নীতিহীন রাজ পর্ব ২৭
আশিকা আক্তার সোহাগী
১৯৭৪ সালে ইতালির সার্ভিয়াতে মারিয়া নামের একজন সেলিব্রেটি ছিলেন।সেই সেলিব্রেটি নারীকে নিয়ে তার দর্শকদের উপর রিদম জিরো নামের একটা এক্সপেরিমেন্ট করা হয়।রাত আটটা থেকে দুইটা পর্যন্ত ছয় ঘন্টা সকল অপরিচিত দর্শকদের সাথে একটা স্টেজে কাটাতে হবে। একপ্রকার স্টেচু হয়ে মারিয়াকে থাকতে হবে সেখানে ।স্টেজের টেবিলে রাখা ছিলো ফুল,কাচি, লিপষ্টিক, কেক সহ বাহাত্তর রকম জিনিস পত্র।এমন কি পেরেক বন্ধুকও ছিলো। সকল জিনিস পত্র মারিয়ার উপর ব্যাবহারের অনুমতি দেয়া হয় দর্শকদের।
প্রথম দুইঘন্টা বেশ ভালো কাটে।কেউ চুল আচড়ে দেয়।কেউ লিপষ্টিক দিয়ে দেয় আবার কেক খায়িছেও কেউ কেউ।কিন্তু রাত যত বাড়তে থাকে সবার আচরণ তত উগ্র হতে শুরু করে। একপ্রযায়ে তারা মারিয়াকে বিবস্ত্র করে দেয়।ব্লেড দিয়ে শরীরের আঘাত থেকে শুরু করে উন্মুক্ত ফিজিক্যালি ইন্টিমেট হয়।থুথু দেয়া থেকে গালিগালাজ সব রকম আচরণের শিকার হয় মারিয়া। শেষে একজন বন্ধুক নিয়ে মারতে এলে আয়োজকরা থামিয়ে দেন এক্সপেরিমেন্ট।
এক্সপেরিমেন্ট শেষে মারিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলে “আমি তো এদের কারো কোন ক্ষতি করিনি এমনি কাউকে চিনিই না।তবে এত ঘৃণা আর বিষাক্ত কেনো হবে মানুষের আচরণ? ”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
এই এক্সপেরিমেন্ট করার প্রধান কারণ হলো ,মানুষ মূলত সবচেয়ে হিংস্র আর উগ্র প্রাণী। সে আপনি চেনা হোন কিংবা অচেনা।নিজের অল্প ক্ষমতার বলেও তারা অন্যকে অপদস্ত কিংবা অহেতুক খুন করতেও পিছোপা হবে না।
তেমনি জিয়নাদের এলাকার বেশিরভাগ মানুষ অপরিচিত। সাত মাসের আবাসস্থলে কেউ কারো আপন কিংবা পর না।কারো সাথে ক্লেশ নেই। ঝগড়াঝাটি কিংবা কোন বিরুধ নেই। তবুও পুরো এলাকা বাসির চক্ষুশূল হয়ে উঠেছে হক পরিবার।সবকিছু হারিয়ে বিধ্বস্ত এই পরিবার যখন কোন রকম বেঁচে আছে।তবুও প্রতিবেশিদের কথার বানে তাদের জীবন ওষ্ঠাগত।
জেনি আসার পর থেকে বিল্ডিংয়ের গেইটের কাছে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে মানুষজন ঘিরে রেখে নানা রকম খারাপ গালিগালাজ করছে।জিয়ানা দূর থেকে তাদের বিল্ডিংয়ের সামনে হট্টগোল দেখে পায়ের গতি বাড়ায়।আর কাছে এসে মাথায় আগুন জ্বলে উঠে।
কয়েকজনকে ধাক্কা দিয়ে সড়িয়ে জেনির কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে অগ্নিচূর্ণ হয়ে একপ্রকার চিৎকার করে প্রশ্ন করে,
-নাটক বের হয়েছে এখানে? আমরা কি চিড়িখানার কোন রংচঙয়ে জন্তুজানোয়ার?
-পাশের ফ্ল্যাটের এক মহিলা সমান গলা উঁচিয়ে বলে,
-জন্তুজানোয়ার তোদের চেয়ে ভালো আছে।নষ্টা মেয়ে মানুষ কোথাকার। তোদের জন্য আমাদের এলাকার বদনাম হচ্ছে।কাল রাতে এসে কে কে যেনো বিয়ে করে গেছে। আবার রাত বিরাতে দুইজনেই বের হয়ে অন্য নাগর ধরতে গিয়েছিস।আমরা কি কিচ্ছু জানি না?
জিয়ানার শরীর রাগে ঘৃণায় কিলবিলিয়ে উঠলো। শরীরের সমস্ত রক্ত যেনো রগবগীয়ে মাথায় চলে এলো।অস্বস্তি ও ভর করছে ক্রমাগত। চরিত্রের উপর কেউ আঙুল উঠালে ঠিক এমন কষ্ট হয় বুঝি।জেনি কিভাবে সহ্য করে এসেছে সব?
-হ্যাঁ হ্যাঁ এসেছেন সব বিজ্ঞ আর জানলে ওয়ালা। আপনারা তো সব চোখে শুনেন আর কানে দেখেন।খুবই যদি ভদ্রলোকের পাড়া হতো তবে দিন দুপুরে একটা মেয়ের সর্বনাশ করে চলে যায়। আর আপনারা বাহিরে দাঁড়িয়ে তামাসা দেখেছেন।পুরোঘর লণ্ডভণ্ড করে ফেলেছে অথচ আপনারা কানে তুলো দিয়ে আর নাকে সরিষা তেল দিয়ে ঘুমিয়েছেন।এখন আসছেন লেকচার দিতে।রাত বিরাতে বা যখন ইচ্ছা তখন আমরা বের হবো। আপনাদের এখনো দেখার আর শোনার কিচ্ছু নাই।ফার্দার যদি আমাদের কোন প্রকার টিজিং করে কেউ কিচ্ছু বলেন মানহানীর মামলা ঠুকে দিবো।আর সবার আগে দিবো আপনাদের নামে। দ্যা বিখ্যাত কুটনী মহিলা গ্রুপ।
জিয়ানা আঙুল দিয়ে কিছু মহিলাকে দেখিয়ে জোরগলায় বলে উঠলো।
ভীরের মাঝে এখন আবার অনেকেই কথা বলা শুরু করলো। বেশিরভাগই নেগেটিভ কথাবার্তা আর গালিগালাজ। এরমাঝে আরেক মহিলা এগিয়ে এসে খপ করে জিয়ানার চুলের মুঠি ধরে জেনির কাছ থেকে সরিয়ে ফেলে বলে উঠলো ,
-সবাই দেখুন কেমন অসভ্য মাইয়া এরা।এদের কে এইভাবে ছেড়ে দেয়া উচিত না।একদিন শিক্ষা দিলে একেবারে টাইট হইয়া যাইবো।এদের চুল ফ্যালাইয়া ন্যাড়া করে দিয়ে ,চুন কালি মেখে সারা এলাকা ঘুরাইলে দেখবেন এদের লজ্জা হবে।
সবাই হ্যাঁ হ্যাঁ করে একমত জানালো।জেনি এবার কেঁদে দিয়ে বলে উঠলো ,
-আমরা আপনাদের মেয়ের বয়সী। অথচ আপনারা এমন ব্যবহার করছেন? কোনদিন বেয়াদবি তো দূরে থাক চোখ উঠিয়ে কথা বলিনি আপনাদের সাথে।তবুও আপনারা আমার সাথে ঘটা অন্যায়ের জন্য আমাদেরকেই বলির পাঠা বানাচ্ছেন? আজ যদি আমাদের জায়গায় আপনাদের মেয়ে হতো?
আরেক মহিলা পেছন থেকে এসে জেনিকে সপাট চর মেরে বলে,
-তোদের মতো নোংরা মেয়েদের মুখে আমাদের মেয়েদের নাম মানায় না।এই সবাই ধর এদের আজ উচিত শিক্ষা না দিলে অন্য বাচ্চারা নষ্ট হয়ে যাবে।
জিয়ানাকে যে মহিলা ধরে রেখেছিলো সে মহিলার পেটে একটা কনুই দিয়ে জোরে গুতো দিলো।তারপর দ্রুত অন্য হাত দিয়ে চুল ছাড়িয়ে নিয়ে মহিলার হাত পিছমোড়া করে চেপে ধরে চিৎকার করে বলে উঠলো ,
-আমি জিয়না হক। দেখতে সোজা হলেও মানুষটা একেবারেই ত্যাড়াব্যাড়া।একেবারেকই সোজা না।আমার দিকে কেউ ঢিল মারলে আমি তারদিকে বোম মারি।
একটা জোরে নিশ্বাস ছেড়ে আবার বলে উঠে,
-আমি মিসেস সুখনীল নিবিড়। আলহাজ্ব মামুন ইসলামের ছোট পুত্রবধূ।আজ আমাকে এখানে যে বা যারা যারা বাজে মন্তব্য করেছেন। কসম খোদার প্রতিটা মানুষকে আমার স্বামী সাড়ে তিনহাত মাটির নিচে জিন্দা পুতে ফেলবে।
উপস্থিত জনতার এতক্ষণে টনক নড়ে। তারা ভেবেছে সম্পুর্ণ গুজব।চেয়ারম্যান পুত্রের কি পাত্রীর অভাব পড়েছে এমন বাড়িতে বিয়ে করবে।কিন্তু যেভাবে এই মেয়ে গলা উঁচু করে বলছে নিশ্চয়ই এটাই সত্যি। এবার কেউ কেউ পিছু হাটলো।কুটনি মহিলারা কেউ কেউ গাইগুই শুরু করলো।
জিয়ানা বুঝলো মেডিসিন কাজ করেছে।আর এটাও বুঝলো ক্ষমতার উপর কিছু নাই।সেই স্বল্প পাওয়া অল্প ক্ষমতার ব্যবহার না হয় একটু করলো।জিয়ানা কুড়িয়ে পাওয়া ক্ষমতা কাজে লাগাতে কিংবা কোন প্রকার লাইমলাইট চায় না। যে মহিলা জেনিকে চর মেরেছে ,সেই মহিলার হাত ধরে জেনির কাছে এনে বলে,
-নাও আপি কষিয়ে একটা রিটার্ন চর দিয়ে দাও।বাকির কাম ফাঁকি।
জেনি সেই মহিলাকে ছাড়িয়ে জিয়ানাকে বলে উঠলো ,
-কু*কুর কামড়ালেও মানুষ উল্টা কু*কুরকে কামড়ায় না।ভেতরে চল।
তারপর সেখান থেকে সটান ঘরে ঢুকে গেলো তারা।বাহিরে তখনো সামাজিক প্রাণীদের অসামাজিক আলোচনা চলমান।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচের সম্পুর্ণ ঘটনা দেখেছেন আঞ্জুমান। যতটুকু নরম হয়ে এসেছিলো ভেতর ভেতর ,হঠাৎ করে আগুন জ্বলে যেনো সেটা চারগুন কঠিন হয়ে উঠলো। নিজের জীবনের শিক্ষকতা আর টিপটাপ করে সম্মানের সাথে চলে এসে এই বয়সে এত লাঞ্চনা উনি আর নিতে পারছেন না।হয় নিজের বিষ খেয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিবেন। না হয় সারাঘরে আগুন জ্বেলে একসাথে পুরো পরিবার শেষ হয়ে যাবে।সম্মানহীন ভাবে একশো বছর বেঁচে থাকার চেয়ে সম্মান নিয়ে একদিন বেঁচে থাকা ভালো।
জেনি আর জিয়ানা খোলা দরজা দেখে কিছুটা অবাক হলেও ,জিয়াউলকে দেখে স্বাভাবিক হলো।জুতা ছেড়ে ড্রয়িং স্পেসে আসার আগে আঞ্জুমান হনহন করে তেড়ে এসে জেনিকে উল্টোপাল্টা থা*প্পড় দেয়া শুরু করলো।
সবাই বিস্ময় আর স্তব্ধ হয়ে গেলো কয়েক মুহূর্ত। পরক্ষণেই জিয়ানা দৌঁড়ে গিয়ে জেনিকে টেনে সরিয়ে এনে প্রশ্ন করলো,
-পাগল হহে গেছো আম্মু?
-পাগল হলেও ভালো ছিলো।তোদের কে বড় করে আজ এই প্রতিদান পাচ্ছি।ঘরের বাহিরেও পা দেয়া যায় না।সারা এলাকায় ছিঃ ছিঃ।
আমাকে বিষ এনে দে নাহয় দুইজনই রেলের চাকায় মাথা দে।
বলে হু হু করে কেঁদে ফ্লোরে বসে পড়লেন আঞ্জুমান।জিয়াউল যেনো নিরব দর্শক। শুধু শরীরেই না আজকাল মন মস্তিস্কেও নিজেকে ইনভ্যালিড মনে হয়।সব সময়ের উঁচু মাথা আজ নিচু হতে হতে মাটিতে মিশে যাওয়ার যোগাড়।
জিয়ানা আঞ্জুমানকে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো সেই অবস্থাতেই। আঞ্জুমান তড়িৎ-গতিতে জিয়ানাকে ধাক্কা দিয়ে চিল্লিয়ে ধার কন্ঠে বলে উঠলো ,
-তোর জন্যই আজ আমার আর আমার মেয়ের এই অবস্থা।সেদিন তোকে খুজতেই এসেছিলো ওরা। তোকে না পেয়ে আমার মেয়েটার সর্বনাশ করে দিয়ে গেছে।আমার পরীর মতো মেয়েটার বিয়ে হলো পাড়ার বখাটের সাথে।ভালো হবে না তোর কোনদিন জিয়ানা। আমি অভিশাপ দিচ্ছি তোকে। তোর জন্য আমার সোনার সংসার জ্বলে পোড়ে কয়লা হয়ে গেলো।ভালো হবে না।এইজন্যই তোরও ভালো বিয়ে হলো না।মাস্তান গুন্ডা একজন পেয়েছিস।শুনেছি নারী কেলেংকারী আছে অনেক। লম্পট বর পেয়েছিস। এখন বাকি জীবন বুঝবি আর ধুকে ধুকে মরবি।গোমড়ে মরবি।
জেনি এতক্ষণ চুপ করে থাকলেও এবার গর্জে উঠে বলল,
-ছিঃ আম্মু। তোমাকে নিজের আম্মু ভাবতেও আমার আজ লজ্জা লাগছে।তুমি কাকে গুন্ডা লম্পট বলছো জানো? যার টাকায় এখনো চলতে পারছো তাকে।তোমার গুনধর ভাই বহু আগেই জমি বিক্রি করে দিয়েছে জাল দলিল করে। নিবিড় ভাই নিজের পকেটের টাকা দিয়ে তোমার ভাইকে পাঠাইছে।সেই টাকায় আজ সংসার চলছে। ডোন্ট জাজ আ বুক বাই ইটস কভার। আর নিবিড় আর মুসাদ্দিক কোন রাজনৈতিক টাকা খায় না।তারা দুইজনই সফল ফ্রিলান্সার।তাই ভালো কথা বলতে না পারো বলো না।কিন্তু খারাপ কথা সহ্য করবো না।
জিয়াউল সব চুপচাপ শুনে এতক্ষণে মুখ খুললেন।
-আঞ্জুমান আমি আজ এই মুহূর্তে স্বজ্ঞানে স্বইচ্ছায় একটা স্বীদ্ধান্ত নিয়েছি।আমি আর তোমার সাথে সংসার করতে চাই না। তাই তোমাকে আমি ত্যাগ করলাম।মানে তালাক দিচ্ছি।এক তালাক ,দুই….
জিয়ানা গিয়ে জিয়াউলের মুখ চেপে ধরলো। কাপা গলায় বলল,
-আব্বু আমাকে আর অপরাধী বানিয়ো না।আমার সব দোষ এটা আমিও মানি।আমার জন্মের দোষ। আমার ভাগ্যের দোষ। তোমরা আমাকে চমৎকার শেল্টার দিয়েছো।শিক্ষা ,আদব কায়দা সব দিয়েছো পরিপূর্ণ। আমি সেগুলো ব্যবহার করতে পারিনি। কাজেও লাগাতে পারিনি।চলো আমরা এই এলাকা ছেড়ে দেই।অতীতকে তো মুছে ফেলা যায় না।তবে অতীত আগলে ধরে বসে থাকাও ঠিক হচ্ছে না।
কথাগুলো জিয়ানা অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবে বললেও চোখে হড়কাবান। তারপর গড়িয়ে পড়া সেই পানি গালের উপর থেকে মুছে আঞ্জুমানের দিকে তাকিয়ে বলল,
-আম্মু অভিশাপ দিলে যদি তোমার একটুও ভালো লাগে তবে তাই দাও।আর ভার্সিটির কাছে আমরা যে বাসা নিয়েছি আমি আজ থেকে সেখানেই থাকবো পার্মানেন্টলি।আপিও হইতো সেখানেই উঠবে।তোমাদের জন্য অন্য এলাকায় বাসা দেখবো।ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট হলেই চলবে তাই না?
আঞ্জুমান জিয়াউলের দিকে তাকিয়ে আছে তখন থেকেই।তার কানে আর কোন শব্দই যাচ্ছে না। তালাক শব্দটাই বাড়ি খাচ্ছে বারবার।
এই সে এদের জন্য নিজের সুন্দর বিলাসী জীবন ফেলে এসেছিলো? এমন ঠুনকো ভালোবাসা জিয়াউলের? চাকরি ছাড়া ,অর্থ অভাবে দৈন্যদশায় দিন কাটাচ্ছে।সামাজিক ,আর্থিক সব দিক দিয়ে আজ শূন্যের ঘরে এসে আঞ্জুমান না হয় ভুলভাল বলে ফেলেইছে তারজন্য জিয়াউল সোজা ত্যাগের কথা বলবে?
আঞ্জুমান গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে কন্ঠ শক্ত করে বলে উঠলো ,
-তোমাদের কারো কোথাও যেতে হবে না।আমি নিজেই চলে যাচ্ছি।ত্যাগ করতে চাওয়া আর করা একই জিনিস।ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিবো শীঘ্রই।
জিয়ানা আঞ্জুমানের পা টেনে ধরে হিচকি দিয়ে এবার কান্না শুরু করলো। এমন ভাবে ধরেছে আঞ্জুমান নড়তেও পারছে না।পেছন ফিরে দেখলো চলে যাবো বলার পরেও জেনি আর জিয়াউলের চেহারা অপরিবর্তিত। আর নিচে তাকিয়ে দেখলো যাকে পর ভেবেছে সে আকুল হয়ে কেঁদে যাচ্ছে।
-আম্মু। ও আম্মু। তুমি আমাকে মারো কাটো যা ইচ্ছা করো আগের মতো।গালিগালাজ করো যত ইচ্ছা তবুও ছেড়ে যেয়ো না।তুমি বের হওয়ার সাথে সাথে আব্বুর হার্ট এট্যাক করবে। আমরা তো এতিম হয়ে যাবো আম্মু। আমার সত্যি কোন হাত নেই এসবে।কোন একটা ভুলের কাফফারা চলছে আমাদের।আমি সব ঠিক করে দিবো ইনশাআল্লাহ। আমাকে একটু ভরসা করা যায় না? তুমি নিজের হাতেই তো আমাকে মানুষ করেছো। তুমি কি তোমার জিয়ানাকে চেনো না? আমাদের বিয়ে ভুল হলেও ভুল মানুষের সাথে হয়নি। তাদের ভেতরে এখনো মনুষ্যত্ববোধ আছে।আমাদের উপর একটু ভরসা করো দয়া করে।
আর কিছু বলতে পারলো না জিয়ানা কান্নার দাপটে। আঞ্জুমান নিজেও নিচু হয়ে বসে জিয়ানাকে জড়িয়ে ধরে শব্দহীনভাবে কেদে উঠলো।জেনি দৌঁড়ে এসে একসাথে আঞ্জুমান আর জিয়ানাকে জড়িয়ে নিলো।সেও কেদে কেটে শেষ।
জিয়াউল হুইল চেয়ার টেনে এনে ধপ করে ফ্লোরে পড়ে গেলেন।সেদিকে পাত্তা না দিয়ে শরীর টেনে সবার কাছে এনে আগলিয়ে নিলো পুরো পরিবারকে।
সবাই আজ কাদছে। কাদুক। কান্না স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ করে। শরীরের টক্সিন চাপ উপশমে সাহায্য করে। কান্না মানুষের প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় করে।যার ফলে কান্নার পর একপ্রকার প্রশান্তি বয়ে আনে শরীর আর মনে।
নরম হয়ে আসা সূর্যের তেজ জানান দিচ্ছে দিনের টেম্পার প্রায় শেষ।অপরাহ্নের শুরুতেই হঠাৎ করে কিছু মহিলা পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায় জিয়ানাদের বিল্ডিংয়ের সকালের কুটনি দুইজন মহিলাকে।সারা এলাকা থম মেরে যায় এই ঘটনায়।
মক্কু এসে নিবিড়কে জানায় ,
-ভাই কাজটা কি ঠিক হইলো?
-শোন এলাকায় যখন অনেক কু*ত্তা হবে।অযথায় সেগুলা ঘেউঘেউ করবে।কু*ত্তার দলের মাঝে দুইটারে কষে বারি দিবি তারপর সবগুলার ঘেউঘেউ বন্ধ তো হবেই সাথে অর্ধেক এলাকা ছেড়ে পালাবে।
-এই থেরাপি তো জানিই ভাই।কিন্তু দুইজনের মাঝে একজন পাপ্পুর বোন আছে।যে জেনিকে চর মারছে ওই মহিলাটা।এই মহিলাই সব মদতদান করছে।পাপ্পু আর গালকাটা মকবুল এর পেছনে আছে নিশ্চিত ভাই।
নিবিড় পেপার ওয়েটটা ঘুরালো বার কয়েক তারপর বলল,
-আমার বাঘিনী এমনি এমনি ছেড়ে দিলো সেটা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।তুই শিউর জিয়ানা কিছু করে নাই?
-সেটা জানি না ভাই।জনি জানে। ঘটনাস্থলে ওই ছিলো।
-আচ্ছা জনিকে দেখা করতে বলিস।আর এক সপ্তাহ পর কালচারাল ফেষ্ট। খরচের হিসেবটা করে আমাকে দিস।প্লাস প্রধান অতিথি দিবি মাঈনুল খানকে।
মক্কু অবাক হয়ে নিবিড়ের পায়ের কাছে এসে বসে জিজ্ঞেস করলো ,
-ভাই? মাঈনুল খান?উনি কি আসবে? একজন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সত্যি আসবে?
-হুম আমার সাথে কথা হয়েছে।উনার সিডিউল ফ্রি অনুযায়ী ডেট ফিক্সড করেছি আমি।
-চেয়ারম্যান স্যার জানেন?
-নাহ।
তখনই নিবিড়ের ফোনে কল আসলো।কল রিসিভ করে শুধু শোনা গেলো আসতাছি।
-থানায় চল।আমাদের পার্টির দুইল ছেলে বাইশ হাজার পিস ফেন্সিডিল সহ সীমানায় কট খাইছে।
বলে মুচকি হাঁসলো।
মক্কুও দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলো ,
-ভাই আমি না শোনলাম আড়াইলাখ বোতল নিয়ে আসতাছে?
-এটাই টেকনিক পাপ্পুর।ছোট্ট চালান দিয়ে ইচ্ছাকৃত কট খাওয়ায়ে আস্তেধীরে বড় চালান নিয়ে পগারপার হয়।
-পুলিশ গুলাই এক একটা শা*লার ন্যাংটি ইন্দুর। বা*লগুলারে সরকার কি ট্রেইনিং দেই আমি বুঝি না ভাই?
-পুলিশ নিজেই ইনভলভ থাকে রে মক্কু।তারা কমিশন খেয়ে সাবধানে পাড় করে দেয়।তবে এইবার পাপ্পু একা না। তোর মনে আছে নায়িকা রুমঝুম গুম হওয়ার জন্য যে রেজাউল সরকারের কাছে গিয়েছিলাম?
-হ ভাই অনেক রাতে গেলেন।
-ভেতরে কেউ ছিলো না।তবে বাহিরে পাপ্পু আর গাল কাটা মকবুলের জুতা ছিলো।
-বিরোধীদলীয় নেতার সাথে ভাই রেজাউল কি করে?
-সবাই একঘাটে পানি খায় রে মক্কু।রাজনীতিতে সবাই যেটা দেখে সেটা রাজনীতি না। এটা শুধু স্ক্রিপ্ট সাজানো একটা রুল প্লে করা থাকে। ভেতরে সব ভিন্ন।কন্ট্রাক্ট করা থাকে কার কতটুকু ভাগ। তবে আমার আর তোর মতো যারা আছি তারাই আসল মারাটা খায়।ফ্রন্টলাইনে আমাদের রেখে এরা সবসময় ডাবলরুল প্লে করে। টু মাচ আয়রনি না?
-হ ভাই।কিন্তু আমরা তাহলে কোন পক্ষে? সবাই যদি তলে তলে এক হয় আমরা তো সব একবারে ফেঁসে যাবো।
-অলরেডি তুই ফাঁসা।
-কোনটার জন্য?
দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো মক্কু
-রেজাউলের সরকারের অফিসে তুই দুইবার নষ্টামি করছিস। যদিও নেশার ঘোরে। তবুও উনার কাছে ফুটেজ আছে।
মক্কু লজ্জায় মুখ লুকিয়ে বলল,
-ভাই জেনি যদি জানে তাহলে কি আমাকে ভুল বুঝবে না?
-জেনি অনেক ম্যাচিউড। আমারটা হলে আইসা বলতো ‘যান দ্বিতীয় বিয়ে করে আসেন।তিনটা সিট খালি আছে এখনো”
বলে হোঁ হোঁ করে হেঁসে উঠলো।মক্কু খেয়াল করলো নিবিড় ইদানীং কারণে অকারণে হাঁসে।কিন্তু তার হাঁসি আসছে না।তাই স্বীদ্ধান্ত নিলো যা যা গোপন কথা আছে সব বলে দিবে।সম্পর্ক শুরু করতে গেলে কোন গোপনীয়তা রাখা উচিত না।বিশেষ করে এইসব বিষয়ে তো একদমই না।
জিয়ানা আর জেনির ফাইনাল পরিক্ষার দোহাই দিয়ে ফ্ল্যাটে উঠেছে। জিয়াউল গাইগুই করলেও জিয়ানা হাবিজাবি বুঝিয়ে এসেছে।প্রতি উইকেন্ডে যাবে তারা। তাছাড়া কাছাকাছি তো ,ফোন করলেই হাজিরা দিয়ে আসবে।
জিয়ানা ব্যাগ সহ কিছু দরকারি জিনিসপত্র সহ জেনিকে উপরে দিয়ে একটু মার্কেটের দিকে যাবে।জেনি ব্যাগ ফ্লোরে রেখে বলে ,
-আমিও যাবো। মুসাদ্দিক নিচে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। একটু দেখা করে আসি।
জেনি আর জিয়ানা নেমে দেখে নিবিড়ের বাইক নিয়ে মক্কু দাঁড়িয়ে আছে।মুখচোখে অন্যদিনের মতো উৎফুল্লতা নেই।জিয়ানা তাদের রেখে সামনে আগালো।
মক্কু ইশারা করলো বাইকে বসার জন্য। জেনি বিনাবাক্যের উঠে বসলো। জড়তা-সংকোচ ছাড়াই পেটের কাছে হাত দিয়ে ধরে বসলো।মক্কু মুচকি হেঁসে বাইক স্টার্ট করে ছুটে চললো নদীর দিকে।
বিকেল হওয়াই মানুষ জন নিশ্চয়ই সব ভাত ঘুমে।এইদিকটাই বেশ নিরিবিলি। নদীর শান্ত হাওয়াই জেনির গোছানো চুল ,যা বাইকের বাতাসে এলোমেলো হয়েছে সেগুলো উড়ছে। সাদা কালো মিশেলের একটা সেলুয়ার কামিজ পড়ে ওড়নাটা চাদরের মতো পেচানো।জেনি সবসময় ওড়না এইভাবেই পড়ে।এটা মক্কু খুব ভালো লাগে। আগে স্বাস্থ্য বেশ গুলুমুলু ছিলো। এখন স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে। তাছাড়া আগে বেশ সাজুগুজু করতো আর এখন একদম সাদামাটা। নিজের যত্নের যে বেশ হেলাফেলা করে বুঝা যায়।ফর্সা মুখে কেমন জানি বিষাদের ছাপ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। যদিও কখনো ভিক্টিম কার্ড প্লে করে না।এমনকি বেচারাভাব টাও নেই।আলাদা এক দৃঢ়তা আছে জেনির চাহনির মাঝে।জিয়ানা আর জেনির তেমন কোন মিল নেই। না চেহারা আর না ব্যাক্তিতের।
মক্কুকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে জেনি প্রশ্ন করলো,
-কত খারাপ চেহারা না আমার?
মুচকি হেঁসে মক্কু উত্তর দিলো ,
-আমার পাশে তোমাকে জ্বল জ্বলে তারা লাগছে নিশ্চয়। আমাকে দেখেছো তুমি কখনো?
-না দেখার কি আছে? ছেলে হিসেবে ঠিকই তো আছেন।শুধু একটু স্বাস্থ্য খারাপ।হাইট টাইট সবই ঠিকই আছে।খাওয়া দাওয়া ঠিক মতো করলেই ঠিক হয়ে যাবে।
মক্কু ঘাসের উপর বসে পড়লো।তারপর নিজের পকেট থেকে রুমাল বের করে বিছিয়ে জেনিকে ইশারা করলো বসতে। জেনি রুমালটা গুটিয়ে নিজের হাতে নিয়ে খালি ঘাসের উপর বসলো।
মক্কু জেনির রুমাল ভাজ করা দেখতে দেখতে বলল,
-কিচ্ছু ঠিক নেই।তুমি জানো আমার চেহারায় গাঞ্জুটে একটা ভাব আছে? অথচ আমি কখনো গাঞ্জা তো দূরের কথা তেমন একটা সিগারেটও খাই নাই।তবে ড্রিংক্স করেছি।
মথা চুলকিয়ে আস্তে করে বলে অন্যদিকে তাকালো।
জেনি মুচকি হাঁসলো ,এমন মুখচোরামি দেখে।মক্কু আরও বলল,
-শুধু মাত্র এই চেহারার জন্য আমকে অসংখ্যবার পুলিশ রাস্তায় আটকিয়েছে।হুদাই চেক করেছে। পুলিশের ধারণা আমি কঠিন গাঞ্জা সেবক।
মক্কুর বলার ধরণ দেখে জেনি খিলখিল করে হেঁসে উঠলো। আর মক্কু তার সাথে সাধ দিলো।জেনির অতিরিক্ত হাঁসার ফলে চোখের কোনে জল চিকচিক করে উঠলো।
-নিজেকে নিয়ে কেউ এইভাবে বলে?
-যা সত্যি তা স্বীকার করতে দোষের কি? তোমাকে আর একটা কথা বলার জন্য এনেছি।
মাথা নিচু করে বলল মক্কু।
জেনি জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকালো তার দিকে।
মক্কু দ্বিধা ঝেড়ে বলা শুরু করলো ,
-আমি সারাজীবন ভেবেছি বিয়েসাদী করবো না।তোমাকে ভালো লাগতো কিন্তু বলার সাহস হয়নি কারণ কোথায় সজীব ভাই আর কোথায় আমি।মেয়েদের প্রতি আর প্রেম ভালোবাসা আসেনি ঠিকই কিন্তু ফাজলামি করেছি অনেক।ইভটিজিং ,ফ্লার্ট সবই করেছি রাস্তাঘাটে। কিন্তু স্বজ্ঞানে কখন..
ঢোক গিললো একটা বড় করে। তারপর জেনির হাতটা কাপা হাতে ধরে নিজের কাছে এনে বলল,
-নেশার ঘোরে আমি কয়েকবার ফিজিক্যালি ইন্টিমেট হয়েছি।আম নট ভার্জিন।
-সেটা তো আমিও না মুসাদ্দিক।আমাকে চারজন রে…
আর কিছু বলতে পারলো না জেনি।মক্কু নিজের হাত দিয়ে জেনির মুখ চেপে ধরেছে।
-ওইটা এক্সিডেন্ট। হয় না জীবনে কত এক্সিডেন্ট? তাছাড়া তোমার বয়সে অসংখ্য মেয়ে আছে যারা বিয়ের আগে অসংখ্যবার রিলেশনের নামে স্বইচ্ছায় নোংরামি করে আসে।আবার লোক ঠকিয়ে এরেঞ্জ ম্যারেজ করে।তুমি আমার কাছে পূতপবিত্র জেনি।
জেনি নিঃশব্দে কেঁদে উঠলো। মক্কু দেখলো চেয়ে মুক্তাদানার মত টুপটুপ করে চোখের পানি গাল বেয়ে পড়ছে।হাত পেতে কয়েকফোটা পানি আটকালো। তারপর জিজ্ঞেস করলো ,
-চোখের পানি খেতে কেমন খেয়ে দেখি? আমি কখন ,কবে কেঁদেছি মনে নাই।
জেনি কান্নার মাঝে হেঁসে দিয়ে সেই হাত ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিলো। মক্কু মুখ এগিয়ে এনে বলল,
-হাতেরটা ফেলে ভালো করেছো এখন তোমার গালের গুলা খাওয়া যাবে।
জেনি মক্কুর বাহুতে কিল দেয়া শুরু করলো।
-অসভ্য আছেন ভালোই।
একজোড়া কপোত-কপোতীর খুনসুটি ময় সম্পর্ক চলতে থাকলো শান্ত নদীটির তীরে ,বেলা ডোবার প্রাক্কালে।
নিবিড়ের ক্লাবের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আপনা আপনি পায়ের গতি কিছুটা শিথিল হলো জিয়ানার।পরক্ষণেই সেটাকে জোর করে বাড়িয়ে টান দিলো একটা। সাইসাই করে সাইকেলটা চলে গেলো।
অপরদিকে ভেতরের টিনের জানাল দিয়ে নিবিড় দেখে মুচকি হাঁসলো।বিয়ের পর তিনদিন চলে গেছে। কালচারাল ফেষ্টের জন্য নিবিড়ের হাড্ডি গুড়া হওয়া পরিশ্রম যাচ্ছে। তাই দেখাও হয়নি আর তাদের।কিন্তু প্রতিনিয়ত মেয়েটা নিবিড়কে জ্বালিয়ে মারছে।রাতে ঘুম তো আগে থেকেই হতো না। ইদানীং সেটা দিনেও ফেস করছে।চোখ বন্ধ করলেই জিয়ানার শরীরের গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা লাগে। কয়েকমিনিট জিয়ানার শরীরের উপর পড়ে থাকার কথা মনে হলেই কেমন শিরশির অনুভূতি ধাপাধাপি করে।চোখ পাকিয়ে নিবিড়কে রাগ দেখানো।আবার জোর করে ওষুধ খাওয়ানো। প্রতিটা কাজ থ্রিডি স্কিনের মতো চোখে ভাসে। নিজেই নিজেকে প্রচন্ড খারাপ ভাষায় গালি দিলো,
-বা*ষ্টার্ড সাবকন্সিয়াস মাইন্ড।
তারপরও যখন ক্লান্তি এসে চোখের পাতায় ভর করে। সাথে সাথে ভেসে উঠে ,তেলতেলে ছোটনাকের ,বড় বড় বাদামি চোখের এক মেয়ের মায়াবী মুখের প্রতিচ্ছবি।
জিয়ানা যখন থেকে উইগ পড়া বাদ দিয়েছে তখন থেকে দেখছে ছোটখাটো ইভটিজিং এর শিকার হচ্ছে।যদিও মাস্ক পড়েই থাকে তবুও বুঝা যায় সে একজন মেয়ে।তাড়াহুড়ো না থাকলে সেখানে দাঁড়িয়েই উত্তমমধ্যম কিছু দিয়ে দিবে।একদিন আগে স্কুলের ইউনিফর্ম পড়া কিছু ছেলে জিয়ানাকে দেখে বলে উঠে ,
-মাম্মা! সেই সেই।
জিয়ানা সাইকেল থামিয়ে বলে ,
-ওহে হারামজাদাস। আমি আসলেই সেই। কিন্তু মাম্মা হবে না ,তোদের মাম্মার বউ মামি আমি।নেক্সট টাইম ঠিকঠাক কমেন্টস চাই ওক্কে?
ছেলে গুলা হকচকিয়ে স্থান ত্যাগ করে সাথে সাথেই।আবার হাটার সময় কিংবা অন্য কাজের সময় কেউ নোংরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেই জিয়ানা বড় করে সালাম দেয়।এতে করে উক্ত ব্যাক্তিটি লজ্জায় পড়ে যায়।
মার্কেটে যাচ্ছে কিছু দরকারি জিনিসপত্র কিনতে। কিন্তু রাস্তার মাঝখানে এমনভাবে একটা সাদা টয়োটা প্রাডো গাড়ি দাঁড় করানো সাইকেলটাও পাড় করা যাচ্ছে না। তাই জিয়ানা পেছন থেকে হাক ছাড়লো ,
-আই বাপ। কোন লাট সাহেব রে রাস্তাকে নিজের পৈতৃক সম্পত্তি মনে করে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখেছে?
সাইকেল রাস্তায় রেখে জিয়ানা গাড়ির কাছে গেলো।কাচে টোকা দিয়ে মাস্ক খুলে প্যান্টের পকেটে ভরে দাঁতে দাঁত পিষে অপেক্ষা করলো আরও মিনিট দুয়েক। ধৈর্য্যের বাধ ভেঙে যখন সপ্তম আসমানে ,তখন আশেপাশে তাকিয়ে কিছুটা দূরে কাঙ্খিত বস্তুটা দেখে মুচকি হাঁসি দিলো।
অপরদিকে গাড়ির ভেতর একজোড়া চোখ দেখে যাচ্ছিলো জিয়ানাকে।
আধাভাঙা একটা ইট নিয়ে জিয়ানা যেই কাচে মারবে তখনই জানালার কাচ নেমে গেলো। সেই কাচ দিয়ে জিয়ানা মাথা ঢুকিয়ে দেখলো ,শক্তপোক্ত এক দেশি ব্যাটা বিদেশি ভং ধরে হাতে ফোন নিয়ে জিয়ানার দিকে তাকিয়ে।জিয়ানা জিজ্ঞেস করলো ,
-এই যে লাটের বাট কালা নাকি? কখন থেকে নক করছি?কানে যায় না? মুখের কথার দাম নাই অথচ ভাঙ্গা ইটের বেশ ক্ষমতা।
-আই জাষ্ট ওয়ান্ট টু সি ,অনলি বিউটি নাকি বিউটি উইথ ব্রেইন।
-দেখা শেষ? এখন ফোটেন গাড়ি সহ।নাহলে এই ইট দিয়ে কি ফাটাবো তার ঠিক নেই।মেজাজ খারাপ হওয়া শুরু হয়ে গেছে।আক্কেল তো মাথায় থাকে কিন্তু আপনার দেখছি নিতম্বে নেমে গেছে।
হো হো করে হেঁসে দিলো গাড়ির ব্যাক্তিটি।তারপর গাড়ির দরজা খোলে নেমে জিয়ানার কাছে এসে দাঁড়ালো। জিয়ানা কপাল ভাজ করে দেখলো সুউচ্চ ব্যাক্তিটিকে। কোথাও পরিচিত ঠেকছে যেনো।
-লুক ,দ্যা কার টায়ার হ্যাজ গন ফ্ল্যাট। ড্রাইভার মেকানিক কে ডাকতে গেছে। তাই গাড়ি দিয়ে এমন বেকায়দায় রাস্তা ব্লক করা।
জিয়ানা উকি দিয়ে দেখলো সত্যি সামনের চাকাটা পাংচার। নিজের ভুল বুঝতে পেরে হাতের ইট টা সাইডে রেখে বলল,
-দুঃখিত। কিন্তু এখন আমি যাবো কিভাবে? এখন বিকেল তাই রিক্সা কিংবা বাইক নেই রাস্তায়। একটু পরেই তো হেব্বি গেঞ্জাম লেগে যাবে।
ব্যাক্তিটি আর একটু এগিয়ে এসে জিয়ানার দিকে ঝুকে বলল,
-আমার তো এই ফাঁকা রাস্তায় তোমার সঙ্গ বেশ ভালো লাগছে মিস।
-এ্যা? আবেহ রুমিও। আমি জুলিয়েটের খালা ,রং নাম্বারে ফ্ল্যাট করছেন। এইসব চিজি ফ্ল্যাটে আমার বমি আসে।তাছাড়া কি পারফিউম দিয়েছেন?
বেশ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে দুই কদম পিছিয়ে গেলো জিয়ানা।
-কেনো স্মেইলটা কি অনেক হট?
-হট? হো হো করে হেঁসে দিলো জিয়ানা।তারপর আবার বলে,
-তীব্রতা এত বেশি যে আমার নাকে সুড়সুড়ি লাগছে। যে কোন মুহূর্তে হাচি শুরু হতে পারে।
-বেশ। হাচির কিন্তু একটা সুন্দর শব্দ হয়।যেমন “হাইচ্চুমু”
মুখে মুচকি হেঁসে বলে উঠলো লোকটা।
জিয়ানা বুঝলো আচ্ছা ত্যাঁদড় এই লোক। তবে ভুল লোকের সাথে পাঙ্গা নিয়েছে বাছাধন।জিয়ানা কোন রকম গাড়ি ঢেঙে সাইকেল ঘুড়িয়ে বলে উঠলো ,
নীতিহীন রাজ পর্ব ২৬
-আরেকটা আছে আপনি হইতো জানেন না।হাইচ্চু*দিরভাইমায়েরেবাপ7up।
তারপর সাইকেল নিয়ে আবার ফিরে গেলো যেদিক দিয়ে এসেছিলো সেদিকেই।
অপরদিকে রাস্তায় দাঁড়ানো ব্যাক্তিটি দম ফাটানো হাঁসি দিয়ে গাড়িতে উঠতে উঠতে বলে উঠলো ,
-ইন্টারেষ্টিং।ঝাঁসি কি রানী।
