নীতিহীন রাজ পর্ব ৪৬
আশিকা আক্তার সোহাগী
“বিখ্যাত চিত্রশিল্পী রেনোয়ার বলেছেন,দুনিয়াতে অনেক অসুখ ,আমি কি আর একটু অসুখ তৈরি করে যাবো?”
মানুষ দুঃখ শুধু তৈরি করতেই না ,নিজের দুঃখটাও সবার মাঝে ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে দিতেও পছন্দ করে। অনেকেই বলে দুঃখ ভাগাভাগি করলে সেটার ধার কমে কিন্তু আসলে ব্যাপারটা সবক্ষেত্রেই সত্য না।যার সাথে ভাগ করা হয় সাময়িক সময়ের জন্য সে নিজেও দুঃখের সাগরে সাতার কাটে।তাই দুঃখ ভাগ করার আগে দশবার ভাবা উচিত। কারণ সবার হিলিং সিস্টেম একরকম কাজ করে না।কারো দ্রুত আবার কারো ধীরে কাজ করে।
জিয়ানার দ্রুত কাজ করে কিন্তু জেনির ধীর।জিয়ানা চাকাচাক করে নিজেকে একটা শক্ত খোলশে আবৃত করে সটান হয়ে দিব্যি ঘুরেফিরে। শোকের ছায়া তার মাঝে পড়ে না।আপাতত তার বন্দীদশার সমাপ্তি হয়েছে।সে মুক্ত বিহঙ্গ। তাই এলাকাটা একটা চক্কর দিচ্ছে।ভেতর ভেতর সুপ্ত কিসের যেনো টানাপোড়ন চলছে।হঠাৎ ভালনারেবল ফিল হচ্ছে।মাত্র কয়েকঘন্টা নিবিড়ের সঙ্গ জিয়ানাকে কেমন ডিপেন্ডেবল বানিয়ে দিয়েছে।দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে একটা। মাথা ঠান্ডা রেখে আবার ভেবে চলল কিছুক্ষণ আগের ঘটনা,
দরজায় শব্দ হলে নিবিড় উঠে ড্রয়িংরুমে যায়।মক্কুকে ইশারা করে লকরুমে ঢুকতে বলে। আর জিয়ানাকে বলে দরজা খুলতে কিন্তু তারা যেনো ভেতরে প্রবেশ না করে। নিবিড় ফ্রেশ হয়ে বের হচ্ছে।জেনি ঘুমে ঘুমে এদের ইশারা ইংগিতের কনভেনশন দেখে চলেছে।
জিয়ানা দরজা খুলার সাথে সাথে চারপাঁচজন খাকি পোশাকধারী আইনের লোক দেখতে পায়। একজন এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে ,
-সুখনীল নিবিড়ের ফ্ল্যাট না এটা? উনাকে ডাকুন।
জিয়ানার মনে হলো এর নাকে অনায়াসে তিনটা ছিদ্র হতো।দুইটা ছিদ্র কম হয়ে গেছে।এখনো অনেক জায়গা খালি পড়ে আছে।এই এক অদ্ভুত গুন তার ,খোমার ভুল দ্রুত চোখে পড়ে।যেমন আয়নার সামনে দাঁড়ালেই তার নিজের নাকের ক্রুটি সবার আগে চোখে পরবে।এইজন্য আয়নাই দেখে না।নাক থেকে চোখ সরিয়ে লোমটার সম্পুর্ণ চেহারার দিকে তাকিয়ে বলে,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
-জ্বি উনারই ফ্ল্যাট।কিন্তু আপনারা এখানে কেনো?
-উনার নামে এরেষ্ট ওয়ারেন্টি আছে।আমাদের সাথে থানায় যেতে হবে।
-দেখান ওয়ারেন্ট!
-আপনি কে?
-উনার স্ত্রী।
পুলিশটা জিয়ানাকে উপর নিচ দেখে বলে,
-স্ত্রী বলে তো একেবারেই মনে হচ্ছে না।
-আপনাকেও দেখে পুলিশ মনে হচ্ছে না।
লোকটা গলা ঝেড়ে বলে ,
-উনাকে ডাকুন।একমিনিট সময়।
-আসার আগে ফোন দিতেন। উনি রেডি হয়ে বসে থাকতো। তাহলে আপনাদের কষ্ট করে উপরে উঠতেও হতো না।এক মিনিটেই পেয়ে যেতেন।
-পুলিশের লগে মশকরা?
-পুলিশ হচ্ছে জনগণের বন্ধু। বন্ধুর সাথে মশকরা করবো নাতো কি তার বাপের সাথে করবো?ওসি হাবিবকে ফোন দেন। ওয়ারেন্ট ছাড়া সুখনীল নিবিড় কোথাও যাচ্ছে না।
-উনাকে স্যাক করা হয়েছে।নতুন স্যার আজকে জয়েন করবে।
জিয়ানা অবাক হলেও জিজ্ঞেস করলো ,
-একবছরও হয়নি উনি এই থানায় এসেছেন।উনার রেকর্ড থেকে সব ভালো তাহলে স্যাক করা হয়েছে কেনো?
-সেসব আপনার জেনে কাজ নেই। আপনি আপনার হাজবেন্ডকে ডাকুন।নাহলে আমরাই ভেতরে ঢুকবো।পালাতে দেয়া যাবে না।
-ওয়েট ওয়েট এখানেই দাঁড়ান। উনি কোন ছিচকে পাতি নেতা না কিংবা গুন্ডা না যে পুলিশ দেখে পালাবে।
-ক্রিমিনাল সবাই আমাদের চোখে সমান।
-ক্রিমিনাল? অভিযুক্ত আর অপরাধী আলাদা। আপনি দুইটাকেই এককরে ফেলছেন না? আগে তো প্রমাণ হোক উনি সত্যি অপরাধী। আগেই আপনি সীল মেরে দিচ্ছেন ক্রমিনালের?
-আপনি বেশি সময় নষ্ট করছেন। আর আইন আমাদের শিখাতে আসবেন না। বেশি ঝামেলা করলে সন্দেহের খাতিরে আপনাকেও এরেষ্ট করবো।
-আপনি ছয়মাস ট্রেনিং করেই আইন শিখে গেছেন? আমি দুইবছর থেকে পড়ছি।পাঠ্যগত বইয়ের বাহিরে অসংখ্য আইন মস্তিস্কে মজুদ করেছি।আমি প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে পারবেন?
-দেখুন ম্যাডাম আমরা উপরের মহলের অর্ডারে চলি।আমাদের অর্ডার ফলো না করলে চাকরি থাকবে না।দয়া করে উনাকে ডাকুন।
জিয়ানার এবার পছন্দ হলো পুলিশের কথা।তাই বলল,
-ঠিক আছে দাঁড়ান। উনি ফ্রেশ হচ্ছেন।
রুমে এসে দেখে নিবিড় ঝটপট গোসল করে নিয়েছে।ভেজা শরীর ঠিক মতো মুছেওনি ওমনি শার্ট হাতে নিয়েছে।জিয়ানা টাওয়াল নিবিড়ের হাত থেকে নিয়ে পিঠ মুছতে মুছতে বলে,
-ওসি হাবিবকে স্যাক করেছে।ব্যাপারটা আমার ভালো লাগলো না।থানায় হঠাৎ ওসি পরিবর্তন…
-ওদের পছন্দ অনুযায়ী ওসি না হলে তো কিচ্ছু করতে পারবে না তাই।
-নেক্সট যে আসবে সে নিশ্চিত ওদের সুপারিশ প্রাপ্ত কেউ।
-যতই সুপারিশ প্রাপ্ত হোক নেক্সটের নেক্সট থাকে।তুমি কিছুদিন জেনির বাবা মার সাথে থাকো।ওখানটা অনেক মানুষের বাস ,ফলে হঠাৎ কোন বিপদ হওয়ার পসিবিলি কম।আর এক্সাম ছাড়া ভার্সিটি যাওয়ার দরকার নেই। ঠিক আছে?
তারপর কাবার্ড খুলে ড্রয়ার থেকে একটা নতুন ফোন আর একটা ক্রেডিট কার্ড বের করলো।পাশে নিবিড়ের রি*ভালবারটা রাখা।জিয়ানার হাতে কার্ডটা দিয়ে বলে,
-আমাদের বিয়ের ডেট আর মাসের নাম্বার পিন।প্রাইভেট পড়াতে হবে না।যা খরচ সব এখান থেকেই করবে।নো তেড়িবেড়ি। আর এটা তোমার ফোন।নাম্বারটাও নতুন।আগের আইডি কোনটাই নেই সব ডিজেবল করে দিয়েছি।আপাতত সবকিছুর থেকেই দূরে থাকবে।
জিয়ানা সুবোধ মেয়ের মতো হাতে নিলো কার্ডটা।তারপর বলে,
-আপনার রি*ভালবারটাও দিয়ে যান তাহলে।ওইটার তো এখন আর কাজ নাই।
-হুম বানরের হাতে লাঠি দেই।আমাকে পাগলে কামড়িয়েছে তো।
জিয়ানা কপাল ভাজ করে জিজ্ঞেস করে ,
-বানর? আমি বানর হবো কেনো? হলে আপনি বানর।লেজ তো আপনার আছে। সামনে বা পেছনে ব্যাপার না।
নিবিড় শার্টের ভাজ খুলা বাদ দিয়ে কিছুক্ষণ থেমে চিন্তা করে।তারপর চোখ ছোট করে বলে,
-অসভ্য মেয়ে।হায়া শরম কিছুই নেই?
-শরমে কি গরম ভাত জুটবে?
-একটা কথাও মাটিতে পড়তে দাও না।সাবধানে থাকবে। অত আনাচে কানাচে যাবে না। মনে থাকবে?
জিয়ানা হ্যাঁ না কিচ্ছু বলে না।নিবিড় জিয়ানার হাত থেকে টাওয়াল কেড়ে নিয়ে বলে ,
-হয়েছে বউগিরী দেখাতে চাইলে ফ্রেঞ্চ কিস দিতে পারো। অবশ্য ফ্রেঞ্চ কিস শিখতে হলে বারবার প্রেক্টিস করতে হয়।
তারপর এগিয়ে এসে জিয়ানার দুইচোখের পাতায় উষ্ণ চুমু একে বলে ,
-এঞ্জেল কিস দিলাম। বিদায়ের সময় এই কিস দেয়া হয়।ষোল ক্যাটাগরির কিস আছে।সবগুলো শিখে রাখবে। আমি ফিরে এসে যেনো সব পাই।
জিয়ানার চোয়াল ঝুলে গেছে বেশ খানিকটা। পুলিশ দরজায় দাঁড়িয়ে আর এই লোক বউকে চুমুর ক্লাস নিচ্ছে?
জিয়ানাকে হাবলার মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে নিবিড় জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,
-ভুলেও থানা বা জেলখানার আশেপাশে যাবে না। আমার সাথে দেখা করার দরকার নেই। আর তোমার পাকনামিও করতে হবে না। আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি।তুমি নিজে সাবধানে থেকো।
তারপর হাতে ফ্ল্যাটের মেইন দরজার চাবি দিয়ে বলে ,
-আসি। আল্লাহ হাফেজ।
জিয়ানা পেছন ডেকে বলে,
-সুখ আপনি অসুস্থ। অনেক বেশি বড় অসুখ আপনার। আপনার এই রাজনীতি আরও বেশি অসুস্থ। এইজন্য আমি রাজনীতি পছন্দ করি না।
নিবিড় ঘুরে মুচকি হেঁসে বলে,
-রাজনীতি পছন্দ করার জিনিসও না।তাছাড়া তুমি রাজনীতি পছন্দ করবে কেন?তোমার পছন্দের সব জুড়ে সুখনীল নিবিড় হোক।আল্লাহ হাফেজ। টেইক কেয়ার।
তারপর দরজা খুলে বের হয়ে যায়। এই প্রথম নিবিড় জিয়ানাকে রেখে আগে চলে যাওয়াই তার ভালো লাগলো না। উল্টো সুক্ষ্ম সুচের মতো হৃদয়ে কিছু গাথার যন্ত্রণা অনুভব করলো।জিয়ানা দ্রুত বারান্দায় যেতে যেতে ভাবে,
“সৃষ্টিকর্তা সবাইকে উজার করে দেন না।কাউকে কাউকে যেটুকু ছিটেফোঁটাও দেন সেটাও নির্দ্বিধায় কেড়ে নেন।”
এবং বারান্দায় দাঁড়ানোর সাথে সাথেই যা দেখে সেটা বিস্ময়কর।
ক্লাব আর ভার্সিটির সব ছেলেপেলে বিল্ডিংয়ের নিচে দাঁড়িয়ে। নানা স্লোগান দিচ্ছে,
“নিবিড় ভাই আসছে
রাজপথ কাপছে”
এরা কি আগে থেকে জানতো নাকি?
নিবিড় সটান দৃঢ়চিত্তে হেঁটে যাচ্ছে।লোকটার সত্যি আলাদা একটা ব্যাপার আছে। সবার মাঝে তাকেই কেমন চোখে পড়ছে।শরীর থেকে হাত দুইটা ফাঁকা রেখে হাটে। ঝুলন্ত হাত দুটো একটুও নড়ে না।
হেঁটে পুলিশ ভ্যানের কাছে গেলে সকলে ঘিরে ধরলো নিবিড়কে।সাথে নানা স্লোগান।
“নিবিড় ভাইয়ের কিছু হলে
জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে”(রিপিট হচ্ছে বারবার)
“একশান একশান
ডাইরেক্ট একশান ”
“মিথ্যাবাদী দালালেরা
হুশিয়ার সাবধান”
“বাঁধা দিলে লাগবে লড়াই
এ লড়াইয়ে জিততে চাই”
নিবিড় হাত উঁচু করার কয়েক সেকেন্ড পরেই চারপাশ একেবারেই শান্ত হয়ে গেলো।
নিবিড় বেশ গলা উঁচিয়ে ভাষণ দেয়া শুরু করলো ,
-আসসালু আলাইকুম আমার স্নেহাশিস ভাইয়েরা। তোমরা আমার শক্তি। এই এলাকার শক্তি। এই শক্তি কখনোই মিথ্যার সাথে আপোষ করেনি আর ভবিষ্যতেও করবে না ইনশাআল্লাহ। আমি সুখনীল নিবিড় নিতান্তই ক্ষুদ্র নগন্য একজন মানুষ। কিন্তু আজ তোমাদের এই ভালোবাসায় নিজেকে কিছুটা হলেও শান্তনা দিতে পারছি যে ,তোমরা শত্রুর পাতা ফাঁদে পা না দিয়ে এখানে উপস্থিত হয়েছো।ইনশাআল্লাহ এই চক্রান্ত আর সকল ষড়যন্ত্র ভেঙে আবার তোমাদের মাঝে ফিরে আসবো।এসে আমাদের এই এলাকার উন্নয়নে আবার সামিল হবো।নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সহি উদ্দেশ্য সফল করবেন।কোন প্রকার অহিংসতা আর কলহন আমি সাপোর্ট করি না।তাই আশা করি তোমরাও সকল প্রকার হটকারিতা এড়িয়ে চলে ক্যাম্পাস আর এলাকার প্রশাসনিক কার্যকলাপে সাহায্য করবে।
আল্লাহ হাফেজ।
এতক্ষণ পিন অফ সাইলেন্ট থাকলেও এবার একসাথে গুনগুন শব্দে চারপাশ ভরে গেলো।নিবিড়কে ভ্যানে উঠানোর আগেই ভ্যানে অন্যান্য ছেলেপেলে উঠে ভরে গেলো।তারাও নিবিড়ের সাথে জেলখানায় যাবে।
জিয়ানা এই প্রথম নিবিড়ের বক্তব্য মন দিয়ে শুনলো।অতি সহজ সরল বাচনভঙ্গি নিবিড়ের।কিছু মানুষ আছে না ,যাদেরকে খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয়।নিবিড় সেই ক্যাটাগরির মানুষ।অল্প এইটুকু ভাষণে জিয়ানাকে হিপনোটাইজ করে ফেলেছে যেনো।
এরমাঝে শুরু হলো পুলিশের লাঠিচার্জ। উড়াধুরা পিটিয়েও একজনকেও ভ্যান থেকে নামাতে না পেরে সামনের পুলিশ ফট করে নিজের সিটে নিবিরকে বসিয়ে দরজালা লাগিয়ে দেয়।আর গাড়ি ভর্তি সকল ছেলেপেলে সহই গাড়ি যাত্রা শুরু করে থানার অভিমুখে।
“রাজায় রাজায় যুদ্ধ হলে উলুখাগড়ার প্রাণ যায়।”
এই কথাটা চিরাচরিত সত্য।নিবিড়কে এরেষ্ট করে থানায় নিয়ে যাওয়ার নিউজ পাবলিশ হওয়ার পর পরই এলাকায় লুটপাটের একটা হিড়িক পড়ে।দোকানপাট ,বাজার-ঘাট, শপিংমল থেকে শুরু করে এমন লুটপাট শুরু হলো চারপাশে যেনো গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে।
পুলিশ নামকাওয়াস্তে একবার টহল দিয়ে গেলেও পাঁচ মিনিট পর আবার শুরু। খুচরা ব্যাবসায়ীরা থেকে বড় ব্যাবসায়ী সবারই অবস্থা কয়েক ঘন্টায় পথে বসার মতো।
সাভারের সকল ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ক্লাব গুলা সঙ্গবদ্ধ ভাবে থানা ঘেরাও করেছে।এই সুযোগে প্রতিপক্ষ গ্রুপ পুরা এলাকা অচল করে দিয়েছে।
জিয়ানা এই গোলমালের ভেতরে আটকা। সে এককোনায় ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে দেখে যাচ্ছিলো লুটেরা গুলো আসলে কার পক্ষ্যের লোক।সবগুলাই মুখে মাস্ক পড়া। তবে চোখ কপাল দেখে জিয়ানা নিশ্চিত এরা লোকাল কেউ না।আর লোকাল হলেও এতদিন এই এলাকায় থাকেনি।
একটা সিরামিক প্লাস ফিটিংসের দোকানে ঢুকে ক্যাশ থেকে টাকা নিয়ে বাকি জিনিসপত্র ভেঙে গুড়িয়ে দিলো লুটেরার দল।জিয়ানা সাধারণ পোশাকেই এসেছে।একটা সান ক্যাপ আর মাস্কের খুব প্রয়োজন বোধ করলো এই মুহূর্তে।
জিয়ানা কিছুটা পেছন পেছন অনুসরণ করলো দলটার।বাজার ছাড়িয়ে বিভক্ত হয়ে গেলো সবাই।যে হাত নেড়ে নেড়ে সবাইকে ইন্সট্রাকশন দিচ্ছিলো জিয়ানা তার পেছন নিলো।সাথে আরও দুইজন যোগ হলো সামনের রাস্তা থেকে।এরমাঝে একটাকে জিয়ানার চেনা চেনা লাগছে বেশ।হ্যাঁ এটা বদি।বদি এখন কোন গ্রুপে জিয়ানার জানা নেই।তবে নিবিড়ের প্রতিপক্ষে যে এটা নিশ্চিত। দুপুরের তেজ কমে এসেছে।কিন্তু গোলমালের জন্য চারপাশ শুনশান নীরবতা। একটা প্রাণীও দেখা যাচ্ছে না।
জিয়ানা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে চলছে এদের পেছন পেছন। বাজারের সিমানা পাড় করে গোডাউন এলাকায় এসে বিচ্ছিন্ন দলের সবাই এক হলো। জিয়ানা ওদের কথা শুনার জন্য খুবই আস্তে আস্তে আগাচ্ছে।কিছুটা কাছাকাছি যেয়ে থেমে যায় একটা কথা শুনে,
-পুরা এলাকা অচল করার নির্দেশ দিয়েছে ভাই।উনাকে ছাড়া এই এলাকা যে একেবারেই অনিরাপদ এটা প্রশাসনকে বুঝাতে হবে।রাতে বড় বড় গোডাউন সব লুটের প্ল্যান ঠিকঠাক সফল করতে হবে।
পাশ থেকে একটা মোটাসোটা লোক প্রশ্ন করে ,
-এই লুটপাটের জিনিস গুলা কি আমরা ভাগাভাগি করে নিমু?
-হোপ হালার পু।এগুলা সব ভাই জেল থেকে বের হয়ে খুঁজে বের করার বাহানা করে ফেরত দিবে।এটাই পলিটিক্স। বুঝছিস?তোদের কমিশন ভাই সব নিজেই মিটাবে।টেনশন নট। আপাতত জামা কাপড় বদলিয়ে আই সবাই। যাহ।
সবাই আবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলো।আর জিয়ানা ভাঙ্গারির বড় বড় বস্তার আড়ালে মিশে রইলো স্তব্ধ হয়ে।পলিটিক্স ঠিক কতটা খারাপ? জিয়ানা কল্পনা করতে পারে না।শত শত মানুষের এই যে ক্ষতি হলো কতটুকু পুষিয়ে দেয়া যাবে? নিবিড়ের পলিসি তো জিয়ানার সাথেও যাবে না।
জিয়ানা বের হয়ে এলোমেলো হাটে।যতই কাছাকাছি আসতে চায় ,ততই পরিস্থিতি যেনো দূরে ঠেলে দেয় দুইজনকে দুইদিকে।হেটেঁ হেঁটে বস্তির দিকে আগায়।উদ্দেশ্য বাচ্চাদের সাথে কিছুক্ষণ হৈহল্লা করা।এটাই একমাত্র মন মস্তিস্ক ভালো করার টনিক।
মক্কুরা সবাই থানার সামনে আন্দোলন করে যাচ্ছে সকাল থেকে। প্রেস আর পুলিশের ঠেলাঠেলিতে আগানোর কোন সুযোগ নেই।দুপুর পাড় হয়ে গেছে অনেকক্ষণ হবে।সকালের নাস্তা আর দুপুরের খাবারের জন্য মক্কু বার কয়েক রিকুয়েষ্ট করেছে দায়িত্বরত পুলিশকে। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে মা*র্ডারের আসামীর জন্য এখানে কড়াকড়ির আদেশ দেয়া হয়েছে।সেই থেকে মক্কুর মাথা হ্যাং। মা*র্ডার? খু*নের আসামী বানিয়ে দিয়েছে তারমানে।তাহলে কোনভাবেই আগাম জামিন দিবেই না ,কোর্টে উঠবে কেস।সাথে অত্যাচার তো আছেই।
চেয়ারম্যান মামুন ইসলাম বারোটার দিকে থানায় এসে উপস্থিত হয়।কিন্তু অনেক রিকুয়েস্টের পরেও তাকেও ঢুকতে দেয়া হয়নি। উনি উপস্থিত সবাইকে আশ্বস্ত করে গেছেন নিবিড়ের কোন ক্ষতি উনি হতে দিবেন না।
মক্কু উনাকে দেখে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে ,
-হ*ত্যা মামলা দিয়েছে স্যার।আপাতত কি আগাম জামিনের ব্যবস্থা করা যাবে?
-আগাম জামিন কেন দেখো কোন জামিনই হয় কিনা।স্বয়ং রেজাউল সরকার এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে যেহেতু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বায়ে নিবিড়ের জেল কিংবা ফাঁসিও হতে পারে।
এরমাঝে মক্কু খেয়াল করে রনি একসাইডে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে।মক্কু আকাশের কানে কানে গিয়ে কিছু একটা বলে। আকাশও ইশারায় কিছু একটা বুঝায়।
আকাশ মিনিট দশেক পর মক্কুর কানে কানে বলে,
-ভাই খবর অত্যাধিক খারাপ। প্ল্যান খুব জঘন্যভাবে সাজাইছে।
আজকে রাতের মাঝে এরা ভয়াবহ কিছু করবে।রনিকে বলা হয়ছে ফাইনাল সময় এসে গেছে। রেডি থাকতে। বুঝতে পারছেন?
সেই থেকে মক্কু পোলাপান নিয়ে আন্দোলন করে যাচ্ছে।থানার সামনে থেকে এরা নড়বে না।
“অবৈধ মাদকের চোরাচালান সহ দুইটা মাডার কেসের আসামী সুখনীল নিবিড়। ধর্ষণের পর খু*নের অভিযোগে পুলিশ কাষ্টারিতে আছে সাভার ১নং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পুত্র নিবিড়। ”
মোদির দোকানে টিভিতে বারবার একই হেডলাইন বলে যাচ্ছে এক সংবাদ পাঠিকা। জিয়ানা আমলে নিবে না নিবে করেও থেমে গেলো। কোথাও একটা চরম অশান্তির শিখা যেনো তাকে পুড়াচ্ছে।ফোনটা বের করে কল লিষ্টে যায়। কন্ট্রাকে তিনটা নাম্বার সুখ,মক্কু আর জেনি।মক্কুকে ফোন দিয়ে অপেক্ষা করে ,কিন্তু পিক হয় না কল।জেনিকে ফোন দেয়ার সাথে সাথেই রিসিভ হয়,
-আপি মক্কু ভাই কই?উনার কি খবর জানো?
-মুসাদ্দিক থানার সামনে। আধাঘন্টা আগে কথা হয়েছে।ভেতরে কাউকে এলাও করছে না।এমনি নিবিড় ভাইয়ের বাবাকেও ঢুকতে দেয়নি। তারা সবাই থানা ঘেরাও করে আন্দোলন করছে। পরিস্থিতি মনে হয় ভালো না। নতুন ওসি নাকি খুব রাফ বিহেভ করছে নিবিড়ের সাথে।
-ও আচ্ছা রাখছি।
বলে জিয়ানা ফোন কাটে। ফোনটা ঘুরিয়ে দেখে। নামিদামি ফোন কিনেছে। যে ফোনের খুব ক্রেজ সবার কাছে। কিন্তু জিয়ানার কাছে নেই। এইসব বস্তুগত ব্র্যান্ড নশ্বর লাগে। জিয়ানার খচখচানি ভাব বাড়ে।
সন্ধ্যার অলস বেলা মনখারাপেরা ভীড় করে মনের আকাশে।কোথাও শূন্যতা আর হাহাকার বিরাজমান। বস্তিতে গিয়ে মর্জিনা খালার পিচ্চি রবির সাথে খেলে কিছুক্ষন।নিবিড় তাদের খাবার আর পোষাক দিয়ে ঘোল পাল্টিয়ে ফেলেছে যেনো।
জিয়ানাকে অন্যদিনের চেয়ে আজ মনমরা দেখে রবি চুমু একে দেয় জিয়ানার গালে।সেই চুমুতে জিয়ানার হঠাৎ মনে পড়ে গতকালের নিবিড়ের অতি আলতোভাবে যত্ন করে ছুঁয়ে দেয়ার কথা।আচম্বিতে সকল হাহাকার যেনো উড়ে গেলো পাতলা মেঘের মতো।মস্তিস্কের নিউরনের থিতিয়ে যাওয়া সচল হয়।মন আর মস্তিস্কের দ্বন্দে মন বলে,
-পলিটিস্ক নামটাই যেখানে নোংরা সেখানে এতে জড়ানো ব্যাক্তিরা পূতপবিত্র হতে পারে না।নিবিড় নিজের আখের কথা আগে ভাববে এটাই স্বাভাবিক। সে একজন উঠতি পলিটিশিয়ান হওয়াই তার নিজের ক্ষমতা ভারি করার জন্য যা করার তাই করবে।
মস্তিস্ক বলে উঠলো ,
-তুই মায়ায় পড়ে গেছিস সেই ভন্ডনেতার। তাই তার করা অন্যায়ের উপযুক্ত লজিক খুজছিস।জাষ্টিফাই করছিস মন মতো করে।অন্যায় তো অন্যায়ই। সেখানে অন্য কথা চলে না।
জিয়ানার পীড়ন লাগে এই টানাপোড়েনে।সে নীতিগত ভাবে পারছেও না নিবিড়কে ঘৃণা করতে। আবার মন থেকেও মেনে নিতে পারছে না।এই দ্বিধাদ্বন্দে টিকতে না পেরে ফোনটা আবার হাতে নিলো। মুখস্ত জিয়াউলের নাম্বারে কল দিয়ে একটা নাম্বার চায়।মিনিট পাচেক পর কাঙ্খিত নাম্বারে ফোন দিয়ে অপেক্ষা করে।
-আসসালামু আলাইকুম আংকেলে আমি জিয়ানা হক।আপনাকে এই সময় ফোন দেয়া ঠিক হয়নি যদিও তবুও একপ্রকার বাধ্য হয়েই দিতে হলো।
-ওয়ালাইকুম আসসালাম।আমি তোমার নাম্বারে কিছুক্ষণ আগে ট্রাই করেছি সেটা আন রিচেবল দেখাচ্ছিল।
-কি জন্য আংকেল?
-তুমি আগে বলো তুমি কেনো ফোন দিয়েছো?
-আপনাকে হঠ্যাৎ স্যাক করা হলো কেনো এটাই মাথায় আসছে না?
-আমার ডিউটির সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর উপর হামলা ইস্যু টেনে এতদিন পর বরখাস্ত করেছে।এটার জন্যই ফোন দাওনি আমি নিশ্চিত।
নীতিহীন রাজ পর্ব ৪৫
-জ্বি ঠিক ধরেছেন।সুখনীল নিবিড়কে থানায় রেখেছে সেটা তো জানেনই। কিন্তু ভেতরের খবর কেউ পাচ্ছে না। সারাদিন চলে গেছে কাউকেই এলাও করছে না দেখা করার।
ওসি হাবিব তাকে ভেতরের খবর জানাচ্ছে বলে ফোন কাটে।জিয়ানা অপেক্ষায় থাকে ফোনের। পাঁচ মিনিট দশ মিনিট করে প্রায় বাইশ মিনিট পর ফোন আসে। আর জিয়ানা সেকেন্ডেই রিসিভ করে কানে উঠায়।
-জিয়ানা পরিস্থিতি কিছুটা গোলমেলে। আমাকে ভেতরের এক কনস্টেবল জানালো কাল কোর্টে তুলবে নিবিড়কে।কিন্তু মাঝামাঝি রাস্তায় তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে এনকাউন্টারের ।সাজানো নাটকে নিবিড়কে সরাসরি এনকাউন্টার করা হবে।
জিয়ানার দুনিয়া টলে উঠলো। মাথায় বারবার ঘুরছে শুধু এনকাউন্টার শব্দটা।
