প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২০
ইনান হাওলাদার
“তোমার সাথে প্রথম কথা বলার পর থেকেই মনে হচ্ছিল তুমি আলাদা। তোমার হাসি, তোমার বোকামি,তোমার বাচ্চামো,কথা বলার ভঙ্গি ….এভরিথিং , এভরিথিং আমার কাছে স্পেশাল।
আমি জানি জীবন সবসময় সহজ হবে না, কিন্তু আমি চাই তোমার হাতটা ধরে পথ চলতে। আনন্দে-দুঃখে, ঝড়ে-বৃষ্টিতে, হাসি-কান্নায় ,সবসময় তোমার পাশে থাকতে।
তুমি কি আমাকে সেই সুযোগ দেবে,আহি?আমার জীবনসঙ্গী হয়ে আমার গল্পটাকে পূর্ণ করবে?”
মেহেদীর মুখে এত এত কথা শুনে ভ্যা’বলার মতো চেয়ে আছে আহি।স্কুল – কলেজে অনেক ছেলে প্রপোজ করেছে ।কিন্তু এভাবে সামনা সামনি কেউ কখনও বলার সাহস পায়নি।একে ওকে দিয়ে বলিয়েছে। মেহেদীই প্রথম!
তবে মেহেদী এটা কি বলল সে বো’কা?সে যদি বো’কা হয়ে থাকে তাহলে মেহেদী তার থেকে বড় বো’কা। শুধু সুন্দর সুন্দর কথা বলে প্রপোজ করলেই হবে? তার কি উচিত ছিল না একগুচ্ছ গোলাপ আনা? মিনিমাম একটা গোলাপ আনলেও সে রাজি হয়ে যেত। গোলাপ নাহয় বাদই দিলো।তারা তো ফুলের বাগানে দাঁড়িয়ে আছে। এখান থেকে যেকোনো একটা ফুল ছিঁ’ড়ে তো দিতে পারত।
কাল অনেক রাতে ঘুমোতে যাওয়ার দরুন ঘুম থেকে উঠতে অনেকটা বেলা হয়ে গিয়েছিল আহির।ফ্রেশ হয়ে এসে দেখলো পারভিন বেগম খাবার নিয়ে বসে আছেন।সে ওয়াশরুমে থেকে বেরোতেই বড় মা খাবার খেতে বলে চলে গেলেন।খাওয়া যখন মাঝপথে তখন শবনম ম্যাসেজ করে বাড়ির ডান পাশের নার্সারিতে ডাকে।সে নাকে- মুখে খাবারগুলো গিলে সেখানে উপস্থিত হয়।এসেই এই কাহিনী।
মেহেদী নরম ও আবেগ মিশ্রিত কন্ঠে ফের বলল,
” আহি? কী ভাবছ? দেখো ,তোমার সময় লাগলে নিতে পারো।ভেবে – চিন্তে আমাকে আনসার দিয়ো।তবে নি’রাশ করবে না প্লীজ! ”
আহি যেন হেসে ফেলল।এসব আবেগী কথা শুনলেই কেন জানি তার হাসি পায়।কি আর করার!
কিন্তু চোখে একরকম আ’তঙ্কের ঝিলিকও দেখা গেল। সে ধীরে ধীরে বলল,
” দেখুন মেহেদী ভাইয়া আমি বো’কা নই।আর আমার কিছু ভাববারও প্রয়োজন নেই।আপনি এসব কথা বলেছেন জানলে আম্মু আর তূর্য ভাই আমাকে মে’রে বুড়িগঙ্গায় ভা’সিয়ে দিবে। ”
” দেখো,তারা তোমার মা আর বড় ভাই শা’সন তো করবেই।তুমি চাইলে আমি ডিরেক্ট তোমার ফ্যামিলির সাথে কথা বলবো ”
আহি অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে চোখ বড়বড় করে তাঁকিয়ে বলল,
” পা’গল হয়ে গেছেন আপনি? আমি এখন বিয়ে- টিয়ে করব না ভাই ”
আহির ছেলে মানুষি ভ’ঙ্গিমা দেখে হালকা হেসে ফেললো মেহেদী আর মুখে বললো,
” করো না! তুমি যখন চাইবে তখন বিয়ে হবে ”
” কিন্তু আমার তো প্রে’ম করতেও ল’জ্জা লাগে।যদি ধরা খাই তূর্য ভাই মে’রে ফেলবেন আমাকে ”
” আচ্ছা,ঠিক আছে । প্রেম করতেও হবে না । তুমি শুধু….”
আহি হঠাৎ এদিক – ওদিক তাঁকাল, চারপাশটা ভালো করে লক্ষ্য করে বলল,
” আপনার সাথে এভাবে কথা বলছি দেখলে তূর্য ভাই আমাকে ধরে পা’ড়াবে ,মেহেদী ভাইয়া ।এখন আমি আসি ”
মেহেদীর গলায় এক ফোঁটা হ’তাশা ঝরল। বি’রক্ত হলেও সেটা প্রকাশ না করে মুখে বললো,
” সব কথায় তূর্য ভাই,তূর্য ভাই করছো কেনো ?”
” কারণ …….”
” আরে আহি আপু,এখানে তুমি আর আমি সারা দুনিয়া খুঁজে বেড়িয়েছি।শিগগির আসো বাসর ঘরের টাকা ভাগাভাগি হচ্ছে । মেহেদী ভাইয়া তুমিও আসো ” বলে আহির হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল তাহি ।
” আরেকটু পরে আসতে পারলে না শ্যা’লিকা?” বিড়বিড় করে আওড়াল মেহেদী।
হালকা রোদ এসে পড়েছে খোলা জানালা দিয়ে, ঘরের ভেতর আধো-আলো, আধো-ছায়ার খেলা। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তূর্য একাধারে সি’গারেট টেনে যাচ্ছে। চোখ দুটো কেমন নির্লিপ্ত ।
ঠিক সেই মুহূর্তেই আস্তে করে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো আহি। উদ্দেশ্য তূর্য ভাইকে জ্বা’লানো। তার মুখে চিরোচেনা দু’ষ্টু হাসি।তবে তূর্যকে সি’গারেট খেতে দেখে সেটা মিলিয়ে গেল।এখন বি’রক্ত করা যাবে না। কেননা , তূর্য ভাই যখন সি’গারেট খান তখন কেমন যেন ব্যবহার করেন। তাই ভ্রু কুঁচকে বলল,
” আপনি বেড়াতে এসেও সি’গারেট খাচ্ছেন ,তূর্য ভাই ?”
তূর্য মুখের ভিতরের অবশিষ্ট ধোয়াটুকু শূন্যে ছেড়ে পিছন ফিরে না তাঁকিয়েই বললো,
” নার্সারিতে কী করছিলি তুই?”
” ফুল তুলতে গিয়েছিলাম ” একটু সময় নিয়ে বলল আহি। মানে সবদিকে ন’জর। লু’কিয়ে চু’রিয়েও কিছু করার কায়দা নেয়।
তূর্যের দৃষ্টি এইবার খানিকটা ঘুরল।চোখ সরু করে বলল,
” ওই ছেলেটা কেন গিয়েছিল ?”
আহি একমুহূর্ত ভেবে থ’ত’ম’ত করতে করতে জবাব দিলো,
” কোন ছেলেটা ? ওওওও.. মেহেদী ভাইয়া ? উনিও মনে হয় ফুল আনতে গিয়েছিলেন ”
তুর্যের মুখ গ’ম্ভীর।বি’রক্তির সুরে বলল,
“কেন এসেছিস বলে বিদেয় হ ”
” এসেছিলাম অন্য একটা কারণে।সেটা পরে বলব,এখন এই বিশ টাকা ধরুন ,এক প্যাকেট সোনালী বিড়ি কিনে খেয়েন ” বলে একটা চকচকে বিশ টাকার নোট তূর্যের দিকে এগিয়ে দিলো আহি।
” বাঁদ’রামি না করে যা এখন “গলা শ’ক্ত করে বললো তূর্য।
আহি চলে যেতেই নিচ্ছিল।কিন্তু হঠাৎ তার মনে হলো তুর্যের মুখটা আজ অন্যদিনের তুলনায় বেশি গ’ম্ভীর দেখাচ্ছে।তাই সে কৌ’তূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
” আপনার কি মন খা’রাপ,তূর্য ভাই ? ”
” তোর জেনে কাজ নেয় ” বলে আবারো তার হালকা বাদামী ঠোঁ’টের ভাঁজে সিগারেট চেপে ধরলো।
” আপনার কষ্ট আমি বুঝি,বুঝলেন? আপনার চোখের সামনে আপনারই ছোট ভাইয়ের বা’সর হয়ে গেল।কদিন পর বা’চ্চাও হবে।অথচ আপনার বিয়েই হলো না ”
” সেধে সেধে নিজের বি’পদ ডেকে না এনে দূর হ চোখের সামনে থেকে ”
তূর্যের অগোচরে একটা ভেং’চি কেটে চলে গেল আহি।আজ মনে হয় তূর্য ভাই ভালো মনে সি’গারেট খাচ্ছেন। তা না হলে নির্ঘাত ব’কতেন।
ঘরটার ভেতর যেন কেউ অদৃশ্য আ’গুন ধরিয়ে দিয়েছে। পর্দার ফাঁক দিয়ে দুপুরের রোদ এসে মেঝেতে পড়ছে, কিন্তু সেই আলোও যেন উ’ত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মা-ছেলের কথা কা’টা’কা’টির শব্দে।
নাজমা বিশ্বাস চেয়ারে সোজা হয়ে বসে আছেন। মুখে বি’রক্তির ছাপ, ঠোঁ’ট আঁকাবাঁকা করে চাপা রা’গ চেপে ধরেছেন। হাতদুটো আঁকড়ে ধরে রেখেছেন আঁচলে, কিন্তু চোখে মুখে স্পষ্ট আ’তঙ্ক। ছেলেটা যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
তিনি তী’ক্ষ্ণ গলায় হঠাৎ বলে উঠলে,
“তুমি কি পা’গল হয়ে গেছ, মেহেদী? কিসব যা তা বলছ? কয়দিন হয়েছে ওই মেয়ের সাথে তোমার পরিচয়? বলো কয়দিন? মাত্র তিন দিনেই তুমি তাকে ভালোবাসো বলছো? বিয়ের প্রস্তাব দিতে বলছো? এই কথা যদি একবার তোমার বাবার কানে যায় কি হবে ভেবে দেখেছ? আর তুমি যেটাকে ভালোবাসা, ভালোবাসা বলে পা’গল হচ্ছো সেটাকে ভালোবাসা বলে না। এটা মোহ! দুই দিন পর কেটে যাবে।”
কথাগুলো ছু’রির মতো বিঁ’ধে গেল মেহেদীর ভেতরে। সে চেয়ার থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে, গলার শিরাগুলো ফুলে উঠেছে।ফর্সা মুখশ্রী র’ক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। দু’হাত মুঠো করে শ’ক্ত করে রেখেছে, কিন্তু কণ্ঠস্বর যেন কাঁ’পা আ’গুন।সে চাপা কণ্ঠে হুং’কার দিয়ে বলল,
” মোহ, প্রেম, ভালোবাসা যা ই হোক না কেন আমি ওকেই চাই। চাই মানে চাই! ওর প্রতি আমার অনুভূতি যদি মোহ হয় তাহলে আমি এই মোহেই বাঁ’চব, আর এই মোহেই ম’রব। আচ্ছা মা, তুমিই বলো, কারো উপস্থিতিতে যদি বুক কাপে, কারো জন্য যদি নিজের সব কিছু ছেড়ে দিতে ইচ্ছা করে, তাহলে সেটা কি মোহ? আর যদি মোহই হয়ে থাকে তাহলে আমি কেয়ার করি না। আমি ওই মোহেই ডুবে আছি! আর সেখান থেকে বের হতেও চাই না।”
শেষ কথাগুলো বলার সময় মেহেদীর বুক উঠানামা করছে দ্রুততায়। চোখে রা’গের সঙ্গে একধরনের এক’গুঁয়েমি।
“সব জায়গা ঘাড় ত্যাঁ’ড়ামি সাজে না। এসব ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল।” নাজমা বিশ্বাসের গলায় ধম’কের সুর স্পষ্ট।
” আমি বলেছি মানে তুমি এখনি যাবে মা।রাইট নাউ! আমার রা’গ সমন্ধে তোমার ভালো করে ধারণা আছে। দয়া করে আর কথা বাড়াবে না।” হাতে থাকা মোবাইটাকে সজোরে মেঝেতে আছাড় মেরে হুংকার দিয়ে কথাগুলো বলে উঠলো মেহেদী।
এভাবে আরো কিছুক্ষণ মা – ছেলের মাঝে ত’র্কাতর্কি হলো। না চাইতেও ছেলের কাছে হার মানতে হলো নাজমা বিশ্বাসকে।এই সম্পর্ক যে কোনো দিনই গড়ে উঠবে না, তিনি সেটা ভালো করেই জানেন।তবে ছেলের সাথে না পেরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি। উদ্দেশ্য চৌধুরী বাড়ির বড় কর্তা – কর্তির জন্য বরাদ্দকৃত ঘর। কিন্তু সেখানে কাউকে পেলেন না। ফিরেই আসছিলেন ,সেই মুহূর্তে পারভিন বেগম পিছন থেকে ডেকে বললেন,
” ভাবি কিছু বলবেন ”
পুনরায় পিছু ফিরলেন নাজমা বিশ্বাস। একবার চাইলেন কিছু না বলেই চলে যাবেন।কিন্তু সেই মুহূর্তে ছেলের ক’রুন মুখশ্রী চোখের সামনে ভেসে উঠল।তার মুখে সং’কোচের আভা বিদ্যমান।সেটা পারভিন বেগমও খেয়াল করলেন।তিনি বললেন,
” ভাবি আসুন আমরা ভিতরে বসে কথা বলি। ”
ভেতরে গেলেন নাজমা বিশ্বাস।বিছানার উপর দুজনে পাশাপাশি বসলেন।নাজমা বিশ্বাস কিছুটা সময় নিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
” আসলে আপা,আমি এই কয়দিনে যা বুঝলাম ,আপনাদের পরিবারে দুলাভাইয়ের কথাই সবাই মান্য করে।তাই দুলাভাইকেই কথাটা বলতে এসেছেছিলাম।উনি যেহেতু নেয় আপনাকেই বলছি ”
কথাটুকু বলে নিজের দুই হাত দ্বারা পারভিন বেগমের দুই হাত মুঠো বন্দি করে তিনি ফের বললেন ,
” আপা,আমার মেহেদীর জন্য আপনার দেবরের মেয়ে ,আহির হাতটা চাইছিলাম ! দয়া করে না করবেন না ,আপা ”
পারভিন বেগমও কিছুটা চি’ন্তায় পড়ে গেলেন।মনের ভিতরের এলোমেলো কথাগুলো একসাথে গুছিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন,
” আসলে ভাবি,মেয়েটা তো পড়ছে। আমারা এখনো এসব নিয়ে ভাবছি না। পড়ছে পড়ুক,আল্লাহ যেখানে কপালে লিখেছেন সেখানে হবে । আর আমাদের মেয়েটা হাতে পায়ে বড় হলেও সংসার করার বোধ – বুদ্ধি এখনো হয়নি।সেটা এই কয়দিনে আপনি বুঝতে পেরেছেন আশা করি ”
” পড়বে,সেটা নিয়ে আমাদের কোনো স’মস্যা নেয় আপা ”
” সংসার আর পড়া একসাথে হয় না ভাবি।তবে আপনি যেহেতু বলছেন আমি সবাইকে বলে দেখব ”
মেহেদীর মা মুখে হাসির মতো একচিলতে আভা এনে বললেন,
” আমরা না হয় আকদ সম্পন্ন করে রাখলাম।”
” আমি ওর বাবা – চাচাদের বলে দেখি,ভাবি।তাদের মেয়ে তারা যেটা ভালো বুঝবে করবে। ”
রাতের আকাশ গভীর , দূরের শহরের আলো ঝলমল করছে যেন দূরে কোনো জীবন্ত নগরী, কিন্তু ঘরের ভেতরের বাতাস ভারী। জানালার ফাঁক দিয়ে হালকা হাওয়া ঢুকছে। ঘরের কোণে ঘরোয়া আলো ফিকে।এমন সময় আকবর চৌধুরী থমথমে মুখে ঘরে ফিরলেন। স্বামীকে দেখে পারভিন বেগম এগিয়ে গিয়ে কিছু বলতে চাইছিলেন।কিন্তু তার আগেই আকবর চৌধুরী বলে উঠলেন,
” কী হয়েছে তোমার ছেলের? শুনলাম ঢাকা ফিরেছে! কাল বৌভাত সেরে আমরা তো এমনিতেই চলে যেতাম।এত রাতে ঢাকা ফেরার কোনো দরকার ছিল?”
” হয়তো জরুরি কোনো কাজ বেঁধে গিয়েছে তাই….” বাকি কথাটুকু শেষ করার আগেই আকবর চৌধুরী রে’গে মেগে বলতে আরম্ভ করলেন,
” আর কত ভাবে ছেলের দো’ষ ঢাকবে তূর্যের মা? কী কাজ ওর? এত রাতে রো’গী এসে অপেক্ষা করছে তোমার ছেলের জন্য? কোনো খবর আমার কানে আসেনি ভেবেছ? ”
” কী খবরের কথা বলছো ?” সবকিছু জানা সত্ত্বেও এমন কথা বলায় আকবর চৌধুরীর রা’গ আরও তীব্র হয়ে উঠল, চোখ সরু করে বললেন,
” তোমার ছেলে যাওয়ার আগে রা’গা’রা’গী করেনি তোমার সাথে? জিনিস পত্র ভা’ঙা চো’রা করেনি? বলো আমাকে !এটা কি ওর আব্বার বাড়ি? রাগ উঠেছে বা’ড়ি’ধু’ড়ি করে চলে গেলাম।”
তূর্যের মা হালকা দম বন্ধানো শ্বাস নিয়ে উত্তর দিলেন,
” সে তো ওর ছোটকালের অভ্যেস! রে’গে গেলেই…..”
” তুমি এখনো ছেলের টান টানবে?এত রে’গে যাওয়ার মতো কোনো কারণ তো আমি দেখছি না । অভ্যাস পাল্টাতে বলো ছেলেকে।অভ্যাস না ব’দভ্যাস! আর সবাইকে রেডি হয়ে থাকতে বলো, কাল ভোরেই আমরা রওনা হবো ”
আকবর চৌধুরী চেয়েছিলেন খুব সকাল সকালই বেরিয়ে পড়বেন ঢাকার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেটা হয়নি।বেরোতে বেরোতে অনেকটা দেরি হয়ে যায়।পারভিন বেগমের বাড়ির লোকেরা তো আসতেই দিতে চাইছিলেন না। অন্তত বৌভাতের অনুষ্ঠানটায় থেকে যাবার জন্য অনুরোধ করেছিলেন।
তুর্যের এভাবে হুট করেই ঢাকায় ফিরে যাওয়ার কারণ সম্পর্কেও সে বাড়ির লোকেরা অবগত নন।এদিকে ঢাকায় ফেরার আগে মেহেদী অনেক চে’ষ্টা করেছিল আহির সাথে আলাদা করে কথা বলার জন্য।কিন্তু পারেনি!
এসব নানান ঝা’মেলায় রওনা দিতে অনেকটা সময় লেগে যাওয়ায় তাদের ঢাকায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকাল গড়িয়ে গিয়েছে।
পারভিন বেগম বাড়িতে ফিরে গায়ে জড়ানো ভারী শাড়িটা পাল্টে কোনো রকমে নিত্যদিনে পরিহিত শাড়ি পরে দুই জা কে রান্নার জোগাড় করতে বলে আগে ছেলের রুমের সামনে গেলেন।দরজা ভেজিয়ে রাখা দেখে ধীরে ধীরে সেটা ঠেলে খুললেন। ঘর আধো অ’ন্ধকার, জানালার পর্দা বাতাসে দুলছে, টেবিলের উপর একটা খোলা বই আর আধখাওয়া কফির মগ পরে আছে। নিত্যদিনের আ’বর্জনা রাখার জন্য রুমের ভিতরে যে ওয়েস্ট বাস্কেট রাখা হয়েছে সেটা ভরে আছে অসংখ্য কাচের টুকরায়। রুমে স্থান পাওয়া সবচেয়ে দামি আর সুন্দর সোপিচটা দেখা যাচ্ছে না। ওয়েস্ট বাস্কেটে রাখা কাচের টুকরোগুলো হয়তো তারই। এই প্রথমবারের মতো তিনি ছেলের ঘর এতটা অগোছালো পেলেন।
তিনি চারদিকে তাঁকিয়ে একটু চি’ন্তিত হয়ে পড়লেন। রুমের কোথাও তূর্য নেয়। কয়েকবার ডাকও দিলেন ।কিন্তু কোনো উত্তর পেলেন না!বুকের ভেতরটা ধ’ক করে উঠলো।তারপর বেলকনির দিকে এগিয়ে গেলেন ।সেখানেও নেয়!তিনি আর সময় ন’ষ্ট না করে ছাদের দিকে হাঁটা ধরলেন।সেখানে পৌঁছাতেই ছেলেকে দেখতে পেলেন,সে ছাদের রেলিং ঘে’ষে দুই হাত বুকে বেধে দাঁড়িয়ে আছে।দৃষ্টি শূন্যে !সবসময় পরিপাটি করে রাখা চুলগুলো আজ এলোমেলো।মেসি ওয়েভী লেয়ার কাট করা চুলগুলো আজ জেল দিয়ে সেট করা নেয়।কেমন যেন উস্কো – খুস্কো,বাতাসে মৃদু উড়ছে। ছেলের এমন উদাসী ভাব দেখে বুকের ভিতর খ’চ করে উঠল পারভিন বেগমের।
” আব্বা ?”মমতা ভরা কন্ঠে ডাক দিলেন পারভিন বেগম।
ডাকটা তূর্যের কান অবধি পৌঁছালেও সে কোনো সাড়া দিল না। এখনো একই কায়দায় দাঁড়িয়ে আছে। যেন কারো উপস্থিতি সে টের পায়নি।পারভিন বেগম ফের ডাকলেন,
” কথা বলবি না আব্বা? ”
তূর্য এবার পিছন ফিরে মায়ের পানে চাইলো। ঠোঁটে তি’র্যক হাসির রেখা টেনে বলল,
” কেন বলবো না ? ফাইনালাইজড এভরিথিং? বলো সবটা।শুনি! ” ছেলের ভ’ঙ্গুর কন্ঠস্বর শুনে পারভিন বেগমের বুক কেঁ’পে উঠলো । তুর্যের ভিতরে কি চলে সেটা বাইরে থেকে বোঝা মুশকিল।তবে আজ কিছুটা হলেও বোঝা যাচ্ছে।
” ঘরে …….” ধপাধপ কারো পায়ের আওয়াজ শুনে থেমে গেলেন পারভীন বেগম। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে চাইলেন তিনি।তূর্যও মায়ের দিক হতে দৃষ্টি সরিয়ে সামনে চাইলো।
” তূর্য ভাই ?আপনি কি ছাদে ?” গলা উঁচু করে ডাকতে ডাকতে ছাদে পা রাখলো আহি। সেখানে পারভিন বেগমকেও উপস্থিত দেখে ফের বলল,
“বড় মা আপনিও আছেন! তাহলে থাক,আমি পরে আসবো ”
” না থাক মা,কেনো এসেছিলি বল।আমার কাজ আছে ” বলে বাকি কথাটুকু শেষ না করেই চলে গেলেন পারভিন বেগম । তিনি চোখের আড়াল হতেই আহি তূর্যের দিকে এগিয়ে গিয়ে গলার আওয়াজ কমিয়ে বলল,
” আপনাকে একটা গরম খবর দেওয়ার আছে। তবে তার বিনিময়ে আমি যা চাইব সেটা দিতে হবে ”
” অ’যথা ব’ক’ব’ক করে কানের মাথা খাস না ”
” অ’যথা নয়! একটু আগে আব্বু বড় আব্বুকে বলছিলেন আপনাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিতে ।তাহলে নাকি আপনি ঘরমুখো হবেন ”
“একথা তোর বাপ বলেছে?”
” হ্যাঁ !” বলে উপর – নিচ মাথা দোলালো আহি।
” গিয়ে বল তার ……” কথা শেষ না করে মাঝপথেই থেমে গেল তূর্য। আহি বাকি কথাটুকু শোনার জন্য তাড়া দিয়ে বলল,
” থামলেন কেন? কী বলব ? ”
” নাথিং! যা তুই ”
” বিনিময়ে কিছু একটা চেয়েছিলাম ”
” কী চাস?”ভ্রু কুঁচকে সুধালো তূর্য।
” আপনার রুমে সুন্দর একটা পেন দেখেছি । ওইটা দিবেন ?”
” আবার আমার রুমে গিয়েছিলি ?”
” আপনাকে খুঁজতে গিয়েছিলাম । দিবেন কলমটা ?”
” ঢং করিস ? কলম পিছনে লুকিয়ে রেখেছিস দেখিনি ভাবছিস?”
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১৯
তুর্যের কথা শুনে আহি কেবলা হাসি দিয়ে পিছনে লুকিয়ে রাখা হাতটা সামনে এনে পুনরায় দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলল,
” তাহলে নিয়ে নিলাম,হ্যাঁ ?” কথাটা বলেই এক দৌঁড়ে ছাদ থেকে নেমে গেল। যাওয়ার পথে একবার হোঁ’চট খেয়ে পড়তে গিয়েছিল,আবার নিজেকে সামলেও নিয়েছে।
