প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১২
বন্যা সিকদার
মৌ খিলখিল করে হাসলো। ঠোঁটের চারদিকে লেগে থাকার আইসক্রিম উজানে’র শার্টে মুছে উওর দিল। “হুম।
“হায় আল্লাহ এই মেয়ে দেখি সামান্য চকলেট‚ আইসক্রিমের জন্যও ভালোবাসি বলে।
“এই পঁচা বর আমি একদমই চকলেট‚ আইসক্রিম জন্য ভালোবাসি বলিনি। আমার ক্রাস বর এতো গুলো চকলেট‚ আইসক্রিম‚ চিপস্ এনে দিয়েছে বলে তাকেই বলেছি। আমি আপনার মতো লুচু নই‚ যে বিয়ের আগেই ফষ্টি নষ্টি করি হু।
উজানে’র মুখটা এক নিমেষে বেলুনের মতো চুপসে গেল। সে মনে মনে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল‚ এই মেয়েটাকে নিয়ে আর পারা যায় না। সবসময় এক অক্ষর বেশি না বললে যেন এর পেটের ভাত হজম হয় না। উজান নিজেও এবার একটু মুখ বাঁকিয়ে‚ মৌ’য়ের কথার পিঠে উল্টো সুর ধরে খোঁচা দিয়ে বলে উঠল।
“ফষ্টি-নষ্টি করেছি তো ভালোই করেছি। তোমার মতো তো আর হাজার খানেক ছেলের প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে বেড়াই না।
মৌ আইসক্রিমটা মুখের কাছে নিয়েই আচমকা থেমে গেল। সে চোখ দুটো বড় বড় করে বলল‚ “ছিঃ আপনি নিজে একটা ছেলে হয়ে আবার আরেক ছেলের প্রেমে পড়তে চান? ঘরে আমার মতো এত সুন্দর অপ্সরা বউ থাকতেও নজরটা এত খারাপ কেন আপনার শুনি? নাকি আপনি আসলে একজন গ্যা…
মৌ’য়ের মুখের ওই মারাত্মক বাকি কথা শেষ হওয়ার আগেই উজান রীতিমতো বিষম খেয়ে চেঁচিয়ে উঠল„ “জাস্ট শাট আপ মিসেস চৌধুরী। তোমায় কি আমি এই এত চকোলেট‚ আইসক্রিম আর চিপসের পাহাড় এনে দিয়েছি আমার সামনে বসে বসে আমারই মুখে মুখে এভাবে তর্ক করার জন্য?
মৌ এক ভেংচি কেটে বলল‚ “হুহ সত্যি কথা শুনলে তো সবার গায়ে একটু জ্বালা ধরবেই‚ এটাই স্বাভাবিক। আর শোনেন মিস্টার খাটাস‚ আপনি মোটেও এই এত কিছু আমায় এনে দেননি। আপনি তো আমায় সবার সামনে নিজের বউ বলে স্বীকারই করতে চান না। এগুলো সব আমার ওই ড্যাশিং আর ক্রাশ বর উজান চৌধুরী এনে দিয়েছে আমায়। আর আমি শুধু আমার বরের কথাই শুনবো‚ আপনার মতো খাটাস লোকের এখানে কোনো দরকার নেই হু!
উজান নিজের নাক কুঁচকে চরম বিরক্তি নিয়ে তাকালো। “ফাজিল মেয়ে একটা।
’ফাজিল’ শব্দটা শোনা মাত্রই মৌ’য়ের ফর্সা মুখের রঙ মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে লাল হয়ে গেল। সে হাতের আইসক্রিমের চট করে শেষ করে দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর নিজের কোমড়ে হাত গুঁজে। গলার স্বর সপ্তমে চড়িয়ে কর্কশ কণ্ঠে প্রতিধ্বনি করে উঠল। ”আপনি ফাজিল‚ আপনার চৌদ্দ গুষ্টি ফাজিল। খচ্চর লোক বউকে ভালোবাসে না‚ শুধু কথায় কথায় বকে হুহ!
উজান চরম বিস্ময়কর দৃষ্টিতে কিছু সময় এই পুঁচকে মেয়ের রণচণ্ডী রূপের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের গলার স্বর খানিকটা উচু করে মুখ ভাঙিয়ে উত্তর দিল। “বউ? লাইক সিরিয়াসলি? তুমি বউ নও‚ বউ নামের অ্যাটম বোমা!
”হ্যাঁ এখন তো আমাকে অ্যাটম বোমা মনে হবেই। ঘরে এত সুন্দর বউ থাকতে বাহিরে ফষ্টি নষ্টি করতে পারেন কিনা।
উজান দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠে। “এই ইডিয়েট তোমার মনে হয় উজান চৌধুরী সত্যি সত্যি বাসার বাহিরে ফষ্টি নষ্টি করে?
“আপনি কি শুধু ফষ্টি নষ্টি করেন‚ সাথে নাঙ্গীদের সাথে ঘেঁষাঘেঁষিও করতে পারেন। তাই এখন বউকে তিতা লাগছে।
উজান নিজের কপাল কুঁচকে তাকালো। তারপর নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলো‚ “হোয়াট নাঙ্গী?
“একটা মেয়ের বয়ফ্রেন্ড বা প্রেমিককে যদি ‘নাঙ্গ’ বলতে পারে‚ তাহলে সেই হিসেবে আপনার ওই শিরিন পেত্নী একটা আস্ত নাঙ্গী।
উজানে’র মুখ দিয়ে আর কোনো কথা সরল না। সে শুধু একটা তপ্ত ও দীর্ঘশ্বাস ফেলল। উজানে’র ওই অসহায় অবস্থা দেখে মৌ সঙ্গে সঙ্গে আবারও একটা মুখ ভাঙাল। উজান নিজের ভেতরের সমস্ত রাগ ভুলে এবার নিঃশব্দে হেসে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল এবং চলো যেতে হাঁটতে লাগলো। ঠিক তখনই কিছু একটা মনে পড়তেই সে তড়িঘড়ি হয়ে মৌ’য়ের দিকে ঝুঁকে পড়লো।
“এই পিচ্চি ওয়েট‚ ওয়েট।
মৌ উজানে’র ওই আচমকা গলার আওয়াজে আর ঝড়ের গতিতে এগিয়ে আসায় ভয়ে কেঁপে উঠল। তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে‚ উজান কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার শক্ত হাতের কবজিতে নিজের ধারালো দাঁত দিয়ে কষে এক কামড় বসিয়ে দিল। উজান “আউচচ” করে নিজের হাতটা টেনে নিলো। মৌ সঙ্গে সঙ্গে দাঁত কটমট করে বলে‚
“খাচ্চর লোক একটা। এভাবে হুটহাট চিল্লাচিল্লি করে আমায় ভয় পাইয়ে একদম মেরে ফেলতে চান?
উজান নিজের হাতের কামড়ের দাগটার দিকে তাকিয়ে ফুঁ দিতে দিতে বলল‚ “ফাজিল কেমন করে কামড় দিলো। ইসসস কি ব্যথা। আর তুমি আবার ভয়ও পাও নাকি? আমি তো জানতাম এই দুনিয়ায় তুমি একাই সবার ভয়ের একমাত্র কারণ!
কথাটা শেষ হতেই মৌ নিজের বড় বড় চোখ দুটো আরও তীক্ষ্ম করে উজানে’র দিকে তাকাল। মুহূর্তের মধ্যে রাগে মৌ’য়ের পুরো মুখটা একদম লাল টকটকে রক্তবর্ণ ধারণ করল। বউ’য়ের ওই রাগী চাউনি দেখে উজান এবার নিজের গলা খাঁকারি দিয়ে অত্যন্ত মিনমিন স্বরে বিড়বিড় করে আওড়াল। “এমন করে তাকাও কেন ভয় লাগে তো!
মৌ এবারও কোনো কথা না বলে একদম ড্যাবড্যাব করে উজানে’র চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তা দেখে উজান নিজের চোখ দুটো ছোট ছোট করে নিল। মাথাটা খানিকটা নিচু করে ফিসফিস করে। “অগ্নিকন্যা‚ প্লিজ এমন করে তাকিও না। সত্যি সত্যি আমার ভয় লাগছে। বাই দ্য ওয়ে‚ একটা কথা বলো তো? তুমি কীভাবে জানলে জরিয়ে ধরা মেয়েটি শিরিন?
মৌ নিজের ঠোঁট উল্টে বলল‚ “কেন জানব না? আপনার ওই ফোন থেকে জেনেছি!
উজান এবার আকাশ থেকে পড়ার মতো চমকে উঠে। “হোয়াটটটট? তুমি আমার ফোন ঘেঁটেছো? তুমি কখন আমার ফোন ঘাঁটলে?
মৌ এবার বিছানার ওপর একদম টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে উজানে’র মুখোমুখি হলো। বিছানায় দাঁড়ানোর কারণে আজ সে উচ্চতায় ঠিক উজানে’র সমকক্ষ হয়েছে নয়তো মেঝেতে দাঁড়ালে সে বড়জোর উজানে’র চওড়া বুক অবধি পৌঁছাতে পারে। মৌ নিজের ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময়ী ও বিজয়ের হাসি ঝুলিয়ে রাখলো।
“আপনার ওই ফোন তো বাসর রাতের ঠিক পরের দিনই পুরো ঘেঁটে তছনছ করে ফেলেছি আমি। আপনার কপালটা বড্ড ভালো যে ওই পেত্নী শিরিনে’র কোনো ছবি আপনার গ্যালারিতে ছিল না নয়তো সেইদিনই আপনাকে কোরবানি দিয়ে দিতাম। খুব ভালো করে মনে রাখবেন মিস্টার প্রফেসর‚ আপনি এখন আমার বর। আমার বর হয়ে যদি অন্য কোনো নারীর দিকে চোখ তুলে তাকান বা ফ্লার্ট করেন‚ তবে আপনার ওই সুন্দর চোখ দুটো আমি নিজে টেনে উপড়ে ফেলব। আর সাথে ওই মেয়েটাকে একদম খুন করে ফেলবো।
মুহূর্তের মধ্যে উজান এক হেঁচকা টানে মৌ’কে বিছানা থেকে নিজের শক্ত আর চওড়া বুকের ওপর টেনে নিল। আচমকা এই কাণ্ডে মৌ বড্ড ভয় পেয়ে নিজের চোখ-মুখ শক্ত করে খিঁচে বন্ধ করে ফেলল। হুট করেই যখন সে অনুভব করল কারো অত্যন্ত তপ্ত আর ভারী দীর্ঘশ্বাস তার মুখের ওপর আছড়ে পড়ছে‚ তখন সে নিজের চোখ দুটো পিটপিট করে মেলল। চোখ খুলেই দেখল উজান তার মুখের এতটাই কাছে ঝুঁকে আছে যে দুজনের নাকের ডগা প্রায় ছুঁইছুঁই। উজানে’র এই অতর্কিত ঘনিষ্ঠতা দেখে মৌ’য়ের বুকের ভেতরের হৃদপিণ্ডটা যেন বিদ্যুৎ গতিতে লাফাচ্ছে। উজান মৌ’য়ের চোখের দিকে গভীর দৃষ্টি রেখে হুট করেই এক চিলতে বাঁকা হেসে বলে উঠল„
“তা কয়জনকে মারবেন মিসেস চৌধুরী? আপনার এই হ্যান্ডসাম বরকে যে অনেক মেয়ে নিজের করে চায়।
মৌ এবার এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে উজানে’র কলারটা নিজের ছোট ছোট হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে অত্যন্ত দৃঢ় ও জেদি গলায় উত্তর দিল। ”যে কয়জনই আপনাকে চাক না কেন‚ আমি তাদের সবাইকে খুন করবো। খুব ভালো করে শুনে রাখুন মিস্টার প্রফেসর‚ এই মিসেস উজান চৌধুরী নিজের ব্যবহারের একটা সামান্য সুতোও কখনো কারো সাথে শেয়ার করে না। সেখানে আপনাকে তো অন্য কারো সাথে শেয়ার করার প্রশ্নই ওঠে না। আপনি শুধু আমার‚ আর শুধুই আমারই থাকবেন। বুঝতে পেরেছেন?
পুঁচকে বউয়ের মুখে এই প্রথম এমন স্পষ্ট আর তীব্র অধিকারবোধের স্বীকারোক্তি শুনে উজান নিঃশব্দে হাসল। তার বুকের ভেতর এক অন্যরকম ভালোলাগা ছুঁয়ে গেল। সে আলতো করে মৌ’কে নিজের বুক থেকে ছেড়ে দিল এবং কোনো কথা না বাড়িয়ে শান্ত পায়ে কক্ষ ত্যাগ করল। উজান রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই মৌ নিজের বিছানায় ধপাস করে বসে নিজের মনেই খিলখিল করে হেসে উঠল। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে‚ তার এই খাটাস বরটা ইদানীং আর আগের মতো তার ওপর খুব একটা বিরক্ত হয় না। বরং তার এই পাগলামিগুলো এখন বেশ উপভোগই করে!
বিকেলের স্নিগ্ধ ও হালকা মিষ্টি বাতাসের মাঝে একা একা হেঁটে চলছে মেহের। সামনেই তাদের পরীক্ষা‚ তাই লাইব্রেরিতে বসে কিছু দরকারী নোটস আর বই পড়তে পড়তে কখন যে বিকেল গড়িয়ে গিয়েছে সে বুঝতেই পারেনি। অবশ্য এখন অনেকটা দিন অনেক বড়‚ সন্ধ্যা হতে এখনও বেশ খানিকটা সময় বাকি আছে। কাঁধে ভারি কলেজের ব্যাগটা ঝুলিয়ে সে ক্লান্তিভরা পায়ে ধীরে ধীরে পিচঢালা রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলছে। এই প্রচণ্ড গরমে হেঁটে চলার কারণে তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হয়েছে। অন্য দিনগুলোর তুলনায় আজ গরমটা একটু বেশিই পড়েছে। মেহের যখন নিজের মনে হেঁটে যাচ্ছিল‚ ঠিক তখনই হুট করে পাশে কারো এক দীর্ঘ ছায়া আর চেনা উপস্থিতি টের পেল।
সে চমকে পাশে ফিরে তাকাতেই দেখে তার ঠিক গা ঘেঁষে হেঁটে চলছে ইফাত চৌধুরী। ইফাত’কে এই অসময়ে হুট করে নিজের ঠিক পাশে দেখতে পেয়ে মেহেরে’র চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। ইফাত মেহেরে’র ওই থতমত খেয়ে যাওয়া মুখটা দেখেই ঠোঁটের কোণে এক মুচকি হাসি ঝুলাল। তারপর মেহের কিছু বুঝে ওঠার আগেই‚ চোখের পলকে তার কাঁধ থেকে ভারী ব্যাগটা নিজের হাতে টেনে নিল। অতঃপর মেহেরে’র পায়ে পা মিলিয়ে একদম তাল মিলিয়ে হাঁটতে লাগল। মেহের চরম অস্বস্তিতে পড়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে তোতলামি কণ্ঠে বলে উঠল‚ “আ আ আপনি এখানে? আর আমার ব্যাগ এভাবে আপনাকে নিয়ে যেতে হবে না‚ আমি নিজেই নিজের ব্যাগ ক্যারি করতে পারব। দিন ওটা।
ইফাত মেহেরে’র কথা শুনে সাথে সাথে মাঝরাস্তায় থমকে দাঁড়িয়ে গেল। সে নিজের জোড়া ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল‚ “এই যে মিস মেহের‚ আমি তোমার চেয়ে বয়সে বড় নাকি তুমি আমার চেয়ে বড়?
মেহের মাথা নিচু করে আমতা আমতা করে বলল‚ “আ আ আপনি বড়।
“গুড! তাহলে আমি যা বলব তুমি ঠিক তাই করবে। কোনো তর্ক করবে না‚ চুপচাপ হেঁটো।
ইফাত আবার হাঁটতে শুরু করে আলতো হেসে বলল‚ “আর একটা গুড নিউজ শোনল‚ আমি কিন্তু এখন থেকে নিয়মিত বাবার সাথে অফিসে যাবো। আজকেও গিয়েছিলাম। প্রথম দিন তো তাই কাজগুলো বুঝতে একটু কষ্ট হয়েছে। তবে ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে কী বলো?
মেহের নিজের শুকনো ঢোক গিলে অত্যন্ত নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিল। “সেটা আমাকে কেন বলছেন?
ইফাত এক পলক মেহেরে’র ম্লান মুখের দিকে তাকালো। “তোমাকে বলব না তো আর কাকে বলবো‚ শুনি?
”আমি কীভাবে জানব কাকে বলবেন? আর প্লিজ আমার ব্যাগটা এবার আমায় দিয়ে দিন। ভাইয়া আমাকে বলে দিয়েছে রাস্তায় চেনা-অচেনা কোনো ছেলের সাথে যেন বেশি কথা না বলি।
এক মুহূর্তও ব্যাগটা নিজের কাছে রাখল না ইফাত। সে সজোরে মেহেরে’র হাতে তার ব্যাগটা ধরিয়ে দিল। তবে মেহেরে’র এই রুক্ষ উত্তর শুনে ইফাতে’র মনটা একটুও খুশি হলো না বরং তার পুরো মুখটা কালো হয়ে গেল। মেয়েটা তাদের বাসা থেকে নিজেদের বাড়িতে চলে আসার পর থেকে কেন যেন আবারও কেমন জানি চেঞ্জ হয়ে গিয়েছে। অথচ ওই কয়েকটা দিন যখন সে তাদের বাড়িতে ছিল। তখন কত সুন্দর করে হেসে হেসে ইফাতে’র সাথে কথা বলত। কিন্তু এখন তার আচরণ একদম ভিন্ন‚ পুরোপুরি অচেনা। সে আজ সকাল থেকে মেহের’কে কম করে হলেও ২০ থেকে ৩০ বার ফোন করেছে অথচ মেহের একটা ফোনও রিসিভ করেনি! কেন মেয়েটা তার সাথে এমন অদ্ভুত আচরণ করছে‚ ইফাত কিছুতেই তার সমীকরণ মেলাতে পারছে না।
ইফাত একটু এগিয়ে গিয়ে মৃদু কণ্ঠে ডাকল।
“ফুলকন্যা!
মেহের মনের ভেতর এক তীব্র ধাক্কা খেয়ে চমকে তাকাল। সে মনে মনে ভাবল‚ এই লোকটার সাথে সে যত দূরত্ব বজায় রেখে চলতে চায়। লোকটা ঠিক ততটাই তার কাছাকাছি চলে আসে। সে কীভাবে এই পাগল মানুষটাকে বোঝাবে যে‚ তার মনের গভীরে মেহের’কে নিয়ে যে আশা ও রঙিন স্বপ্ন বাসা বেঁধেছে তা পূরণ হওয়া এই সমাজে একদম অসম্ভব। ইফাত মুখে নিজের ভালোবাসার কথা সরাসরি প্রকাশ না করলেও‚ মেহের তার ওই চোখের ভাষা খুব ভালো করেই বুঝতে পারে। ইফাতে’র মনে মেহেরে’র জন্য কী গভীর অনুভূতি চলছে‚ তা সে স্পষ্ট টের পায়। আর ঠিক সেই কারণেই সে দূরত্ব বজায় রাখে। তবুও এই মানুষটা কেন যেন তার থেকে দূরে সরে যায় না। মেহের’কে ওভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইফাতে’র কণ্ঠস্বর এবার বড্ড অসহায় শোনাল। সে আবারও জিজ্ঞেস করল‚
“ফুলকন্যা তুমি কি আমার ওপর খুব বেশি বিরক্ত?
মেহের মাথা নাড়িয়ে নিচু স্বরে বলল‚ “কই না তো। বিরক্ত হব কেন?
“তাহলে আমাকে এভাবে সারাক্ষণ এভয়েড করো কেন? তুমি কি জানো‚ তোমার করা এই এভয়েড করা আমি একদম নিতে পারি না? তোমায় আজ সকাল থেকে আমি কতগুলো ফোন করলাম অথচ তুমি একটা বারও আমার ফোনটা রিসিভ করলে না। তুমি কি একবারও ভেবে দেখেছো‚ এতে আমার মনটা কতটা হার্ট হয়েছে। আমি কতটা কষ্ট পেয়েছি?
ইফাতে’র এই তীব্র আকুলতা আর কষ্টের কথা শুনে মেহেরে’র বুকটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে নিজের চোখের অশ্রু লুকানোর জন্য অপরাধীর মতো মাটির দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে রইল‚ তার মুখ থেকে একটি শব্দও বের হলো না। ইফাত মেহেরে’র একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার এক হাত আলতো করে ধরতে চাইল। তার কণ্ঠে তখন অনুনয়‚
“ফুলকন্যা প্লিজ কিছু তো বলো?
কিন্তু এবারও মেহের একটা কথাও বলল না। সে নিজের হাতটা সরিয়ে নিয়ে ছলোছলো চোখে ইফাতে’র দিকে তাকাল। ঠিক তখনই তার নজর গেল কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সাব্বিরে’র ওপর। সাব্বির’কে দেখা মাত্রই মেহের যেন এক মস্ত বড় বাঁচার উপায় খুঁজে পেল। সে আর এক সেকেন্ডও ইফাতে’র সামনে দাঁড়াল না বরং তড়িৎ গতিতে দৌড়ে সরাসরি সাব্বিরে’র কাছে চলে গেল। ইফাত মাঝরাস্তায় একা দাঁড়িয়ে অসহায় ও শূন্য দৃষ্টিতে কিছু সময় মেহেরে’র চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভেতরটা এক তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠল।
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১১
সে কোনো ভাবেই এই মেয়েটাকে বোঝাতে পারছে না যে‚ মেহেরে’র প্রতি তার এই তীব্র টান কোনো সাময়িক মোহ নয়৷ এটা তার হৃদয়ের একদম গভীর থেকে সৃষ্টি হওয়া এক পবিত্র অনুভূতি! ইফাত নিজের অতীতে অনেক মেয়ের সাথেই তো মিশেছে‚ অনেক রিলেশনশিপও করেছে, কিন্তু মেহেরে’র জন্য কেন তার ভেতরটা এমন ব্যাকুল হয়ে ওঠে? কেন মেহের’কে একটু না দেখলে তার সাথে একটা দিন কথা না বললে মনটা ভীষণ অস্থির হয়ে যায়? এই তীব্র ছটফটানি তো সে আগে কখনো কারো জন্য অনুভব করেনি। কিন্তু নিজের মনের এই আকুল কথাটুকু সে কীভাবে ওই অবুঝ মেয়েটাকে বোঝাবে‚ তা ভেবেই ইফাত এক তপ্ত ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু সে চেষ্টা করবে‚ যেভাবেই হোক অবুঝ মেয়েটাকে নিজের করে ছাড়বে।
