Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৬৮

নীতিহীন রাজ পর্ব ৬৮

নীতিহীন রাজ পর্ব ৬৮
আশিকা আক্তার সোহাগী

”যে ব্যাক্তি তার কোন ভাইকে গুনাহের কারণে লজ্জা দেয়,সে উক্ত গুনাহে লিপ্ত না হওয়া পর্যন্ত মা*রা যাবে না। -তিরমিজি ২৫০৫”
অথচ আমরা ফট করেই বলে দেই তুই পাপিষ্ঠ। উফ জিয়ানার ব্যাথায় চিনচিন করে উঠে শরীরের ভেতর।চোখ বন্ধ করে সিটে হেলান দিয়ে আছে সে।পৃথিবী এত অদ্ভুত কেন? আর মানুষ গুলোই বা এত বিচিত্র কেনো?যে দৃষ্টি সৃষ্টিকর্তা সব দেখার জন্য দিয়েছেন কেনো সেই দৃষ্টি দিয়ে মানুষের ভেতর পড়া যায় না।কেনো কাউকে ঘৃণা করার আগে মন আর মস্তিস্ক বারবার সংকেত পাঠায় না?

মিনিট দশেক পর ব্যাথা কমে আসে।আসলে শরীর মেরামত হতে সময় নেই না।নিজের মতো আরাম খোঁজে নেয়।
জিয়ানা দীর্ঘদিন কাউকে ঘৃণা করতে পারে না। রুপককে নিয়ে এই বোধটাতে সে খুব আরাম পেলো।হ্যাঁ রুপক।কিছু মানুষ কসুর করে নিজেকে জাহির করতে যে সে খারাপ।যেমনটা নিবিড় করতো।যেহেতু সে কাউকে ভালোবাসতে পারে না। তাই চাইতো কেউ তাকে ভালো না বাসোক।এখন মনে হচ্ছে রুপম মন্ডলও একই রকম।তানাহলে গোপনে কেনো নিবিড়কে চিঠি দিয়ে সচেতন করবে?

চিঠিটাই লিখা,
‘নীলুফা ইয়াসমিন কোন সাধারণ মেয়ে নাহ।সে মন্ত্রপুত লুসিফারের সন্তান।তার র*ক্ত অতি মূল্যবান। তাই তার সন্তানদের ধরা হয় দুষ্কর মানুষ হিসেবে।যেকোন মুহূর্তে তারা অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে লোকসমাগম থেকে।’
চিঠি পড়ে জিয়ানার বমি চলে আসে।নাউজুবিল্লাহ বলে ইস্তেগফার করেছে কয়েকবার।জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে নিবিড়ের দিকে তাকালে নিবিড় ড্রাইভ করতে করতে বলে,
‘আমাদের বিয়ের দুইদিন পর এই চিরকোট একটা বক্সে ভরে আমার কাছে আসে।লেখা কার হতে পারে বলোতো?’
‘আমি কিভাবে জানবো? আমি কি রাইটিং এনালাইজার?’
নিবিড় বাকা হেসে বলে,’রুপক মন্ডলের।এই লেখা রাফিন চিনেছে।ডানহাত হারানোর পর থেকে নাকি উনি পা দিয়েও লেখার প্র‍্যাক্টিস করতো।আজকে এখানে আসার সময় জানতে পারি এটা উনি নিজেই পাঠিয়েছেন আমাকে। সতর্কতা হিসেবে।একজন শ*য়তান পূজারী যার মাঝে ইমানের ছিটে ফোটা নাই সে কেনো তোমার পরিচয় পাওয়ার পর এটা দিয়েছে সেই হিসেব আমি মিলাতে পারছি না।’

জিয়ানা তাকিয়েই থাকে নিবিড়ের দিকে।তার জীবনের গোলমাল আসলে শুরু হয়েছে তারও মায়ের জন্মের আগে থেকে।কাকে দোষ দিবে জিয়ানা? বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বের হয় তার।নিবিড় আরও বলে,
‘অবিশ্বাস না।এই চিরকোট পাওয়ার পর থেকে আমি ভীত। আম্মুর মতো তুমিও যদি হারিয়ে যাও এই ভয়ে আমি তোমাকে পাহারায় রাখি।’
‘কেনো রাখেন? ব্যবহার করা শেষ হয়নি এখনো? প্রয়োজন কবে ফুরাবে আমার?’
হার্ড ব্রেক কষে নিবিড়।আচম্ভিতে জিয়ানার হাত ধরে হেচকা টানে নিজের কোলে আনে। জিয়ানার সদ্য আঘাত প্রাপ্ত ব্যাথার জায়গায় খামচে ধরে নিজের কালচে ঠোঁটে অত্যাচার শুরু করে জিয়ানার উপর।চোখ মুখ কুচকে রেখেছে জিয়ানা।হাত পা নিথর পড়ে আছে পাশে।র*ক্তে যখন আবার নিবিড়ের হাত ভিজে উঠে তখন নিজের রাগের মাত্রা হ্রাস পায়।জিয়ানাকে সিটে বসিয়ে নিজের ট্রি-শার্ট খুলে পড়িয়ে দিয়ে কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলে,
‘কেনো এমন কথা বলো চাঁদ?তোমাদের কাছে যেটা ভালোবাসা আমার কাছে সেটাই প্রয়োজন। এই দুনিয়ায় আমার একমাত্র জিয়ানা হককেই প্রয়োজন।’

‘আর ক্ষমতার?’
‘তোমাকে আমার কাছে রাখতে আর নূর ম্যানসনের মানুষদের জন্য ক্ষমতা প্রয়োজন।’
‘প্রতিপত্তি?’
‘নেই।’
‘আপনাকে যারা ভালোবাসে?’
নেই বলতে গিয়েও হেসে গাড়ি স্টার্ট করে নিবিড়।জিয়ানা লক্ষ্য করে নিবিড়ের চোখ আদ্র হয়ে উঠেছে। জিয়ানার মেরুদণ্ড সোজা হয়ে যায়।নিবিড় কাঁদছে এই ভাবনাটা সে মেনে নিতে পারছে না।নিবিড় সামনে দৃষ্টি রেখে বলে,
‘আমি নিজেই নিজেকে ভালোবাসি না জিয়ানা।আমি নামাজে দাঁড়ালে এই ভয়ে থাকি ,আমার নামাজ কি কবুল হবে? আমি নিজেই যে নাজায়েজ ওয়ালাদ।’

জিয়ানা ধমকে উঠে “সুখ?”
নিবিড় হেঁসে বলে, ‘তুমিই বলো আমার জন্ম কি হালাল? ‘
‘সেই হিসেব আপনার মা বাবা দিবে।সেটার দ্বায় আপনার না।কারো জন্মের উপর যদি তার হাত থাকতো তবে কেউ এই পোড়া দেশে জন্মাতে চাইতো না।বেশিরভাগ রয়েল ফ্যামিলির বাবা মা চাইতো।আমি নিজেও চাইতাম জিয়াউলের হকের মেয়ে হতে।’
জিয়ানা কিছুক্ষণ থেমে আবার বল,’আপনি কি তাদের কথা জানেন না? আমাদের যুদ্ধ সন্তানদের কথা? আমাদের বীরাঙ্গনা মায়েদের কথা? এখানে আপনি কাকে হারাম বলতে চান?পৃথিবীতে অসংখ্য ওয়ার বেবি আছে।যুদ্ধ একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর পর্যন্ত চলে কিন্তু যুদ্ধসন্তানদের নামের সাথেই যুদ্ধ যুক্ত হওয়াই সারাজীবনের বহন করতে হয় এই ট্যাগটা।আপনার বাবা ছিলো ,মা এখনো আছে।আপনি নিজেকে কেনো এতটা ছোট ভাবেন সুখ?’
‘বড় ছোট কোন ব্যাপার না। আমি নোংরা। এইজন্য আমি কাউকে ছুতে চাই না।কিন্তু তোমাকে না ছুয়েও থাকতে পারি না।’

‘এই আপনে গাড়ি থামান।এক্ষুনি থামান।ফেরেব্বাজ লোকদের আমার পছন্দ না।আমি আপনার সাথে সংসার করবো না।আপনি তো নোংরা?’
নিবিড় হোঁ হোঁ করে হেঁসে বলে,’তবে আমার নোংরা কাটার মেশিন তুমি।’
‘শুনোন হেয়ালি না একটা কথা বলি।ঝিনুক আঘাত পেলেই মুক্তা তৈরির কাজ শুরু করে।তার ভেতরে যদি বালি কনা বা পরজীবি প্রবেশ করে সেটাকে মুকাবিলা করার জন্য নেকার নামের একপ্রকার চকচকে পদার্থ নির্গত করে।যেটা সেই অনুপ্রবেশকারির চারপাশে আবৃত করতে থাকে দিনের পর দিন।এজন্য সেটা মুক্তায় পরিনত হয়। নিজের পাওয়া কষ্টগুলোকে আমি কখনো স্রেফ কষ্ট মনে করি না।সেগুলা এক একটা মুক্তা।যা আমার জীবনের মূল্য বাড়িয়েছে।আমার চিন্তা ভাবনা পালটানোর জন্য সাহায্য করেছে।আপনাকে নূর ম্যানসনের সবাই ভালোবাসে।কেউ বিন্দুমাত্র কিন্তু মনে রাখেনি।’

‘শেষ কথাটার সাথে একমত না।এরা আমাকে তখনই ভালোবাসা শুরু করেছে যখন থেকে প্রোপার্টি আমার নামে উইল হয়েছে।আমি তাদের প্রয়োজন ,প্রিয়জন না।’
‘ঠিকই তো আছে।আপনি নিজেও তো আমাকে প্রয়োজনে ব্যবহার করছে এটা যদি ভালোবাসা হয় তবে ওদেরটা মেনে নিতে সমস্যা কোথায়?’
গাড়ির গতি কমায় নিবিড়। ভেতরটা কি হালকা কেপে উঠলো? মৃদু হেঁসে বলে,
‘আমার আর তাদের হিসেব আলাদা।’
‘ওও আচ্ছা সাদ্দা কু*ত্তা টমি ,মেরে কু*ত্তা কু*ত্তা?’
নিবিড় অট্টহাসি দিয়ে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলে।নিবিড়ের মনটা হালকা লাগে।এইভাবে কি কেউ যদি আগে বলতো ,নিজের প্রতি ঘৃণাটা অর্ধেক কমে যেতো তবে।মাথা ঘুরিয়ে তাকায় জিয়ানার দিকে।ঝটিল ব্যাপারের সহজ যুক্তি দাঁড় করাতে জিয়ানার জুড়ি নেই।

উদাস সকাল ,মুখ গোমড়া করে বারান্দায় বসে জিয়ানা।অবশ্য ভোর রাত থেকে বসে আছে।ইদানীং নিদ্রাহীনতায় বেশ ভুগতে হচ্ছে তাকে।রাতটা পুড়ানোর কোন উপায় তার জানা নেই।নূর মেনশনে কেটে গেছে চব্বিশদিন।প্রতিদিন নিবিড় আসে মধ্যরাতে। আদর টাদর করে রোজ নিয়ম করে।কিন্তু ইদানীং জিয়ানার সেসবেও বিতৃষ্ণা জন্ম নিয়েছে।মনে হয় এসব লাভ বোম্বিং এর প্রথম স্টেজ।

আবার অহেতুক সন্দেহ করলে মস্তস্কের আরাম মিলে।সবকিছুই অসহ্য লাগে।এই যে খালি সুবিন্যস্ত সমান ভাবে ট্রিম করা ঘাসের মাঠেরমাঝে দুইটা গাড়ি পার্ক করা এগুলাকেও মনে হচ্ছে দাঁত কেলিয়ে হাঁসছে।বিদঘুটে তাবদ দুনিয়া।অথচ কিছুদিন আগেও জিয়ানার চিন্তাধারা ছিলো আজ আছি কাল নেই অহেতুক মন খারাপ দীর্ঘ করে কেনো আয়ু খরচ করবো।বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে।মনে হচ্ছে বয়স চল্লিশ পাড় হয়ে গেছে। তার একদম হাঁসতে ইচ্ছা করে না।সেই যে ফুটবল ম্যাচে রাব্বিদের সাথে দেখে হয়েছে এরপর আর দেখা হয়নি।জিয়ানাই যায়নি।ক্লাস করে গুনে গুনে।রুম থেকেই বের হতে ইচ্ছা করে না।এতে অবশ্য নিবিড় খুব খুশী।

জিয়ানা উঠে দাঁড়ালো।সাথে সাথেই মাথায় চক্কর কাটে। উঠলে একবার মাথা ঝিমঝিম করে ,বসলে একবার।খাওয়া দাওয়া দেখলেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।একবার কোথাও বসলে মনে হয় সেখানে শেকড় গজিয়ে গেছে।আর উঠতে ইচ্ছা করে না।তবুও শরীর টেনে উঠলো।নিবিড় ফাঁকা বিছানা দেখলেই উঠে পড়বে।এমনিতেই অনেক রাতে ঘুমিয়েছে।সারাদিন বাসার বাহিরে থাকে। খাওয়া দাওয়ার ঠিক ঠিকানা নেয়।
জিয়ানা রুমে ঢুকেই দেখে নিবিড় উঠে বসেছে।করুন চোখে জিয়ানার দিকেই তাকিয়ে আছে।আঙুল দিয়ে ইশারা করে কাছে ডাকে।জিয়ানা গুটি মেরে বিড়াল ছানার মতো ঢুকে যায় নিবিড়ের বুকে।জিয়ানার শরীরে কাটা দিচ্ছে দেখে হাতরে রিমোট খুঁজে রুমের টেম্পারেচার আপ করে দেয়।

নিবিড়ের ইদানীং বুক ফেঁটে যায় জিয়ানাকে দেখলে।কেমন চঞ্চল দুরন্ত খরগোশের মতো মেয়েটা শান্ত হয়ে গেছে। আর একটা জিনিস খেয়ালে এসেছে কিছুদিন হয় নিবিড়ের। জিয়ানার পাজরের হাড় ভিজিবল এখন।কোলে নিলেও হুটহুটে লাগে অনেক।কিন্তু নিবিড় তো কোন ফাঁককোকর রাখেনি।ঘরে তিনটা সিসি ক্যামেরা। হাই সিকিউরিটি লক করা রুম।জিয়ানাকে কড়া ভাবে বলা আছে বাথরুমের বাহিরে যেনো চুল না কম্ব করে। পরিধেয় জামা কাপড় সব সরাসরি ওয়াশিং মেশিনে যায়।নামাজে রেগুলার হয়েছে দুইজনই।প্রতিদিন দোয়া দুরুদ পড়ে ঘুমায়। টিএইচএস আর সুগার টেস্ট থেকে শুরু করে সব টেস্টই করানো হয়েছে।এভরিথিং ইজ নরমাল। তবে কেনো এমন হচ্ছে?
নিবিড়ের বুকের ভেতর জ্বলুনি ধরে।নীলুফা ইয়াসমিনের এইসব উপস্বর্গ ছিলো।তবে কি জিয়ানাও হারিয়ে যাবে নিবিড়ের কাছ থেকে? নিজের স্বার্থপরতার জন্য জিয়ানাকে নিজের সাথে জড়িয়ে কি নিবিড় চরম ভুল করে ফেললো? কিভাবে শ্বাস নেবে এই মেয়েটাকে ছাড়া?শক্ত করে চেপে ধরে জিয়ানাকে।জিয়ানা মৃদু আর্তনাদ করে বলে,

‘আঃ লাগছে সুখ? এত শক্ত করে ধরার কোন মানে আছে?’
নিবিড় হাতের বাঁধন নরম করে।জিয়ানার মাথায় চুমু দিয়ে জিজ্ঞেস করে ,
‘কোন খারাপ স্বপ্ন দেখো?’
জিয়ানা মাথা দিয়ে না করে।নিবিড় আবার প্রশ্ন করে ,
‘বাহিরের কারো দেয়া কিছু খেয়েছো?’
এবারও মাথা নাড়ায়।
‘কেউ তোমার চুলে হাত দিয়েছিলো?
‘না’
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে নিবিড়।চোখ মুদে নানা রকম কথা ভাবে। ফট করে চোখ মেলে তাকিয়ে জিয়ানাকে বুক থেকে সরিয়ে সামনে এনে জিজ্ঞেস করে ,
‘স্বপ্নে কিছু খেয়েছো রিসেন্ট?’
‘হুম কিছুদিন আগে আপনাকে বাকালাভা আনতে বললাম না? সেদিন রাতে স্বপ্নে একটা লম্বা লোক বাসায় এসে সবাইকে বাকালাভা দিচ্ছে।আমিও খেয়েছি।’

নিবিড় চড়াক করে উঠে বসে। জিয়ানাকে অন্যকোন ভাবেই কালোজাদু করতে না পেরে স্বপ্নের মাধ্যমে খারাপ জ্বিন দিয়ে খাওয়ানো হয়েছে।তার হিসেব এইজন্যই মিলেনি।জিয়ানাকে হাত ধরে উঠিয়ে বলে,
‘চলো গোসল করে নামাজ পড়ে নেই।তোমার একটা রুকাইয়া করতে হবে।সব আগের মতো ঠিক হয়ে। আল্লাহর কালামের চেয়ে বড় শক্তি আর কোনকিছুতে নেই।’
‘কি বলছেন? আমার শীত লাগছে এখন গোসল করতে পারবো না।’
‘তোমার করতে হবে না।আমি করিয়ে দিচ্ছি।’
বলে জিয়ানাকে পাজাকোলে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে যায় নিবিড়।

একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর কঠিন মানুষটাও আর কঠিন থাকতে পারে না। হতাশ হয়ে পড়ে।রুপক মন্ডলের অবস্থাও আজকাল একই।পাহাড় গলে একসময় সমতললে পরিনত হয় কিন্তু মানুষের পাহাড়সম আশা কখনো গলে না।মৃত্যুর পর রুহটাও সেই আশা নিয়েই চল্লিশদিন ঘুরাফেরা করে। রুপকের জীবনে একটাই চাওয়া ছিলো নীলুফা।সাথে নূর ম্যানসনের একজন হয়ে উঠা।

সু-ব্যবহার ,শ্রম ,বুদ্ধি ,সম্মান আর ভালোবাসা সে উজাড় করে বিলিয়েছে নূর ম্যানসনের প্রতিটা সদস্যের প্রতি।তবুও দিন শেষে সে আশ্রিত নামেই পরিচিত ছিলো।বালক বয়সেই মনে মনে ভাবে এই পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করে সে ফ্যামিলি মেম্বার হবে একদিন।এই লক্ষ্যেই নীলুফাকে কখনোই বোনের নজরে দেখেনি। কিন্তু ভাগ্যের দোষ কিংবা গুনে অন্য নারীর সাথে জুড়ে য্যায়।বিয়ের পর চেষ্টা করেছে নিজের স্ত্রীকে ভালোবাসতে কিন্তু পারেনি।ভাগ্যক্রমে নীলুফাকে ভালোবাসার যাবতীয় নিদর্শন উন্মোচন হয়ে যায় রাফিনের মায়ের কাছে।সারারাত ফুপিয়ে কেঁদে বলেছিলো ‘কুলসুম আম্মাকে আমি কালই সব খুলে বলবো।’

ব্যাস আর কোন রাস্তা ছিলো না রুপক মন্ডলের।যে স্থান সে বুঝ আসার পর থেকেই তিলে তিলে গড়েছে সেটা যেনো দমকা হাওয়াই নড়ে উঠে।তাই পরেরদিন সকালবেলায় ইচ্ছা করেই গ্যাসের পাইপ কেটে রেখে দেয়।রাফিনকে নিয়ে দরজায় দাঁড়ানোর সময় দেখে নিবিড় হাজির।তাদের আজ লুকিয়ে গান শিখতে যাওয়ার কথা রাফিনের মাসির কাছে।নূর ম্যানসনে এইসবের একদম অনুমতি নেই।কিন্তু চতুর নিবিড় ঘরে পা দিয়েই বলে,
‘রুপ মামু কেমন একটা গন্ধ বের হয়েছে না? ‘
রুপক তাড়া দিয়ে বলে,’আমি তো পাচ্ছি না।চল চল দেরি হয়ে গেলে বাসায় ধরা খেয়ে যাবি।’
আধাঘন্টা পর রুপকের ফোনের কল আসে। পুরাবাড়ি শেষ হয়ে গেছে।

চোখ খুলে রুপক মন্ডল। শত চেষ্টা করেও ভালো আর হওয়া হয়নি তার।নিজের কলিজা পঁচিয়ে হৃদয়ের খাবার মিটাচ্ছে বছরের পর বছর।আটমাস অন্ধকার প্রকোষ্ঠে অকথ্য শারীরিক আর মানষিক নির্যাতনে সে বুঝেছে ,এই জগতে ভালো মানুষের দাম নেই।সব ক্ষমতা আর ভন্ডদের দখলে।এরপর ভুগেছে সাইকোসিস রোগে।
হঠাৎ আজ মনে হলো এইসব কিছু ভ্রম।নীলুর হাত নড়েনি।সেটা আর জীবনেও নড়বে না।নীলু কোন প্রিন্সেস না। সে রুপকের নীলুফা ইয়াসমিন। রুপকের ফিনিক্স। পাহাড়ি জোৎস্যা। জোনাকির মতো উৎফুল্ল ছোট ছোট আশা।নক্ষত্রের মতো ঝলঝলে শোভা। পাহাড়ি বন্যফুলের মন মাতানো সুভাস। একশো লাল ফুলের মাঝে শুভ্র সাদা গোলাপ।হাজার সেরা কবিতার নারীর মাঝে একজন বনলতা সেন।একজন অদ্বিতীয়া। একজন অতি মানবিক মানবী।যে ভেজা চোখে হাঁসি মুখে বলেছিলো ,’আজও আমি তোমাকে ঘৃণা করতে পারলাম না রুপকদা। আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।’
প্রচন্ড চিৎকারে টেবিলের সব জিনিস ফেলে দেয় রুপক মন্ডল। তার এই ক্ষমা চায় না।এতটা ব্রুটালিটি দেখেও কেনো একটা মেয়ে তাকে ঘৃণা করবে না? কেনো এত মায়া করে সে রুপককে? এসব তো জানতেই হবে তাকে।আরও যত নিচে নামতে হোক সে নামবে।হাজার হাজার শয়তানের পায়ে পড়বে তবুও যদি এর জবাব চায়।

চুল খামচে ধরে ফ্লোরে বসে রুপক মন্ডল।হামাগুড়ি দিয়ে হাতড়ে আলমারির কাছে যায়।কোনরকম একটা রাউন্ড শেপের বোতল বের করে ঢকঢক করে প্রাচার করে খাদ্যনালীতে।গ্রীবাদেশ আর কলিজার জ্বলুনিতে হৃদয়ের জ্বলুনি কমে আসে।আস্তেধীরে চোখ মুদে এলে কানে ভাসে ,আমার দেখা সেরা মানুষ তুমি রুপকদা।কিন্তু দুনিয়ার পর তোমার সাথে তো আমার দেখা হবে না আর।’

রুপকের মুখ শুকিয়ে যায় দেখে নীলুফা খিলখিলিয়ে হেঁসে বলে, কারণ তুমি থাকবা স্বর্গে আর আমি জান্নাতে।’
একগাদা ভাঙাচোরা জিনিসের উপর চোখ বন্ধ করেই শুয়ে থেকে গা দুলিয়ে হাঁসে রুপক।পরক্ষণেই আবার দেখতে পায় নীলুফার ভয়ার্ত ক্লান্ত ফ্যাকাশে মুখের আর্তচিৎকার ,’ ওকে মেরো না রুপকদা।আমার স্বামী সে।আমার সন্তানের বাবা।আমার মাথার তাজ।আমার সুখ আর শান্তির স্থান।ওকে ছেড়ে দাও। ওর কোন অন্যায় নেয়।’
রুপক ধড়ফড়িয়ে উঠে দাঁড়িয়ে নীলুফাকে ধরতে চায়।আর বিড়বিড় করে ,’কাঁদে না নীলু। তুই কাঁদলে আমার সব ধ্বংস ধ্বংস লাগে।তোর সব সুখ আর শান্তি আমি এনে দেবো।আমাদের সুন্দর সংসার হবে। ফুটফুটে একটা মেয়ে হবে। একদম তোর মতো।এমন বাদামী বড় বড় মনির চোখ হবে।এমন বুঁচা ছোট্ট একটা নাক। আর খুব দুষ্টু।ওকে আমি কি নাম দিবো? কি নামে ডাকবো? না না কোন নাম তার সাথে যাবে না তাকে আমি আমার না পাওয়া মা বলে ডাকবো।আমার জননী হবে সে।’

পরক্ষণেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠে যখন তার কল্পনার মতোই জিয়ানার চেহারাটা সামনে ভেসে উঠে।যে মেয়েটার চোখেমুখে তার জন্য স্পষ্ট ঘৃণা।
টলতে টলতে ঢলে পড়ে ফ্লোরে।বৃদ্ধ শরীর আর কত নিবে?সাইকোসিস রোগে ভোগার সময়ে সে কল্পনায় নীলুর সাথে সংসার করেছে।নীলুর ঠা ঠা করা মোহনীয় হাঁসির স্রোতে সাতার কেটেছে দিনের পর দিন।কল্পনার সংসার তাদের ছোট্ট মেয়ের দুরন্তপনায় ভরে থাকতো সারাক্ষণ। কিন্তু বাস্তবে কিচ্ছু নেই।নেই চার সীমানায়। সব ধূ ধূ মরুভূমি।নিজের বুকে কিল ছুড়ে ইচ্ছামতো।
শরীর নেতিয়ে আসে এক সময় । তারও তো একটা বাউন্ডারি আছে?নশ্বর এই দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি নশ্বর মানব শরীর। আহা জীবন।অতি ক্ষুদ্র ,নগন্য একটা আয়ু নিয়ে হাজার হাজার কর্মকাণ্ড। তারমাঝে আবার ভালো-মন্দ ,রোগ-শোক,শান্তি-অশান্তি,পাপ পূন্যের হিসেব।
তবে সব হিসেব খুব শীগ্রই শেষ হবে।অপেক্ষার মেয়াদ শেষ যে….

নামাজে বসেই নিবিড়ের জানা যত দোয়া দুরুদ আছে সব পাঠ করে জিয়ানার মাথা ফু দেয়।জিয়ানাকে জায়নামাজে বসিয়েই নিবিড় ফোন বের করে কল দেয় এক বিশেষ নাম্বারে।অপরপ্রান্তে রিসিভ হয়েই ভেসে আসে লম্বা সালাম।নিবিড় সব খুলে বলে।তারপর ওপাশ থেকে কিছু দিক নির্দেশনা দেয় যা নিবিড় মনোযোগ দিয়ে শুনে।ফোন ডিস্কানেক্ট করে নিচে গার্ডেন এরিয়ায় যায় নিবিড়।মাঝারী সাইজের সাতটা বরইয়ের পাতা উঠিয়ে আনে।তারপর রান্নাঘর থেকে মিনি হ্যান্ড ব্লেন্ডার নিয়ে উপরের নিজ কক্ষে ফেরত আসে।

ব্লেন্ডারের পাতাগুলো ব্লেন্ড করে দুইলিটার পানিতে মিশিয়ে দেয়।তারপর সূরা ফাতিহা , আয়াতুল কুরসি, ইখলাস,নার্স আর ফালাক তিনবার করে পড়ে ফু দেয় উক্ত পানিতে।তারপর সেটা এক লিটার আলাদা করে অন্য বোতলে রাখে।বাকি একলিটার জিয়ানার হাতে দেয় খেতে।
জিয়ানা আবার বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়ে আছে।এমন সবুজ পানীয় দেখে নাক আরও উঁচুতে তুলে।নিবিড় ধরে সোজা করে বসিয়ে বলে,
‘বিসমিল্লাহ বলে সব খারাপ জিনিসের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার নিয়তে তিন ঢোকে খাও। ‘
‘এতটুকু খেতে পারবো না।’
‘ওষুধ অনেক সময় খেতে হয়।আচ্ছা ঠিক আছে ফাইভ স্টারের কোন ড্রিংক্স মনে করে খেয়ে ফেলো।’
‘ভালো রেস্টুরেন্টে খাবার খাওয়ার চেয়ে ,ভালো খাবার যেকোন রেস্টুরেন্টে খাওয়া আমি প্রিফার করি।আপনি জানেন?’
‘হ্যাঁ এখন গুড গার্লের মতো খাও।’

জিয়ানা বাধ্য হয়েই পনেরো মিনিট লাগিয়ে শেষ করে একলিটার পানীয়।তারপর নিবিড় খুরুজের অডিও আয়াত সাউন্ড সিস্টেমে সেট করে আবার আরেক লিটার হাতে নেয়।তারপর জিয়ানার দিকে তাকিয়ে বলে,
এই অডিওটা চোখ বন্ধ করে মনোযোগ দিয়ে শুনে শুনে বাকি পানিটুকু শেষ করবে।’
জিয়ানা আড়চোখে দেখে বলে,
‘মে*রে টেরে ফেলবেন নাতো?’
‘হুম।এতে আমার কি লাভ?’
‘আরেকটা বিয়ে করতে পারবেন?’
‘কথা না শুনলে তাই করবো।’
‘লক কডপিস লাগিয়ে দিবো আপনাকে।যেটা আমার ফিঙ্গার প্রিন্ট ছাড়া খুলবে না।আমি মরে গেলে সারা জীবন এমনেই থাকা লাগবে।’
নিবিড় হাসতে গিয়েও হাসে না।মাথায় টোকা দিয়ে বলে,
‘দুষ্টু বুদ্ধি তো মাথায় গিজগিজ করে। উল্টোটাও তো হতে পারে। আমি যদি আগে ম*রে যাই?’
‘সুখ?’
‘বাচ্চা নেয় ,বউ থাকবে না ,আমি থেকেই বা কি করবো?দেশের উন্নয়ন যে আমার একমাত্র লক্ষ্য না সেটা তো তুমি জানো? ‘

জিয়ানা গ্লাসটা হাতে নিয়ে মাথা খাটের স্ট্যান্ডে রেখে বলে,
‘আমি আপনার ছাকনি হতে গিয়ে কাকর হয়ে গেলাম তাই না সুখ? ভেবেছিলাম স্বচ্ছ মিহি সোনার দানার মতো সুখ গুলো আপনার হবে। উপরের পড়ে থাকা কাকড় ময়লা দুঃখ গুলো আমি ধারণ করবো।কেমন উল্টো হয়ে গেলো সব?’
‘আমার পেইন কিলার। আমার শরীর আর মস্তিস্কের স্বস্তি। আমার দুনিয়ায় একটুকরো চাঁদ। তুমি আমার পাশে আছো এটাই আমার জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি।’
‘তবে বলুন ভালোবাসেন?’
‘বললে কি হবে?’

নীতিহীন রাজ পর্ব ৬৭

‘অনেক কিছু হবে।আপনি বলুন আগে।’
নিবিড় জিয়ানার নাক টেনে খালি গলায় গায়,
“তুমি যদি বলো পদ্মা মেঘনা একদিনে দিবো পাড়ি
তুমি যদি বলো চাঁদের বুকে বানাবো আমার বাড়ি
তুমি আমার শুধু আমার ভালো লাগা কবিতা….”

নীতিহীন রাজ পর্ব ৬৯