নিবৃতা পর্ব ৩৩
নেহার ছায়ালিপি
দুই ভাইবোন গুরুত্বপূর্ণ কোন এক বিষয়ে কথা বলার জন্য একত্রিত হলেও, তাদের মাঝে অবস্থান করা নীরবতা তখনও কাটে নি। এতোদিন দূরে থেকে, বোনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে আপন মনোভাবে অটল ও দৃঢ় থাকা নিভান, আজ অল্প সময়ের মধ্যেই নিজ চিন্তা ভাবনায় সামান্য ফারাক খুঁজে পেয়েছে। চোখের সম্মুখে কিছু দৃশ্যাবলীর স্বাক্ষী হওয়ার পর মনে হয়েছে, এতোগুলো দিন ও যা যা ভেবে এসেছিলো, যেসব মন্তব্য পুষে রেখেছিলো মনে, তাদের মধ্যে সবটা পুরোপুরি সঠিক নয়। একপাক্ষিক মন্তব্য লালন করা উচিত হয় নি। যদিও সবকিছু পর্যবেক্ষনের জন্য মাত্র কয়েক ঘন্টা খুব বেশি সময় নয়, তবুও কিভাবে যেন সেই দু’জন মানুষের মাঝে থাকা সুপ্ত শুদ্ধ অনুরাগের গভীরতা খুব সহজেই ওর চোখে ধরা দিয়েছে। ছোট বোনের মুখে স্পষ্ট হয়ে ওঠা সেই উজ্জ্বলতা এখনও দৃষ্টির পাতায় জ্বলজ্বল করছে, যেটা কোনভাবেই উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
নিভানকে গভীর কোন এক ভাবনায় মত্ত দেখে নিবৃতা চুপ করে অপেক্ষা করে। বুঝতে পারলো হয়তো কোন অত্যন্ত জরুরি বিষয় নিয়ে সে কথা বলতে চাইছে। কিন্তু তাবিব নামটার উল্লেখও ওকে স্বস্তি দিচ্ছিলো না। বিস্তারিত জানার জন্য মুখিয়ে আছে সে। আরও কয়েক মুহুর্ত নিশ্চুপে গড়াতেই ও নিচু গলায়, সতর্ক হয়ে বলে,
– কোন সমস্যা বড় ভাইয়া?
ধ্যান ছুটলে, বোনের দিকে তাকায় নিভান। সেই কুটিলতাহীন চোখ দুটোতে কারও জন্য বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশিত হচ্ছে। মানুষটা কে, সেটা আর বলতে অপেক্ষা রাখে না। নিভান এক লম্বা শ্বাস ছাড়ে। পরপর মৃদু হেসে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
– বড় ভাইয়া কিন্তু সবসময় নিবুর ভালোটাই চায়। সর্বাবস্থায় আমার ছোট্ট নিবুটা সুখী থাকবে এটাই তো আমার জন্য শান্তির।
আচমকা এ কথার মর্মার্থ উদ্ধার করতে অপরাগ নিবৃতা। নিজের মাঝে অপার বিভ্রম থাকা সত্বেও, ও হাসলো অমলিন। ছোট করে বললো,
– জানি তো।
বোনের সেই স্নিগ্ধ হাসিতে মনোবল খুঁজে পেলো নিভান। এই জীবনটাতে কতো কিছু সহ্য করে, প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার লড়াই করে তবেই তো ওরা এতো দূর পর্যন্ত আসতে পেরেছে। তাহলে কি অবশেষে ভালো থাকার চেষ্টাটা না করলেই নয়? ওর মতে, এই ভালো থাকার পথে অন্তরায় হয়ে থাকা কোন এক সম্পর্কে প্রয়োজনে ভাঙা কিংবা গড়া নিতান্তই নিছক এক বিষয় এখন। খুশি থাকতে পারাটাই যে মোক্ষম বিষয়। সবার মন রক্ষা করে চলতে গেলে, অধিকাংশ সময়ই আমরা আমাদের সারাজীবনের স্বস্তি ও শান্তি বিসর্জন দিয়ে দেই। অথচ জীবন তো একটাই এবং সেটাও ভীষন ক্ষুদ্র। এখানে এতো জটিলতা টেনে আনার সময় কোথায়? মানসিক দ্বন্দ্বে ফেঁসে গিয়ে নিজেকে কষ্ট দেওয়ার মাঝে কোন মাহাত্ম্য নেই।
– আমি তোমার এবং তাবিবের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছিলাম।
– জ্বি, বলো বড় ভাইয়া।
নিবৃতা গোল গোল চোখে ভীষন মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে। অথচ অন্য সময় হলে ওর মাঝে সংশয়ের অভাব থাকতো না। তাবিব কি এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে নিবৃতা চাইলে তার জন্য নিজের স্বভাবও পরিবর্তন করতে পারে?
– তোমাদের বিয়ের সময় আমি দেশে ছিলাম না। সেজন্যই তাবিবের মতোন তালাকপ্রাপ্ত এবং এক বাচ্চার বাবার সাথে তোমার বিয়ে সম্ভব হয়েছে। আমার বোনকে যদি একান্তই বিয়ে দিতেই হতো, তাহলে আমি ওর জন্য যথেষ্ট সময় নিয়ে, বাছ বিচার করে, সেরা কাওকেই খুঁজে বের করতাম।
নিভানের কথা এগোলো না। নিবৃতা জড়তা বিহীন কন্ঠে মৃদু প্রতিবাদ করে উঠলো।
– অন্য কেউ হলে তো আমি কখনও বিয়ে করতাম না বড় ভাইয়া। ঝিলমিলের জন্যই তো বিয়েতে মত দিয়েছিলাম আমি।
এখনও তাহলে বিয়ের সম্পর্কটা তানহাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়? নিভান ওর মস্তিষ্কে ওঠা প্রশ্নের উত্তর খোঁজায় পরবর্তী মন্তব্য পেশ করে।
– সেটাই আমার কথা নিবু। অথচ বিয়ের মতোন একটা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, কখনও তৃতীয় কারও জন্য টিকে থাকে? আদৌও এতে কোন গুরুত্ব থাকে? তানহার জন্য তুমি বিয়েটা করলেও বিষয়টা কি এখনও শুধুমাত্র তানহাকে কেন্দ্র করেই আছে? তুমিই বলো।
নিবৃতা চুপ বনে গেলো। পেলব ওষ্ঠ দ্বয় গুটিয়ে নিয়ে মাথা নত করলো। নিভান তো ভুল কিছু বলে নি। প্রতিটি সম্পর্কের নিজ নিজ চাহিদা ও অভিযোজন থাকে। এই যে, তাবিব নামক মানুষটা নিবৃতাকে ভালোবাসার দাবি করে। নিবৃতা কোনরূপ যোগ্য প্রার্থী না হয়েও তাবিব ওর জন্য কতো কিছু করে। কেন করে? কেবলমাত্র তানহার মা হওয়ার জন্য তো নয়। কারন তাবিবের মনে নিবৃতার জন্য বিশেষ স্থান রয়েছে। ওকে আপন জীবনের বড় এক অংশীদার বানিয়েছে। তানহা পর্যন্ত সবকিছু সীমাবদ্ধ থাকলে কি আজ নিবৃতা এতো সমাদর পেতো? অবশ্যই না।
নিবৃতাকে চুপ থাকতে দেখে নিভান ওর নীরব উত্তরটা বুঝে নিলো। ও আবারও বললো,
– তোমাকে, আমাকে, আমাদের পুরো পরিবারকে কম যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় নি নিবু। আমাদের জঘন্য থেকে জঘন্যতম দিনেরও মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে দিনশেষে সেগুলো পাড় করে আমরা আজ এক সুস্থ্য জীবনে আসতে পেরেছি। যদিও সময়টা কম নয়, তবুও অসফল কিন্তু হই নি। তাই আমি চাই, এবার অন্তত আমরা ভালো থাকি। মা একটু শান্তিতে থাকুন, তুমি একটু স্বাধীনভাবে বাঁচো। এবং এই সুন্দর জীবনযাপন করা মানে কিন্তু এই না যে, সমাজের রীতিনীতি মেনে ভালো থাকা। ভালো থাকা সম্পূর্ণ ব্যক্তি মত এবং ইচ্ছের উপর নির্ভর করে। যে যেভাবে থেকে স্বস্তি পায়। আমার কথা কি বুঝতে পারছো?
নিবৃতা কি এতো কঠিন কঠিন কথা বুঝে? নাহ তো। বুঝলে তো কতকিছুর সমাধান হয়ে যেতো আজ! ক’দিন যাবত তাবিবের মনে কি চলছে সেটাও বুঝে নিতে পারতো। এই দোলাচলের সৃষ্টিই হতো না! তবে ভাইয়ের কথায় এতটুকুও ধরতো পারলো যে, সে চায় নিবৃতা যেন সর্বাবস্থায় ভালো থাকে। তাই ও মৃদু মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,
– জ্বি।
– আমার এসব কথার পেছনে মূল যে কারণ রয়েছে তা হলো তোমার কি ইচ্ছে, সেটা জানা।
এবার নিবৃতা কিছুই বুঝলো না। বোকা মুখে তাকিয়ে রইলো। পরপর অস্থির ভাবে চোখের পলক ফেলতে লাগলো। নিষ্পাপ সেই মুখে তাকিয়ে রইলো নিভান। জটিলতা ও কুটিলতা ভর্তি এই দুনিয়ায় তার বোন এক দুর্লভ রত্ন।
– তোমার যে বিয়ে এবং পুরুষ ভীতি ছিল সেটা পুরোপুরি যৌক্তিক এবং স্বাভাবিক। সত্যি বলতে আব্বুরও কখনও ইচ্ছে ছিল না তোমাকে বিয়ে দেবার। পরের সংসার সামলানো সোজা কথা নয়৷ তোমাকে এই জঞ্জাল ও দুঃখের মধ্যে উনি ফেলতে চান নি। কিন্তু সেই ইচ্ছে তার আর পুরন হয় নি। মা-ও পরিস্থিতির গেঁড়াকলে ফেঁসে গিয়ে তোমার বিয়ে দেওয়াই উচিত মনে করেছিলেন। ভুল সময়ে ভুল সিদ্ধান্ত আর কি।
– বড় ভাইয়া…..
নিবৃতাকে শেষ করতে না দিয়ে নিভান বললো,
– আমাকে শেষ করতে দাও।
নিবৃতা নতজানু হয়ে গেলো। বাধ্য স্বরে বললো,
– আচ্ছা।
– নানান প্রতিবন্ধকতার কারনে, সঠিক সময়ে তোমার সঠিক চিকিৎসা হয় নি। সেটা শারীরিক বলো কিংবা মানসিক দুটোই। তোমার স্বাভাবিক জীবন যাপন অনেক বড় অংশে ব্যহত হয়েছে। তবুও আমি কিন্তু আশা ছাড়ি নি। ভিনদেশে কঠিন পরিস্থিতিতে আটকা পরেও, তোমার বড় ভাইয়া তোমার চিন্তা ভুলে নি। দেরীতে হলেও, তোমার কি প্রয়োজন, কি করা উচিত, সবকিছুই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ভেবে চিন্তে ঠিক করে এসেছি। আমি চাই তুমি এসব থেকে অনেক দুরে সরে আসো। পুরাতন সব ভুলে যাও। শুরু থেকে নতুন করে সবকিছুর আরম্ভ করো। বুঝতে পারছো আমার কথা?
বড় ভাইয়া তো নিবৃতার ভালোর জন্যই সব চাচ্ছে। খারাবি কিছু থাকার প্রশ্নও উঠে না। কিন্তু সব ভুলে যাওয়ার অর্থ কি? সেখানে শুধুমাত্র অতীত রয়েছে না নিবৃতার গুরুত্বপূর্ণ বর্তমানও? ও জানতে চেয়ে বললো,
– সেটা কিভাবে হবে?
– আমি চিরতরে এই দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছি। তোমাকে আর মা’কে নিয়ে। আমরা এখানে আর থাকবো না।
নিবৃতা যেন কথা বলতেও ভুলে গেলো। ওর জীবনের গন্ডী তো এখন আর কেবলমাত্র মা, ভাই, ভাবী পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়৷ এসব কি বলছে নিভান? ও আড়ষ্ট কণ্ঠে বলতে চাইলো,
– ঝিলমিল আর…
– তানহাও যাবে। তুমি যেখানে তানহা সেখানে। সমস্যা কোথায়? প্রয়োজনে আমি সব ব্যবস্থা করবো। তোমার মেয়ের বিন্দু পরিমাণ অসুবিধার সুযোগ পর্যন্ত রাখবো না আমি।
নিবৃতা বিস্ময় নিয়ে চাইলো। চোখে দৃষ্টিতে অজস্র প্রশ্ন। অস্ফুটে বললো,
– ঝিলমিলের বাবা?
নিভান থমকে গেলো কিছু পলের জন্য। পরপর নিজের কন্ঠস্বরকে দৃঢ় করে বললো,
– তাবিবের সাথে কথা হয়েছে আমার।
– কি কথা?
– তাবিব বলেছেন, তোমার খুশির পথে কোন বাঁধা হবেন না তিনি।
কি ধরনের কথা হচ্ছে এসব? নিবৃতাকে কোন গোলকধাঁধায় নিক্ষেপ করা হয়েছে? ওর মাথা ব্যথা করতে শুরু করলো।
– কিসের বাঁধা? কি বলছো তুমি বড় ভাইয়া?
নিভান শান্ত সুরে বললো,
– তুমি তাবিবকে কেন বিয়ে করেছ? তানহার জন্য। তাই তো?
– হ্যা, কিন্তু…..
– তোমাদের বিয়েটা কেন টিকে আছে? তানহার জন্যই না?
আদও কি তাই? তানহা ছাড়া কি এই সম্পর্কের কোন ভিত্তি নেই? কেন আজকের পূর্বে কখনও এই প্রশ্ন নিবৃতার মন মস্তিষ্কে উদয় হয় নি? ও বিভ্রান্ত স্বরে বললো,
– আসলে…..
– তানহা যেভাবে তোমার সকল খুশির কারন, সেভাবে একই কিংবা এর সামান্য পরিমান খুশিও কি তুমি কখনো তাবিবের কারণে হয়েছ? তার জন্য তুমি কোন টান অনুভব করো? মনে হয়েছে তাকে ছাড়া তোমার মোটেও চলবে না?
এতো এতো প্রশ্ন ও গভীর অর্থোবধক কথার ভারে নিবৃতা নুইয়ে পরলো। ভীষন করে অসহায় লাগলো নিজেকে। সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যুত্তর করতে ব্যর্থ হওয়ায় নিভান আবারও বলে,
– তোমার মতো তাবিবও আমার এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন নি। কারণ উনিও এটা ভালো মতন জানেন যে, তুমি তাকে ভালোবাসো না। তানহার জন্যই এক প্রকার বাধ্য হয়ে সংসার করছো।
নিবৃতা কিছু না বলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো ভাইয়ের মুখের দিকে। নিভান আবারও বলে,
– তবে তাবিব তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী। লোকটা সত্যিকার অর্থেই তোমার ভালো চান। এজন্যই তো আমাদের যখন কথা হলো, তখন উনি বললেন, তুমি যদি নিতান্তই সংসার করতে না চাও তাহলে উনি তোমায় যেতে দেবেন। অযথা চাপ সৃষ্টি করবেন না। এমনকি তানহাকেও তোমার কাছে দিয়ে দিবেন। আর তাছাড়া উনি অনুমতি না দিলেও, আমার বোনের জন্য যেটা ভালো সেটা তো আমি করতামই। কারও বাঁধা, যে কোন বিপত্তি দিয়ে আমার কিছু যায় আসে না।
– তাবিব আমার সাথে থাকতে চান না?
নিবৃতা কেমন অবিশ্বাস্য স্বরে বলে উঠলো। নিভান ভ্রু কুঁচকায়। ওকে শুধরে দিয়ে বলে,
– তুমি যদি না চাও তাহলে উনি জোর করবেন না।
– তাহলে উনি কি চান? আমার সাথে সংসার করতে আর আগ্রহী নন?
নিভান মিথ্যে বললো না মোটেও। স্বাভাবিক গলায় বললো,
– সেরকম কিছুই নয়। তুমি ভুল ভাবছো নিবু।
নিবৃতা নিশ্চল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
– তাহলে?
– আমার তো মনে হয় উনি তোমায় যথেষ্ট পরিমানে পছন্দ করেন।
নিবৃতা কলের পুতুলের ন্যায় নাড়িয়ে বলে,
– নাহ। উনি তো বলেছিলেন যে আমায় ভালোবাসেন।
নিভান থমকে যায় কিয়ৎক্ষণের জন্য। চুপটি করে তাকিয়ে থাকে বোনের অসহায় মুখের দিকে। ওর কি আসলেও কোথাও একটা ভুল হচ্ছে? ও সাবধানী কন্ঠে বলে,
– আর তুমি? তুমি কি তাকে ভালোবাসো?
এই প্রশ্নটা। ঠিক এই প্রশ্নটাই তো তাবিব করেছিল নিবৃতাকে। অথচ নিবৃতা সেদিন উত্তর করতে ব্যর্থ হয়। বরঞ্চ প্রত্যুত্তরে বলেছিল, ভালেবাসার সংজ্ঞা ওর জানা নেই। এরপর তাবিবই তো ওকে বোঝালো, দেখালো, অনুভব করালো যে ভালোবাসা ঠিক কেমন হয়৷ নিবৃতা তো শিখছিলো নিষ্ঠার সহিত, কিন্তু কি যে হলো হঠাৎ! কিভাবে যেন পরাজয় স্বীকার করে মানুষটা বলে দিলো যে, নিবৃতা তাকে ভালোবাসে না। আর তাবিবের সেই স্বীকারোক্তির বিষাদগ্রস্ত কন্ঠস্বর এখনও নিবৃতার কানে বাজে। লোকটার সেদিন পাওয়া দুঃখ ও কিছুটা হলেও অনুভব করেছিলো। এজন্যই নিবৃতা নিজের চোখেই নিজে ছোট হয়েছে। সেই ভালো মানুষটা ওর দ্বারা কষ্ট পেলো, সেটা সহ্য হয় নি।
এক ক্লিষ্ট ঢোক গলাধঃকরণ করে নিবৃতা সরল চোখে তাকিয়ে বলে,
– আচ্ছা, বড় ভাইয়া ভালোবাসা কাকে বলে?
এক্ষেত্রে নিভানও কি নির্বোধ নয়? সে তো নিজেও অজ্ঞ!
– আমি ভালোবাসায় বিশ্বাসী নই নিবু।
নিবৃতার মুখ অসহায়ের ন্যায় ছোট হয়ে গেলো। শুকনো মুখটা নত হতেই নিভানকে আরও বলতে শোনা গেলো,
– তবে আমি মানুষকে বলতে ও স্বীকার করতে শুনেছি, এই অনুভূতিটা খুবই সুন্দর। এই যে তোমাকে বললাম, তার প্রতি বিশেষ টান রয়েছে কি না তোমার। কখনও মনে হয়েছে কি না, জীবন নামক যাত্রায় সেই মানুষটা আমার সঙ্গী না হলে, অনেক বড় কিছুর স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবো। তার মন খারাপে তোমার কষ্ট হবে, তাকে সামান্য পরিমান খুশি করতে পারলেও নিজেকে ভীষন স্বার্থক মনে হবে। নিজের আগে তার ভালো খারাপের চিন্তা মাথায় আসবে৷ যেকোন পরিস্থিতিতে অনয়াসেই তাকে বিশ্বাস করার জন্য মন সায় দিবে৷ প্রয়োজনে সবার আগে তার ভরসাস্থলে আশ্রয় নিতে মন চাইবে। সে সুন্দর কিংবা কুৎসিত হোক, সর্বাবস্থায় দু’চোখে একমাত্র তাকেই সেরা লাগবে। অপার মায়া কাজ করবে মানুষটার জন্য। এই ছোট ছোট অনুভূতিমালার সংমিশ্রণই তো ভালোবাসা।
নিভানের দৃষ্টি কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছে। ও থামতেই নিবৃতা প্রসারিত নজরে চাইলো। তবুও নিজেকে সামলে রেখে বললো,
– ভাবীর জন্য এগুলো অনুভব করো তুমি?
বোনের কথায় নিভান হাসলো। সেই হাসির মাঝে লুকায়িত শ্লেষ সহজে ধরা গেলো। নিবৃতা কেমন যেন হতাশ হলো এতে।
– নাহ! তাছাড়া আমি খুবই লজিক্যাল মানুষ নিবু। কারও উপর নির্ভরশীল হওয়ার মতো মানসিকতা আমার নেই। আমি সেরকম নরম মনের নই। পরিস্থিতি আমাকে কখনো এতোটা দুর্বল হতে দেয়ই নি।
নিবৃতা এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে, মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলো। কিচ্ছুটি বললো না মাঝে। নিভান বোনের নীরবতা পর্যবেক্ষণ করে বলে,
– কি ভাবছো এতো? বড় ভাইয়া আছি তো। যা ইচ্ছে হয়, আমাকে বলো। সেরকমই হবে, কথা দিচ্ছি। কোনরূপ দ্বিধায় নিজেকে বেঁধো না। জাস্ট ট্রাস্ট মি, এভরিথিংস্ গনা বি ফাইন!
ভাইয়ের থেকে বোধহয় এতোটুকু আস্কারারই প্রয়োজন ছিল। নিবৃতা ঝট করে উঠে দাঁড়ালো। অস্থির চিত্তে অনুরোধ মিশিয়ে বললো,
– ক্যাব বুক করে দিবে প্লিজ? আমি না এর আগে কখনও করি নি, তাই হয়তো পারবো না।
নিভান ভ্রু কুঁচকে চায়। একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে,
– এতো রাতে কোথায় যাবে?
– বাসায়।
– বাসায়ই তো আছো!
– ওটাও তো আমার আরেক বাসা।
নিভান বোঝানোর সুরে বললো,
– এখন অনেক রাত হয়ে গিয়েছে। কাল সকাল সকাল যেয়ো। তাছাড়া তানহাও তো ঘুমিয়ে পরেছে। এতো ঝামেলার কি দরকার?
– ঝিলমিলকে মা দেখবে তো, কোন সমস্যা নেই। তুমি শুধু আমাকে একটু বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে এসো। তাতেই হবে৷ একা একা ভয় লাগে যে নাহলে তোমাকে জ্বালাতাম না।
নিভান মায়া নিয়ে তাকালো এতে।
– ছোট বোন জ্বালাতন, আবদার না করলে কে করবে, হ্যা?
নিবৃতা হাসলো মিষ্টি করে। নিভান পুনরায় বলে,
– এখনই কেন কথা বলতে হবে?
– আমি না এলেমেলো হয়ে যাই খুব৷ দেখা যাবে এখন যা বলতে চাইছি, পরে সে কথা আর তোলার মনোবলই খুঁজে পাবো না।
নিভানের আর কি বলার থাকে এরপরও? নিবৃতা আবার তাড়া লাগিয়ে বললো,
– একটু অপেক্ষা করো। আমি তৈরী হয়ে আসছি।
চপল পা এগোতেই নিভান পিছু ডাকলো।
– নিবু!
নিবৃতা থেমে গিয়ে বললো,
– হ্যা?
নিভান এগিয়ে এলো। বোনের মাথায় হাত রেখে বললো,
– ভালোবাসো তাবিবকে?
– আমার কি প্রয়োজন, আমি কি চাই, আমি কি ভাবছি, আমার কিসে ভালো হবে, আমি কি পারবো, আমার কিসে সমস্যা। এগুলো আমি নিজে উপলব্ধি করার আগে উনি বুঝে ফেলেন। জটিল থেকে জটিল বিষয়ও সহজ করে দেন শুধুমাত্র আমার জন্য। মনে প্রশ্ন জাগার আগেই উনি সমাধান দিয়ে দেন। তাই আমি চাই, এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাবটাও উনিই আমাকে দিন। হোক সেটা আবারও। হয়তো উনার উত্তর এবার বদলাতে পারে।
নিবৃতা আর দাঁড়ায়নি এক মুহুর্তও। সে সোজা ছুটেছে নিজ ঘর অভিমুখে। আজ যে ভীষন তাড়া ওর। বাড়ি পৌছে, মানুষটার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, চোখে চোখ রেখে, কিছু প্রশ্ন করার আছে ওর। জানা বাকি অনেক অজানা কিছু। সাথে আরও বাকি আছে বিগত কিছুদিনের হিসাব বরাবর করা। সবসময় নিবৃতা পালিয়ে বাঁচলেও, এবার সেই এড়িয়ে যাওয়ার অভ্যাসটা ধারন করেছে ওর স্বচ্ছ মানবটি। এর পেছনের কারনটা শোনাও যে প্রয়োজন। অতঃপর যখন সকল প্রকার জিঘাংসা মিটবে, তখন নাহয় নিভানের প্রশ্নের উত্তরটা দেওয়া যাবে যে নিবৃতা আসলে কি চায়।
অথচ এদিকে নিভানের স্থির চেহারায় ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠে। ও বুঝে গিয়েছে, বোনের শেষ জবাবটা কি হবে। অবস্থা সাপেক্ষে আজ নিভান বাস্তববাদী মানুষে পরিণত হলেও পরিবারের মাহাত্ম্য ওর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলায় বাবার থেকে পাওয়া সেই সু-শিক্ষা ও আদর্শ ও ভুলে নি। সেজন্যই ওর ছোট বোনটার যদি সুন্দর, শান্তি ও মিষ্টি অনুভূতি সম্পন্ন এক সাজানো গোছানো সংসার থাকে, তাহলে হয়তো এতেই সবচেয়ে খুশি হবে ও। কারণ মনের সুস্থতা তো মানসিক সুখেই। শত শত বাহ্যিক চিকিৎসাও এর সম্মুখে হেরে যেতে বাধ্য!
দরজার বিপরীত প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা আপাদমস্তক কালো আবরনে আবৃত, নারীটিকে দেখে চমকে উঠেছে তাবিব। ঘন ভীড়ের মাঝেও যদি সে মিশে যায়, তবুও একান্ত রমনীকে চিনতে তাবিবের একটুও ভুল হবে না৷ নিঃসংকোচে ঠিক খুঁজে নিবে তাকে। আচমকা পাওয়া এই বিস্ময়ের তোরে অস্ফুটে বলে উঠলো ও,
– তুমি?
– কেন? অন্য কাওকে আশা করেছিলেন এই সময়ে?
বাঁকা কন্ঠে জবাব দিয়ে, তাবিবকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে চলে এলো নিবৃতা। আবারও রাগের বহিঃপ্রকাশ! মেয়েটার একটুও করুনা হয় না তাবিবের উপর। কোনমতে দরজা লাগিয়ে তাবিব ছুটলো নিবৃতার পিছু পিছু। ওর মস্তিষ্ক এখনও ঠিকঠাক সচল হয় নি তখনও৷
– এই সময়ে অবশ্যই অন্য কাওকে আশা করিনি কিন্তু তাই বলে তুমি যে আসবে সেটাও ধারনায় ছিল না।
তাবিবের ঘরেই ঢুকেছে নিবৃতা। কেমন অস্থির ভঙ্গিতে, অযথাই বল খাটিয়ে বাহিরের পোশাক টেনে টুনে খুলছে ও। এরই মাঝে কিছু একটা খেয়ালে আসতেই তাবিবের ভ্রু কুঁচকে আসে হঠাৎ।
– এই! তোমার তো সাহস কম না, এতো রাতে একা একা চলে এসেছ, হ্যা? কি হলো বলো? সমস্যা কি?
একের পর এক ধেয়ে আসা উত্তপ্ত প্রশ্নের বান এড়িয়ে গেলো সে। কারণ সুপ্ত আক্রোশ আজ বেরিয়ে আসার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। নিবৃতার শ্বেত বর্ণের মুখটা অগ্নি স্পর্শ পাওয়ার মতো রাঙা হয়ে উঠেছে।
– কেন? আমার মতো বোকা, অবুঝ, নির্বোধ মানুষদের কি সাহস দেখাতে নেই?
তাবিব অসন্তোষ চোখে তাকালো। কি থেকে কি বলছে এই মেয়ে!
– আমার প্রশ্নের উত্তর দাও আগে।
নিবৃতা নেতিবাচক ভাবে মাথা নাড়ে। পটু নারীদের মতো, কাঁধের আঁচল পেঁচিয়ে কোমরে গুঁজে। নরম মুখে আজ তার এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। পরপর ভারি কদমে এসে ঠিক তাবিব সম্মুখ বরাবর দাঁড়ায়। সেই পুরুষালী ভাবুক নজরে নিজের দৃপ্ত আঁখিদ্বয় মিলিত করে তীক্ষ্ণ গলায় বলে,
নিবৃতা পর্ব ৩২
– আজ প্রশ্ন করার অধিকার শুধুমাত্র আমার একার। আর আপনি এক এক করে সবগুলোর জবাব দিতে বাধ্য।
বিগত কতগুলো দিনে, এই নিবৃতা নামক শান্ত মানবীর এক একটি নতুন রৌদ্র রূপের সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাবিবকে, যা বারে বারে ওকে চমকে দিচ্ছে। এবং আজ, এইমাত্র তাবিবের হঠাৎই মনে হলো, এই প্রথম, ওর স্ত্রীকে সে ভয় পাচ্ছে। বড়ই আশ্চর্য তো!
