Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৩০

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৩০

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৩০
রাত্রি মনি

জেইনের তাড়ায় ইয়াশ হাঁপাতে হাঁপাতে করিডোর পেরিয়ে লিফটে ঢুকে পড়ে। দরজা নামতে থাকে ঠিক তখনই এলেনা এসে থমকে দাঁড়ায়। চোখাচোখি হতেই কেঁপে ওঠে দুজনেই। এলেনা তৎক্ষণাৎ মুখ ঘুরিয়ে পা বাড়িয়ে চলে যেতে চায়।
ইয়াশ হঠাৎ হাত বাড়িয়ে তাকে হেঁচকা তাকে টানে ভেতরে নিয়ে আসে। দরজা শব্দ করে বন্ধ হয়ে যায়। এলেনা প্রচণ্ড রেগে গিয়ে ছটফট করে, কণ্ঠ উঁচু করে বলে,
“ছাড়ো ইয়াশ! কি করছো তুমি? মানে কি এসবের? আমাকে যেতে দাও!”
সে বিরক্ত হয়ে বারবার হাত ছাড়াতে চায়। ইয়াশ জেদে আরও শক্ত করে ধরে রাখে। চোখেমুখে জমাট কষ্ট, গলায় হাহাকার মেশানো স্বর,

“না! আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। কেন এভাবে আমাকে ইগনোর করছো? কি অপরাধ আমার? তুমি কি একবারও বোঝো না আমি ভেতর থেকে কতটা ভাঙছি?”
এলেনার মুখ রাগে টানটান হয়ে যায়। নিজের হাত ছাড়িয়ে কড়া গলায় বলে,
“না, বুঝতে পারছি না। আমার জন্য কেন কষ্ট পাবে তুমি? আমাদের মাঝে তো সেরকম কিছুই ছিল না!”
ইয়াশের চোখ মুহূর্তেই ছলছল করে ওঠে। গলায় কাতর সুর মিশে যায়
“সত্যি!…আমাদের মাঝে কিছুই ছিল না… কিন্তু আমি তো তোমাকে ভালোবাসি।”
এলেনা বিরক্ত ভঙ্গিতে তাকিয়ে বলে,

“না, ছিল না! আমি কি কখনো তোমাকে ভালোবাসার কথা বলেছি? না। এটা তোমার ভুল, ইয়াশ। তুমি আমাদের বন্ধুত্বকে ভালোবাসা ভেবেছ। অথচ আমি কখনোই তোমাকে ভালোবাসিনি!”
ইয়াশ হঠাৎ তার কোমর চেপে কাছে টেনে আনে। চোখে চোখ রেখে কাঁপা কণ্ঠে বলে,
“তুমি মিথ্যে বলছো। আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসো। তোমার চোখ বলছে তুমি আমাকে ভালোবাসো। কেন এভাবে মিথ্যে বলে, আমাকে আর নিজেকে কষ্ট দিচ্ছো?”
এলেনা ছটফট করে ছাড়াতে চায়, কিন্তু ইয়াশ তাকে আরও শক্ত করে চেপে ধরে রাখে। তার শরীর একটুও নড়তে পারে না। ছলছল চোখে তাকিয়ে এলেনা ভাঙা গলায় বলে,

“বললাম তো আমি ভালোবাসি না তোমাকে… ছাড়ো, দম বন্ধ লাগছে আমার।”
ইয়াশ গভীর দৃষ্টিতে তার চোখে চোখ রেখে, থেমে থেমে ধরে আসা গলায় বলে,
“আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো। বলো তুমি আমাকে ভালোবাসো না।”
এলেনা মোচড়াতে থাকে, রাগ আর বিরক্তি চরমে পৌঁছে যায়। কণ্ঠ ভেঙে চিৎকার করে ওঠে
“এসব কি হচ্ছে ইয়াশ?? ছাড়ো আমাকে… ছাড়োপ ভালো লাগছে না আমার। ইয়া…”
আর কোনো কথা বলার সুযোগই দেয় না ইয়াশ। হঠাৎ নিজের ঠোঁট শক্ত করে এলেনার ঠোঁটে চেপে বসায়। বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে যায় এলেনার। সাথে সাথেই ছটফটিয়ে ওঠে, দুহাতে পিঠে কিল ঘুষি মারতে থাকে, যেন নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চায়।

কিন্তু ইয়াশের আঁকড়ে ধরা শক্তি যেন লৌহকঠিন। এলেনা যত বেশি কিল ঘুষি মারে, ইয়াশ তত বেশি জোরে কাছে টেনে ধরে। তার ঠোঁটের স্পর্শ এক মুহূর্তে আরও গভীর, আরও দাবিদার হয়ে ওঠে। এক হাতে কোমর শক্ত করে চেপে রেখেছে, অন্য হাতে তার গালের পাশ ধরে রেখেছে এমনভাবে যে একটুও সরে যাওয়া অসম্ভব।
চাপা শ্বাস, দ্রুত ধুকপুক করা হৃদস্পন্দন। সব মিলিয়ে চারদিকের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। তার হাতের স্পর্শ যত কঠিন হয়, ঠোঁটের চুম্বন ততটাই গভীর আর উন্মত্ত হয়ে ওঠে।

একসময় এলেনার প্রতিরোধ ধীরে ধীরে থেমে আসে। হাত বাড়িয়ে খামচে ধরে ইয়াশের চুল, আর ঠোঁট মেলাতে থাকে তার ঠোঁটের সাথে। মুহূর্তেই তাদের স্পর্শ বদলে যায়, রাগ আর বিরক্তির জায়গায় গলে যায় উন্মাদ আবেগ।
শ্বাস নিতে কষ্ট হলেও কেউই ছাড়ে না। দুজনের গরম নিঃশ্বাস একে অপরের ফুসফুস ভরে দেয়। চারপাশ যেন অন্ধকারে মিলিয়ে যায়, শুধু তাদের দমবন্ধ করা চুমুর তীব্রতা বাড়তে থাকে।
চোখের কোণ ভিজে ওঠে এলেনার, সুখ আর অসহায়তার মিশ্র জলে। ইয়াশ এক ঝটকায় তার চুলের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে আরও কাছে টেনে নেয়। ঠোঁটের উপর ঠোঁট রেখে থেমে না থেকে হিসহিসিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“এখনো বলবে তুমি আমাকে ভালোবাসো না?”
মুহূর্তেই এলেনা হঠাৎ নিজের থেকে ছাড়িয়ে দেয়, ঠাস করে এক চড় বসায় ইয়াশের গালে। চিৎকার করে বলে,

“না বাসি না! আর কতবার বলবো?”
ইয়াশের ঘাড় নুইয়ে যায়, হাত গালের উপর চলে যায়। তবুও চোখ তুলে এক মুহূর্ত থেমে , আবারও এক ঝটকায় এলেনাকে দুহাতে বন্দী করে ফেলে। কপালে কপাল ঠেকিয়ে শ্বাস নিতে নিতে ফিসফিসিয়ে বলে,
“প্লিজ… আর সহ্য করতে পারছি না আমি। একটু বোঝার চেষ্টা করো!”
এলেনার বুক ওঠানামা করতে থাকে, নিঃশ্বাস ঘন হয়ে আসে। চোখ ভিজে ওঠে, কণ্ঠে জমাট বাঁধা দহন,
“তুমি বুঝতে পারছো না ইয়াশ। আমি তোমাকে ভালোবাসতে পারবো না। নিজের জীবনের সাথে কাউকে জড়াতে চাই না আমি। আমার জীবনের লক্ষ্য আলাদা।”

ইয়াশ চোখ শক্ত করে বন্ধ করে রাখে, তবুও কপাল তার কপালে ঠেকিয়ে রাখে। নিঃশ্বাস ভারি হয়ে ওঠে। গলার ভেতর থেকে ধাক্কা মেরে বেরিয়ে আসে ক্ষীণ স্বর
“আর সেটা নিশ্চয়ই… তোমার বাবা-মায়ের খুনিদের খুঁজে বের করা… তাই না?”
এলেনা বিস্ফোরিত হয়ে চোখ বড় বড় করে তাকায়।ইয়াশ ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি টেনে শীতল গলায় বলে,
“কি ভেবেছো, শুধু তুমি একাই মানুষের মন পড়তে পারো? আমি সব জানি, এলি। আমি তোমার পাশে থাকতে চাই সারাজীবন। তোমার প্রতিটা বিপদে তোমাকে আগলে রাখতে চাই। একবার সুযোগ দিয়ে দেখো আমাকে। একটু বিশ্বাস রাখো আমার ওপর… আমি কখনো তোমাকে একা ছাড়বো না। প্লিজ… প্লিজ… প্লিজ… এই দূরত্ব আমি আর সহ্য করতে পারছি না।”
এলেনা বড় বড় শ্বাস টেনে নিজেকে সামলায়। তাদের কপাল এখনো একে অপরের সাথে ঠেকানো। চোখে তীব্র কষ্ট মিশে যায়।

“আর যদি কোনোদিন জানতে পারো… তোমার খুব কাছের কেউ-ই আমার বাবা-মায়ের খুনি? এমন কেউ, যাকে তুমি চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করো… তখন কি করবে, ইয়াশ? আমার পাশে থাকবে… নাকি তার পাশে?”
ইয়াশ হঠাৎ তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়।
“তুমি কার কথা বলছো আমি জানি না এলি… শুধু এইটুকু জানি সারাজীবন তোমার পাশে থাকবো। যেকোনো পরিস্থিতিতে। খুব ভালোবাসি তোমাকে।”
এলেনার চোখ ভিজে ওঠে জল গড়িয়ে নামে গালে। কান্না ভেজা কণ্ঠ কাঁপতে থাকে,
“হয়তো একদিন সত্যিটা জানলে তুমি বিশ্বাসই করবে না… আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। তখন তো আমি বাঁচতে পারবো না, ইয়াশ। নিজের বাবা-মাকে হারিয়ে যতটা কষ্ট সহ্য করেছি, দ্বিতীয়বার সেই কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা নেই আমার।”
ইয়াশ তার মাথাটা আরও শক্ত করে নিজের বুকে চেপে ধরে, আঙুল জড়িয়ে ধরে তার চুলে। বুকের ভেতর ধুকপুকানি এলেনার কানে স্পষ্ট শোনা যায়। নিঃশ্বাস ভাঙা ভাঙা হলেও গলায় দৃঢ় অঙ্গীকার,
“কথা দিচ্ছি, আর কক্ষনো তোমাকে কষ্ট পেতে দিব না তোমায়। কখনো না।”

জেইন নিজের রুমের সামনে এসে থমকে দাঁড়ায়। গভীর শ্বাস টেনে ঠোঁট কামড়ে ধরে। বুকের ভেতর ধুকপুকানি যেন দ্বিগুণ গতিতে ছুটছে। আজকাল তার নিজের হার্টবিটও তার কথা শোনে না যেন একেবারে বউয়ের মতো, খালি জ্বালাতন করে।
লজ্জায় নিজের অজান্তেই ঠোঁটে হালকা মুচকি হাসি ফুটে ওঠে। ভাবা যায়! যেই মেয়েটা রোজ রাতে তার স্বপ্নে এসে তাকে জ্বালিয়ে রাখতো, যেই মেয়ের কারণে তার চোখের পাতা এক হতো না আজ সেই মেয়েটাই তার রুমের ভেতরে, তারই বউ হয়ে আছে।
নিশ্চয়ই এখন মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে। এই সুযোগে ঝটপট কয়েকটা চুমু খেয়ে নেবে। পরে কে জানে! ঘুম ভাঙলে যদি উল্টো তাকেই এই রুম থেকে ধাক্কা মেরে বের করে দেয়!

না, যাই হোক না কেন… এখন থেকে আর কখনোই সে মেয়েটাকে নিজের থেকে আলাদা করবে না। যতই আঘাত দিক, যতই পালাতে চাক সে তাকে সর্বক্ষণ নিজের বুকে আটকে রাখবে। তার দমবন্ধ করা শ্বাসের ভেতরেই বাঁচতে হবে তাকে। মনে মনে কিছু একটা ভাবনা আসতেই তার ঠোঁটে ক্রুর হাসি খেলে যায়।
সে পাসওয়ার্ড চাপিয়ে দরজা খোলে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তার চোখ সোজা গিয়ে আটকে যায় বিছানায় কিন্তু… একি! তার ফায়ারফ্লাই কোথায়?
মুহূর্তেই চোখে আগুন জ্বলে ওঠে। বুকের ভেতর রক্ত যেন দাউ দাউ করে পুড়তে থাকে। শরীরের প্রতিটি স্নায়ুতে উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে।

সে ছুটে গিয়ে ওয়াশরুম চেক করে না, নেই। চারপাশে পাগলের মতো তাকায়, ঘরের প্রতিটি কোণা তন্নতন্ন করে খোঁজে, এমনকি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় কিন্তু কোথাও নেই। ঘরটা বন্ধ, বাইরের সব পথও আটকে রাখা… তবুও! অসুস্থ, দুর্বল মেয়েটা কোথায় যেতে পারে?
না… না… না…! বুক ধড়ফড় করে ওঠে। আতঙ্কে তার শ্বাসরোধ হতে থাকে। মনে হয় পৃথিবীটা যেন এক লহমায় ভেঙে পড়ছে তার চারপাশে। আবারও কি সে তার ফায়ারফ্লাইকে হারিয়ে ফেলবে? না! না! এবার নয়। এবার যদি সে হারিয়ে যায়… তাহলে সত্যিই আর বাঁচতে পারবে না।
সে পাগলের মতো সব তছনছ করতে থাকে, তার রুম থেকে শুরু করে পুরো পেন্টহাউজের প্রতিটা কোণা। সোফার নিচে, জানালার পর্দার আড়াল এক ইঞ্চি জায়গাও বাদ দেয় না। তবুও… নেই। কোথাও নেই মেয়েটা।
হঠাৎ তার বুক ভার হয়ে আসে। শ্বাস যেন একদম বন্ধ হয়ে আসছে। চোখের সামনে সবকিছু ঘোলা, অন্ধকার, ঝাপসা হয়ে ওঠে। ভেতর থেকে কেমন এক ভয়াল শূন্যতা পুরো শরীর জড়িয়ে ধরে।
সে নিজের দুই হাতে চুল টেনে ধরে, দাঁত চেপে ফিসফিস করে ওঠে

“কোথায় তুমি সোনা? প্লিজ… আই নিড ইউ… আর কত জ্বালাবে আমাকে? আমি তো পুড়তে পুড়তে একেবারে ছাই হয়ে যাচ্ছি। এবার তোমাকে হারালে… সত্যিই মরে যাব আমি।”
করিডোরের ধারে জেইন হোঁচট খেয়ে প্রায় মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল। তখনই মাত্তেও তাড়াতাড়ি দৌড়ে এসে তাকে ধরে ফেলে। শক্ত করে আগলে রাখে, যেন পড়ে না যায়।চিন্তায় ভরা কণ্ঠে বলে,
“ভাই! কি হয়েছে আপনার? মাথায় কি আবার যন্ত্রণা শুরু হয়েছে? কিছু তো বলুন! এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা আপনার পক্ষে সম্ভব না। চলুন, রুমে যেতে হবে এখনই। আমি এক্ষুনি ডাক্তার ড্রেভেন’কে খবর দিচ্ছি।”
জেইনের শরীর কাঁপছে। তার চোখ দুটো লালচে, নিঃশ্বাস যেন গলায় আটকে আছে। কষ্টে ভাঙা ফিসফিসে গলায় বলে,

“না… ড্রেভেন’কে নয়… আই নিড হার… শুধু ও..ও..ওকে চাই… ওকে খুঁজে বের কর… আমায় এনে দে… আমার এখনই… এখনই প্রয়োজন ওকে।”
সে প্রায় মাত্তেওর গায়ে ঢলে পড়ে। বুক ধড়ফড় করছে, আঙুলগুলো কাঁপছে। প্রতিটা মুহূর্তে তার ভেতরের উন্মাদনা যেন আরও বাড়ছে।
মাত্তেও চমকে তার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। বুক কাঁপতে থাকে ভয়ে। সে ঠিক বুঝতে পারছে, জেইন কার কথা বলছে।
“ভাবীর কি হয়েছে ভাই? ভাবি তো আপনার রুমেই ছিলেন… তাহলে আপনি এমন করছেন কেন?”
জেইনের কাঁপা হাত হঠাৎ ঝাঁপটে ধরে মাত্তেওর গলার শার্ট। এতটাই শক্ত করে চেপে ধরে যে কাপড় প্রায় ছিঁড়ে যেতে বসে। চোখ দুটো শূন্য আর পাগলপারা, নিঃশ্বাস যেন ভেতরে আটকে আছে। ভাঙা ভাঙা গলায় সে কাঁদোস্বরে বলে,

“ও চলে গেছে, মাত্তেও… ও আবার আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমি বাঁচব না, মাত্তেও… এবার আমি সত্যিই মরে যাব। আগে তো পুরোপুরি পাইনি ওকে, কিন্তু এখন… এত কাছে পেয়েও যদি হারিয়ে ফেলি… আমি বাঁচব না… আমি পারব না!”
তার হাত কাঁপতে কাঁপতে আরও জোরে আঁকড়ে ধরে। সে ভাঙা গলায় ফিসফিস করে,
“ওকে এনে দে না আমায়… প্লিজ বল না, ওকে এনে দিবি… দেখ, খুব কষ্ট হচ্ছে আমার… মনে হচ্ছে কেউ গলা চেপে ধরেছে, দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে…”
মাত্তেও দিশেহারা হয়ে পড়ে।কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। সে কাঁপা হাতে জেইনের হাতটা ধীরে ধীরে নিজের কাঁধে তুলে নিতে চায়, যেন অন্তত তাকে ভর দিয়ে দাঁড় করাতে পারে। কিন্তু জেইন এক ঝটকায় হাত সরিয়ে ফেলে। চোখ রক্তলাল, দাঁতে দাঁত চেপে গর্জনের মতো করে বলে
“অ্যাই জানোয়ারের বাচ্চা!!!!! তোর কি মনে হয় আমি অসুস্থ? আমি রুমে যাবো না! আমার ফায়ারফ্লাইকে খুঁজে বের করতে হবে… এক্ষুনি!”
তার শরীর সোজা হয়ে টান টান হয়ে যায়। বুক ফুলে ওঠে, চোখে আগুন জ্বলে ওঠে। সে কড়া গলায় আদেশ ছুঁড়ে দেয়

“সবাইকে এলার্ট করে দে। এক মুহূর্ত নষ্ট করা যাবে না। সব সিসিটিভি ফুটেজ চেক কর। জঙ্গলের চারপাশে সব গার্ড ছড়িয়ে দে। সবগুলো নেকড়ে’কে বের করে দে প্রত্যেকটা কোণা তছনছ করে খুঁজবে। ড্রোন চালিয়ে দে, আকাশে এক বিন্দুও যেন চোখ এড়িয়ে না যায়। এয়ারপোর্ট, বন্দর, রেললাইন সব সিল করে দে। আমি চাই না একটা কাকপক্ষীও এখান থেকে নড়তে পারে!”
তার প্রতিটা শব্দ যেন শিরা ছিঁড়ে বের হওয়া রক্তের মতো গরম, ধারালো।
তার আদেশ যেন বজ্রপাতের মতো ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই সব গার্ড সক্রিয় হয়ে যায়। বিষাক্ত হাইব্রিড নেকড়ের দল বেরিয়ে পড়ে শিকারের খোঁজে। তাদের গর্জনে পুরো ক্যালাব্রিয়া শিউরে ওঠে বাতাসের বুক ফুঁড়ে যেন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।

কিন্তু কোথাও কোনো চিহ্ন নেই। প্রতিটা গলি, প্রতিটা জঙ্গল, প্রতিটা পাহাড়ি পথ তন্ন তন্ন করে খুঁজে ফেলা হয়। সিসিটিভির প্রতিটা ফুটেজ চেক করা হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে। তবুও কিছুই মেলে না।
রুমটা যেমন ছিল তেমনই আছে ডোর লক করা, ঠিক যেমন জেইন রেখে গিয়েছিল। না বাইরে থেকে কেউ ভেতরে ঢুকেছে, না ভেতর থেকে কেউ বাইরে গেছে। অথচ মেয়েটা নেই। যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছে সে।
বাইরে ড্রোনগুলো আকাশ চষে বেড়াচ্ছে, চারদিকে ফোর্স ছড়িয়ে পড়েছে। এয়ারপোর্ট, রেললাইন, জাহাজ, ট্রাক, গাড়ি সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একটা কাকপক্ষীকেও নড়তে দেওয়া হয়নি। তবুও কেউ কোনো খোঁজ দিতে পারছে না।
সবকিছু যেমন ছিল তেমনই আছে শুধু সে নেই। আর এই অদৃশ্য শূন্যতাই যেন জেইনের বুক চিরে ধ্বংসের আগুন ছড়িয়ে দিচ্ছে।

গভীর রাত পেরিয়ে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। কিন্তু হল ঘরের ভেতরে অন্ধকার গ্ৰাস করেছে। সমস্ত গার্ড একসাথে জড়ো হয়েছে। মাথা নিচু, চোখ মাটিতে গেঁথে আছে। কারোর সাহস নেই মুখ তোলার।
একটা শ্বাসের শব্দও যেন কারও কানে বিঁধছে। চারপাশে পিনপতন নীরবতা, বাতাসও যেন থেমে গেছে।মাঝখানে ঘাড় হেঁট করে বসে আছে জেইন। তার কালো শার্টের উপরের দুটো বাটন খোলা। ফলে ফর্সা শক্তপোক্ত বুক দৃশ্যমান। হাতা গোটানো কুনই পর্যন্ত সমস্ত শিরাউপশিরা দৃশ্যমান। তাকে দেখতে শান্ত কিন্তু তার চারপাশে চাপা আগুনের তাপ ছড়িয়ে পড়ছে। যেন মুহূর্তেই বিস্ফোরণ হবে।
হঠাৎ নিস্তব্ধতা চিরে বিদ্যুতের মতো গর্জে ওঠে তার কণ্ঠ।
“হোয়ার ইজ মাই ফায়ারফ্লাই???? আই সেইড, হোয়ার ইজ সী????”
তার চোখ দুটো অগ্নিগর্ভ, শিরায় শিরায় রক্ত টগবগ করছে।
“আই ওয়ান্ট হার… রাইট নাউ…! ইন ফ্রন্ট অফ মি!!!”

কণ্ঠের প্রতিটা শব্দ ছুরির মতো বিঁধে যায় সবার বুকে।তার গর্জনে যেন কেঁপে ওঠে গোটা ক্যালাব্রিয়া। পায়ের নিচে মাটি পর্যন্ত কম্পিত হয়, দেয়ালগুলো প্রতিধ্বনি তোলে সেই ভয়াল স্বর।
গার্ডদের শরীর ঘামে ভিজে গেছে আতঙ্কে। কেউ সাহস করে তাকাতে পারছে না, কেউ নড়তেও পারছে না। সবাই জানে এবার শাস্তি অবশ্যম্ভাবী। প্রাণ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা। কারণ জেইনের রোষ মানেই মৃত্যু আর ধ্বংস।
জেইন হঠাৎ ঝড়ের মতো উঠে দাঁড়ায়। তার হাতে চকচকে ধারালো কুড়াল। অন্ধকার আলোয় সেটার ফলার ঝিলিক যেন মৃত্যুর ইশারা। তার ঠোঁটে অদ্ভুত, ভুতুড়ে এক বাঁকা হাসি যেন মৃত্যু তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।যেন এক মুহূর্তেই পুরো হলঘর রক্তে ভেসে যাবে।
সে হাত তোলে, কুড়াল ঝলসে ওঠে বাতাসে। এক কোপ নামবে সামনে মাথা নত করা নিরীহ গার্ডের ঘাড়ে।
ঠিক তখনই ঝড় থামিয়ে দেয় এক শক্ত হাত। ইয়াশ দাঁতে দাঁত চেপে সে জেইনের হাত চেপে ধরে রাখে।জেইনের চোখ মুহূর্তেই জ্বলন্ত পশুর মতো হয়ে ওঠে।
তার দৃষ্টিতে হিংস্রতা, রক্তের ক্ষুধা। চোয়াল শক্ত করে, গলার মধ্যে থেকে চাপা, গর্জনময় স্বরে ফিসফিসিয়ে ওঠে,

“আমার সামনে থেকে সরে দাড়া, ইয়াশ। আজ ওদের কাউকে ছাড়বো না আমি। এতোবার সাবধান করার পরেও বারবার একই ভুল করছে ওরা। ভুলের শাস্তি তো পেতেই হবে।”
সে ইয়াশের মুখের এত কাছে ঝুঁকে আসে যে গরম নিঃশ্বাসে বাতাস ঘন হয়ে যায়।
“আর তুই… যদি আমার পথে বাঁধা দিস…”
এক সেকেন্ড থেমে, তার চোখে হত্যার নাচন
“তোকে মারতেও হাত কাঁপবে না আমার।”
হল ঘরে পিনপতন নীরবতা। সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে দুই ভাইয়ের দিকে। ইয়াশ হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধৈর্য ধরে নরম গলায় বোঝানোর চেষ্টা করে
“দেখ, এটা মাথা গরম করার সময় নয়। ঠান্ডা মাথায় ওকে খুঁজতে হবে। ওদের মেরে কি হবে বল? ওরা তো নিজেদের দায়িত্ব ঠিকভাবেই পালন করেছে।

আর তুই-ই ভেবে দেখ, রিমম্… সরি মা, মা যদি সত্যিই রুম থেকে বের হতো, তাহলে তো সবার আগে তোর কাছে নোটিফিকেশন আসার কথা। রাইট? তাহলে এবার এলো না কেন? আর রুমটা তুই নিজেই পাসওয়ার্ড দিয়ে লক করেছিলি। তাহলে ও কিভাবে বের হবে? তারপরও ভাব ও অসুস্থ, একা কোথায় বা যেতে পারে? আমার মনে হয় এখনো রুমেই কোথাও আছে। তোর রুমে তো আরও দুটো সিক্রেট রুম আছে। হয়তো ঘুরতে ঘুরতে ঢুকে গেছে সেখানেই। আমরা সবাই তো পেন্টহাউজেই ছিলাম। ও বাইরে গেলে অন্তত কারো না কারো চোখে পড়তই।”
জেইনের চোখে ক্ষণিকের দ্বিধা, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই আবার তীব্র আগুন জ্বলে ওঠে। সে চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস টেনে নেয়। তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত গতিতে। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে ওঠে

“তোর কি আমাকে ইডিয়েট মনে হয়? প্রতিটা কোণা খুঁজে দেখেছি আমি! সিক্রেট রুম, বেডরুম, ওয়াশরুম, বারান্দা… La Galleria এমনকি পুরো পেন্টহাউজ পর্যন্ত। কোত্থাও নেই ও। কোত্থাও না।”
ইয়াশ কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ভেতরে ভেতরে কিছু একটা ভাবে। তারপর শান্ত, দৃঢ় গলায় বলে,
“ঠিক আছে, বুঝলাম। কিন্তু তুই একটু মাথা ঠান্ডা কর। আমরা ওকে খুঁজে বের করবোই। সব জায়গায় লোক ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কেউ না কেউ ঠিক খুঁজে পাবে ওকে।”
জেইনের চোখ হঠাৎ ছলছল করে ওঠে। তার বুকের ভেতরটা যেন ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। তার ঠোঁট কাঁপে। গলার স্বর ক্ষীণ হয়ে আসে,

“তুই বুঝতে পারছিস না ইয়াশ, ওকে না দেখে এক মুহূর্ত থাকতে পারি না আমি। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। মনে হয় বুক ফেটে যাবে। ওকে আমার চাই এখনি! নইলে মরে যাবো আমি।”
সে হঠাৎ হাতের কুঠার ছেড়ে ইয়াশের হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। গলার স্বর ভেঙে আসে, একেবারে অসহায় সুরে,
“ওকে আমার কাছে এনে দে না প্লিজ, তুই যা বলবি সব করবো আমি। কাউকে মারবো না, কাউকে না। শুধু ওকে এনে দে। কষ্ট হচ্ছে তো।”

ইয়াশ অনেক কষ্টে তাকে বুঝিয়ে শুঝিয়ে রুমে নিয়ে আসে। এই মুহূর্তে জেইনকে দেখে মনে হয় না সে সেই দানবীয় ক্ষমতাশালী মানুষ। সে একেবারে একটা ছোট্ট বাচ্চা হয়ে গেছে। যেন তার প্রিয় খেলনাটা কে যেন কেড়ে নিয়েছে। তাকে বিছানায় বসিয়ে ইয়াশ ফ্রিজ থেকে একটি ঠান্ডা পানির বোতল বের করে দেয়।
“পানি টা খা, মাথা ঠান্ডা হবে। ভালো লাগবে।”
কিন্তু এক ঝলকে যেন পুরো মানুষটা বদলে যায়। সে এক ঝটকায় বোতলটা ছুড়ে ফেলে দেয়, ধপাস করে মেঝেতে ছিটকে পড়ে বোতলটা। সে রাগে কাঁপতে কাঁপতে সে গর্জন করে ওঠে,
“আমার এসব কিচ্ছু চাই না!!! তুই আমাকে রুমে নিয়ে এলি কেন? ছাড় আমাকে!!!!”
তার গর্জন এতটাই তীব্র যে পুরো রুমটা কেঁপে ওঠে। শব্দ শুনে মাত্তেও দৌড়ে এসে ঢুকে পড়ে। কিন্তু ততক্ষণে জেইনের পাগলামি চরমে পৌঁছে গেছে। সে সবকিছু ভাঙতে শুরু করে, চোখে-মুখে অসহায় দানবের রূপ।
ইয়াশ আর মাত্তেও মিলে আটকানোর চেষ্টা করলেও ব্যর্থ। জেইন ক্রমেই হিংস্র হয়ে উঠছে।
রুমের এক কোণায় বিশাল এক ডিজাইনার কাবার্ড।
ঝকঝকে কাঁচের মতো তার গায়ে ঝিলিক দেয়,
দূর থেকে মনে হয় হিরের তৈরি। সেখানে একপাশে সাজানো হাতিয়ার, অন্যপাশে তার ছোটবেলার কিছু পুরোনো জামাকাপড়।

জেইন ঝাঁপিয়ে পড়ে হাতিয়ার বের করার জন্য হাত বাড়ায়। ইয়াশ আর মাত্তেওর বুক ধড়ফড়িয়ে ওঠে
আজই হয়তো তাদের শেষ দিন। কিন্তু কাবার্ড খুলতেই তার জ্বলন্ত নীলাভ চোখ হঠাৎ শান্ত হয়ে আসে। মুখের হিংস্রতা মুছে যায় এক পলকেই। হালকা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে। যেন মনে হয় আবার নতুন করে তার দেহে প্রাণ ফিরে এসেছে। চোখ ছলছল করে ওঠে। গলার স্বর কেঁপে উঠে বিষাক্ত যন্ত্রণায়।
“ফায়ার…ফ্লাই…….”

ঘুম ভাঙতেই নিজেকে নরম মখমলে কালো বিছানায় আবিষ্কার করে রিম। আস্তে ধীরে উঠে বসতেই শরীর ভারী মনে হয়, জ্বরের তীব্রতা এখনো রক্তে আগুনের মতো জ্বলছে। সে চারপাশে দৃষ্টি ঘোরাতে গিয়ে থমকে যায়।
পুরো রুমটা যেন মানুষের জন্য নয় ক্রিকেট মাঠের মতো বিশাল এক ফাঁকা শূন্যতা, আর সেই শূন্যতাকে গ্রাস করে আছে শুধু গভীর কালো। দেয়াল, মেঝে, ফার্নিচার, এমনকি তার নিচের বিছানাটাও একেবারে নিখুঁত কালো। আলো এখানে ঢুকলেই যেন নিভে গিয়ে মরছে। চারপাশের নিস্তব্ধতা এতটাই দমবন্ধ করা যে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল তার। সে আগেও একবার এ রুমে এসেছিল মাত্তেয়োর অনুরোধে জেইনের ব্যান্ডেজ করতে কিন্তু তখন এতটা খেয়াল করতে পারেনি। আর এই দুদিন জ্বর আর অসুস্থতার কারণে চোখ খোলেইনি ভালো করে। তাই এই জায়গার প্রকৃত চেহারা কখনোই উপলব্ধি হয়নি। আজ প্রথমবার, পূর্ণ জেগে ওঠার পর, যেন অচেনা এক দানবীয় অন্দরমহলে আটকা পড়েছে সে।

সে কাঁপা কাঁপা দৃষ্টি বেডের সামনের দেয়ালের দিকে ফেলে। মুহূর্তেই বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যায়। আতঙ্কে চমকে উঠে সে ছিটকে বিছানার শেষ প্রান্তে গিয়ে ঠেকে। বুক ধকধক করছে, মনে হচ্ছে বুক ফেটে বেরিয়ে আসবে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, সে বড় বড় করে শ্বাস টেনে নিতে থাকে। হাত কাঁপছে, পুরো শরীর হিম হয়ে যাচ্ছে।
রিমের বুক ধড়ফড় করছে, শ্বাসকষ্টে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে কাঁপতে কাঁপতে আবার চোখ ফেরায় দেয়ালের দিকে। প্রথমে যেন কিছুই নেই নিখুঁত কালো দেয়াল। কিন্তু পরের মুহূর্তে হঠাৎই অন্ধকার ভেদ করে ভেসে ওঠে সেই দৃশ্য!

দেয়ালের বুক চিরে যেন এক বিশাল সোনালী দানব মাথা তোলে। এক অদ্ভুত ঝলমলে আলোয় গড়া ড্রাগন, পুরোপুরি সোনার তৈরি। কিন্তু মূর্তির মতো স্থির নয় বরং তার চোখদুটি যেন জীবন্ত, রিমের শরীরের ভেতর বিদ্ধ হয়ে ঢুকে যাচ্ছে। চোখের শীতল সোনালি শিখা তাকে স্থির করে রাখে, পালাবার শক্তি কেড়ে নেয়।
ড্রাগনের আঁশে অদ্ভুত প্রতিফলন, যেন সে নিঃশ্বাস নিলেই তা দপদপ করে জ্বলে ওঠে। অন্ধকার ঘরের ভেতরে তার সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়ছে, আর সেই আভা আলো নয় বরং গিলে ফেলার মতো ভয়।
রিমের মনে হলো ড্রাগনটা শুধু দেয়ালে নেই, বরং তাকে ঘিরে রেখেছে চারদিক থেকে। তার বুক ভারী হয়ে আসে, মনে হচ্ছে দেয়াল ভেদ করে অগ্নিশ্বাস ছুঁড়ে দেবে যে কোনো মুহূর্তে।
রিম বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। তার হাত-পা কাঁপছে অনবরত, যেন শরীরের ভেতরকার রক্ত জমে বরফ হয়ে গেছে। ভয়ে তার চোখ স্থির থাকতে পারছে না, চারপাশে ছুটোছুটি করতে থাকে সে। কিন্তু বেরোনোর কোনো রাস্তা নেই। প্রতিটি দেয়াল তার জন্য মৃত্যুর মতো অচল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
হঠাৎই তার মনে হয়, দেয়ালগুলো স্থির নেই। যেন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে তার দিকে। প্রতিটি দেয়াল হাত বাড়িয়ে তার গলা চেপে ধরতে চাইছে। কালো দেয়ালের ভেতর থেকে অদৃশ্য হাত বেরিয়ে এসে তার নিঃশ্বাস কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

মাথা ঘুরে যায়, তীব্র যন্ত্রণায় চোখ অন্ধকার হয়ে আসে। সে কাতরাতে কাতরাতে নিজের মাথা চেপে ধরে। ঠান্ডা ঘাম বেয়ে নেমে আসে কপাল থেকে। হঠাৎই তার বুক ফেটে যায় আতঙ্কে, আর গলা ফাটিয়ে পাগলের মতো চিৎকার করে ওঠে। চিৎকার ভেসে যায় বিশাল রুমের মধ্যে, কিন্তু কোথাও প্রতিধ্বনি হয় না। নিস্তব্ধতা সব শব্দ গিলে খায়।
তার কান্নায় শ্বাস আটকে আসে, বুকের ভেতর হাহাকার জমে ওঠে। মনে হয় আর এক মুহূর্তও টিকে থাকতে পারবে না। যেন তার আত্মা দেহ ছেড়ে বেরিয়ে আসবে, টেনে নিয়ে যাবে অজানা অন্ধকারের দিকে।
ঠিক তখনই তার চোখ পড়ে বেডের ডান দিকে রাখা এক ঝকঝকে বিশাল কাঁচের কাবার্ডে। সে হাঁপিয়ে উঠে দাঁড়ায়, কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে যায় সেখানে। তার কণ্ঠরোধ হয়ে আসছে। অবশেষে হাত বাড়িয়ে কাবার্ডের দরজা খুলে ফেলে। ভেতরে হালকা ডিম লাইটের মতো ক্ষীণ আলো ছড়িয়ে আছে। সেই ক্ষীণ আলোয় অদ্ভুতভাবে চকচক করছে কিছু ছোট ছোট বাচ্চার গরম কাপড় যেন মৃত শৈশবের স্মৃতি জমে আছে সেখানে।

রিম আর কিছু ভাবে না নিজের শরীরটাকে জোর করে গুঁজে দেয় কাবার্ডের ভেতরে। ভাঁজ হয়ে গুটিয়ে যায় এক কোণে। যেন সেই কাঁচের আলমারি তাকে বাঁচিয়ে দেবে চারপাশের কালো মৃত্যুর হাত থেকে।
সে ডোরটা বন্ধ করে দেয়। অন্ধকার ভেতরে ঢুকে পড়লেও বাইরে থেকে আসা ভয়ংকর উপস্থিতি কিছুটা দূরে সরে গেছে বলে মনে হয়। নিজের শরীরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে সে।
রিমের মনে হয় এই বিশাল রাক্ষুসে ঘরের মধ্যে সে নিছক এক চুনোপুঁটি, কাবার্ডের অন্ধকারে লুকিয়ে পড়া এক তুচ্ছ প্রাণ। ভয়ে ভয়ে চোখ বন্ধ করে রাখে। শরীরটা ক্রমে অবশ হয়ে আসে, কাঁপন থেমে যায়। আর অবশেষে অদ্ভুত এক ক্লান্তি ও ভয়ের ভারে সে আবার তলিয়ে যায় গভীর অচেতন ঘুমে।

রিম’কে চোখের সামনে পেয়েই জেইনের শরীর যেন অস্থির উন্মাদনায় কেঁপে ওঠে। ঘুমিয়ে থাকা রিমকে সে আচমকা ঝড়ের মতো টেনে নেয় বুকের ভেতর, এমনভাবে শক্ত করে চেপে ধরে যেন ছেড়ে দিলে সে চিরতরে হারিয়ে যাবে।
তার ঠোঁট ফাঁক হয়ে আসে, হাঁপাতে হাঁপাতে শ্বাস টেনে নেয় রিমের চুল থেকে আসা গন্ধ। হৃদপিণ্ডের ধুকপুক শব্দ অস্বাভাবিক জোরে বাজতে থাকে, যেন বুক ফেটে বেরিয়ে আসবে।
জেইনের হাত দুটো ক্রমে শক্ত হয়ে ওঠে। সে দুহাতে রিমের মুখটা আঁকড়ে ধরে, আর পরের মুহূর্তে উন্মাদের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। চোখ, কপাল, গাল সব জায়গায় অজস্র ভেজা চুম্বন আঁকতে থাকে, যেন বহু বছরের খিদে একসাথে মিটিয়ে নিচ্ছে।
ঘুমের তন্দ্রার ভেতরেই ভেজা ভেজা অনুভূতিতে কুঁকড়ে যায় রিম। তার চোখ মুখ কুঁচকে যায়, অস্থির হয়ে ওঠে শরীর। অবশেষে পিটপিট করে আধো চোখ খোলে, অস্পষ্ট দৃষ্টিতে তাকানোর চেষ্টা করে।
তখনই জেইনের ঠোঁট কাঁপা কাঁপা ভাঙা ভাঙা স্বরে ফিসফিসিয়ে ওঠে

“কোথায় ছিলে তুমি? কত খুঁজেছি তোমাকে… তুমি জানো না তোমাকে না দেখলে আমার কতটা কষ্ট হয়? আর কক্ষনো আমার চোখের আড়াল হবে না তুমি। তুমি যদি চোখের আড়াল হও… আমি মরে যাবো। সত্যি মরে যাবো আমি।”
রিম আধো চোখে তাকায়, ঠোঁট নড়ে ওঠে কিছু বলার জন্য। কিন্তু তার আগেই জেইনের উন্মাদ চোখ ঝলসে ওঠে। এক ফোঁটা দেরিও না করে নিজের ঠোঁট চাপিয়ে দেয় রিমের ঠোঁটে। শ্বাস কেটে যায়, পৃথিবী থেমে যায় এক মুহূর্তের জন্য।
রুমের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা মাত্তেও আর ইয়াশ এই দৃশ্য দেখে বিষম খেয়ে কাশতে থাকে। শুকনো কাশি চেপে রাখতে না পেরে একে অপরের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকায়। তারপর নিঃশব্দে, এক ফোঁটা শব্দ না করে, আস্তে আস্তে বেরিয়ে পড়ে রুম থেকে।

জেইন রিমের ঠোঁটে ঠোঁট চেপে দেয়, যেন নিজের মিষ্ট ভাব পুরোপুরি ঢুকিয়ে দিতে চায়। রিমের শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ ছড়িয়ে পড়ে। মুখ দিয়ে বের হয় অসম্পূর্ণ, গভীর গোঙানির আওয়াজ। জেইনের চুমু আরও গভীর হয় মাথার সব কণায় ছড়িয়ে দেয় যেন পুরোপুরি খেয়ে ফেলার নেশায় সে।
রিমের হাত স্বয়ংক্রিয়ভাবে জেইনের চুল আঁকড়ে ধরে। জেইন একেবারে নিজের দিকে টেনে নেয়, তাদের শরীর মিলিত হয় এক ধরণের অচেনা তীব্রতা দিয়ে। ওষ্ঠের সাথে ওষ্ঠের সংঘর্ষ বাড়তে থাকে, যেন ঠোঁটের মধ্যে একটুও ফাঁক নেই। দুজনের শ্বাস-প্রশ্বাস একাকার হয়ে যায়, হৃদস্পন্দন ছুটতে থাকে অস্বাভাবিক গতিতে।
জেইন রিমের ঠোঁটের প্রতিটা কাঁপুনি অনুভব করে। যেন সে তার সমস্ত মধু, সমস্ত সুধা মৌমাছির মতো আহরণ করে নেয়। হাত এলোমেলোভাবে ছুঁয়ে যায় রিমের শরীরের নিষিদ্ধ স্থানগুলোতে। রিমের নিঃশ্বাস ক্রমেই বন্ধ হয়ে আসার চেষ্টা করে, সে ছটফট করে ওঠে, জেইনকে ঠেলে সরাতে চায়।

কিন্তু জেইন নিজের মধ্যে নেই। সে রিমের দুটো হাত শক্ত করে চেপে ধরে, আরও কাছে টেনে নেয়। চুমুর মাঝে হালকা হালকা দাঁত বসিয়ে দেয়। রিমের মুখ ব্যাথায় কুঁচকে যায়, চোখ দিয়ে নোনা জল ঝরে পড়ে। জেইন আবার ঠোঁট কামড়ে চু-ষতে থাকে, যেন রিমের ব্যথা গিলে খাচ্ছে। সে দাঁত দিয়ে রিমের নিচের ঠোঁট রাবারের মতো টেনে ধরে। রিমের নখ তার কাঁধে ডেবে যায়, যেন রক্ত বের হয়ে আসবে। কিন্তু জেইনের মাঝে কোনো পরিবর্তন নেই।
জেইন রিমের ঠোঁট টেনে শব্দ করে ছেড়ে দেয় শ্বাস নেওয়ার জন্য সামান্য বিরতি। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই উন্মাদ যেন সে আবার হামলে পড়ে রিমের ঠোঁটে। শরীর ঠকঠক করে কাঁপছে রিমের, শক্তি ক্রমেই ঝরে যাচ্ছে। একধরনের অদ্ভুত শিরশিরানি ছড়িয়ে পড়ছে পুরো শরীরে।
জেইনের মুখ যেন রিমের মুখের গভীরে ঢুকে যায়। থামতে চাইলেও থামতে পারে না। মনে হয়, সারাজীবন এভাবে থেকে খুশি মনে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারবে। রিম ফুঁপিয়ে ওঠে, গলা দিয়ে শব্দ বেরোয় না,ফিসফিস করে বলে,

“ছাড়ুন….. মরে যাবো আমি। নিঃশ্বাস নিতে পারছি না।”
জেইন থামে না। বরং তার চুমু আরও গভীর, আরও উন্মাদ হয়ে উঠে। চুম্বনের মাঝেই সে ফিসফিস করে ওঠে,
“একটু সহ্য করো সোনা… আমি কন্ট্রোল করতে পারছি না। আর একটু… প্লিজ।”
রিমের কি হলো কে জানে? ভদ্র মেয়ের মতো সে জেইনকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। জেইন চুমু খেতে খেতে তাকে কাবার্ড থেকে তুলে নিজের কোলে নিয়ে নেয়। রিমের দুই পা তার কোমড়ে জড়িয়ে ধরে, আর দুই হাত তার গলা পেঁচিয়ে রয়েছে। জেইনের দুটি শক্ত হাত রিমের ঊরুতে রেখে তাকে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করছে।
চুম্বনরত অবস্থায় জেইন ধীরে ধীরে বিছানার দিকে এগোয়। বিছানায় পৌঁছেই সে রিমকে দাঁড় করিয়ে ঠোঁট ছেড়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে গভীর শ্বাস নিতে থাকে। রিমের চোখ বন্ধ। সে ধীরে ধীরে শ্বাস নিচ্ছে। তাদের গরম, ভারী শ্বাস-প্রশ্বাস একে অপরের মুখে আছড়ে পড়ে।
জেইন ধীরে ধীরে রিমের নাকের সাথে নিজের নাক ঘষে। চোখে মুখে তৃপ্তি, মাদকতা আর অদ্ভুত সুখের ঝিলিক। সে শ্বাস নিতে নিতে হালকা মুচকি হাসে।তারপর টুপ করে শব্দ করে রিমের ঠোঁটে একটা ছোট্ট চুমু বসিয়ে দেয়। জীভ দিয়ে নিজের ঠোঁটের শেষ লালা টুকু চেটে নেয়। শুষ্ক ঢোক গিলে কপালে কপাল ঠেকিয়ে গাঢ়, মাদকতা মেশানো কণ্ঠে ফিসফিস করে,

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৯

“উমম yummm….এটা তো আগের থেকেও বেশি টেস্টি ছিল, intoxicating। তোমার ঠোঁট… Just like Jello. এতটাই জুসি এন্ড ফ্লাপি যে, মনে হচ্ছে কামড়ে ছিঁড়ে ফেলি একদম। এক রাতেই ফ্লেভার এতো বেড়ে গেল কিভাবে বলতো? তোমার lips… এখন আমার pure addiction. I can’t stop, even if I want to… কি মিশিয়েছো বলোতো? নাকি তোমাকেই পুরোপুরি খাওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করছো?”
রিম চোখ বন্ধ করে রাখে। লজ্জায় তার গাল দুটো ফুলে লাল হয়ে যায়। ধীরে ধীরে শ্বাস নিচ্ছে, মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে শরীরের সব শক্তি ঝরে যাচ্ছে। যেন জান বেরিয়ে যাবে এক্ষুনি।

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৩১