নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ৭
ইলোরা ফারদিন
জসীম মাস্টার বাসাটা মেরামত করার পাশাপাশি নিজ দায়িত্ব রঙও করে দিয়েছেন। অবশ্য এটাই নিয়ম যে নতুন ভাড়াটিয়া উঠানোর আগে বাসা নিজ দায়িত্বে বাড়ির মালিক মেরামত করে দেন।
সেদিন বাসাটাকে বসবাসের অযোগ্য মনে হলেও আজ বাসাটাকে অত্যন্ত সুন্দর একটি বাসা মনে হচ্ছে। দুটো ছোট শোবার ঘর। মাঝে একটি বৈঠক ঘর তার পাশে একটি সুন্দর বারান্দা। ছোট্ট একটি উঠান। উঠানের এক কোণায় ছোট্ট একটি রান্না ঘর। আরেক কোণায় শৌচাগার আর গোসলখানা। এক কথায় তাদের মতো ছোট পরিবারের জন্য একদম পারফেক্ট একটি বাসা।
চিন্তিত ভঙিতে বারান্দায় বসে আছে হাসান। নোলক স্বামীকে এ অবস্থায় দেখে তার কাছে যেয়ে বসে স্বামীর চিন্তার কারণ জিজ্ঞেস করে। হাসানও স্ত্রীকে নত মুখে বলে,” হাতে টাকা নেই নোলক, ঘরের ছোট খাটো জিনিসপত্র কি করে কিনব। তার উপরে আবার মিনুর বিয়ের জন্য লোন করেছিলাম। সব টাকা ফেরত দিয়ে দিলেও, ৫০ হাজারের মতো তো আগেই খরচ হয়ে গিয়েছে। ওই দেনাও এখনো মাথায়।”
নোলক কিছু না বলে ঘরে গেল। তারপর হাতে করে তার সোনার একজোড়া ঝুমকা নিয়ে হাসানের কাছে এলো, তারপর বলল,” এগুলো বেচে দেও। এখন সোনের ভরির দাম বেড়েছে। অনায়াসে দেড় লাখের উপরে পাবে। ”
হাসান স্ত্রীর দিকে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকাল। এই সময়ে এই সাহায্যটুকু অনেক তার জন্য।
সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না, কেটে গিয়েছে প্রায় একটি বছর।
নোলক নোলকের নতুন সংসারে বেজায় খুশি। একটু একটু করে ঘরের প্রতিটি জিনিস কিনেছে সে। নিজের হাতে তার ছোট্ট সংসারটি সাজিয়েছে। নিজেও এখন কেটারিং সার্ভিস এর ব্যবসা করে। হাসানের স্কুলের কেটারিং এর দায়িত্ব এখন নোলকের আশার আলো কেটারিং সার্ভিসের। এছাড়াও এলাকার বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিসের কেটারিং সার্ভিসের কাজ সে নিয়েছে। মাস শেষে মোটা অংকের টাকা আসে তার হাতে। এক কথায় সুখী সংসার তার।
নিজের বারান্দায় গতমাসে একটি দোলনা বসিয়েছে নোলক। ইদানীং বৃষ্টি হলে এখানে বসেই চা খায় আর বৃষ্টি অনুভব করে। মুখে এসেছে তার নতুন লাবন্য। হাসান তো বলেই নোলকের বয়স নাকি দশ বছর কমে গিয়েছেম। নোলকে হাসানের কথা শুনে, আর মিটিমিটি আসে।
আসলে সৌন্দর্যটা হলো নিজের মনের উপর। মন পরিষ্কার থাকলে, মনটা শান্তিতে থাকলে, মনটা সুখে থাকলে, চেহারায় সৌন্দর্য এমনিতেই ফুটে উঠে।
আজও আকাশটা মেঘলা। তাই নোলক আগে বাগে সব কাজ সেরে ফেলেছে। বাচ্চারাও ঘুমিয়ে গেছে। একটু পর হাসানও চলে আসবে। তাই তাড়াতাড়ি নোলক একটু পাকোড়া ভেজে নিল, আর দুই কাপ ঘন দুধ চা। এরকম মেঘলা দিনে স্বামীর সাথে বসে চা পাকোড়া খাওয়ার শান্তিটাই আলাদা।
নোলক পাকোড়া ভাজতে ভাজতেই দরজা ধাক্কানোর আওয়াজ পেল৷ ভাবলো হাসান এসেছে। তাই গ্যাস অফ করে তড়িঘড়ি করে ছুটলো দরজা খুলতে। কিন্তু দরজা খুলতেই চোখের সামনে এলো অপ্রত্যাশিত মুখ।
সোফায় সামনাসামনি বসে আছে মিতু আর নোলক হাসান। সবাই নিশ্চুপ। তাই নোলকই বলল,” তা মিতু হুট করে এ বাসায়?”
” আমার আসা কি বারণ ভাবি?”
” তা কেনো হবে। তবে পূর্বে যা যা ঘটেছে, তারপর এ বাসায় তোমার আসাটা একটু অন্যরকমই বটে।” তাচ্ছিল্য হেসে বলল নোলক
” না ভাবি, এর আগেও ভাইয়ার সাথে তার স্কুলে যেয়ে অনেকবার দেখা করেছি। ভাইয়া হয়তোবা তোমায় জানায় নি। এখন তো ভাইয়া প্রতিদিনই বাসায় যায়।
সে যাই হোক ওগুলো বলতে আমি আসি নি। আমি শুধু বলতে এসেছি, যে অনেক মান অভিমান তো হলো। এখন তোমরা বরং বাসায় ফিরে চলো। মাকে তো চেনোই, সে তোমাকে ডাকবে না। কিন্তু বাসাটা একদম ফাকা পরে আছে। আমি সারাদিন বাসায় থাকি না। আমার ক্লাস থাকে। মা বুড়ো মানুষ, সারাদিন বাসায় একা।
তোমরা যাওয়ার দু’দিন পরেই রতন ভাই আর তার বউ বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে। এদিকে আপাও নিজের সংসারে ব্যস্ত। ছোট ভাইও তার ভার্সিটি নিয়ে ব্যস্ত।
তাই আমি অনুরোধ করতে এসেছি যে তোমরা বাসায় ফিরে চলো।
এর আগেও ভাইয়ারকে অনেকবার বলেছি। কিন্তু ভাইয়া বলেছে তুমি রাজি হবে না। তাই তোমার কাছে আজ অনুরোধ করতে এসেছি।”
হাসান গোপনে তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ রেখেছে শুনে অবাকই হলো নোলক। সে তার ভাই বোন মায়ের সাথে সম্পর্ক রাখতেই পারে, কিন্তু এটা নোলকের কাছে গোপন করলো কেনো? নোলক কি কখনো বাধা দিয়েছে তাকে যে সে তার ভাই বোনের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারবে না।
নোলক অবাক দৃষ্টিতে হাসানের দিকে কিচ্ছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। নোলকের সেই দৃষ্টিতে হাসান মাথা নিচু করলো।
নোলক এবার কড়া স্বরে বলল,” এখন কি তোমার মায়ের কাজের লোকের অভাব পরেছে, তাই আমাকে ডাকতে এসেছো? আমার জানা মতে তোমার মায়ের ব্যংকে জমি বিক্রি ২০ লাখ টাকার ফিক্স ডিপোজিট আছে, সেখান থেকে মাসে ১৬ হাজের বেশি টাকা পায়। সেই ১৬ হাজার টাকাও তোমার মা তুলে না। ওগুলো জমেও অনেক টাকা হয়েছে। তোমার মাকে বলো নিজের জন্য একটা কাজের মেয়ে রেখে দিতে।
অবশ্য ও টাকায় তো মনে হয় না তার গাত দিতে হয়। তোমার ভাই ই তো মনে হয় তোমাদের বাজার খরচ দিয়ে আসে। তোমার আর তোমার ছোট ভাইয়ের খরচও নিশ্চই আবার তোমার ভাই দেয়া শুরু করেছে।
শুনে রাখো মিনু, তোমার শখ হলে তোমার ভাইকে নিয়ে যাও। তাকে আরেকটি বিয়ে দাও। ডিভোর্সের নোটিশ আমি পাঠিয়ে দিব। এই লোকটাকে কেন জানি আমার আর সহ্য হচ্ছে না।” বলেই টেবিলে রাখা চা আর পাকোড়ার বাটিটা ছুড়ে গেটের দিকে ফিকে ফেলে দিল। সাথে সাথে কাছের বাটি কাপগুলো ভেঙে চুরচুর হয়ে গেল। শব্দে বাচ্চারাও ঘুম থেকে উঠে গেল।
কিন্তু সব কিছুকে উপেক্ষা করে নোলক নিজের ঘরে ঢুকে গেল।বড্ড বেশি বিতৃষ্ণা লাগছে তার।
অন্ধকার ঘরে বসে আছে নোলক। আজ অনেকক্ষণ কেদেছে সে। নিজের সংসারটাকে কেনো জানি বিরক্ত লাগছে তার। হাসনকেও সহ্য হচ্ছে না।
হাসান লাইট জ্বালিয়ে নোলকের পাশে বসলো, তারপর বলতে শুরু করলো,” আমি বড় ছেলে ও বাসার। কি করে নিজের দায়িত্বকে অবহেলা করি নোলক। মিতু একা কি করে নিজের পড়াশুনার খরচ চালাবে। আমার ছোট ভাইটাও শখ করে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। সেই খরচ সে কি করে দিবে? এদিকে আমার মায়ের প্রতিও আমার দায়িত্ব আছে। সেটা থেকে তো আমি মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারি না।”
নোলক তাচ্ছিল্য হেসে বলল,” ১৭ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল আমার। পড়াশুনার অনেক শখ ছিল। কিন্তু তূমি তোমার মা আমাকে সেই সুযোগ দেও নি। বাসা থেকে আমি আমার বই গুলো নিয়ে এসেছিলাম, কিন্তু তোমার মা সেগুলো বাদামওয়ালার কাছে অল্প দামে কেজি হিসেবে বেচে দিল। সেদিন আমি অনেক কেদেছিলাম মনে আছে? কিন্তু তোমার মা আমাকে বলেছিল, বিয়ে হয়ে গিয়েছে,তাই আমি যেন পড়াশুনার ভুত মাথা থেকে নামিয়ে সংসারে মন দিই। তুমিও সেদিন তোমার মায়ের হ্যা তে হ্যা মিলিয়েছিলে।
কিন্তু তোমার ভাইবোনেরা ঠিকি আমার চোখের সামনেই নিজেদের পড়াশুনা চালিয়ে গেল।
সেই অল্প বয়সী আমি টার উপর তোমার মা কম অত্যাচার করেনি। ওই ছোট ছোট হাতে তোমার মা, তোমার, তোমার ভাইবোনদের সবার কাপড় ধুয়েছি। সবার ফাই ফরমাস খেটেছি। তারা কিন্তু বয়সে আমার বড় ছিল। কিন্তু তাদের জুতাটাও আমাকে দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে নিত। আর তুমি সব দেখে চুপ থাকতে।
যাই হোক শেষে প্রতিবাদ করে নিজের অধিকার বুঝে নিলাম। কিন্তু কি হলো? আমিই ব্যর্থ হলাম।
তোমার উপর চাপ পরবে এই চিন্তায় নিজের স্বর্ণের জিনিস বিক্রি করলাম। নিজে ব্যবসা শুরু করলাম। আর সেই টাকা তুমি ব্যংকে জমা দেয়ার নামে তোমার ভাই বোন মাকে দিলে?
আরে আমার মতো একটা অশিক্ষিত মেয়ে যদি ব্যবসা করে আয় করতে পারি, তোমার ভাই বোন তো আমার চেয়ে অনেক শিক্ষিত। তারা কি পারে না টিউশনি করাতে? ফ্রিল্যান্সিং করতে? বা ছোট ব্যবসা করতে?? কেনো পারে না হাসান?
তোমার মায়ের কাছে কি টাকার অভাব পরেছে? তাকে কেনো আমার কষ্টে আয় করা টাকা তুমি দিলে? এই চুপ করে আছো কেনো?
হাসান আমি মুক্তি চাই, তোমার থেকে মুক্তি চাই। তোমার মতো কাপুরুষের সাথে আমি সংসার করতে পারব না। তুমি বরং আমাকে ছেড়ে দিয়ে তোমার মায়ের পছন্দে বিয়ে করো আরেকটা। ”
এতোক্ষণ চুপ করে থাকলেও নোলকের শেষ কথায় চমকে গেল হাসান। নোলক তার কাছে তালাক চাইলো? যেন নিজের কানকেও সে বিশ্বাস করতে পারলো না। ধরফরিয়ে নোলকের হাত ধরে বলল,” এই নোলক কি বলছো এই সব। এই সামান্য বিষয়ে তুমি তালাক দিবে আমাকে?”
” হ্যা। আমার যতটাকা তুমি তোমার পরিবারকে দিয়েছো, ওই টাকা যদি সাতদিনের মাঝে ফেরত না দেও, তাহলে আমি এই সংসারে থাকব না। আমি যদি ভুল না হই, পুরো দুই লক্ষ টাকা দিয়েছি আমি তোমাকে এই এক বছরে ব্যংকে রাখতে, যা তুমি তাদের পেছনে খরচ করেছো।” বলেই নোলক বাচ্চাদের রূমে চলে গেল। হাসানকে আর এক মুহুর্তের জন্যও তার সহ্য হচ্ছে না।
নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ৬
হাসানের মাথায় আকাশ ভেঙে পরলো। মনে পরলো অতীতের কথা। বাড়ি ছাড়ার এক মাস পরেই মিতু তার স্কুলে আসে। তারপর নানা রকম ইমোশনাল কথা বলে। হাসানও গলে যায়। আবারও সবার দায়িত্ব নিজ কাধে নিয়ে নেয়। নোলকের ব্যবসার টাকাও সে তার পরিবারের পেছনে খরচ করে। এমনকি ছোট ভাইয়ের দামি ল্যাপটপ, ফোন আর সময় অসময় ট্যুরের আবদার মেটাতে প্রায় ৩ লক্ষ টাকা ঋণও হয়ে গিয়েছে। তাই তো লোনের টাকা শোধ করতে আরও বেশ কিছু টিউশনি জুটিয়েছে। নোলকের ব্যবসার টাকা সরিয়ে কিস্তি দেয়। যেটা নোলক এখনো জানে না। হাসান বুঝে উঠতে পারছে না সে কি করবে। এসব জানতে পারলে নোলক কোনোদিনও তাকে ক্ষমা করবে না।
এই চিন্তায় সারাটা রাত ঘুম আসলো না হাসানের।
এদিকে নোলকও নিজের সিদ্ধান্তে অটল।

অনেক ধন্যবাদ আপু গল্পটা দেওয়ার জন্য।