Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৪১

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪১

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪১
আশিকা আক্তার সোহাগী

“এক তুড়িতেই আমার জীবন মোচ্ছবের সংজ্ঞায় পরিনত হলো যেনো।যখন শুনলাম আমার আম্মা নিজের সংসার বাঁচানোর জন্য কালো জাদুর মতো পন্থা বেছে নিয়েছিলো।যখন জানলাম আমার ভাইদের আর আমার কোন জাদুকরের নিষিদ্ধ জাদুর ফলে জন্ম ,তখন আমার দুনিয়া টলে উঠেছিলো।
সবচেয়ে বড় কষ্ট আর আঘাত পাই যখন এটা জানি জাদুকরের একমাত্র শর্তই ছিলো মেয়ে বাচ্চা হলে তাকে বুকের দুধ পানের আগেই জাদুকরের হাতে সপে দিতে হবে।

তারপরের দুইটা পাতা খালি।তারপর থেকে হাতের লেখার বদল।জিয়ানা বার কয়েক পরখ করলো।দুইটা লেখার অনেক ভিন্নতা।একটা মেয়ের লেখা বুঝাই যাচ্ছে আর একটা বেশ ছড়ানো লেখা। পুরুষদের লেখা যেমন হয়।
জিয়ানা পরবর্তী পাতা গুলা দেখলো বাকি লেখাটা ভিন্ন।এবং পাতার ডিজাইনটাও আগেরটার মতো না।আর একটু কাছে আনে ডায়েরিটা। এবং আলাদা আঠা দিয়ে সুক্ষ্মভাবে ডায়েরির পাতা জোড়া লাগানো হয়েছে। বাকিটা পড়বে কিনা জিয়ানা দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে গেলো।
ফ্লোর থেকে উঠে আবার ঘাটা শুরু করলো সম্পুর্ন কক্ষটা।তারপর মনে পড়লো পাশের রুমের টেবিলের উপর কিছু এলোমেলো খাতাপত্র আর নকশার কথা। কালক্ষেপণ না করে আবার বের হয়ে সেই রুমে ঢুকে টেবিল ঘাটা শুরু করলো। বেশ কোনার দিকে একটা ছোট্ট প্যাড খাতা পেলো।সেটা খুলেই জিয়ানা বুঝতে পারলো বাকি ডায়েরিটার লেখাটা নিবিড়ের।কিন্তু নীলুফা ইয়াসমিনের ডায়েরিতে পাতা ছিড়ে নিবিড় লিখবে কেন? আর লিখবেই বা কি? তাই আবার যায় সেই লাইব্রেরি রুমে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

নিবিড় সেপিওসেক্সুয়াল। মানে হচ্ছে প্রচন্ড বুদ্ধিমত্তা মানুষের প্রেমে পড়া এবং একমাত্র তার বুদ্ধিমত্তার জন্যই কামবোধ করা।ঠিক যেমন স্বাভাবিক মানুষ আকর্ষণ উদ্দিপনা অনুভব করে সৌন্দর্যের প্রতি।তেমন সেপিওসেক্সুয়ালরা বুদ্ধিমত্তা সম্পুর্ন মানুষের প্রতি আকর্ষিত হয়।তাদের কাছে রুপ লাবণ্য উজ্জ্য।
যেহেতু সে মানুষের সকল গুনে গুনানিত তাই শারীরিক চাহিদা আবশ্যক।নারী শরীর তার কাছে ঘৃণ্য ছিলো ছোট থেকেই।কোন এক দূর্ঘনায় তার ধারণা বিকৃত হয়েছে কিংবা ভুল কিছু সে আকড়ে আছে।প্রায় ত্রিশ হতে চললো নিবিড়ের বয়স।নারীদের বেশভূষা আর রং ঢংয়েই তার মাথায় আগুন জ্বলে যেতো।ন্যাকামি নাখরা দেখলে মনে হতো থা*প্পড় দিয়ে মে*রে ফেলতে।যদি কেউ সামনে এসে নিজের শরীর দেখিয়ে তাকে ভ্রষ্ট করতে চাইতো তবে তার সেদিন খবর হয়ে যেতো।একবার এক উকিলের স্ত্রী এসেছিলো নিবিড়ের কাছে।বয়স খুব বেশি ছিলো না।লাস্যময়ী এই নারী নিবিড়কে দেখেই মুখ থুবড়ে পড়েছিলো।মামুন ইসলামের পিএ আশরাফের মাধ্যমে সে নিবিড়ের ক্লাবে আসে। সেদিন নিবিড় তার বেল্ট দিয়ে সেই মহিলার পিটের ছাল উঠিয়ে জ্বালা মিটিয়ে দিয়েছিলো জনমের তরি।মাঝখানে একবার শুনেছিলো উকিলের সাথে ডিভোর্স হয়ে গেছে।
আজ আবার জিয়ানার পেনড্রাইভে সেই মহিলার একটা ভিডিও এলো সামনে। যেই ফোল্ডারের নাম “সুখনীল দ্যা ছুপা রুস্তম ”

সেই মহিলার সাথে আশরাফের গোপন সম্পর্ক আছে। একটা ক্লাবের বারে অতি ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে তারা ড্রিংক্স করছে। নেক্সট ভিডিওতে ,আশরাফ প্রচন্ড ড্রাংক হয়ে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে আছে। উকিলের এক্স ওয়াইফ পাশে এক সাইট হয়ে শুয়ে একহাত মাথার নিচে দিয়ে রেখে জিজ্ঞেস করলো ,
-আশরাফ তোমার এই বুড়া নামটা আমার ডাকতে ইচ্ছে হয় না একদম।তোমার মতো তাগড়া ঘোড়ার এমন ওল্ড স্কুল নেইম হোয়াই ডার্লিং?
-ওহ সোনা। ইউ ক্যান কল মি আর্থার। দোজ বুলশিট নেইম ইজ কমপ্লিট ফেইক।
বলে রমনীকে কাছে টেনে নিলো। নিবিড় স্কিপ করলো বাকিটুকু।
সে জানে এখানে কি হবে এখন।ভিডিওটা সিলেক্ট করে সেন্ড করলো আকাশের কাছে। মেসেজ দিলো “এইটুকুও এড করে রাখ।ঠিক বারোটা আর টপাটপ সব আপলোড”

নিবিড় জানে আশরাফ আসলে আশরাফ না।ক্যানিবাল গ্রুপ লিডার সে।একই সাথে সে থেইষ্টিক স্যাটানিজমদেরও বিভিন্নভাবে সাহায্য করে। আশরাফের চেহারা আকার সব কিছুই আট দশটা বাঙ্গালীর মতোই।সে বংশীয়ভাবে অর্জিনালী বাঙ্গালী। তার মা ছিলো আফ্রিকান। ভিসা ছাড়া ইউরোপে গিয়ে জেল খাটে বহুবছর।এবং সেই জেলেই তার অন্য থেইষ্টিক স্যাটানিজমদের সাথে পরিচয় হয়।তাদের মাধ্যমেই প্রথমে অপরাধ জগতে ঢুকে। আস্তে আস্তে নিজেই একজন শয়তানে পরিনত হয়।
অর্জিনাল নাম আর্থার ডয়েল। বয়স ষাটের ঘরে।অথচ দেখে মনে হয় সর্বোচ্চ হলে চল্লিশ হবে।নিবিড় তাকে ধরতে পেরেছিলো অনেক আগেই কিন্তু প্রমাণের জন্য অপেক্ষায় ছিলো এতদিন।

নিবিড়ের তাকে কখনোই সন্দেহ হয়নি।একপ্রকার কেচো খুড়তে গিয়ে সাপ বের হয়েছে।মামুন ইসলামের কিছু নকল পেপার আশরাফের কাছে আছে ভেবে গোপনে তার বাসায় তল্লাশি করেছিলো নিবিড়।সেখানে একটুকরো কাগজ পেয়েছিলো যেটার মতো একই লেখা নিবিড়ের কাছেও ছিলো। স্যাটানিক বাইবেলের অংশ।সাধারণ কোন মানুষের কাছে এই জিনিস ঝালমুড়ির ঠোংগা হয়ে নিশ্চিত আসবে না? সেই সন্দেহ থেকেই আশরাফের বিভিন্ন কার্যকলাপে নজর রাখে নিবিড়। এবং তার সন্দেহ সত্যি হয়।কিন্তু শয়তান পূজারীর ব্যাপারটা তার এখনো তেমন প্রমাণ মেলেনি।নিবিড় প্রমাণ পেয়েছে সিরিয়াল কিলার হিসেবে। আফ্রিকার সাউথ সুদানের এক আলোচিত সিলিয়ার কিলার আর্থার ডয়েলই হচ্ছে মোঃ আশরাফ।
অপরজন সংসদ সদস্য রেজাউল সরকার। তার ড্রাগসের ব্যাবসার সকল অর্জিনাল নথিপত্র নিবিড় উদ্ধার করেছে।সম্ভব হয়েছে একজন শত্রুরুপী বন্ধুর জন্যই।যাকে একসময় নিজের ভাইয়ের চেয়ে কম কিছু মনে করতো না। বদিরুজ্জামান বদি। সমুদ্রের পাল্লায় পড়ে যে বিগড়ে গিয়েছিলো।ফিরেও আসে কিছুদিন পর। কিন্তু নিবিড়ের একটা কথায় ,

“রং বদল মানুষ আর পাগলা কুকুরের মধ্যে বাদল সৈয়দ স্যার পাগলা কুকুরকে বেঁছে নেয়াকে সঠিক মনে করেন। কারণ জলাতঙ্কের চিকিৎসা আছে কিন্তু রঙ্গাতঙ্কের নেই ”
বদি সেদিন নিবিড়ের পা জড়িয়ে ধরে আকুল হয়ে কেদেছিলো।সে যা করেছে মন থেকে করেনি।বোনের সংসার বাঁচানোর জন্যই করেছে সব।নিবিড় সেদিন গলেনি।সকলের সামনে অপমান করে তাড়িয়ে দিলেও রাতে ফোন করে বদিকে।
এবং একটা কথায় বলে,

-বদি আসল শুভাকাঙ্ক্ষী কে আমি চিনি এবং জানি।তুই আদালতে দাঁড়িয়ে একবারের জন্যও আমার চোখের দিকে তাকাসনি।সাক্ষি দেয়ার সময় তোর গলার কম্পনেই আমি নিবিড় তোকে ক্ষমা করে দিয়েছি।আমার জীবনে আফসোস বলতে কিছু নেই। তাই আসল শুভাকাঙ্ক্ষীদের অন্যদের মতো আমি কখনোই ভুল বুঝি না।
হাউমাউ করে কেদে উঠে বদি।সে নিজেও অনুতপ্ত।নিবিড় কি করেনি তাদের জন্য।বদি আর সজীবের পরিবার নিবিড়ই চালাতো একপ্রকার।সবাই কম বেশি ফ্রিল্যান্সিং শিখলেও ওইসব বদির মাথায় ঢুকতো না। তাই ফুলটাইপ রাজনীতি করতো সে।কাপা গলায় প্রশ্ন করে ,
-ভাই তাহলে আমাকে মাফ করছেন?
-তোর উপর রাগ করলে না মাফ করবো। তবে তুই আর ক্লাবে আসবি না।কাল হুইপের কাছে গিয়ে কাজ চাইবি।বাকি আমি ধাপে ধাপে তোকে বলবো।”
তখন থেকেই বদি রেজাউলের হয়ে কাজ করলেও নিবিড়ের অনুচর ছিলো।জিয়ানাকে নিয়ে সেদিনের সব কথা বদি নিবিড়কে বলার পর নিবিড় সহ্য করতে পারেনি।তাই যা প্রমাণ ছিলো সেগুলা এক জায়গায় করে এখন এক্সপোজ করার পালা শুধু।

“যে বাতাসে বড় গাছ উপরে ফেলে ,সেই বাতাসেই ঘাসেরা দোলে।বড় হওয়ার দম্ভ কখনো করো না।- জালালুদ্দিন রুমি”
কিন্তু কিছু মানুষের দম্ভ থাকে সবসময় আকাশছোঁয়া। তাদের অহংকারের জিহবায় বলি হয় হাজারো নিরিহ আত্মা। মোজাম্মেল ইসলামের মা নূরজাহান খাতুন ছিলেন অত্যন্ত দাম্ভিক মহিলা।উনার পৈতৃক সম্পত্তির জন্য গ্রাম্য গরীব মোজাম্মেল ইসলামের পিতার আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়। এরোগেন্ট এই মহিলার অত্যন্ত দুর্নাম ছিলো এলাকায়।বয়স হলেও বিয়ে দিতে না পারায় ,শেষমেষ গ্রাম থেকে গরীব শিক্ষিত মোজাম্মেল ইসলামের বাবাকে ধরে এনে বিয়ে দেয় নূরজাহান খাতুনকে।সেই সাথে লাভ করেন অঢেল সহায় সম্পত্তি।নূরজাহান এরোগেন্ট হলেও ছিলেন স্বামী ভক্ত। কিন্তু তারা আশেপাশের নারীদের জীবন নরক বানিয়ে দিতো ।

নূরজাহানের কথায় ছিলো নূর ম্যানসনের শেষ কথা।সংবিধান পরিবর্তন হতে পারে কিন্তু এই মহিলার কথা নড়চড় হতো না।নিজের পুত্রদের বিয়ে করান নিজ পছন্দের।এবং বউদের বাছাই করেছেন একপ্রকার ছোট মাছ কেনার মতো টিপে টিপে।হাটিয়ে নাড়িচাড়িয়ে।ভালোঘরের মেয়েদের জায়গা দেন নিজ গৃহে। মোজাম্মেল বড় পুত্র ছিলো।তাকে বিয়ে করান উম্মে কুলসুম মানে নিবিড়ের দাদির সাথে।একেবারেই বাচ্চা মেয়ে ঘরে তুলেন। নাবালিকা ছিলেন বিয়ের কালেও।
বিয়ের পর একবছর ঘুরতেই উনি কুলসুমের জীবন ন্যাড়াপোড়া বানিয়ে ফেলেন। কারণ এখনো বাচ্চা হলো না কেনো। এইভাবে দুই বছর যায়।এবং তিনবছর পর উনি ঘোষণা দেন মোজাম্মেলকে আবার বিয়ে করাবেন। এই বউ বন্ধা।

তখনকার সমাজে মেয়েদের এক এবং একমাত্র পরিচয় ছিলো স্বামী আর যোগ্যতা ছিলো কে কয়টা বাচ্চা জন্মদানে সক্ষম। কুলসুমের সংসার ভাঙার দারপ্রান্তে যখন তখন নূর ম্যানসনের দোরগোড়ায় এলো এক লম্বা আলখাল্লা পড়া কবিরাজ।সাহায্য চাওয়ার নাম করে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে কুলসুমকে দেখেই বলে ,
-নিসন্তান হয়ে আর কয়দিন ঘুরবি।আমার আস্তানায় আয় তোর মনোবাসনা পুরনো হবে।
দিশাহারা কুলসুম যেনো দিশা পেলো। তাই শ্বাশুড়িকে নিয়েই গেলো উক্ত কবিরাজের আখড়াই। সেদিন কবিরাজ কিছু তাবিজ কবজ আর কিছু খাওয়ার ওষুধ দেয়। কোনপ্রকার হাদিয়া নিতে অপারগতা জানায় এবং একমাত্র শর্ত দেয়।প্রথম বাচ্চা যেটাই হোক সেটা কুলসুমের কিন্তু পরবর্তীতে মেয়ে বাচ্চা হলেই কবিরাজকে দিয়ে দিতে হবে বুকের দুধ খাওয়ানোর আগেই।কবিরাজের শর্ত একবাক্যে রাজি হয় নূরজাহান খাতুন। উনার মেয়ে বাচ্চা এমনিতেই পছন্দ না। বংশের প্রদ্বীপ থাকলেই হলো।

নারী যে নারীর সবচেয়ে বড় শত্রু এরচেয়ে আর বড় উদাহরণ কি হতে পারে?
কয়েকমাস পর কুলসুম সত্যি সত্যি বাচ্চা গর্ভে ধারণ করলো।এবং একটা খবরেই শ্বশুরঘরে কুলসুমের কদর বেড়ে গেলো কয়েকগুন।নূরজাহানের পর কুলসুমের স্থান চলে এলো আপনা আপনি।
প্রথম সন্তান ছেলে বাচ্চা হলো। নাম রাখা হল মাজাহার ইসলাম।প্রথম বাচ্চা হওয়ার পরের বছর মামুন ইসলামের জন্ম হয়।তারপর পর পর দুইটা মৃত্য বাচ্চা জন্ম দেয় কুলসুম।দুই সন্তান নিয়েই সবাই সন্তুষ্ট ছিলো।সত্যি বলতে কুলসুম মনে মনে ভয়ে থাকতো যদি মেয়ে বাচ্চা হয়ে যায়।পর পর সব ছেলে বাচ্চাই জন্ম দিয়েছে সে।যদিও মৃত্য বাচ্চা জন্ম দেয়াই প্রতিনিয়ত শ্বাশুড়ির কথায় ঝর্ঝরিত হতো।

কিন্তু ভাগ্যে ছিলোই অন্যকিছু।মোজাম্মেল ইসলাম একটা মেয়ের জন্য তরপাতো খুব।ভাইয়ের মেয়েদের নিজের অন্তপ্রাণ ভাবতো।মামুন ইসলামের পর তিনটা বাচ্চা মৃত্যই জন্ম দেয়।সব ছিলো ছেলে সন্তান।বাচ্চা আর হবে না ভেবে কুলসুম যখন থিতু হয়েছিলো ,পনেরো বছর পর আবার সে গর্ভবতী হয়।এইবার পরিপক্ক কুলসুমের ভয় বাড়ে।আবার এটাও ভাবে কত বছর পাড় হয়ে গেছে ওইসব শর্ত ফর্ত আর কি।কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে ডেলিভারির আগে বাসায় এসে হাজির হয় সেই কবিরাজ।এবং কুলসুমকে বলে

-আমার জিনিস চলে এসেছে। তাকে নিতে এসেছি।
ভয়ে কুলসুমের শরীর কুলকুল করে ঘামা শুরু করে।সেটা আরও বেড়ে যায় তখন ,যখন মোজাম্মেল পেছন থেকে কবিরাজের কথা শুনে ফেলে।এমন কি অতি খুশী হয়ে কবিরাজকে বকশিসও দেয় সেদিন। কবিরাজ বাসা থেকে বের হয়ে গেলে কুলসুম সেই স্থানে গিয়ে দেখে বকশিসের টাকা ফেলে গেছে।
জন্ম হয় নীলুফা ইয়াসমিনের।অবশেষে মোজাম্মেলের জীবিত মেয়ে বাচ্চা হয়েছে। সেই খুশীতে পুরা এলাকায় দুইটা গরু জবাই করে খাইয়ে দেয় পরেরদিন।মেয়েকে নিয়ে মোজাম্মেলের আহলাদ দেখে কুলসুম নিজের শর্ত ভঙ্গ করবে সিদ্ধান্ত নেয়।

কীভাবে যেনো কবিরাজ জেনেও যায় মেয়ে বাচ্চার জন্ম হয়েছে।পরেরদিনই সে এসে হাজির হয়। কুলসুম ভয়ে নূরজাহানের দ্বারস্থ হয়।এবং নূরজাহান নির্দয়ের মতো বলে কবিরাজের শর্ত মানতে।এরা যেমন ভালো করতে পারে তেমনি খারাপও করে।তাই এদের সাথে শত্রুতার দরকার নাই।কুলসুমের কোল থেকে ছিনিয়ে নেয় সদ্য জন্মনেয়া বাচ্চাটাকে।
যতই শর্ত হোক বা বাস্তবতা হোক।কিংবা দশম বাচ্চাই হোক কোন মায়ের কাছে সেই বাচ্চা ফেলনা না।যার নাড়ী ছেড়া ধন সে জানে কেমন মহব্বত নিয়ে আসে একটা বাচ্চা।শ্বাশুড়ির পা ধরে আকুতি মিনতি করেও যখন কোন সুরহা পাচ্ছিলো না। তখন বাধ্য হয়ে মোজাম্মেলকে সবটা খুলে বলে।মোজাম্মেলের তখন উঠতি জনপ্রিয়তা। সমাজে একটা অন্যরকম প্রতাপ গড়ে উঠেছিল। রাজনৈতিক ক্ষমতাও আসি আসি ভাব।তাই তার ইগোতে লাগে। সামান্য একটা কবিরাজ তার কন্যাকে নিতে এসেছে।ক্ষমতার বলে সেই কবিরাজকে উত্তম মাধ্যম দিয়ে রক্তাক্ত করে বের করে দেয় নূর ম্যানসন থেকে।

কবিরাজ নূর ম্যানসনের মূল ফটকে দাঁড়িয়ে উচ্চ আওয়াজে অভিশাপ দেয়” এই বাড়ির ,এই ছাদের নিচে একদিন রক্তের বন্যা বয়বে।বংশ নির্বংশ হবে। ”
কেউ কবিরাজের কথা আমলে না নিলেও নূর জাহান খাতুনের ঘুম উড়ে গেলো।বয়স বিশ বাইস না হতেই নাতীদের বিয়ে করালেন।উনার চাই বংশধর।কোন ভাবেই বংশ নির্বংশ হওয়া যাবে না।আর নীলুফাকে বাকা চোখে তো দেখতেনই।
অন্য সকল নাতী নাতনী যেখানে ছিলো প্রাণভোমরা ,যেখানে নীলুফা ছিলো ভোমরার বিষ।ছোট্ট নিলুফা এই বৈষম্য টের পেতো ছোট থেকেই। তাই কেঁদে কেঁদে নিজ পিতার কাছে অভিযোগের ঝুড়ি নিয়ে বসতো।মোজাম্মেল নিজেও বুঝতো নিজ মায়ের একচোখামু।তাই মেয়েকে অন্য সবার থেকে বেশি সময় দিতেন। সকল বায়না নিজে মিটাতো।সিংহ পুরুষ মোজাম্মেল মেয়ের কাছে এসে হয়ে যেতো আদর্শ পিতা।
হিউম্যান সাইকোলজির মতে “যে সন্তান তার পিতার সহীত যত সময় ব্যায় করে, দেখা গেছে তারা অন্যদের তুলনায় প্রচুর বুদ্ধিমান হয়।”

নীলুফাও হয়েছিলো বুদ্ধিমতি।শুধু বুদ্ধি না অত্যন্ত বিনয়ী আর দয়ালু।মানুষের জন্য তার মন খুব টানতো।বিশেষ করে বাসায় যারা হেল্পিং হ্যান্ড ছিলো। দারোয়ান ,কিংবা এলাকার গরীব দুঃখী তাদের জন্য নীলুফা ছিলো লটারি।কেউ কখনোই নূর ম্যানসনে এসে খালি হাতে ফিরতো না।নীলুফা ফেরাতো না।নূর ম্যানসনের সকল বাচ্চাদের জন্য ঈদ কিংবা বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানে জোড়ায় জোড়ায় জামা এলেও নীলুফা সেগুলা নিতো না।সে তার পিতাকে আগেই জানিয়ে রাখতো তার জামার বদলে গার্ডের মেয়ের জন্য একটা লাল ফর্ক লাগবে, বুয়ার সারা জীবনের স্বপ্ন স্বর্ণের দুল পড়া ,কিংবা স্কুল থেকে আসার সময় যে প্রতিবন্ধী ভিক্ষুককে দেখেছে তার জন্য একটা নতুন জামা কেনা।
এসব নানা বাহনার ফর্দ সে তার পিতাকে দিতো।মোজাম্মেল হেসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতো।সাথে সকল চাহিদা পুরনো করার পরেও নীলুফার জন্য বিশেষ জামা আনতো।
অনেকেই ভালোবাসলেও আবার অনেকেই ব্যবহারও করতো সহজ সরল নীলুফাকে।একবার এক নতুন বুয়া কিছুদিন কাজ করেই নীলুফাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে তার মায়ের গহনা কোথায় রাখে জেনে নেই।
কিছুদিন পর যখন কুলসুমের বালা খুজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। তখন নীলুফা সবার সামনে পুতুল খেলতে খেলতে বলে “হাফিজা খালা নিয়েছে।”

নতুন বুয়ার নাম হাফিজা ছিলো।সে তো মোজাম্মেলের পায়ে পড়ে আহাজারিতে শুরু করে অস্বীকার করে। কিন্তু মোজাম্মেল আর কোন ঝামেলা করেনি।আলগোছে সবকিছু ম্যানেজ করে শান্ত করে বলে আমি দেখবো ব্যাপারটা।একা যখন নীলুফা তার কাছে আসে মোজাম্মেল জিজ্ঞেস করে ,
-আম্মা সবার সামনে হাফিজার নাম নেয়া কি ঠিক হয়েছে?সে তো লজ্জা পেয়েছে।
নীলুফা বাপের গলা জড়িয়ে ধরে বলে,

-আব্বা সে আমাকে আম্মার গহনা কোথায় রাখে জিজ্ঞেস করেছে।আর খালাই আম্মার ঘরে আজ সকালে কাজ করেছে অনেক্ষণ।এরপর আর কেউ সেই ঘরে যায় নাই।রাতে আম্মা খুলে রাখছে বালা আর সকালের পরে হারিয়ে গেছে।
মোজাম্মেল বুঝেছে সেদিন ,মেয়ে শুধু দয়াবানও না প্রচুর বুদ্ধিমত্তা সম্পুর্ন। উনি আরও ভালো ভাবে নীলুফার যত্ন নেয়া শুরু করলো।দুই ছেলের ব্যাপারে দায়িত্ব যা পালন করার করলেও। নীলুফার আচার ব্যবহার আর বিনয়ীর জন্য তাকে পড়াশোনা থেকে লজিং মাস্টার নিজেই বাছাই করতেন।
এসব নূরজাহান খাতুনের আরও সহ্য হতো না।আস্তে আস্তে নীলুফা বড় হয়। তার বুদ্ধিমত্তা আর উদারতাও বাড়তে থাকে।স্কুলের টিফিনের খরচ বাচিয়ে বান্ধুবীর বই খাতা কিনে দেয়া।বাসায় ভিক্ষুক এলে রান্নাঘরে নিয়ে যা ইচ্ছা নিয়ে নিতে বলা,রিক্সায় উঠলে বয়স্ক রিক্সাওয়ালা হলে রিক্সার পেছনে ঠেলা দেয়া সহ নানা উদ্ভট কাজও সে করতো।সবই মোজাম্মেলের নজরে পড়তো।

দিন যতই যাক কুলসুমের ভয় কাটতো না।তার মনে হতো ভুল সে প্রথমেই করেছে।বাচ্চা তার এমনিতেই হতো। নাবালকের নিশ্চয়ই বাচ্চা হয় না।বিয়ের তিন বছর পর তার মেন্সট্রুয়েশন সার্কেল শুরু হয়। কবিরাজের ভাওতাবাজির খপ্পরে পড়ে সে তার ভেতরগত শান্তি বিনষ্ট করেছে।এমন কি মেয়ের যেনো কোন ক্ষতি না হয় তাই কুরআনের শিক্ষাটা আরও কড়া করে দেন।সকল প্রকার শরীর বন্ধের দোয়া থেকে শুরু করে যাবতীয় কালো জাদু কিংবা জ্বীনের নজর থেকে হেফাজতের জন্য ছোট বড় সকল দোয়া শিখাতো প্রতিদিন।
মাজাহার আর মামুনের বিয়ে করানো হয় একসাথে।আর বিয়ের পরেই নূরজাহানের কড়া আদেশ বছর ঘুরতেই যেনো সবার পেট ফুলে উঠে।কুলসুম শ্বাশুড়ি হলেও তার মাতব্বরি একেবারেই খাটতো না নূরজাহানের দাপটে।কারণ একটাই ,তখনো সকল সম্পত্তি নিজের নামেই রেখেছিলেন।তিন ছেলের কাউকেই দেন নি।ছেলেরা সম্পত্তির লোভে মায়ের দিকে চোখ তুলে তাকাতো না।

সত্যি সত্যি বছর না ঘুর‍তেই মাজাহারের ঘরে দুই জমজ ছেলের জন্ম হলো। আর মামুনের ঘরে মেহেদী ইসলাম।বৃদ্ধা খুশী হয়ে বড় নাত বউকে পঞ্চাশ ভড়ি আর মেহেদীর মাকে পঁচিশ ভড়ি সোনার গহনা দিলেন।
নূর ম্যানসনের সবাই বুঝতে পারলো যার যত ছেলে তার তত লাভ।এরমাঝে মোজাম্মেলরা তিন ভাই জমিজামা আর সম্পত্তি নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল শুরু করলো। তাদের পিতা গত হয়েছিলো নীলুফা জন্মের আগেই।পিতার নামে কোন সম্পদ ছিলো না বিধায় এখানে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বলতে কোন ব্যাপার ছিলো না।

ছেলেরা মায়ের পছন্দ মতো চললেও নাতীরা হয়ে গেলো এলোমেলো। এরমাঝে মামুন ইসলাম সবচেয়ে বেশি। পরিবার থেকে বিয়ে করানো বউ তার কাছে অতি পানসে ঠেকে।বাচ্চা হওয়ার পর সেই বউয়ের দিকে ফিরেও তাকায় না।মেহেদীর আম্মা মারুফা ছিলো একেবারেই সাদা মাটা ,সহজ সরল আর দেখতেও তেমন সুশ্রী না।জৈবিকতার টানে প্রথমে নতুন বউ হিসেবে মামুন কাছে টানলেও কয়েক মাস পর থেকেই অন্য নারীতে মাতলেন।মোজাম্মেল ইসলাম তখন স্থানীয় চেয়ারম্যান থেকে জাতীয় নির্বাচনের মানোয়ার পান।বাপের ক্ষমতার বলে ছেলেরা যেনো পেয়ে বসে।মাজাহার যা করতো আড়ালে আবডালে হলেও মামুন ইসলাম ছিলো লাগামহীন পাগলা ঘোড়া। তার কোন সামাজিকতার কিংবা পারিবারিক দ্বায় নেই। দিনে স্কুল কলেজের সামনে টিজ করা। রাতে ক্লাব আর নিষিদ্ধ পল্লীতেই পড়ে থাকতো।

আচম্বিতে একদিন চোখে পড়ে এক কিশোরী। বার কয়েকবার তাকে উত্যক্ত করলেও সে মামুন ইসলামকে একে বারেই পাত্তা দিতো না।এটাই ইগোতে লাগে তার।বিয়ে ঠিক হওয়া শাহনাজ স্বপ্নাকে উঠিয়ে আনে।এবং বিয়ে ছাড়াই সকল প্রকার নির্যাতন চালাই আটকিয়ে রেখে। মাসখানেক বন্দী থাকার পর স্বপ্না পালাতে সক্ষম হয় মামুনের ডেরা থেকে।কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে।সারা এলাকায় স্বপ্নার গর্ভবতী হওয়ার খবর ছড়িয়ে যায় অতি দ্রুত।মোজাম্মেলের সম্মানের আঘাত লাগে তাই স্বপ্নাকে আনেন নূর ম্যানসনে।

একের পর এক স্বপ্ন ভাঙা মেয়েটা বিধ্বস্ত যখন তখন এসে পড়ে একান্নবর্তী এক বিশাল পরিবারে। সাথে বাচ্চাসহ সতীন ফ্রী। একমাত্র নীলুফাই সাদরে গ্রহণ করেছিলো স্বপ্নাকে।স্বপ্নার নিজ স্বামীর কক্ষে জায়গা হয়নি।সে নীলুফার সাথেই থাকতো।নীলুফা তখন বারো বছরের কিশোরী। প্রতিদিন স্বপ্নার পেটের বাবুর সাথে কথা বলা,স্বপ্নার খাওয়া দাওয়া থেকে সকল কিছুর দায়িত্ব ছোট্ট মেয়েটা নিজ হাতে করতো।

কিন্তু স্বপ্না নিজের এই পরিনতি কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি।সেও ভালো পরিবারের মেয়ে।এখানে সবার অবহেলা আর বাকা নজরে তাকানো সে একেবারেই মেনে নিতে পারেনি।হতাশায় প্রতিরাতে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করতো তাকে আর তার বাচ্চাসহ উঠিয়ে নিক।তার এই জীবন ভালো লাগে না। মামুন ইসলামের সাথে স্বপ্নার একই বাড়িতে থাকলেও দেখা হতো না।হলেও মুখ ফিরিয়ে রাখতো।সর্বোচ্চ ঘৃণা করতো সে এই লোকটাকে।
কিছুদিন পর জন্ম হলো নিবিড়ের।

আর কিছু নেই। জিয়ানা উল্টেপাল্টে ডায়েরি দেখে।নেই বাকিটা ফাঁকা।
ফ্লোর থেকে উঠে দাঁড়ালো। আবার বুক রেকের দিকে এগিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে থাকে।

“love is always sweet on second time”
ইংরেজী এই প্রবাদটা জেনির জন্য ওতপ্রোতভাবে সত্যি।তার দিন রাত একটা নেশায় কেটে যাচ্ছে যেনো।মক্কুর দুষ্টু মিষ্টি অত্যাচার ,সংসারের টুকটাক কাজকর্ম আর নাম মাত্র লেখাপড়ায় দুইটাদিন যেনো স্বপ্নের মতো কেটেছে।
মক্কু আজ ফিরবে না।জেনি রাতের খাওয়ার সময় হঠাৎ করে জিয়ানার কথা মনে পড়ে।কাল দুইবার ফোন দিয়েছিলো রিসিভ হয়নি।ব্যাক যে করবে না জেনি জানে।তবুও মনটা খচখচ করছিলো।তাই তামান্নাকে ফোন দিয়ে জিয়ানার কথা জিজ্ঞেস করে। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে তামান্না ভেবেছে জিয়ানা জেনির সাথে।অর্ধেক খেয়ে জিয়াউলের কাছে ফোন দিয়ে জানে সেখানেও যায়নি।মানে দুইদিন দুইরাত থেকে কেউ জানে না জিয়ানা কোথায়?
নিবিড়ের ফোন নাম্বার জেনির কাছে নেই।মক্কুকে ফোন দিয়ে নিবিড়কে চায়।মক্কু ব্যাস্ত আছে বললে উল্টো রাগ দেখিয়ে বলেছে

-এক্ষুনি দিবেন মানে এক্ষুনি।
তাই বাধ্য হয়ে মক্কু নিবিড়ের কাছে গিয়ে ফোন বাড়িয়ে দেয়।নিবিড় ফোন কানে নিয়ে বলে ,
-হুম?
-জিয়ু কোথায়?
কাটকাট গলায় জেনি জিজ্ঞেস করে নিবিড়কে।
-আমার কাছে।
-কেনো আপনার কাছে কেনো? ওয়েট আপনি ওকে মেরে টেরে ফেলেননি তো? দুইদিন একরাত থেকে নিখোঁজ জিয়ু।সত্যি বলুন কি করেছনে?
-বউয়ের সাথে সবাই যা করে।
পাশ থেকে মক্কু কাশা শুরু করলো। জেনি একটু থতমত খেলেও,পুনরায় গলায় তেজ এনে বলে,
-আপনাদের তেমন সম্পর্ক না।হুটহাট করে নিশ্চয় সব স্বাভাবিক হয়ে যায় না? একমাস হয় বিয়ে হয়েছে আপনি ওকে কখনো ফোন দিয়েছেন? নাকি খোঁজ নিয়েছেন কি করছে? কেমন আছে?কিভাবে চলছে? এখন মনে হলো আর ক্ষমতার জোরে তুলে নিয়ে গেলেন এটা তো হতে পারে না?

-তাহলে কি হতে পারে?
-দেখুন হেয়ালি করবেন না। জিয়ুকে যেখানেই রেখেছেন আমাকে দেখান। আপনার কোন ভরসা নেই। আপনি লোকসমাগমের মাঝেই আমার বোনকে থা*প্পড় দিতে পারেন যেহেতু ,সেহেতু নিরিবিলি খু*নও করতে পারবেন।কোথায় আছে জিয়ু বলেন আমিই যাবো।
-আমার পেটে। কেটে খেয়ে ফেলেছি।বাকিটা ফ্রিজে আছে।
বলে কট করে কেটে ফোন মক্কুর দিকে ঢিল ছুড়ে। ফোন আবার বাজে। মক্কু নিবিড়ের দিকে তাকায়। নিবিড় বলে,
-লাউড দিয়ে রিসিভ কর।
-হ্যাঁ জেনি বলো।
-হ্যাঁ হ্যাঁ করছেন আপনি এখনো? জিয়ুকে না জানি কি করেছে।দেন ফোন দেন উনার কাছে। আপনি তার চ্যালা হতে পারেন, আমি না।
জেনি যে কাঁদছে জিয়ানার চিন্তায় সেটা ভারি কন্ঠেই বুঝা যাচ্ছে। মক্কু শান্তনা দিয়ে বলে,

-আহা জেনি কাঁদার কি হলো।ভাই মজা করেছে।জিয়ানা ভালো আছে।ভাইয়ের ফ্ল্যাটে।
-এখনো আপনি ওইলোকের হয়ে সাফাই গাইছেন?ভালো না খারাপ আছে আমি নিজ চোখে দেখতে চাই।ফোনেও পাচ্ছি না।আগেই বলেছিলাম ডিভোর্স নে।এইভাবে এমন ঝুলন্ত সম্পর্ক কারো আগায় না।সে নিজেও এত সিয়ানা।আমার কথাটা কানেই নেয়নি।যতই চিল আর বিন্দাস দেখাক ওর যে আগে পিছ কেউ নেই এই কষ্টে ভেতর ভেতর পুড়ে এটা আমি খুব ভালো করেই জানি। জানেন মুসাদ্দেক ওর মাঝে যে একটা নরম নারীস্বত্বা আছে যেটা খুবই কোমল আর আদুরে।অথচ ওর ভাগ্যটা কেমন দেখুন লাইফে এমন কাউকে পেলো না যে ওকে একটু বুঝবে কিংবা একটু যত্ন করবে।আব্বু যখন থেকে একেবারেই নিজেকে গুটিয়ে নিলো জিয়ানার মোটামুটি এই পৃথিবী থেকে আস্থা আর ভরসার কাধ সেদিন থেকেই শেষ। তবুও কোন অভিযোগ নেই।দিব্বি চলছে।নিজের টিউশনি মিমকে দিয়ে টানা দুইমাস যে কিভাবে চলেছে আমি আপনাকে বুঝাতে পারবো না।বাসা থেকেও দেয়ার মতো অবস্থা ছিলো না।তামান্নাও ছিলো না সাথে।নয়দিন শুধু একবেলা খেয়ে চলেছে।সেটাও শুকনা খাবার।আমি বাসা থেকে এসে দেখি তার শরীরের যে কি অবস্থা। ওভারসাইজ ড্রেসের জন্য বুঝা যায় না।এই মেয়েটার বিয়ে হলো এমন একজনের সাথে দেখুন যে পারে শুধু জোরজবরদস্তি। তবুও কোন অভিযোগ করে না জিয়ু্র। সবসময় বলবে ভাগ্য যা দেয় আমি দুইহাতে আকড়ে ধরি না ঠিকই তবে কেউ ধরলে আমি ছাড়ি না।

একটানে বলে কান্নায় ভেঙে পড়লো জেনি।
মক্কু কি বলবে সে স্তব্ধ। সে জানে নিবিড় জিয়ানার সব খেয়াল রাখে।এখন দেখছে শুধু গার্ড লাগিয়ে রেখেছে ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়নি।দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।তার বউটা কষ্ট পাচ্ছে কিন্তু সে কিছুই করতে পারছে না।অপরদিকে নিবিড় মনোযোগ দিয়ে জেনির কথা শুনলো।তারপর ফোন নিয়ে বলে,
-তোমার বোন আমার টাকা নেয় না জেনি।তার প্রাইভেট নেই আমি জানতাম।তার একাউন্টে টাকা দিয়েছি বলে রাস্তায় আমার সাথে যাতা ব্যবহার করেছে।এখন তোমার বোনকে ধরে বসে থাকা নিশ্চয়ই আমার কাজ না?নাকি প্রতিবেলায় তাকে বাবুসোনা বলে মুখে তুলে খাওয়াতে হবে?
-হ্যাঁ তাই করবেন।জেদ ধরে বিয়ে করতে পেরেছেন বাবুসোনা বলে খাওয়াতে পারবেন না? আমার বোনের ওয়েট যদি এককেজি কবে তবে আপনার ডানডাতের ডানহাত ভেঙে দিবো বলে দিলাম।
বলে খট করে ফোন কেটে দিলো জেনি।
মক্কু হা হয়ে গেছে জেনির কথা শুনে।সবশেষে ঝড় গতিপথ বদলে তার দিকেই আসে কেন? নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে বলে,

-ভাই আমার ঘরেও আগুন জ্বালায় দিলেন? বউদের একটু তোষামোদ করতেই হয়।জিয়ানার ওয়েট টা খেয়াল রাইখেন।
বলে আস্তে করে বের হয়ে গেলো মক্কু।
জিয়ানার স্বাস্থ খারাপ হয়েছে নিবিড় বুঝতে পেরেছিলো ফ্ল্যাটে আজ কোলে নেয়ার সময়।আগের বার হাসপাতালে নেয়ার সময় ওয়েট ঠিকঠাক ছিলো এইবার একেবারেই পাতলা লেগেছে।এমন জেদি বউ এক্ষান পেয়েছে যা জেদ করবে সেটাই করবে।নাহ জেনির কথাটা গুরুত্ব দিতে হবে।আজ এটাও বুঝেছে শরীরও স্ট্যাবেল না জিয়ানার।সেন্সলেস হওয়ার সময় মুখচোখ সাদা হয়ে গিয়েছিলো।একবার শুধু পানি খাবো বলতে পেরেছিলো।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪০

নিবিড়ের চিন্তা বাড়ে। ছটফট লাগে।কে বলেছিলো এই মেয়েকে সাভার আসতে। নিবিড় দিব্বি ছিলো রাজনীতি নিয়ে। এখন মাথায় সারাক্ষণ জিয়ানা ঘুরে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।নাহ অন্তত ফোনটা দেয়া উচিত ছিলো।খেয়েছে কিনা জানা যেতো।ডেস্কটপের স্কিনে নিজের উদগ্রীব চেহারা দেখে নিবিড় হাঁসে ,নিজের অবনতি রুপি উন্নতি দেখে।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪২