Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৩৯

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৩৯

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৩৯
রাত্রি মনি

বিমানের চাকাগুলো মাটিতে স্পর্শ করার সাথে সাথে পুরো কেবিনে হালকা ঝাঁকুনি। তারপর ধীরে ধীরে কমে আসা গতির সাথে রানওয়ের আলো চোখে পড়তে থাকে। জানালার বাইরে দেখা যায়—বৃষ্টিভেজা রানওয়ের ওপর আলো ঝিকমিক করছে, দূরে সারি সারি লাইট যেন সোনালি মুক্তোর মতো সাজানো।
পাইলটের গলা ভেসে আসে—

“Ladies and gentlemen, welcome to Dhaka, Bangladesh.”
ভেতরে যাত্রীদের মনে এক অদ্ভুত স্বস্তি আর উত্তেজনার মিশেল। কেউ হাসিমুখে জানালার বাইরে তাকায়, কেউ আবার মোবাইল চালু করে প্রিয়জনকে মেসেজ পাঠায়।
বিমানের দরজা খোলার সাথে সাথে একদম ভিন্ন অনুভূতি, কাঁচের দরজা ভেদ করে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো এলেনা, ইয়াশ আর মাত্তেও। তিনজনের চোখেই কালো সানগ্লাস, মুখে নিস্পৃহ ঠাণ্ডা অভিব্যক্তি। গরম আর আর্দ্র বাতাসের ঢেউ মুখে এসে লাগে, সাথে হালকা ধোঁয়া আর ধুলো মেশানো শহুরে গন্ধ। করিডর ধরে এগিয়ে যাওয়ার সময় কানে ভেসে আসে ঘোষণা—

“Flight from Rome has just arrived…”
এলেনার লম্বা হিলের শব্দ টক্ টক্ করে প্রতিধ্বনি তুলছে চকচকে মেঝেতে। তার বাদামি সিল্কি চুল কাঁধে এলিয়ে আছে, ঠোঁটে হালকা লাল লিপস্টিক—যেন ভয় আর সৌন্দর্য একইসাথে বহন করছে।
ইয়াশ নীরব। পকেটে দুহাত গুঁজে চারপাশ‌ বিশ্লেষণ করছে তীক্ষ্ণ চোখে। তার কালো স্যুটে মেটালিক ঘড়ির ঝিলিক চোখে পড়ে। মাত্তেওর হাতে কালো ট্রলি ব্যাগ। মুখে বিরক্তির ছাপ। সে নাক টেনে মুখটা কুঁচকে চারপাশের ভিড় দেখে বিরক্ত হয়ে বলল,
“Madonna mia! এত গরম! এত ধুলো! এটা এয়ারপোর্ট? আমি তো শ্বাসই নিতে পারছি না…”
ইয়াশ তার দিকে একবার তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে ফিসফিস করে বলল,

“Shut up, Matteo.”
এলেনা কিছু না বলে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। তার গম্ভীর নীরবতার মাঝে মাত্তেয়োর বকবক যেন আরও স্পষ্ট শোনায়।
কাস্টমস আর ইমিগ্রেশন তারা অনায়াসে পেরিয়ে যায়।কারও সাহস হয় না তাদেরকে বেশি প্রশ্ন করার।অফিসাররা কেবল নীরবে পাসপোর্টে সীল মেরে মাথা নাড়ে।
বাইরে বেরুতেই কড়া আলো আর গরম বাতাস আঘাত করে মুখে। ভিড় জমা লোকজনের কোলাহল থেমে যায় তাদের উপস্থিতিতে। সবার দৃষ্টি গিয়ে আটকে থাকে এই তিন বিদেশি ফিগারে, যেন সিনেমার চরিত্র হেঁটে যাচ্ছে বাস্তবে।

গাড়ি আগে থেকেই অপেক্ষায়—একটা কালো টিন্টেড SUV। ড্রাইভার দরজা খুলে দাঁড়িয়ে পড়ে। এলেনা প্রথমে স্লো মোশনের মতো এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে। তার পর ইয়াশ গাড়িতে বসে। মাত্তেও শেষবার চারপাশে তাকিয়ে, ভিড়ের দিকে শীতল চোখে একবার তাকায়, তারপর দরজা বন্ধ করে ভেতরে ঢোকে।
SUV-এর ইঞ্জিন গর্জে ওঠে, ধোঁয়া ছেড়ে ধীরে ধীরে এয়ারপোর্ট ছেড়ে বেরিয়ে যায়—ঢাকার অস্থির রাস্তায় মিলিয়ে যায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
রিমের নিথর, র*ক্তমাখা, ন*গ্ন শরীরটা দেখে মুহূর্তের মধ্যে জেইনের বুক হিম হয়ে গেল। মনে হলো পৃথিবীর সব শব্দ থেমে গেছে, শুধু তার বুকের ভেতরের ধকধকানিই শোনা যাচ্ছে। চোখ দুটো এমনভাবে কেঁপে উঠল যেন কারও ছোড়া গুলি এসে বুকে বিঁধেছে। ঠান্ডা ঘাম ঝরতে শুরু করল তার কপাল থেকে, হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে, শ্বাস ভাঙছে।

গত রাতের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি চিৎকার যেন তীক্ষ্ণ ছুরি হয়ে বুকের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। হিংস্র রাগ আর অন্ধ উন্মাদনায় সে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল। তার সেই অন্ধকার মুহূর্তের হাতেই আজ তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটা ভেঙে গেছে। যে মেয়েটাকে সে বুকের মধ্যে আগলে রেখেছিল, তাকেই সে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে।
সে হঠাৎ উন্মাদের মতো এগিয়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল রিমের কাছে। নিজের কালো শার্টটা নিয়ে রিমের র*ক্তমাখা, ঠান্ডা শরীরের উপর ছড়িয়ে দিল। সেই শরীরটা ঠান্ডা, নিস্তেজ, নিথর—শ্বাস নেই, প্রতিক্রিয়া নেই। কাঁপা কাঁপা হাতে সে শরীরটা বুকে জড়িয়ে নিল। ঠোঁট কাঁপছে, গলা শুকিয়ে গেছে, চোখে অন্ধকার ছায়া নেমে পড়েছে। সে রিমের গাল দুটো দুই আঙুলে ধরে, থরথর করা কণ্ঠে ডেকে উঠল,

“ফায়ারফ্লাই… সোনা…প্লিজ সোনা.. চোখ খোলো সোনা… আমার দিকে একবার তাকাও… হেই বার্বিডল…open your eyes please …I can’t breat… প্লিজ চোখ খোলো… একবার কথা বলো আমার সাথে। তোমার কিছু হলে আমি মরে যাবো… আআআমি… আমি মরে যাবো… এএএ…এ আমি কী ফেললাম…”
তার কণ্ঠটা যেন একেবারে ভেঙে গিয়েছে, হঠাৎ করেই কাঁপা কাঁপা কান্নায় আটকে যাচ্ছে। শ্বাস নিতে পারছে না। বুকের ভেতরের হাড়গুলো যেন ফেটে যাচ্ছে। এক হাতে রিমকে বুকে পিষে ধরে অন্য হাতে নিজের চুল টেনে ধরল। দাঁত চেপে রুদ্ধ কণ্ঠে বলল

“আ-আমার… আমার ভুল হয়ে গেছে সোনা… বিশ্বাস করো… আমি তোমাকে একটুও কষ্ট দিতে চাইনি… একবার চোখ খুলে আমার দিকে তাকাও… একবার আমার সাথে কথা বলো… আমার সাথে রাগ দেখাও… বলো… বলো আপনি.. আপনি একটা জানোয়ার… বলো আমি আপনাকে ঘৃণা করি… আমি সব সহ্য করব… তোমার ঘৃণা, তোমার আঘাত… সব… শুধু একবার চোখ খোলো প্লিজ… আমার দম আটকে যাচ্ছে… আমি মরে যাচ্ছি…”
কিন্তু রিমের কোনো সাড়া নেই। চোখ বন্ধ, ঠোঁট শক্ত, শরীর অচেতন। চারপাশের বাতাস যেন অদৃশ্য এক পাথর হয়ে তার বুকে বসে গেছে। জেইনের শ্বাস ভাঙতে ভাঙতে আরেকবার রিমের ঠোঁটের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল

“আ-আমি… আমি আর কক্ষনোও কষ্ট দেব না তোমাকে… প্লিজ সোনা, চোখ খোলো… প্লিজ… একবার শুধু তাকাও আমার দিকে… তোমার মনস্টার তোমাকে ডাকছে… একবার জানোয়ার বলে ডাকো আমাকে… আমি তোমার মুখে জানোয়ার ডাকটা শুনতে চাই। আমি আমি আর এই যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছি না… I can’t tolerate this pain anymore. এর চেয়ে ভালো তুমি আমাকে মৃত্যু দিয়ে দাও…”
তবুও কোনো সাড়া নেই। রিমের শরীর নিস্তেজ, ঠান্ডা।
জেইনের চোখে এখন শুধু পাগলামি আর অসহায়ত্বের ছায়া।তার বুক ওঠানামা করছে, শ্বাস যেন সত্যিই কেটে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে বুকের ভেতর কেউ পাথর চাপা দিয়েছে। চোখে লালচে রক্তিম ছায়া, মুখে আতঙ্ক আর অনুশোচনার দাগ। সে উন্মাদের মতো রিমের মুখে, কপালে, রক্তমাখা বুকে চুম্বন দিতে দিতে ফিসফিস করছে,
“আমি মরে যাব তোমাকে ছাড়া… শুনছো? আমি মরে যাব…”

হঠাৎ তার কণ্ঠ থেকে আর্তনাদের মতো এক গর্জন বেরিয়ে এলো, যা ঘরের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। তার বুকের ভেতরকার অস্থিরতা পুরো ঘরটাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
রিমের হাত তখন ঢলে পড়ল তার বাহু ছড়িয়ে ফ্লোরে। জেইনের চোখ অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠলো। আরও বেশি পাগলের মতো রিমের শরীরটা শক্ত করে চেপে ঝাঁকিয়ে হিংস্র বন্য পশুর মত চিৎকার করে উঠল,
“অ্যাই… অ্যাই বেইমানের বাচ্চা!!! এই… চোখ খোল!! খোল বলছি… খোল চোখ!!… ছলনাময়ী!!! বেইমান!!! আমাকে একা রেখে চলে যাবি ভেবেছিস?? এতই সোজা? আমি তোকে মুক্তি দেব ভেবেছিস?? তুই.. তুই তো বলেছিলি সারাজীবন আমার সাথে থাকবি। তাহলে কেনহ্ … কেন করলি বল? কেন কেন? প্রয়োজন হলে আমাকে আঘাত করতি… আমি তোকে কষ্ট দিয়েছিলাম না? তাহলে আমাকে রক্তাক্ত করতি… নিজেকে কেন আঘাত করলি তুই? আমার বুকটা জ্বলে যাচ্ছে… তুই বুঝতে পারছিস না? আমি কষ্ট পাচ্ছি… তুই দেখতে পাচ্ছিস না? চোখ খোল বলছি!! কি ভেবেছিস তুই… আমাকে একা ছেড়ে চলে যাবি ভেবেছিস! কক্ষনো না… কিচ্ছু হবে না তোর… আমি হতে দেব না… যতক্ষণ এই পৃথিবীতে আমার শ্বাস চলবে, তোর কিচ্ছু হবে না… তোকে বাঁচতে হবে… আমার জন্য… আমার জন্য বাঁচতে হবে তোকে…বুঝতে পেরেছিস তুই!!!”

তার শেষের চিৎকার এতটাই জোরালো ছিল যে, পুরো ক্যালাব্রিয়ার যত বন্য পশুপাখি ছিল সব যেন ছুটে পালিয়ে গেছে। তার চোখ রক্তবর্ণ, ঠোঁট কাঁপছে। শরীরটা কাঁপছে হিংস্র বাতাসের মতো। তার আঙুলে আর শক্তি নেই, কিন্তু তবুও সে রিমকে বুকের মধ্যে চেপে রেখেছে।
হঠাৎ সে রিমকে কোলে তুলে নিল, কাঁপতে কাঁপতে বার থেকে বেরিয়ে রুমে চলে গেল। বিছানায় শুইয়ে আবারও তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার বুকের ভেতর অস্থিরতা এখন আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে যাচ্ছে। হাত, পা, শরীর সব কাঁপছে।
যে মানুষটা এত তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক আর কঠোর হৃদয়ের অধিকারী, সেও আজ জ্ঞান শূন্য হয়ে গেছে ভেঙে পড়েছে। এই মুহূর্তে সে শুধু জানে, যে করেই হোক পৃথিবী ধ্বংস করে হলেও, তার ফায়ারফ্লাইকে বাঁচাতে হবে। সে তার ফায়ারফ্লাইকে হারিয়ে বাঁচতে পারবে না। কক্ষনো না!

ঢাকা, বাংলাদেশ
কালো SUV ঢাকার অভিজাত একটি ফাইভ স্টার হোটেলে থামল।ঝলমলে আলো, ঝকঝকে কাঁচের দরজা, আর ইউনিফর্ম পরা গার্ডরা দাঁড়িয়ে আছে ভদ্র অভ্যর্থনার জন্য। ইয়াশ, মাত্তেও আর এলেনা একসাথে নেমে এলো। তাদের চলাফেরায় এক অদৃশ্য প্রভাব যেন চারপাশের ভিড় নিজে থেকেই সরে যাচ্ছে। রিসেপশনের ম্যানেজার তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে এসে অভ্যর্থনা জানাল, মাথা নিচু করে,
“Welcome to Dhaka, Mam.”

এলেনা কোনো বলল না, শুধু একবার চারপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি চালাল। গার্ড, ক্যামেরা, প্রবেশপথ সব খুঁটিয়ে নিল সে। যেন প্রতিটি জায়গার মানচিত্র তার মাথায় খোদাই হয়ে যাচ্ছে। ইয়াশ হাসি মুখে ম্যানেজারকে ধন্যবাদ জানাল। আর মাত্তেও এক হাতে কালো ট্রলি ব্যাগ, অন্য হাতে জামার হাতা ঝাড়তে ঝাড়তে মুখ কুঁচকে বলল
“অবশেষে একটু এয়ারকন্ডিশনের দেখা পেলাম। এই শহরের ধুলো-বালি দেখে আমি শপথ করছি, ফুসফুসে এক্সট্রা ফিল্টার লাগাতে হবে!”
হোটেল বয় ব্যাগ নিতে এগিয়ে আসতেই মাত্তেয়ো ব্যাগটা শক্ত করে ধরে বিরক্ত মুখে বলল,

“No, no, no… এটা আমার সাথে যাবে। Italy থেকে এসেছে, তোমরা হাত দিও না।”
ইয়াশ বিরক্ত হয়ে মাথা নাড়ল। ফিসফিস করে বলল,
“Stop embarrassing us, Matteo.”
তারা তিনজনে একসাথে সব নিয়ম পালন করে, পেপারে সাইন করে, যে যার কার্ড হাতে নিয়ে নিল। তারপর তিনজনে একসাথে লিফটে ওঠে টপ ফ্লোরে পৌঁছে গেল। মাত্তেও রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করতে যাবে ঠিক তখনই হঠাৎ তার হাতের ফোনটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনে লেখা—Boss: Zain।
সে এক মুহূর্ত থমকে গেল।

“এই সময় হঠাৎ ভাইয়ের ফোন?”
হালকা অস্বস্তি নিয়ে কল রিসিভ করতেই কানে ভেসে এল জেইনের ভাঙা, বিক্ষিপ্ত গলা। সেই কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক শূন্যতা, যেটা মাত্তেয়ো একমাত্র সেদিনই শুনেছে—যেদিন রিম হারিয়ে গিয়েছিল। বুক ধক করে উঠল তার।
“ভাই… কী হয়েছে আপনার? আপনি এমন করছেন কেন?”
কিন্তু ওপাশে কোনো স্বাভাবিক উত্তর নেই। শুধু ভাঙা নিঃশ্বাস, কাঁপা কাঁপা কান্না জড়িত কণ্ঠ ভেসে এলো…
“মাত্তেও….মাত্তেও কিছু একটা কর, ওকে বাঁচিয়ে দে। ও কথা বলছে না মাত্তেও। তুই কিছু একটা কর আমি মরে যাবো। আমি সহ্য করতে পারছি না। ও-ওকে.. বল না আমার সাথে কথা বলতে….”
মাত্তেওর পা থেমে গেল। গলা শুকিয়ে কাঠ।
“ভাই, ভাই আগে আপনি একটু শান্ত হোন । ভালো করে নিঃশ্বাস নিয়ে তারপর বলুন কি হয়েছে।”
কিন্তু ওপাশে হাহাকার ভরা গলা

“আ-আমি আমার ফায়ারফ্লাই….. আমার ফায়ারফ্লাইকে আমি কষ্ট দিয়েছি মাত্তেও….. এখন ও আমার সাথে কথা বলছে না। আমি কি করবো বল? আমি… আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। আমার মাথা কাজ করছে না। আ-আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। তুই ওকে বল না, বল না আমার সাথে কথা বলতে। বল না ওকে…..”
মাত্তেও কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। তার কানে শুধু বাজছে ভাইয়ের হাহাকার। সে দ্রুত ফোন হাতে নিয়ে ইয়াশের রুমে নক করে। ইয়াশ ডোর খুলে ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
“কি সমস্যা? এখনো ফ্রেশ না হয়ে আমাকে জ্বালাতে আসলি কেন?”
মাত্তেও হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,

“ভাই ফোন করেছে। ভাইয়ের গলা খুবই করুন শোনাচ্ছে। মনে হচ্ছে ভাবির সিরিয়াস কিছু হয়ে গেছে। আমি কিছু বুঝতে পারছি না আপনি একটু ভাইয়ের সাথে কথা বলুন….”
ইয়াশ সাথে সাথে ফোনটা হাতে নিয়ে কানে তুলে নিল। চিন্তিত গলায় বলল
“hey dude… What happened? Is everything okay?”
ইয়াশের কানে ভেসে আসে জেইনের আধভাঙ্গা কান্না জড়িত কন্ঠ,

“ইয়াশ আমার ফায়ারফ্লাই…. তুই ঠিক বলেছিলি ইয়াশ আমি ওকে নিরাপদ রাখতে পারিনি, আমার জন্য, ও আমার জন্য কষ্ট পেয়েছে ইয়াশ। ও নিজের হাত কেটে ফেলেছে। এবার আমি কি করবো বল? ও তো আমার সাথে কথা বলছে না। তুই কিছু একটা কর না প্লিজ…. আমি.. আমি আমার এই হাত দুটো দিয়ে আমার ফায়ার ফ্লাইকে কষ্ট দিয়েছি। এই হাত আমি রাখবো না, রাখবো না এই হাত, যেই হাত আমার ফায়ারফ্লাইকে কষ্ট দিয়েছে। কেটে ফেলবো এই হাত, জ্বালিয়ে দেব।”

ইয়াশ স্তব্ধ। রিম হাত কেটে ফেলেছে মানে! জেইন থাকতে এটা কিভাবে সম্ভব! আর রিমই বা কেন হুট করে এমন একটা পথ বেছে নিল? যে মেয়েটা এতদিন বন্দি থেকেও কখনো এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি তাহলে আজ কেন এমনটা করল সে? প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে তার মাথায়। কিন্তু এই মুহূর্তে উত্তর খোঁজার সময় নেই।
প্রথম কাজ জেইনকে থামানো, শান্ত করা আর রিমকে বাঁচানো। সে জেইনকে বলে,
“okay okay clumdown. তোকে আগে মাথা ঠান্ডা করতে হবে। আর এসব কি বলছিস তুই? তুই যদি নিজের হাত কেটে ফেলিস তাহলে লিটেল সিস্টারকে কিভাবে বাঁচাবি? তুই এক কাজ আগের রিমের pulse rate চেক কর।”
জেইন ধরে আসা গলায় শ্বাস কাঁপিয়ে বলে

“আমি চেক করে দেখেছি…. খুব ধীরে চলছে। সময় খুব কম। ওকে যেভাবেই হোক বাঁচাতে হবে।”
“তাহলে তুই ওকে নিয়ে হসপিটালে চলে যা as soon as possible.”
জেইন হঠাৎ ঝড়ের মতো বলে উঠল
“না না হসপিটালে নিয়ে গেলে ওর লাইফ রিস্ক আরো বেড়ে যাবে… চারপাশে সব শত্রুরা আছে… এই মুহূর্তে আমি ও’কে নিয়ে কোন রিস্ক নিতে পারবো না…”
ইয়াশ দাঁত চেপে বলল
“কিন্তু এখন এসব ভাবলে তো হবে না, আগে ওকে বাঁচাতে হবে।”
জেইনের গলা ভাঙা কিন্তু ভয়ঙ্কর দৃঢ়
“তুই সব ব্যবস্থা কর… ওর চিকিৎসা এখানেই হবে…”
ইয়াশ বিস্মিত
“ওখানে কিভাবে সম্ভব!”
জেইনের কণ্ঠ যেন ঠান্ডা আগুন,
“আমি সেসব কিচ্ছু জানি না… আমি শুধু জানি আমার ফায়ারফ্লাইকে বাঁচিয়ে তুলতে হবে… আর তুই সব ব্যবস্থা করে দিবি… এক্ষুনি!”

ইয়াশ আর কিছু বলার মতো শব্দ খুঁজে পেল না। ফোনের ওপাশের ভাঙা, কাঁপা নিঃশ্বাসগুলো যেন তার কানে নয়, সরাসরি বুকের ভেতর আঘাত করছিল। সে জানে এই মানুষটার মাথা ঠান্ডা না হলে যেকোনো সময় যেকোনো কিছু করে ফেলতে পারে। তার চোখের সামনে যেন ভেসে উঠল দুইটা রক্তমাখা দেহ একটা রিমের, অন্যটা জেইনের।
হঠাৎ মনে হলো বুকের ভেতর থেকে যেন কেউ একটা বরফের হাত ঢুকিয়ে সব গরম রক্ত চেপে ধরছে। সে জানে এখন কথা না শুনলে, এখনই যদি কোনও ব্যবস্থা না নেয়, তবে এই পাগলটা নিজেকে শেষ করে দেবে, সাথে টেনে নিয়ে যাবে সেই মেয়েটাকেও।
সে একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোন কেটে দিল। হাত কাঁপছিল। আঙুলগুলো যেন ঠান্ডা বরফ হয়ে গেছে। এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে সে নিজের ফোনে নম্বর ডায়াল করলো । স্ক্রিনে ইতালির পার্সোনাল হসপিটালের নামের পাশে লাল আলো জ্বলছিল।
ডায়াল করতেই ভেতর থেকে গলা শুকিয়ে এল।

“ড. ইয়াকুজা…”
তার গলা থেমে গেল।
আমাদের একটা-জরুরী কেস… এখনই। এখনই সব রেডি করুন। ব্লাড, ইকুইপমেন্ট, সবকিছু। সাথে একজন ফিমেইল ডক্টর। যতটা লুকিয়ে সম্ভব। কেউ যেন ঘুণাক্ষরেও টের না পায়।”
ওপাশের ডাক্তারের কণ্ঠে আতঙ্ক ফুটে উঠল,
“কেসটা কতটা ক্রিটিকাল?”
ইয়াশ দাঁত চেপে ফিসফিস করে, যেন কারও না শোনার মতো করে বলল
“ক্রিটিকাল না, মৃত্যুর কিনারে। যদি দেরি হয়, দু’জনেরই দাফন করতে হবে।”
ফোন কেটে ইয়াশ কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার মাথায় বারবার ভেসে উঠছে রিমের রক্তমাখা হাত আর জেইনের উন্মত্ত, ভাঙা কান্না। তার ঠোঁট থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো
“হে আল্লাহ এবারের মতো এদের দু’জনকে বাঁচিয়ে দিও… না হলে এই দুনিয়ার সবচেয়ে বড় রক্তক্ষয়ী ঝড়টা নেমে আসবে।”

ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
“First time… তাও আবার পিরিয়ডের পর পর! আপনার এতটা rude হওয়া উচিত হয়নি। একটু খেয়াল রাখা উচিত ছিল। প্রচুর পরিমাণে ব্লিডিং হয়েছে। এছাড়া হাতের ক্ষতটাও অনেক গভীর যদিও একটুর জন্য শিরা কাটেনি। এনিওয়েস এখন উনি বিপদ মুক্ত। তবে জ্ঞান ফিরতে দু-একদিন সময় লাগতে পারে। আর ওনাকে কিছুদিন সম্পূর্ণ বেড রেস্টেই থাকতে হবে।”
ঘরের ভেতরটা এখন একেবারে হসপিটালের কেবিনের মতো। চারপাশে মনিটর, স্যালাইন স্ট্যান্ড আর অ্যান্টিসেপটিকের তীব্র গন্ধ। রিমকে একটা সাদা চাদরে ঢাকা বেডে শুইয়ে রাখা হয়েছে। জেইন রিমের এক হাত শক্ত করে নিজের দুহাতে চেপে ধরে বসে আছে। আঙ্গুলগুলো এতটাই সাদা আর টানটান, যেন রক্ত থেমে গেছে। তার চুলগুলো এলোমেলো, উস্কোখুস্কো, চোখগুলো লালচে, অন্ধকারে ডুবে যাওয়া, কিন্তু তবু নিঃশব্দ। মুখটা একেবারে শুকনো, ফ্যাকাশে, তাতে আর রঙ নেই শুধু অদ্ভুত এক ক্লান্তি।
তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলা ডাক্তার নিঃশব্দে হাতের কাটা অংশটা পরিষ্কার করে নতুন ব্লাড ব্যাগ লাগিয়ে দিলেন। তারপর ধীরে ধীরে গ্লাভস খুলে পাশে দাঁড়ালেন।তিনি নরম গলায় বললেন,

“এখন আর কোনো সমস্যা নেই। ওনার অবস্থা কিছুটা স্টেবল। জ্ঞান ফিরলে আমি আবার আসবো। ততক্ষণ ওনার বিশেষ যত্নের প্রয়োজন। আপনি চাইলে আমি একজন নার্সের ব্যবস্থা করে দিতে পারি।”
জেইন ধীরে ধীরে মুখটা উঁচু করল। তার চোখের তলায় গভীর ছায়া, যেন শত বছর ধরে ঘুমায়নি। ফিসফিস করে, প্রায় নিজের সাথেই কথা বলার মতো করে বলল
“তার কোনো প্রয়োজন নেই… আমি সবটা সামলাতে পারবো।”
ডাক্তার চলে যাওয়ার পর ঘরটা আবার ভুতুড়ে নীরবতায় ডুবে যায়। বিছানার পাশে বসে জেইন রাতের পর রাত জেগে থাকে। চোখ লাল হয়ে গেছে, ঠোঁট শুকিয়ে ফেটে গেছে, মুখে হালকা দাড়ি বাড়তে শুরু করেছে। কিন্তু সে এক মুহূর্তের জন্যও রিমের হাত ছাড়ে না।
একদিন পর ধীরে ধীরে রিমের চোখ খুলে যায়। কিন্তু সেটি যেন খোলার পরও শূন্য—কোনো সাড়া নেই। হাসি নেই, কান্না নেই, এমনকি রাগও নেই।
এভাবেই বেশ কিছুদিন কেটে যায়, কিন্তু রিমের মধ্যে কোনো পরিবর্তন নেই, সে যেন নিথর পাথরের মূর্তি।
একসময়ের চঞ্চল, প্রাণবন্ত মেয়েটার এই পরিবর্তন দেখে জেইনের বুকের ভেতরটা জ্বলে যায় আগুনের মতো। সে ডাক্তারকে ডেকে জানতে চায় রিম কিভাবে স্বাভাবিক হবে। ডাক্তার ঠাণ্ডা গলায় বলেন,

“She is under trauma. ওকে অনেক বেশি খুশি রাখতে হবে। ওর পছন্দের জগতে ফিরিয়ে নিতে হবে। তবেই হয়তো ধীরে ধীরে ফিরে আসবে।”
জেইনের চোখ পড়ে টেবিলে রাখা একটি ডায়েরির দিকে। রিমের ডায়েরি। সে কাঁপা হাতে সেটি তুলে নিয়ে পড়তে থাকে। পাতার পর পাতা ভরে আছে রিমের ছোট ছোট শিশুসুলভ ইচ্ছেগুলো—তুষারপাত দেখা, ক্যান্ডেল লাইট ডিনার, লেকের ধারে চেরি ব্লসম ঝরা ফুল, নৌকায় চাঁদের আলোতে বসে থাকা…
জেইনের বুক ভারী হয়ে ওঠে। নিঃশব্দে ফোন তুলে মাত্তেওকে বলে,

“Tell the guards to make all arrangements.আমার ফায়ারফ্লাই যা চেয়েছে, সব আজই পূরণ হবে।”
তারপর জেইন রিমকে কোলে তুলে বাথরুমে নিয়ে যায়। বাথটাবের গরম জলে, নিজের হাতে ধীরে ধীরে খুব যত্ন সহকারে গোসল করিয়ে দেয়, যেন হাত আর বুকের ব্যান্ডেজ এক ফোঁটাও পানিতে না ভিজে। রিমের শরীরের লালচে ছোপ ছোপ দাগ গুলো দেখে তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। সফট তোয়ালে দিয়ে যত্ন করে মুছিয়ে দেয় শরীরের প্রতিটা পানির ফোটা। মখমলি রঙের ড্রেস পরিয়ে, নরম হাত দিয়ে গালে চুল সরিয়ে দেয়। তারপর হেয়ার ড্রায়ারের উষ্ণ বাতাসে রিমের ভেজা চুল শুকিয়ে সুন্দর করে বেনী করে দেয়। সাজানো রিম তখনও পুতুলের মতো বসে থাকে—নিষ্প্রাণ, শূন্য। জেইনের বুকটা কেঁপে ওঠে। সে চায় তার ফায়ারফ্লাই তার সাথে রাগ করুক, তাকে ঘৃণা করুক, আঘাত করুক… কিন্তু এভাবে চুপ থাকলে সে সহ্য করতে পারে না।

বুকের যন্ত্রণা চেপে সে রিমকে কোলে তুলে বাইরে লনে নিয়ে যায়। বাইরে সন্ধ্যার আলো নেমে এসেছে। চারপাশের দৃশ্যটা যেন কোনো পরীর জগত। আকাশ থেকে ধীরে ধীরে নামছে তুষারের মতো কৃত্রিম সাদা কণা, মাটির ওপর নরম আলো জ্বলে উঠেছে। লেকের ধারের সবুজ ঘাসের ওপর সাদা-গোলাপি আলো ফেলে সাজানো টেবিল–চেয়ার। মাঝখানে সোনালি ক্যান্ডেলগুলো নরম বাতাসে দুলছে, চারপাশে ছড়িয়ে দিচ্ছে এক স্বপ্নময় আভা। দূরে শোনা যাচ্ছে হালকা ভায়োলিন সুর, যা যেন রাতকে আরও মায়াবী করে তুলেছে।

জেইন রিমকে আস্তে করে চেয়ারে বসিয়ে তার সামনে বসে। রিমের পছন্দের খাবার সাজানো টেবিলে—বিরিয়ানি, গ্রিলড চিকেন, চিংড়ির মালাইকারি, চকোলেট ডেজার্ট। সে প্রতিটি লোকমা তুলে রিমকে খাইয়ে দেয়, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান রত্ন সে নিজের হাতে ধরে রাখছে। রিম নিঃশব্দে খেতে থাকে। অনুভূতিহীন যন্ত্রমানবের মতো।
হঠাৎ চারপাশে ঝরতে শুরু করে চেরি ব্লসমের গোলাপি পাপড়ি। বাতাসে উড়ে এসে কিছু পাপড়ি রিমের চুলে আটকে যায়। রিমের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে ওঠে, ঠোঁট সামান্য নড়ে ওঠে, আর অজান্তেই সেখানে এক হালকা হাসি ফুটে ওঠে। ক্ষণস্থায়ী হলেও সেই হাসি জেইনের বুকের শূন্যতায় ঝড় তুলে শান্তি এনে দেয়। তার কন্ঠ ভাঙা অথচ প্রশান্ত। সে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করে।

“তোমার পছন্দ হয়েছে এগুলো?”
রিম কোনো উত্তর দেয় না। তার হাসি মিলিয়ে যায়। আবার শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। জেইনের বুক ভেঙে দীর্ঘশ্বাস বের হয়। তবুও সে হাল ছাড়ে না।
ডিনার শেষে সে রিমকে কোলে নিয়ে লেকের ধারে আসে। ছোট্ট কাঠের বোট সাজানো আছে নরম লণ্ঠনের আলোয়। লেকের জলে সেই আলো প্রতিফলিত হয়ে চারপাশকে যেন রূপকথার মতো করে তুলেছে।
বোট যখন ধীরে ধীরে ভেসে ওঠে, রাতের আকাশে রুপালি চাঁদ ভেসে ওঠে। সেই আলো এসে পড়ে রিমের মুখে। জেইনের কাছে মনে হয়—এ পৃথিবীর সব সৌন্দর্য এক হয়ে গেলেও রিমের মুখের দীপ্তি তার চেয়ে বহুগুণ বেশি।
বাতাসে ভেসে আসে ফুলের গন্ধ, লেকের জলে পড়ে চাঁদের ঝিলিক। হঠাৎ আবার আকাশ থেকে গোলাপি পাপড়ির ঝরনা নামে। রিম সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকে নিঃশব্দে, তার চোখে জলের ঝিলিক ফুটে ওঠে—কিন্তু শব্দহীন।
জেইন রিমকে নিজের বুকে টেনে নেয়। চারপাশের চাঁদের আলো, ভায়োলিনের সুর আর পাপড়ির বৃষ্টি সব মিলিয়ে তাদের নীরব মুহূর্তটাকে সবচেয়ে গভীর ভাষায় রাঙিয়ে তোলে।

রিম নিজের রুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। এতকিছুর পরেও তার মুখে হাসি ফোটাতে পারেনি জেইন। চারপাশ নিঃস্তব্ধ, কেবল তারার আলো আর নীচে লেকের জলে প্রতিফলিত সেই আলো। বাতাসে হালকা শীতলতা, আর দূর থেকে ভেসে আসছে ব্যথা ভরা সেই সুর—
“না জানি কোন অপরাধে দিলা এমন জীবন,
আমারে পোড়াইতে তোমার এত আয়োজন…”🎶
রিমের চোখে কোনো জল নেই, কিন্তু সেই দৃষ্টি যেন একদম প্রাণহীন—শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চুলে হালকা বাতাস খেলা করছে।
হঠাৎ পেছন থেকে নরম পদধ্বনি—একজন মহিলা সার্ভেন্ট ধীরে এগিয়ে আসে।

“এখন আপনার শরীর কেমন আছে, ম্যাম?”
রিম পেছনে না তাকিয়েই নিষ্প্রাণ গলায় বলে,
“খাঁচার ভেতর বন্দি পাখি যেমন থাকে, আমিও তেমনি আছি। আমার জীবনটা এমন কেন হলো বলতো? আমি তো কখনো কারো কোনো ক্ষতি করিনি! তাহলে আমার সাথেই কেন? কি অপরাধ ছিল আমার?”
তার গলাটা ভেঙে আসে।
“শুধু একটা ছোট্ট স্বপ্ন ছিল… বড় গায়িকা হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম… মায়ের কষ্ট দূর করতে চেয়েছিলাম… ছোট্ট একটা স্বপ্নের বাড়ি বানাতে চেয়েছিলাম যেখানে আমরা সুখে থাকতে পারবো। কিন্তু হঠাৎ দুঃস্বপ্নের মতো একটা ঝড় এসে সবকিছু কেমন এলোমেলো করে দিল…”
কথা বলতে বলতে রিমের চোখের কোণা বেয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে।
অন্যদিকে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জেইন তার প্রতিটি শব্দ শুনে ফেলে। তার বুকের ভেতর যেন কারও হাত ঢুকে মুচড়ে ধরে আছে। সে কিছু মুহূর্ত সেখানে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়।

পেন্টহাউজের অন্ধকার গোপন কক্ষে এসে জেইন একাই বসে থাকে কিছুক্ষণ। নীচু আলোয় তার চোখের চারপাশটা লালচে। সে ফোন তুলে, ইয়াশের নামের পাশে চাপ দেয়। ফোন ধরতেই ওপাশে ইয়াশের গলা।
“হ্যাঁ বল, লিটল সিস্টার এখন কেমন আছে?”
জেইনের গলা কেঁপে যায় কিন্তু দৃঢ় শোনায়,
“সমস্ত ব্যবস্থা কর… ফ্লাইটের টিকিট বুক কর। আমি ওকে বাংলাদেশ পাঠিয়ে দেবো সুরক্ষিতভাবে।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা। যেন ইয়াশের মাথার ওপর পুরো আকাশ ভেঙে পড়েছে। জেইন!! জেইন এই কথা বলছে যেই জেইন কিনা তার ফায়ারফ্লাই কে ছাড়া এক মুহূর্ত নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিতে পারে না। সে এই কথা বলছে!
ইয়াশ নিজের বিষময় কাটিয়ে বলে,

“এসব কি বলছিস তুই? তুই কি নেশার ঘরে আছিস, নাকি পাগল হয়ে গেছিস? যাকে না দেখলে এক মুহূর্ত থাকতে পারিস না, যার শরীরের সুভাস না পেলে দম বন্ধ হয়ে আসে তাকে ছাড়া কিভাবে থাকবে তুই।”
জেইনের গলা ফাটলধরা, কিন্তু অদ্ভুত এক শান্তি লুকিয়ে আছে সেখানে।
“হয়তো ওকে ছাড়া থাকতে আমার কষ্ট হবে ইয়াশ… কিন্তু এই মুহূর্তে ওর কষ্ট আমি আর সহ্য করতে পারছি না। তাই চাই ও যেখানেই থাকুক ভালো থাকুক। যদি আমার থেকে দূরে থেকে ভালো থাকতে পারে… তাহলে দূরেই থাকুক। আমি ওকে দূর থেকেই আগলে রাখবো, দূর থেকেই দেখবো। কিন্তু এই নীরবতা… এই পাথর হয়ে যাওয়া আমি সহ্য করতে পারবো না…”
ইয়াশ শ্বাস কষে টেনে বলে,

“দেখ তুই এখন নিজের মধ্যে নেই। এখন এই কথা বলছিস, কিন্তু পরে আবার নিজেই কষ্ট পাবি। আমি জানি ও চলে গেলে তুই পাগল হয়ে যাবি। প্রতিদিন একটু একটু করে মরবি। আর আমি তোর কষ্ট সহ্য করতে পারবো না। তুই একবার রিটেল সিস্টারকে সত্যিটা বলে দেখ, যে তুই ওর আরাত্র। আমার বিশ্বাস, ও যদি সত্যিটা জানতে পারে, কোনদিন তোকে ছেড়ে যেতে চাইবে না। সারা জীবন তোকে আঁকড়ে ধরে রাখবে।”
জেইনের কণ্ঠে তীব্র যন্ত্রণা আর হালকা হাসির ছায়া,
“সেটা আর সম্ভব নয় ইয়াশ। ও কেন আমার কথা বিশ্বাস করবে বল? ওর কাছে তো মনে হতেই পারে আমি মিথ্যে বলছি। ওর কাছে আমি শুধু একটা মনস্টার, অপরিচিত, অপরাধী। আর আমি নিজেই চাইনা ও কোনদিন আমার পরিচয় জানতে পারুক। আর কেন সেই কারণটা তুই নিজেও ভালো করে জানিস। তার থেকে ভালো তুই সব ব্যবস্থা করে দে… আমি কালই ওকে এখান থেকে পাঠিয়ে দিতে চাই…”

রিম বারান্দার ঠান্ডা মার্বেল ফ্লোরে হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে। তার দুটো বাহু নিজের কাঁধে জড়ানো, যেন নিজেকে আরেকটু আঁকড়ে ধরলে ভিতরের কষ্টটা কিছুটা কমে যাবে। আকাশ ভরা তারা যেন অসংখ্য নিঃশব্দ সাক্ষী— নীচে লেগুনের নীলচে জল হালকা বাতাসে ঢেউ তুলে মৃদু শব্দ করছে। চারপাশে সমুদ্রের গন্ধ, রাতের আর্দ্র হাওয়ায় রিমের চুলগুলো মুখে এসে লেপ্টে গেছে।
পেছন থেকে নিঃশব্দে এসে থামল জেইন। কিছুক্ষণ তার ফায়ারফ্লাইকে এভাবে একা, ভাঙা দেখে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে রিমের সামনে বসে পড়ল। হাওয়ার টানেই তার গলার স্বরটা আরও কাঁপা, ক্ষীণ হয়ে গেল

“রিশাব আর ওর সাথীরা… সবাই সুরক্ষিতভাবে বাংলাদেশ পৌঁছে গেছে। আর তোমাকেও কাল এখান থেকে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন থেকে তুমি স্বাধীন… নিজের ইচ্ছেমতো চলবে, কেউ আর তোমাকে বন্দি করে রাখবে না।”
রিম কিছুক্ষণ নীরব থাকে। বাতাসে শুধু জলের গন্ধ আর লেগুনের ঢেউয়ের মৃদু শব্দ। তারপর সে মুখে একরকম ব্যথাভরা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে তোলে
“এখন তো আমাকে পাঠিয়েই দিতে চাইবেন, তাই না? আপনার প্রয়োজন যে মিটে গেছে… যা চেয়েছিলেন তা তো পেয়েছেনই। জা*নোয়ারের মতো খু*বলে খেয়েছেন আমার শরীরটা। আশ মিটেছে, না?”
জেইন হঠাৎ যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। তার বুকের ভেতরটা কেউ দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে। সে ক্ষীণ গলায়, যেন নিজের কথায় নিজেই ভেঙে যাচ্ছে। হঠাৎ রিমের চুলের মুঠি টেনে ধরে নিজের মুখের বরাবর করে

“তোমাকে কাছে পাওয়ার তৃষ্ণা একজীবনে মিটবে না আমার। এরকম আরো একশত জনমও কম পড়ে যাবে।বুঝেছ?”
সে রিমের চুলের মুঠি থেকে নিজের হাতের বাঁধন আলগা করে ফেলে। কিছুক্ষণ নিরব থেকে আবারও নিরুদ্বেগ গলায় বলল,
“আমি তোমার স্বামী! আমার হক আছে তোমার উপর…”
রিমের চোখ বেয়ে নীরবে একটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। তার গলায় নিস্তেজ অথচ বিষাক্ত স্বর
“স্বামী বলেই তো সেই স্বামীর হাতে বৈধভাবে ধ*র্ষিত হতে হলো আমাকে… একটা মেয়ের জীবনে এর থেকে বড় পাওনা আর কি হতে পারে?”
জেইন দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করে ফেলে। তার হাতের মুঠো এত শক্ত যে আঙুলের গিঁট সাদা হয়ে গেছে। বুকের ভেতর যেন ভাঙা কাঁচ ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিচ্ছে। এক মুহূর্তও সেখানে থাকতে পারল না সে। দ্রুত উঠে দাঁড়াল, নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল বারান্দা থেকে। অন্ধকার করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে নিজের ভেতরেই কেঁপে উঠল।
সত্যিই… সে তার ফায়ারফ্লাইকে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছে…
বাইরে তখন হালকা বাতাসে তারার আলো আরও নিস্তেজ, লেগুনের জলও যেন কাঁদছে রিমের সাথে।

ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ
ইতালিতে রাত হলেও বাংলাদেশ এখন সময় বিকেল তিনটা। মাত্তেও গাড়ি ড্রাইভ করছিল। সে প্রথমবার ঢাকা এসেছে, শহরটা একটু ঘুরে দেখার জন্য কৌতূহল ছিল তার। হঠাৎ তার গাড়ির সামনে থেকে ধাক্কা খেয়ে একটা মেয়ে পড়ে যায়। মাত্তেও সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়ে। চোখের সানগ্লাস খুলে দেখে মেয়েটা কাদায় লুটোপুটি খাচ্ছে। মাত্তেও ভয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে মেয়েটাকে টেনে তোলে।ঠাস! সাথে সাথে ঠাটিয়ে একটা চড় পড়ে তার গালে। মাত্তেও অবাক হয়ে গালে হাত দিয়ে তাকিয়ে থাকে।
মেয়েটা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চিৎকার করে বলে,
“বান্দির পোলা, তোর সাহস কি করে হলো আমাকে টাচ করার! ইশ্ কি করল! আমার পুরো স্কুল ড্রেসটা কাদার মধ্যে নষ্ট হয়ে গেল। এবার বাড়ি গিয়ে আমি মাকে কি জবাব দিব? মা তো আমাকে একেবারে কুচি কুচি করে ফেলবে!”

মেয়েটার কথায় ভড়কে যায় মাত্তেও। কন্ঠ নরম করে বলে,
“I am sorry. আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি আপনার ড্রেস নষ্ট হয়েছে তো। ঠিক আছে আমাকে বলুন কত টাকা, আমি ক্ষতিপূরণ দিয়ে দিব।”
এবার মেয়েটা রেগে লাল হয়ে পড়ল। ভ্রু কুঁচকে চোখে আগুন ধরিয়ে তির্যকভাবে বলল,
“কি বললি তুই??? আমাকে টাকার গরম দেখাচ্ছিস? তুই জানিস আমি কে? আমি যদি একবার চিৎকার করে এই মহল্লার লোকজনকে ডাকি না! তাহলে তোকে এমন মার মারবে, যে তুই তোর পুরো চৌদ্দগুষ্টির নাম ভুলে যাবি। শালা বদমাইশ!”
মাত্তেও হতবাক হয়ে, বিস্ময়ে বলল,

“এএই তুমি তুই-তুকারি করছ কেন? আমি তো ভদ্রভাবে কথা বলছি। শুধু তোমার ড্রেসটাই নষ্ট হয়ে গেছে। তাই টাকা দিতে চেয়েছি। না চাইলে নিবে না! এত চিৎকার করছো কেন?”
মেয়েটার রাগ যেন আরও তীব্র হচ্ছিল, ভ্রু কুঁচকে, দাঁত চিবিয়ে, আগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“আমি চিৎকার চেঁচামেচি করছি আমি? আর তুই যে আমাকে কাদায় ফেলে দিলি! বিনা অনুমতিতে আমার গায়ে হাত দিলি! সেটা কী? তোকে তো আজকে আমি গণধোলাই খাওয়াবো।”
মেয়েটা এবার চিৎকার শুরু করল , তড়িৎ মাত্তেও তার হাত দিয়ে মেয়েটির মুখ চেপে ধরল। মৃদু কণ্ঠে অনুনয় করে বলল,

“এই চিৎকার করো না প্লিজ। আমি সরি বললাম তো। তুমি এভাবে চিৎকার করলে লোকে ভাববে আমি তোমাকে ইভটিজিং করছি। তাহলে আমার মান-সম্মান সব নষ্ট হয়ে যাবে।”
মেয়েটি মাত্তেয়োর হাত ছাড়ানোর জন্য একটা তীক্ষ্ণ কামড় বসিয়ে দিল। সাথে সাথে মাত্তেও ঝাড়ি মেরে পিছিয়ে পড়ল, চোখ-মুখ কুঁচকে বলে উঠল,
“এই তুমি কি রাক্ষসী নাকি? এভাবে কেউ কামড়ে দেয়!”
মেয়েটি রাগে ফুসফুস করে ওঠে,
“কি বললি তুই আমাকে? আমি রাক্ষসী! তুই একটা গরু, ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চা, নেড়ি কুত্তার গু। বান্দির পোলা তোকে যদি আর কোনোদিন আমার সামনে দেখি না, তাহলে ধরে তোর নু*ন্টু কেটে দেবো। মনে রাখিস, আমার নামও রাহি। এই এলাকার বড় বড় সব ভাই ব্রাদার আমার কথায় ওঠে বসে। বিশ্বাস না হলে সবাইকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখিস।”

বলেই সে হেঁটে চলে গেল, নিজের বজ্রগর্জন রেখে পেছনে যতদূর চোখ যায়। মাত্তেও গাল ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে রইল—হঠাৎ শরীরে একটা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেল। মুখে ধীরে ধীরে মুচকি হাসি ফুটল। ঠিক তখনই দূর থেকে মাইকে গানের কণ্ঠ বেজে উঠল মেলোডিয়াস ,
“তোকে প্রথমবার দেখেই চোখে চোখ রেখেই
কখন জানিনা আমি কেস খেয়েছি।
তোর সেক্সি হাসিতে মন নিতে নিতে,
কখন জানিনা আমি কেস খেয়েছি….🎶
ওই ক্ষণে ইয়াশ দৌড়ে এসে দাঁড়ালো, অস্থির কণ্ঠে বললো,
“এই কি হয়েছে রে মাত্তেও? দূর থেকে দেখলাম মেয়েটা তোর সঙ্গে চিৎকার চেঁচামেচি করছে।”
মাত্তেও যেন এখনও স্বপ্নের মধ্যে ঘোরের ভেতর। ইয়াশ তার কাঁধে হাত রেখে ঝাকুনি দিতেই বাস্তবে ফিরে এলো তার গাল দুটো লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে উঠলো। ইয়াশ ভ্রু কুঁচকে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বলল,

“এই কি হয়েছে তোর? এমন কেন করছিস?”
মাত্তেও লাজে নত হয়ে মুচকি হেসে বলল,
“ভাই আই এম ইন লাভ।”
ইয়াশ বিস্ময়ে কণ্ঠ তুলল,
“লাভ! কখন, কিভাবে, কাকে দেখে?”
মাত্তেও আঙুল দিয়ে ইশারা করলো মেয়েটি চলে যাওয়ার দিকে। ইয়াশ অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
“আমাদের ইতালিতে এত মেয়ে থাকতে ওই পিচ্চি মেয়েটাকেই কেন পছন্দ হলো তোর?”
মাত্তেও হালকা লাজুক ভঙ্গিতে মুচকি হেসে বলল,
“গালি শুনে।”
ইয়াশ এক মুহূর্ত থমকে গেল। দেখে মনে হচ্ছে রীতিমতো লাথি খেয়েছে। তার মুখে মিশে গেল অবিশ্বাসের ছায়া।
“কিহ্!!!”
মাত্তেও থাপ্পর খাওয়া গালে হাত বুলিয়ে, মৃদু স্বরে বলল
“হুম…….”

ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
গভীর রাত। করিডোরটা নির্জন, কেবলমাত্র দেয়ালে লাগানো ডিম লাইটগুলো মৃদু আলোর রেখা ছড়াচ্ছে। চারদিকে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। যেন পুরো পেন্টহাউসটাই শ্বাস আটকে আছে।
রিম ধীরে ধীরে হাঁটছে। তার পরনে রাতের সফেদ গাউনটা হাওয়ার টানে দুলছে। এবার আর জেইন তাকে কক্ষে বন্দি করে রাখেনি। সে চায় রিম স্বাভাবিক হয়ে উঠুক। কিন্তু রিম এখনো নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত মনে করতে পারছে না। এই দেয়ালের ভেতরকার অদৃশ্য শৃঙ্খল যেন তার শরীরকে বেঁধে রেখেছে।
রিমের মন ভালো ছিল না। তাই একটু মনটা হালকা করার জন্য হাঁটতে বেরোয়। হাঁটতে হাঁটতে আবার সেই রহস্যময় ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল রিম। এই ঘরটা যেন সব সময়ই তাকে অদৃশ্যভাবে কাছে টানে। সে দরজার কালো চকচকে ধাতব প্লেটটার দিকে তাকিয়ে আছে। তার বুকের ভেতর কেমন এক অজানা চাপা ধ্বনি বাজতে থাকে। চোখ থেমে যায় দরজার উপরে লেখা সোনালি অক্ষরে—

“R O S E N 0707”
কেমন যেন অচেতনভাবে হাত বাড়িয়ে কোড টাইপ করে ফেলল সে দড়জার প্লেটটার লেখা গুলো। ক্লিক!
একটা তীক্ষ্ণ শব্দের সাথে সাথে ভারী লোহার দরজাটা গম্ভীর আওয়াজ তুলে সরে গেল ভেতরের দিকে। রিম স্থির হয়ে গেল। শ্বাস নিতে ভুলে গেছে প্রায়। “এটা… খুলে গেল?”
সে তো ভেবেইনি এত সহজে খুলে যাবে! কেবল কৌতূহলবশত টাইপ করেছিল, কিন্তু এখন অদ্ভুত এক ভয় আর টান মিশে তার ভেতর কাঁপন ধরিয়েছে।

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৩৮

ধীরে ধীরে ঘরে পা রাখল সে। প্রথমে কিছুই বোঝা গেল না। ঘরটা পুরোপুরি অন্ধকার। ভেতরে ঘন বাতাস, হালকা ধাতব গন্ধ। কিছুক্ষণ দ্বিধায় দাঁড়িয়ে থেকে হাত বাড়িয়ে সুইচ অন করে দিল রিম। সাথে সাথে আলো ঝলসে উঠলো ঘরের প্রতিটি কোণে।
রিমের চোখ বিস্ময়ে বড় হতে হতে স্থির হয়ে গেল। ঠোঁট কেঁপে উঠল। বুক ধক ধক করে উঠল অস্বাভাবিকভাবে।কারণ ঘরের ভেতর সে যা দেখল, তা তার কল্পনারও বাইরে………….

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪০