Home প্রফেসর জিয়ান কায়সার প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৭

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৭

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৭
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না

রিত্তিকা জিয়ানের ঘরের দিকে তাকিয়ে মনে মনে একটা শেষ ভেঙচি কেটে হালকা হেসে বললো, “হ্যাঁ চল, আজকের রাতের বিনোদন একদম পয়সা উসুল মতো ছিল!”
​তারপর তারা দুজনে মিলে হাসিমুখে ঘরের দিকে রওনা দিল।

কবির,জিহাদ, সাইফান জিয়ানকে ধরে নিয়ে এসে তার ঘরে দিয়ে চলে গেল।
দরজাটা দড়াম করে বন্ধ হতেই জিয়ানের বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভটা আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়লো । নিচে ঘটে যাওয়া অপমানজনক ঘটনাটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। হাত দুটো মুঠো করে, চোয়াল শক্ত করে জিয়ান মনে মনে ফুঁসে উঠল,
​”তুমি নিজেকে কী মনে করো আমি তা জানি না। কিন্তু এইটুকু অন্তত মনে রেখো—তুমি যা করেছ, তার প্রত্যেকটি হিসাব খুব শীঘ্রই আমি সুদে-আসলে উসুল করে ছাড়ব।”
​রাগে, ক্ষোভে সেদিন রাতে আর এক ফোঁটাও ঘুম হলো না তার। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেই কেটে গেল পুরোটা রাত।

পরদিন সকালে কায়সার বাড়ির খাবার টেবিলে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। সুফিয়ান কায়সার থেকে শুরু করে পরিবারের প্রায় সবাই উপস্থিত হয়েছে। টেবিলে হরেক রকমের নাশতা সাজানো, কিন্তু সবার মাঝে কেবল একটি আসন শূন্য। জিয়ান নেই।
​চারপাশে চোখ বুলিয়ে রিহানা কায়সার বললেন, “জিয়া, জিয়ানকে একটু ডেকে নিয়ে আয় তো মা। ”
​জিয়া বলল, “মা, আমি একটু আগেই ভাইয়াকে ডাকতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভাইয়া বলল ওর নাকি একদম খিদে নেই। ও এখন নিচে আসবে না।”
​টেবিলের এক কোণায় বসে চামচ দিয়ে প্লেট নাড়াচাড়া করছিল রিত্তিকা। জিয়ার কথা শুনে তার ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময়, তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। মনে মনে সে নিজেকে বলল, ‘আসবেন কী করে উনি? কাল রাতে ওনার অহংকারে যেভাবে আঘাত লেগেছে, তারপর মুখ দেখানোর সাহস আছে নাকি! আচ্ছা জব্দ হয়েছে।’
রিত্তিকার এই অকারণ মুচকি হাসি রেনিয়া কায়সারের
(জিহাদের মা) নজর এড়াল না। তিনি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার রিত্তিকা মা, তুমি একা একা হাসছ কেন? কিছু হয়েছে নাকি?”

​রিত্তিকা একটু অপ্রস্তুত হয়ে নিজের হাসিটা আড়াল করার চেষ্টা করল, “না না, আন্টি! তেমন কিছু না।
তারপরেই বললো, আসলে… বলছিলাম কি, আমি আজকে একটু পরেই চলে যাব। বেলা বাড়ছে তো, আর কিছুক্ষণ পর আমার ভার্সিটি আছে। আজ সময়মতো পৌঁছাতে হবে।”
​এতক্ষণ চুপ করে থাকা পরিবারের অভিভাবক সুফিয়ান কায়সার এবার মুখ খুললেন। গম্ভীর কিন্তু স্নেহশীল কণ্ঠে বললেন, “এত তাড়াহুড়ো কিসের রিত্তিকা? আজ এখান থেকেই সরাসরি ভার্সিটি চলে যাও।”
আচ্ছা দাদু। আমি এখান থেকে ভার্সিটি যাবো।
____​আজ ভার্সিটির চত্বরটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা
ঠেকছে রিত্তিকার কাছে। প্রতিদিন যেখানে অনুশা, নিহারিকা আর আনিকা ক্লাস শুরুর আগে আড্ডা জমিয়ে রাখে, আজ সেখানে কেউ নেই। মেয়েগুলোর কোনো পাত্তাই নেই আজ! রিত্তিকা মনে মনে একটু অবাক হলেও জিয়ার তাড়া খেয়ে দ্রুত করিডোর পেরিয়ে ক্লাসরুমে গিয়ে ঢুকল।
​ঠিক সময়েই তারা ক্লাসে পৌঁছাতে পেরেছে। প্রথম ক্লাসটাই প্রফেসর জিয়ানের। স্যার ক্লাসে প্রবেশ করতেই পুরো রুম জুড়ে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। উপস্থিত সব শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করে একসাথে সালাম দিল। প্রফেসর জিয়ানও মুখে এক চিলতে অমায়িক হাসি নিয়ে সালামের উত্তর দিলেন এবং সবাইকে বসতে বললেন তিনি।

​আজ জিয়ান স্যারকে দেখতে অন্যরকম সুন্দর লাগছিল। পরনে নিখুঁত ফিটিংয়ের একটি কালো ব্লেজার, যা তার গম্ভীর ব্যক্তিত্বকে যেন আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।যা দেখে রিত্তিকার অবস্থা আজ একটু ভিন্ন। সে খাতা-কলম সামনে নিয়ে বসলেও, তার চোখ যেন জিয়ান স্যারের ওপর থেকে সর ছিলই না। স্যারের ব্ল্যাকবোর্ডে লেখার ভঙ্গি, কথা বলার স্টাইল—সবকিছু মিলিয়ে রিত্তিকা মন্ত্রমুগ্ধের মতো একদৃষ্টে স্যারের দিকেই তাকিয়ে রইল। ক্লাসের বাকি দুনিয়াটা যেন তার চারপাশ থেকে ঝাপসা হয়ে গেছে।
​ঠিক তখনই ক্লাসের সেই মোহময় নীরবতা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল এক অদ্ভুত আর বিকট আওয়াজে।
​হঠাৎ করেই রিত্তিকার ফোনের রিংটোনটা তীব্র শব্দে বেজে উঠল। কোনো সাধারণ টিউন নয়, পুরো ক্লাসরুম কাঁপিয়ে স্পিকারে বেজে উঠল এক অদ্ভুত ডায়ালগ আর হাসির আওয়াজ—

“হি… হা হা হা হা হা…
দেখি তারা সুন্দরী আমি তো যেখানে সেখানে থাকি না
আমি একতলায় বাস করি তিন তলায় থাকি!
তাতে লোকের কি করে সব মনি মা…
ছি মা ছি ছি ছি যত হয়েছে জ্বালা!”
​পুরো ক্লাসের সবার নজর মুহূর্তের মধ্যে ঘুরে গেল রিত্তিকার দিকে। কেউ কেউ মুখ চেপে হাসতে লাগল, কেউ আবার চরম বিরক্ত হলো। কিন্তু রিত্তিকার সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই! সে তখনো ঘোরলাগা চোখে জিয়ান স্যারের দিকেই তাকিয়ে আছে। ফোনের ওই অদ্ভুত রিংটোন বাজছে তো বাজছেই, অথচ রিত্তিকা যেন এক অবাস্তব জগতে হারিয়ে গেছে।

এই চরম বিশৃঙ্খলা দেখে প্রফেসর জিয়ানের ফর্সা মুখটা রাগে থমথমে হয়ে গেল। তার কপালে ভাঁজ পড়ল, চোখের দৃষ্টি হয়ে উঠল তীক্ষ্ণ আর রাগী। তিনি হাতের চকটা সজোরে ডেস্কে রেখে ভারী কদমে এগিয়ে এলেন রিত্তিকার বেঞ্চের দিকে। স্যারের পুরো অবয়ব থেকে যেন রাগ ঝরে পড়ছে।
​জিয়ান স্যার একদম রিত্তিকার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। অথচ রিত্তিকা এখনো ঘোর কাটেনি, সে বোকার মতো স্যারের দিকে তাকিয়েই আছে!
​জিয়ান স্যার চরম গম্ভীর আর রাগী কণ্ঠে টেবিলের ওপর একটা জোরে চাপড় মেরে বললেন,

“মিস রিত্তিকা! ক্লাসরুমটাকে কি আপনার মগের মুল্লক মনে হয়।
ক্লাস চলাকালীন সবার সামনে ফোন স্পিকারে দিয়ে এই ধরনের ফালতু গান শোনার সাহস আপনার হয় কী করে, মিস রিত্তিকা? পড়াশোনায় মনোযোগ না দিয়ে ক্লাসে বসে আপনি মিউজিক উপভোগ করছেন? দিস ইজ আ ইউনিভার্সিটি ক্লাস, আপনার বাড়ি বা থিয়েটার হল নয় !”
জিয়ানের তীব্র রাগী চেহারা দেখে রিত্তিকা ভয়ে একেবারে সিঁটিয়ে গেল। তার গলা শুকিয়ে কাঠ। ক্লাসের বাকি সবাই তখন তার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করছে।
​রিত্তিকা কোনোমতে কাঁপাকাঁপা গলায় আমতা আমতা করে বলল,

” সরি স-স্যার… আসলে আপনি যা ভাবছেন তা নয়… এটা কোনো গান না…”
​”তাহলে এটা কী?” জিয়ান স্যার দুই ভ্রু কুঁচকে আরও এক ধাপ এগিয়ে এলেন, তার রাগ যেন কমছেই না।
​রিত্তিকা কোনোমতে নিজের কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে ফোনটা হাতে নিল এবং ফোনের স্ক্রিনটা স্যারের দিকে ঘুরিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “স্যার, আমি ক্লাসে বসে গান শুনছিলাম না। এটা আসলে… আসলে আমার ফোনের রিংটোন! কেউ একজন কল দিয়েছে, তাই আওয়াজ হচ্ছে। আমি ইচ্ছা করে গান ছাড়িনি, স্যার…”

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৬

​কথাটা বলেই রিত্তিকা তাড়াহুড়ো করে ফোনটা সাইলেন্ট করে ফেলল। কিন্তু জিয়ান স্যারের রাগী চাউনি তখনো তার ওপর থেকে সরল না।।
“ইজ দিস হোয়াট আ রিংটোন সাউন্ডস লাইক?! ডোন্ট ইউ হ্যাভ দ্য মিনিমাম সেন্স টু সাইলেন্স ইয়োর ফোন বিফোর এন্টারিং দ্য ক্লাস? লিভ মাই ক্লাস রাইট নাউ। জাস্ট আউট!”
বাট স্যার..

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here