Home নূর ই মহব্বত নূর ই মহব্বত পর্ব ২৭

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৭

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৭
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী

আহিলের ইস্পাতকঠিন চোখের দিকে তাকিয়ে নওমি নির্বাক হয়ে বসে রইল। কি বলবে খুঁজে পাচ্ছে না সে। আহিল জানালার দিকে ফিরে আবার বললো,
– তুমি যখন চলে গিয়েছিলে তখন আমি নিজেকে ব্যস্ত রাখতে মাঝে মাঝে যেতাম। চেষ্টা করতাম মাইন্ডকে ওদিকে ঘুরিয়ে রাখতে। তুমি চলে যাওয়ার পর আমার এই ঘরটা যখন মরুভূমি হয়ে গেল, তখন একলা ঘরে ওই শূন্যতা আমি সহ্য করতে পারতাম না নওমি। নিজেকে পা গল হওয়া থেকে বাঁচাতে, তোমার স্মৃতিগুলো থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে আমি আবার ওই বিপ’জ্জনক দুনিয়াটায় পা বাড়াতাম। খুব জটিল কোনো মা’র্ডার কেসের সাইকোলজিক্যাল অ্যানালাইসিস বা ড্রা’গ র্যা’কেটের পেছনের মাস্টারমাইন্ডকে ধরার জন্য যখন মাথা খাটাতাম, তখন কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও তোমার চলে যাওয়ার কষ্টটা মাথা থেকে দূরে থাকত।
আহিলের গলায় একটা চাপা হাহাকার স্পষ্ট ফুটে উঠল। জানালার ওপাশে থাকা নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ও আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল,

– অনেকে ভাবত ডক্টর আহিল বড্ড কাজের পাগল, দিনরাত শুধু হসপিটাল আর পেশেন্ট নিয়ে থাকে। কিন্তু কেউ জানত না, এই চাদর ঢাকা সাধারণ ডাক্তারটার ভেতরে একটা ছটফটে মানুষ লুকিয়ে আছে, যে প্রতি রাতে অপ’রাধীদের ডায়েরি ঘেঁটে নিজের ভেতরের ক্ষ’তটাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করে। আজ প্রকৃতি বুঝি আমার সেই পুরোনো পরিচয়টাকে আবার জোর করে টেনে বের করল!
আহিলের এই কথাগুলোই কি ছিলো জানে না নওমি, কিন্তু এই প্রথমবার ভেতর থেকে মনে হলো আহিল বোধহয় ওর চেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছে! ও ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে আহিলের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। কোনো কথা না বলে ও দুই হাত দিয়ে পেছন থেকে আহিলকে জড়িয়ে ধরল, নিজের মুখটা চেপে ধরল ওর চওড়া পিঠে। হুট করেই নওমির এই আকস্মিক আলিঙ্গনে আহিল কিছুটা চমকে উঠল। ওর শরীরের সমস্ত শক্ত হয়ে থাকা পেশিগুলো এক পলকে শিথিল হয়ে এলো। তন্মধ্যে শোনা গেল ফুঁপানোর আওয়াজ!

– আই অ্যাম সরি আহিল! আমি আপনাকে কত ভুল বুঝেছি… কত কথা শুনিয়েছি!
হুট করে এমনভাবে পেছন থেকে নওমি জড়িয়ে ধরে কাঁদায় ভরকে গেল আহিল। পরক্ষণেই আলতো হেসে পেছন ফিরলো সে। নওমির গালে হাত দিয়ে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
– পাগলী একটা! কাঁদছ কেন? এই যে একটু আগে বাঘিনীর মতো গর্জন করছিলে, সেই তেজটা হুট করে কোথায় গেল, হুম?
– ইয়ার্কি করবেন না একদম! আমি সিরিয়াসলি স্যরি বলছি।
আহিল কিছুটা ঝুঁকে গেল। সেভাবেই বললো,
– আমি কি আপনার স্যরি চেয়েছি? কিসের জন্য স্যরি বলছেন?
নওমি এবার চোখ তুলে তাকালো। মলিন মুখে বললো,

– তিন বছর আগে যদি না বুঝে কিছু না জিজ্ঞেস করে চলে যেতাম তাহলে আমাদের জীবনটা অন্যরকম হতো তাই না? ভুলটা বোধহয় আমারই বেশি ছিলো! আপনি এত চেষ্টা করার পরও আমি মানিয়ে নিতে পারছি না যেন! আপনার খারাপ লাগে আমি বুঝতে পারি। আদনান হারিয়ে যাওয়ার পরও আমি হুঁশ জ্ঞান খুইয়ে আপনাকে বলেছি আপনি আমাদের ফিরিয়ে এনেছেন বলে এমন হয়েছে! কতটা পাষাণ আমি! আর আপনি কি না আমার জন্য আদনানকে খুঁজে এনেছেন! তার জন্য স্যরি শব্দটা অনেক ছোট কিন্তু আমার যে আর বলার মতো কিছুই নেই!
আহিল ওর চোখের পানি মুছে দিয়ে এতোগুলো বছর পর প্রথমবারের মতো নওমির কপালে নিজের ঠোঁট দুটো ছোঁয়ালো তারপর খুব আদুরে গলায় বললো,
– ধুর! ভুল দুজনেরই ছিলো। তুমি তো ফিরে এসেছো এবার দুজনই চেষ্টা করছি তো সব আগের মতো করার? এসব নিয়ে মন খারাপ করবে না একদম! আর আমি তোমার জন্য আদনানকে ফিরিয়ে এনেছি কে বলেছে? আদনান আমারও ছেলে আমার জন্যও আমি ফিরিয়ে এনেছি! তোমার স্যরি আমার লাগবে না। আমাকে অন্যকিছু দিও।
নওমি অবুঝের মতো বোকা কণ্ঠে বললো,

– আমার কাছে কিছু নেই কি দিবো আমি?
নওমির গালে হাত রেখে ওর কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে আহিল বললো,
– কে বলল তোমার কাছে কিছু নেই নওমি? তিন বছর আগে তুমি যখন আমার ওপর অভিমান করে চলে গিয়েছিলে, তখন তুমি শুধু নিজে যাওনি, আমার হাসিখুশি চঞ্চল রূপটা, আমার বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা, আমার পুরো পৃথিবীটাই নিজের সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলে।
আহিল একটু থামল। ওর আঙুলগুলো নওমির গাল বেয়ে নামা অশ্রু কণাগুলো যত্ন করে মুছে দিয়ে আবার বলল,
– আমাকে তোমার ওই ছোট্ট স্যরিটা দিতে হবে না। তার বদলে আমি আরো বেশি কিছু চাই…
– কি?
– ভালোবাসা, বিশ্বাস! আমাকে শুধু তোমার ওই হারানো ভালোবাসা আর বিশ্বাসটুকু ফিরিয়ে দাও। আমাকে তোমার হাতটা শক্ত করে ধরার অধিকারটুকু দাও, যাতে আগামী দিনে কোনো ঝড় এলেও তুমি আমার বুক থেকে ছিটকে না যাও। আর কিচ্ছু চাই না আমার… শুধু তুমি আর আদনান আমার এই শূন্য খাঁচায় আজীবন থেকে যাও, পারবে না এইটুকু দিতে?
ও আর নিজেকে সামলাতে পারল না। আহিলের কপাল থেকে নিজের কপালটা সরিয়ে ও দুই হাতে আহিলের গলা জড়িয়ে ধরে ওর চওড়া বুকে মুখ লুকালো। এতক্ষণের চাপা কান্নাটা এবার বাঁধ ভাঙা বন্যার মতো বেরিয়ে এলো ওর।
আহিল একটু হেসে একটা গভীর তৃপ্তির শ্বাস ফেলে নওমিকে নিজের বাহুডোরে শক্ত করে বেঁধে নিল। এক হাত ওর পিঠে আর অন্য হাতটা নওমির রেশমি চুলে ডুবিয়ে দিয়ে ওকে নিজের বুকের সাথে আরও মিশিয়ে ধরল। তিনটে বছর এই বুকটা কতটা শূন্য ছিল, তা আজ নওমির এই কান্নামিশ্রিত আলিঙ্গনটার কারণেই সবচেয়ে ভালো টের পাচ্ছে। নওমি ওভাবেই উত্তর দিল অস্ফুট স্বরে,

– দিতে পারবো অবশ্যই পারবো!
আহিল হাসল, আলতো করে নওমির চুলের ভাঁজে চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল,
– কেঁদো না নওমি। তোমার এই কান্না যে আমার বুকটা ঝাঁ’ঝরা করে দেয়। আমি তো তোমাকে কাঁদতে দেখার জন্য এই কথাগুলো বলিনি।
নওমি আহিলের বুকেই মুখ গুঁজে রেখে ভাঙা গলায় বলল,
– আমি আর কোথাও যাব না আহিল। আর কখনো আপনাকে একা ফেলে যাব না। আপনি যেতে বললেও যাবো না! এইটুকু অধিকার আমি আপনাকে আজীবন দিয়ে রাখলাম।
নওমির মুখে এমন স্বীকারোক্তি শুনে মনপ্রাণ জুড়িয়ে গেল আহিলের। সে হাসলো শুধু কিছুই বললো না। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। নওমির কান্নার তোপ কমে আসলে আহিল ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,

– হয়েছে কাঁদা? এই বুকটা তো তোমারই নামে সিল মে’রে দেওয়া আছে।
নওমি কিছু বললো না। আহিল ওকে বুক থেকে তুলে কপালে উষ্ণ ভালোবাসার পরশ দিয়ে বললো,
– আহিল থাকতে নওমি আর আদনানের গায়ে একটা আঁ’চ’ড় লাগারও সুযোগ নেই। নিজের জা’নটার ক্ষ’তি আমি কীভাবে করব বলো? এই জা’নটা তো এখন আর শুধু আমার একার নয়, এটা তো অন্য কারও কাছে বন্ধক রাখা, তাই না?
নওমি লাজুক হেসে মাথা নুইয়ে ফেললো। আহিল ওর লাজে রক্তিম চেহারা দেখে হেসে ফেললো।
– খেয়েছো? সারাদিন তো কিছু খাও নি। চলো খেয়ে ঘুমাবে।
নওমি মাথা নেড়ে সায় দিল। পরক্ষণে আবার জিজ্ঞেস করলো,
– এবার তো বলুন! আদনানকে কোথায় পেয়েছেন? কি হয়েছিল ওর?
আচমকাই আহিলের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।
– সেটা কালকে জানাবো। এত কিছু এই ছোট মাথায় নেওয়ার কোনো দরকার নেই। চলো খেয়ে আসি।
নওমি আর কথা বাড়ালো না। আহিল যেহেতু আশ্বস্ত করেছে নিশ্চয় সেহেতু ও চুপ থাকায় শ্রেয় মনে করলো। ওরা খেতে গেল। খাওয়ার মাঝে আহিলের চাচী বললো,

– আমাদের সন্ধ্যায় বেরিয়ে যেতে দিলে ভালো হতো আপা। এই রাতে যেতে অনেক বেগ পোহাতে হবে।
– কেন চাচী? আজ কেন যাবেন?
– আমি থাকতে চেয়েছিলাম কিন্তু তোমার চাচার নাকি কি কাজ পড়েছে!
আহিল খেতে খেতেই বললো,
– আজকে থাকবেন চাচী। কেউ কোথাও যাবেন না। আগামীকাল কাজ আছে।
– কি কাজ?
সকলের কৌতুহলী দৃষ্টি আহিলের উপর। আহিল নির্বিকার জবাব দিল,
– সেটা কালকেই বলবো কিন্তু আপনারা আজ থাকছেন।
আহিলের কথা আর কেউ ফেললো না।

পরেরদিন সকালে,
ড্রইং রুমে সকলে জড়ো হয়ে আছে। সকলের চোখে মুখে কৌতূহল শুধুমাত্র দুজন মানুষ বাদে। এক আহিল যার মধ্যে ভাবসাব নির্বিকার অন্যদিকে আহিলের চাচা যার মতিগতি ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কিন্তু খুব অস্থির তিনি। বারবার এক কথায় আওড়াচ্ছেন,
– আহিল বাবা, সকাল তো হয়ে গেল। এবার আমাদের যেতে দাও। শহরের ওদিকের ব্যবসাটা তো আমাকেই দেখতে হয়, অনেক জরুরি কাজ আটকে আছে।
আহিল সোজা হয়ে বসে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো,
– ব্যবসার কাজ তো আজীবনই থাকবে মেজো চাচা। কিন্তু আজকের দিনটা একটু স্পেশাল। একটু পরেই আমাদের বাড়িতে কয়েকজন বিশেষ অতিথি আসছেন। ওনারা এলে সবার সামনে একটা জরুরি হিসেব-নিকেশ চুকানো হবে। তাই ভাবলাম, পরিবারের বড় সদস্য হিসেবে আপনার থাকাটা বড্ড প্রয়োজন।
– কি আছে আজকে? কিসের হিসেব নিকেশ?
আহিল এবার নিজের ফর্মে ফিরল। দুইহাত বুকে বেঁধে সরাসরি ওর মেজ চাচার চোখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে শান্ত কণ্ঠে বললো,

– কেন করলেন চাচা এমন? আপনার সাথে তো কোনোকালেই আমার শত্রুতা ছিলো বলে আমার মনে পরে না?
বাড়ির সবাই যেন আকাশ থেকে পড়লো। কিসের কথা বলছে? কিসের শত্রুতা! আহিলের মেজ চাচা উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
– কি বলছো কি হ্যাঁ? কিসের শত্রুতা? কি করেছি আমি?
– বুঝতে পারছেন না?
আহিলের নির্বিকার জবাবে এবার মুখ খুললো ওর মেজো চাচি।
– কি হয়েছে আহিল? কিসের কথা বলছো তুমি? পরিষ্কার করে বলো।
আহিল এবার বাড়ির সবাইকে এক পলক তাকালো। সবার চোখে মুখে উপচে পড়া বিস্ময়। সে অত্যন্ত শান্ত গলায় বললো,

– কাল থেকে তো সবাই আদনানের নিখোঁজ হওয়ার কথা জিজ্ঞেস করে করে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছো। তো শোনো কে করেছে এই কাজ!
আহিলের এই নাটকীয়তায় সবাই শোনার অপেক্ষা করছে।
– আদনানকে কিড’ন্যাপ করিয়েছে মেজ চাচা।
আহিলের এই একটা মাত্র বাক্যে পুরো ড্রয়িং রুমে নীরবতা নেমে এলো। সবাই একদম পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে রইল। কয়েক সেকেন্ড কারও মুখ থেকে একটা শব্দও বের হলো না।
নীরবতা ভেঙে মেজো চাচী প্রথম চিৎকার করে উঠলেন,
– এসব কী কথা বলছো তুমি আহিল? তোমার মেজো চাচা আদনানকে কিড’ন্যাপ করিয়েছে মানে? ওনার নিজের ভাইয়ের নাতি হয় ও! তোমার মাথা ঠিক আছে তো?
আহিল ঠান্ডা স্বরে বললো,
– আপন নাতি তো নয়?
এই কথা যেন বি’ষ ঢেলে দিল। আহিলের চাচী উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
– কি বলতে চাইছো তুমি? ওনি তোমাদের আপনের চেয়ে কম দেখেছে কখনো?
মেজো চাচা যেন সুযোগ পেয়ে মুখ খুলল,

– মি’থ্যে! সম্পূর্ণ বানো’য়াট কথা! নিজের আপন চাচার ওপর এমন নোংরা অপ’বাদ দিতে তোমার একটুও লজ্জা করল না আহিল? কী প্রমাণ আছে তোমার কাছে, হ্যাঁ? মুখ দিয়ে বললেই হলো?
আহিল সোফা ছেড়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। শার্টের কোণা টেনে ঠিক করতে করতে বললো,
– প্রমাণ ছাড়া ডক্টর আযলান কোনো প্রেসক্রিপশনও লেখে না, আর এটা তো আমার কলিজার টুকরোর জীবনের ব্যাপার!
আহিলের মা আহিলের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেন,
– কি বলছিস এসব আহিল? তোর মেজো চাচা কেন এমন করবে?
– মা প্লিজ! তোমরা জানো আমি কারণ আর প্রমাণ ছাড়া কিছু করি না বা বলি না।

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৬

ঘরের এক কোণে নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নওমি। কিছুই যে তার মাথায় ঢুকছে না। এতদিন সে ভেবেছে যে কল দিয়েছে সে আদনানকে নিয়েছে কিন্তু আহিল বলছে তার চাচা! তাহলে কি সেই লোক? হিসাব মিলছে না। তার চাচা কেন তাদের টার্গেট করবে! কিসের স্বার্থ? আগে তো ওর চাচা ওকে খুব স্নেহ করতো! এসব ভাবতে ভাবতে আহিল বললো,
– শান্ত হয়ে বসেন। আমি সব প্রমাণ একেক করে আপনাদের দেখাবো। আশা করছি প্রমাণ দেখে দ্বিমত করার কিছু থাকবে না। কিন্তু চাচার এই কাজের পেছনে কি কারণ সেটা না জেনে আমি আজকে ছাড়ছি না!

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here