Home নেশাক্ত প্রহর (মিহি সিজন ২) নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩৬

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩৬

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩৬
রূপন্তী সরকার

ঋষভ ইয়াশফার একদম কাছাকাছি চলে এল। ও আলতো করে মাথা নিচু করে ইয়াশফার নাকের সাথে নিজের নাক ঘষল। হুট করে এই ছোঁয়ায় ইয়াশফার মনের ভেতর কেমন যেন একটা অদ্ভুত আর অস্বস্তিকর অনুভূতি হলো। ও আর ওভাবে ঋষভের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ও নিজের দুই হাত দিয়ে ঋষভকে আলতো ধাক্কা মেরে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিল, তারপর ঝটপট খাট থেকে নেমে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। ঋষভ এক মুহূর্তের জন্য বিছানায় বসে থমকে রইল। ও একদমই বুঝতে পারল না ইয়াশফা হুট করে এভাবে ওকে ফেলে কেন চলে গেল।
ইয়াশফা ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে ডাইনিং রুমের দিকে গেল। নিচে তখন রাতের খাবারের সময় হয়ে গেছে এবং সবাই টেবিলে খেতে বসেছে। ইয়াশফাকে আসতে দেখেই মিহি হেসে বলল, “এইতো, চলে এসেছে ইয়াশফা। আমি তো এখনই তোমাকে ওপরে ডাকতে যাচ্ছিলাম। আসো, এখানে এসে খেতে বোসো। আর ঋশ কই?”

ইয়াশফা একদম আস্তে সুরে জবাব দিল, “ওপরে আছে।”
কথাটা বলেই ও নিজের চেয়ারটায় গিয়ে বসল প্লেটে খাবার নিয়ে চুপচাপ খাওয়া শুরু করল। ও যখন খাচ্ছিল, ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো ঋষভ। ওর মুখটা গম্ভীর। ও ডাইনিং টেবিলে এসে আর কোথাও না তাকিয়ে সোজা ইয়াশফার একদম পাশের চেয়ারটায় এসে বসল। চেয়ারে বসামাত্রই ও টেবিলের বাকি সবার দিকে না তাকিয়ে ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল, “চলে এসেছো কেন আমাকে ওভাবে রেখে?”
ঋষভের মুখ থেকে সবার সামনে এমন একটা কথা শোনা মাত্রই ডাইনিং টেবিলের সবাই একদম স্তব্ধ হয়ে গেল! চামচ হাতে সবার হাত থমকে রইল। কেউ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না, এই কথাটা কি ঋষভ বললো? সিরিয়াসলি? সবাই ভুল শুনছে না তো?
ইয়াশফা কিন্তু ওর কথার কোনো জবাব দিল না। ও নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ খেয়ে যেতে লাগল। এই খ্যাপাটে লোকের সাথে এখন ওর বিন্দুমাত্র কথা বলার ইচ্ছে নেই। ও একদম নিশ্চুপ রইল। ঋষভ বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরও যখন কোনো উত্তর পেল না, তখন ওর মেজাজটা আবার চড়ে গেল। ও ইয়াশফার দিকে আরেকটু ঝুঁকে এসে ভারী গলায় বলল, “ইয়াশ, আমি কিন্তু তোকে কিছু একটা জিজ্ঞেস করেছি?”

ইয়াশফা তবুও মুখ খুলল না। ও একদম নির্বিকার হয়ে নিজের খাওয়া চালিয়ে যেতে লাগল। ডাইনিং টেবিলের সবাই এখন নিজেদের খাওয়া-দাওয়া একদম বাদ দিয়ে পুরো মনোযোগ দিয়ে এই দুইজনের তামাশা দেখছে। রিদ নিজের প্লেটে হাত রেখে একদম চুপচাপ বসে আছে। ও আজকে মাঝখান থেকে কোনো কথা বলবে না, শুধু তামা দেখবে। তবে ও মনে মনে বেশ মজা পাচ্ছে। তিথি আর জ্যোতিরা তো মিটিমিটি হাসা শুরু করে দিয়েছে। ইয়াশফাকে এমন কড়া ভাব ধরে থাকতে দেখে ঋষভ নিজের দাঁত কিড়মিড় করে উঠল। ও আর নিজের রাগ চেপে রাখতে না পেরে টেবিলে হালকা চাপ দিয়ে ইয়াশফাকে শুনিয়ে বলল, “আমাকে রাগিয়ে দিস না ইয়াশ, মেরে ফেলবো কিন্তু”
ইয়াশফা নিজের জায়গায় একদম অটল রইল, ও যেন কিছুই শুনতে পায়নি। রিদ এবার আর থাকতে না পেরে নিজের চেয়ারে হেলান দিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, কি সমস্যা তোমাদের? এমন করছ কেন তোমরা দুজন? এ্যাই এটম বোম কাহিনী কী শুনি একটু?”
ঋষভ এবার ইয়াশফার উত্তরের অপেক্ষা করার প্রয়োজন মনে করল না। ও নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর ডাইনিং টেবিলের সবার সামনে, ইয়াশফাকে এক ঝটকায় পাঁজাকোলা করে নিজের কোলের ওপর তুলে নিল!হুট করে সবার সামনে ওভাবে কোলে তুলে নিতেই ইয়াশফা লজ্জায় একদম লাল হয়ে গেল, ও হাত-পা ছোঁড়ার চেষ্টা করতেই ঋষভ ওকে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। ও ইয়াশফাকে কোলে নিয়েই সিঁড়ির দিকে হনহন করে পা বাড়াল এবং গম্ভীর গলায় বলল, ” থাপ্পড় দিয়ে তোর দাঁত ফেলে দিবো ইডিয়ট, ত্যাড়ামি করিস আমার সাথে?”

সিঁড়ি বেয়ে ওপরে যেতে যেতে ও ঘাড় ঘুরিয়ে নিচে ডাইনিং টেবিলের দিকে তাকিয়ে মিহিকে উদ্দেশ্য করে কড়া গলায় হাঁক ছেড়ে বলল, “মাম্মা, আমাদের খাবারটা একটু ওপরে রুমে পাঠিয়ে দাও!”
কথাটা বলেই ও ইয়াশফাকে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। আর নিচে ডাইনিং টেবিলে রিদ, মুগ্ধ আর জ্যোতিরা ওদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো, ঋষভ মনে হয় সত্যিই এখন ইয়াশফাকে মেনে নিয়েছে,ছেলেটা বেয়াদব, স্বীকার করে না
ঋষভ ইয়াশফাকে কোলে করে নিজের ঘরে নিয়ে এসে এক হাত দিয়ে দরজাটা আটকে দিল। তারপর ও এগিয়ে গিয়ে ইয়াশফাকে বিছানার ওপর বসিয়ে দিল। ইয়াশফা এতটুকু নড়াচড়া করল না, একদম চুপচাপ নিজের জায়গায় বসে রইল। ঋষভ কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বিছানা থেকে নেমে নিচে মেঝেতে ইয়াশফার পায়ের কাছে বসে গেল। ও নিজের লম্বা হাত দুটো দিয়ে ইয়াশফার দুটো হাত আলতো করে নিজের মুঠোয় নিল। ওর চোখ দুটো তখন কেমন যেন নরম হয়ে এসেছে। ও ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “আমি আর কখনো তোকে আঘাত করবো না ইয়াশ।”

ইয়াশফা তবুও কোনো কথা বলল না, ও নিজের মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে একদম চুপ করেই রইল। ঋষভ ওর এই নীরবতা সহ্য করতে পারছে না। ওর বুকের ভেতরটা কেমন যেন খচখচ করে উঠল। ও ইয়াশফার হাত দুটো আরেকটু শক্ত করে ধরে আকুল হয়ে বলল, “আমার সাথে কথা বল প্লিজ? তুই যা বলবি আমি তাই শুনবো, প্রমিজ। প্লিজ কথা বল? একটু কথা বল আমার সাথে?”
ইয়াশফা এবার নিজের মুখটা ঘোরাল। ওর চোখ দুটো এতক্ষণে রাগে আর অভিমানে ছলছল করে উঠেছে। ও ঋষভের চোখের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল,
“কেনো কথা বলবো আপনার সাথে? আমি গরিব ঘরের মেয়ে বলে আমাকে যখন তখন মারধর করবেন? আমার কেউ নেই বলে আমাকে এভাবে মারধর করবেন আপনি?”

ঋষভ ইয়াশফার মুখে এই কথাটা শোনা মাত্রই একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। ও নিজের জায়গায় যেন পাথরের মতো জমে গেল। ও স্বপ্নেও ভাবেনি যে ইয়াশফা নিজের মনের ভেতর এত বড় একটা ক্ষোভ আর কষ্ট চেপে রেখেছে। ও নিজেকে আর সামলাতে পারল না। ও মেঝে থেকে উঠে ঝট করে বিছানায় বসে ইয়াশফাকে এক টানে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিল। ও ইয়াশফার গলায় নিজের মুখ গুঁজে দিয়ে বড্ড কাতর গলায় বলল, “আই অ্যাম সরি সাকুরা আমি আসলেই খুব বড় ভুল করে ফেলেছি। আমি আর কখনো তোমাকে মারবো না, একটুও আঘাত করবো না মনে। প্লিজ আমার সাথে কথা বলো।”
ইয়াশফা ঋষভের বুকের ভেতর ওভাবেই মুখ গুঁজে থেকে একটু খোঁচা দিয়ে বলল, “কেনো? আমি কথা বলার সাথে আপনার কী সাথ, হ্যাঁ? আমাকে তো আপনি নিজের মুখেই বউ বলে মানেন না! তাহলে এখন এত পিরিত দেখানোর তো কোনো প্রয়োজন নেই আপনার!”

ঋষভের মুখের সেই নরম ভাবটা ইয়াশফার মুখে ‘বউ মানি না’র খোঁটা শুনতেই বদলে গেল। ও নিজের সেই পুরোনো গম্ভীর মুখোশটা মুখে টেনে এনে ইয়াশফাকে একটু আলগা করে বলল, “হ্যাঁ, বউ তো মানিই না তোমাকে। আর পিরিত কোথায় দেখাচ্ছি আমি?”
ইয়াশফা নিজের গাল দুটো ফুলিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল, “কেনো? এই যে সবার সামনে কোলে তুলে নিয়ে আসলেন, এখন আবার হাত ধরে বসে আছেন, এটাকে পিরিত বলে না?”
ঋষভ নিজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি লুকিয়ে রেখে বলল, “নাহ তো, একে তো পিরিত বলে না!

ইয়াশফা নিজের বড় বড় চোখ দুটো সরু করে এক পলক ওর দিকে তাকালো তারপর কোনো কিছু না ভেবেই চট করে এক ঝটকায় নিজের মুখটা বাড়িয়ে সোজাসুজি কামড় বসিয়ে দিল ঋষভের খাড়া নাকের ডগায়!
ব্যাস, খেল খতম আর পয়সা হজম! ইয়াশফার এই আচমকা কামড় খাওয়া মাত্রই ঋষভের ভেতরের সেই গম্ভীর মুখোশটা গলে জল হয়ে গেল। ওর বুকের ভেতরের সবটুকু সুপ্ত অবাধ্যতা আর তীব্র ভালোবাসা এক পলকে চাড়া দিয়ে উঠল। ও নিজের লম্বা, বলিষ্ঠ হাত দুটো বাড়িয়ে এক হ্যাঁচকা টানে ইয়াশফাকে নিজের শরীরের সাথে একদম মিশিয়ে ওকে খুব কাছে টেনে আনল।

ঋষভ আর এক সেকেন্ডও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারল না। ও নিজের হাত বাড়িয়ে চট করেই ইয়াশফার পরনের ঢিলেঢালা গেঞ্জিটা গা থেকে খুলে দূরে ছুঁড়ে ফেলল। তারপর ও নিজের মুখটা নামিয়ে পরম আবেশে আর তীব্র ভালোবাসায় মুখ গুঁজে দিল ইয়াশফার উন্মুক্ত বুকের মাঝে। ও একনাগাড়ে ইয়াশফার বুকে নিজের নাক আর ঠোঁট ঘষতে লাগল, নিজের নিশ্বাসের সবটুকু উষ্ণতা ও ওখানেই ঢেলে দিতে চাইল।
হুট করে ঋষভের এই তীব্র আর উন্মাদনাময় ভালোবাসার ঝড়ে ইয়াশফা স্তব্ধ হয়ে গেল। ও নিজের হাত দিয়ে ওকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে চাইল, কিন্তু পারল না। ওর পুরো শরীরটা এক অজানা আবেশে আর তীব্র ছোঁয়ায় মুহূর্তের মধ্যে একদম অবশ হয়ে এলো, ওর হাত-পা নাড়ানোর ক্ষমতাটুকুও যেন এক পলকে হারিয়ে গেল। ও নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বুজে ফেলে শুধু ঋষভের এই অবাধ্য পাগলামি নিজের মনের গভীর থেকে অনুভব করতে লাগল। ঋষভ ইয়াশফার বুকের উপর থেকে মাথা উঠিয়ে ওর অধরের দিকে তাকালে ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তারপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ইয়াশফার অধরে নিজের অধর মিলিয়ে দিলো। ক্রমাগত নিজের গতি বাড়াতে লাগলো ইয়াশফার মস্তিষ্ক ঋষভকে সরাতে চাইছে কিন্তু শরীর-শাই দিচ্ছে না। দুই হাত দিন ঋষভ এর পিঠ খামচে ধরলো। এটাই যেন ইয়াশফার কাল হয়ে দাঁড়ালো ঋষভ নিজের উন্মাদনা বাড়াতে লাগলো। ইয়াশফার পুরো শরীরে নিজের হাতের ছোয়া ভরিয়ে দিতে লাগলো। আস্তে আস্তে পুরো ঘর জুড়ে দুজন নর-নারী ভারী নিঃশ্বাস ছড়িয়ে পড়লো। কোন কিছুর হুঁশ নেই তাদের দুজন নিজেদের উন্মাদনায় মত্ত। তাদের হালাল সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে।

পরদিন সকালবেলা। বাইরে তখন অবিরাম ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো জানালার কাচে ধাক্কা খেয়ে একটা চেনা সুর তৈরি করছে। ইয়াশফা পিটপিট করে চোখ খুলে দেখল ঋষভ ওর বুকের মাঝে মুখ গুঁজে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। ঘুমের ঘোরেই ও ইয়াশফাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে খুব নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলছে, “আমাকে ছেড়ে যাস না ইয়াশ…”
ইয়াশফা নিজের ঠোঁটের কোণে একটা চিলতে মুচকি হাসি ফুটিয়ে তুলল। ও নিজের দুটো হাত বাড়িয়ে ঋষভকে আরও নিবিড়ভাবে বুকে জড়িয়ে ধরল।
ঠিক তখনই হঠাৎ ইয়াশফার ধ্যান ভাঙল। চারপাশের বৃষ্টির ঝমঝম শব্দটা যেন এক ধাক্কায় ওকে বাস্তবে আছাড় মারল। ও ধড়ফড় করে উঠে বসে আশেপাশে তাকাল। বিছানার কোথাও তো ওর স্বামী নামক মানুষটার কোনো অস্তিত্ব নেই!
কোথায় ঋষভ? এই ঘরে এই বাড়িতে তো কোনো ঋষভ নামক ব্যক্তির অস্তিত্ব নেই। তাহলে ও এতোক্ষণ কাকে নিয়ে খেয়াল দেখলো?
বিছানার এক পাশে শুয়ে আছে ইয়াশফার আড়াই বছরের বাচ্চা। পুরো ঘর জুড়ে থমথম করছে একরাশ নিঝুম নীরবতা। ইয়াশফা নিজের গাল দুটো হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল, জায়গাটা চোখের পানিতে ভিজে একদম একাকার হয়ে আছে। এতক্ষণ যা কিছু দেখছিল, যা কিছু ভাবছিল তা আসলে কোনো বর্তমানে ছিল না? ওইগুলো ছিল ওর অতীত? হ্যাঁ অতীত ই ছিলো, তার স্বামী তো তাকে ছেড়ে চলে গেছে বহুদিন আগে, প্রায় ৩ বছর হয়ে যাচ্ছে,

ইয়াশফার চোখ গেল ওর নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে রাখা একটা পুরোনো, ভাঁজ করা চিঠির দিকে। ও কাঁপতে কাঁপতে চিঠির পাতাটা মেলল। তিন বছর আগের সেই অভিশপ্ত ভোরের চেনা হাতের অক্ষরে সেখানে লেখা রয়েছে
প্রিয় ঋশের সাকুরা,
প্রথমেই বলে রাখি আমি কিন্তু তোমাকে আমার বউ বলে মানি না। আর যদি বলো তোমাকে ছুঁয়েছি কেন। সারাজীবন তোমার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিতে পারব না জেনেও, নিজের সমস্ত সীমাবদ্ধতা আর পরিণতির কথা জেনেও তোমার এতটা কাছে চলে এসেছিলাম। তোমার হৃদয়কে, তোমার অনুভূতিগুলোকে, তোমার নিস্পাপ জীবনের একটা অংশকে গভীরভাবে ছুঁয়ে দিয়েছি।
যদি কোনোদিন আমার স্মৃতি তোমাকে কষ্ট দেয়, যদি আমার রেখে যাওয়া অনুভূতিগুলো তোমার চোখ ভিজিয়ে দেয়, তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিও, সাকুরা।

বিশ্বাস করো, তোমাকে আঘাত দেওয়ার ইচ্ছে আমার কখনো ছিল না। আমি শুধু নিজের অজান্তেই তোমাকে এতটা ভালোবেসে ফেলেছিলাম যে দূরে থাকার শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলেছিলাম। নিজেকে সামলাতে পারি নি, তোমার বুকে মাথা রাখলে আমার অনেক শান্তি লাগে ইয়াশ,
আজ আমি তোমাকে না জানিয়েই এই বাড়ি ছেড়ে এমন কি সব কিছু ছেড়ে চলে যাচ্ছি। কেন যাচ্ছি, কোথায় যাচ্ছি
সেটা এই মুহূর্তে কাউকে বুঝিয়ে বলার মতো কোনো ভাষা আমার জানা নেই। তবে হ্যাঁ, একটা জরুরি কাজে যাচ্ছি, কিছু পাপ এবং পাপির বিনাশ করতে যাচ্ছি। কবে ফিরবো আমি জানি না, কিংবা আদৌ কোনোদিন তোমার খারাপ বর তোমার কাছে ফিরে আসতে পারবে কি না সেটাও জানি না।

হয়তো এটাই তোমার সাথে আমার শেষ দেখা, আমার তোমাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না ইয়াশ, তুমি আমার ছোট্ট মুরগির বাচ্চার মতো বউ, আমার ক্ষমতা থাকলে আমি এই সময়টাকে সারা জীবনের জন্য থামিয়ে দিতাম পাখি, আর মন ভরে দেখতাম তোমার ঘুমন্ত নিষ্পাপ চেহারাটা, যখন তুমি এই চিঠিটা পড়বা, তখন আমি হয়তো এই দেশের সীমানা বা এই পৃথিবী ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছি। আজকে তোমাকে আমি অনেকগুলো নামে সম্মোধন করেছি কিন্তু কেনো করেছি জানিনা। আমার দেওয়া এই নাম গুলো শুধু তোমার জন্য বউ। এই নামগুলোতে তোমাকে যেনো কেউ না ডাকে। আর আমি যদি কখনো বেঁচে ফিরি, তখন হয়তো তুমি অনেকটা বড়ো হয়ে যাবে, জানো ইয়াশ তোমার মতো বাচ্চার সাথে যখন আমার বিয়ে হলো তখন আমিও ভেবেছিলাম পাপার মতো আমিও তোমাকে নিজ হাতে বড় করবো, কিন্তু তা আর সম্ভব হলো না। আমার জন্য কখনো অপেক্ষা করো না সাকুরা, আমি নিজেও জানিনা আমি ফিরবো কিনা। হয়তো সত্যিই আর কখনো ফিরবো না। তুমি মানুষের মতো মানুষ হও, অন্যায়ের সাথে কখনো আপোষ করবে না ইয়াশ, যদি কখনো ন্যায় বিচারের জন্য অন্যায় করতে হয় তাহলে তুমি সেই অন্যায় করবে। মনে রাখবে কারো বিচার কেউ করতে পারে না, তাই নিজের বিচারক নিজেকেই হতে হবে”

ইতি: ঋশ
ইয়াশফা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। নিজের ভেতর জমে থাকা সবটুকু কষ্ট আর জেদ যেন এক নিমেষে ওর চোখের কোণায় এসে জমা হলো। ওর জীবনে কখনো ঋষভ নামের এমন কোনো নিষ্ঠুর লোকের অস্তিত্ব ছিল না। আর কোনোকালে যদি থেকে ও থাকে, তবে আজ সে এই মানুষটাকে মন থেকে চরম ঘৃণা করে। এই লোকটাকে ও কোনোদিনও আর নিজের স্বামী বলে মনে করবে না। বর্তমানে ইয়াশফার বয়স এখন সতেরো বছর। আর কিছু মাস পরেই ও আঠারো বছরে পা দেবে। মাত্র পনেরো বছর বয়সে সে মা হয়েছে। এই তিনটা বছর ওর কঠিন লড়াইয়ের দিনে রিদ, মিহি সহ পরিবারের সবাই ওর পাশে ছায়ার মতো ছিল। অথচ তখন তার সব থেকে প্রয়োজন ছিল ওই মানুষটাকে, আর তখনই সে তাকে ফেলে চলে গেল! ঠিক তখনই বিছানার দিক থেকে একটা তীব্র কান্নার আওয়াজ পেয়ে ইয়াশফার স্মৃতির ঘোর একদম কেটে গেল। ওর ছেলে যার নাম ইয়ান ঋয়াশ চৌধুরী, সে আচমকা ঘুমের ঘোরে কেঁদে উঠেছে। ইয়াশফা আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল ছেলের কাছে। আড়াই বছরের পুচকে ইয়ান একদম হাউমাউ করে চোখ-মুখ লাল করে কাঁদছে। ইয়াশফা ওকে কোলে তুলে নিয়ে পিঠ চাপড়ে দিল, কপালে চুমু খেল, মুখে আধো আধো কথা বলে ভোলানোর চেষ্টা করল, কিন্তু বাচ্চাটাকে কিছুতেই থামাতে পারছে না। ঘরের দরজা খোলা থাকায় এই বিকট কান্নার শব্দ শুনে নিচে থেকে ছুটে এলেন মিহি। মিহিও অনেকক্ষণ কান্না থামানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু ইয়ানের কান্না কিছুতেই থামে না। কান্নার শব্দ পেয়ে ড্রয়িংরুম থেকে ছুটে এলো রিদ।

রিদ এসেই কোলে নিলো ইয়ানকে। ওর নিজের বুকটাও মোচড় দিয়ে উঠল। রিদ ওর গালে মুখ ঘষে দিয়ে বড্ড আকুল হয়ে বললেন, “কী হয়েছে দাদুভাই, কান্না করবেন না প্লিজ। এখনি ডক্টরের কাছে নিয়ে যাবো।”
ওরা আর দেরি না করে রওনা হলো ড. রোহান ইউভানের পার্সোনাল চেম্বারের উদ্দেশ্যে। চেম্বারে পৌঁছানো মাত্রই রিদ একদম হন্তদন্ত হয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। ওর কোলে ইয়ান তখনো অনবরত কেঁদে যাচ্ছে। রিদ কোনো প্রোটোকল না মেনে সোজা টেবিলের ওপাশে বসা ইউভানের কাছে গিয়ে ইয়ানকে ওনার কাছে দিলো। আর ইউভান ইয়ানকে কোলে নিতেই ও এক পলকে একদম চুপ হয়ে গেল, কান্না থামিয়ে দিল! ইউভান নিজের ঠোঁটের কোণে এক মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে ইয়ানের পেটে আলতো করে একটা কাতুকুতু দিল। তারপর সোজা ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ফানি করে বলে উঠল ”
বাবা ট্যাও আগে বললেই হতো বাপের কোলে উঠবি, এতো কান্না করার কি আছে?”
ইউভানের মুখ থেকে নিজের ছেলের জন্য এই ‘বাপ’ শব্দটা শোনা মাত্রই ইয়াশফা আর নিজের ভেতরের রাগটা একদম ধরে রাখতে পারল না। ও নিজের চোখ দুটো বড় বড় করে খেপে গিয়ে চড়া সুরে বলে উঠল, “এই বাপ বাপ করাটা এবার বন্ধ করুন! কিসের বাপ আপনি ওর? ওর নিজের বাপের খোঁজ নাই, আরেকজন এসে বাপ বাপ মারায়!”

ইউভান ইয়াশফার এই চড়া গলার ধমক আর রাগ দেখে একটুও বিরক্ত হলো না, ওনার একগাল দাঁত কেলানো হাসিটা আরও চওড়া হয়ে গেল। ও নিজের একটা আঙুল বাড়িয়ে ইয়াশফার ওই খাড়া নাকের ডগায় আলতো করে একটা টোকা দিল। তারপর একদম সহজ সুরে বলল, “এই পিচ্চি চুপ, ও আমার ছেলে তোমার কি?”
ইউভানের হাতের এই আচমকা ছোঁয়ায় ইয়াশফা দূরে সরে গেল। ও ইউভানের জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে বলল, “ডোন্ট টাচ মি, জানে মেরে দিবো!”
ইউভান এবার নিজের দুই হাত নাড়িয়ে, মুখটা একদম বাচ্চাদের মতো ভয় পাওয়ার ভান করে দাঁত কেলিয়ে ঠাট্টা করে বলল, “ভয় পেয়েছি!”

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩৫

ইউভানের তামাশা দেখে ইয়াশফার রাগ আরও চড়ে গেল। ও আর কোনো কথা না বাড়িয়ে এক পা এগিয়ে এসে ইউভানের কোল থেকে জোর করে ইয়ানকে নিজের বুকে নিয়ে নিলো। কিন্তু ও ইউভানের কোল থেকে ইয়ানকে আলাদা করতেই ইয়ান আবারও নিজের মুখটা হা করে আগের মতোই চিৎকার করে কেঁদে উঠল! ইউভান নিজের খালি হয়ে যাওয়া হাত দুটো পকেটে গুঁজে দিয়ে, ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে একটু বাঁকা হেসে মাথা নেড়ে বলল, “বাপের থেকে ট্যাওকে আলাদা করছ সিস্টার, কাজটা কিন্তু তুমি মোটেও ঠিক করলা না”

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here