পৌষপার্বণ পর্ব ৬
Irfa Mahnaj
চৈত্রের রুমে বসে লুডু খেলছে পার্বণ, চৈত্র, হেমন্ত ও বসন্ত।
তখনই আগমন ঘটে পৌষের। নিজের দান দিতে দিতে পৌষের দিকে একবার তাকিয়ে চৈত্র শুধায়,
— কিরে কিছু লাগবে নাকি?
— হ্যাঁ লাগতো।
একটু অস্বস্তি হচ্ছে পৌষের। যা পার্বণকে দেখে আরো বেশি হচ্ছে।
বারবার সেই চুম্বনের দৃশ্য মনে পড়ে যাচ্ছে আর কেমন গুটিয়ে যাচ্ছে পৌষ।
এদিকে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আছে পার্বণ। মনে হচ্ছে যেনো কিছুই হয়নি। সবকিছু একদম স্বাভাবিক।
একটু আগে যে তাণ্ডব ঘটিয়ে এসেছে তা কেউ পার্বণের মুখ দেখে বলতে পারবে? উঁহু মোটেই না।
মনে মনে একগাদা গালি দিচ্ছে পৌষ পার্বণকে। কিন্তু পার্বণ শান্ত। একবারের জন্যও পৌষের দিকে তাকাচ্ছে না।
পৌষ কিছুক্ষণ পর পর পার্বণের দিকে তাকাচ্ছে আর হাসফাঁস করছে। ওর এই অবস্থা দেখে কপাল কুঁচকে গেলো চৈত্রের।
জিজ্ঞেস করলো,
— কিরে বললি না? আর এরকম অস্বাভাবিক আচরণ করছিস কেনো?
চৈত্রের হঠাৎ প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেল পৌষ। আমতা আমতা করে জানালো,
— তোমার কাছে মলম আছে না?
— হ্যাঁ আছে। কিন্তু কি করবি তুই মলম দিয়ে?
ছক্কা মারতে মারতে পৌষের কথার জবাব দিলো চৈত্র।
— ওই আসলে… আমার ঠোঁট টা..
— এতো আমতা আমতা করছিস কেনো তুই? আর তোর ঠোঁটে কি হয়েছে?
কথাটা বলতে বলতে পৌষের ঠোঁটের দিকে তাকালে আতকে উঠে চৈত্র।
চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— তোর ঠোঁটের এহেন করুণ দশা কেমন করে হলো? এতো ফুলে গেলো কীভাবে?
— মৌমাছি কামড়েছে।
পার্বণের দিকে আড়চোখে তাঁকিয়ে কথাটা বলল পৌষ।
এই এতক্ষণ পর পার্বণের হাতটা থামলো। ললাটে ভাঁজ ফেলে পৌষের দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হয়ে যায় দুজনের।
পৌষের দিকে তাঁকিয়ে কি বুঝলো কে জানে নিম্নওষ্ঠ কামড়ে মিটিমিটি হেসে আবারো নিজ কাজে মনোনিবেশ করলো পার্বণ।
সেভাবেই রসিকতা করে বলতে লাগলো,
— মধু থাকলে মৌমাছি তো কামড়াবেই।
পুষ্পছায়া ~
ডাইনিং টেবিলে বসে মাথা নিচু করে চুপচাপ খাবার খাচ্ছে বনচাঁপা আর কালমেঘ।
আজকে ওদের বাবা গন্ধরাজের কাজ থাকায় তিনিও বাড়িতেই আছেন। ফুরফুরে মেজাজে ডাইনিং এর দৃশ্য দেখে এসে থমকালো।
গন্ধরাজ টেবিলে চেয়ার টেনে বসতে বসতে ছেলে মেয়েদের উদ্দেশ্য বলতে লাগলেন,
— কি ব্যাপার তোমরা এভাবে মাথা নিচু করে রেখেছ কেনো?
কথা বলতে বলতে ভাতের প্লেট নিয়ে ভাত বাড়তে লাগলেন। অতপর যেই না তরকারির ঢাকনা তুলে তরকারি কি রান্না করেছে দেখলেন অমনি চোখ মুখ কুঁচকে গেলো।
করলা ভাজি, মুলা ভাজি, পালং শাক রান্না, আর গুড়া মাছের চচ্চড়ি। সাথে সিম, আলু, ফুলকপি, গাজর দিয়ে বানানো নিরামিষ তরকারি।
কোথায় ভাবলেন আজকে ছুটির দিন আজকে একটু ভালো মন্দ রান্না খাবে তা না কিসব ঘাস পাতা ছাগলের খাবার।
গন্ধরাজ ছেলে মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন,
— এসব কি? আর তোমাদের মা কোথায়? এসব কোনো খাবার হলো? আজকেও এসব খাবো নাকি!
কালমেঘ নিজের মাথা উঁচিয়ে বাবার পানে তাকায়। থমথমে গলায় বলে,
— মা রান্নাঘরে তাকেই গিয়ে জিজ্ঞেস করো এসব কি।
ছেলের গালে স্পষ্ট পাঁচ আঙুলের ছাপ। সাথে সাদা আর সবুজ শাক, সবজির কিছু অংশ।
বুঝায় যাচ্ছে থাপ্পড়ের দেয়া হয়েছে আর যিনি থাপ্পড়টা দিয়েছেন তিনি রান্না করছিলেন। তবে গন্ধরাজ এসবে পাত্তা না দিয়ে ছুটলো রান্নাঘরের দিকে।
“ঠাস” করে একটা আওয়াজ হতেই চোখ বন্ধ করে ফেলে বনচাঁপা ও কালমেঘ।
বনচাঁপা ফিসফিস করে ভাইকে বলে উঠে,
— ডোজ বাবাকেও দেয়া হয়েছে মনে হয়।
তাদের কথার মাঝেই সেখানে এসে উপস্থিত হয় গন্ধরাজ। ছেলেমেয়ের মতো নিজেও যা আছে তাই দিয়ে ভাত খেতে শুরু করে।
তার নিজের গালেও থাপ্পড়ের ছাপ। স্পষ্ট গরম গরম থাপ্পড়টা রান্নাঘর থেকে বউয়ের হাতেই খেয়ে এসেছে।
মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বলে,
— আগেই বলে দিতে পারতে আবহাওয়া গরম।
বনচাঁপার মাথা তুললে দেখা যায় তার গালেও সেম ছাপ। মানে বাপ ছেলে আর মেয়ে তিনজনেই অপছন্দের খাবারের জন্য প্রতিবাদ করায় থাপ্পড় খেয়ে বসে আছে।
অসহায় চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে নিজ অসহায়ত্ব বুঝালো বনচাঁপা।
কলিং বেল বাজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বসন্ত। হাত পা রীতিমত কাপছে তার। কখন না আবার প্যান্টটাই ভিজে যায়।
বসন্তের ভাবনার মাঝেই দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন বসন্তের বাঘ শশুর হিমসাগর।
গমগমে সুরে বসন্তকে দেখেই প্রশ্ন ছুড়লেন। চোখে মুখে খেলা করছে বিরক্তি তার।
— কি চাই?
— আপনার মেয়েকে।
মুখ ফসকে কথাটা বের করেই জিভে কামড় বসায় বসন্ত। শুধরে বলে,
— আপনাকে।
আবারো তালগোল পাকিয়ে ভূল কথা বলে ফেলেছে বুঝতেই এবার কপাল বরাবর একটা ইট দিয়ে বারি মারতে ইচ্ছে করছে বসন্তের।
— কি চাই তোমার?
হিমসাগরের প্রশ্ন শুনে এবারে মিনমিন করে বলে উঠে,
— আচার।
— মানে?
আচারের বাটিটা হিমসাগর এর মুখের সামনে ধরে বসন্ত বলে,
— আচার এনেছি আপনার জন্য। আমের আচার।
বসন্ত খুব ভালো মতোই জানে সব কিছু ফিরিয়ে দিতে পারলেও এই বেটা আম রিলেটেড কিছুই ফিরিয়ে দিতে পারবেন না।
হলোও তাই আমের আচার ফিরিয়ে তো দিলেনই না সাথে বসন্তের বাড়ির ভিতর প্রবেশের বুদ্ধিতেও জল ঢেলে দিলেন।
আমের আচার এর বাটিটা থাবা মেরে নিয়ে বসন্তের মুখের উপর ঠাস করে দরজাটা লাগিয়ে দিলেন।
হিমসাগরের কাজে আহাম্মক বনে দাড়িয়ে রয় বসন্ত। বাংলা গালি ছুঁড়ে দরজায় লাথি মারতেই খট করে দড়জাটা খুলে যায়।
লাথি গিয়ে লাগে সোজা হিমসাগরের পায়ে। ব্যস যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যে হয়।
— হে হে হে আংকেল আমি আসলে…. আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি।
বলে কেবলাকান্তের মতো হাসতে থাকে বসন্ত ভেবলা।
পৌষের কথামতো ভাদ্রকে ঘুরতে যাওয়ার জন্য রাজি করায় চৈত্র।
বাড়ির সবাইও সম্মতি দেয়। এতে মহাখুশি পৌষ। ঘুরতে যাবে খুশি তো হবেই।
আর পৌষ খুশি হবে তাতে বেগরা দিবে না পার্বণ তাও আবার হয় নাকি। শয়তানি হেসে জানায় সেও যাবে।
ব্যস ঠুস করে পৌষের চেহারা চুপসে এইটুকুনি হয়ে যায়।
যা দেখে রীতিমতো ইবলিশের মতো হো হো করে হাসতে থাকে পার্বণ। যা একান্তই পৌষের উক্তি।
হেমন্ত, বসন্ত যেতে পারবে না। ওদের পরীক্ষা, প্রাকটিক্যাল সব মিলিয়ে ওদের আর যাওয়া হবে না।
তাই এই সফরে যাবে পৌষ, পার্বণ, চৈত্র, ভাদ্র। কক্সবাজার যাবে তারা।
ব্যাগ প্যাক করতে ব্যস্ত পৌষ আর পার্বণ ওকে খোঁচাতে।
তারা রাতের বেলা যাবে। রাতের বাস ভ্রমণও হয়ে যাবে সাথে সকালের সূর্যোদয় দেখাও।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাসে উঠে সিটে বসা পর্যন্ত পৌষের হাত শক্ত করে ধরে রাখে পার্বণ।
একমুহুর্তের জন্যও ছাড়ে না। ভিড়ভাট্টার মাঝে খুব সুন্দর করে আগলে নিয়ে হাটে পার্বণ।
কারো সাথে সামান্য শরীরও ছুঁতে দেয় না। খুব যত্নের আর শক্ত ভাবে পৌষকে নিজের সাথে করে নিয়ে যায় পার্বণ।
তখন পুরোটা সময় পৌষ এক নতুন পার্বণকে আবিষ্কার করে। যেই পার্বণ দায়িত্ব নিতে জানে। কেয়ারিং পার্বণকে পৌষ দেখে।
সিটে বসতেই সিট পাল্টানোর কথা বলতেই ধমকে উঠে পার্বণ,
পৌষপার্বণ পর্ব ৫
— চুপচাপ বসে থাক। বড় ভাই তার বউয়ের সাথে পার্সোনাল সময় কাটাবে আর তুই গাধী তাদের মাঝে হাড্ডি হতে যাচ্ছিস।
ধমক খেয়েই যে চুপ হয়েছে পৌষ তা পার্বণকে বুঝতে দিতে চাইলো না। তাই বলল,
— ভাবিস না তুই ধমকেছিস বলে চুপ হয়েছি। আমি তো চুপ হয়েছি ভাই ভাবির মাঝে ডিস্টার্ব না হয় তাই।
আড়ালে ঠোঁট টিপে হাসলো পার্বণ। পৌষের মতো করেই বলল,
— না এসব আবার ভাবতে আছে নাকি। আমি ভাবছি না।
