Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১০

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১০

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১০
রাত্রি মনি

ইতালি, রোম
রোমের এক স্বর্ণালী জাগরণ। তিবের নদীর বুকে রোদের কোমল ছোঁয়া। প্রাচীন কলোনার স্তম্ভে আলো-ছায়ার খেলা টহল দেয় ইতিহাস। বাতাসে ভেসে আসে সভ্যতার গন্ধ। গির্জার ঘন্টা ধ্বনি যেন নতুন দিনের প্রতিজ্ঞা। আকাশে শান্তির রং। আর শহর জেগে ওঠে এক নীরব মহিমায়।
ডোরবেলের কর্কশ শব্দটা তন্দ্রাচ্ছন্ন মস্তিষ্কে হাতুড়ির মতো আঘাত করল আলেস্সান্দ্রোর। গভীর বিরপ্তিতে কুঁচকে গেল কপাল। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ল্যাবের কাজ পেছনে ফেলে বিছানায় গা এলিয়েছিল সে। ক্লান্তিতে ভেঙে আসছিল শরীর।

বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে সে, শরীরের নিচের অংশটুকু দামী কমফোর্টারে ঢাকা। উন্মুক্ত চওড়া পিঠের ওপর ঝাপসা আলোয় জীবন্ত হয়ে উঠেছে একটি ড্রাগন সাপের ট্যাটু। কালচে কালিতে আঁকা সেই ড্রাগনের ধারালো দাঁতগুলো এমনভাবে বের করা, যেন অবাধ্য কোনো শিকারের গলায় এই মুহূর্তেই কামড় বসাবে।
আবারো ডোরবেল! এবার শব্দটা যেন আরও জেদি। আলেস্সান্দ্রোর চোয়াল শক্ত হয়ে এল। বাড়িতে একঝাঁক মেইড থাকার কথা, কিন্তু এই অসময়ে কাউকেই কি পাওয়া যাবে না? বিড়বিড় করে একদলা বিরক্তি উগরে দিয়ে সে বিছানায় উঠে বসল।কমফোর্টারটা একপাশে ঠেলে দিয়ে দ্রুত একটা টি-শার্ট গলিয়ে নিল শরীরে। এরপর আলসেমি মাখা পায়ে স্লিপার জোড়া পরে নিয়ে ঘরের বাইরে পা বাড়াল।
লিভিং রুমে এসে মেইন ডোরটা খুলতেই বাইরের ঠান্ডা বাতাস আর উজ্জ্বল আলো এসে লাগল চোখে। সামনে দাঁড়িয়ে বিশ-একুশ বছরের এক তরুণ। মাথায় ক্যাপ, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। তার হাতে একটা বেশ বড়সড় কার্টুন বক্স।তরুণটি বিনয়ের সাথে বলল,

“স্যার, আপনার পার্সেল। দয়া করে এখানে একটা সাইন করে দিন।”
আলেস্সান্দ্রো সরু চোখে বক্সটার দিকে তাকাল। তার প্রখর স্মৃতিশক্তি বলছে, সম্প্রতি সে এমন কোনো কিছুর অর্ডার করেনি। কাজের ব্যস্ততায় কেটেছে এই কয়েকটা দিন। কন্ঠস্বরে বরফশীতল গাম্ভীর্য মিশিয়ে সে বলল,
“আপনি বোধহয় ভুল ঠিকানায় এসেছেন। আমি কোনো পার্সেল অর্ডার করিনি।”
ডেলিভারি বয়টি কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে হাতে থাকা রসিদটা চেক করল।
“কিন্তু স্যার, ঠিকানা তো একদম নির্ভুল। এখানে কি মিস্টার আলেস্সান্দ্রো থাকেন না?”
নিজের নামটা এভাবে একজন সাধারণ ডেলিভারি বয়ের মুখে উচ্চারিত হতে শুনে আলেস্সান্দ্রোর রগচটা মেজাজটা মুহূর্তেই চড়ে গেল। তার আভিজাত্যে যেন কেউ সজোরে ধাক্কা দিল। তবে সে নিজেকে সংবরণ করল, চেহারায় ফুটতে দিল না সেই আগ্নেয়গিরি।
হাত বাড়িয়ে শান্ত গলায় বলল,

“জি, আমিই আলেস্সান্দ্রো। পার্সেলটা দিন। যে পাঠিয়েছে, তার কোনো নাম কি এখানে উল্লেখ আছে?”
ছেলেটি এপাশ-ওপাশ উল্টে দেখে মাথা নাড়াল।
“না স্যার, প্রেরকের কলামটা একদম ফাঁকা।”
পার্সেলটা হাতে নিয়ে খসখসে একটা সাইন করে দিল আলেস্সান্দ্রো। হয়তো তার পরিচিত কোনো বন্ধু বা বিজনেস পার্টনার পাঠিয়েছে এই পার্সেল। ডেলিভারি বয়কে বিদায় করে দিয়ে সে ভারী সদর দরজাটা সজোরে আটকে দিল। লিভিং রুমের ডাইনিং টেবিলে পার্সেলটা অযত্নে রেখে পা বাড়াল ফ্রিজের দিকে।
হঠাৎই করিডোরের ওপাশ থেকে দুজন মহিলা সার্ভেন্ট হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। তাদের ফ্যাকাশে মুখ আর থরথর করে কাঁপা হাতগুলোই বলে দিচ্ছিল, তারা কতটা আতঙ্কিত। যেন আগেই বুঝে গেছে, আজ কিছু একটা ভুল হয়েছে।আলেস্সান্দ্রো সেদিকে না তাকিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানির বোতল বের করল।

“কোথায় ছিলে তোমরা?”
তার কণ্ঠস্বর শান্ত, কিন্তু তার ভেতর লুকিয়ে আছে আগ্নেয়গিরির উত্তাপ।তাদের একজন তোতলাতে তোতলাতে উত্তর দিল,
“সরি স্যার… ওদিকে… ‘নেরো’কে খাবার দিতে গিয়েছিলাম।”
আলেস্সান্দ্রো গ্লাসে পানি না ঢেলে সরাসরি বোতল থেকেই ঢকঢক করে পানি পান করল। তার প্রতিটি চুমুকের শব্দ যেন ওই ঘরে উপস্থিত মেয়ে দুটির হৃদপিণ্ডের ধুকপুকুনি থামিয়ে দিচ্ছিল। সে ধীরে ধীরে বোতলের ছিপিটা আটকাল।
“আমি বলেছিলাম, আমার ঘুমের সময় যেন কোনো ধরনের ডিস্টার্বেন্স না হয়।”
আলেস্সান্দ্রোর চোখ দুটো এবার তাদের ওপর স্থির হলো, যা কোনো হিংস্র শিকারি প্রাণীর চেয়ে কম নয়।
“আমার আদেশ অমান্য করার পানিশমেন্ট কী, সেটা নিশ্চয়ই তোমাদের অজানা নয়?”
“উ-উই আর সরি স্যার! আর কখনো এমন হবে না!”

আলেস্সান্দ্রো কোনো উত্তর দিল না। শান্ত ভঙ্গিতে টেবিলের ওপর রাখা তার রুপালি রঙের হ্যান্ডগানটা তুলে নিল। কোনো ধরনের সতর্কবার্তা ছাড়াই পরমুহূর্তে একটি গুলির শব্দ পুরো হলঘরে প্রতিধ্বনিত হলো। একজন সার্ভেন্টের হাতের তালু এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে বেরিয়ে গেল বুলেটটা।
মেয়েটি যন্ত্রণায় কুঁকড়ে মেঝেতে পড়ে গেল, কিন্তু তার অন্য হাত দিয়ে আহত হাতের তালুটা চেপে ধরে গগনবিদারী চিৎকারটা গলার ভেতরেই আটকে রাখল। সে জানে, তার মালিকের সামনে কান্নার শব্দ করা মানে নিজের মৃত্যু পরোয়ানা আরও দ্রুত সই করা।পাশে থাকা অন্য মেয়েটিও ভয়ে পাথর হয়ে তার সহকর্মীকে জড়িয়ে ধরে মেঝেতে বসে পড়ল।

আলেস্সান্দ্রো নিচু হয়ে বন্দুকের নল থেকে বের হওয়া ধোঁয়াটা দেখল। তারপর বরফশীতল গলায় বলল, “আই ডোন্ট লাইক মেকিং মিস্টেকস্। এন্ড আই নেভার লাইক দোস হু মেক মিস্টেকস্।”
সেই হাড়হিম করা কণ্ঠস্বর বাতাসকে ভারী করে তুলল। আলেস্সান্দ্রো টেবিলের পাশে থাকা একটি লাল সুইচে চাপ দিতেই যান্ত্রিক শব্দে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল দুজন বিশালদেহী গার্ড।
“নেরোর কাছে নিয়ে যাও ওদের, দে উইল বি নেরোস্ স্পেশাল মিল টুডে।”
গার্ডরা রোবোটের মতো মেয়ে দুটিকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, তাদের আহাজারি আর বাঁচার আকুতি দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছিল। কিন্তু আলেস্সান্দ্রোর পাথুরে হৃদয়ে সেই করুণ সুর সামান্যতম আঁচড়ও কাটতে পারল না। সে নির্বিকার চিত্তে নিজের টি-শার্টের হাতা ঠিক করল।
কিছুক্ষণ পরেই পাশের সেই বদ্ধ অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে ভেসে আসতে লাগল মানুষের বীভৎস আর্তচিৎকার আর হাড়গোড় চিবানোর পৈশাচিক শব্দ। তার সাথে মিশে আছে কোনো এক আদিম হিংস্র প্রাণীর জিভ লকলক করা হিসহিস আওয়াজ।

নেরো কোনো সাধারণ বন্য পশু নয়। সে আলেস্সান্দ্রোর ল্যাবে তৈরি এক অভিশপ্ত সৃষ্টি। হিংস্র মাংসাশী প্রাণীর ভ্রূণ আর মানুষের ডিএনএ-র এক ভয়ংকর সংমিশ্রণ—এক নরখাদক দানব। দেখতে মানুষের আদল হলেও তার ভেতরে বাস করে এক ক্ষুধার্ত জন্তু, যার একমাত্র কাজ হলো আলেস্সান্দ্রোর অবাধ্য হওয়া মানুষদের রক্তে নিজের তৃষ্ণা মেটানো।

বেশ কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে বসে থাকার পর আলেস্সান্দ্রোর ভেতর কৌতূহল দানা বাঁধতে শুরু করল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে বক্সের প্যাকিংটা ছিঁড়তে শুরু করল। কভার খুলতেই এক তীব্র ভ্যাপসা গন্ধে তার নাকে ধাক্কা দিল—রক্ত আর পচনশীল মাংসের মিশ্রিত এক উৎকট গন্ধ।
বক্সের ভেতরে তাকাতেই আলেস্সান্দ্রো খিঁচে চোখ বন্ধ করে নিল। সেখানে পড়ে আছে একটা বীভৎসভাবে কাটা মানুষের মাথা। সাধারণ কোনো মানুষ এই দৃশ্য দেখলে ভয়ে জ্ঞানশূন্য হয়ে যেত, কিন্তু আলেস্সান্দ্রোর স্নায়ু ইস্পাতের মতো শক্ত। ল্যাবে ছিন্নভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে কাজ করাটা তার নিত্যদিনের অভ্যাস। তবে এবারের দৃশ্যটা তাকে সামান্যতম হলেও বিচলিত করল। কারণ, এই কাটা মাথাটা কোনো অচেনা মানুষের নয়; এটি তার ছোট ভাই, সান্দ্রে-র।

সান্দ্রের প্রাণহীন চোখের মণিগুলো যেন স্থির হয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বিচার চাইছে। বক্সের ভেতরে যত্ন করে রাখা হয়েছে মাংসের ছোট ছোট টুকরো আর সাদাটে হাড়। নিখুঁত কোনো কসাইয়ের মতো প্রতিটি অংশ আলাদা করা হয়েছে। এক মুহূর্তের জন্য আলেস্সান্দ্রোর বুকটা কেঁপে উঠল, দীর্ঘ শ্বাস টেনে সে নিজের হৃৎস্পন্দন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করল।
কাটা মাংসের স্তূপের এক কোণে একটা ভাঁজ করা চিরকুট রক্তে ভিজে সপসপে হয়ে আছে।আলেস্সান্দ্রো ঘৃণাভরে সেটা তুলে নিল। তাতে লেখা:

“বিশ্বাসঘাতকদের আমি কোনোদিন ক্ষমা করি না। তোর প্রাণের ভাই সান্দ্রে আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল শুধুমাত্র তোর জন্য। তাই ওর শরীরের ২,৫৯৫টি টুকরো উপহার হিসেবে তোর কাছেই পাঠিয়ে দিলাম। আশা করি, উপহারটা তোর পছন্দ হবে। ইতি—তোর যম।”
চিঠিটা পড়া শেষ হতেই আলেস্সান্দ্রোর চোয়াল শক্ত হয়ে এল। হাতের মুঠোয় চিরকুটটা এমনভাবে পিষল যে তার হাতের নীল শিরাগুলো তীরের মতো ফুটে উঠল। কপালে রগগুলো দপদপ করছে। আগ্নেয়গিরির মতো ফুটতে থাকা ক্রোধ ভেতরে চেপে রেখে সে শূন্যে তাকিয়ে বিড়বিড় করল,
“কাজটা তুই মোটেও ঠিক করলি না। এর পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেটা তোর ধারণারও বাইরে। ভুলে যাস না, তোর সেই মূল্যবান হার্ডড্রাইভ এখনো আমার কবজায়।”

ভাইয়ের লাশের সামনে দাঁড়িয়েও আলেস্সান্দ্রোর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক রহস্যময়, পৈশাচিক হাসি। সেই হাসিতে শোকের লেশমাত্র নেই, আছে শুধু এক চরম ধ্বংসের নীল নকশা।
ঘরটা অন্ধকার। শুধু একটা টিউবলাইটের ঝাপসা আলো প্রতীয়মান।দেয়ালে ফাটল, স্যাঁতসেঁতে নোনা জল উঠে ফোস্কার মতো ফুলে উঠেছে। বাতাসে একটা পঁচা কাঠ, ছাঁকা রক্ত আর মৃত জন্তুর গন্ধ যা গলার নিচে দলা পাকিয়ে বসে যায়। মেঝের কোণায় জমে থাকা পানির গন্ধে মাছিও ভিড় করে না, যেন তারাও জানে এখানে থাকা নিরাপদ নয়।

একটা পরিত্যক্ত গোডাউন। যেখানে মানুষজনের আনাগোনা নেই বললেই চলে।নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ একটা প্লাস্টিকের ড্রামের নিচ থেকে ফিসফিসানি শোনা গেল। একটা কুচকুচে কালো সরু সাপ, তার মসৃণ শরীর দিয়ে শীতল আতঙ্কের এক নীল রেখা এঁকে দিয়ে দেয়ালে উঠে গেল। আশেপাশে বিষাক্ত বিচ্ছু আর নাম না জানা সব পতঙ্গদের রাজত্ব।
এরই মাঝে নিস্তব্ধতা চিরে ভেসে এলো একটি মৃদু গোঙানি। ধুঁকতে থাকা আলোয় দেখা গেল—ঘরের মাঝখানে একটি কাঠের চেয়ারে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বসে আছে এক তরুণী। একসময় হয়তো তার রূপ মুগ্ধ করার মতো ছিল, কিন্তু এখন সেই শরীরের প্রতিটি ক্ষতচিহ্ন এক একটি যন্ত্রণার মহাকাব্য। মুখটা সাদা কাপড়ে ঠাসা, চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে এসেছে। সে দেখছে না, বরং মৃত্যুর প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে।
হঠাৎ…

ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে গোডাউনের ভারী লোহার দরজাটা খুলে গেল। টক-টক-টক।বাইরের অন্ধকারের চেয়েও কালো একজোড়া হিল জুতো মেঝেতে শব্দ তুলল।এগিয়ে আসছে এক নারী। পরনে তার স্লিভলেস ব্ল্যাক গাউন, কাঁধ পর্যন্ত নামানো ধারালো ব্লান্ট বব কাট চুল। এক হাতে একটি ছোট আয়না, অন্য হাতে টকটকে লাল লিপস্টিক। অদ্ভুত এক নির্লিপ্ততায় সে তার ওষ্ঠদ্বয়ে এঁকে দিচ্ছে রক্তের মতো গাঢ় প্রলেপ।তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি, আর গলায় সেই ভুতুড়ে গুনগুনানি,
“কোই নাম হে কোয়ি… ব্যাদনাম হে কোয়ি…”

গানের সুরটা যেন এই পচা গন্ধ আর অন্ধকারের সাথে মিশে এক বীভৎস সিম্ফনি তৈরি করেছে। সেই সুরের প্রতিটি কম্পন উপস্থিত বন্দি তরুণীর শিরদাঁড়া দিয়ে এক তীব্র শীতল স্রোত বইয়ে দিল। তার চেতনার শেষ সুতোটুকু ছিঁড়ে গেল। সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল, কিন্তু রশিগুলোর বাঁধন মাংস ভেদ করে হাড় অবধি কামড়ে ধরছে। চারটি দিন সে এক ফোঁটা পানি পায়নি। তৃষ্ণায় জিবটা তালুর সাথে সেঁটে গেছে, প্রতিবার শ্বাস নিতে গেলে মনে হচ্ছে ফুসফুসে কেউ জ্বলন্ত কয়লা ঢেলে দিচ্ছে। সে শুকনো ঢোক গিলে গলাটা ভেজানোর বিফল চেষ্টা করল। এক ফোঁটা পানি না পেলে হয়তো পরবর্তী নিশ্বাসটাই হবে তার শেষ।

হিলের খটখট শব্দটা কাছে এগিয়ে এল। গুনগুন গান গাইতে গাইতে হঠাৎ হাঁটু বন্দী মেয়েটির সামনে বসে পড়লো তরুণী। তার চোখে এক পৈশাচিক তৃপ্তি; সে একাধারে শান্ত আবার উন্মাদ। তার মুখের অভিব্যক্তি যেন কোনো দক্ষ অভিনেতার মতো নিমিষেই বদলে যাচ্ছে। এক মূহূর্তে মনে হচ্ছে সে চরম বুদ্ধিমতী এক নারী, পরক্ষণেই তার চাহনিতে ফুটে উঠছে অবুঝ শিশুর সারল্য।
ঝটকা মেরে মেয়েটির মুখের সাদা টেপটা ছিঁড়ে ফেলল সে। ব্যথায় ককিয়ে ওঠার আগেই নখগুলো চোয়ালের হাড় লক্ষ্য করে চেপে বসল মেয়েটির। যেন সে চোয়ালটা চূর্ণ করে ফেলবে। অসহায় মেয়েটির ওষ্ঠের ফাঁক দিয়ে এক করুণ আর্তনাদ বেরিয়ে এল।
এতে যেন খিলখিলিয়ে হেসে উঠল তরুণীটি—সে হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, আছে হাড়হিম করা এক বিভীষিকা।
“মিস ওয়ার্ল্ড মুনা! কয়েকদিন আগেই তো মাথায় মুকুট পরে বিশ্বজয় করেছিলে, তাই না? আজ তোমার এই হাল! সো স্যাড…”
বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে মিথ্যে আফসোস করল তরুণী। তারপর ঘৃণাভরে মুনার মুখটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল,

“ছিঃ! তোমার গায়ে হাত দিয়ে আমার হাতটাই নোংরা হয়ে গেল।”
মুনার শরীর আর বইছে না। চারদিনের অমানুষিক অত্যাচারে তার প্রতিটি ক্ষত এখন বিষিয়ে উঠেছে। নিজের শরীরের পচন ধরা গন্ধে তার নিজেরই বমি আসছে। কোনোমতে কন্ঠের সবটুকু জোর একত্র করে ফিসফিসিয়ে বলল,
“পা… পানি।”
চোখেমুখে এক ক্রুর কৌতুক খেলে গেল তরুণীর। সে যেন এই আকুতিটার জন্যই অপেক্ষা করছিল।
“পানি? আহারে কিউটি পাই, পানি খাবে? দিচ্ছি, এক্ষুনি দিচ্ছি। তোমাকে আজ আমি সব কষ্ট থেকে মুক্তি দেব। আজকের পর আর কোনো তৃষ্ণা থাকবে না তোমার।”
সে উঠে গিয়ে কোণায় রাখা সেই ড্রাম থেকে এক গ্লাস পানি ভরে আনল। মুনার মুখের সামনে ধরতেই এক উৎকট পচা গন্ধ নাকে এল তার। তরুণীটি আদুরে ভঙ্গিতে গ্লাসটা উপুড় করল মুনার ঠোঁটে। এক চুমুক দিতেই মুনার পাকস্থলী উল্টে এল। পানিটা নোনা, পিচ্ছিল আর বীভৎস গন্ধে ভরা—যেন কোনো মরা জন্তু ধোয়া পানি। মুনা বমি করতে চাইল, কিন্তু খালি পেটে শুধু পিত্ত আর লালা ছাড়া কিছুই বেরোল না। পৈশাচিক হাসিতে ফেটে পড়ল সেই তরুণী।

“কী হলো, খাবে না? এটা তো স্পেশাল তোমার জন্য আনা! ওহ, আমি তো ভুলেই গেছি, তুমি তো এখন আর সেই বিশ্বসুন্দরী নেই। তোমার সেই জৌলুস, সেই হাসি—সব কোথায় গেল? মুকুট পরে খুব তো হাসছিলে স্টেজে দাঁড়িয়ে, এখন কেমন লাগছে?”
মুনা ঝাপসা চোখে তরুণীটির দিকে তাকাল। অস্ফুট স্বরে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
“কে… কে তুমি? কেন করছো এসব? কী অপরাধ আমার?”
প্রশ্নটা শুনে তরুণীর হাসি এবার গগনবিদারী হয়ে উঠল। সে হাসতে হাসতে সামনের দিকে ঝুঁকে এল।
“অপরাধ? তোর অপরাধ তোর সৌন্দর্য! এই পৃথিবীতে যদি কোনো সুন্দর থাকে, তবে সেটা একমাত্র আমি—অলিভা! নিজের দিকে তাকিয়ে দেখ, যে সৌন্দর্যের জন্য দুনিয়ার ছেলেরা তোর পায়ে লুটিয়ে পড়ত, যে সৌন্দর্যের অহংকারে তুই আকাশ ছুঁতে চেয়েছিলি। আজ দেখ, এই অবস্থায় তোকে দেখলে মানুষ ভয় পাবে, ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেবে। তুই এখন আর মানুষ নোস, তুই একটা ঘৃণিত পচা বস্তু!”
মুনা আর কথা বলার শক্তি পেল না। সে শুধু বিড়বিড় করে বলল,
“কী চাও তুমি? আমাকে মুক্তি দাও… প্লিজ।”
অলিভার ঠোঁটে তখন শয়তানি হাসি। সে মুনার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল,
“দেব তো… আজ তোমাকে আমি চিরদিনের জন্য মুক্তি দেব, কিউটি পাই। এমন এক মুক্তি, যা কোনোদিন কেউ কল্পনাও করেনি।”

“স্পিড বাড়াও বেনজি! আমাদের হাতে সময় একদম নেই। ঘড়ির কাঁটা বলছে আর মাত্র ৪৫ মিনিট, এরপরই ২৪ ঘণ্টার ডেডলাইন শেষ হয়ে যাবে। যেকোনো মূল্যে মুনাকে উদ্ধার করতে হবে আমাদের। এর চেয়ে দেরি হলে পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। মেক ইট ফাস্ট!”

কিছুক্ষণ আগে………..
মিলানো, কুইস্তুরা
মিলান পুলিশ হেডকোয়ার্টারের গোয়েন্দা ডিভিশনের ভেতরটা এখন এক জীবন্ত শ্মশান। চারদিকের নিস্তব্ধতা কেবল কম্পিউটারের প্রসেসরের একটানা ঘ্যানঘ্যানানি আর হ্যাকারদের কিবোর্ডে আঙুল চালানোর শব্দে ভাঙছে।
কার্লোর চোখের নিচে কালচে দাগ। গত তিন রাত সে বাড়ি ফেরেনি। আসলে বাড়ি ফেরার কোনো তাগিদও সে অনুভব করে না—অপেক্ষা করার মতো কেউ নেই সেখানে। নীলচে এলইডি আলোর নিচে তার ফ্যাকাশে মুখটা আরও কঠোর দেখাচ্ছে। সে তার টেবিলের ওপর দুই কনুইয়ের ভর দিয়ে মুখটা হাতের মুঠোয় গুঁজে বসে আছে। দুশ্চিন্তার প্রতিটি সেকেন্ড যেন তার মাথার ওপর হাতুড়ির ঘা মারছে। ঘড়ির কাঁটা নির্দয়ভাবে এগিয়ে চলছে।
২৪ ঘণ্টার সময়সীমা শেষ হতে আর মাত্র চার ঘণ্টা বাকি। এই একদিনে সে মিলানের প্রতিটি অলিগলি চষে ফেলেছে, কিন্তু ব্লাডি কুইন বা মিস ওয়ার্ল্ড মুনার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।আর না তো কোনো ক্লু। সে যতটা সহজ ভেবেছিল সবকিছু যেন আরো বেশি কঠিন হয়ে উঠছে।নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মধ্যে সে যেন হাতড়ে মরছে।
হঠাৎ কক্ষের দরজাটা সশব্দে খুলে গেল। বেনজি প্রায় ছুটতে ছুটতে ঘরে ঢুকল। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। অস্থির কণ্ঠে সে বলল,

“স্যার! একজন ডেলিভারি বয় এই খামটা একটু আগে রিসেপশনে দিয়ে গেছে। এর ওপর প্রেরকের নাম লেখা আছে—ব্লাডি কুইন!”
নামটা শোনা মাত্রই কার্লোর নিস্তব্ধ শরীরটা বিদ্যুদ্বেগে খাড়া হয়ে গেল। সে বেনজির দিকে একজোড়া জ্বলন্ত চোখে তাকাল।
“গিভ মি দ্যাট!”
খামটা ছিঁড়ে ভেতর থেকে সাদা কাগজটা বের করল সে। নীল কালিতে সুন্দর করে সাজিয়ে লেখা কয়েকটা লাইন। কার্লোর দৃষ্টি দ্রুত সেই কাগজের ওপর দিয়ে দৌড়ে গেল:
“আর মাত্র চার ঘণ্টা সময় অবশিষ্ট। আমি ভেবেছিলাম আপনি একজন ধূর্ত পুলিশ অফিসার, খুব সহজেই আমার হদিস পেয়ে যাবেন। But I was wrong. I didn’t know you were so stupid before!”
চিঠির নিচে একটা হাতে লেখা ঠিকানা। কার্লো খুব নিচু স্বরে, বিড়বিড় করে নামটা আওড়ালো

“ক্রেমোনা, লোম্বার্ডি…”
সে দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কক্ষের ঘুমন্ত আলস্য এক মুহূর্তে উবে গেল। কার্লো হ্যাকারদের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল,
“লোকেশন ম্যাপ বের করো! ক্রেমোনার এই নির্দিষ্ট পয়েন্টে আমাদের এখনই পৌঁছাতে হবে। বেনজি, ব্যাকআপ টিমকে অ্যালার্ট করো। চার ঘণ্টা মানে চার ঘণ্টাই—খেলাটা ও শেষ করতে চাইছে, কিন্তু শেষ চালটা আমি দেব।”
হঠাৎ গোয়েন্দা বিভাগের প্রতিটি কম্পিউটার স্ক্রিন একসঙ্গে জ্বলে উঠল। কোনো হ্যাকিং সিগন্যাল নয়, বরং সরাসরি একটি লাইভ স্ট্রিমিং লিঙ্ক চালু হয়েছে। স্ক্রিনে যা ভেসে উঠল, তা দেখে কার্লোর মেরুদণ্ড দিয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল।
ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে আছে অলিভা—তার চোখের মণি দুটো উন্মত্ততায় জ্বলছে, ঠোঁটে সেই নারকীয় বীভৎস হাসি। তার পাশে চেয়ারে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে মিস ওয়ার্ল্ড মুনা। মুনার রাজকীয় সৌন্দর্য এখন ধুলোয় মেশানো; মুখমণ্ডল রক্তাক্ত, চোখ দুটো আতঙ্কে প্রায় পাথর হয়ে গেছে। অলিভা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে খুব ধীরে একটি ধারালো ব্লেড মুনার গালের কাছে নিয়ে এল। কোনো শব্দ নেই, শুধু এক পৈশাচিক নীরবতা।

“এক মুহূর্ত আর দেরি নয়!”
কার্লোর গর্জনে পুরো বিভাগ কেঁপে উঠল।পরবর্তী কয়েক সেকেন্ড ছিল ঝড়ের বেগে। কার্লো আর বেনজি ফোর্স নিয়ে নিচে পার্ক করে রাখা সেই Alfa Romeo গাড়িতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বেনজি স্টিয়ারিং হাতে নিয়ে অ্যাক্সিলারেটরে সজোরে চাপ দিল। মিলানো থেকে ক্রেমোনা—প্রায় আশি কিলোমিটারের রাস্তা। সাধারণ হিসেবে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লাগার কথা, কিন্তু তাদের হাতে সময় নেই।
গাড়িটি মিলানোর রাস্তা চিরে বিদ্যুতের মতো ছুটে চলল। টায়ারের ঘর্ষণে রাস্তা থেকে ধোঁয়া উড়ছে। ট্রাফিক সিগন্যাল তোয়াক্কা না করে গাড়িটি যখন হাইওয়েতে উঠল, তখন তার স্পিডমিটারের কাঁটা বিপজ্জনক সীমা অতিক্রম করেছে। রাস্তার পথচারীরা কেবল একটি কালো ছায়া ধেয়ে যেতে দেখল, যার পেছনের ধুলোবালি থিতু হওয়ার আগেই গাড়িটি দিগন্তে মিলিয়ে গেল।
কিন্তু নিয়তি বোধহয় অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।

ক্রেমোনার কাছাকাছি পৌঁছানোর ঠিক দশ কিলোমিটার আগে হঠাৎ ইঞ্জিনের ভেতর থেকে একটা বিকট শব্দ হলো। পরক্ষণেই বনেট থেকে গলগল করে কালো ধোঁয়া বের হতে শুরু করল। বেনজি প্রাণপণ চেষ্টা করল নিয়ন্ত্রণ রাখতে, কিন্তু গাড়িটি কয়েকবার হেঁচকি তুলে মাঝরাস্তায় গোঁ গোঁ করে থেমে গেল।
গাড়ির টায়ার ঘষটানোর শব্দে চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কার্লো বিদ্যুৎবেগে দরজা খুলে নিচে নামল। তার কপালে উত্তেজনার ঘাম। সে অবিশ্বাসে নিজের গাড়ির দিকে তাকাল, তারপর প্রচণ্ড ক্ষোভে গাড়ির ডিকিতে এক সজোরে ঘুষি মারল। হাতটা ঝাড়া দিয়ে যন্ত্রণাকাতর গলায় সে চিৎকার করে উঠল,
“ড্যাম ইট! ঠিক এই মুহূর্তেই নষ্ট হতে হলো এই জঞ্জালটাকে? উই আর অলরেডি লেট!”

গোডাউনের গুমোট বাতাসে এখন ঘাম, প্রস্রাব আর টাটকা রক্তের একটা মিশ্র গন্ধ। মুনা চেয়ারের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা, তার শরীরের প্রতিটি পেশি যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আছে। কিন্তু অলিভা? সে যেন এক ঘোরের মধ্যে আছে। এক হাতে রাজকীয় ভঙ্গিতে একটি অস্ত্রোপচারের ব্লেড ঘোরাচ্ছে সে, আর অন্য হাতে ধরছে নিজের ঠোঁটে লাগানো সেই বিখ্যাত লাল লিপস্টিক।
এক সময় সে চেয়ার টেনে মুনার ঠিক মুখোমুখি বসল। মুনার চোখের মণি দুটো আতঙ্কে কাঁপছে, যেন কোনো হিংস্র নেকড়ের সামনে একটা হরিণ অসহায়ভাবে তাকিয়ে আছে। অলিভা মৃদু গুনগুন করে গান গাইছে, যেন কোনো প্রিয় শিশুকে ঘুম পাড়াচ্ছে
“এই সুন্দর মুখটা আজ আমার ক্যানভাস।”

হঠাৎ গানের তাল কাটল। এক পৈশাচিক ক্ষিপ্রতায় অলিভা মুনার রেশমি চুলে মুঠো করে ধরল।মাথার খুলি থেকে চামড়াসহ চুলের গোছা উপড়ে নিতে লাগল সে। মুনার রুদ্ধ গোঙানিতে ঘরটা ভারী হয়ে উঠল। মেঝেতে এখন টাটকা রক্তে মাখা সোনালি চুলের স্তূপ।
অলিভা একটি রক্তাক্ত চুলের গোছা মুনার নাকের সামনে ধরে বিদ্রুপের সুরে বলল,
“এই সেই রেশমি চুল, তাই না? যার জন্য কোটি কোটি পুরুষ পাগল! আজ দেখো, এগুলো স্রেফ নর্দমার আবর্জনা।”
সে অট্টহাসি দিয়ে চুলের গোছাটা এক পাশে ছুড়ে ফেলে দিল।এরপর ব্লেডটা মুনার ঠোঁটের কাছে নিয়ে এল। মুনার চোখের জল গাল বেয়ে ব্লেডের ধারালো আগায় এসে মিশল।
“এই ঠোঁট দিয়েই তো বিশ্বজয় করা হাসি হাসতে তুমি। আজ আমি এই হাসি চিরতরে মুছে দেব…”
‘ছ্যাঁক!’—ব্লেডের এক টানে ওপরের ঠোঁটটা নাকের পাশ পর্যন্ত চিরে গেল। গরম রক্ত ফিনকি দিয়ে মুনার সাদা পোশাক ভিজিয়ে দিল। মুনা চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলার শিরাগুলো যেন পাথর হয়ে গেছে। আরও একটা পোঁচ—নিচের ঠোঁটটা ঝুলে পড়ল থুতনির কাছে।

কিন্তু উন্মাদ শিল্পীর কাজ তখনো বাকি। সে অত্যন্ত নিপুণভাবে মুনার গালে ব্লেড চালিয়ে খোদাই করতে লাগল বিকৃত সব জ্যামিতিক নকশা। একপাশে একটা ভাঙা হৃদপিণ্ড, অন্যপাশে গোল করে কাটা চোখের মতো দাগ। আর ঠিক কপালে, গভীর করে কেটে লিখল— “BLOODY QUEEN”।
মুনা তখন যন্ত্রণার চরম সীমায় পৌঁছে জ্ঞান হারানোর উপক্রম। অলিভা তার কানের কাছে মুখ নিয়ে নিঃশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলল,
“Now… you’re just like me… broken, bloody, forgotten.”
শেষে অলিভা তার কিটব্যাগ থেকে বের করল মোটা নাইলনের সুতো আর একটা বাঁকানো সার্জিক্যাল সুঁই। রক্তের ধারা চুইয়ে পড়ছে মুনার চিবুক দিয়ে। অলিভা সুঁইটা মুনার ছিন্নভিন্ন ঠোঁটের মাংসে বিঁধিয়ে কাঁটা ঠোঁট জোড়া দিতে দিতে বলল,
“Let me stitch you a new smile.. a smile no one will ever forget.”

ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
সকালের আলো ফুটতেই পেন্টহাউজে এসে পৌঁছালো ইয়াশ। এজের সাথে তার জরুরি কিছু আলাপ আছে। এলিভেটরে পা রাখতেই দেখা হলো এলেনার সাথে। পরনে তার চিরচেনা ব্ল্যাক বডিকন স্যুট। ইয়াশের পরনেও কালো স্যুট। এলেনা নির্বিকার, পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে; যেন তার সামনে কেউ নেই। ইয়াশ আড়চোখে একবার তাকালো তার দিকে, তারপর নিচু স্বরে প্রশ্ন করল,
“হোয়ার ইজ এজে?”
এলেনার উত্তর এল যান্ত্রিক রোবটের মতো নিস্প্রাণ কণ্ঠে,
“রুমে। হয়তো ঘুমোচ্ছে।”
ইয়াশ দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল। এলিভেটর থামতেই এলেনা বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল, কিন্তু হঠাতই থেমে গেল তার পদযুগল। ইয়াশ এক বুক আকুতি নিয়ে তাকে ডাকল
“এলি…!”

এলেনা থমকে দাঁড়াল। শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে শক্ত করে নিল সে, কিন্তু পেছন ফিরে তাকাল না। ইয়াশ আর কিছু বলার ভাষা পেল না। এলিভেটরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ইয়াশ দীর্ঘক্ষণ শূন্য দৃষ্টিতে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
কাঙ্ক্ষিত ফ্লোরে এলিভেটর থামতেই সংবিত ফিরল তার। ধীর পায়ে বের হতে গিয়েই ধাক্কা খেল পাতলা ছিপছিপে গড়নের এক তরুণীর সাথে। উচ্চতায় ইয়াশের বুক সমান হবে মেয়েটি—হয়তো পাঁচ ফুটের আশেপাশে। ভ্রু কুঁচকে তাকাল ইয়াশ, আর মুহূর্তেই চমকে উঠল সে!
এ তো রিম! যাকে এজে নিজের কক্ষে বন্দি করে রেখেছে। আজ পর্যন্ত ইয়াশ তাকে সামনাসামনি দেখেনি, আজই প্রথম। মেয়েটা দেখতে একদম ছোটখাটো, বয়স হয়তো উনিশের কাছাকাছি হবে। মুখটা ভীষণ মায়াবী—ঠিক যেন ইয়াশের ছোট বোনটার মতো।

চার বছর আগে এক দুর্ঘটনায় নিজের বোনকে হারিয়েছে ইয়াশ। রিমকে দেখে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল তার। পুরনো স্মৃতিগুলো ভিড় করে আসছে মাথায়।রিম বিরক্ত কপালে হাত ঘষতে থাকে। ইয়াশের শক্তপোক্ত বুকের সাথে ধাক্কা লেগে বেশ ব্যথা পেয়েছে মেয়েটা। মনটা ভীষণ তেতো হয়ে গেল তার। ইচ্ছে করছিল কড়া করে দু-চারটা কথা শুনিয়ে দিতে—’চোখে কি দেখতে পান না? নাকি অন্ধ?’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই বলল না সে। গাল ফুলিয়ে হনহন করে সার্ভেন্ট মহিলার পিছু পিছু ছুটল।

ইয়াশ খানিকটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এতক্ষণে সে বুঝতে পারল, রিম মেয়েটা আসলে ভীষণ চঞ্চল। সম্ভবত এতদিন খাঁচায় বন্দি থেকে নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছে।
আজ রিমের মনে যেন আনন্দের সীমা নেই। সকাল থেকেই সে পুরো পেন্টহাউজ টইটই করে ঘুরে দেখছে। পায়ে চোট আছে, তবুও সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। তবে তার ছায়ার মতো সাথে লেগে আছে দুজন মহিলা সার্ভেন্ট। এজের কড়া নির্দেশ—রিমকে এক মুহূর্তের জন্যও একা ছাড়া যাবে না।
ইয়াশ পাসওয়ার্ড চেপে এজের রুমে প্রবেশ করল। রুমের ভেতরটা যেন অন্ধকারের আস্তানা। দেয়াল থেকে শুরু করে আসবাবপত্র—সবকিছুই কুচকুচে কালো।
বিছানায় উপুড় হয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন এজ। কোমর পর্যন্ত ঢাকা কালো কমফোর্টারে, অনাবৃত পিঠের ফর্সা ত্বকে ঘাড়ের ঠিক নিচে একটা পুরনো কাটা দাগ। দাগটা ছোট হলেও নজরে পড়ার মতো। তার পাশেই রয়েছে ছোট একটা কালো তিল, যা দৃশ্যটাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ঘাড়ের এক পাশে কানের নিচে প্যাঁচানো ইংরেজি হরফে ছোট একটা ট্যাটুও দেখা যাচ্ছে।
ইয়াশ হাঁক ছেড়ে ডাকল,

“ডুড!”
কোনো সাড়া নেই। এজে গভীর ঘুমে। ইয়াশ এবার একটু জোর দিয়েই বলল,
“হেই ডুড, গেট আপ! ইটস আর্জেন্ট।”
বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে উঠল এজের। সে নড়েচড়ে বসে আবার আরাম করে বালিশের নিচে মুখ গুঁজে দিল। সারারাত তার এক ফোঁটাও ঘুম হয়নি। সারাটা সময় রিমের রুমের এক কোণে বসে পাহারা দিয়েছে মেয়েটাকে; যদি আবার মেয়েটার জ্বর বাড়ে! ভোরের দিকে নিজের রুমে এসে শরীর ছেড়েছে তার। এই অসময়ে ঘুমের ব্যাঘাত সে সহ্য করতে পারছে না।
কিন্তু ইয়াশ তো ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। সে বিছানা থেকে একটা কুশন তুলে ছুড়ে মারল এজের গায়ে। এবার রাগে কিড়মিড় করতে করতে উঠে বসল এজ। মাথার ভেতরটা যেন ঝিমঝিম করছে। ভোরে ঘুমানোর আগে দুই বোতল রেড ওয়াইন খালি করে তবেই বিছানায় গিয়েছিল সে। চোখ দুটো টকটকে লাল হয়ে আছে। এক হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে অন্য হাতে বিছানার চাদরটা শক্ত করে মুঠো করে ধরল সে। হাতের রাগী শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
দাঁতে দাঁত চেপে বিরক্তি নিয়ে মুখ দিয়ে বের হলো,

“Fu**k…”
ইয়াশ চোখ বড় বড় করে তাকালো। যেন আকাশ থেকে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে বলল,
“আস্তাগফিরুল্লাহ! আস্তাগফিরুল্লাহ! সকাল সকাল এসব কী সূরা পাঠ করছিস ভাই? তুই যে ‘শুদ্ধ পুরুষ’ সেটা তো জানতাম, তাই বলে সকাল সকালই শুরু হয়ে যাবি?”
“শাট আপ ইউ ইডিয়েট!!!”
দাঁত কিড়মিড় করে গর্জে উঠল এজ।কণ্ঠস্বরেমিশে আছে চরম বিরক্তি। ইয়াশের দিকে একবার রক্তচক্ষু হানল সে।
“সকাল সকাল আমার ঘুমের বারোটা বাজাতে এখানে কী করছিস তুই?”
ইয়াশ বেশ অবাক হওয়ার ভান করে বলল,

“তোর কি এখনও সকাল মনে হচ্ছে? ঘড়িতে ১১টা বাজতে চলল!”
এজে আর কথা বাড়াতে চাইল না। গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“বাজে কথা না বলে কেন এসেছিস সেটা বলে কেটে পড়।”
বন্ধুর এমন রূঢ় জবাবে ইয়াশ এবার খানিকটা মুখ গোমরা করল। যেন খুব আহত হয়েছে এমন ভঙ্গিতে অভিমানী গলায় বলল,
“কেন? আমি কি এখানে এমনি এমনি আসতে পারি না?”
“তুই এমনিতেই সারাদিন এখানে পড়ে থাকিস! আর একটা ফালতু কথা বললে তোকে এখানেই পুঁতে ফেলব। এমনিতেই মাথা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে।”
এজের অবস্থা দেখে ইয়াশ এবার একটু দমে গেল। ব্যস্ত হয়ে বলল,
“দাঁড়া, আমি তোর জন্য লেবুর পানি আনতে বলছি। মাথা যন্ত্রণা এক সেকেন্ডে গায়েব হয়ে যাবে।”
“আমার কিচ্ছু লাগবে না। জাস্ট বল কী হয়েছে? তাড়াতাড়ি শেষ কর, আমি ঘুমাব।”
ইয়াশ এবার সোজা হয়ে বসল। গলার স্বর নিচু করে খুব স্পষ্টভাবে বলল,
“আর্জেন্ট বাংলাদেশ যেতে হবে।”

‘বাংলাদেশ’—শব্দটা কানে যেতেই মুহূর্তের জন্য এজের পুরো শরীর স্থির হয়ে গেল। সে হঠাতই নীরব হয়ে গেল। পুরনো কোনো এক স্মৃতি যেন বিষাক্ত সাপের মতো ফণা তুলে দাঁড়িয়েছে তার মস্তিষ্কের কোণে। সে কিছুক্ষণ নিথর হয়ে মাথা নিচু করে বিছানায় বসে রইল। সিল্কি চুলগুলো অবিন্যস্ত হয়ে কপালে এসে পড়েছে। চোখের দৃষ্টি এখন হিমশীতল। তার এই মুহূর্তে মনের অবস্থা বোঝার সাধ্য কারও নেই।
“ডুড! ডিড ইউ হেয়ার মি?”
এজে কোনো উত্তর দিল না। নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে উঠে গাছে একটা শার্ট জড়িয়ে নিল। তারপর ধীরে ধীরে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। পকেটে দুহাত গুঁজে বাইরের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রইল সে। শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল
“আমি যেতে পারব না। তুই এলেনাকে নিয়ে চলে যা।”
“কিন্তু তুই না গেলে যে হবে না! ওখানের পরিস্থিতি কেউ সামলাতে পারছে না। আমাদের ৩০০ মিলিয়ন ইউরোর মাল আটকে আছে বর্ডারে।”

এজে শুকনো গলায় বলল,
“এসব সামান্য বিষয় নিয়ে আমি মাথা ঘামাতে চাই না। আমি মিনিস্টারকে ফোন করে সব ঠিকঠাক করে দিচ্ছি। তুই আর এলেনা গেলেই সবটা সামলে নিতে পারবি।”
ইয়াশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে খুব ভালো করেই জানে এজে কেন বাংলাদেশে যেতে চাইছে না। তা ছাড়া, দেশের মিনিস্টার যেখানে এজের কথায় ওঠবস করে, সেখানে সে একটা ফোন করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তাই ইয়াশ আর তর্কে জড়াল না।
এজে বারান্দার ঝুলন্ত হ্যামক চেয়ারটায় পা ছড়িয়ে বসে পড়ল। শরীরটা ক্লান্ত ভঙ্গিতে এলিয়ে দিল সে। ইয়াশ তার পাশে এসে দাঁড়াল, তারপর সহজ গলায় জিজ্ঞেস করল,
“রিমকে দেখলাম রুমের বাইরে। ও কি…?”

কথাটা শেষ করতে পারল না ইয়াশ। মুহূর্তের মধ্যে এজের এক হাত কামানের গোলার মতো ছুটে এসে চেপে ধরল ইয়াশের গলা। এজের চোখে তখন দাউদাউ করে জ্বলছে অগ্নিশিখা, যেন জীবন্ত কোনো আগ্নেয়গিরির লাভা উপচে পড়ছে। চোয়াল শক্ত করে হিসহিসিয়ে সে বলে উঠল,
“হাউ ডেয়ার ইউ সে হার নেম লাইক দ্যাট!”
এজে এত শক্ত করে গলা চেপে ধরেছে যে ইয়াশের চোখ উল্টে যাওয়ার উপক্রম। সে খুকখুক করে কাশতে শুরু করল, শ্বাস নিতে না পেরে চোখের কোণে পানি জমে উঠল তার। কোনোমতে অস্ফুট স্বরে বলল,
“ব্রো… ছাড় আমাকে… মরে যাব তো!”
এজের কণ্ঠস্বরে তখনো খুনে মেজাজ,

“তুই বলেই এখনো বেঁচে আছিস—এটাই তোর ভাগ্য। তোর জায়গায় অন্য কেউ এই দুঃসাহস দেখালে এতক্ষণে তার জিভ টেনে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দিতাম।”
হাতের বাঁধন কিছুটা ঢিলে হতেই ইয়াশ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“আরে… ও তো আমার চেয়ে অনেক ছোট! ওকে নাম ধরে ডাকব না তো কী বলব? তাছাড়া ওকে আমি নিজের ছোট বোনের নজরেই দেখি।”
এবার এজের হাতের মুঠো পুরোপুরি আলগা হয়ে এল। ইয়াশের গলার চামড়া লাল হয়ে পাঁচ আঙুলের ছাপ বসে গেছে। ইয়াশ গলাটা ঝেড়ে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছে, এমন সময় এজে গম্ভীর মুখে বললো,
“খালা! তুই ওকে ‘খালা’ বলে ডাকবি।”
তারপর কিছু একটা ভেবে আবারো বললো,

“না না, মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি হয়। তুই বরং ওকে ‘আম্মা’ বলে ডাকবি।”
ইয়াশ যেন আকাশ থেকে পড়ল! বিস্ময়ের চরমসীমায় পৌঁছে সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এইটুকু একটা হাঁটুর বয়সী মেয়েকে নাকি তার ‘আম্মা’ বলে ডাকতে হবে! নিজের কপাল নিজেই থাপড়াতে ইচ্ছে করছে তার। আল্লাহর মালুম—কীভাবে যে এমন একটা সাইকো তার বন্ধু হলো! স্রেফ ছোটবেলার বন্ধুত্ব বলেই আজ পর্যন্ত টিকে আছে, নইলে কবেই এই পাগলের পাল্লা ছেড়ে পালাত সে।
“আম্মা বলে ডাকব মানে? তুই কি পাগল হয়ে গেছিস?”
“হ্যাঁ, আম্মা বলেই ডাকতে হবে।”
“অসম্ভব! লোকে শুনলে কী বলবে? ঠিক আছে, তোর খুশির জন্য আমি ওকে বড়জোর ‘সিস্টার’ বলে ডাকব। এবার খুশি তো?”

এজে দাঁত কিড়মিড় করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই এক অপার্থিব সুরের মতো কানে ভেসে এল খিলখিলানো হাসির শব্দ। যেন শুকনো মরুর বুকে হঠাৎ ঝরনার ধারা নেমেছে। মুহূর্তেই এজের সমস্ত রাগ বাষ্প হয়ে উড়ে গেল। সে সম্মোহিতের মতো নিচের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত নেশা—হয়তো ভালোবাসার, নয়তো তীব্র কোনো পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার।

বাগানের সবুজ ঘাসের ওপর প্রজাপতির পেছনে ছোটাছুটি করছে রিম। কতদিন পর মেয়েটাকে এভাবে প্রাণ খুলে হাসতে দেখল সে! না, দিন বলা ভুল হবে—হয়তো কয়েক বছর! দীর্ঘ কয়েক বছর পর আবার সেই অবারিত প্রাণের স্পন্দন শুনতে পেল এজ। রিমের হাসির প্রতিটা শব্দ এজের বুকের ভেতর হাতুড়ির মতো পিটছে। হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি যেন মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে তার। রিমের পরনে আজ টকটকে লাল রঙের একটা চুড়িদার; সহস্র ফুলের মাঝে তাকে যেন সদ্য ফোটা এক রক্তগোলাপ বলে ভ্রম হচ্ছে।
ইয়াশ পাশে দাঁড়িয়ে সবটাই লক্ষ্য করছিল। সে খুব ভালো করেই জানে, এই মেয়েটিই এজের ‘প্রাণভোমরা’। রিমকে ছাড়া নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয় এই পাথর-হৃদয় মানুষটার। কিন্তু তাই বলে এভাবে একটা প্রাণোচ্ছ্বল মেয়েকে বন্দি করে রাখা? আর কতদিন?
ইয়াশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীর স্বরে প্রশ্ন করল,

“তুই ওকে সব সত্যিটা বলে দিচ্ছিস না কেন?”
রিমের ওপর থেকে এক মুহূর্তের জন্যও দৃষ্টি না ফিরিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল এজে। ম্লান কণ্ঠে বলল,
“ওর কি সেসব মনে আছে?”
“কিন্তু ও তো তোকে ঘৃণা করে!”
“হয়তো ঘৃণা করে…”
এজের কণ্ঠে এক অদ্ভুত ঘোর। সে ঘোর লাগা মানুষের মতো বিড়বিড় করে বলল,
“কিন্তু ওর ঘৃণার মাঝেও তো আমি আছি। ওকে হারিয়ে আমি এমন ভালোবাসা চাই না, যেখানে আমি নেই।”
ইয়াশ আর কোনো কথা খুঁজে পেল না। এজের এই পাগলামির কোনো ব্যাখ্যা তার কাছে নেই। সে কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকিয়ে রইল।

বাগানে প্রজাপতির মায়ায় ছুটতে ছুটতে হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হোঁচট খেল রিম। আছড়ে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে এজে যন্ত্রণায় নিজের চোখ-মুখ খিঁচিয়ে বন্ধ করে ফেলল। তার হাতের মুঠি পাথরের মতো শক্ত হয়ে এল; যেন রিম নয়, আঘাতটা লেগেছে খোদ এজের হৃদপিণ্ডে। ব্যথার তীব্রতা রিমের চেয়ে এজই যেন বেশি অনুভব করল।
রিমকে পড়ে যেতে দেখে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এক সিকিউরিটি গার্ড তাকে ধরতে এগিয়ে এল। সেটা দেখা মাত্রই এজের ভেতর থেকে এক হিংস্র চিৎকার বেরিয়ে এল,
“স্টপ! আই সেই স্টপ রাইট দেয়ার নাউ!”

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৯

পেন্টহাউজের দেওয়ালে দেওয়ালে সেই চিৎকার প্রতিধ্বনিত হলো। ভয়ে ও বিস্ময়ে গার্ডটি তৎক্ষণাৎ কয়েক হাত দূরে সরে গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। রিম কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। এজের রণহুঙ্কার শুনে সে উপরের ব্যালকনির দিকে তাকাল।
বাতাসে দুই জোড়া চোখের দৃষ্টি একে অপরের সাথে ধাক্কা খেল। এক জোড়া চোখে অগাধ নেশা আর পাগলামি, অন্য জোড়ায় কেবলই ঘৃণা। এজের সেই ঘোর লাগা দৃষ্টির বিপরীতে রিমের অন্তর বিষিয়ে উঠল এক নিমিষেই। অসহ্য এক বিতৃষ্ণা নিয়ে রিম ওখান থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। তারপর দ্রুত পায়ে মহিলা সার্ভেন্টদের সাথে ভেতরে চলে গেল।
এজে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল সেই শূন্য বাগানের দিকে চেয়ে।………………

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১১