প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫
রাত্রি মনি
শহর থেকে দূরে নির্জনে অন্ধকার এক অভিশপ্ত বাংলো। জঙ্গলের ভেতর একাকী দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো বাংলোটি যেন মৃত্যুর নিঃশ্বাস ফেলে। চারপাশে ঘন জঙ্গল আর লতাগুল্মের এমন জটলা, যেন এক বিশাল অজগর বাংলোটিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে দম বন্ধ করে মারছে। ঝোড়ো বাতাসে গাছের ডালপালার ঘর্ষণ কোনো বন্য প্রাণীর আর্তনাদের মতো শোনাচ্ছে।
বাংলোর সদর দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই নাকে ধাক্কা দিল এক উৎকট পচা গন্ধ। শুধু পচন নয়, তার সাথে মিশে আছে রাসায়নিক আর জমাটবদ্ধ রক্তের ভ্যাপসা ঘ্রাণ। দেয়ালে অদ্ভুত সব আঁকিবুঁকি, যেন কোনো উন্মাদ তার নখ দিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বীভৎস গল্পটা লিখে রেখেছে।
বেনজি নাকে রুমাল চেপে আড়ষ্ট গলায় বলল,
“স্যার, এরকম ভুতুড়ে বাংলোয় কি আদৌ কোনো মানুষ থাকে? আমার তো হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। এত বাজে গন্ধে! এই গন্ধে মনে হচ্ছে পেটের নাড়িভুঁড়ি সব বেরিয়ে আসবে!”
কার্লোর হাতের টর্চের আলোটা দেওয়ালে স্থির হলো। বেনজির আজগুবি কথায় মেজাজটা আরও তিরিক্ষি হয়ে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে নিচু স্বরে বলল,
“শাট আপ বেনজি! আমরা এখানে কোনো ফাইভ স্টার হোটেলের বুকিং দিতে আসিনি। কিলারকে ধরতে এসেছি। এতই যদি ভয়, তবে পুলিশ না হয়ে মালি হতে পারতে; সারাদিন বাগানে ফুল গন্ধ শুঁকে কাটাতে পারতে। ফোকাস অন দ্য কেস!”
কথাটা তীরের মতো গিয়ে বিঁধল বেনজির আত্মসম্মানে।অপমানিত বোধ করলেও চুপ করে গেল।ঠিক তখনই নিস্তব্ধতা খানখান করে দিয়ে ওপরতলার করিডোর থেকে ভেসে তীক্ষ্ণ শব্দ।
ঠক… ঠক… ঠক…
হিল জুতো দিয়ে কেউ যেন মেপে মেপে মেঝেতে আঘাত করছে। কার্লো আর বেনজি মুহূর্তের মধ্যে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে পজিশন নিল। সেফটি ক্যাচ নামিয়ে বন্দুক উঁচিয়ে ধরল কার্লো।ওপর থেকে নেমে এল ছাইরঙা পোশাক পরিহিত এক নারী। তার মুখমণ্ডল কুয়াশার মতো ঝাপসা হলেও হাতের সেই ধারালো ফল কাটার ছুরিটা টর্চের মৃদু আলোয় চকচকে হয়ে উঠল।
কার্লোর ইশারায় বেনজি চিতার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে পেছন থেকে তার হাত মুচড়ে ধরল। মেঝেতে পড়ে গেল ছুরিটা।
“ইউর গেম ইজ ওভার!”
বেনজি গর্জে উঠল।বেনজির কঠিন হাতের মুঠোয় বন্দি নারীটির শরীর থরথর করে কাঁপছে। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে, যা গাল বেয়ে চিবুক দিয়ে টুপটুপ করে নিচে ঝরছে। তার চোখ দুটো যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে—ঠিক যেন কোনো জীবন্ত নরক দেখে এসেছে সে।পরপরই ভয়ার্ত কণ্ঠে বিড়বিড় করে উঠলো,
“আমাকে বাঁচান স্যার। ও আসছে….. ওই… ও..ওওই সাইকোটা মেরে ফেলবে আমাকে। দোহাই আপনাদের, আ-আমাকে এখান থেকে বের করুন!”
কার্লো আর বেনজি একে অপরের দিকে তাকাল। দুজনের চোখেমুখে গভীর বিস্ময়। যাকে তারা ধরতে এসেছে, সে-ই এখন বাঁচার জন্য পুলিশের কাছে আকুতি জানাচ্ছে? আর কে’ই বা তাকে মারতে চাইছে?
বেনজি তার হাতের বাঁধন আরও শক্ত করে বিরক্ত গলায় বলল,
“একদম চালাকি করবে না আমাদের সাথে! আমরা জানি তুমিই সেই ‘ব্লাডি কুইন’। এতদিন সুন্দরীদের নৃশংসভাবে খুন করার সময় দয়া লাগেনি? এখন পুলিশের হাতে ধরা পড়ে সতী সেজে ভালো মানুষ হওয়ার ঢং করছো? তোমার এই নাটক আমাদের মুখস্থ!”
“শাট আপ বেনজি! কাজের চেয়ে কথা বেশি বলো তুমি,” কার্লোর কড়া ধমক খেয়ে বেনজি দমে গেল।
নারীটি এবার ডুকরে কেঁদে উঠল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“স্যার, বিশ্বাস করুন, ও আমাকে মেরেই ফেলবে! আপনারা বুঝতে পারছেন না, ও কোনো মানুষ না, ও একটা শয়তান!”
“ভারী বিরক্ত করছে তো এই মহিলা! স্যার, একে সোজা থানায় নিয়ে চলুন। আমাদের অফিসার নিনা যখন লক-আপে নিয়ে পেছনের পিঠে দুই ঘা দেবে, তখন আপনা-আপনিই সব সত্যি বেরিয়ে আসবে। সব ঢং উবে যাবে তখন।”
কার্লো এবার শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ নজরে নারীটির দিকে তাকাল। তার অভিজ্ঞ চোখ বলছে, এই আতঙ্ক কোনো অভিনয় নয়। সে নিচু স্বরে বলল,
“শি ইজ নট লাইং বেনজি। এই তীব্র আতঙ্ক মেকআপ দিয়ে তৈরি করা যায় না। তাছাড়া, এর চোখের মণি আর হাতের কাঁপুনী বলছে এ কিলার হতে পারে না।”
কার্লো এবার নারীটির সামনে এসে দাঁড়াল। তার গম্ভীর কণ্ঠস্বর বাংলোর নিস্তব্ধতা চিরে দিল,
“শান্ত হও। তুমি যে কিলার নও, সেটা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু তুমি এখানে কী করছো? কে তোমাকে মারতে চাইছে? সবটা বলো আমাদের।”
বাংলোর স্যাঁতসেঁতে মেঝের ওপর পড়ে থাকা একটা পুরনো নড়বড়ে কাঠের চেয়ারে মহিলাকে বসতে দিল কার্লো। টর্চের আলোটা পাশের দেওয়ালে প্রতিফলিত করে রাখা হয়েছে। যাতে মহিলার আতঙ্ক দৃষ্টি কিছুটা কমে। কার্লোর জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সামনে মহিলাটি ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে ধুকপুক স্বরে তার জবানবন্দি দিতে শুরু করল।
“একটা মেয়ে স্যার! ও মানুষ নয়, ও অন্য কিছু। ওর চলাফেরা, কথা বলা—সবকিছুই অদ্ভুত। সারাক্ষণ নিজের মনে কী সব বিড়বিড় করে আওড়ায়, যেন কোনো অদৃশ্য প্রেতাত্মার সাথে কথা বলছে। টাকার খুব অভাব ছিল আমার, তাই ও যখন আমাকে দিয়ে প্রতি সপ্তাহে এক প্যাকেট করে ওই নামী কোম্পানির লিপস্টিক কিনে আনার কাজ দিল, আমি রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু আমি জানতাম না এই লিপস্টিকের পেছনে কত রক্ত লেগে আছে।”
মহিলাটি কাঁপতে কাঁপতে তার মাথার ওপরের চাদরটা সরাতেই কার্লো আর বেনজির চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। তার একটা কান নিখুঁতভাবে কেটে নেওয়া হয়েছে, আর মাথার মাঝখানের চুলগুলো অগোছালোভাবে উপড়ে ফেলা।সে ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
“যখন বুঝতে পারলাম ওর মাথায় সমস্যা আছে, আমি কাজটা ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ও… আমাকে হুমকি দিল, ওর কথা না শুনলে আমার ছোট ছেলেটাকে মেরে ফেলবে। সেই ভয়ে আমি ওর সব কাজ করে দিই। ও অনেকগুলো মেয়েকে মেরে ফেলেছে স্যার। এখানেই , এই বাড়িতে! আমি নিজের চোখে দেখেছি ওই মেয়েগুলোর ওপর কী পাশবিক অত্যাচার চালিয়েছে ও! আ.. আআমাকে, আমাকেও মারতে চায় এখন। ও..ও..ও এখনো এখানে আছে। আমার পিছু নিয়েছিল মারার জন্য। তাই ছুরি নিয়েছিলাম নিজেকে বাঁচানোর জন্য।”
কার্লোর ভ্রু কুঁচকে এল। সে প্রশ্ন করল,
“কিন্তু ও এভাবে নির্বিচারে সবাইকে মারছে কেন? ওর মোটিভ কী?”
“সৌন্দর্য! ও যাদেরকে মেরেছে তাদের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে একমাত্র তাদের সৌন্দর্য। নিজের থেকে সুন্দর কোনো মেয়েকে এই পৃথিবীতে সহ্য করতে পারে না ও।যাকে ওর প্রতিযোগী মনে হয়, তাকেই ও তিলে তিলে শেষ করে দেয়। সৌন্দর্যই ওদের কাছে অভিশাপ হয়ে আসে স্যার! ও এখন আমাকেও মেরে ফেলবে। আমাকে বাঁচান স্যার! আমি বাঁচতে চাই। আমার ছেলে, ওর আমি ছাড়া কেউ নেই। প্লিজ স্যার, আমাকে বাঁচান।
কার্লো কিছুটা দ্বিধাগ্ৰস্থ মহিলার কাঁধে হাত রাখল। আশ্বস্ত করে বলল,
“তুমি শান্ত হও। ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আমরা আছি। ওর সাধ্য নেই তোমার গায়ে আঁচড় কাঁটে।”
আশ্বস্ত হয়ে বড় করে নিঃশ্বাস ফেলে মহিলাটি। কিন্তু হায় পরিহাস! সেটিই বোধহয় ছিল তার ত্যাগ করা শেষ নিঃশ্বাস।কোনো আর্তনাদ করার সুযোগটুকুও পেল না সে। চেয়ার থেকে গড়িয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল নিথর দেহটা। চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে গেল পুরো দুনিয়া। হয়তো চলে গেছে না ফেরার দেশে।
ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে যায় কার্লো বেনজি দুজনেই। বুঝতে সময় লাগে কিছুটা।স্তব্ধতা ভেঙে প্রথম নড়ে উঠল কার্লো। সে দ্রুত মহিলাটির নিথর শরীরের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। কাঁপা কাঁপা আঙুলে গালে হাতের উল্টো পিঠ রাখল সে—হিমশীতল। পালস নেই। কার্লোর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল; অপরাধী তার নাকের ডগা দিয়ে একজনকে শেষ করে দিল, অথচ সে টেরই পেল না।
বেনজি তখন মেয়েটির মাথার পেছনে টর্চের আলো ফেলে ঝুঁকে দেখছিল। হঠাৎ সে আঁতকে উঠে বলল,
“স্যার, এদিকে দেখুন! এটা কী?”
মেয়েটির ঘাড়ের ঠিক ওপরে, করোটির একদম নিচে চুলের আড়ালে বিঁধে আছে একটা অত্যন্ত সরু আর ধারালো রুপোলি সুচ। বেনজি সাবধানে সেটা বের করে আনল। আগ্নেয়গিরির লাভার মতো টকটকে লাল রক্ত সেই সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে চুইয়ে পড়ছে।
বেনজি বিস্ময় আর আতঙ্কে অস্ফুট স্বরে বলল,
“স্যার! এই সামান্য একটা সুচ দিয়ে কি কাউকে মেরে ফেলা সম্ভব? এটা দিয়ে কীভাবে মরল এই মহিলা?”
“আই থিংক এটা কোনো সাধারণ সুচ নয়। তুমি এটা দ্রুত এভিডেন্স প্যাকেটে ভরে নাও, ফরেনসিক ল্যাবে পাঠাতে হবে।এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করা যাবে না।”
“ইয়েস স্যার,” বলতে বলতে বেনজি প্যাকেট বের করল।
ঝনঝন… ক্র্যাশ!
ঠিক সেই মুহূর্তেই বাংলোর নিস্তব্ধতা চিরে দিয়ে পাশের করিডোর থেকে ভেসে এল কাঁচ ভাঙার এক বিকট শব্দ।
কার্লো আর দেরি করল না। সে তার নাইন এমএম পিস্তলটা দুই হাতে শক্ত করে ধরে সেই শব্দের দিকে দৌড়ে গেল। তার পিছু পিছু বেনজিও ছুটল। পুরো ঘরটা অন্ধকারে ডুবে আছে, শুধু টর্চের আলোটা এদিক-সেদিক নাচছে।
ফাঁকা একটা বড় ঘরে ঢুকে কার্লো স্থির হয়ে দাঁড়াল। জানালার পর্দা নড়ছে। হয়তো একটু আগেই এখানে কেউ ছিল। এখন ঘরটা একদম শূন্য, কিন্তু মাঝখানে রাখা পুরনো ড্রেসিং টেবিলের বিশাল আয়নাটা কেউ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হাজারো কাঁচের টুকরো। সেই ভাঙা আয়নার অবশিষ্ট অংশে টাটকা, গরম রক্ত দিয়ে বড় বড় করে লেখা—
“BLOODY QUEEN…!”
ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউস
বিকেলের গোধূলি বেলায় আকাশের সোনালী আঁভা হঠাৎ ঘন মেঘে ঢাকা পড়ে যায়। সাগরের পাড়ে দাড়িয়ে থাকা জলপাই আর সাইপ্রাস গাছগুলো মৃদু বাতাসে দুলতে থাকে। যেন তারা আগে থেকেই জানতো বর্ষণ আসছে। একটু পরেই টুপটাপ করে নামতে শুরু করে বৃষ্টি। প্রথমে হালকা, তারপর একটু একটু করে ভারী ছন্দে ভেজাতে থাকে চারপাশ।
পাহাড়ের গায়ে বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ে সরু ধারা হয়ে। কাচের জানালায় বিন্দু বিন্দু ফোটা জমে ওঠে। দূরের গ্রামগুলোতে সাদা ধোয়ার মত কুয়াশা ছড়িয়ে পড়ে। যেন সবকিছু এক জাদুকরী চাদরে মোড়ানো।
ব্যালকনির গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে রিম।বৃষ্টির বিন্দুরা অবাধ্য হয়ে তার অবয়ব ভিজিয়ে দিচ্ছে। কপালে লেপ্টে থাকা ভেজা চুলের সারি আর গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির জলধারা তাকে এক অপার্থিব রূপ দিয়েছে। মেয়েটা সুদূরের দিকে তাকিয়ে আছে—হয়তো কোনো প্রতীক্ষায়, হয়তো কোনো অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে। চারপাশে ঝিরঝিরে বৃষ্টির সুর, আর সেই সুরের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে তার দীর্ঘশ্বাস। হাতে ধরা গ্রিলটা ভিজে স্লিপারি হয়ে আছে। তবুও ছাড়ে না সে। বাতাসে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধে রিমের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠছে, অস্থিরতা বাড়ছে। তবুও, এই বিষণ্নতার মাঝেও তাকে দেখাচ্ছে অপরূপ স্নিগ্ধ।
ঠিক নিচেই, বিলাসবহুল এই পেন্টহাউজের চারধারে কড়া পাহাড়ায় নিয়োজিত একদল ছায়ামূর্তি। কালো পোশাকে আবৃত সেই গার্ডদের হাতে উদ্যত বিশাল স্নাইপার। তাদেরই একজন স্থির দৃষ্টিতে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখছে বৃষ্টিতে ভেজা সেই বিষণ্ন প্রতিমা—রিমকে।
পেন্টহাউজের সেই গুমোট নিস্তব্ধতা চিরে দিয়ে সেখানে প্রবেশ করে এজে। তার প্রতিটি পদক্ষেপে এক ধরনের আধিপত্য আর আসন্ন ঝড়ের সংকেত। গার্ডদের কোনো একটা কড়া নির্দেশ দিতে গিয়েও মাঝপথে থেমে যায় সে। তার তীক্ষ্ণ নজর গিয়ে পড়ে এক গার্ডের ওপর—যে কি না পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে ওপরের ব্যালকনির দিকে।
এজে তার দৃষ্টি অনুসরণ করে ওপরে তাকাতেই দেখল রিমকে। মুহূর্তেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে, কপালে ফুটে ওঠে রাগের নীল শিরা। তার ‘ফায়ারফ্লাই’-এর দিকে অন্য কারো মুগ্ধ দৃষ্টি? এই চিন্তাটাই এজেকে পশুর মতো হিংস্র করে তোলে। তার ভেতরটা অপমানের আর ঈর্ষার দাবানলে জ্বলতে থাকে।
পলক ফেলার আগেই এজে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকটার ওপর। তার শক্ত হাতটা সাড়াশির মতো চেপে বসে গার্ডের গলার নালিতে। লোকটা যন্ত্রণায় একটা চিৎকার পর্যন্ত করার সুযোগ পায় না; কেবল অদ্ভুত এক গোঙানি আর বাতাসের জন্য হাঁসফাঁস শব্দ বেরিয়ে আসে তার কণ্ঠ চিরে।
এজে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে ওঠে, কন্ঠস্বরে যেন নরকের আগুন,
“হাউ ডেয়ার ইউ!!! আমার ফায়ারফ্লাইয়ের দিকে তাকানোর সাহস তোর হয় কী করে? আজ তোর ওই নোংরা চোখ দুটো আমি উপড়ে ফেলব। ব্রিং আ স্ক্রু ড্রাইভার… নাউ!”
আশেপাশে থাকা অন্য গার্ডরা ভয়ে সিঁটিয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে একজন গার্ড তড়িৎ বেগে ছুটে এসে কাঁপা হাতে একটা স্ক্রু ড্রাইভার বাড়িয়ে দেয় এজের দিকে। এজে লোকটাকে পশুর মতো আছাড় মেরে ফেলে দেয় মাটিতে । লোকটা বাঁচার জন্য দু-হাত নাড়িয়ে কিছু একটা বলতে চায়, কিন্তু এজের উন্মাদনার কাছে তা তুচ্ছ।
‘ক্যাঁচ-ক্যাঁচ’ শব্দে ধাতব ফলাটা হাড় আর মাংসের ভেতরে নিজের পথ করে নেয়।কোনো অনুকম্পা নয়, কোনো দ্বিধা নয়—এজে যান্ত্রিক নিষ্ঠুরতায় তীক্ষ্ণ স্ক্রু ড্রাইভারটা গেঁথে দেয় লোকটার চোখের মণির ভেতর।পরের মুহূর্তেই ছিটকে আসে গরম রক্ত, যা এজের রক্তাভ চোখে-মুখে মেখে তাকে আরও বিভৎস করে তোলে।
গগনবিদারী এক আর্তনাদ চারপাশের বৃষ্টির শব্দকে ছাপিয়ে যায়। সেই আর্তনাদে পেন্টহাউজের দেওয়ালগুলো যেন কেঁপে ওঠে, কিন্তু এজের পাথুরে মনে তা সামান্যতম আঁচড় কাটতে পারে না।
নিচ থেকে আসা সেই অমানুষিক আর্তনাদ রিমের কান ছিদ্র করে মগজে গিয়ে আঘাত করে। চমকে উঠে ব্যালকনি থেকে নিচের দিকে তাকাতেই তার শিরদাঁড়া দিয়ে হিমশীতল স্রোত বয়ে যায়। শরীর মুহূর্তেই অসাড়, পায়ের তলার মাটি যেন সরে যাচ্ছে। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা কামারের নেহাইয়ের মতো আছাড় খাচ্ছে—ধুকপুক শব্দটা সে নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছে। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। দৃষ্টি আটকে আছে নিচের ওই বীভৎসতায়।
বৃষ্টির ঝিরঝিরে শব্দের বদলে সেখানে এখন রাজত্ব করছে আদিম পাশবিকতা। এজে—না, ও কোনো মানুষ নয়, সাক্ষাৎ যমদূত! তার দাঁতে-মুখে ছিটকে আসা কালচে রক্ত মেখে এক পৈশাচিক উল্লাসে মেতেছে সে। রক্তের নেশায় চুর হয়ে যাওয়া কোনো এক ক্ষুধার্ত হায়েনার মতো সে একের পর এক আঘাত করে চলেছে নিথর দেহটার ওপর। বীভৎস সেই দৃশ্য দেখে রিমের পেট গুলিয়ে উঠছে, বমির উদ্রেক হচ্ছে তার।
এজে দুপাশে ক্যাড়ক্যাড় ঘাড় ফুটিয়ে, ধীরে ঘাড় বাঁকা করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সব গার্ডের দিকে তাকিয়ে হুংকার ছাড়ে,
“এখানে আর কারো এমন দুঃসাহস আছে আমার ফায়ারফ্লাইয়ের দিকে তাকানোর? টেল মি! আই… সেইড… টেল মি!!!”
সেই হুংকারে পেন্টহাউজের মজবুত ভিত্তিও যেন কেঁপে ওঠে। দুর্ধর্ষ সব গার্ডরা পর্যন্ত কুঁকড়ে যায় ভয়ে, মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকে অপরাধীর মতো। এজে আবারও চিৎকার করে ওঠে,
“যে আমার ফায়ারফ্লাইয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাবে, তাকে ঠিক এভাবেই শেষ করে দেব আমি! জ্যান্ত নরকে পুঁতে দেব।”
ঠিক তখনই আকাশ চিরে এক প্রলয়ংকরী বজ্রপাত ঘটে। যেন প্রকৃতিও এই নৃশংসতায় সায় দিচ্ছে। বৃষ্টির স্বচ্ছ ধারার সাথে গার্ডের দেহ থেকে চুইয়ে পড়া তাজা রক্ত মিশে এক বিভীষিকাময় লাল স্রোত তৈরি করেছে। ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ আর রক্তের ভ্যাপসা কটু গন্ধ মিলেমিশে বাতাসকে ভারী করে তুলেছে।
শান্তি! রক্তের সেই কাঁচা ঘ্রাণে তৃপ্তির শ্বাস নেয় এজে। এক অদ্ভুত শান্তিতে চোখ বন্ধ করে সে। ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে বিশ্রী, পৈশাচিক হাসি। হাত বাড়াতেই এক গার্ড কাঁপতে কাঁপতে তার হাতে তুলে দেয় প্রিয় ব্লু রাজ লেমোনেড ফ্লেভারের ইলেকট্রিক সিগারেট। এজে গভীর এক টান দেয় তাতে। পরক্ষণেই একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে দেয় বৃষ্টির বাতাসে। সেই নীলচে ধোঁয়া বৃষ্টির অঝোর ধারার সাথে মিশে গিয়ে মুহূর্তেই ফিকে হয়ে যায়। রয়ে যায় শুধু আতঙ্ক।
এজে বড় বড় হিংস্র পদক্ষেপে করিডোর পেরিয়ে রিমের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়। ঘরের শান্ত পরিবেশটা মুহূর্তেই বিষিয়ে ওঠে রক্তের আর বৃষ্টির নোনা গন্ধে। রিম তখনো সেখানে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে, যেন এক জীবন্ত পাথর। তার চোখেমুখে শূন্যতা, বুক ফেটে এক আকাশ সমান চিৎকার বেরিয়ে আসতে চাইছে কিন্তু কণ্ঠনালি যেন কেউ চেপে ধরেছে। রিমের রক্তে ফোবিয়া আছে, আর আজ সে যা দেখেছে তাতে তার চেতনা বিলুপ্ত হওয়ার পথে।
এজে ভেতরে ঢোকামাত্র মেঝের দামী কার্পেট বৃষ্টির পানি আর লাল রক্তে মাখামাখি হয়ে যায়। তাকে এগিয়ে আসতে দেখে রিম আর্তনাদ করে ওঠে,
“দূরে… দূরে থাকুন! কাছে আসবেন না একদম! আপনি একটা পশু… আ ব্লা*ডি বি*স্ট!”
এজের ঠোঁটের কোণে আবারও সেই পৈশাচিক, বিদ্রূপাত্মক হাসি ফুটে ওঠে। সে ধীরস্থিরভাবে রিমের দিকে এগিয়ে যায়।
“উহুঁ,”
এজে মাথা নেড়ে মৃদু স্বরে বলে,
“তোমাকে বলেছিলাম না সোনা, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হলো মানুষ। আর আমি? আমি তোমার ধারণার চেয়েও হাজার গুণ বেশি খারাপ। যে চোখ তোমার দিকে উঠবে, সে চোখ আর দুনিয়া দেখবে না। তোমার এই সৌন্দর্য শুধু আমার জন্য তোলা থাকবে। আর কারো অধিকার নেই তোমাকে দেখার। আমি… শুধুমাত্র আমি তোমাকে দেখব। তুমি শুধু আমার।”
রিম এবার সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে ওঠে,
“কক্ষনো না! কিসের অধিকারের কথা বলছেন আপনি? আপনার নিজেরই তো কোনো অধিকার নেই আমার ওপর! কাছে আসবেন না একদম। আপনার ওই নোংরা, রক্তমাখা হাত দিয়ে আমাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করবেন না। ঘৃণা করি আমি আপনাকে! পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি! আই হেইট ইউ! আই হেইট ইউ! আই হেইট ইউ!!!!”
চিৎকার করতে করতে রিমের চোখের জল বাঁধ মানে না। সে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে ফ্লোরে ধসে পড়ে। দুই হাঁটুতে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে ওঠে। নিজের মনেই বিলাপ করতে থাকে—এ কোন নরকে এসে বন্দি হলো সে? সে তো কখনো কারো ক্ষতি করেনি। তবে কেন তার সাথেই এমন হয়?
শৈশব থেকেই তো সে শুধু যন্ত্রণাই পেয়ে এসেছে। যে জিনিসটাকে সে ভালোবেসে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছে, সেটাই তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। তার প্রিয় পুতুল, প্রিয় খেলনা, পছন্দের শখ—সব! এমনকি শেষ আশ্রয় বাবাও তাকে ছেড়ে চলে গেছেন। মায়ের ভালোবাসাও কোনোদিন কপালে জোটেনি। রিমের বুক চিরে শুধু একটাই হাহাকার বেরিয়ে আসে—এই বিশাল পৃথিবীতে কি কেউ নেই যে তাকে একটু নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসবে? একটু যত্ন করে নিজের বুকের মাঝে আগলে রাখবে?
এজে টলমল পায়ে এসে রিমের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে। রিম ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার দুচোখ বেয়ে নোনা জলের ধারা তখনো অবাধে বইছে। নিজের ‘ফায়ারফ্লাই’-এর চোখে জল দেখে এজের পাথুরে বুকটাও যেন মুহূর্তের জন্য কেঁপে ওঠে। সে ব্যাকুল হয়ে হাত রাখে রিমের দুগালে। এজের হাতে লেগে থাকা আঠালো, কাঁচা রক্ত রিমের দুধে-আলতা গালদুটোতে মাখামাখি হয়ে যায়—এক বীভৎস কিন্তু তীব্র অধিকারবোধের ছাপ।
“তুমি কাঁদছ কেন, বার্বিডল? কেঁদো না, প্লিজ!”
এজের কণ্ঠে এক অদ্ভুত মিনতি। নিজের বুকের বাঁ দিকে হাত রেখে সে বলে ওঠে,
“তোমার কান্না আমি সহ্য করতে পারি না। এখানে লাগে… তুমি কাঁদলে আমার খুব কষ্ট হয়। সোনাপাখি, কাঁদে না প্লিজ!”
রিম ঝাপসা চোখে তাকায়। ঘৃণা আর অভিমানে তার কণ্ঠস্বর কেঁপে ওঠে,
“ছাড়ুন আমাকে! ছুঁবেন না আপনি! আমার কষ্টে যদি আপনার এতই কষ্ট হয়, তাহলে কেন আমাকে এই নরকে বন্দি করে রেখেছেন? কেন আমাকে আমার পরিবারের কাছে যেতে দিচ্ছেন না? বলুন! আমাকে আমার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে আসুন। এখানে দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার , মরে যাব আমি!”
এজে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এক পলক রিমের চোখের দিকে চেয়ে থেকে শীতল গলায় বলে,
“সরি বার্বিডল! তোমার সব ইচ্ছে আমি পূরণ করতে পারি। তুমি চাইলে আমি আকাশের ঐ চাঁদেও নিয়ে যেতে পারবো তোমায়। কিন্তু ওই একটা আবদার আমি রাখতে পারব না। তোমাকে সারা জীবন আমার কাছেই থাকতে হবে—আমার বন্দিনী হয়ে। ইউ ডোন্ট হ্যাভ এনি চয়েস!”
রিমের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। সে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে চিৎকার করে ওঠে,
“আপনি একটা জানোয়ার! ঘৃণা করি আমি আপনাকে! আই হেইট ইউ! আই হেইট ইউ!”
সে পাগলের মতো এজের পাথুরে বুকে ছোট ছোট মুঠোয় এলোপাথাড়ি ঘুসি মারতে থাকে। কিন্তু এজে স্থির পাহাড়ের মতো বসে সেই আঘাত সয়ে যায়। মারতে মারতে একসময় রিমের শক্তি ফুরিয়ে আসে। প্রচণ্ড মানসিক চাপ আর রক্ত দেখার আতঙ্কে তার শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। শেষবারের মতো এজের রক্তমাখা মুখটা আবছা দেখে নিয়ে সে জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়ে।
এজে খুব যত্ন করে নিজের ‘ফায়ারফ্লাই’-কে বুকের মাঝে আগলে ধরে কোলে তুলে নেয়। ঘরের মেঝেতে থাকা নিজের পায়ের রক্তচ্ছাপ মাড়িয়ে সে রিমকে নিয়ে বিছানার দিকে পা বাড়ায়। অঘোর ঘুমে আচ্ছন্ন রিমের কপালে সে এক দীর্ঘ, গভীর ভালোবাসার পরশ এঁকে দেয়।ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় বিষণ্ণ হাসি নিয়ে এজে বিড়বিড় করে বলে,
প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪
“আজ আমার থেকে পালাতে চাইছো তুমি? ঘৃণা করছো আমায়? কিন্তু যেদিন আমার আসল পরিচয় জানবে, কী করবে সেদিন? আমার জীবনে প্রথম রক্তে হাত ভিজিয়েছিলাম শুধুমাত্র তোমার জন্য… তারপর আর কাটাতে পারিনি রক্তের সেই নেশা।”
