Home পৌষপার্বণ পৌষপার্বণ পর্ব ২৩

পৌষপার্বণ পর্ব ২৩

পৌষপার্বণ পর্ব ২৩
Irfa Mahnaj

পৌষকে কোলে করে নিয়ে সোজা নিজের রুমে আসে পার্বণ। ওকে খাটের উপর বসাতেই জোঁকের মতো পার্বণকে পেঁচিয়ে ধরে পৌষ।
পার্বণের পিঠে কিল, ঘুষি মেরে রাগে ফুসতে ফুসতে শুধায়,
— বাঁদর ছেলে।শয়তান…
— মরা গরুর নয় ঠ্যাং!
— পার্বণনননন!!
কানে হাত দিয়ে পার্বণ জবাব দেয়,
— আস্তে বাবা আমি কানা নই শুনতে পাই।
— কথা বলবি না একদম তুই। আমি কত কষ্ট করে সাজলাম আর তু্ই বেয়াদবে এমন একটা কাজ করলি!
নাক টেনে কথা গুলো বলে পৌষ। ওর রীতিমতো হাত পা ছুড়ে কান্না পাচ্ছে। পাবেনা ও কত কিছু ভেবে রেখেছিলো। কি করবে, কি কিনবে, কি খাবে সব কিছু।আর শেষ মুহূর্তে কিনা ওর যাওয়াই হলো না?
বউয়ের লাল হয়ে যাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে আছে পার্বণ। ওর ভীষণ আদর আদর লাগছে। বউ পৌষকে দেখতে একটু বেশিই সুন্দর লাগছে। আচ্ছা পার্বণ যদি কিছুমিছু করে? খুব কি ক্ষতি হবে?
পরক্ষনেই নিজের মনে নিজেই আওড়ালো,

— ধুর ব্যাঙ আমি আবার কবে থেকে এসব ভাবা শুরু করেছি। ইচ্ছে হয়েছে মানে করে ফেলো। ব্যাস। সিম্পল।
ভেবেই লাল টুকটুকে হওয়া পৌষের নাকের মাথায় কামড় বসিয়ে দিলো পার্বণ। হঠাৎ ওর এরকম কাজে চোখ বড় হয়ে গেলো পৌষের।
পাশে থাকা বালিশ উঠিয়ে সেটা দিয়ে দেয় এক বাড়ি। বাড়ি খেয়ে বালিশটা নিয়েই গা দুলিয়ে হাসতে আরম্ভ করে পার্বণ। ধপ করে পৌষের পাশে সেই বালিশটাতেই মাথা ঠেকিয়ে শুয়ে পড়ে।
কনুই ভাঁজ করে হাতের উপর মাথা ঠেকিয়ে পৌষের দিকে তাকিয়ে রয় পার্বণ। পার্বণকে নিজের তাকিয়ে এমন মিটিমিটি হাসতে দেখে গা পিত্তি জ্বলে উঠে পৌষের।খেঁকিয়ে উঠলো ও,
— কোন ছাতার মাথা গল্প করবি তু্ই? যার জন্য আমাকে এভাবে নিয়ে এসেছিস?
— কাছে আয় গল্প করছি।
— না এখানেই ঠিক আছি এভাবেই বল তু্ই আমি শুনতে পাচ্ছি।
— কাছে না আসলে এই গল্প শোনা যায় না।
— দরকার নেই তাহলে এমনিতেই তোর মতিগতি ভালো ঠেকছে না।
পৌষের বলতে দেরি কিন্তু ওকে হেঁচকা টানে নিজের বুকের উপর ফেলতে দেরি হয় না পার্বণের।কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলে পার্বণ,

— একদম ঠিক ধরেছিস আমার মতিগতি একদম ঠিক নেই।
— ভুলে যাস না… উম!উম!
নিজের কথা আর শেষ করতে পারে না পৌষ। তার আগেই ওর মুখ বন্ধ করে দেয়। অবশ্যই হাত দিয়ে না। পৌষের মুখ বন্ধ করতে বুঝি পার্বণের হাত লাগে? উহু না।
মিনিট তিনেকের মাথাই পার্বণকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে ওয়াশরুমের দিকে দৌড় লাগায় পৌষ। ওয়াশরুমে ঢুকেই বমি করে ভাসিয়ে দেয় ও।
এই দৃশ্য দেখে অসহায় পার্বণ কপাল চাপড়ায় আর আফসোস করে বলে,
— হায়!আমার ছাও একটু বেশিই তাড়াতাড়ি চলে আসলি না?তোদের মায়রে বোধহয় এখন চুমুও খাওয়া যাবে না!
দৌড়ে চলে গেলো পৌষকে ধরতে। ওর পিঠে হাত বুলিয়ে ওর মাথায় এক হাত চেপে পৌষের পিছনে দাড়িয়ে রয় পার্বণ।
যা খেয়েছিলো সব বেরিয়ে গেছে মেয়েটার। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে পার্বণের বুক চিড়ে।
একে গন্ধ গন্ধ বলে মেয়েটা কিছু খেতে পারে না। যা একটু খেয়েছে সব বেরিয়ে গেছে। পৌষের নেতিয়ে পড়া চেহারাটার দিকে একবার তাকিয়ে ওর চোখ মুখ পানি দিয়ে ধুয়ে দেয় পার্বণ।
তারপর পাজাকলা করে পৌষকে কোলে তুলে বেডের উপর নিয়ে বসায়।ওর মুখ মুছিয়ে দিয়ে যেইনা ওর শাড়ি পাল্টে ওকে আরাম দায়ক পোশাক পড়ানোর জন্য ওর শাড়িতে হাত দেয় অমনি লাফিয়ে উঠে পৌষ।
ক্লান্ত শরীর নিয়েই বাঁধা দেয় পার্বণকে। কপালে ভাঁজ পড়ে পার্বণের। পৌষের হাতটা নিজের হাতের উপর দিয়ে ঝাঁটকা মেরে সরিয়ে বলে,

— মাইন্ড এতো খারাপ হলো কবে থেকে তোর পৌষ?
— যবে থেকে তু্ই আমার জীবনে এসেছিস, যবে থেকে বিয়ের কথা জেনেছিস তবে থেকেই।
পৌষের দিকে সেন্টি মার্কা ইমোজি নিয়ে তাকায় পার্বণ। বলে,
— কিছু করবো না তু্ই অসুস্থ আমার মাথায় আছে। তাছাড়া আর কিছু দেখা বাকি আছে?নতুন কিছু অ্যাড হয়েছে নাকি?
— হ্যা তোর বাচ্চা।
কেমনডা লাগে বলেন তো? না মানে এটা কোনো কথা হলো? এই মেয়েকে পার্বণ করবে কি!
শাড়ি যাতে খুলে পড়ে না যায় তাই পিন লাগিয়েছিলো। বড় ব্রুজ গুলো খুলতে পারলেও ছোট সিফটিপিন খুলতে বেগ পোহাতে হয় পার্বণকে। ব্যাস কিছুক্ষন আগের সব রাগ এই পিনের উপর ঝেড়ে মেরে উঠে দাড়ায় জনাব।
পৌষের মুখের উপর ওর ড্রেস ছুড়ে মেরে বলে,

— এইসব কি পড়েছিস খুলতে পারছি না।
— তো তোকে আমি বলেছিলাম খুলতে?
কেমন করে জানি তাকালো পার্বণ। তারপরই ড্রামাতে যেমন ইমোশনাল সিন গুলো করা হয় না সেরকম ভাবেই ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল শুরু করে ও পৌষকে।
— হ্যা ভালো মানুষের তো কোনো দামই নেই।
তারপর হুট করে গাইতে শুরু করে,
“আমি তো ভালা না,
ভালা লইয়াই থাইকো!”
এদিকে বেচারি পৌষ আহাম্মক বনে যায় পার্বণের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে বলে উঠে,
— প্রেগন্যান্ট আমি আর মুড সুইং হচ্ছে ওর!

বসন্ত নিজের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছে। আজকে বোধহয় বাড়ি গেলে ওর চল্লিশার আয়োজন করা হবে।
আর ও কি বুঝেছিলো নাকি এমন হবে? আশ্চর্য!ভুল মাত্রই মানুষ। থুড়ি মানুষ মাত্রই ভুল। ভাইয়ের কাঁধে হাত দিয়ে মাথা দুই পাশে ঝাকিয়ে মুখ দিয়ে “চুক চুক” আওয়াজ করছে হেমন্ত।
— দোয়া করি ভাই বেঁচে থাকলে তুই পরের জন্মে আবারো আমার ভাই হয়ে জন্মাস।
হেমন্তের হাত ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিয়ে খেঁক করে উঠে বসন্ত।
— তুই যমজ নামের কলঙ্ক।
— কিসের সাথে কি পান্তা ভাতে ঘি!
প্রবাদ বাক্য আওড়াতেই হেমন্তের পায়ে একটা লাথি বসিয়ে দেয় বসন্ত। থমথমে মুখে বলে,
— শা*লার জমজের তো কোনো ফয়দাই লুটতে পারছি না। এতো কাইল্লা হওয়া লাগলো কেনো তোর?
হেমন্তও বসন্তের পিঠে কিল বসিয়ে ওকে শুধরে দিলো।

— আমি কালো না ব্রাউন। আর তুই বেশিই সাদা। বয়লায় মুরগির মতো। দেখতেও বয়লার মুরগি যদিও।
ভাইয়ের কথায় রাগার কথা থাকলেও এতোক্ষনে মারামারি বাধিয়ে দেওয়ার থাকলেও বসন্ত আছে অন্য টেনশনে। দাঁত দিয়ে নখ কাটতে গেলেই বাঁধ সাধে হেমন্ত।
— তোকে না কতবার বারণ করেছিলাম।
— আরে ভাই এসব ছাড় উপায় বল বাঁচবো কিভাবে।
— এখন তো শুধু একটাই উপায় আছে।
চোখ দুটো চকচক করে উঠলো বসন্তের। জিজ্ঞাসা করলো,
— কি?
— পিঠে ছালা বাঁধা।
বিজ্ঞদের মতো করে কথাটা বলতেই মুখটাকে ভোঁতা বানিয়ে হেমন্তের দিকে তাকিয়ে থাকে বসন্ত।
আসলে হয়েছে কি মেলায় এসে নাগর দোলনায় উঠিয়ে দিয়েছে বসন্ত সবাইকে। ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে সবাইকে উঠিয়েছে।
বলেছে কিছুই হবে না। ওঠার আগে আষাঢ় ছেলের পানে তাকিয়ে বার বার সাবধান বাণী দিয়েছে।

— বাবা আমার যদি কিছু হয় আজকে তবে আমি তোমার পিঠের ছাল তুলে আমার ছিড়া জুতায় পট্টি দিবো।
দাঁত কেলিয়ে বসন্ত তখন বলেছিলো,
— আরে চিল বাবা কিছু হবে না।
কিন্ত যেইনা দোলনায় উঠে অমনি ওখানের উপস্থিত সবার থেকে ওর পরিবারই বেশি চিৎকার দিচ্ছে।
জ্যৈষ্ঠ নিজের বয়স ভুলে গিয়ে পাশে থাকা বড় ভাইয়ের কোলের উপর গিয়ে বসে। আষাঢ় ভয়ের ঠেলায় ওর বউ মাঘের কোলে উঠে ওর গলা জড়িয়ে ধরে চিল্লিয়ে উঠে,
— ওরে আমার খোদা….আল্লাহগোওও!!
কোথায় মাঘ ভয়ে ওর জামাইর কোলে উঠবে তা না এই ব্যাটাই উল্টো ওর কাঁধে ঝুলে আছে। আষাঢ়ের মাথায় গাট্টা দিয়ে বিড়বিড়িয়ে উঠে মাঘ,
— শা*লা ভীতু।
অন্যদিকে ফাল্গুন ও বর্ষা দুই বোন, দুই জা, দুই বেয়ান মানে সম্পর্কের আর শেষ নেই এদের। একে অন্যের গলা জড়িয়ে ধরে চিক্কুর মারছে
অবস্থা বেগতিক বুঝতে পেরেই সেই থেকে হাঁটু কাঁপছে বসন্তের।

— আমাদের হেমন্ত না ওইটা?
পূর্ণার কথায় সেদিকে ফিরে বনচাঁপা। সম্মুখের দৃশ্য তার মোটেই পছন্দ হয় না। নজর এদিক সেদিক ঘুরিয়ে ধমক দিয়ে উঠে পূর্ণাকে।
আজকে পৌষ, পূর্ণা আর বনচাঁপার একসাথে ঘোরার প্ল্যান ছিলো। ফ্যামিলির সাথে এলেও মেলাতে এসে মিলিত হওয়ার কথা ছিলো তিন বান্ধবীর।
তিন জন একসাথে ঘুরবে, ফিরবে,কিনবে,গল্প করবে। আড্ডা দিবে। খাবে। তবে দুর্ভাগ্য বশত পৌষ আসেনি।
— হেমন্ত হোক আর যেই হোক তোর তাতে কি?
রাগে ফুসতে ফুসতে কথাটা বলতেই পূর্ণা অবাক গলায় জিজ্ঞেস করে,

— আমার তাতে কিছুই না কিন্তু তু্ই এমন রাগে বোম হয়ে আছিস কেনো?
— তোর চোখে সমস্যা।
— রাগে তোর মুখ লাল হয়ে গেছে।
— গরমে লাল হয়েছি।
— আচ্ছা বাদ দে। কিন্ত হেমন্তের সাথে ওই মেয়েটা কে বলতো? গফ নাকি?
হেমন্ত ও তার পাশে দাড়ানো মেয়েটার পানে একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নেয় বনচাঁপা। ওর একটুও ভালো লাগছে না।
হেমন্ত একটা মেয়ের সাথে তাও আবার হেসে হেসে কথা বলছে। শুধু কি তাই? মেয়েটার জন্য চুড়িও চয়েস করছে দেখো!
উপরন্তু পূর্ণার কথা ওর আগুনে ঘি ঢালার মতো হলো। ও জোরে চেঁচিয়ে উঠলো,

পৌষপার্বণ পর্ব ২২ (২)

— জানিনাআআআ!
তারপর ধুপধাপ পা ফেলে সেখান থেকে প্রস্থান করলো।ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে পূর্ণা শুধালো,
— যাহ বাবা এর আবার কি হলো?

পৌষপার্বণ পর্ব ২৪