নিবৃতা পর্ব ৭
নেহার ছায়ালিপি
নতুন বাসা, নবীন কিছু মানুষ ও পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে নিবৃতা। ভালো, খারাপ দুটোর সংমিশ্রণই রয়েছে এই নয় জীবনে। ভালো বলতে তার ঝিলমিল। কিন্তু খারাপ? লোকটাকে তো একেবারে খারাপ বলা যায় না, তবে সে অস্বস্তিকর অনুভূতি জোগায়। তার কাটকাট, স্পষ্ট ভঙ্গিমায় কথা বলার ধরন নিবৃতাকে ভীত করে দেয়। তার সেই তীক্ষ্ণ, ক্ষুরধার নজর, এই প্রকম্পিত মনে সংশয় ও দ্বিধার পাহাড় গড়ে তোলে। গত দু’দিনে নিবৃতা প্রাণপন চেষ্টা করেছে তার চোখের আড়ালে থাকার জন্য। তবে রাতে খাওয়ার সময় সেই দেখা হয়েই যায়। আর তখন? মানুষটা যে আড়চোখে ওকে ভীষন করে খেয়ালে রাখে সেটা নিবৃতা বোঝে।
ও অবুঝ হলেও বেপরোয়া নয়। গতকাল স্কুলে গিয়ে পদত্যাগ পত্র দিয়ে এসেছে। নিবৃতা জানে, সে কোন কাজের নয়। কোন যোগ্যতাই নেই তার। জীবনে কারও কোন প্রয়োজনে ও কখনও এগিয়েও যেতে পারবে না। নিজের জড়তা, অক্ষমতা ও দ্বিধান্বিত মন নিয়ে এক কোণে পরে থাকবে। বাবার মৃত্যুর পর, তারই পরিচিত এক বন্ধুর মারফতে স্কুলে চাকরি মিলেছিল। অন্যথায় নিজ থেকে চেষ্টা করলে, নিবৃতার মতো আহাম্মকের কোথাও জায়গা হতো না। সফলতা তার জন্য নয়। নতুবা, গত দু’ বছরে ভাবীর বিরক্তিকর বাণীর সাথে খোঁটাও শুনে পার করতো হতো। এসব ভেবেই এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ও। এরই মাঝে বেল বাজে। নিবৃতা নড়েচড়ে উঠে। আজ তানহা স্কুলে গিয়েছে। ওকে ওর বাবাই দিয়ে আসে। সেজন্য এই পুরো বাসায় নিবৃতা একলাই ছিল। তবে সেটাও এখন কেটে যাবে, কারণ কাজে সাহায্যকারী খালা এসেছেন। ভাগ্যক্রমে সেও নিবৃতার পুরো বিপরীত স্বভাবের।
দরজার কাছে আসতেই শোনা যায় খালা বলছেন,
– ভাবি, আমি রেনু!
তাবিবের দেওয়া নির্দেশই এটা। যেই আসুক, নিবৃতা কিংবার নিজের সুবিধার্তেই হোক, সে যেন নিজ থেকেই আপন পরিচয় দেয়। নিবৃতা তবুও সংকোচে ভরপুর। মাথায় আঁটসাঁট করে ঘোমটা তুলে নেয়। পরপর নরম হাতে, প্রথমে দরজার চেইন লকে চেইন আটকে নেয়। খেয়ালে রাখে যেন সেটা মজবুত হয়েই আটকেছে। অতঃপর ভীত চোখে বড় করে এক শ্বাস টেনে দরজা খুলে দেয়। যদিও চেইন লকের কারণে সম্পূর্ণ খুলে যায় না সেটা। সেই একটু ফাঁক গলিয়েই মধ্য বয়স্কা রেনুর হাসোজ্জল মুখখানি দেখা যায়।
– আরেহ ভাবি! আমিই তো। এতো ভয় পাইলে হয়?
সংশয় পূর্ণ মৃদু হাসি দিলেও চারপাশে হালকা করে চোখ বুলায় নিবৃতা। মন কিছুটা শান্ত হলে আস্তে করে চেইন লকটা খুলে দিয়ে সরে দাঁড়ায়। রেনু ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলেন,
– পেরায় ছয় বছর যাবত এইহানে কাম করি ভাবি। আজ পইযন্ত কোন কমপেলেন নাই আমার নামে। আপনার কইলজাডা এতো ছোট কেন?
রেনু সত্যিই কিছু মনে করেন না নিবৃতার এই কাজে। গত পরশু তাবিব তাদের পরিচয় করিয়ে দিলেও গতকাল যখন সে যথারিতি সময়ে আসলো, তখনও একই আচরণ করেছে নিবৃতা। তবে বর্তমানে, যেই ভয়াবহ এক সময় যাচ্ছে, সেখানে কাওকে এতো সহজে বিশ্বাস করা সাজে না। এতটুকু রেনু বুঝেন। তাই কিছু বলেন নি।
– আমি একটু ভীতুই আপা। কিছু মনে করবেন না।
নিজের কাজে সামান্য লজ্জিত নিবৃতা। সবসময়ই হয়। কিন্তু মনের ভয়কে সে উগড়ে ফেলে দিতে পারে না। তাই তো কোমলমতী ব্যবহারে ক্ষমাও চেয়ে নেয় পরে।
রেনু বিস্তর হাসেন। তাবিব ভাইয়ের নতুন বৌটাকে তার অনেক পছন্দ হয়েছে। উনি হাসতে হাসতে বললেন,
– আরেহ কিছুই মনে করি নাই ভাবি। এতো চিন্তা কইরেন না তো।
নিবৃতা কিছু বলে না। শুধু প্রত্যুত্তরে কাষ্ঠ হাসে। এদিকে রেনু কাজে ব্যস্ত হয়ে পরলেও সেই তালে তিনি অনবরত কথা বলতেই থাকেন। তার বুলির মাঝে কোন বিরতি নেই। তার কাছে মনে হয়, নিবৃতা সেরা একজন শ্রোতা। যে শুধু শুনেই যায়। ভালোমন্দ কিছুই বলে না। এই অবশ্য সই। রেনু মনের কথা নির্দ্বিধায় কারও কাছে উজার করে বলতে পারছেন, এতেই মানসিক শান্তি। রেনু বসে বসে তরকারি কাটছেন আর পাশেই নিবৃতা গালে হাত দিয়ে বসে বসে তার কথাগুলো শুনছে। মনে মনে বেশ অবাকও হচ্ছে। এগুলো সত্যি সত্যিই হয়? জীবন কতই না অদ্ভুত। তবে বরাবরই মুখ ফুটে কিছু বলতে সে পারে না।
– আর বইলেন না ভাবি। শাশুড়ী নিজে পছন্দ কইরা ছেলের বৌ আনলো, এহন নাকি হেতেরে সহ্যই করবার পারে না। এডি কোন কতা? মাইনষেরে শয়তানে ধরলে আর কোনু উপায় থাকে না।
নিবৃতাও বিজ্ঞের ন্যায় মাথা নাড়ায়। সত্যিই তো। সুস্থ মস্তিস্কের মানুষের পক্ষে এরূপ আচরণ করা সম্ভব? এরই মাঝে চোখ যায় ঘড়িতে। তানহার আসার সময় হয়ে গিয়েছে। নিবৃতা চট করে উঠে গিয়ে ফ্রিজের কাছে গেলো। ঠান্ডা পানির বোতল ও একটা লেবু নামালো। অতঃপর লেবুর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রেনুর কাছে চললো।
– আপা, এটা একটু কেটে দিবেন?
– আরে দেন দেন।
খুব করে মনোযোগ নিয়ে লেবু কাঁটাটা দেখলো নিবৃতা। গোল গোল চোখদুটো তার কৌতুহলে ভরপুর। আপাত দৃষ্টিতে সহজ লাগলেও তেমন সহজ না এই কাজটি। লেবুর মাঝের অংশটা কেটে ফেলে দেওয়াটা কিছুটা ঝামেলার।
– এই লন!
সেগুলো নিয়ে শরবত বানাতে বসলো নিবৃতা। গ্লাসে পানি ঢেলে লেবু চিপে নিতেই সময় এলো চিনি দেওয়ার। বোকা সে বুঝলো না কয় চামচ দেওয়া উচিত। উপায় না পেয়ে রেনুকে জিজ্ঞেস করে নিলো।
– এক গ্লাসে কতটুকু চিনি দিতে হয় আপা?
রেনু মুখ টিপে হাসেন। এতটুকুও জানে না নতুন বৌ। কিন্তু যাই হোক, অন্তত শেখার চেষ্টা করছে তো।
– এক চামুচ দিলেই হইবো ভাবি।
– আচ্ছা।
অতঃপর এই প্রথম নিজের হাতে কিছু একটা বানিয়ে বড়ই গর্ববোধ করলো নিবৃতা। ইচ্ছে করলো তানহার মোবাইল দিয়ে মাকে কল করে জানাতে যে ও নিজের হাতে শরবত বানিয়েছে। উঠতে গিয়েও থেমে গেলো তৎক্ষনাৎ। হঠাৎ করেই এতো প্রফুল্লতার কোন এক কারণে নিভে গেলোখুঁজে, সাথে মুখে আধার নেমে এলো। মনের মাঝে কিছু একটা আঁটকে দিলো তাকে। চোখের তারায় নেমে এলো ঘুটঘুটে অন্ধকার। কি যেন এক অবর্ণনীয় বিষাদ সেই মন কুঠীরে!
আগে বাসায় ফিরলে কেউ ছিল না তানহাকে আগলে নেওয়ার জন্য। কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চেত না ওর পুরো দিনের গল্পগুলো। রাতে বাবার ফেরার অপেক্ষায় চুপচাপ বসে থাকতে হতো। টানা ক্লাসের ক্লান্তি মন মস্তিষ্কে জড়ো করে যখন বিছানায় উপুড় হয়ে পরে রইতো, তখন আগ বাড়িয়ে এক গ্লাস পানি সেধে দেওয়ার মতো কেউ থাকতো না। এই একলা বাড়িতে ফেরার কোন তাড়া ছিল না মনে। কিন্তু আজকের দিনটা ভিন্ন। বাসায় তার অতি পছন্দের কেউ একজন অপেক্ষারত। তানহার জন্য! সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় মাথায় হাত বুলিয়ে সে বলেছিল,
– দেরী করবে না কিন্তু। ছুটি হলেই সোজা বাসায় চলে আসবে!
তানহার সেই থেকেই তাড়া! আজ তো স্কুলে তার প্রিয় ম্যাডামও নেই। সময় কাটানোর কোন রাস্তাও নেই। সে আছে তানহার আপন নীড়ে। তাই তো ছুটেই এসেছে এক প্রকার!
কলিং বেল বাজতেই নিবৃতা দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসেছে। এবার আর তার আচরণে কোন সাবধানতা নেই, রয়েছে তটস্থতা। যেন জানাই আছে যে, দরজার অপারে কে। তবুও অপেক্ষা না করে বাবার দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী তানহা গলা উঁচিয়ে বললো,
– আম্মু দরজা খোলো!
ঠোঁটে বিস্তৃত হাসি নিয়ে এক নরম কায়া, ভীষন মায়া সমেত তৎক্ষনাৎ তানহাকে আগলে নিলো। পরপর মিষ্টি কন্ঠী সে বলে উঠলো,
– এসে গিয়েছ!
বিস্তর হাসে তানহা৷ নিবৃতার আলিঙ্গনে আবদ্ধ থেকেই ও ঘরে ঢুকলো। খেয়ালে আসলো সেই মানুষটা ওর কাঁধ থেকে ভারি ওজনের ব্যাগটা নিজের মতো করে বুঝে নিচ্ছে। ও বাঁধা দিয়ে বলে,
– অনেক ভারি। তোমার পীঠে ব্যাথা করবে তো।
ওর প্রতি তানহার চিন্তা দেখে মনে মনে ভীষন আপ্লুত হয় নিবৃতা। তবে মুখে সেটা প্রকাশ করে না। অবশেষে যখন কেউই ব্যাগটা ছাড়লো না তখন দু’জন মিলেই সেটা ঘরে নিয়ে এলো। তানহা হাফ ছেড়ে বিছানায় বসতেই নিবৃতা শরবতের গ্লাস দুটো নিয়ে আসলো। একটি তানহার হাতে ধরিয়ে দিয়ে দরজার বাহিরে উঁকি দিলো। বসার ঘরটা এখনও ফাঁকা। ভ্রু দ্বয়ের মাঝে কয়েক পরতের ভাজ পরলো। না পারতে তানহাকে জিজ্ঞাসা করলো,
– তোমার বাবা কোথায়?
আমোদে ঠান্ডা পানীয় গলাধঃকরণ করছিলো তানহা। মনটা জুড়িয়ে গিয়েছে। ও থেমে গিয়ে সরল গলায় বললো,
– বাবা তো হসপিটালে। রাতে আসবে।
নিবৃতা স্থির বনে তাকিয়ে রয়। গ্লাসটা টেবিলে রেখে এসে তানহার পাশে বসে। জানতে চেয়ে বলে,
– তোমাকে নিতে যায় নি?
– না তো।
– তাহলে তোমার জন্য যে গাড়ি এসে অপেক্ষা করে?
– আরেহ উনি তো ড্রাইভার আঙ্কেল। বাবার তো সময় হয় না।
বিস্ময় ভাব নিবৃতার পুরো মুখটা ছেয়ে যায়।
– সবসময় ড্রাইভারই যান?
– হ্যা।
– বয়স কেমন?
এবার তানহাকে ভাবুক দেখালো। চোখমুখ ছোট করে বললো,
– বাবার চেয়ে বড় হবে হয়তো।
নিবৃতার মুখাবয়ব বড্ড নিরেট হয়ে যায় এই মুহুর্তে। সরল চোখে কেমন চাপা ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটে। হাত দুটো হয় মুষ্টিবদ্ধ।
রাত সাতটা বেজে গিয়েছে তাবিবের বাসায় পৌছাতে পৌছাতে। চেম্বার না থাকায় একটু দ্রুতই এসেছে। আবহাওয়া আজ বেশ গরম। ঘাম হচ্ছে প্রচুর। কাঁধের দিক থেকে শার্টটা পুরো ভিজে গিয়েছে। বেশ ক্লান্ত লাগছে। কলিং বেল চাপার কয়েক মুহুর্ত পরে দরজায় ক্ষীণ করাঘাতের আওয়াজ হয়। ভ্রু কুঁচকায় তাবিব। মেয়েটা ওকে এড়িয়ে চলেছে এ দুইদিন। দরজা খুলতেও আসে নি। আজ আবার এলো? বোধহয় তানহা নেই। ও এক শ্বাস ছেড়ে বলে উঠলো,
– আমি তাবিব।
পরপর খট করে শব্দ তুলে দরজা খুলে যায়। আড়াল থেকে মাটি রঙা ওড়না নজরে আসছে। যে মানুষটা ওর থেকে ইচ্ছেকৃতভাবে লুকিয়ে থাকে, তাকে তাবিবও দেখে না দেখার ভান করলো। কোন কথা ছাড়াই সুন্দরমতন জুতো খুলে যখন ঘরের পথ ধরলো তখন পিছন থেকে সেই সরু আওয়াজটি ওকে থামিয়ে দিতে বললো,
– আপনার সাথে কিছু কথা ছিল।
তাহলে সে নিজের প্রয়োজনে এসেছে? তাবিবের ভালো লাগলো না এই স্বার্থপরতা। ও নাকোচ করে বললো,
– আমি অনেক ক্লান্ত এখন। পরে কথা বলি।
– নাহ!
দৃঢ় কন্ঠের সে রাজি হলো না। তাবিব বিস্ময় নিয়ে ঘুরে দাড়ায়। নিবৃতা তখন ফ্রিজ খুলে শরবতের গ্লাস বের করছে। সেটি নিয়ে তাবিবের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
– একটু বসুন।
এ কাকে দেখছে ও? আজ জড়তার কোন লক্ষণ নেই তার মাঝে! যদিও সে চোখ তুলে তাকায় নি। তাবিব আর মানা করলো না। শরবতের গ্লাসটা হাতে নিয়ে বসলো সোফায়।
– বলুন।
নিবৃতা সময় নিলো না। সারাদিন এই ক্ষনের অপেক্ষাতেই সে ছিল। ও থমথমে গলায় বললো,
– আপনি ড্রাইভার পাঠান ঝিলমিলকে বাসায় পৌছে দিতে?
গ্লাস এক চুমুক বসাতেই আরাম পেলো তাবিব। গলার কাছে দুটো বোতাম ছাড়িয়ে সোফার পীঠ এলিয়ে দিলো। নিবৃতার প্রশ্নের জবাবে বললো,
– হ্যা। কোন সমস্যা?
– আপনার কাছে এটা কোন সমস্যা লাগছে না?
জহুরি নজরে তাকায় তাবিব। কপালে ভাজ ফেলে বলে,
– কি বলতে চাইছেন?
– আপনি একজন অপরিচিত, অচেনা, অজানা লোককে কেন ঝিকমিলকে নিতে পাঠাবেন?
কন্ঠে কেমন ক্ষোভ ঝড়ে পরছে। তাবিব বিচলিত হয়।
– অপরিচিত কোথায়? আমার হসপিটালেই তো কাজ করে। বিশ্বস্ত বলেই মেয়ের কাজে রেখেছি তাকে।
– তার বিশ্বস্ততার কোন নিশ্চয়তা আছে?
তাবিব দেখলো, কথা বলতে গিয়ে সর্বদা যার ঠোঁট কাপে তার চোয়াল আজ শক্ত, মসৃণ! তানহার বিষয়ে সে কখনও কোন অপোষ করে না। তার চিন্তা বুঝতে পেরে তাবিবের মনে ভালো লাগা কাজ করলো। তাই বিবাদে না যেয়ে শান্ত স্বরে বলে,
– লোকটা আসলেই খুব ভালো। অনেক বছরের চেনাজানা। আমার মেয়ের নিরাপত্তার চিন্তা কি আমার নেই?!
– কেউই বিশ্বাসের যোগ্য নয়।
নিবৃতা প্রতিবাদী গলায় বলে। তাবিব কি বলে প্রতিরোধ করবে বুঝে পায় না।
– তাহলে আমাকে এখন কি করতে বলছেন? আমার তো তখন সময় হয় না যে তানহাকে বাসায় পৌছে দিয়ে যাবো।
– আপনার ড্রাইভারকে বলবেন, সে যেন আগে বাসায় এসে আমাকে নিয়ে যায় তারপর তানহার স্কুল।
তাবিব অবাক হয়ে বলে,
– আপনি যাবেন?
– আমার মেয়ের দায়িত্ব আমি অন্য কোন অপরিচিত, বেগানা পুরুষের হাতে দিবো না।
জেদি এক কন্ঠস্বর। হাতদ্বয় তার মুষ্টিবদ্ধ করে রাখা। নিশ্চল দৃষ্টি তার মেঝেতে রাখা। সামান্য একটি বিষয় তবুও যেন অসামান্য। সেই নত মুখটির দিকে তাবিব অপলক তাকিয়ে রইলো। কেন যেন নজর ফেরাতে মন চাইলো না একটুও। তার সম্পর্কে প্রথম যখন জানতে পেলো, তখন মনে হলো এরকম একটা মেয়ে কি আদোও কারও মা হওয়ার যোগ্য? অথচ অতি অল্প সময়েই মানবীটি তার সাধারণ এক কর্মে তাবিবের সেই প্রশ্নকে এক লগমায় চুরমার করে দিলো। কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠলো তার মনটা। শুধু ছোট্ট করে নরম স্বরে বললো,
– আপনি যেভাবে বলবেন সেভাবেই হবে নিবেদিতা।
নিবৃতা তখন তানহার খাতা দেখছিলো। বাসায় তেমন একটা কাজ নেই। তাই তানহার পড়ালেখার দায়িত্ব এখন ওর উপরেই। আগে তাবিব সাহায্য করতো। এখন সেটারও প্রয়োজন নেই। লিখতে বসে বারংবার অগোছালো চুলগুলো তানহাকে বিরক্ত করছিলো বেশ। ও নাক কুঁচকে সেগুলো বারে বারে সরিয়ে দিতে লাগলো কিন্তু তবুও কোন লাভ হলো না। পরাজিত হয়ে, চট করে উঠে গিয়ে চিরুনি হাতে নিলো। বাবা মসজিদে গিয়েছে। তাই শেষ উপায় নিবৃতা। সোজা গিয়ে নিবৃতার দিকে চিরুনি বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
– আম্মু চুল আঁচড়ে একটা বিনুনি পাকিয়ে দাও তো!
খাতা থেকে চোখ তুলে একবার তানহার দিকে তো আরেকবার চিরুনীর দিকে তাকালো ও। দৃষ্টিতে পুরো বিভ্রম ছড়িয়ে। বুঝলো না কি করবে।
– নাও।
নিবৃতা সোজা হয়ে বসলো। মুখটা ছোট করে বললো,
– আমি তো পারি না।
তানহা বড় বড় করে তাকিয়ে বলে,
– তুমি বিনুনি বানাতে পারো না?
অকস্মাৎ নিজের মাথায় হাত দেয় নিবৃতা। সেখানে খোঁপা বাধা। গত তিন দিনে ঠিক মতো চুল আঁচড়ায় নি ও। আগে তো মা ধরে বসে চুলের যত্ন নিতেন। এসবের প্রতি কোন পরোয়া কখনই ছিল না ওর। কিভাবে কি করে জানা নেই। ওর সত্যিই এবার আফসোস জাগলো। সারাটা জীবন কি করে আসলো ও? পুরো সময়টাই নষ্ট করেছে। অবশ্য ওর জীবনটা তো নষ্টই! কিছুই নেই এখানে! ও শুকনো মুখে বললো,
– আগে তো মা করে দিতো। আমি কখনও করি নি।
বলার ধরন বড্ড শিশুসুলভ। তানহা হেসে ফেললো। হাসতে হাসতে নিবৃতার গায়ের উপর ঢলে পরে বললো,
– তুমিও আমার মতো একটা বাচ্চা। বড় বাচ্চা।
– সরি।
নিবৃতা হাসলো না। নিজের অপারগতায় ওর রাগ হলো। তানহা হাত নাড়িয়ে বললো,
– নো প্রবলেম। বাবার কাছে চলে যাবো। বাবাই তো আঁচড়ে দেয়।
নিবৃতা শুনলো কথা টুকুন। বুঝলো তাকে আবারও সেই লোকটার শরণাপন্ন হতে হবে। এক দীর্ঘশ্বাস বুক চিরে বেরিয়ে গেলো। মুখটা কাঁদো কাঁদো হয়ে উঠলো সহসা!
দরজা আবারও সেই মানবীই খুলেছে। তাবিব এবার আর সাবলীল মুখে থাকতে পারলো না। ও বুঝতে পেরেছে এর পিছনেও কারণ আছে। ঠোঁটের কোনে এক বক্র হাসি খেলে গেলো। ঘরে না গিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বুকে দুই হাত গুঁজে দাড়িয়ে গেলো। বা ভ্রু উঁচিয়ে বললো,
– এবার কি প্রয়োজন?
পেলব ঠোঁট দুটো গুটিয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ। কেমন অসহায় কন্ঠে বললো,
– আমাকে বিনুনি পাকানো শিখাবেন?
তাবিবের মনে হলো ও ভুল কিছু শুনলো। বিস্ময় নিয়ে বললো,
– বিনুনি?
– জ্বি।
মাথা দুলিয়ে সে বললো। তাবিবের অনুভুতি ব্যাখা করার মতো নয়। ও দ্বিধায় পরে গেলো।
– কেন?
– ঝিলমিল চুল আঁচড়ে দিতে বলেছিল। কিন্তু আমি তো পারি না। আগে মা করে দিতো আমারটা। সেটা শুনে ও বললো, সমস্যা নেই, আপনি এসে নাহয় করে দিবেন। তাই আপনার কাছেই শিখতে এলাম।
এক কৌতুহল ঘিরে ধরলো তাবিবকে। ও সেটা না দমিয়ে বললো,
– ইউটিউবে দেখেও তো শিখতে পারতেন। আমিই কেন?
নিবৃতাকে ভাবুক দেখালো।
– ওটা কি?
বাহিরি দুনিয়া থেকে নিবৃতাকে লুকিয়েই রাখা হয়েছে এক প্রকার। এসব বিষয়ে ওর জ্ঞান শুন্যের কোঠায়। সেটা তাবিবের সম্পূর্ণ অজানা। ওর বিস্ময় মাত্রা ছাড়ালো। অবিশ্বাস্য স্বরে বললো,
– মোবাইল চালান না?
– আমার তো মোবাইল নেই।
– মোবাইল নেই মানে?
– স্কুলে যাওয়ার সময় মায়েরটা নিয়ে যেতাম। কথা বলার প্রয়োজন হলে। আর বাসায় এসে ফেরত দিয়ে দিতাম।
তাবিব বুঝতে পারছে না কিছুই। এখনকার দিনে এরকম ঘটনাও ঘটে? নিবৃতা সম্পর্কিত সবকিছুই এমন অস্বাভাবিক কেন? ওর পরিবার কি সবটা ওকে জানায় নি? কিছু কথা হয় তো এখনও আড়ালে রয়ে গিয়েছে। ওকে কথা বলতে হবে। নতুবা নিবৃতা নামক এই মানুষটাকে বোঝা ও জানা ওর জন্য ভীষন কঠিন হয়ে যাবে। ওকে অবিশ্বাস তাবিব একদমই করতে চাইছে না। তবে তবে কিছু কিছু বিষয়ের উত্তর পাওয়াটা অত্যাবশ্যকীয়! নিজের ভাবনায় লাগাম টেনে ও আস্তে করে বললো,
– আসুন তাহলে। আজকে আবারও আপনার টিচারের দায়িত্ব পালন করি।
তাবিবের পেছন পেছন কদম মিলিয়ে নিবৃতা পৌছালো তানহার ঘরে। যে তখন অংক করায় মনোযোগী ছিল। তাবিব পাশে বসে খাতাটা পরোখ করে বলে,
– এই অংকটা না তুমি সেদিন বুঝতে পারো নি? আজ কিভাবে পারছো?
গণিতের প্যাচ খোলার সময় তানহার ধ্যান জ্ঞান অন্য কোথাও থাকে না। ও কোনমতে চটপট করে বললো,
– আম্মু শিখিয়ে দিয়েছে।
খাটের এক প্রান্তে কেমন কুণ্ঠিত হয়ে বসে আছে সে। তাবিন এক নজর সেখানে তাকিয়ে তানহায় মনোনিবেশ করলো। ওর অংক হলে সবগুলো পড়ায় একবার চোখ বুলিয়ে নিলো। নাহ! সব ঠিকঠাক। সত্যি বলতে একটু বেশিই ঠিক। ও স্বস্তি পেলো। গত কয়েকদিন যাবত প্রতি পদে পদে সকল দায়িত্ব থেকে কেমন নিস্তার পেয়ে যাচ্ছে ও। ভালোমন্দ মিশ্র অনুভূতি! তাবিব মেয়ের অগোছালো চুলে হাত বুলিয়ে বলে,
– চলো, তোমার চুল আঁচড়ে দেই।
– হ্যা, চলো চলো।
তানহা গিয়ে সোজা মেঝেতে বসে পরলো, ঠিক তার অভ্যাস মতো। তাবিব মৃদু হেসে ওর পেছনে গিয়ে বসার কয়েক মুহুর্ত পরেই টের পেলো, ওর পাশেই আরেকজন কেউ বসেছে। ব্রীড়া তার মাঝে স্পষ্ট, কিন্তু তার ঝিলমিলের জন্য নিজের গন্ডী পেরিয়ে আসতে সে সদা প্রস্তুত। তাবিব কিঞ্চিৎ বেঁকে গেলো। যেন নিবৃতার দেখতে সুবিধা হয়। অতঃপর পরের পুরোটা কাজ ও বেশ সময় নিয়েই করলো। প্রতিটি কদম যতটা সম্বভ সহজ করেই দেখালো। আর নিবৃতা? তার সবটা দিয়েই শিখে নিলো বিনুনি পাকানোর মতো জটিল একটি কাজ।
নিবৃতা পর্ব ৬
এভাবেই, নতুন জীবনে মানিয়ে নিতে, অভ্যস্ত হতে একটু একটু করে নিজ খোলস হতে বেরিয়ে আসছে নিবৃতা। এক কালে যে কারও জন্য ভাবতো না, কেমন ভ্রুক্ষেপহীন। এমনকি আপন সত্তাকেও তুচ্ছ করে দিয়েছিলো, আজ সে অন্য একটি মেয়ের জন্য, যার প্রতি তার কোন রক্তের টান না থাকলেও হৃদয়ের গভীর মমত্ববোধ রয়েছে। ওর জন্য নিজেকে পরিবর্তনের চেষ্টায় রয়েছে। হয়তো এই প্রচেষ্টাটুকু আপাত দৃষ্টিতে খুব বেশি বড় নয়, তবে নিকষ তমসায় ডোবা এক দিশাহীন অস্তিত্বের জন্য এতটুকুই অনেক কিছু।
