Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৫

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৫

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৫
ইনান হাওলাদার

ড্রেসিং টেবিলের সামনে ঠোঁ’ট উল্টে দাঁড়িয়ে আছে আহি। চোখ দুটো এখনো টলমল করছে। ডান হাত দ্বারা গলার বাম পাশের নরম অংশ অনবরত ডলে যাচ্ছে। একটা মানুষের দয়া-মায়া কতটা কম হলে এভাবে রা’ক্ষসের মতো কাঁ’মড় দিতে পারে ? র’ক্তের জমাট বাঁধিয়ে দিয়েছে একদম । অথচ , নিজের ভিতরে কোনো অনুশোচনার আঁচও দেখলো না।মেয়েটা আপন মনে আরো হাজারটা অভিযোগ দেওয়ার মধ্যে ফের রুমে প্রবেশ করলো তূর্য। ওকে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ডিভানে বসতে বসতে বলল,

” এখনো যাসনি ? ”
অভিমানে , কাঁ’ন্নায় ঠোঁ’ট ভেঙে আসলো আহির। অভিযোগের সুর তুলে বলল,
” আপনি এত খারাপ কেন তূর্য ভাই? একটা মানুষ আরেকটা মানুষকে এভাবে কি করে কাঁ’মড়াতে পারে? ”
” শুধু কাঁ’মড়েছি? সাথে আর কিছু করিনি ,হুম? ” ডিভানে মাথা এলিয়ে দিতে দিতে বলল ও।
” জুতা মে’রে গরু দান করতে কে বলেছে আপনাকে ? ”
” তো কাছে আয়,এবার শুধু গরু দান করি। কি হলো আয় ! জুতা মা’রবো না প্রমিজ ” ডিভান থেকে ওঠার ভান করতে করতে বলল ও।
আহি রাগে দুঃখে আর কথা বাড়ালো না। থমথমে মুখ নিয়ে বেরিয়ে গেল। তূর্য ঘাড় কাত করে তির্যক চোখে ওর যাওয়া দেখলো। মানবিটা চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হতেই মুচকি হেসে পুনরায় ডিভানে শরীর এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করলো।মিনিট খানেক ওভাবে রইলো।মাথাটা ঝিমঝিম করছে। এক কাপ কফি প্রয়োজন। ড্রয়িং রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো ও।
আহি তূর্যের রুম থেকে বের হওয়ার পরপরই তাহি ওকে ডাকতে এলো। মারুফা বেগম ডাকছেন। নিচে গেল ও। তিনি রাতের জন্যে ময়দা মাখছেন। আহি পাশে গিয়ে দাঁড়ালো । আড় চোখে একবার কফির কাপ হাতে বসে থাকা তূর্যকে দেখে নিলো। অধৈর্য ভঙ্গিতে মা কে বলল,

” ডাকছ কেন আম্মু ? ”
” দাঁড়া একটু ,বলছি ” হাতের কাজ বহাল রেখে বললেন মারুফা বেগম।
আহি সবজির ঝুড়ি হতে একটা গাজর বের করলো । সেটাকে সিঙ্ক হতে ধুয়ে এনে মোড়া টেনে মায়ের পাশে বসলো। খাচ্ছে আর একাধারে গলার সেই জায়গা ডলছে। বন্ধ টিভির স্ক্রিনে আহির কার্যকলাপ পুরোপুরি স্পষ্ট। তূর্য সেদিকেই তাঁকিয়ে আছে। এভাবে বিরতিহীন ভাবে গলা ডলতে দেখে বিড়বিড় করলো সে,
” যা একটু ব্য’থা পেয়েছিল ডলে ডলে সেটাকে দ্বিগুণ করবে ,ই’ডিয়ট !”
মারুফা বেগমও ওর এই ডলাডলি শুরু থেকে লক্ষ্য করছেন।হাতের কাজ শেষ করে বললেন,
” কি হয়েছে গলায় ? তখন থেকে ঘষা-মাজা করেই যাচ্ছিস!”
আহি ভুত দেখার মতো করে দ্রুত গলা থেকে হাত নামলো।সত্যি কথা বলা যাবে না।এদিকে মি’থ্যা কি বলবে খুঁজে পাচ্ছে না।মারুফা বেগমের প্রশ্নে তূর্য ওপাশ থেকে শুকনো কাঁশি দিয়ে উঠলো। মনে মনে আল্লাহকে ডাকলো । ব’লদটা আবার বিচার দেওয়ার জন্যে বলে না দেয় ” তূর্য ভাই কাঁ’মড়েছে। ”
এটা যে কাঁ’মড় না এ কথা ওই ই’ডিয়ট এখন বোঝাবে কে ! বড় তো কম হয়নি ,তবুও কোনটা কাঁ’মড়,কোনটা কি বোঝে না? নাকি বুঝেও অবুঝ থাকে উপরওয়ালা জানেন।
তড়িঘড়ি করে মি’থ্যা বানানো আহি।তোতলাতে তোতলাতে বলল,

” গান্ধী…গান্ধী পোকা ঘাড়ে এসে পড়েছিল।কাঁ’মড়েছে মনে হয়,তখন থেকে জ্ব’লছে আম্মু ”
তূর্য যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। তবে খানিকটা বিরক্তও হলো বটে। দুনিয়াতে আর পোকা পেল না,শেষে ওই পোকার সাথেই তুলনা দিতে হলো।দীর্ঘশ্বাস ফেললো একটা । মারুফা বেগম জেরা করলেন । বললেন,
” গান্ধী পোকা কোথায় পেলি তুই ? ”
” কোথায় পাবো আবার? ছাদে লাউ গাছ লাগিয়েছ সেখানে হয়েছে ” জোর গলায় বলল আহি।একেই বলে ‘ চো’রের মায়ের বড় গলা ।’ রা’ক্ষস লোকটার জন্যে এখন ওকে মি’থ্যা বলতে হচ্ছে। মেয়ের এহেন কথা মানতে পারলেন না তিনি । লাউ গাছে তিনি প্রতিদিন সকালে শান্ত অথবা প্রান্তকে দিয়ে স্প্রে করান। পোকা কোথা থেকে জন্ম নিবে? আবার নিজেকে বুঝ দিলেন তিনি ,হয়তো ওরা ঠিক মতো স্প্রে করে না।
মেয়ের কথা মেনে নিলেন ।বললেন,

” আচ্ছা,ওখানে একটু নারিকেল তেল মাখিয়ে নিস। ”
আহি মায়ের কথায় ‘ হ্যাঁ ‘ বোধক মাথা নাড়লো। মারুফা বেগম পুনরায় বললেন,
“শোন ,সন্ধ্যায় তোর ম্যামকে আসতে না করে দিস। একটু পার্লারে যেতে হবে ”
” কেন? ” অসময়ে পার্লারে যাওয়ার কথা শুনে অবাক হলো ও।
” নাক ফোঁড়াতে হবে না ? ” খোলসা করলেন মারুফা বেগম।
খরগোশের মতো একাধারে গাজর চিবোনো থেমে গেল মেয়েটার।চেহারায় আ’তঙ্ক ভর করলো।মুখ পাংসুটে করে জানতে চাইলো,
” অনেক ব্য’থা লাগবে আম্মু? ”
মারুফা বেগম কিছু বলার আগে ওপাশ থেকে তূর্য বলে উঠলো,
” ওসবের দরকার নেই মেজো মা ”
এতক্ষণ ধরে মা-মেয়ে দুজনের কথাই মনোযোগ সহকারে শুনছিল ও। তবে ওর কথা মানলেন না মারুফা বেগম।বললেন,

” না,বাবা ! বাঙালি বউয়ের নাকে নাকফুল না থাকলে ভালো দেখায় না।আর এতে আহামরি ব্য’থাও লাগবে না ”
” ভ’য় পাচ্ছে ও ”
আহি বিরোধিতা করলো তূর্যের,
” ভ’য় পাচ্ছি না আমি । ম্যামকে আসতে বারণ করে দিবো।কিন্তু আমি তোমার সাথে যাব না ” শেষ বাক্যটা থমথমে কন্ঠে বললো সে।
” কেন?”
” কান ফোঁড়ানোর সময় একটু চেঁ’চিয়ে উঠেছিলাম বলে তুমি আমার ডান গালে চ’ড় মে’রেছিলে,আমার মনে আছে আম্মু ”
” চেঁ’চানোর জন্যে মে’রেছিলাম ? নাকি পার্লারের ওই মহিলাকে থা’বড় মে’রেছিলি তাই মে’রেছিলাম,শ’য়তান? ”
” আমি তো আর ইচ্ছা করে মে’রেছিলাম না।আপনা-আপনি হাত উঠে গিয়েছিল ”
নির্দোষ সাজার চেষ্টা করলো ও।যদিও সে ইচ্ছা করে চ’ড় দিয়েছিল না।সত্যিই ভুল করে লেগে গিয়েছিল।মা-মেয়ের ঝ’গড়া আর নিতে পারলো না তূর্য। দ্রুত কফিটুকু শেষ করে উঠে পড়ল।
এদিকে মেয়ের কাছে হার মেনে নিলেন মারুফা বেগম,
” আচ্ছা,ঠিক আছে ।আমার সাথে যেতে হবে না।বুবু নাহয় লতার সাথে যাস। আজকে আর হচ্ছে না তাহলে, কাল যাস”

আহির ইচ্ছা ছিল আজকের শেষ ক্লাসটা করবে না ওরা। ফ্রেন্ডের সাথে নতুন উদ্বোধন হওয়া একটা রেস্টুরেন্টে যাবে।কিন্তু সেই ইচ্ছায় এক বালতি জল ঢেলে দিল তূর্য।একটু আগেই কল করে জানিয়েছে সে নিতে আসছে। এদিকে ফ্রেন্ডরাও ছাড়ছে না। হঠাৎ তূর্যের জরুরি তলব কেন সেটাও জানে না মেয়েটা। বন্ধু-বান্ধবের জোরাজুরিতে ও কল করলো তূর্যকে। একবার রিং হতেই কল কেঁ’টে ব্যাক করলো তূর্য। আহি সাথে সাথে রিসিভ করে আহ্লাদী গলায় ডাকলো,
” তূর্য ভাই? ”
এই কন্ঠ তূর্যের চেনা।এভাবে ডেকেছে মানে নিশ্চয়ই কোনো বাহানা আছে।সে বলল,
” বল ”
” আপনার নিতে আসতে হবে না ” আস্তে করে বলল ও।
বায়না এরকম হতে পারে তূর্যের ধারণার বাইরে ছিল। থাকারই কথা! এমনি সময় মেয়েটা ওর সাথে কোথাও যাওয়ার সুযোগ পেলে যেন আসমানের চাঁদ হাতে পায়। সারাক্ষণ মুখিয়ে থাকে যদি একটু ওর সাথে বেরোনো যায়। তূর্য জানতে চাইলো,

” হোয়াই? ”
” আজকে আমরা একটু বাইরে খেতে যাবো ”
” কেন? বাড়িতে রান্না করেনি ?”
আহি মনে মনে শুকরিয়া আদায় করল।ভাগ্যিস কথাগুলো কেউ শুনতে পাচ্ছে না।নাহলে এই ত্যাঁড়া কথা শুনলে বন্ধু সমাজে তার মান থাকতো না। তূর্য পুনরায় বলল,
” অন্য একদিন যাস। ”
” আপনার সাথে অন্য একদিন যাই ?”
” ডেইলি আমি ফ্রী থাকবো না আহি ” এবারে তূর্যের কন্ঠ কিছুটা শক্ত ছিল। কথাটা বলেই কল কাঁটলো ও।
সবাই ওর মুখের দিকে তাঁকিয়ে আছে। আহি মন খারাপ করে বলল,
” আজকে তোমরা যাও। আমি আরেকদিন যাবো”
কিন্তু কেউ মানতে নারাজ। সবাইকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলো আহি। এদিকে তারও সুপ্ত ইচ্ছা তূর্যের সাথেই বেরোনোর।
বেকায়দায় ফেসেছে মেয়েটা।একমাত্র তারিন ওকে বুঝছে । কিন্তু সে মেয়েটাও বাকিদের বোঝাতে পারছে না। বাকিরা আবারো জোরাজুরি করছে কল করার জন্যে।কিন্তু আহি এবার কিছুতেই কল করবে না। জানে ,এবার নিশ্চয়ই ব’কা শুনতে হবে। মেয়েগুলোর কাছে ব্যর্থ হয়ে আবারও কল করলো।এবারে রূঢ় কন্ঠ তূর্যের,

” কি প্রবলেইম তোর? একবার বলেছি না ? ”
আহির মুখ আরো মলিন হয়ে এলো। বেশ কয়েক মাস পর তূর্যের এমন রূঢ় কন্ঠ শুনলো ও। ফোনের ওপাশের ব্যক্তির মে’জাজ সম্পর্কে ধারণা নেই বাকিদের। তাদের মধ্যে থেকে একজন আহির কান থেকে মোবাইল নিয়ে কথা বললো। প্রথমেই সালাম জানালো,
” আসসালামু আলাইকুম,ভাইয়া।আমি আহির ফ্রেন্ড — রাত্রি ”
সালামের উত্তর দিলো তূর্য।মেয়েটা ভালো মন্দ জানতে চেয়ে মূল কথায় আসলো,
” ভাইয়া ,আমরা একটু বাইরে খেতে যেতে চাচ্ছিলাম।আপনি অন্য একদিন ওকে নিয়ে বেরোবেন ,প্লিজ? ”
ওকে কিছু বলল না তূর্য। শুধু বলল,
” আহির কাছে দেও ”
দিলো না মেয়েটা। সে তূর্যকে দিয়ে স্বীকার না করিয়ে মোবাইল দিবে না। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে অনুমতি দিলো তূর্য। মেয়েটা তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আহির হাতে মোবাইল দিয়ে দিলো। সে কানে ধরে কিছু বলার আগেই কল কেঁটে গেলে। তূর্য গম্ভীর মুখে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গন্তব্য পাল্টালো।

বাড়িতে ফিরে দুই হাত কচলাতে কচলাতে সারা রুম পায়চারি করছে আহি। ওভাবে মুখের উপর কল কেনো কেঁটে দিলেন তূর্য ভাই? রাগ করলেন না তো আবার! টেনশনে পেটের খাবারটাও হজম হয়নি।একটাবার লোকটার মুখ দেখলে বুঝতে পারতো রাগের পরিমাণ কতটুকু বা আদেও রাগ-টাগ কিছু করেছে কিনা।যদি রাগ করে থাকে সেটা ভাঙানো জরুরি।এদিকে লোকটার সামনে যেতেই ভয় লাগছে ওর। তাছাড়া গিয়ে স্যরি বললে কি কাজ হবে? যদি বলেন, ” স্যরি বললেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়?”
মনে সাহস যুগিয়ে তূর্যের রুমের সামনে গেল ও। সমস্যার মুখোমুখি না হলে তার সমাধান করা সম্ভব নয়। রুমে গিয়ে পেল না তূর্যকে। দম যতটুকু নিয়ে এসেছিল তার এক তৃতীয়াংশ ফুস করে হাওয়া হয়ে গেল। রুমে যখন নেই ছাদে আছে নিশ্চয়ই। সে জোর পায়ে হেঁটে ছাদে উঠলো। ধারণা সত্যি হলো ওর। ছাদের একপাশে থাকা দোলনায় বসে আছে তূর্য। কোলের উপর ল্যাপটপ। কোনো মুভি দেখছে হয়তো। আহি গিয়ে ডাকলো,

” তূর্য ভাই ?”
” হুম, বল ” চোখ স্ক্রিনে রেখে সাঁড়া দিলো ও।কন্ঠ পুরোপুরি স্বাভাবিক। মনে খানিকটা জোর পেল আহি।
উৎফুল্ল চিত্তে বলল,
” কি করছেন?”
” রো’মান্স করছি, দেখতে পাচ্ছিস না? ” বলে ওর দিকে তাঁকালো তূর্য। মেয়েটার মুখ থেকে হাসি নিবে গেল।মুখ গোমড়া করে তূর্যের পাশে বসতে বসতে বলল,
” আপনি কি আমার উপর রাগ করেছেন?”
” রাগ করার মতো কিছু হয়েছে?”তূর্য একটু চেপে গিয়ে জায়গা দিতে দিতে বলল।জায়গা পেয়ে আরাম করে বসলো আহি।আহ্লাদী গলায় বলল,
” বলুন না রা’গ করেছেন কিনা ”
” যদি বলি ‘ করেছি ‘ কি করবি? রাগ ভাঙাবি?”
” হুম ” উপর নিচ মাথা দোলাতে দোলাতে বলল ও।
” তাহলে ভা’ঙা ”
আহি মুঠো ভর্তি করে আনা এক্স-সেল ( X-cel) তূর্যের সামনে ধরলো। গাল ভর্তি হেসে বলল,

” এগুলো আপনার ! ” ভ্রু কুঁচকালো তূর্য । আহি বলল,
” আপনি সি’গারেট খেলেই এগুলো চিবোন আমি দেখেছি ”
” এগুলো দিলে রাগ ভাঙবে আমার? বাচ্চা পেয়েছিস?তাছাড়া, কি ভেবেছিস তুই? আমার সাথে না এসে ফ্রেন্ডের সাথে গিয়েছিস, সেই দুঃখে আমি স্মোকিং করছি?”
” তেমন কিছু না, এমনিই দিলাম । একটা সি’গারেট খেয়ে বাচ্চাদের মতো দোকানে গিয়ে বলবেন, ‘ আংকেল,একটা এক্সেল দিন ‘ কেমন দেখা যায় না? তাই !”
” আচ্ছা! ওগুলো আমার রুমে রেখে দিস ”
আহি উঠতে গেল তারপর আবার অনেক হিসাব-নিকাশ করলো। আজ পর্যন্ত তূর্যের মধ্যে ওর দেখা একমাত্র বদ অভ্যাস এইটা। ছেড়ে দিলেও তো পারে লোকটা। এই এখন তূর্য মুভির পজ করে রাখা অংশে একটা লোক — ভিলেন হবে হয়তো ঠোঁটে সি’গারেট গোজা আর নিচে ইংরেজি ছোট ছোট অক্ষরে লেখা , ‘ স্মোকিং ইজ ইনজিউরিয়াস টু হেলথ। ইট কজেস ক্যান্সার। ‘

” আর সিগারেট খাবেন না ,তূর্য ভাই ” আদেশ করলো সে।
” ওগুলো রেখে আয় ” আহির হাতের দিকে ইশারা দিয়ে বলল তূর্য।
” তারমানে আপনি সিগারেট খাবেনই ?”
” তোর কী প্রবলেইম ?”
” খুব বাজে গন্ধ ”
” অল্টারনেটিভ পেয়ে গেলে আর খাবো না ”
” অলটারনেটিভ কবে পাবেন আর কবে সি’গারেট ছাড়বেন? ”
” এইতো আর অল্প কিছুদিন পরই ”
কৌতূহল জাগলো আহির মনে।সন্দিহান কন্ঠে জানতে চাইলো,
” সিগারেট ছেড়ে আমার ভ্যাপ ধরবেন নাকি?”
” বাবাহ! ভ্যাপও চিনিস তুই ? ” আশ্চর্য হওয়ার ভান করে বলল তূর্য।
” আগে বলুন তো ..!” অধৈর্য হলো আহি।
” না ”
” তাহলে ?”
হুট করেই মেয়েটার কোমর ধরে হ্যাঁচকা টান দিলো তূর্য।নিজের সাথে পুরোপুরি মিশিয়ে নিয়ে গভীর চোখে তাঁকালো।আহির দুই হাত ওর বুকে যেয়ে থেকেছে।কন্ঠ গাঢ় করে বলল,

” ইউওর লি’পস ”
আহি অপ্রস্তুত হয়ে তড়িৎ জায়গা ত্যাগ করতে চাইলো।রক্তশুন্য মুখে এলেমেলো দৃষ্টিতে আশপাশ দেখলো। ওর আসলে উচিতই হয়নি এত জেরা করা। তার তো মনে রাখা উচিত ছিল ইদানিং খুব নি’র্লজ্জ হয়ে গিয়েছেন এই লোক। প্রতিটা কথার মাথায় একটা না একটা নি’র্লজ্জ মার্কা,অ’সভ্য কথা বলবেনই।কোমর থেকে পুরুষালি হাত জোড়া ছাড়াতে ছাড়াতে রা’গ দেখিয়ে বলল,
” আপনি রাগ করেননি মোটেও।শুধু শুধু আমি রাগ ভাঙাতে এসেছি ”
” নেক্সট টাইম রা’গ ভাঙাতে আসলে অন্য কিছু ট্রাই করবি। কি মিন করলাম বুঝেছিস ,আই থিঙ্ক ” ফিসফিসিয়ে বলল ও।
ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো মেয়েটার কান। তূর্য ওর ‘ ছেড়ে দে মা,কেঁদে বাঁচি ‘ অবস্থা দেখে নিঃশব্দে হাসলো। তার পরপর হাতের বাধন ঢিলা করলো। যেকোনো সময়ে যে কেউ ছাদে চলে আসতে পারে। বাড়াবাড়ি করলো না ও। ছাড়া পেয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে চলে গেল আহি।এত লজ্জা কোথা থেকে পায় ই’ডিয়টটা কে জানে ! পুরো দুনিয়ার লজ্জা ওনার নাকের ডগায়।স্টু’পিড !

দেখতে দেখতে বিয়ের দিন ঘনিয়ে এসেছে। মোটামুটি সকল অ্যারেঞ্জমেন্ট শেষ। দাওয়াত বা নেমন্তন্নের পর্ব চুকিয়ে গিয়েছে আরো আগেই। চৌধুরী বাড়ির প্রতিটি সদস্যের কেনাকাটাও প্রায় শেষ। মেহেদী থেকে শুরু করে বউ ভাত পর্যন্ত প্রতিটি ফাংশনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ড্রেস।
তবে বিয়ের বর-কনের যাবতীয় কেনাকাটা বাকি।এটা নিয়ে আহির বেজায় মন খারাপ। যেহেতু নিজের বিয়ের ব্যাপার তাই কাউকে বলতেও পারছে না ‘ আমার জন্যে কবে শপিং করবে?’ বিয়ে যেহেতু তার ,শপিং তো তাকে করেই দিবে, সেটা আজকে দিক আর বিয়ের আগের দিন দিক,এই ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছে ও। শপিং আটকে আছে তূর্যের জন্যে। সে সময়ও পাচ্ছে না আর যেতেও পারছে না।
আজকে বাড়ির তিন গিন্নি গিয়েছিলেন তাদের জন্যে শাড়ি কিনতে।সেগুলোই সকলে দেখছে। আহি তাদের প্রতিটি শাড়ি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। তিন জা’ই প্রতিটি ফাংশনের জন্য মিল করে শাড়ি কিনেছেন।শুধু কালার ভিন্ন। লতা বেগমের একটা শাড়ি আহির খুব পছন্দ হলো।ও আবদার করে বসলো,

” ছোট মা,আপনার এই শাড়িটা আমি একদিন পরবো,বুঝেছেন?”
” ঠিকাছে,পরিস ” মিষ্টি হেসে বললেন তিনি। আকবর চৌধুরী তূর্যকে নিচে নামতে দেখে বললেন,
” এখনো শপিংয়ে যাচ্ছ না কেন? পর্যাপ্ত টাকা না থাকলে আমার থেকে হাওলাদ করতে পারো ”
এই যে শেষ বাক্যটা তিনি বললেন, ইচ্ছা করে বললেন।তিনি জানেন এরকম দশটা বিয়ের খরচ একা বহন করার সাধ্য উপরওয়ালা ওনার ছেলেকে দিয়েছেন।
যেদিন থেকে জানতে পেরেছেন আহির সাথে ছেলের সম্পর্কের কথা সেদিন থেকেই ওনার এই ছেলের সাথে পায়ে পা লাগিয়ে ঝ’গড়া করতে ইচ্ছা করে। কেন করে জানেন না। তার ছেলে যে লাখে একটা এই নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই ওনার।আহিকে খুব যত্নে রাখবে এই বিশ্বাসও আছে। তবুও মেয়েটার সাথে ওকে মানতে ক’ষ্ট হয় ওনার।এরকম হাসিখুশি মেয়েটার সাথে তার ঘাউরা ছেলে যায় না।কিন্তু তাদের ভোলাভালা মেয়েটা বুঝলো না নিজের ভালো।
” খোঁচা মা’রবেন না তো ভাইজান।ওর সময় হলে নিয়ে যাবে ” হবু মেয়ে জামাইয়ের পক্ষ নিলেন মারুফা বেগম। পাশ থেকে আহি বিড়বিড় করে উঠলো,

” বিয়ের আগে আর ওনার সময় হবে বলে মনে হয় না ” সবাই শুনলো কথাটা। আকবর চৌধুরীও নিজের হবু বৌমার পক্ষ নিলেন,
” একদম মনের কথাটা বলেছিস মা। ”
তার এমন কথায় আহি কিছুটা গর্ব বোধ করলো।তূর্য বলল,
” সময় আমার হলেও আপনাদের আদরের মেয়ের হয় না ”
আহি যেন আসমান ভেঙে পড়ল।
” আমাকে কখনো বলেছেন শপিংয়ে নিয়ে যাবেন ?” ঝগড়ার শুরে বলল ও।
” কি বলবো তোকে? সেলিব্রিটি হয়েছিস ! আজকে এই রেস্টুরেন্ট উদ্বোধন করতে ডাকে তোকে ,কালকে এই কাজ থাকে ,পরশু আরেক কাজ ।আমি তো অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাচ্ছি না ”
আহি দুইয়ে দুইয়ে চার করলো। তাহলে সেদিন তূর্য ভাই শপিং করতে যাবে বলে ওকে নিতে আসতে চেয়েছিলেন।কিন্তু বাকি দুইদিনের কথা মনে করতে পারলো না। হয়তো সত্যিই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল নাহলে তূর্যের সাথে যেতে সে রাজি হবে না ,এটা তো স্বপ্নেও ভাবা যায় না।তার উপর শপিং করতে! ও উৎসাহ নিয়ে বলল,

” তাহলে আজকে যাবেন ? ”
তূর্য দেওয়াল ঘড়িতে তাঁকিয়ে একবার সময় মেপে নিলো।যেটুকু সময় পাবে এতে তার গোটা শপিংমল কেনা হয়ে গেলেও আহি দুইটা ড্রেস কিনতে পারবে কিনা সন্দেহ। বাকি কেনাকাটা তো দূরেই থাকলো।আর বারবার শপিংমল ঘোরাঘুরি মোটেও পছন্দ না ওর। একদিন যাবে আর সেদিনই গোটা শপিং করে নিবে।দরকার হয় পুরো দিন ঘুরবে । তবুও একদিনেই শেষ করতে হবে।ও একবার যাচাই করে নিলো,
” ছয় ঘন্টায় সকল কেনাকাটা ফিনিশ করতে পারবি? ”
সাথে সাথে মুখ চুপসে গেল আহির।জানত এই লোকের সাথে শপিংয়ে গেলে এমনটাই হবে । সে তো একটা বারের জন্যে বলেনি এই লোকের সাথে শপিংয়ে যাবে। ঘটা করে নিজে থেকেই নিয়ে যেতে চেয়েছে আর এখন সময়ও বেঁধে দিচ্ছে।তূর্য ওর মুখ দেখে যা বোঝার বুঝলো ।বলল,

” আচ্ছা,পরশু দিন একটু ফ্রি থাকার চেষ্টা করলে ভালো হতো ” বলে চলে গেল ও। আহিও পিছুপিছু দৌঁড় দিলো। মাঝ সিঁড়িতে গিয়ে পাকড়াও করলো। আস্তে করে বলল,
” আপনার অনেক কষ্ট হয়ে যাবে তূর্য ভাই।আমি আম্মু ,বড় মা বা ছোট মার সাথে যাব ”
” আমার সাথে যেতে কি প্রবলেইম ? ”
” আমার শপিং করতে অনেক টাইম লাগে ।তারপর আপনি ব’কবেন”
” বলেছি ব’কবো? ”
” গিয়েছিলাম একদিন অনেক ব’কেছিলেন,আমার মনে আছে।আপনি খুব অধৈর্য ”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো তূর্য।বলল,

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৪

” আর কত ধৈর্য ধরতে বলছিস তুই? ” একটু থেমে পুনরায় বলল,
” ব’কবো না ” আহি আরো কিছু বলতে চাইছিল।কিন্তু তার পূর্বেই তূর্য ওকে থামিয়ে দেয়।ও’য়ার্ন করে,
” আর একটা কথা বললে পুরো শপিং-ই বন্ধ করে দিবো ”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৬