নূর ই মহব্বত পর্ব ৩৬
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী
নওমি আয়নার সামনে দাঁড়ানো। পেছনে আহিল বিছানায় বসে আছে আর আদনান বিছানার উপর লাফাচ্ছে। আহিল কিছু নতুন সোয়েটার এনেছে তাদের তিনজনের জন্য একই রকম। নতুন জামা পেয়ে আদনান পড়ার পর থেকেই লাফাচ্ছে এদিকে নওমি এটা পড়ে মুখ কুঁচকে আয়নার দিকে চেয়ে আছে। পেছন ফিরে আহিলের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আমি এইটা পড়বো না।
– কেন এটা মানিয়েছে তো! শীতও মানবে সুন্দর ও লাগবে!
– কেমন ডিব্বার মতো লাগছে দেখেন!
“ডিব্বার মতো” শুনে আহিল হেসে ফেলল। আদনান চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললো,
– দিব্বা কি মা?
আহিল হেসে বললো,
– তোমার মা!
– মা দিব্বা?
নওমি নাক ফুলিয়ে বললো,
– আহিল!
– তুমিই তো বললে আমি তো বলিনি!
ইনোসেন্ট ভাব নিয়ে বলল আহিল।
– মা দিব্বা তো বিচকুটের বক্স!
হাসি চেপে রাখতে গিয়েও ছেলের কথায় হেসে ফেললো আহিল। মুহূর্তেই নওমির রাগ হলো। এই সোয়েটারটা পরাতে নাহয় ওর নিজেকে সত্যিই বেশ গোলগাল লাগছিল। কিন্তু তাই বলে বর আর ছেলে মিলে এভাবে খেপাবে? সে রাগ দেখিয়ে কোমড়ে হাত দিয়ে বললো,
– খুব হাসি পাচ্ছে তাই না? হাসুন হাসুন! ছেলের সামনে আমাকে এভাবে ইনসাল্ট করতে আপনার একটুও বাধল না? আমি এখনই এটা খুলে রেখে দিচ্ছি। আমি এই ডিব্বা মার্কা ড্রেস পরে কোথাও যাব না, ব্যস!
নওমি ওইটা টেনে খুলতেই আহিল দ্রুত খাট থেকে নেমে এসে ওর হাত চেপে ধরল।
– আরে রাগ করছ কেন? আদনান তো ছোট বাচ্চা, ও কি আর বুঝে বলেছে? আর সত্যি বলতে, সোয়েটারটা কিন্তু একদমই খারাপ লাগছে না গোলগাল কিউট ভালোই তো লাগছে।
– থাক, আর কিউট বলে সান্ত্বনা দিতে হবে না। আপনাদের বাপ বেটার চয়েস আপনারাই পরুন। আমি আমার সাধারণ সুতির চাদর গায়ে দিয়েই শীত ভালোই চলে যাবে , তাও এই সোয়েটার পড়ছি না আমি!
নওমি সোয়েটার ওর হাতে দিয়ে রুম থেকে চলে গেল। আহিলও জোর করলো না। মেয়েটার মেজাজ এখন খিটখিটে হয়ে থাকে। বেশ গরম আবহাওয়া! পরে একটু বুঝিয়ে বললেই হবে।
আহিল আদনানকে নিয়ে রুমেই ছিলো। বাচ্চাটা খেলতে খেলতে ঘুমিয়ে পড়েছে। একটু পর নওমি আসলো… আদনানকে ঘুম দেখে বেলকনির দিকে যেতে গেলেই পায়ের পাতায় একটা কা-মড় ধরা টান লাগল। অস্ফুট স্বরে “উহ” শব্দ করে উঠলো সে। সে পা দুটো সোজা করার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। মাঝেমধ্যে পায়ের পেশিতে হুট করে টা’ন লাগা বা ক্র্যা’ম্প হওয়াটা যে কতটা যন্ত্রণাদায়ক, তা ও প্রতিটা দিন টের পাচ্ছে। ব্যথার তীব্রতায় ওর চোখে পানি চলে এলো ওর। পাশের সোফায় ধীরে ধীরে বসলো। আহিল ততক্ষণে এগিয়ে আসলো ওর কাছে। তার অভিজ্ঞ মস্তিষ্ক বুঝে গেল কথায় সমস্যা হচ্ছে সে কিছু জিজ্ঞেস করে সময় নষ্ট করল না।
– লম্বা লম্বা শ্বাস নাও।
বলে ও পায়ে ম্যাসাজ করতে শুরু করলো। মৃদু ম্যাসাজ করার পর আস্তে আস্তে পায়ের ভেতরের সেই অবশ করা শক্ত টানটা হালকা হয়ে এল। ব্যথাটা কমে আসতেই নওমি সোফার পিঠের সাথে মাথা ঠেকিয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আহিল চিন্তিত গলায় বলল,
– দুপুরে ঠিকঠাক পানি খেয়েছিলে? ক্যালসিয়াম ট্যাবলেটটা নিয়েছিলে তো? এই সময়ে ডিহাইড্রেশন বা ক্যালসিয়ামের কমতি হলেই কিন্তু পেশিতে এভাবে টান ধরে!
নওমি কাঁচুমাচু মুখ করে চো’রের মতো চাইল। আসলে দুপুরে আদনানকে খাওয়াতে গিয়ে ও নিজের ট্যাবলেটের কথা একদম ভুলে গিয়েছিল। আহিল ওর মুখের এক্সপ্রেশন দেখেই উত্তরটা পেয়ে গেল। ও কপাল চাপড়ে বললো,
– নিজের প্রতি এই অবহেলাটা কবে কমবে বলো তো? আমার চেম্বারে এত বড় অলস পেশেন্ট আর একটাও নেই।
নওমি হাসলো। আহিলের কাঁধে মাথা রেখে ভাবলো কিছুক্ষণ ইদানিং কি যে হয় সারাক্ষণ কিসের যেন চিন্তা হয়। সন্ধ্যে নামলেই কেমন একটা অদ্ভুত একাকীত্ব আর অস্থিরতা দানা বাঁধে মনের ভেতর। কোনো কারণ ছাড়াই মন খারাপ হয়, আবার পরক্ষণেই মনে হয় সবকিছু ঠিক আছে। মাঝে মাঝে খুব ভয় হয়, বুক ধড়ফড় করে উঠে কিচ্ছু বুঝে উঠতে পারে না। আজব! এতটা নরম আহ্লাদি মেয়ে সে কোনকালেই ছিলো না! এখন অতিরিক্ত ভালোবাসায় আহ্লাদি হয়ে গিয়েছে তবে?
– আচ্ছা আহিল?
আহিল তখনো ওর পায়ে হালকা ম্যাসেজ করছিল। সে আনমনা উত্তর দিল,
– হু?
নওমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। এখনো ওর বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। ও আহিলের কাঁধে মাথাটা আরও একটু চেপে নিচু গলায় বলল,
– আচ্ছা… আমার যদি কোনোদিন কিছু হয়ে যায়? মানে ধরুন, যদি হুট করে আমি….
কথাটা শেষ করার আগেই আহিলের হাতের ম্যাসাজ থেমে গেল। মাথা হালকা ঘুরিয়ে তাকালো এতে নওমি মাথা তুলে নিলো আহিলের কাঁধ থেকে। আহিল কিঞ্চিৎ রাগ দেখিয়ে বললো,
– কী বলছ এসব তুমি নওমি? এসব আজেবাজে কথা মাথায় আসে কোত্থেকে তোমার? আর কখনো যেন তোমার মুখ থেকে এই ধরনের ফালতু কথা না শুনি!
নওমি কিছুটা ভরকে গেল। হুট করে আহিলের রাগ কিংবা ভয় পাওয়া আশা করে নি সে। মিনমিন গলায় আওড়ালো,
– না, আমি এমনি বলছিলাম। আজকাল কেমন যেন খুব ভয় লাগে আমার। মাঝরাতে বা সন্ধ্যায় হুট করে বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে। নিজেকে বড্ড দুর্বল মনে হয়। মনে হয়, যদি আমি শেষ পর্যন্ত সবটা সামলে উঠতে না পারি? যদি কোনো অঘটন ঘটে যায়?
আহিলের মনে ধাক্কা লাগলেও সে নওমির সামনে নরম হলো না বরং স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো,
– এই যে মনের ভেতর উল্টোপাল্টা চিন্তা আনছ, পানি কম খাচ্ছো, মেডিসিন মিস করছো এইসব কারণেই হরমোনাল ইমব্যালেন্স হচ্ছে আর বুক ধড়ফড় করছে। কোনো অঘটন ঘটবে না, কিচ্ছু হবে না তোমার।
নওমি শুনল কিন্তু মনকে বোঝাতে পারলো না। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য দৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। নিজের পেটের ওপর হাতটা রেখে বললো,
– আমার না খুব চিন্তা হয়! মাঝেমধ্যে ভাবি, যদি সত্যিই ডেলিভারির সময় আমার বড় কোনো ক্ষ-তি হয়ে যায়, তখন আমার আদনানের কী হবে আহিল? যে আসবে তার কি হবে? ও তো মায়ের আদর কেমন হয় তা কোনোদিন জানতেই পারবে না!
কথাগুলো বলতে বলতে নওমির গলাটা বুজে এল। ওর গাল বেয়ে টপটপ করে দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এই আশঙ্কাজনক চিন্তাটা ইদানীং ওকে ভেতরে ভেতরে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। প্রতিটা মা-ই হয়তো জীবনের এই সন্ধিক্ষণে এসে নিজের অজান্তেই এমন এক অদৃশ্য ম’রণ’ভয়ে ভোগে।
আহিল নিজেকে সর্বোচ্চ শক্ত রাখার চেষ্টা করে বললো,
– নওমি! নওমি এসব কেন চিন্তা করছো? ইনশাআল্লাহ্ এরকম কিছু হবে না! তুমি কি ভরসা হারিয়ে ফেলছ?
নওমি হেসে চোখের পানি মুছে মাথা নাড়ল সাথে বললো,
– না, ভরসা হারাইনি। কিন্তু মন তো কোনো নিয়ম মানে না। এইসব চিন্তায় ঘুরে মাথায়!
আহিল ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো,
– এত চিন্তা করতে কে বলেছে হু? তুমি চিন্তামুক্ত থাকো সব চিন্তা আমাকে দিয়ে!
আহিল ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,
– হসপিটালের ডিউটি কিংবা এই বাইরের দুনিয়ার কোনো চাপই কখনো আহিলকে কাবু করতে পারে না কিন্তু তোমার চোখের এই দু ফোঁটা পানি আমার পুরো বুকটা ওলটপালট করে দেয়। তোমার মনে যত ভয় আছে, যত আশঙ্কা আছে সব আজ থেকে আমার ডায়েরিতে ট্রান্সফার করে দাও। আজ থেকে তোমার সমস্ত চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট সব আমার হোক। বিনিময়ে তুমি শুধু শান্তিতে নিশ্বাস নাও, নিজের আর আমাদের এই পুচকুর খেয়াল রাখো।
নওমি আহিলের বুকে মুখ গুঁজে চুপ করে রইলো।আহিল নওমিকে নিজের বাহুবন্ধনে আরও একটু শক্ত করে চেপে ধরে ওর চুলে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল। তারপর ফিসফিস করে বললো,
– আদনান যেমন মা ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না, এই আহিলও কিন্তু তার নূরকে ছাড়া পুরোপুরি অপূর্ণ। তাই ওসব আজেবাজে চিন্তা একদম মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। আমরা চারজন মিলে খুব সুন্দর একটা সংসার সাজাব, ইনশাআল্লাহ্। এখন ভালো মেয়ের মতো চোখের পানিটা মুছে একটু হাসো তো দেখি?
নওমি মাথা তুলে ওর দিকে তাকিয়ে বললো,
– চারজন?
আহিল বুঝলো না। সে ভ্রু কুঁচকে বললো,
– হ্যাঁ চারজনই তো?
নওমি রহস্যময়ী হাসলো। পরক্ষণেই হাসি মিলিয়েও গেল। আহিল বুঝলো না বিষয়টা।
– কি হয়েছে?
– না আমার হিসাবে বোধহয় ভুল হয়েছে।
বলে মুখ গোমরা করে বসে রইলো। আহিল দোটানায় পড়লো হুটহাট কি যে হচ্ছে মেয়েটার।
হাসপাতালের করিডোরে পায়চারী করছে আহিল। একটু আগেই নওমিকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। বেশ যন্ত্রণা শুরু হয়েছিল নওমির। এই সময়ে লেবার পেইন ওঠা মানেই প্রিমেচিউর ডেলিভারি। একজন ডাক্তার হিসেবে আহিল খুব ভালো করেই জানে এর জটিলতা কতটা মারা’ত্মক হতে পারে। করিডোরের পায়চারী করতে করতে ও ঘামছে। একটু পর মহিলা ডক্টরটি বেরিয়ে এলে আহিল তড়িঘড়ি করে ছুটে গেল। আহিল কিছু বলার আগেই ডক্টর দ্রুত বললো,
– আহিল ইউ হ্যাভ টু বি স্ট্রং!
আহিল চমকে বললো,
– কি হয়েছে ডক্টর? কি বলছেন আপনি?
– মা নাহয় বাচ্চা যেকোনো একজনকে বেছে নিতে হবে আপনাকে! আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি ডক্টর আযলান! সময় বড্ড কম।
এই একটা বাক্য শোনার সাথে সাথে আহিলের পায়ের তলা থেকে যেন মাটিটা ধ’সে গেল! চারদিকের সবকিছু কেমন ওলটপালট হয়ে গেল ওর। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। মনটা চিৎকার করে বলছে, “আমার দুজনকেই চাই! কিভাবে থাকবো আমি ওদের ছাড়া! নওমিকে ছাড়া থাকতে পারবো না আমি কিন্তু নওমিকে চাইলে ও ফিরে আসার পর ওকে কি জবাব দিবো আমি? আমি… আমি দুজনকেই চাই!”
কিন্তু মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হলো না। মনে হচ্ছে সে হেলে পড়ে যাচ্ছে, সত্যিই কি মাটি ভেঙে সে তলিয়ে যাচ্ছে? গেলে বোধহয় ভালো হতো! বেঁচে যেতো সে! আবার কানে আসলো একই কণ্ঠস্বর,
– ডক্টর আযলান প্লিজ কো-অপারেট! আমাদের জানান আমরা কি করবো? তবে হ্যাঁ বাচ্চাকে বাঁচাতে গেলে কিন্তু দুজনেরই লাইফ রি’স্ক!
আহিল বহু কষ্টে উচ্চারণ করলো,
– নূর…আমার নওমিকে চাই! ওকে বাচাঁন!
ডক্টর মহিলাটি ভেতরে চলে গেলেন। আহিল যেন হিসেব কষছে! সে কি বড্ড স্বার্থপর হয়ে গেল না? একটু নাহয় স্বার্থপর হলো নিজের জন্য? নওমির ভালোবাসার ভাগীদার হতে গিয়ে, ওর হাতটা আজীবন ধরে রাখার লোভে সে কি নিজেরই রক্তের প্রতি অবিচার করে বসল? যে সন্তানকে দুনিয়ায় আনার জন্য এই ক’মাস ধরে এত আয়োজন, যাকে ছুঁয়ে দেখার লোভ একটু আগ অব্দিও ছিলো আজ এই মুহূর্তে সেই পুচকুর জীবনটা নিজ হাতে কে’ড়ে নিল সে? সে একটা ভালো বাবা হতে চেয়েছিল, অথচ উল্টো এক নি’ষ্ঠুর, খু_নি বাবা হয়ে গেল না তো?
আহিল দুহাতে নিজের মুখটা চেপে ধরে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে মাটিতে বসে রইলো। ওর অবচেতন মন ওকে অনবরত দং-শন করতে লাগল।
এভাবে আধা ঘণ্টা কেটে গেল বোধহয়। ডক্টর বেরিয়ে আসলেন। আহিল তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
– ন… নওমি…?
ডক্টর একটু চুপ থেকে সবার দিকে এক পলক তাকালেন। তারপর আহিলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
– উই আর এক্সট্রিমলি স্যরি! আমরা… আমরা কাউকেই বাঁ’চাতে পারলাম না!
কথাটা জীবন্ত একটা ব’জ্র’পাত হয়ে আহিলের উপর আছড়ে পড়লো। ওর পুরো পৃথিবীটা যেন এক ধাক্কায় অন্ধকার হয়ে গেল। ও চিৎকার করে কাঁদতে চাইল, কিন্তু বুকটা এক তীব্র, দমবন্ধ করা যন্ত্রণায় ভারী হয়ে নিঃশ্বাস আটকে আসতে লাগল।
– নওমি….
একটা আর্তনাদ করে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল আহিল। ওর পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে, বুকটা তীব্র বেগে ওঠানামা করছে। কপাল বেয়ে ঠাণ্ডা ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। আহিল দুহাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরে কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে বসে রইল তারপর ঝট করে আশেপাশে তাকাল। চোখে পড়লো নওমি নিশ্চিন্তে শান্তিতে ওর কোল ঘেঁষে ঘুমিয়ে আছে। সেই স্নিগ্ধ মুখটা দেখেই ওর সব চিন্তা উড়ে গেল। আহিল একটা দীর্ঘ স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে নওমির দিকে এগিয়ে গেল। ঘুমন্ত নওমিকে আলতো করে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল। ওর শরীরের সেই পরিচিত স্পর্শ আর শান্ত নিঃশ্বাসের শব্দ পেতেই আহিলের ভেতরের সেই ঝড়টা আস্তে আস্তে শান্ত হতে লাগল। ও নওমির পুরো মুখে চুমু খেয়ে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
– এই মেয়ে! তোমার চিন্তা আমায় দিতে বলেছি তাই বলে এইসব চিন্তা কেন আসবে! না এরকম কিছু হবে না! তোমার কিচ্ছু হবে না! আমাদের পুচকুও ভালো থাকবে।
বেশ কিছুক্ষণ এভাবে জড়িয়ে রাখার পর আলতো করে নওমিকে ছেড়ে বিছানা ছেড়ে নামলো আহিল। ঘড়িতে সময় দেখলো তিনটে বাজার পাঁচ মিনিট বাকি। পারফেক্ট টাইম! ও ওয়াশরুমে গিয়ে অজু করে নেয় দ্রুত। ফিরে এসে একবার আদনান আর নওমির দিকে তাকিয়ে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে যায় সে! তাহাজ্জুদের উপযুক্ত সময়ে সে মহান রবের কাছে দুয়ার ফুলঝুরি খুলে বসে। লম্বা লম্বা সেজদাহ দিয়ে নামাজের অন্তিম পর্যায়ে দুই হাত তুলে রবের কাছে মোনাজাত ধরে,
– ইয়া রব্বুল আলামিন, তুমি তো অন্তর্যামী। বান্দার মনের খবর তোমার চেয়ে ভালো আর কে জানে মাবুদ? একটু আগে যে ভয়ানক দৃশ্য তুমি আমায় দেখালে, তা যেন কেবলই একটা কাল্পনিক দুঃস্বপ্ন হয়েই রয়ে যায়। আমি তো বড্ড দুর্বল এক মানুষ আল্লাহ্! পরীক্ষা নেওয়ার জন্য আমার নূরের ওপর কোনো কঠিন ফয়সালা জারি কোরো না। ও বড্ড নরম মনের একটা মেয়ে, উপরন্তু এখন শরীরের এই অবস্থা। তুমি তো দয়াময়, তুমি তো রহমান! আমার নওমিকে তুমি সব রকমের বিপদ-আপদ আর জটিলতা থেকে মুক্ত রাখো।
বলতে বলতে ওর গলা বুজে আসছে। চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। সমস্ত গাম্ভীর্য এক পাশে সরিয়ে রেখে বড্ড অসহায় এক ভিখারির মতো দুই হাত পেতেছে ওর রবের দরবারে। ও আবার ভাঙা গলায় বলল,
– আল্লাহ্… খুব কষ্ট আর যন্ত্রণাদায়ক তিন তিনটে বছর পার করে এই সুখের মুখ দেখেছি আমরা। একে অপরের থেকে দূরে থাকা ওই দিনগুলোতে আমরা কতটা মরে মরে বেঁচে ছিলাম, তা তো তোমার অজানা নয় মাবুদ। দীর্ঘ তিন বছরের সেই বিরহ আর কষ্ট পার করে আজ যখন আমার এই ভাঙা বুকে আবার আমার সুখপাখিটা ফিরে এসেছে, আমার ভাঙা সংসারটা জোড়া লেগেছে তখন তুমি এভাবে আমার সুখ কেড়ে নিও না আল্লাহ্! আমার নূরকে আমার থেকে কেড়ে নিও না। আমার এই সামান্য সুখের ওপর তোমার রহমত দান করো মাবুদ।
বারবার বলতে বলতে থমকে যাচ্ছে সে। অঝোরে চোখ বেয়ে নোনা জল গড়াচ্ছে। এই আহিলকে বোধহয় তার রব ছাড়া কেউ কোনোদিন দেখেনি! এতটা নরম, এতটা দুর্বল!
নূর ই মহব্বত পর্ব ৩৫
– যে নতুন প্রাণকে তুমি আমাদের জীবনে পাঠাচ্ছো, তাকে সুস্থ সবলভাবে এই পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার তৌফিক দাও। আমার নওমি আর সন্তানের জীবনকে তুমি দীর্ঘায়ু করো। ওদের কোনো ক্ষ-তি আমি সইতে পারব না আল্লাহ্, আমার এই সাজানো সংসারটা আবার ভেঙে চুরমার হয়ে গেলে এই আহিল যে পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে। আমার আদনানকে মায়ের আদর ভালবাসা থেকে বঞ্চিত করো না দয়াময়! আমাকে আর নওমিকে… আমাদের চক্ষুশীতলকারী সন্তান দান করো! আমার সব চিন্তা, সব ভয় আজ তোমার কাছে সঁপে দিলাম। তুমি আমাদের ওপর তোমার খাস রহমতের চাদর বিছিয়ে দাও। আমীন, ইয়া রাব্বুল আলামীন।
দীর্ঘ মোনাজাত শেষে আহিল দুই হাতে মুখ মুছে এক দীর্ঘ তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এতক্ষণের ভয় আর অস্থিরতাটা যেন জায়নামাজের ওপর চোখের পানির সাথে মিশে এক নিমেষে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল।
