত তাকে সেবার পুরোপুরিই ভেঙে ফেলে। সে রাতে, মায়ের শিয়রে বসে, দু সন্তানের নির্ঘুম রাত কাটে। কি মনে করে, সে প্রথম জাকির বসে রইলেন কেবিনে বাহিরে, করিডরে। হয়তো কিছু একটা টের পেয়েছিলেন। ঠিকই তার অপেক্ষার সুতো কাটলো, ভোর হওয়ার আগেই। নতুন দিনের সূর্যের আলো দেখার সুযোগ হয় নি তরীর। সকল ভালোবাসা, দায়িত্ব, মায়া মমতার শিকল ভেঙে চলে গিয়েছেন পরপারে। হাসপাতাল জুড়ে তরুণী তাকরিমার হাহাকার ভেসে বেড়ালেও, ছোট তাবিব ছিল মৌন। কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে পাওয়া দুটো বড় ধাক্কায় সে তখন মুখ থুবড়ে পরে আছে। মা চলে গেলো। আর বাবা? সে তো থেকেও এখন আর নেই।

তরী চলে যেতেই, তার সংসারে অন্য নারীর রাজত্ব নেমে এলো। সেই ঘরের প্রতিটি কোন থেকে উঠে গেলো তরীর ছোঁয়া। হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো তার ছায়া। মা মা ঘ্রানের বদলে মিলে অপরিচিত এক রমনীর উপস্থিতি। তাবিব, তাকরিমাকে মানিয়ে নিতে হলো সৎ মা নামক মানুষটির সাথে। তাবিব জানতো, মা মানেই মমতায়ী, আদুরে এক অস্তিত্ব। ভরসাস্থল, শান্তির নীড়। কিন্তু সেই মা নামটির আগে যখন দু অক্ষের সৎ নামক শব্দটি বসে, তখন সেই চরিত্রের ভয়াবহ বিকৃতি ঘটে। নারীটিকে মা বলে ডাকলেও, দিনে দিনে মায়েরা সত্যিকার অর্থে কেমন হয়, সেটা ভুলতে শুরু করলো তাবিব। সেই সাথে, মায়ের আদর খুঁজে পাওয়ার চেষ্টাও এক সময় থামিয়ে ফেললো। নিজ পরিবার, নিজ বাড়িতে থেকেও হয়ে গেলো পরের ন্যায়। বাবা থেকেও নেই। একই ছাদের নিচে থেকেও যেন শত শত মাইল দুরত্ব। বাবার সাথে দেখা হলেও, কেবলমাত্র কঠোর শাসন শোনার জন্যই হতো। কত শত অভিযোগ তাবিবের নামে! কত কত তিক্ত বানী। অথচ মা বলতেন, তাবিব আমার লক্ষ্মী ছেলে। তাবিব সেদিন উপলব্ধি করতে পেরেছিলো, লক্ষ্মী আসলে মায়েরা হয়। সেজন্য আমরাও সবার কাছে প্রিয় হই। তাবিবের সৎ মা যে তেমন নয়!
তবুও বড় আপুর সঙ্গে তাবিব, বাকি সব কষ্টের সাথে মানিয়ে নিতো। বড় বোনেরা তো মায়ের মতোই আগলে রাখে আমাদের। কিন্তু সে ছায়াও বেশিদিন মাথার উপর রইলো না।

দু’বছর পর, বাবা তার হাত সুপাত্রের কাছে হস্তান্তর করলেন। তাকরিমার নতুন ঠিকানা, তখন অন্য শহরে। সহজে দেখা হওয়াও সম্ভব নয়। এভাবেই দিন কাটলো, ছোট সৎ বোনের পাশাপাশি, আরও দু’টো ভাইয়ের আগমন ঘটলো। সেই দু’জন খুব সুন্দর মতনই জাকিরের ছেলে সন্তানের অভাব পূরণ করে দিতো। তাকে কষ্ট করে, তাবিবকে খুঁজে নিতে হতো না। তবুও যদি তাবিব তার সম্মুখে পরে যেতো, তাহলে ওকে রোষানলের শিকারই হতে হতো। কেন সে মায়ের সাথে ভালো ব্যবহার করে না, কেন ভাইবোনদের আদর করে না। কেন বাবার কাছে আসে না। অথচ সেগুলো সবই ছিল মিথ্যে আরোপ। জাকিরের দৃষ্টির আড়ালে, সালমা খুবই নিপুনভাবে তাবিবকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। দেখিয়ে দিয়েছিলেন, তাবিবের স্থান ঠিক কতটা নিচে! বৈষম্য, ভালোবাসা ও মমতা বিহীন জীবনে এভাবেই বড় হচ্ছিল তাবিব। কারও প্রতি কোনরূপ প্রত্যাশা ছিল না ওর। মা’য়ের থেকে পাওয়া সকল শিক্ষাকে জীবনের আদর্শ বানিয়ে নতুন আলোর পিছনে ছুটছিলো। সফলতা! যাকে আঁকড়ে ধরে এই নরকতুল্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে পারতো সে। কিন্তু সেই নিরন্তর দৌড়ে বাঁধা হয়ে নতুন আগমন ঘটলো আঁখি নামক দুরন্ত এক মানবীর!

নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে আপ্রাণ শ্রম দিয়ে যাচ্ছিলো তাবিব। তাকরিমার দেওয়া ক্রমাগত সাহস এবং অনুপ্রেরণা ওকে সামনে এগিয়ে যাওয়াতে উদ্বুদ্ধ করে। বাবার নামমাত্র ছায়াতল থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ছিল ভীষন উদগ্রীব। তবে পথে, মনোযোগে বিঘ্ন ঘটাতে এলো আখি নামক চঞ্চলা এক তরুণী। বৃষ্টিময় দিনে, গায়ে কাঁদা ছিটা পরার পরও, তাবিবের সরল মুখে যে স্বচ্ছ হাসির রেখা ফুটে উঠেছিল, সেটাই প্রেমের পুষ্প ডালা সেজে আঁখির মনের অন্দরে হাজির হয়েছিল। চুপচাপ, শান্ত গোছের ছেলেটি কেড়ে নিয়েছিল ওর রাতের ঘুম। সর্বদা নিজ চাওয়া পুরনে জেদী মনোভাব পোষন করা আঁখি, তখন বেকায়দায় তাবিবের পিছে পরে যায়। যতো ভাবে একজনের প্রতি প্রেম নিবেদন দেওয়া যায়, আঁখি সে সকল পন্থাই অবলম্বন করেছিল। তাবিবের জন্য নিজের পাশের সিটটা খালি রাখা, ছুটির পর ওর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা, সুযোগ পেলেই তাবিবের ব্যাগে ফুল, চকোলেট, চিঠি, উপহার লুকিয়ে দেওয়া। সাধারণত ছেলেদের সেগুলো করতে দেখা গেলেও, সেক্ষেত্রে আঁখি ছিল একগুয়ে। নিজের মতোন করে চেষ্টা করছিল তাবিবের মনোযোগ পেতে। কিন্তু তবিব তখনও নির্বিকার। এসব প্রেম, ভালোবাসার প্রতি ছিল না ওর বিন্দুমাত্র, ছিটেফোঁটা আগ্রহ কিংবা ইচ্ছে। যার নিজ পরিবারই অস্তিত্বহীন, সে কিভাবে এসবে জড়িয়ে যাওয়ার মনোবল খুজে পাবে? তবুও আঁখি থেমে থাকে নি। নানান উপায়ে, একেক দিন একেক ভাবে সকলের সামনে, এক প্রকার অপ্রস্তত করে ছেড়েছিল ভদ্র সভ্য তাবিবকে। যেদিন বিষয়টি কোচিংয়ের সিনিয়র এক ভাইয়ের চোখে পরলো, তখন তিনি পরামর্শ দিলেন, বিষয়টি মুখোমুখি বসে, বিস্তারিত আলাপচারিতার মাধ্যমে মিটিয়ে নিতে। তাবিব সেদিন থিতু হয়েছিল। গিয়ে হাজির হয়েছিল আঁখির দ্বারে। লেকের পারে বসে, প্রথম সেদিন তাদের মাঝে হয়েছিল দ্বিপাক্ষিক কথোপকথন।
তাবিবের নজর তখন, হ্রদের টলটলে পানিতে, আর আঁখির মুগ্ধ দৃষ্টি, ওর অতি সাধারণ, জটিলতা মুক্ত মুখপানে।

– আমাকে এতো পছন্দ করার কারণ কি?
ক্ষনিকের নীরবতা কাটিয়ে তাবিব যখন কথাটি বলে উঠলো, তখন খিলখিল করেই হাসলো আঁখি।
– কাওকে পছন্দ করার কোন কারণ থাকে? জানি না তো। উমমমমম….. হয়তো তুমি খুবই বোকা, সরল আর সাধারণ। একদম আমার বিপরীত। তাই! ওপোসিট এট্র্যাক্টস্! রিমেম্বার?
কথার মাঝে সামান্য গাম্ভীর্যতা পর্যন্ত নেই। ভীষন শান্ত, উষ্ণ। অথচ তাবিব? ওর জীবনটাতো এতো সহজ নয়। ও হাপ ছেড়ে উঠে।
– তুমি আমার ব্যাপারে কি জানো?
আঁখি হাসি হাসি মুখে, ভ্রু নাচিয়ে বলে,
– কি জানাতে চাও হুম? বলো বলো। সিক্রেট থাকবে। কোন চিন্তা নেই।
তাবিব হতাশ দৃষ্টি মেলে তাকায়, যাতে আঁখির মুখে ছড়িয়ে থাকা হাসি আরও প্রশস্ত হয়। তাবিব দম ছাড়ে। বিষন্ন কন্ঠে আনমনা হয়ে বলে,

– আই বিলং টু আ ব্রোকেন ফেমিলি। মা ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। তবুও রবের ইচ্ছায়, সংগ্রাম করে কিছু বছর বেঁচেছিলেন, শুধুমাত্র আমাদের দুই ভাইবোনের জন্য। ন’বছর আগে, যেদিন মা মারা যান, সেদিন জানতে পারি, মায়ের অসুস্থতায় বিরক্ত হয়ে বাবা অনেক আগেই দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। সে ঘরে আমার সৎ ভাইবোনও আছে। এরপর তো মা চলে গেলেন। আমার ঠাই হলো সৎ মায়ের সংসারে। সেখানে জীবন ঠিক কেমন কাটতে পারে, সেটা আমি স্পষ্ট করে আর বললাম না। শুধু বুঝে নিয়ো। এখন, আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য, কিছু করতে পারা। সফলতাকে ছুঁয়ে দেওয়া। যেন আমি সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারি। আমার বাবা থেকেও নেই। মাথার উপর শক্ত ছায়া নেই, যাকে আমি পাশে পাবো। বিলাসিতার মাঝে বড় হলেও, সেগুলো ছুঁয়ে দেখার অনুভূতি আমি ভুলে গিয়েছি। অথচ তুমি? অসাধারণ পরিবারের মেয়ে। বাবা মায়ের আদরের সন্তান। কোন কিছুর কমতি নেই তোমার। তাই আমাকে তোমার এই সুন্দর নির্ঝঞ্ঝাট জীবনে জড়ানো অনেক বড় ভুল হয়ে যাবে। দু’দিন গেলে এই আবেগও ফুরিয়ে যাবে। তাই আমার পিছনে সময় নষ্ট করো না। আমরা এখনও অনেক ছোট। সামনে লম্বা সময় পাড়ি দিতে হবে। মূল্যহীন অনুভূতিতে ভেসে গিয়ে সময় অপচয় করো না।
আঁখি শুনে গেলো সব। মাঝে কিছু বলে নি। তাবিব থামতেই ও আবার হাসলো।

– আই ক্যান মেক ইউ স্মাইল স্যাড বয়!
– তোমার কাছে সবকিছুই হাসির বিষয়?
– তো? তুমি কি চাও আমি এখন কাদি? তোমার পরিবার সম্পর্কে জেনে আমি কি করবো? আমি কি তাদের দেখেছি? তাদের চিনি? অবশ্যই নাহ! আমার লেনদেন তোমার সাথে। তোমাকে পছন্দ করি আমি। বাকি দুনিয়া দিয়ে আমি কি করবো?

মা এবং বোনের পর, এই প্রথম তাবিবকে কেউ এতোটা মূল্য দিয়ে কথা বললো। কেউ ওকে এতোটা পছন্দ করলো। অনুভূতির আতিশয্যে ও আর সেদিন কিছু বলতে পারে নি। শুধু, এরপর ক্রমাগত একটু একটু করে, নিজের প্রতিরোধকে দুর্বল হতে আবিষ্কার করলো। আখিঁর নিরন্তর প্রচেষ্টা একদিন সত্যিই সফল হলো। তাবিব নিজের হীনমন্যতাকে হারিয়ে পা বাড়ায় আখির দিকে। ভালোবাসা কি ও জানতো না। আঁখিকে ভালোবাসে কি না, সে প্রশ্নও মস্তিষ্কে উদয় হয় নি কখনো। ওর মনে শুধু ছিল, কারও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা পাওয়ার লোভ। পরিবারের সকলের মাঝে থেকেও একাকিত্বে বড় হওয়া তাবিব তখন কারও জীবনের মূল কেন্দ্র বিন্দু হতে চেয়েছিল। চেয়েছিল নিখাঁদ প্রেমের অধিকারী হতে। কাওকে আশ্রয় করে বাঁচতে চেয়েছিল। নিঃসঙ্গ জীবনে সঙ্গী পাওয়ার অভিলাষ জেগেছিল। কিন্তু তাবিব যতই শান্ত, ধীর, আঁখি ঠিক ততটাই দুরন্ত, অস্থির। তাবিব বলেছিল, ওর অপেক্ষায় থাকতে। জীবনে ভালো কিছু অর্জন করে আঁখিকে সসম্মানে নিজ জীবনে নিয়ে আসবে। তবে আঁখি এই অপেক্ষা অস্বীকার করে। এদিকে, তাবিব চায় নি, বিয়ের আগে অতিরিক্ত যোগাযোগ রাখতে। একসময় এ সিদ্ধান্তে আঁখি ভীষন বেপরোয়া হয়ে উঠলে তাবিব ওকে সামলানোর জন্য প্রতিশ্রুতি দেয় যে, ওর যেকোন এক সনামধন্য মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ হলেই, ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিবে।

এরপর শুরু হলো তাবিবের নিরলস পরিশ্রম। নিজের সর্বস্ব প্রয়োগ করে, নিজের জন্য একটি সিট ছিনিয়ে নেয় ঢাকা মেডিকেল কলেজে। তবে এই সফলতার গুরুত্বের চাইতে, তাবিবের জীবনে প্রবেশের তাড়নাই যেন বেশি ছিল আঁখির। অবশেষে উপায় না পেয়ে, বাবা জাকিরের মুখোমুখি দাঁড়াতে বাধ্য হয় তাবিব।
ঠিক মনে নেই, শেষ কবে বাবার কাছে কোনকিছুর জন্য আবদার করেছিল তাবিব। কবে আহ্লাদ করে চেয়েছিল কিছু। নাই-বা আপন ভেবে পাশে বসে দুটো কথা বলেছে। তবুও সেদিন প্রয়োজনের খাতিরে, নিজ চাওয়া ব্যক্ত করেছিল ও। বসার ঘরে, সোফায় বাবা ও সৎ মা নামক, দু’জন মানুষেরই সরব উপস্থিতি ছিল সেদিন। এবং তাদের সম্মুখে তাবিবের মাথা ছিল নত।
– আপন মা নেই, তবুও আমি যতটুকু পেরেছি শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম তোমাকে। কিন্তু লাভ হয় নি৷ শেষমেশ এমন নির্লজ্জই বের হলে!
সালমার কটুক্তি কানে বিষ বানের মতো আঘাত করলেও তাবিব চুপ ছিল। সে জানে, তার চাওয়াটা বড্ড ছেলে মানুষী ও অযৌক্তিক। সঠিক সময় এখনও আসে নি। কিন্তু আখির দেওয়া চাপে এবং ওকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে বাধ্য হয়েছিল ও!

– এটা ভদ্রলোকের বাড়ি। বেহায়াপনা করতে হলে আমার বাড়ি থেকে একবারে বের হয়ে গিয়ে করো।
তাবিব তো সেই কবেই বের হয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু কিভাবে যেন আটকে যেতো। বাবার বলা সেদিনের কথাটি ওর সমস্ত পিছুটান কাটিয়ে দেয়। দ্বিতীয় কোন চিন্তা ছাড়াই বেরিয়ে পরে বাড়ি থেকে। একজন মানুষও ওকে থামাতে আসে সেদিন। অবশ্য ও সেরূপ কিছু আশাও করে নি ও। ওদিকে চপল আঁখিও চলে এসেছে নিজ বাড়ি ছেড়ে, সবার সাথে বাকবিতন্ডায় লিপ্ত হয়ে।

অতঃপর শুরু হয়েছিল দু’জনের ছোট্ট এক সংসার। সাজিয়েছিল নিজেদের আপন নীড়। তাবিবের দীর্ঘ সঞ্চয়, গুটিকয়েক টিউশনের বেতনে, ওদের খরচ চলে যেতে লাগলো। অল্পবয়সী এই দম্পতির মাঝে আবেগের ঘনঘটা ছিল বেশ। প্রথম প্রেম, শুদ্ধ অনুভূতি, একান্ত বাধ্যতা, সবকিছুই ছিল হৃদয় শীতল করার মতো। তাবিবের মনে হচ্ছিল, অবশেষে ওর জীবনে সুখ পাখি ধরা দিয়েছে, যার নাম আঁখি। যাকে ও সংসার নামক খাঁচায় বেঁধে অতি আদরে লালন করছে! তবে সময়ের মোড় বদলে যেতে খুব একটা দেরী হয় নি। কয়েক মাস বাদে তানহার আগমনের বার্তা পেতেই, ছটফটে আঁখি কেমন শান্ত হয়ে গেলো আচমকা। সুখের সাগরে ভাসমান তাবিবের মনে হলো, এই বুঝি, নতুন দায়িত্বভার আগলে নেওয়ার জন্য আঁখির মন বদল হয়েছে। পরিপক্বতা আসছে। তাবিব নিজ পরিবারের জন্য দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে লাগলো। পাল্লা দিয়ে বাড়া সাংসারিক খরচের সাথে ও নিজ পড়াশোনার চাপ, সবকিছুর সাথে একত্রে খাপ খাওয়াতে ওকে হিমশিম খেতে হলো। তবুও, দিনশেষে বাড়ি ফিরে, আঁখির মুখ এবং সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় ওর সকল ক্লান্তি দূর হয়ে যেতো। কিন্তু দিনকে দিন ও বুঝতে পারলো, আঁখির মনে অসন্তুষ্টির সঞ্চয় হচ্ছে। ব্যস্ত জীবনের সাথে খুব একটা পেরে না ওঠায় ও সেদিকে চাইলেও খুব একটা মনোযোগ দিতে পারছিল না। এবং সেটাই ধীরে ধীরে ওর জন্য ভয়াল আকারে রূপ নিচ্ছিল। অতঃপর তানহার আগমন, সবকিছু এক লহমায় বদলে দিলো। তাবিবের ঠোঁটের হাসি দীর্ঘজীবী হলো না। মুক্তপ্রাণ আঁখি একদিন চেয়ে বসলো বিচ্ছেদ!

– এরকম লাইফ আমি ডিজার্ভ করি না তাবিব! এই ফাইনানসিয়াল ক্রাইসিস এ ভর্তি লাইফ। লোয়ার মিডেল ক্লাস লাইফস্টাইল, এসব আমার সাথে যায় না৷
কোলে কান্নারত তানহাকে শান্ত করার প্রয়াস চালাতে চালাতে তাবিব সেদিন ক্লান্ত স্বরে জবাব দিয়েছিল,
– আমার এমবিবিএস শেষ না হওয়া পর্যন্ত এরূপ কিছুই হবে, সেটা কি তোমার জানা ছিল না আঁখি? আমি কি বুঝিয়ে বলেছিলাম না?
– হ্যা হ্যা! তুমিই সবসময় সঠিক। আমিই ভুল, অস্থির, বেপরোয়া, বেশি বুঝি। সবই আমি মানি? খুশি তো?
আঁখি উচ্চ স্বরে চিৎকার করে উঠতেই তাবিব বলে,
– এভাবে কেন বলছো?
– আমি আর পারছি না। আ’ম টায়ার্ড। এই লাইফ আমার জন্য না। আচ্ছা তা-ও আমি মানিয়ে নিতাম। কিন্তু মাদারহুড? এটা আমাকে একদমই স্যুট করছে না। আমি এসব নিতে পারছি না।
দু হাতে মাথা চেপে আখি আর্তনাদ করে উঠতেই তাবিব স্থবির চোখে ওকে দেখে গেলো। মাতৃত্বকে কেউ কখনও এভাবে উল্লেখ করে?

– তুমি ঠিকই বলেছিল। ওসব ছিল আমার অল্প বয়সের আবেগ। দু’দিন পর কেটে যাবে। আজ লাইফের এই পয়েন্ট এ এসে, সত্যিই আমার সব রঙিন অনুভূতি আসলেই ফিকে পরে গিয়েছে। আর হচ্ছে না আমাকে দিয়ে!
সেদিন তাবিব আর একটা শব্দও বলে নি। চোখের সম্মুখে নিজ সংসার ভেঙে গুড়িয়ে যেতে দেখছিল ও। ওর মায়েরও হয়তো সেদিন ঠিক এরকমই লেগেছিল, যেদিন বাবা তাকে তুচ্ছ করে অন্যত্র ছুটেছিলেন। তাবিব শুনেছে, মেয়েরা মায়ের ভাগ্য পায়। অথচ এখানে, তাবিব ছেলে হয়ে ওর মায়ের নসিব পেয়েছে। তবে একদিক থেকে শুকরিয়া, ও সুস্থ সবল আছে। নিজ সন্তানের জন্য ও সব করতে রাজি, যেভাবে ঠিক ওর মা করেছিলেন।
তাবিব চায় নি, সৎ মায়ের সংসারে থেকে ওর যা পরিনতি হয়েছিল, ওর মেয়েরও সেই একই অবস্থা হোক। তাই জীবনের সঠিক সময়ে এসেও পুনরায় ঘর বাঁধার ইচ্ছে হয় নি। শুধু মেয়ের জন্যও নয়, নিজেকে দ্বিতীয়বার কোন মরীচিকার পিছনে ছুটতে দেখার কল্পনাও করতে পারে নি ও৷ কিন্তু আজ সময়ের ফেরে, আবারও নিদারুণ কষ্টের সম্মুখীন হতে হচ্ছে ওকে। গতবার মনে আঘাত পেলেও, এবার হৃদয় ভাঙা হাহাকার চলছে অন্তঃস্থলে। এই দুঃখ কাটিয়ে উঠার রাস্তা তাবিবের জানা নেই।

নিবৃতার ঘরটি এখনও সেই সাদামাটাই রয়ে গিয়েছে। বিশেষত্বহীন একটি কামড়া। প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ছাড়া অন্য কিছুই নেই। ঘড়ির কাটা রাত দশটার ঘর পেরিয়েছে ইতিমধ্যে। সারাদিনের হৈ হুল্লোড় আর ক্লান্তিতে, তানহাও ঘুমে। নিভানের দেওয়া নানান ধরনের উপহার পেয়ে বেশ প্রফুল্ল এক সময় কাটিয়েছে ও। ঘুমন্ত মেয়ের শিয়রে চুপচাপ বসেছিল নিবৃতা। মাথায় এলোমেলো চিন্তারা ছুটোছুটি করছে। ওর ধ্যানে ব্যঘাত ঘটাতে দরজায় করাঘাত হয়। নিবৃতা দৃষ্টি তুলে তাকিয়ে দেখে, নিভানের উপস্থিতি। ওকে উঠে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। নিবৃতা মাথা ঝাঁকিয়ে, আস্তেধীরে উঠে আসে। ঘর থেকে বের হতেই দেখে, ডাইনিং টেবিলের সম্মুখে, চেয়ার টেনে বসে আছে নিভান৷ স্পষ্টতই পাশেরটাও ছড়িয়ে রাখা। নিবৃতা চুপচাপ গিয়ে বসলো সেখানে। নিভানকে তখন অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে। চোখের দৃষ্টি ভাবুক।

– কিছু বলবে বড় ভাইয়া?
নিভান মাথা ঝাকায়।
– হ্যা।
– কি নিয়ে?
– বিষয়টা তাবিবকে ঘিরে।
তাবিব? এ সময়ে তাবিবকে নিয়ে কি কথা থাকতে পারে নিভানের? নিবৃতার মনে প্রশ্নের সঞ্চার হতেই নিভান বলা শুরু করলো।

হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে, চুপচাপ বসেছিল তাবিব। না পোশাক পরিবর্তন করেছে, না রাতে কিছু খেয়েছে। মস্তিষ্কে ঘুরেফিরে শুধু একটি নামই আধিপত্য ঘটাচ্ছে। নিবেদিতা। যাকে তাবিব নিজের ভেবেছিল। সে হয়তো, আজ রাতে ওকে অস্বীকার করবে। বেছে নিবে মুক্তির পথ। তাবিবের শ্বাসে টান পরে, বক্ষের ঠিক বা পাশে অসহনীয় পীড়া হয়। কিন্তু স্বাভাবিকই চাপা স্বভাবের হওয়ায় ব্যক্ত করতে পারে না কিছুই। অবশ্য সুখ দুঃখের গল্প শোনানোর জন্য একজন সাথীর প্রয়োজন পরে। তাবিবের তো সেটাও নেই। বারান্দার রেলিঙে হাত ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিল তাবিব। খোলা আকাশ পথে মিষ্ট বাতাস উড়ে এসে ওর মুখে আঘাত হানে।

নিবৃতা পর্ব ৩১

অক্ষি পল্লব তিরতির করে কাপে। কিন্তু চোখে হওয়া জ্বলুনি কমায় না। চারপাশে অদম্য নীরবতা, যে হয়তো আবারও তাবিবের জীবনে আপন বিস্তর অংশীদারিত্ব বুঝে নিবে। কিন্তু সময় হয়তো তখনও হয় নি। ফ্ল্যাট কাঁপিয়ে তখনই খুব জোরে কলিং বেল বেজে উঠে। চমকে উঠে তাবিব ঘড়ির দিকে তাকায়। রাত প্রায় বারোটার কাছাকাছি। এসময়ে কে এলো? দুশ্চিন্তা জেগে উঠে মস্তিষ্কে। জোরালো কদমে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই ওর দৃষ্টি থমকে আসে। এ সময়ে, এখানে, এই মানুষটিকে মোটেও আশা করে নি ও। এমন তো নয় যে, কোনভাবে ও ভুল কিছু দেখছে?
– তুমি?

নিবৃতা পর্ব ৩৩