প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩০
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না
রাত তখন প্রায় এগারোটা। চারপাশটা এক নিবিড় শান্ততায় ঢেকে গেছে। হঠাৎ করেই ঘরে মিষ্টি একটা হাসির রেখা ছড়িয়ে জিয়া ঢুকলো। রিত্তিকার দিকে তাকিয়ে বেশ উৎসাহ নিয়ে বলল,
—“রিত্তি, জানিস? বাগানে না কত সুন্দর মাধবীলতা আর বাগানবিলাস ফুটেছে! বাতাসে কী দারুণ সুবাস ভেসে আসছে! চল না, বাইরে গিয়ে ফুলগুলোর সাথে কিছু ছবি তুলে আসি?”
রিত্তিকা বই থেকে চোখ তুলে জিয়ার দিকে তাকাল। তার মুখেও নিমেষেই এক চিলতে আনন্দ খেলে গেল, —“চল যাই! ফুলের সাথে ছবি তুলতে আমার বেশ ভালো লাগে। আর রাতের চাঁদের আলোয় ও স্নিগ্ধ পরিবেশে তো ছবিগুলো আরও সুন্দর আসবে, বল?”
—“হুম চল! দেখ, আমি কিন্তু একদম সেজেগুজে তৈরি!”— জিয়া নিজের পোশাকটা একটু গুছিয়ে নিয়ে ঘুরিয়ে দেখাল।
রিত্তিকা হেসে উঠে বলল, —“তুই সেজেছিস আর আমি সাজবো না, তা কি হয়? দাঁড়া, আমি খালি হালকা করে চোখে একটু কাজল টেনে নিই। কাজল না দিলে তো আমার সাজ পূর্ণ হয় না!”
জিয়া মিষ্টি হেসে সহমত প্রকাশ করল, —“হ্যাঁ, নে নে! তোকে সত্যি চোখে কাজল পরলে অনেক অনেক সুন্দর লাগে রে।”
—“একটু দাঁড়া, এখনই আসছি!”— বলেই রিত্তিকা কৌতূহল ও আনন্দ নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু ড্রয়ার খুলে, অনেক খোঁজাখুঁজি করেও নিজের পছন্দের কাজলটা কোথাও খুঁজে পেল না।
ড্রেসিং টেবিল থেকে মুখ ঘুরিয়ে জিয়াকে জিজ্ঞেস করল, —“জিয়া, তোর কাছে কি কাজল আছে? আমি না আমার কাজলটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি না!”
—“না রে, আমি তো চোখে কাজল দিই না, তাই আমার কাছে নেই।”
কথাটা শোবামাত্রই রিত্তিকার উৎফুল্ল মুখটা এক মুহূর্তে বিষাদে ছেয়ে গেল। কাজল ছাড়া তার যেন সব সাজই অসম্পূর্ণ। বিষণ্ণ মন নিয়ে বিছানার দিকে এগিয়ে এসে বসে পড়ল।
—“তাহলে তুই যা জিয়া, আমি আর ছবি তুলতে যাব না।”
—“কেন রে? ছবি তুলবি না কেন?”
—“কাজল ছাড়া আমার ছবি তুলতে একদম ভালো লাগে না রে। আমার ভাগ্যে বোধহয় সুন্দর ফুলগুলোর সাথে সুন্দর করে ছবি তোলার সুযোগটাই নেই!”
জিয়া রিত্তিকার মন খারাপ দেখে কাছে এসে তার কাঁধে হাত রাখল, —“আরে মন খারাপ করিস না! আজ কাজল নেই তো কী হয়েছে? চল এমনিই ছবি তুলি। কাল না হয় দুজনে মিলে মার্কেট থেকে তোর জন্য সুন্দর কাজল কিনে নিয়ে আসব।”
—“না, আমি একদমই যাব না। তুই যা।”
জিয়া আর জোর করতে না পেরে একপ্রকার অগত্যাই ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ঘরের সব কথা নিঃশব্দে শুনছিল জিয়ান। রিত্তিকা যে কাজলের জন্য ছবি তুলতে পারল না এবং মন খারাপ করে ঘরে বসে রইল— এই সামান্য অভিমানটুকুও জিয়ানের বুকে গিয়ে বিধল। জিয়ান আর ঘরে ঢুকল না। রিত্তিকার এই মন খারাপের মেঘ কীভাবে কাটানো যায়, সেই ভাবনায় সে চুপচাপ বাইরে বেরিয়ে গেল।
রাত তখন প্রায় একটা ছুঁইছুঁই। পুরো শহর নিঝুম। রাস্তার বেশিরভাগ দোকানই বন্ধ হয়ে গেছে। জিয়ান গাড়িতে করে একের পর এক গলি ঘুরছে, যদি একটাও প্রসাধনীর দোকান খোলা পাওয়া যায়! কিন্তু রাতের এই সময়ে কোনো দোকানই খোলা নেই। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে একটি ছোট গলির মোড়ে একটা প্রসাধনীর দোকান খোলা দেখতে পেল সে। তবে দুর্ভাগ্যবশত, দোকানদার তখন দোকানের শাটার নামিয়ে তালা লাগানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
জিয়ান আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে দোকানের সামনে গিয়ে বলল,
—“আপনার দোকানে কাজল আছে?”
দোকানদার একটু অবাক হয়ে জিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, —“কাজল তো আছে, কিন্তু ভাই এখন তো দোকান বন্ধ করে ফেলেছি। আপনি কাল সকালে আসবেন।”
—“না! আমার কাল সকালে হলে চলবে না, আমার এখনই লাগবে। দোকানটা একটু খুলুন!”
দোকানদার বিরক্তির সুরে বলল, —“বলছি তো ভাই, কালকে আসবেন। একবার দোকানের শাটার বন্ধ হয়ে গেছে মানে কাল সকালের আগে আর খোলা হবে না। ।”
, —“আমি আপনাকে এই কাজলের যা দাম, তার ডাবল টাকা দেব! দোকানটা একটু খুলুন, কাজলটা আমার খুব জরুরি।”
জিয়ানের কথা শুনে দোকানদার একটু থামল। জিয়ানের চোখের আকুতি আর জেদ দেখে সে মৃদু হাসল। জিয়ানের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
—“শুনুন ভাই, টাকার লোভ আমার নেই। তবে এত রাতে কাজলের জন্য আপনার এত ব্যাকুলতা দেখে অবাক হচ্ছি! কার জন্য লাগবে আপনার এত রাতে কাজল?”
জিয়ান বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে গম্ভীর অথচ নরম গলায় বলল,
—“আমার বউয়ের জন্য।”
উত্তরটা শুনে দোকানদারের মুখের বিরক্তি নিমেষেই এক অদ্ভুত উষ্ণতায় বদলে গেল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেসে বলল,
—“আচ্ছা বুঝলাম! স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার কাছে নিয়মের দেয়াল রাখা যায় না। দাঁড়ান, দোকান খুলছি।”
দোকানদার শাটার তুলে ভেতরে গেল এবং তাক থেকে একটি সুন্দর কাজলের বক্স বের করল। বক্সটা জিয়ানের সামনে তুলে ধরে দোকানদার নিজ থেকেই বলল,
—“এই বক্সটায় মোট কতগুলো কাজল আছে জানেন? ১৪৩ টা! ১৪৩ মানে বুঝতেই পারছেন— ‘I Love You’! আপনি চাইলে এই পুরো বক্সটাই নিতে পারেন। আপনার বউ কিন্তু এই উপহার পেয়ে অনেক বেশি খুশি হবে!”
জিয়ান আর দ্বিতীয়বার কিছু ভাবল না। রিত্তিকার চোখের সেই সামান্য বিষাদ মুছে দেওয়ার জন্য এই উপহারটাই সেরা। সে কালবিলম্ব না করে ১৪৩টি কাজলের পুরো বক্সটার পেমেন্ট করে দিল এবং দোকানদারকে ধন্যবাদ জানিয়ে কাজল নিয়ে ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
ঘরে ফিরে জিয়ান দেখল রিত্তিকা ততক্ষণে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। জিয়ান খুব সাবধানে, যাতে কোনো শব্দ না হয়, কাজলের বক্সটি ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে দিল।
এরপর কাবাড থেকে নিজের একটা ট্রাউজার আর টি-শার্ট নিয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে শাওয়ার নিয়ে এলো।
চুল তোয়ালে দিয়ে মুছে জিয়ান ধীরে ধীরে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। রিত্তিকার পাশে শুয়ে পড়ল সে। জিয়ানের সমস্ত হৃদয় জুড়ে যেন এক অব্যক্ত ভালোবাসার জোয়ার বইছিল। সে খুব সাবধানে, যেন রিত্তিকার ঘুম না ভাঙে, রিত্তিকাকে টেনে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে নিলো।
রিত্তিকার সুবাস, তার ঘ্রাণ জিয়ানের অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দিল। জিয়ান তার মুখটা রিত্তিকার গলায় গুঁজে রাখল কিছুক্ষণ। রিত্তিকার চুলের সুবাস তার ভেতরের সমস্ত সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিচ্ছিল। চুলের সুবাস নিতে নিতে জিয়ান মুখ তুলে আবার রিত্তিকার গলার কাছে নিয়ে গেল। সেখানে নরম ঠোঁটে ছোট ছোট অনেকগুলো আদুরে চুমু আঁকল। ভালোবাসার এক গভীর আবেগে জিয়ান রিত্তিকার গলায় আলতো করে একটু কামড় বসিয়ে দিল।
সেই মিষ্টি স্পর্শে ঘুমন্ত রিত্তিকা সামান্য নড়ে উঠল।
রিত্তিকার সেই সামান্য নড়াচড়াতে জিয়ান চমকে উঠে নিজের হুঁশে ফিরে এলো। সে নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুশোচনায় এবং নিখাদ ভালোবাসায় যেখানে কামড় দিয়েছিল, ঠিক সেই জায়গায় আবার খুব শান্ত আর নরম করে চুমু খেলো।
অতঃপর ঘুমন্ত রিত্তিকার মুখের দিকে তাকিয়ে হৃদয়ের গভীর থেকে বিড়বিড় করে বলল,
___“জানি না আমার সাথে কী হচ্ছে… তোমার থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিলাম , কিন্তু আমি সত্যি আর পারছি না। তোমার সাথে অন্য কাউকেই সহ্য হচ্ছে না আমার…”
ঠিক সেই মুহূর্তেই, ঘুমন্ত রিত্তিকা নিজেই দু হাত বাড়িয়ে জিয়ানকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তাকে দেখে মৃদু হেসে জিয়ান রিত্তিকার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।তার সেও তাকে জড়িয়ে ঘুমের মাঝে তলিয়ে গেলো।
পরের দিন সকালে আকাশে আলোর মিষ্টি দ্যুতি নিয়ে শুরু হলো একটি সুন্দর ও স্নিগ্ধ দিন। জিয়ান খুব ভোরে উঠে ফ্রেশ হয়ে ফজরের নামাজ আদায় করল। নামাজ শেষে সে কিছু কাজের জন্য বাইরে চলে গেল।
জিয়ান বাইরে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই রিত্তিকার ঘুম ভাঙল। দেয়ালঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল সকাল ৫ টা বাজে। সে বিছানা ছেড়ে উঠে ধীরপায়ে ফ্রেশ হতে গেল। ফ্রেশ হয়ে এসে প্রথমে নিজের নামাজ আদায় করল। এরপর পড়ালেখা করার জন্য পড়ার টেবিলে গিয়ে কিছুক্ষণ পড়তে বসল।
পড়া শেষ করে স্বাভাবিকভাবেই রিত্তিকা চুল বাঁধতে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গেল। তখনই চোখে গেল ড্রেসিং টেবিলের ঠিক মাঝখানে একটা সুন্দর, নতুন বক্স রাখা।
রিত্তিকা বেশ অবাক হয়ে মনে মনে ভাবল,
___“এটা কিসের বক্স? এত সকালে এখানে কে আনল?”
কৌতূহল সামলাতে না পেরে সে আস্তে করে বক্সটা খুলল। বক্স খুলতেই রিত্তিকার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল! ভেতরে সারি সারি সাজানো রয়েছে অজস্র কাজলের কাঠি!
—“এতো কাজল কে আনলো? আর কখন-ই বা আনলো?”— রিত্তিকার মাথায় অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল, কিন্তু তার মনের ভেতরের আনন্দ তখন বাঁধ মানছিল না।
সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। বক্স থেকে একটা কাজল বের করে খুব নিখুঁতভাবে নিজের দুই চোখে সুন্দর করে টেনে কাজল পরে নিল। কাজল পরার পর তার চোখ দুটো যেন এক অন্যরকম মায়াবী রূপ ধারণ করল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই জিয়ান রুমের ভেতরে ঢুকছিল। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে রিত্তিকাকে কাজল পরতে দেখে এবং তার মুখের সেই অনাবিল আনন্দ দেখে জিয়ানের বুকের ভেতরটা এক অজানা সুখে ভরে উঠল। সে দরজার কাছে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কাজল পরা শেষ করে রিত্তিকা পেছনে ঘুরতেই দেখল জিয়ান দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখেই রিত্তিকা কাজলের বক্সটির দিকে নির্দেশ করে কৌতূহল ও বিস্ময় মেশানো গলায় জিজ্ঞেস করল,
—“স্যার, এই কাজলগুলো কি আপনি নিয়ে এসেছেন?”
জিয়ান রিত্তিকার প্রশ্নের কোনো সরাসরি উত্তর দিল না। কাজল পরা সেই মায়াবী, কালো চোখের দিকে তাকিয়ে জিয়ান যেন এক অন্য জগতে হারিয়ে গেল। রিত্তিকার কাজল কালো চোখের অতল গহ্বরে ডুব দিয়ে অত্যন্ত ধীর ও গম্ভীর কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“মাশাল্লাহ…”
রিত্তিকা জিয়ানের এই বিড়বিড় করে বলা কথাটা পুরোপুরি বুঝতে না পেরে আবার জিজ্ঞেস করল,
—“কী হলো? বলুন না স্যার, এগুলো কে আনল?”
জিয়ান নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল,
—“হ্যাঁ, আমিই এনেছি। কাল রাতে দেখলাম কাজল নেই বলে ছবি না তুলে মন খারাপ করে বসে আছ, তাই নিয়ে এলাম।”
রিত্তিকার হৃদয়টা এক অদ্ভুত কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসায় ভরে উঠল। সে মিষ্টি করে হেসে বলল,
—“অনেক অনেক ধন্যবাদ, স্যার! আপনি এত ভালো কবে থেকে হলেন?”
জিয়ান রিত্তিকার দিকে একপলক তাকিয়ে থেকে চোখ দুটি নামিয়ে নিল। এরপর অত্যন্ত নিচু কণ্ঠে, নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে বলল,
**“সেই দিন থেকে… যে দিন থেকে তুমি আমার লাইফে এসেছ।”
জিয়ান এমনভাবে কথাটা বলল যাতে রিত্তিকার কানে সেই জাদুকরী স্বীকারোক্তিটা না পৌঁছায়।
রিত্তিকা কিছুই শুনতে না পেয়ে আবার জিজ্ঞেস করল,
—“কী হলো, কিছু বললেন?”
প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২৯
জিয়ান রিত্তিকার দিকে তাকিয়ে গলার স্বর গম্ভীর করে কাজের কথায় ফিরে এলো,
—“কিছু না। কাজল তো পরা হলো, এবার পড়তে বসো।”
__এখন পড়তে বসতে পারবো না, অনেক পড়েছি খিদে লাগছে আমি খেতে যাচ্ছি। আর আপনার যদি পড়ার ইচ্ছা থাকে তাহলে পড়ুন আমি গেলাম বাই।
